📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 যাইদি মাযহাব

📄 যাইদি মাযহাব


প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম যাইদ রহিমাহুল্লাহ (৮১-১২২ হিজরি; ৭০০-৭৪০ সাল)
'আলি-এর বংশধর হুসাইনের এক দৌহিত্রের মাধ্যমে এ মাযহাবের উৎপত্তি। ইমাম যাইদের পিতা 'আলি যাইন আল-'আবিদীন আইন শাস্ত্রে অসামান্য জ্ঞান ও হাদীস বর্ণনার কারণে সুপরিচিত ছিলেন। ৮১ হিজরিতে মাদীনায় জন্মগ্রহণকারী যাইদ ইবন 'আলি অল্প সময়ের মধ্যেই 'আলাউই বংশের প্রথম সারির একজন বিশেষজ্ঞ 'আলিমে পরিণত হন। তাঁর বড় ভাই মুহাম্মাদ আল-বাকিরাসহ অন্যান্য অনেক আত্মীয়ের কাছ থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন।
ইরাকের কুফাহ, বাসরাহ ও ওয়াসিতের অন্যান্য শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণের মাধ্যমে ইমাম যাইদ তাঁর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন। ওয়াসিতে তিনি ইমাম আবু হানীফাহ ও সুফ্যান আস্-সাওরির মতো সমকালীন বিশেষজ্ঞদের সাথে মত বিনিময় করেছেন।
উমাইয়া খলীফা হিশাম ইবন আব্দিল মালিক (শাসনকাল ১০৫-১২৫ হিজরি; ৭২৪-৭৪৩ সাল) 'আলাউই পরিবারকে খাটো ও অপমানিত করার সুযোগ কখনো হাতছাড়া করতেন না। বিশেষত যাইদ ইবন 'আলীকে প্রায়ই অপমান করা হতো। গভর্নরের অনুমতি ছাড়া তাঁকে মাদীনার বাইরে যেতে দেওয়া হতো না। অনুমতি চাইলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হতো। এমতাবস্থায়, ইমাম যায়দই হলেন 'আলির বংশের প্রথম ব্যক্তি যিনি কারবালার বিপর্যয়ের পর উমাইয়াদের কাছ থেকে খিলাফাহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন।
তিনি গোপনে কুফাহ গমন করেন। সেখানে ইরাকের ওয়াসিত ও অন্যান্য এলাকার শী'আরা তাঁর সাথে মিলিত হয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তবে তাঁর কিছু আত্মীয় কুফাবাসীদের উপর আস্থা রাখতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ ইমাম হুসাইনের সাথে তাদের বিশ্বাসঘাতকতাই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু, তিনি তাদের সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করেননি।
ইমাম যাইদের নব্য অনুসারীরা অনুসন্ধান করে বের করল যে, তাঁর পিতামহের কাছ থেকে খিলাফাহ ‘চুরির’ অভিযোগে প্রথম খলীফাদ্বয় আবু বাক্স ও ‘উমারকে তিনি মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগী মনে করেন না। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ দেখা দেয়। অধিকাংশ অনুসারীরাই তাঁর কাছ থেকে কেটে পড়ে এবং তাঁর পরিবর্তে তাঁর ভাতিজা জা'ফার আস-সাদিককে যুগের ইমাম ঘোষণা করে। খলীফা হিশামের সেনাবাহিনী এ মতবিরোধের সদ্ব্যবহার করে অতর্কিত কুফাহ আক্রমণ করে। মাত্র চার শ’র সামান্য কিছু বেশি অনুসারী ইমাম যাইদের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এ যুদ্ধেই তিনি নিহত হন। ১২।
যায়দি মাযহাবের গঠন
ইমাম যাইদ ছিলেন প্রধানত হাদীস বর্ণনা ও কুর’আন তিলাওয়াতে একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। মাদীনা, বাসরাহ, কুফাহ ও ওয়াসিতের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে তিনি পাঠদান করতেন। এর ফলে তাঁর ছাত্রের সংখ্যা ছিল অনেক। ইমাম যাইদের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল হাদীস বর্ণনা ও কুর’আন তিলাওয়াহ শিখানো।
আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তিনি নিজে তার সমাধান দিতেন, অথবা ফাক্বীহ্ আব্দুর-রহমান ইবন আবি লাইলার মতো সমসাময়িক বিশেষজ্ঞদের কোনো একজনের মতকে বেছে নিতেন। মাযহাবের আইনগত সিদ্ধান্তগুলো ইমাম যাইদ নিজে লিপিবদ্ধ করেননি এবং তিনি কাউকে তা করার নির্দেশও দেননি। তাঁর ছাত্রবৃন্দ নিজ উদ্যোগে সেসব সিদ্ধান্ত সংকলন করেছেন।
যায়দি মাযহাবে আইনের উৎস
এ মাযহাবের আইন বিশেষজ্ঞগণের মতে, ইমাম যাইদ নিম্নোক্ত উৎসগুলো থেকে আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তার মাযহাবের পরবর্তী 'আলিমগণও এসব উৎস থেকেই আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।
১. আল-কুর'আন কুর'আঁনকে ইসলামি আইনের প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিদ্যমান ত্রিশ জুষ (পারা) কুর'আঁনকেই সম্পূর্ণ মনে করা হতো। অনেক চরমপন্থী শী'আহ গোষ্ঠী কুর'আঁনের কিছু অংশ মুছে ফেলা বা লুকিয়ে রাখার যে অভিযোগ উত্থাপন করে, তার সাথে তাঁরা একমত পোষণ করতেন না।
২. সুন্নাহ নাবি ﷺ-এর কথা, কাজ ও সম্মতিকে ইসলামি আইনের দ্বিতীয় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। 'আলাউই পরিবার কিংবা তাদের অনুসারীদের বর্ণিত হাদীসের মধ্যে সীমিত না রেখে সকল নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকে যায়দি মাযহাবে সুন্নাহ মনে করা হতো।
৩. 'আলি রাঃ-এর বক্তব্য একান্তই ব্যক্তিগত মত ছাড়া 'আলি ইবন আবি তালিবের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যকে ইমাম যাইদ সুন্নাহর অংশ মনে করতেন। অর্থাৎ, কোনো বক্তব্যের ক্ষেত্রে 'আলি রাঃ যদি বিশেষভাবে সেটিকে একান্ত নিজের মত বলে উল্লেখ না করতেন, তাহলে ইমাম যাইদ ধরেই নিতেন যে, তা নাবি ﷺ-এর মত। তবে, 'আলির সব সিদ্ধান্তকেই যে তিনি গ্রহণ করতেন তা নয়। বরং মাঝে মধ্যে তিনি 'আলির সিদ্ধান্তের বিপরীত সিদ্ধান্তও দিয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বর্ণিত আছে যে, 'আলি রাঃ-এর মতে ইয়াতিমের নিকট থেকে যাকাত আদায় করা যাবে। পক্ষান্তরে ইমাম যাইদ সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, ইয়াতিমের নিকট থেকে যাকাত আদায় করা যাবে না।
৪. সহাবিগণের ইজমা' ইমাম যাইদ সহাবিগণের ইজমা'কে ইসলামি আইনের একটি উৎস মনে করতেন। তবে আবু বাক্স ও 'উমারের তুলনায় তিনি তাঁর পিতামহকে নেতৃত্বের জন্য অধিক উপযুক্ত মনে করতেন। তথাপিও তাঁদের খিলাফাতকে যেহেতু সহাবিগণ সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তাই তিনিও তা মেনে নেওয়া সকলের উপর বাধ্যতামূলক হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করতেন।
৫. কিয়াস এ মাযহাবের আইনজ্ঞদের মতে, ইসতিহসান ও ইসতিসলাহ্ শীর্ষক উভয় নীতিই এক প্রকার কিয়াস। তাই, এ নীতিগুলোকে তাঁরা অন্যান্য মাযহাবের কিয়াসেরই একটি অংশ মনে করতেন।
৬. 'আকূল (বুদ্ধিমত্তা) যেসব ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী উৎসগুলোতে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না সেসবক্ষেত্রে মানবীয় বুদ্ধিমত্তাকে এ মাযহাবের ইসলামি আইনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যুবক বয়সে ইমাম যাইদ মু'তাযিলি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসিল ইবন 'আতার তত্ত্বাবধানে কিছু দিন শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মু'তাযিলারা সর্বপ্রথম 'আক্ল বা বুদ্ধিমত্তাকে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের যুক্তি মতে বিবেকবুদ্ধিতে যা ভালো মনে হবে তা-ই ভালো এবং যা মন্দ মনে হবে তা-ই মন্দ। কুর'আন ও সুন্নাহর পরেই 'আক্লের স্থান। এ কারণেই তারা কিয়াসের পাশাপাশি সহাবিগণের মতামতকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে, ইমাম যাইদ কিয়াসকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং 'আক্লকে স্থান দিয়েছেন সবার শেষে।
যায়দি মাযহাবের প্রধান ছাত্ররা এ মাযহাব সংরক্ষিত হয়েছে ইমাম যাইদের ছাত্রদের মাধ্যমে। তাঁরা ইমাম যাইদের সিদ্ধান্তগুলোর পাশাপাশি 'আলাউই বংশের অন্যান্য ইমাম এবং সমসাময়িক অনেক বিশেষজ্ঞের আইনগত সিদ্ধান্তগুলোও তাঁদের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
আবু খালিদ, 'আম্র ইব্‌ন খালিদ ওয়াসিতি (মৃত্যু ২৭৬ হিজরি; ৮৮৯ সাল)
'আম্র ইব্‌ন খালিদ সম্ভবত ইমাম যাইদের ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন সর্বাধিক খ্যাতিসম্পন্ন। ইমাম যাইদের সাথে তিনি মাদীনায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন এবং অধিকাংশ সফরে তিনি তাঁর সাথে থাকতেন। 'আম্র দুটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থে ইমাম যাইদের শিক্ষাগুলো সংকলন করেন। গ্রন্থ দুটি হলো মাজমু' আল-হাদীস ও মাজমু' আল-ফিক্হ। এগুলোকে একত্রে বলা হয় আল মাজমু' আল-কাবীর। মাজমু' আল-হাদীস গ্রন্থের সকল হাদীসই 'আলাউই পরিবারের বর্ণনা থেকে নেওয়া হলেও এর সবগুলো বর্ণনাই সিহাহ সিত্তাহর বিখ্যাত গ্রন্থগুলোতে রয়েছে।
আল-হাঁদি ইলী আল-হাক্, ইয়াহইয়া ইবন আল-হুসাইন (২৪৬-২৯৮ হিজরি; ৮৬০-৯১১ সাল)
যায়দিগণ 'আলাউই বংশের হুসাইনি শাখার সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ আল-কাঁসিম ইবন ইবরাহীম আল-হাসানি (১৭০-২৪৩ হিজরি; ৭৮৭-৮৫৭ সাল)-এর মতামতগুলোও যায়দি মাযহাবে স্থান পেয়েছে। তবে, এ মাযহাবের উপর তাঁর চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন কাসিমের দৌহিত্র আল-হাঁদি ইলা আল-হাক্ক। তাকে ইয়েমেনের ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি যায়দি মাযহাবের শিক্ষা অনুযায়ী ইয়েমেনের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন। এ সময়ে সে অঞ্চলে যায়দি মাযহাবের ভিত্তি এতটাই মজবুত হয়ে গিয়েছিল যে, এর বদৌলতে তা অদ্যাবধি টিকে আছে।
আল-হাসান ইবন 'আলি আল হুসাইনি (২৩০-৩০৪ হিজরি; ৮৪৫- ৯১৭ সাল)
আল-হাসান ছিলেন হাঁদির সমসাময়িক। তিনি আন-নাসির আল-কাবীর নামে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি দাইলাম ও জীলানে যাইদি মাযহাব প্রচার করেন। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ এবং তাঁর পরবর্তী লোকেরা তাঁকেই যায়দি মাযহাবের পুনর্জাগরক মনে করেন। ১০।
যায়দি মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ
বর্তমানে এ মাযহাবের অনুসারীবৃন্দের অধিকাংশই বসবাস করতেন ইয়েমেনে। এখনও ইয়েমেনের অনেক নাগরিক যায়িদী মাযহাবের অনুসারী।

টিকাঃ
[১১] শী'আদের উপস্থাপিত বারো ইমামের পঞ্চমজন।
[১২] তারীখ আল-মাযহাব আল-ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭৪৯-৭৯৩।
[১৩] তারীখ আল-মাযাহিব আল-ইসলামিয়‍্যাহ, খন্ড ২, পৃ. ৫২৫।

প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম যাইদ রহিমাহুল্লাহ (৮১-১২২ হিজরি; ৭০০-৭৪০ সাল)
'আলি-এর বংশধর হুসাইনের এক দৌহিত্রের মাধ্যমে এ মাযহাবের উৎপত্তি। ইমাম যাইদের পিতা 'আলি যাইন আল-'আবিদীন আইন শাস্ত্রে অসামান্য জ্ঞান ও হাদীস বর্ণনার কারণে সুপরিচিত ছিলেন। ৮১ হিজরিতে মাদীনায় জন্মগ্রহণকারী যাইদ ইবন 'আলি অল্প সময়ের মধ্যেই 'আলাউই বংশের প্রথম সারির একজন বিশেষজ্ঞ 'আলিমে পরিণত হন। তাঁর বড় ভাই মুহাম্মাদ আল-বাকিরাসহ অন্যান্য অনেক আত্মীয়ের কাছ থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন।
ইরাকের কুফাহ, বাসরাহ ও ওয়াসিতের অন্যান্য শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণের মাধ্যমে ইমাম যাইদ তাঁর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন। ওয়াসিতে তিনি ইমাম আবু হানীফাহ ও সুফ্যান আস্-সাওরির মতো সমকালীন বিশেষজ্ঞদের সাথে মত বিনিময় করেছেন।
উমাইয়া খলীফা হিশাম ইবন আব্দিল মালিক (শাসনকাল ১০৫-১২৫ হিজরি; ৭২৪-৭৪৩ সাল) 'আলাউই পরিবারকে খাটো ও অপমানিত করার সুযোগ কখনো হাতছাড়া করতেন না। বিশেষত যাইদ ইবন 'আলীকে প্রায়ই অপমান করা হতো। গভর্নরের অনুমতি ছাড়া তাঁকে মাদীনার বাইরে যেতে দেওয়া হতো না। অনুমতি চাইলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হতো। এমতাবস্থায়, ইমাম যায়দই হলেন 'আলির বংশের প্রথম ব্যক্তি যিনি কারবালার বিপর্যয়ের পর উমাইয়াদের কাছ থেকে খিলাফাহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন।
তিনি গোপনে কুফাহ গমন করেন। সেখানে ইরাকের ওয়াসিত ও অন্যান্য এলাকার শী'আরা তাঁর সাথে মিলিত হয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তবে তাঁর কিছু আত্মীয় কুফাবাসীদের উপর আস্থা রাখতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ ইমাম হুসাইনের সাথে তাদের বিশ্বাসঘাতকতাই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু, তিনি তাদের সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করেননি।
ইমাম যাইদের নব্য অনুসারীরা অনুসন্ধান করে বের করল যে, তাঁর পিতামহের কাছ থেকে খিলাফাহ ‘চুরির’ অভিযোগে প্রথম খলীফাদ্বয় আবু বাক্স ও ‘উমারকে তিনি মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগী মনে করেন না। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ দেখা দেয়। অধিকাংশ অনুসারীরাই তাঁর কাছ থেকে কেটে পড়ে এবং তাঁর পরিবর্তে তাঁর ভাতিজা জা'ফার আস-সাদিককে যুগের ইমাম ঘোষণা করে। খলীফা হিশামের সেনাবাহিনী এ মতবিরোধের সদ্ব্যবহার করে অতর্কিত কুফাহ আক্রমণ করে। মাত্র চার শ’র সামান্য কিছু বেশি অনুসারী ইমাম যাইদের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এ যুদ্ধেই তিনি নিহত হন। ১২।
যায়দি মাযহাবের গঠন
ইমাম যাইদ ছিলেন প্রধানত হাদীস বর্ণনা ও কুর’আন তিলাওয়াতে একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। মাদীনা, বাসরাহ, কুফাহ ও ওয়াসিতের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে তিনি পাঠদান করতেন। এর ফলে তাঁর ছাত্রের সংখ্যা ছিল অনেক। ইমাম যাইদের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল হাদীস বর্ণনা ও কুর’আন তিলাওয়াহ শিখানো।
আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তিনি নিজে তার সমাধান দিতেন, অথবা ফাক্বীহ্ আব্দুর-রহমান ইবন আবি লাইলার মতো সমসাময়িক বিশেষজ্ঞদের কোনো একজনের মতকে বেছে নিতেন। মাযহাবের আইনগত সিদ্ধান্তগুলো ইমাম যাইদ নিজে লিপিবদ্ধ করেননি এবং তিনি কাউকে তা করার নির্দেশও দেননি। তাঁর ছাত্রবৃন্দ নিজ উদ্যোগে সেসব সিদ্ধান্ত সংকলন করেছেন।
যায়দি মাযহাবে আইনের উৎস
এ মাযহাবের আইন বিশেষজ্ঞগণের মতে, ইমাম যাইদ নিম্নোক্ত উৎসগুলো থেকে আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তার মাযহাবের পরবর্তী 'আলিমগণও এসব উৎস থেকেই আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।
১. আল-কুর'আন কুর'আঁনকে ইসলামি আইনের প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিদ্যমান ত্রিশ জুষ (পারা) কুর'আঁনকেই সম্পূর্ণ মনে করা হতো। অনেক চরমপন্থী শী'আহ গোষ্ঠী কুর'আঁনের কিছু অংশ মুছে ফেলা বা লুকিয়ে রাখার যে অভিযোগ উত্থাপন করে, তার সাথে তাঁরা একমত পোষণ করতেন না।
২. সুন্নাহ নাবি ﷺ-এর কথা, কাজ ও সম্মতিকে ইসলামি আইনের দ্বিতীয় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। 'আলাউই পরিবার কিংবা তাদের অনুসারীদের বর্ণিত হাদীসের মধ্যে সীমিত না রেখে সকল নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকে যায়দি মাযহাবে সুন্নাহ মনে করা হতো।
৩. 'আলি রাঃ-এর বক্তব্য একান্তই ব্যক্তিগত মত ছাড়া 'আলি ইবন আবি তালিবের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যকে ইমাম যাইদ সুন্নাহর অংশ মনে করতেন। অর্থাৎ, কোনো বক্তব্যের ক্ষেত্রে 'আলি রাঃ যদি বিশেষভাবে সেটিকে একান্ত নিজের মত বলে উল্লেখ না করতেন, তাহলে ইমাম যাইদ ধরেই নিতেন যে, তা নাবি ﷺ-এর মত। তবে, 'আলির সব সিদ্ধান্তকেই যে তিনি গ্রহণ করতেন তা নয়। বরং মাঝে মধ্যে তিনি 'আলির সিদ্ধান্তের বিপরীত সিদ্ধান্তও দিয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বর্ণিত আছে যে, 'আলি রাঃ-এর মতে ইয়াতিমের নিকট থেকে যাকাত আদায় করা যাবে। পক্ষান্তরে ইমাম যাইদ সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, ইয়াতিমের নিকট থেকে যাকাত আদায় করা যাবে না।
৪. সহাবিগণের ইজমা' ইমাম যাইদ সহাবিগণের ইজমা'কে ইসলামি আইনের একটি উৎস মনে করতেন। তবে আবু বাক্স ও 'উমারের তুলনায় তিনি তাঁর পিতামহকে নেতৃত্বের জন্য অধিক উপযুক্ত মনে করতেন। তথাপিও তাঁদের খিলাফাতকে যেহেতু সহাবিগণ সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তাই তিনিও তা মেনে নেওয়া সকলের উপর বাধ্যতামূলক হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করতেন।
৫. কিয়াস এ মাযহাবের আইনজ্ঞদের মতে, ইসতিহসান ও ইসতিসলাহ্ শীর্ষক উভয় নীতিই এক প্রকার কিয়াস। তাই, এ নীতিগুলোকে তাঁরা অন্যান্য মাযহাবের কিয়াসেরই একটি অংশ মনে করতেন।
৬. 'আকূল (বুদ্ধিমত্তা) যেসব ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী উৎসগুলোতে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না সেসবক্ষেত্রে মানবীয় বুদ্ধিমত্তাকে এ মাযহাবের ইসলামি আইনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যুবক বয়সে ইমাম যাইদ মু'তাযিলি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসিল ইবন 'আতার তত্ত্বাবধানে কিছু দিন শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মু'তাযিলারা সর্বপ্রথম 'আক্ল বা বুদ্ধিমত্তাকে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের যুক্তি মতে বিবেকবুদ্ধিতে যা ভালো মনে হবে তা-ই ভালো এবং যা মন্দ মনে হবে তা-ই মন্দ। কুর'আন ও সুন্নাহর পরেই 'আক্লের স্থান। এ কারণেই তারা কিয়াসের পাশাপাশি সহাবিগণের মতামতকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে, ইমাম যাইদ কিয়াসকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং 'আক্লকে স্থান দিয়েছেন সবার শেষে।
যায়দি মাযহাবের প্রধান ছাত্ররা এ মাযহাব সংরক্ষিত হয়েছে ইমাম যাইদের ছাত্রদের মাধ্যমে। তাঁরা ইমাম যাইদের সিদ্ধান্তগুলোর পাশাপাশি 'আলাউই বংশের অন্যান্য ইমাম এবং সমসাময়িক অনেক বিশেষজ্ঞের আইনগত সিদ্ধান্তগুলোও তাঁদের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
আবু খালিদ, 'আম্র ইব্‌ন খালিদ ওয়াসিতি (মৃত্যু ২৭৬ হিজরি; ৮৮৯ সাল)
'আম্র ইব্‌ন খালিদ সম্ভবত ইমাম যাইদের ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন সর্বাধিক খ্যাতিসম্পন্ন। ইমাম যাইদের সাথে তিনি মাদীনায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন এবং অধিকাংশ সফরে তিনি তাঁর সাথে থাকতেন। 'আম্র দুটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থে ইমাম যাইদের শিক্ষাগুলো সংকলন করেন। গ্রন্থ দুটি হলো মাজমু' আল-হাদীস ও মাজমু' আল-ফিক্হ। এগুলোকে একত্রে বলা হয় আল মাজমু' আল-কাবীর। মাজমু' আল-হাদীস গ্রন্থের সকল হাদীসই 'আলাউই পরিবারের বর্ণনা থেকে নেওয়া হলেও এর সবগুলো বর্ণনাই সিহাহ সিত্তাহর বিখ্যাত গ্রন্থগুলোতে রয়েছে।
আল-হাঁদি ইলী আল-হাক্, ইয়াহইয়া ইবন আল-হুসাইন (২৪৬-২৯৮ হিজরি; ৮৬০-৯১১ সাল)
যায়দিগণ 'আলাউই বংশের হুসাইনি শাখার সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ আল-কাঁসিম ইবন ইবরাহীম আল-হাসানি (১৭০-২৪৩ হিজরি; ৭৮৭-৮৫৭ সাল)-এর মতামতগুলোও যায়দি মাযহাবে স্থান পেয়েছে। তবে, এ মাযহাবের উপর তাঁর চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন কাসিমের দৌহিত্র আল-হাঁদি ইলা আল-হাক্ক। তাকে ইয়েমেনের ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি যায়দি মাযহাবের শিক্ষা অনুযায়ী ইয়েমেনের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন। এ সময়ে সে অঞ্চলে যায়দি মাযহাবের ভিত্তি এতটাই মজবুত হয়ে গিয়েছিল যে, এর বদৌলতে তা অদ্যাবধি টিকে আছে।
আল-হাসান ইবন 'আলি আল হুসাইনি (২৩০-৩০৪ হিজরি; ৮৪৫- ৯১৭ সাল)
আল-হাসান ছিলেন হাঁদির সমসাময়িক। তিনি আন-নাসির আল-কাবীর নামে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি দাইলাম ও জীলানে যাইদি মাযহাব প্রচার করেন। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ এবং তাঁর পরবর্তী লোকেরা তাঁকেই যায়দি মাযহাবের পুনর্জাগরক মনে করেন। ১০।
যায়দি মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ
বর্তমানে এ মাযহাবের অনুসারীবৃন্দের অধিকাংশই বসবাস করতেন ইয়েমেনে। এখনও ইয়েমেনের অনেক নাগরিক যায়িদী মাযহাবের অনুসারী।

টিকাঃ
[১১] শী'আদের উপস্থাপিত বারো ইমামের পঞ্চমজন।
[১২] তারীখ আল-মাযহাব আল-ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭৪৯-৭৯৩।
[১৩] তারীখ আল-মাযাহিব আল-ইসলামিয়‍্যাহ, খন্ড ২, পৃ. ৫২৫।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 লাইসি মাযহাব

📄 লাইসি মাযহাব


প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আল-লাইস রহিমাহুল্লাহ (৯৭-১৭৫ হিজরি; ৭১৬-৭৯১ সাল)
ইমাম লাইস ইবন সা'দের নামানুসারে এ মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে। ৯৭ হিজরিতে পারস্য বংশোদ্ভূত পিতা-মাতার ঘরে ইমাম আল- লাইস মিশরে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন ইসলামি জ্ঞানের সব কটি শাখায় ব্যাপক অধ্যয়নের পর তিনি মিশরের প্রধানতম বিশেষজ্ঞ 'আলিমে পরিণত হন। তিনি ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম মালিকের সমসাময়িক ছিলেন। ইমাম মালিকের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে ইসলামি আইনের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি মত বিনিময় করেছেন। যেমন, ইমাম মালিক মাদীনার প্রthaকে ইসলামি আইনের একটি স্বতন্ত্র উৎস হিসেবে গ্রহণ করতেন, কিন্তু ইমাম আল-লাইস এ মতের বিপক্ষে চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাঁর যুক্তি উপস্থাপন করতেন।
মাযহাবটি বিলুপ্তির কারণ
১৭৫ হিজরিতে ইমাম লাইসের ইন্তেকালের কিছুদিন পরই নিম্মলিখিত কারণে এ মাযহাবটির বিলুপ্তি ঘটে:
১. তাঁর আইনগত মতামত, ব্যাখ্যা ও সেগুলোর সমর্থনে কুর'আন, সুন্নাহ ও সহীবিগণের মতামত থেকে সংগৃহীত প্রমাণগুলোকে তিনি নিজে লিপিবদ্ধ করেননি। এমনকি তাঁর ছাত্রদেরকেও তা লিপিবদ্ধ করার কোনো নির্দেশ দেননি। ফলে, তুলনামূলক ফিকহশাস্ত্রের আদি গ্রন্থগুলোতে কিছু উদ্ধৃতি ছাড়া তাঁর মাযহাবের তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই।
২. ইমাম লাইসের ছাত্রের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাছাড়া তাঁদের কেউই বিখ্যাত আইনজ্ঞে পরিণত হননি। আর তাই ইমাম লাইসের মাযহাবকে জনপ্রিয় করে তোলার মতো কোনো প্রভাব সৃষ্টিকারী অবস্থানেও তারা ছিলেন না।
৩. ইমাম লাইসের ইন্তেকালের পরেই ফিকহশাস্ত্রে অন্যতম অসাধারণ বিশেষজ্ঞ ইমাম শাফি'ই মিশরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর মাযহাব ইমাম লাইসের মাযহাবকে প্রতিস্থাপিত করে দেয়।
উল্লেখ্য যে, ইমাম শাফি'ই স্বয়ং ইমাম মালিকের কাছে ও ইমাম লাইসের ছাত্রদের কাছে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি ইমাম লাইসের ব্যাপারে এমন কথাও বলেছিলেন যে, তিনি ইমাম মালিকের চেয়ে বড় আইনজ্ঞ ছিলেন; তবে তাঁর ছাত্ররা তাঁকে অবহেলা করেছে।[১৪]

টিকাঃ
[১৪] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৫।

প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আল-লাইস রহিমাহুল্লাহ (৯৭-১৭৫ হিজরি; ৭১৬-৭৯১ সাল)
ইমাম লাইস ইবন সা'দের নামানুসারে এ মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে। ৯৭ হিজরিতে পারস্য বংশোদ্ভূত পিতা-মাতার ঘরে ইমাম আল- লাইস মিশরে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন ইসলামি জ্ঞানের সব কটি শাখায় ব্যাপক অধ্যয়নের পর তিনি মিশরের প্রধানতম বিশেষজ্ঞ 'আলিমে পরিণত হন। তিনি ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম মালিকের সমসাময়িক ছিলেন। ইমাম মালিকের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে ইসলামি আইনের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি মত বিনিময় করেছেন। যেমন, ইমাম মালিক মাদীনার প্রthaকে ইসলামি আইনের একটি স্বতন্ত্র উৎস হিসেবে গ্রহণ করতেন, কিন্তু ইমাম আল-লাইস এ মতের বিপক্ষে চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাঁর যুক্তি উপস্থাপন করতেন।
মাযহাবটি বিলুপ্তির কারণ
১৭৫ হিজরিতে ইমাম লাইসের ইন্তেকালের কিছুদিন পরই নিম্মলিখিত কারণে এ মাযহাবটির বিলুপ্তি ঘটে:
১. তাঁর আইনগত মতামত, ব্যাখ্যা ও সেগুলোর সমর্থনে কুর'আন, সুন্নাহ ও সহীবিগণের মতামত থেকে সংগৃহীত প্রমাণগুলোকে তিনি নিজে লিপিবদ্ধ করেননি। এমনকি তাঁর ছাত্রদেরকেও তা লিপিবদ্ধ করার কোনো নির্দেশ দেননি। ফলে, তুলনামূলক ফিকহশাস্ত্রের আদি গ্রন্থগুলোতে কিছু উদ্ধৃতি ছাড়া তাঁর মাযহাবের তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই।
২. ইমাম লাইসের ছাত্রের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাছাড়া তাঁদের কেউই বিখ্যাত আইনজ্ঞে পরিণত হননি। আর তাই ইমাম লাইসের মাযহাবকে জনপ্রিয় করে তোলার মতো কোনো প্রভাব সৃষ্টিকারী অবস্থানেও তারা ছিলেন না।
৩. ইমাম লাইসের ইন্তেকালের পরেই ফিকহশাস্ত্রে অন্যতম অসাধারণ বিশেষজ্ঞ ইমাম শাফি'ই মিশরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর মাযহাব ইমাম লাইসের মাযহাবকে প্রতিস্থাপিত করে দেয়।
উল্লেখ্য যে, ইমাম শাফি'ই স্বয়ং ইমাম মালিকের কাছে ও ইমাম লাইসের ছাত্রদের কাছে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি ইমাম লাইসের ব্যাপারে এমন কথাও বলেছিলেন যে, তিনি ইমাম মালিকের চেয়ে বড় আইনজ্ঞ ছিলেন; তবে তাঁর ছাত্ররা তাঁকে অবহেলা করেছে।[১৪]

টিকাঃ
[১৪] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৫।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 সাওরি মাযহাব

📄 সাওরি মাযহাব


প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম সাওরি রহিমাহুল্লাহ (৯৭-১৬১ হিজরি; ৭১৯- ৭৭৭ সাল)
ইমাম সুফয়ান সাওরি ৯৭ হিজরিতে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। হাদীস ও ফিকহের ব্যাপক অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি কুফার প্রধানতম বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। অনেক ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার অনুরূপ মত পোষণ করলেও তিনি কিয়াস ও ইসতিহসান নীতির বিরোধী ছিলেন।
ইমাম সুফয়ান সাওরির সাথে 'আব্বাসি রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের বেশ কয়েকবার বাদানুবাদ হয়। কারণ, তিনি ছিলেন স্পষ্টবাদী প্রকৃতির মানুষ এবং শারী'আহ পরিপন্থী রাষ্ট্রীয় নীতিতে সমর্থন করার প্রস্তাবকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। খলীফা আল-মানসুর (শাসনকাল ১৩৬-১৫৮ হিজরি; ৭৫৯-৭৪৪ সাল) চিঠির মাধ্যমে ইমাম আস্-সাওরিকে কুফার বিচারকের পদ গ্রহণ করার অনুরোধ জানান। তবে এতে শর্ত দেওয়া হয় যে, তিনি রাষ্ট্রীয় নীতির সাথে সাংঘর্ষিক কোনো রায় কিংবা মতামত দেবেন না। চিঠিটি পাওয়ার পর ইমাম সাওরি তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বিরক্তির সাথে টাইগ্রিস নদীতে নিক্ষেপ করেন। কিন্তু, এর ফলে শিক্ষকতা ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য তিনি পলায়ন করতে বাধ্য হন। ১৬০ হিজরিতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করেই ছিলেন।
মাযহাবটির বিলুপ্তির কারণ
এই মাযহাবটি বিলুপ্তির মূল কারণগুলো ছিল:
১. ইমাম সুফ্যান আস-সাওরি জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আত্মগোপন করে কাটিয়েছেন। তাই তাঁর ছাত্রের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না যারা পরবর্তী সময়ে জ্ঞানী মহলে তাঁর মতামত ছড়িয়ে দিতে পারত।
২. তিনি হাদীস ও তার ব্যাখ্যার এক বিশাল সংকলন প্রস্তুত করেছিলেন। তবে, তিনি তাঁর প্রধান ছাত্র 'আম্মার ইবন সাইফকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁর সকল লেখা যেন মুছে ফেলা হয়, আর কোনোটা মুছে ফেলা সম্ভব না হলে তা যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। 'আম্মার কর্তব্যপরায়ণতার সাথে নিজ শিক্ষকের সব লেখা নষ্ট করে ফেলেন। তবে ইমাম সাওরির অনেক মতামতই অন্যান্য ইমামের ছাত্ররা সংকলন করেছেন। ফলে, সেগুলো আজও অগোছালোভাবে বিভিন্ন গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে।॥১৫।

টিকাঃ
[১৫] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৬-২০৭।

প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম সাওরি রহিমাহুল্লাহ (৯৭-১৬১ হিজরি; ৭১৯- ৭৭৭ সাল)
ইমাম সুফয়ান সাওরি ৯৭ হিজরিতে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। হাদীস ও ফিকহের ব্যাপক অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি কুফার প্রধানতম বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। অনেক ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার অনুরূপ মত পোষণ করলেও তিনি কিয়াস ও ইসতিহসান নীতির বিরোধী ছিলেন।
ইমাম সুফয়ান সাওরির সাথে 'আব্বাসি রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের বেশ কয়েকবার বাদানুবাদ হয়। কারণ, তিনি ছিলেন স্পষ্টবাদী প্রকৃতির মানুষ এবং শারী'আহ পরিপন্থী রাষ্ট্রীয় নীতিতে সমর্থন করার প্রস্তাবকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। খলীফা আল-মানসুর (শাসনকাল ১৩৬-১৫৮ হিজরি; ৭৫৯-৭৪৪ সাল) চিঠির মাধ্যমে ইমাম আস্-সাওরিকে কুফার বিচারকের পদ গ্রহণ করার অনুরোধ জানান। তবে এতে শর্ত দেওয়া হয় যে, তিনি রাষ্ট্রীয় নীতির সাথে সাংঘর্ষিক কোনো রায় কিংবা মতামত দেবেন না। চিঠিটি পাওয়ার পর ইমাম সাওরি তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বিরক্তির সাথে টাইগ্রিস নদীতে নিক্ষেপ করেন। কিন্তু, এর ফলে শিক্ষকতা ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য তিনি পলায়ন করতে বাধ্য হন। ১৬০ হিজরিতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করেই ছিলেন।
মাযহাবটির বিলুপ্তির কারণ
এই মাযহাবটি বিলুপ্তির মূল কারণগুলো ছিল:
১. ইমাম সুফ্যান আস-সাওরি জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আত্মগোপন করে কাটিয়েছেন। তাই তাঁর ছাত্রের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না যারা পরবর্তী সময়ে জ্ঞানী মহলে তাঁর মতামত ছড়িয়ে দিতে পারত।
২. তিনি হাদীস ও তার ব্যাখ্যার এক বিশাল সংকলন প্রস্তুত করেছিলেন। তবে, তিনি তাঁর প্রধান ছাত্র 'আম্মার ইবন সাইফকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁর সকল লেখা যেন মুছে ফেলা হয়, আর কোনোটা মুছে ফেলা সম্ভব না হলে তা যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। 'আম্মার কর্তব্যপরায়ণতার সাথে নিজ শিক্ষকের সব লেখা নষ্ট করে ফেলেন। তবে ইমাম সাওরির অনেক মতামতই অন্যান্য ইমামের ছাত্ররা সংকলন করেছেন। ফলে, সেগুলো আজও অগোছালোভাবে বিভিন্ন গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে।॥১৫।

টিকাঃ
[১৫] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৬-২০৭।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 শাফি‘ই মাযহাব

📄 শাফি‘ই মাযহাব


প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম শাফি'ই রহিমাহুল্লাহ (১৫০-২০৪ হিজরি; ৭৬৯-৮২০ সাল)
মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইদরীস শাফি'ইর নামানুসারে এই মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে। তিনি ১৫০ হিজরিতে তদানীন্তন শাম এলাকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের গাজা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে ইমাম মালিকের তত্ত্বাবধানে ফিকহ ও হাদীস অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে তিনি বাল্য বয়সেই মাদীনাহ গমন করেন। তিনি ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা' এমনভাবে মুখস্থ করেছিলেন যে, তাঁকে স্মৃতি থেকে হুবহু তা পাঠ করে শুনিয়ে দিতে পারতেন।
১৭৯ হিজরিতে ইমাম মালিকের মৃত্যু পর্যন্ত ইমাম শাফি'ই তাঁর তত্ত্বাবধানেই থেকে যান। তারপর তিনি ইয়েমেনে গিয়ে শিক্ষাদান শুরু করেন। ১৮৯ হিজরিতে তাঁর বিরুদ্ধে শী'আহ বিশ্বাসের প্রতি ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। তখন তাঁকে ইয়েমেন থেকে গ্রেফতার করে ইরাকে 'আব্বাসি খলীফা হারুন আর-রাশীদের (শাসনকাল ১৭০-১৯৩ হিজরি; ৭৮৬-৮০৯ সাল) কাছে হাজির করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে তিনি তাঁর 'আকীদা-বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। পরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এরপর ইমাম শাফি'ই ইরাকেই থেকে যান এবং ইমাম আবু হানীফাহর বিখ্যাত ছাত্র ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানের তত্ত্বাবধানে কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীকালে, ইমাম লাইসের নিকট থেকে জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে তিনি মিশরে গমন করেন। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখেন ইমাম আল-লাইস ইতিমধ্যেই ইন্তেকাল করেছেন। পরে অবশ্য তিনি ইমাম লাইসের ছাত্রদের নিকট থেকে তাঁর মাযহাব অধ্যয়ন করতে সক্ষম হন। ইমাম শাফি'ই বাকি জীবন মিশরেই কাটিয়ে দেন। তিনি ২০৪ হিজরিতে খলীফা আল-মামুনের (শাসনকাল ১৯৭-২১৭ হিজরি; ৮১৩-৮৩২ সাল) শাসনামলে ইন্তেকাল করেন।১৬।
শাফি'ই মাযহাবের গঠন
ইমাম শাফি'ই হিজাযের মালিকি ফিকহকে ইরাকের হানাফি ফিকহের সাথে সমন্বিত করে একটি নতুন মাযহাব তৈরি করেন। এরপর তিনি আল-হুজ্জাহ নামক গ্রন্থাকারে নিজ ছাত্রদের সামনে তা উপস্থাপন করেন। এ গ্রন্থটির শ্রুতলিখনের কাজ সম্পন্ন হয় ১৯৪ হিজরিতে (৮১০ সাল) ইরাকে। তাঁর কিছু ছাত্র।১৭। গ্রন্থটিকে মুখস্থ করে অন্যদের কাছে বর্ণনা করেছেন। তাঁর এই গ্রন্থ ও তাঁর জ্ঞানচর্চার এ কালকে আল-মাযহাব আল-কাদীম বা পুরাতন মাযহাব নামে অভিহিত করা হয়।
মিশরে পৌঁছানোর পর তাঁর জ্ঞানচর্চার নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছিল। সেখানে তিনি ইমাম লাইসের মাযহাব পুরোপুরি আত্মস্থ করে আল-উম্ম নামে আরেকটি গ্রন্থের আকারে তাঁর ছাত্রদের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর এ গ্রন্থ ও জ্ঞানচর্চার এই কালকে মাযহাব আল-জাদীদ বা নতুন মাযহাব নামে অভিহিত করা হয়। সম্পূর্ণ নতুন কিছু হাদীস ও আইনি যুক্তির সাথে পরিচিত হয়ে তিনি তাঁর পূর্বের অনেক সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করেছেন। ইমাম শাফি'ই-ই প্রথম ফিক্হ শাস্ত্রের মৌলিক নীতিমালাকে সুশৃংখলভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর আর-রিসালাহ নামক গ্রন্থে তিনি এ সকল নীতি আলোচনা করেছেন।
শাফি'ই মাযহাবে আইনের উৎস ১. আল-কুর'আন
ইসলামি আইনের উৎসগুলোর মধ্যে কুর'আনের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে ইমাম শাফি'ইও পূর্বের ইমামদের সাথে একমত পোষণ করেছেন। অন্য ইমামদের মতো তিনিও কুর'আনের উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছেন। তবে, কুর'আনের গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি যে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছিলেন তার উপরও অনেক সময় নির্ভর করতেন।
২. সুন্নাহ
ইমাম শাফি'ই হাদীস গ্রহণের জন্য কেবল একটি শর্ত আরোপ করেছেন। তা হলো হাদীসটিকে অবশ্যই সহীহ হতে হবে। ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম মালিকের আরোপিত অন্য সকল শর্তকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। হাদীস শাস্ত্রে বিশেষ অবদান রাখার কারণেও তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন।
৩. ইজমা'
বেশ কিছু বিষয়ে আদৌ ইজমা' সংঘটিত হয়েছিল কি না তা নিয়ে ইমাম শাফি'ই-র যথেষ্ট সংশয় ছিল। তবে, অল্প যে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইজমা' হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে জানা গেছে—তাঁর মতে সেগুলোকে অবশ্যই ইসলামি আইনের তৃতীয় প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৪. সহাবিদের ব্যক্তিগত মত
ইমাম শাফি'ই সহাবিদের ব্যক্তিগত মতামতকে এই শর্তে গ্রহণ করছেন যে, সেগুলো পরস্পরবিরোধী হতে পারবে না। কোনো আইনগত বিষয়ে সহাবিগণের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে ইমাম আবু হানীফাহর মতো তিনিও মূল উৎস কুর'আন ও সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী মতকে বেছে নিয়ে বাকিগুলোকে পরিত্যাগ করতেন।
৫. কিয়াস ইমাম শাফি'ঈ-র মতে, উল্লিখিত উৎসগুলো থেকে আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিয়াস একটি বৈধ পদ্ধতি। তবে, তিনি এটিকে গুরুত্বের ক্রমধারায় শেষের দিকে স্থান দিয়েছেন। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত মতকে তিনি সাহাবিগণের মতামতের চেয়ে সবসময় কম গুরুত্ব দিতেন।
৬. ইসতিস্হাব ইমাম শাফি'ঈ ইমাম আবু হানীফাহ ইসতিহসান ও ইমাম মালিকের ইসতিসলাহ্—উভয় নীতিকেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। এগুলোকে তিনি এক প্রকার বিদ'আত মনে করতেন। তাঁর মতে, এগুলো এমন সব ক্ষেত্রে মানবীয় বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ যেখানে পূর্ব থেকেই ওয়াহয়ির আইন বিদ্যমান। তবে, একই রকম সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ইমাম শাফি'ঈ ইসতিহসান ও ইসতিসলাহ্-এর মতোই একটি নীতি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি এ নীতির নাম দিয়েছেন ইসতিসহাব। [১৮] আক্ষরিকভাবে ইসতিসহাব-এর অর্থ হলো সংযোগ খুঁজে বের করা। কিন্তু, আইনের পরিভাষায় এ শব্দটি দ্বারা পূর্বের কোনো পরিস্থিতির সাথে নতুন পরিস্থিতির সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে ফিকহি আইন বের করে আনার পদ্ধতিকে বোঝায়। এ নীতিটির ভিত্তি হলো, কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য আইন ততক্ষণই বহাল থাকবে, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি কোনো ব্যক্তির দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তার জীবিত বা মৃত হওয়া নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাহলে ইসতিসহাব নীতি অনুযায়ী, সে নিশ্চিতরূপে জীবিত থাকলে যেসকল নিয়মকানুন প্রযোজ্য হতো সেগুলোর সবকিছুই বলবৎ থাকবে।
শাফি'ই মাযহাবের প্রধান ছাত্র
যে সকল ছাত্র আজীবন ইমাম শাফি'ই-র মাযহাব অনুসরণ করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হলেন, ইমাম আল-মুযানি, আর-রাবী' ও ইউসুফ ইব্‌ন ইয়াহইয়া প্রমুখ।
ইমাম আল-মুযানি (১৭৫-২৬২ হিজরি; ৭৯১-৮৭৬ সাল) তাঁর পুরো নাম হলো ইসমা'ঈল ইব্‌ন ইয়াহ্ইয়া আল-মুযানি। ইমাম শাফি'ই-র মিশরে অবস্থানকালের পুরো সময় জুড়ে আল-মুযানি তাঁর সঙ্গী ছিলেন। তিনি শাফি'ই ফিক্হের উপর একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করার কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন। পরবর্তীকালে মুখতাসার আল-মুযানি শিরোনামে তিনি গ্রন্থটিকে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করেন। তাঁর রচিত এই গ্রন্থটিই পরবর্তীকালে শাফি'ই মাযহাবের সর্বাধিক পঠিত ফিক্হ গ্রন্থে পরিণত হয়।
আর-রাবী' মারাদি (১৭৪-২৫৯ হিজরি; ৭৯০-৮৭৩ সাল) আর-রাবী' মারাদি ইমাম শাফি'ই-র গ্রন্থ আল-উম্ম-এর প্রধান বর্ণনাকারী হিসেবে খ্যাত। তিনি আর-রিসালাহ ও অন্যান্য গ্রন্থের পাশাপাশি ইমাম শাফি'ই-র জীবদ্দশায় উক্ত গ্রন্থটির সংকলন সম্পন্ন করেন।
ইউসুফ ইবন ইয়াহ্ইয়া বুয়াইতি ইউসুফ ইব্‌ন ইয়াহ্ইয়া শাফি'ই মাযহাবের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ইমাম শাফি'ই-র স্থলাভিষিক্ত হন। সে সময়ে কুর'আন আল্লাহর সৃষ্টি বা সৃষ্ট বস্তু—মু'তাযিলি এই দর্শনকে রাষ্ট্র সমর্থন প্রদান করে। কিন্তু এ ভ্রান্ত দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে এই বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞকে বন্দি অবস্থায় নির্মম নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়। ১৯৷
শাফি'ই মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ শাফি'ই মাযহাবের অনুসারীবৃন্দের বেশিরভাগই বসবাস করেন মিশর, দক্ষিণ আরব (ইয়েমেন, হাদরামাওত), শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, পূর্ব আফ্রিকা (কেনিয়া, তানজানিয়া) ও দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনামে।

টিকাঃ
[১৬] আল-মাদখাল, পৃ. ১৯২।
[১৭] তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হানবালি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ ইবন হানবাল ও আবু সাওর মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু সাওর।
[১৮] আল-মাদখাল, পৃ. ১৯৫-১৯৬।
[১৯] বোযিনা গাজানী স্প্রেফেস্কা (Bozena Gajanee Stryzewska), তারীখ আত-তাশরী' আল-ইসলামি, (বৈরুত, লেবানন, দাঁর আল-আঁফাঁক আল-জাদীদাহ), প্রথম সংস্করণ, ১৯৮০, পৃ. ১৭৫-১৭৬।

প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম শাফি'ই রহিমাহুল্লাহ (১৫০-২০৪ হিজরি; ৭৬৯-৮২০ সাল)
মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইদরীস শাফি'ইর নামানুসারে এই মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে। তিনি ১৫০ হিজরিতে তদানীন্তন শাম এলাকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের গাজা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে ইমাম মালিকের তত্ত্বাবধানে ফিকহ ও হাদীস অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে তিনি বাল্য বয়সেই মাদীনাহ গমন করেন। তিনি ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা' এমনভাবে মুখস্থ করেছিলেন যে, তাঁকে স্মৃতি থেকে হুবহু তা পাঠ করে শুনিয়ে দিতে পারতেন।
১৭৯ হিজরিতে ইমাম মালিকের মৃত্যু পর্যন্ত ইমাম শাফি'ই তাঁর তত্ত্বাবধানেই থেকে যান। তারপর তিনি ইয়েমেনে গিয়ে শিক্ষাদান শুরু করেন। ১৮৯ হিজরিতে তাঁর বিরুদ্ধে শী'আহ বিশ্বাসের প্রতি ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। তখন তাঁকে ইয়েমেন থেকে গ্রেফতার করে ইরাকে 'আব্বাসি খলীফা হারুন আর-রাশীদের (শাসনকাল ১৭০-১৯৩ হিজরি; ৭৮৬-৮০৯ সাল) কাছে হাজির করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে তিনি তাঁর 'আকীদা-বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। পরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এরপর ইমাম শাফি'ই ইরাকেই থেকে যান এবং ইমাম আবু হানীফাহর বিখ্যাত ছাত্র ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানের তত্ত্বাবধানে কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীকালে, ইমাম লাইসের নিকট থেকে জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে তিনি মিশরে গমন করেন। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখেন ইমাম আল-লাইস ইতিমধ্যেই ইন্তেকাল করেছেন। পরে অবশ্য তিনি ইমাম লাইসের ছাত্রদের নিকট থেকে তাঁর মাযহাব অধ্যয়ন করতে সক্ষম হন। ইমাম শাফি'ই বাকি জীবন মিশরেই কাটিয়ে দেন। তিনি ২০৪ হিজরিতে খলীফা আল-মামুনের (শাসনকাল ১৯৭-২১৭ হিজরি; ৮১৩-৮৩২ সাল) শাসনামলে ইন্তেকাল করেন।১৬।
শাফি'ই মাযহাবের গঠন
ইমাম শাফি'ই হিজাযের মালিকি ফিকহকে ইরাকের হানাফি ফিকহের সাথে সমন্বিত করে একটি নতুন মাযহাব তৈরি করেন। এরপর তিনি আল-হুজ্জাহ নামক গ্রন্থাকারে নিজ ছাত্রদের সামনে তা উপস্থাপন করেন। এ গ্রন্থটির শ্রুতলিখনের কাজ সম্পন্ন হয় ১৯৪ হিজরিতে (৮১০ সাল) ইরাকে। তাঁর কিছু ছাত্র।১৭। গ্রন্থটিকে মুখস্থ করে অন্যদের কাছে বর্ণনা করেছেন। তাঁর এই গ্রন্থ ও তাঁর জ্ঞানচর্চার এ কালকে আল-মাযহাব আল-কাদীম বা পুরাতন মাযহাব নামে অভিহিত করা হয়।
মিশরে পৌঁছানোর পর তাঁর জ্ঞানচর্চার নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছিল। সেখানে তিনি ইমাম লাইসের মাযহাব পুরোপুরি আত্মস্থ করে আল-উম্ম নামে আরেকটি গ্রন্থের আকারে তাঁর ছাত্রদের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর এ গ্রন্থ ও জ্ঞানচর্চার এই কালকে মাযহাব আল-জাদীদ বা নতুন মাযহাব নামে অভিহিত করা হয়। সম্পূর্ণ নতুন কিছু হাদীস ও আইনি যুক্তির সাথে পরিচিত হয়ে তিনি তাঁর পূর্বের অনেক সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করেছেন। ইমাম শাফি'ই-ই প্রথম ফিক্হ শাস্ত্রের মৌলিক নীতিমালাকে সুশৃংখলভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর আর-রিসালাহ নামক গ্রন্থে তিনি এ সকল নীতি আলোচনা করেছেন।
শাফি'ই মাযহাবে আইনের উৎস ১. আল-কুর'আন
ইসলামি আইনের উৎসগুলোর মধ্যে কুর'আনের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে ইমাম শাফি'ইও পূর্বের ইমামদের সাথে একমত পোষণ করেছেন। অন্য ইমামদের মতো তিনিও কুর'আনের উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছেন। তবে, কুর'আনের গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি যে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছিলেন তার উপরও অনেক সময় নির্ভর করতেন।
২. সুন্নাহ
ইমাম শাফি'ই হাদীস গ্রহণের জন্য কেবল একটি শর্ত আরোপ করেছেন। তা হলো হাদীসটিকে অবশ্যই সহীহ হতে হবে। ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম মালিকের আরোপিত অন্য সকল শর্তকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। হাদীস শাস্ত্রে বিশেষ অবদান রাখার কারণেও তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন।
৩. ইজমা'
বেশ কিছু বিষয়ে আদৌ ইজমা' সংঘটিত হয়েছিল কি না তা নিয়ে ইমাম শাফি'ই-র যথেষ্ট সংশয় ছিল। তবে, অল্প যে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইজমা' হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে জানা গেছে—তাঁর মতে সেগুলোকে অবশ্যই ইসলামি আইনের তৃতীয় প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৪. সহাবিদের ব্যক্তিগত মত
ইমাম শাফি'ই সহাবিদের ব্যক্তিগত মতামতকে এই শর্তে গ্রহণ করছেন যে, সেগুলো পরস্পরবিরোধী হতে পারবে না। কোনো আইনগত বিষয়ে সহাবিগণের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে ইমাম আবু হানীফাহর মতো তিনিও মূল উৎস কুর'আন ও সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী মতকে বেছে নিয়ে বাকিগুলোকে পরিত্যাগ করতেন।
৫. কিয়াস ইমাম শাফি'ঈ-র মতে, উল্লিখিত উৎসগুলো থেকে আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিয়াস একটি বৈধ পদ্ধতি। তবে, তিনি এটিকে গুরুত্বের ক্রমধারায় শেষের দিকে স্থান দিয়েছেন। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত মতকে তিনি সাহাবিগণের মতামতের চেয়ে সবসময় কম গুরুত্ব দিতেন।
৬. ইসতিস্হাব ইমাম শাফি'ঈ ইমাম আবু হানীফাহ ইসতিহসান ও ইমাম মালিকের ইসতিসলাহ্—উভয় নীতিকেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। এগুলোকে তিনি এক প্রকার বিদ'আত মনে করতেন। তাঁর মতে, এগুলো এমন সব ক্ষেত্রে মানবীয় বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ যেখানে পূর্ব থেকেই ওয়াহয়ির আইন বিদ্যমান। তবে, একই রকম সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ইমাম শাফি'ঈ ইসতিহসান ও ইসতিসলাহ্-এর মতোই একটি নীতি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি এ নীতির নাম দিয়েছেন ইসতিসহাব। [১৮] আক্ষরিকভাবে ইসতিসহাব-এর অর্থ হলো সংযোগ খুঁজে বের করা। কিন্তু, আইনের পরিভাষায় এ শব্দটি দ্বারা পূর্বের কোনো পরিস্থিতির সাথে নতুন পরিস্থিতির সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে ফিকহি আইন বের করে আনার পদ্ধতিকে বোঝায়। এ নীতিটির ভিত্তি হলো, কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য আইন ততক্ষণই বহাল থাকবে, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি কোনো ব্যক্তির দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তার জীবিত বা মৃত হওয়া নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাহলে ইসতিসহাব নীতি অনুযায়ী, সে নিশ্চিতরূপে জীবিত থাকলে যেসকল নিয়মকানুন প্রযোজ্য হতো সেগুলোর সবকিছুই বলবৎ থাকবে।
শাফি'ই মাযহাবের প্রধান ছাত্র
যে সকল ছাত্র আজীবন ইমাম শাফি'ই-র মাযহাব অনুসরণ করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হলেন, ইমাম আল-মুযানি, আর-রাবী' ও ইউসুফ ইব্‌ন ইয়াহইয়া প্রমুখ।
ইমাম আল-মুযানি (১৭৫-২৬২ হিজরি; ৭৯১-৮৭৬ সাল) তাঁর পুরো নাম হলো ইসমা'ঈল ইব্‌ন ইয়াহ্ইয়া আল-মুযানি। ইমাম শাফি'ই-র মিশরে অবস্থানকালের পুরো সময় জুড়ে আল-মুযানি তাঁর সঙ্গী ছিলেন। তিনি শাফি'ই ফিক্হের উপর একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করার কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন। পরবর্তীকালে মুখতাসার আল-মুযানি শিরোনামে তিনি গ্রন্থটিকে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করেন। তাঁর রচিত এই গ্রন্থটিই পরবর্তীকালে শাফি'ই মাযহাবের সর্বাধিক পঠিত ফিক্হ গ্রন্থে পরিণত হয়।
আর-রাবী' মারাদি (১৭৪-২৫৯ হিজরি; ৭৯০-৮৭৩ সাল) আর-রাবী' মারাদি ইমাম শাফি'ই-র গ্রন্থ আল-উম্ম-এর প্রধান বর্ণনাকারী হিসেবে খ্যাত। তিনি আর-রিসালাহ ও অন্যান্য গ্রন্থের পাশাপাশি ইমাম শাফি'ই-র জীবদ্দশায় উক্ত গ্রন্থটির সংকলন সম্পন্ন করেন।
ইউসুফ ইবন ইয়াহ্ইয়া বুয়াইতি ইউসুফ ইব্‌ন ইয়াহ্ইয়া শাফি'ই মাযহাবের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ইমাম শাফি'ই-র স্থলাভিষিক্ত হন। সে সময়ে কুর'আন আল্লাহর সৃষ্টি বা সৃষ্ট বস্তু—মু'তাযিলি এই দর্শনকে রাষ্ট্র সমর্থন প্রদান করে। কিন্তু এ ভ্রান্ত দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে এই বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞকে বন্দি অবস্থায় নির্মম নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়। ১৯৷
শাফি'ই মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ শাফি'ই মাযহাবের অনুসারীবৃন্দের বেশিরভাগই বসবাস করেন মিশর, দক্ষিণ আরব (ইয়েমেন, হাদরামাওত), শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, পূর্ব আফ্রিকা (কেনিয়া, তানজানিয়া) ও দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনামে।

টিকাঃ
[১৬] আল-মাদখাল, পৃ. ১৯২।
[১৭] তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হানবালি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ ইবন হানবাল ও আবু সাওর মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু সাওর।
[১৮] আল-মাদখাল, পৃ. ১৯৫-১৯৬।
[১৯] বোযিনা গাজানী স্প্রেফেস্কা (Bozena Gajanee Stryzewska), তারীখ আত-তাশরী' আল-ইসলামি, (বৈরুত, লেবানন, দাঁর আল-আঁফাঁক আল-জাদীদাহ), প্রথম সংস্করণ, ১৯৮০, পৃ. ১৭৫-১৭৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00