📄 হানাফি মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আবু হানীফাহ রহিমাহুল্লাহ (৮০-১৫০ হিজরি; ৭০৩-৭৬৭ সাল)
মহান বিশেষজ্ঞ ইমাম আবু হানীফাহর নামানুসারে হানাফি মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে। তাঁর আসল নাম ছিল নু'মান ইবন সাবিত। ৮০ হিজরিতে ইরাকের কুফাহ নগরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ইরানি বংশোদ্ভূত একজন রেশম ব্যবসায়ী। ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার শাসনামলে তাঁর পিতা ইসলাম গ্রহণ করেন।
আবু হানীফাহ তাঁর প্রাথমিক অধ্যয়ন শুরু করেন 'ইল্ম আল-কালাম নামক দর্শন ও আধুনিক ভাষাবিদ্যা শাস্ত্রে। কিন্তু, এর বিভিন্ন শাখায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের পর তা ছেড়ে দিয়ে তিনি ফিক্হ্ন ও হাদীস শাস্ত্রের গভীর অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন। তিনি হাম্মাদ ইবন যাইদকে তাঁর প্রধান শিক্ষক হিসেবে বেছে নেন। হাম্মাদ ছিলেন ঐ সময়ে হাদীসের শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞদের অন্যতম। তাঁর তত্ত্বাবধানে ইমাম আবু হানীফাহ আঠারো বছর শিক্ষা লাভ করেন। এ সময়ে তিনি নিজেই শিক্ষাদানের যোগ্যতা অর্জন করেন। তবে হিজরি ১২৪ সালে (৭৪২ সাল) হাম্মাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর ছাত্র হিসেবেই থেকে যান। তারপর চল্লিশ বছর বয়সে আবু হানীফাহ তাঁর শিক্ষকের স্থান লাভ করেন এবং কুফার শ্রেষ্ঠতম বিশেষজ্ঞে পরিণত হন।
তাঁর প্রজ্ঞা ও বুৎপত্তির কারণে তিনি তৎকালীন উমাইয়া শাসকদের কাছে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তারা তাকে কুফার বিচারকের (কাদি) আসন গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। আর এ কারণে কুফার আমীর (শাসনকর্তা) ইয়াযীদ ইবন 'উমারের নির্দেশে তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। একইভাবে 'আব্বাসিদের শাসনামলেও সরকারি পদ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলে তিনি তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। এ কারণে খলীফা আবু জা'ফার আল-মানসুর (শাসনকাল ১৩৬-১৫৮ হিজরি; ৭৫৪-৭৭৫ সাল) এর আদেশে তাঁকে বাগদাদে কারারুদ্ধ করা হয়। ১৫০ হিজরিতে (৭৬৭ সাল) ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি কারাগারেই ছিলেন।
ইমাম আবু হানীফাহকে একজন তাবি'ঈ (সাহাবিদের ছাত্র) হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ তিনি কয়েকজন সহাবির সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং তাঁদের কাছ থেকে কিছু হাদীসও বর্ণনা করেছেন।২খ
হানাফি মাযহাবের গঠন
ইমাম আবু হানীফাহ শিক্ষাদান পদ্ধতির ভিত্তি ছিল শূরা' তথা পারস্পরিক আলোচনা। আলোচনার উদ্দেশ্যে তিনি ছাত্রদের সামনে কোনো একটি সমস্যা উপস্থাপন করতেন। বিষয়টি সমাধানের ব্যাপারে মতৈক্যে উপনীত হওয়া সম্ভব হলে তিনি তা লিপিবদ্ধ করতে বলতেন। ইমাম আবু হানীফাহ ও তাঁর ছাত্রদের পারস্পরিক অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে আইনগত সিদ্ধান্ত প্রণয়ন করা হতো। এ কারণে বলা যেতে পারে যে, হানাফি মাযহাব যতটা ইমাম আবু হানীফাহ নিজের জ্ঞান গবেষণার ফল, ঠিক ততটাই তাঁর ছাত্রদের পরিশ্রমের ফসল।
সমস্যা সংঘটিত হওয়ার পূর্বে প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে তারা সম্ভাব্য বিভিন্ন সমস্যা আলোচনা করে তার সমাধান বের করতেন। কোনো বিষয়ে আলোচনার শুরুতে তাঁরা বলতেন, 'যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে তার সমাধান কী হবে?'। তাঁদের অনুসৃত এ পদ্ধতির কারণে তাঁরা আহলুর-রা'ই নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।
হানাফি মাযহাবে আইনের উৎস
হানাফি মাযহাবের প্রথম প্রজন্মের ফাকীহগণ নিম্নলিখিত উৎসগুলো থেকে ইসলামি আইনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। নিম্নে গুরুত্বের ক্রমানুসারে এগুলোকে উল্লেখ করা হলো:
১. আল-কুর'আন হানাফি 'আলিমগণ কুর' আঁনকে ইসলামি আইনের সর্ব প্রধান ও সম্পূর্ণ নির্ভুল উৎস মনে করেন। বস্তুত, কুর'আনের মাধ্যমেই তারা অন্যান্য উৎসের বিশুদ্ধতা নির্ধারণ করে থাকেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে অন্য কোনো উৎস কুর'আনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে তাকে তাঁরা ভুল মনে করেন।
২. আস-সুন্নাহ সুন্নাহকে তাঁরা ইসলামি আইনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস সাব্যস্ত করেন; তবে তা ব্যবহারের জন্য হানাফি 'আলিমগণ কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। যেমন, তাদের শর্তানুসারে হাদীস কেবল বিশুদ্ধ (সহীহ) হলেই চলবে না, আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে হলে হাদীসটিকে অবশ্যই প্রসিদ্ধ (মাশহুর) হতে হবে। হানাফি মাযহাবের কেন্দ্র ইরাকে 'আলি ও ইবন মাস'ঊদ (রদিয়াল্লাহু 'আনহুমা) সহ অল্প-কিছুসংখ্যক সহাবি বসবাস করতেন। উপরন্তু ঐ এলাকায় হাদীস জালকারীদের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের কারণে মিথ্যা হাদীসকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে এরূপ শর্ত আরোপ করা হয়েছিল।
৩. সহাবিগণের ইজমা' ইসলামি আইনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল সহাবিগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ, কুর'আন ও সুন্নাহতে স্পষ্টভাবে আলোচিত হয়নি এমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আবু হানীফাহ ও তাঁর ছাত্রদের মতের উপর সহাবিগণের ইজমা'কে প্রাধান্য দেওয়া হতো। হানাফি মাযহাব যেকোনো যুগের মুসলিম বিশেষজ্ঞদের ইজমা'কে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয় এবং মুসলিমদের উপর তা বাধ্যতামূলক মনে করে।
৪. সহাবিগণের ব্যক্তিগত মত কিছু কিছু বিষয়ে সহাবিগণের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল, তাই সেসব বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো ইজমা' প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইমাম আবু হানীফাহ এ ধরনের ক্ষেত্রে সহাবিগণের বিভিন্ন মত পর্যালোচনা করে সর্বাধিক উপযুক্ত মতটি বেছে নিতেন। তিনি তাঁর নিজের মতের উপর সহাবিগণের মতকে সব সময় প্রাধান্য দিতেন। এভাবে তিনি সহাবিগণের মতের অনুসরণকে তাঁর মাযহাবের গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তবে, তাঁদের একাধিক মত থাকলে তা থেকে একটিকে বেছে নেওয়ার জন্য তিনি সীমিত ক্ষেত্রে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করতেন।
৫. কিয়াস উপরোক্ত উৎসগুলোর কোথাও কোনো সুস্পষ্ট বিধান পাওয়া না গেলে ইমাম আবু হানীফাহ সহাবিদের ছাত্রদের (তাবি'উন) মত মেনে নেওয়াকে বাধ্যতামূলক মনে করতেন না। তিনি নিজেকে তাঁবি 'উনদের সমকক্ষ মনে করতেন এবং তিনি নিজের ও তাঁর ছাত্রবৃন্দের প্রতিষ্ঠিত কিয়াসের নীতিমালার ভিত্তিতে নিজেই ইজতিহাদ করতেন।
৬. ইসতিহসান ইসতিহসান হলো কোনো পরিস্থিতির জন্য অধিক উপযুক্ত মনে হওয়ার কারণে তুলনামূলক দুর্বল একটি প্রমাণকে অপর কোনো শক্তিশালী প্রমাণের উপর প্রাধান্য দেওয়া। ফলে ক্ষেত্রবিশেষে একটি খাঁস তথা সুনির্দিষ্ট হাদীসকে একটি 'আম বা সাধারণ হাদীসের উপর প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। অথবা অধিক উপযুক্ত আইনকে কিয়াসের মাধ্যমে প্রাপ্ত আইনের উপর প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে।
৭. 'উরফ (স্থানীয় প্রথা) এ নীতির আলোকে যেসব ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যতামূলক ইসলামি প্রথা নেই, সেখানে স্থানীয় প্রথাগুলোকেই আইনগত মর্যাদা দেওয়া যেতে পারে। এ মূলনীতি প্রয়োগের কারণেই মুসলিম বিশ্বের বহু সংস্কৃতিতে প্রাপ্ত রকমারি প্রথাগুলো আইন ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছে এবং ভুলক্রমে অনেক সময় এগুলোকে 'ইসলামি' প্রথা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। [৪]
হানাফি মাযহাবের প্রধান ছাত্রবৃন্দ ইমাম আবু হানীফার সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ছাত্রবৃন্দ হলেন যুফার ইবন আল-হুযাইল, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান।
যুফার ইবন হুযাইল (১১০-১৫৮ হিজরি; ৭৩২-৭৭৪ সাল) ইমাম যুফার সারা জীবন তাঁর শিক্ষক ইমাম আবু হানীফার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে গিয়েছেন। অনেক আকর্ষণীয় প্রস্তাব পাওয়া সত্ত্বেও তিনি বিচারকের পদ গ্রহণ করেননি। তিনি শিক্ষকতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। মাত্র ৪২ বছর বয়সে বাসরায় ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
আবু ইউসুফ ইয়া'কুব ইবন ইবরাহীম (১১৩-১৮২ হিজরি; ৭৩৫-৭৯৫ সাল) ইমাম আবু ইউসুফ কুফার এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হাদীসের ব্যাপক জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে তিনি হাদীসশাস্ত্রের একজন উল্লেখযোগ্য বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। অতঃপর তিনি কুফাতে ইমাম ইবন আবি লাইলার (মৃত্যু ১৪৮ হিজরি; ৭৬৫ সাল) তত্ত্বাবধানে নয় বছর ফিক্হ্ অধ্যয়ন করেন। আবু লাইলার পিতা ছিলেন মাদীনার একজন বিখ্যাত সাহাবি। আবু ইউসুফ পরবর্তীকালে ইমাম আবু হানীফার তত্ত্বাবধানে নয় বছর অধ্যয়ন করেন। আবু হানীফার ইন্তেকালের পর তিনি মাদীনায় গিয়ে অল্প সময়ের জন্য ইমাম মালিকের তত্ত্বাবধানে শিক্ষালাভ করেন।
'আব্বাসি খলীফা আল-মাহদি (১৫৮-১৬৮ হিজরি; ৭৭৫-৭৮৫ সাল) ও হারুন আর-রাশীদ (১৭০-১৯৩ হিজরি; ৭৮৬-৮০৯ সাল) আবু ইউসুফকে রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করেন। প্রধান বিচারপতির ক্ষমতাবলে তিনি বিভিন্ন শহরের বিচারক নিয়োগ দিতেন। তাঁর নিয়োগপ্রাপ্ত সবাই ছিলেন হানাফি মাযহাবের অনুসারী। এভাবে, তিনি মুসলিম সাম্রাজ্য জুড়ে এ মাযহাবের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৫।
মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান শায়বানি (১৩২-১৮৯ হিজরি; ৭৪৯-৮০৫ সাল)
ইমাম মুহাম্মাদ ইরাকের ওয়াসিতে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি বড় হয়েছেন কুফাহ নগরীতে। আবু ইউসুফের মতো তিনিও প্রথমে হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ইমাম আবু হানীফাহর মৃত্যুর পূর্বে তিনি অল্প সময়ের জন্য তাঁর তত্ত্বাবধানে জ্ঞানার্জন করেন। তারপর তিনি আবু ইউসুফের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন চালিয়ে যান এবং পরবর্তীকালে মাদীনায় গিয়ে ইমাম মালিকের নিকট তিন বছর পড়াশোনা করেন। এ সময়ে তিনি ইমাম মালিকের হাদীস গ্রন্থ আল-মুয়াত্তা'র অন্যতম বর্ণনাকারীতে পরিণত হন। পরবর্তী সময়ে বাগদাদে ইমাম শাফি'ই সহ আরও অনেক বিশেষজ্ঞই মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা লাভ করেন।
মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানও খলীফা হারুন আর-রাশীদের শাসনামলে বিচারকের (কাদি) পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তবে, বিচারকের পদে থাকলে অনেক বিষয়ে আপস করতে হয়, তাই অল্প দিনের মধ্যে তিনি ঐ দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে পুনরায় বাগদাদে তাঁর শিক্ষকতায় ফিরে আসেন।
হানাফি মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ
বর্তমানে হানাফি মাযহাবের অনুসারীদের বেশিরভাগই বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক, গায়ানা, ত্রিনিদাদ, সুরিনামে বসবাস করে। মিশরেও এ মাযহাবের কিছু অনুসারী দেখা যায়।
ঊনবিংশ শতাব্দিতে 'উসমানি শাসকবৃন্দ হানাফি মাযহাবের আইনকে রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত করেন। তখন বিচারক পদে নিয়োগ প্রত্যাশী সব বিশেষজ্ঞ এ মাযহাবের আইনশাস্ত্র শিখতে বাধ্য হন। এভাবেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এ মাযহাব 'উসমানি সাম্রাজ্যের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
টিকাঃ
[২] আল-মাদখাল, পৃ. ১৭১-১৭২।
[৩] মুহাম্মাদ ইউসুফ মুসা, তারীখ আল-ফিক্হ আল-ইসলামি, (কায়রো, দাঁর আল-কিতাব আল-'আরাবি), ১৯৫৫, খণ্ড ৩, পৃ. ৬২।
[৪] আল-মাদখাল, পৃ. ১৭৫-১৮৬।
[৫] শাহ ওয়ালীউল্লাহ দাহলাউই, আল ইনসাফ ফী বায়ান আসবাব আল-ইখতিলাফ, (বৈরুত, লেবানন, দাঁর আন-নাফাইস), দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৭৮, পৃ. ৩৯।
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আবু হানীফাহ রহিমাহুল্লাহ (৮০-১৫০ হিজরি; ৭০৩-৭৬৭ সাল)
মহান বিশেষজ্ঞ ইমাম আবু হানীফাহর নামানুসারে হানাফি মাযহাবের নামকরণ করা হয়েছে। তাঁর আসল নাম ছিল নু'মান ইবন সাবিত। ৮০ হিজরিতে ইরাকের কুফাহ নগরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ইরানি বংশোদ্ভূত একজন রেশম ব্যবসায়ী। ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার শাসনামলে তাঁর পিতা ইসলাম গ্রহণ করেন।
আবু হানীফাহ তাঁর প্রাথমিক অধ্যয়ন শুরু করেন 'ইল্ম আল-কালাম নামক দর্শন ও আধুনিক ভাষাবিদ্যা শাস্ত্রে। কিন্তু, এর বিভিন্ন শাখায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের পর তা ছেড়ে দিয়ে তিনি ফিক্হ্ন ও হাদীস শাস্ত্রের গভীর অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন। তিনি হাম্মাদ ইবন যাইদকে তাঁর প্রধান শিক্ষক হিসেবে বেছে নেন। হাম্মাদ ছিলেন ঐ সময়ে হাদীসের শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞদের অন্যতম। তাঁর তত্ত্বাবধানে ইমাম আবু হানীফাহ আঠারো বছর শিক্ষা লাভ করেন। এ সময়ে তিনি নিজেই শিক্ষাদানের যোগ্যতা অর্জন করেন। তবে হিজরি ১২৪ সালে (৭৪২ সাল) হাম্মাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর ছাত্র হিসেবেই থেকে যান। তারপর চল্লিশ বছর বয়সে আবু হানীফাহ তাঁর শিক্ষকের স্থান লাভ করেন এবং কুফার শ্রেষ্ঠতম বিশেষজ্ঞে পরিণত হন।
তাঁর প্রজ্ঞা ও বুৎপত্তির কারণে তিনি তৎকালীন উমাইয়া শাসকদের কাছে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তারা তাকে কুফার বিচারকের (কাদি) আসন গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। আর এ কারণে কুফার আমীর (শাসনকর্তা) ইয়াযীদ ইবন 'উমারের নির্দেশে তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। একইভাবে 'আব্বাসিদের শাসনামলেও সরকারি পদ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলে তিনি তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। এ কারণে খলীফা আবু জা'ফার আল-মানসুর (শাসনকাল ১৩৬-১৫৮ হিজরি; ৭৫৪-৭৭৫ সাল) এর আদেশে তাঁকে বাগদাদে কারারুদ্ধ করা হয়। ১৫০ হিজরিতে (৭৬৭ সাল) ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি কারাগারেই ছিলেন।
ইমাম আবু হানীফাহকে একজন তাবি'ঈ (সাহাবিদের ছাত্র) হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ তিনি কয়েকজন সহাবির সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং তাঁদের কাছ থেকে কিছু হাদীসও বর্ণনা করেছেন।২খ
হানাফি মাযহাবের গঠন
ইমাম আবু হানীফাহ শিক্ষাদান পদ্ধতির ভিত্তি ছিল শূরা' তথা পারস্পরিক আলোচনা। আলোচনার উদ্দেশ্যে তিনি ছাত্রদের সামনে কোনো একটি সমস্যা উপস্থাপন করতেন। বিষয়টি সমাধানের ব্যাপারে মতৈক্যে উপনীত হওয়া সম্ভব হলে তিনি তা লিপিবদ্ধ করতে বলতেন। ইমাম আবু হানীফাহ ও তাঁর ছাত্রদের পারস্পরিক অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে আইনগত সিদ্ধান্ত প্রণয়ন করা হতো। এ কারণে বলা যেতে পারে যে, হানাফি মাযহাব যতটা ইমাম আবু হানীফাহ নিজের জ্ঞান গবেষণার ফল, ঠিক ততটাই তাঁর ছাত্রদের পরিশ্রমের ফসল।
সমস্যা সংঘটিত হওয়ার পূর্বে প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে তারা সম্ভাব্য বিভিন্ন সমস্যা আলোচনা করে তার সমাধান বের করতেন। কোনো বিষয়ে আলোচনার শুরুতে তাঁরা বলতেন, 'যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে তার সমাধান কী হবে?'। তাঁদের অনুসৃত এ পদ্ধতির কারণে তাঁরা আহলুর-রা'ই নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।
হানাফি মাযহাবে আইনের উৎস
হানাফি মাযহাবের প্রথম প্রজন্মের ফাকীহগণ নিম্নলিখিত উৎসগুলো থেকে ইসলামি আইনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। নিম্নে গুরুত্বের ক্রমানুসারে এগুলোকে উল্লেখ করা হলো:
১. আল-কুর'আন হানাফি 'আলিমগণ কুর' আঁনকে ইসলামি আইনের সর্ব প্রধান ও সম্পূর্ণ নির্ভুল উৎস মনে করেন। বস্তুত, কুর'আনের মাধ্যমেই তারা অন্যান্য উৎসের বিশুদ্ধতা নির্ধারণ করে থাকেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে অন্য কোনো উৎস কুর'আনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে তাকে তাঁরা ভুল মনে করেন।
২. আস-সুন্নাহ সুন্নাহকে তাঁরা ইসলামি আইনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস সাব্যস্ত করেন; তবে তা ব্যবহারের জন্য হানাফি 'আলিমগণ কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। যেমন, তাদের শর্তানুসারে হাদীস কেবল বিশুদ্ধ (সহীহ) হলেই চলবে না, আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে হলে হাদীসটিকে অবশ্যই প্রসিদ্ধ (মাশহুর) হতে হবে। হানাফি মাযহাবের কেন্দ্র ইরাকে 'আলি ও ইবন মাস'ঊদ (রদিয়াল্লাহু 'আনহুমা) সহ অল্প-কিছুসংখ্যক সহাবি বসবাস করতেন। উপরন্তু ঐ এলাকায় হাদীস জালকারীদের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের কারণে মিথ্যা হাদীসকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে এরূপ শর্ত আরোপ করা হয়েছিল।
৩. সহাবিগণের ইজমা' ইসলামি আইনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল সহাবিগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ, কুর'আন ও সুন্নাহতে স্পষ্টভাবে আলোচিত হয়নি এমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আবু হানীফাহ ও তাঁর ছাত্রদের মতের উপর সহাবিগণের ইজমা'কে প্রাধান্য দেওয়া হতো। হানাফি মাযহাব যেকোনো যুগের মুসলিম বিশেষজ্ঞদের ইজমা'কে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয় এবং মুসলিমদের উপর তা বাধ্যতামূলক মনে করে।
৪. সহাবিগণের ব্যক্তিগত মত কিছু কিছু বিষয়ে সহাবিগণের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল, তাই সেসব বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো ইজমা' প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইমাম আবু হানীফাহ এ ধরনের ক্ষেত্রে সহাবিগণের বিভিন্ন মত পর্যালোচনা করে সর্বাধিক উপযুক্ত মতটি বেছে নিতেন। তিনি তাঁর নিজের মতের উপর সহাবিগণের মতকে সব সময় প্রাধান্য দিতেন। এভাবে তিনি সহাবিগণের মতের অনুসরণকে তাঁর মাযহাবের গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তবে, তাঁদের একাধিক মত থাকলে তা থেকে একটিকে বেছে নেওয়ার জন্য তিনি সীমিত ক্ষেত্রে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করতেন।
৫. কিয়াস উপরোক্ত উৎসগুলোর কোথাও কোনো সুস্পষ্ট বিধান পাওয়া না গেলে ইমাম আবু হানীফাহ সহাবিদের ছাত্রদের (তাবি'উন) মত মেনে নেওয়াকে বাধ্যতামূলক মনে করতেন না। তিনি নিজেকে তাঁবি 'উনদের সমকক্ষ মনে করতেন এবং তিনি নিজের ও তাঁর ছাত্রবৃন্দের প্রতিষ্ঠিত কিয়াসের নীতিমালার ভিত্তিতে নিজেই ইজতিহাদ করতেন।
৬. ইসতিহসান ইসতিহসান হলো কোনো পরিস্থিতির জন্য অধিক উপযুক্ত মনে হওয়ার কারণে তুলনামূলক দুর্বল একটি প্রমাণকে অপর কোনো শক্তিশালী প্রমাণের উপর প্রাধান্য দেওয়া। ফলে ক্ষেত্রবিশেষে একটি খাঁস তথা সুনির্দিষ্ট হাদীসকে একটি 'আম বা সাধারণ হাদীসের উপর প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। অথবা অধিক উপযুক্ত আইনকে কিয়াসের মাধ্যমে প্রাপ্ত আইনের উপর প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে।
৭. 'উরফ (স্থানীয় প্রথা) এ নীতির আলোকে যেসব ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যতামূলক ইসলামি প্রথা নেই, সেখানে স্থানীয় প্রথাগুলোকেই আইনগত মর্যাদা দেওয়া যেতে পারে। এ মূলনীতি প্রয়োগের কারণেই মুসলিম বিশ্বের বহু সংস্কৃতিতে প্রাপ্ত রকমারি প্রথাগুলো আইন ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছে এবং ভুলক্রমে অনেক সময় এগুলোকে 'ইসলামি' প্রথা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। [৪]
হানাফি মাযহাবের প্রধান ছাত্রবৃন্দ ইমাম আবু হানীফার সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ছাত্রবৃন্দ হলেন যুফার ইবন আল-হুযাইল, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান।
যুফার ইবন হুযাইল (১১০-১৫৮ হিজরি; ৭৩২-৭৭৪ সাল) ইমাম যুফার সারা জীবন তাঁর শিক্ষক ইমাম আবু হানীফার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে গিয়েছেন। অনেক আকর্ষণীয় প্রস্তাব পাওয়া সত্ত্বেও তিনি বিচারকের পদ গ্রহণ করেননি। তিনি শিক্ষকতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। মাত্র ৪২ বছর বয়সে বাসরায় ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
আবু ইউসুফ ইয়া'কুব ইবন ইবরাহীম (১১৩-১৮২ হিজরি; ৭৩৫-৭৯৫ সাল) ইমাম আবু ইউসুফ কুফার এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হাদীসের ব্যাপক জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে তিনি হাদীসশাস্ত্রের একজন উল্লেখযোগ্য বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। অতঃপর তিনি কুফাতে ইমাম ইবন আবি লাইলার (মৃত্যু ১৪৮ হিজরি; ৭৬৫ সাল) তত্ত্বাবধানে নয় বছর ফিক্হ্ অধ্যয়ন করেন। আবু লাইলার পিতা ছিলেন মাদীনার একজন বিখ্যাত সাহাবি। আবু ইউসুফ পরবর্তীকালে ইমাম আবু হানীফার তত্ত্বাবধানে নয় বছর অধ্যয়ন করেন। আবু হানীফার ইন্তেকালের পর তিনি মাদীনায় গিয়ে অল্প সময়ের জন্য ইমাম মালিকের তত্ত্বাবধানে শিক্ষালাভ করেন।
'আব্বাসি খলীফা আল-মাহদি (১৫৮-১৬৮ হিজরি; ৭৭৫-৭৮৫ সাল) ও হারুন আর-রাশীদ (১৭০-১৯৩ হিজরি; ৭৮৬-৮০৯ সাল) আবু ইউসুফকে রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করেন। প্রধান বিচারপতির ক্ষমতাবলে তিনি বিভিন্ন শহরের বিচারক নিয়োগ দিতেন। তাঁর নিয়োগপ্রাপ্ত সবাই ছিলেন হানাফি মাযহাবের অনুসারী। এভাবে, তিনি মুসলিম সাম্রাজ্য জুড়ে এ মাযহাবের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৫।
মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান শায়বানি (১৩২-১৮৯ হিজরি; ৭৪৯-৮০৫ সাল)
ইমাম মুহাম্মাদ ইরাকের ওয়াসিতে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি বড় হয়েছেন কুফাহ নগরীতে। আবু ইউসুফের মতো তিনিও প্রথমে হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ইমাম আবু হানীফাহর মৃত্যুর পূর্বে তিনি অল্প সময়ের জন্য তাঁর তত্ত্বাবধানে জ্ঞানার্জন করেন। তারপর তিনি আবু ইউসুফের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন চালিয়ে যান এবং পরবর্তীকালে মাদীনায় গিয়ে ইমাম মালিকের নিকট তিন বছর পড়াশোনা করেন। এ সময়ে তিনি ইমাম মালিকের হাদীস গ্রন্থ আল-মুয়াত্তা'র অন্যতম বর্ণনাকারীতে পরিণত হন। পরবর্তী সময়ে বাগদাদে ইমাম শাফি'ই সহ আরও অনেক বিশেষজ্ঞই মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা লাভ করেন।
মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানও খলীফা হারুন আর-রাশীদের শাসনামলে বিচারকের (কাদি) পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তবে, বিচারকের পদে থাকলে অনেক বিষয়ে আপস করতে হয়, তাই অল্প দিনের মধ্যে তিনি ঐ দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে পুনরায় বাগদাদে তাঁর শিক্ষকতায় ফিরে আসেন।
হানাফি মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ
বর্তমানে হানাফি মাযহাবের অনুসারীদের বেশিরভাগই বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক, গায়ানা, ত্রিনিদাদ, সুরিনামে বসবাস করে। মিশরেও এ মাযহাবের কিছু অনুসারী দেখা যায়।
ঊনবিংশ শতাব্দিতে 'উসমানি শাসকবৃন্দ হানাফি মাযহাবের আইনকে রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত করেন। তখন বিচারক পদে নিয়োগ প্রত্যাশী সব বিশেষজ্ঞ এ মাযহাবের আইনশাস্ত্র শিখতে বাধ্য হন। এভাবেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এ মাযহাব 'উসমানি সাম্রাজ্যের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
টিকাঃ
[২] আল-মাদখাল, পৃ. ১৭১-১৭২।
[৩] মুহাম্মাদ ইউসুফ মুসা, তারীখ আল-ফিক্হ আল-ইসলামি, (কায়রো, দাঁর আল-কিতাব আল-'আরাবি), ১৯৫৫, খণ্ড ৩, পৃ. ৬২।
[৪] আল-মাদখাল, পৃ. ১৭৫-১৮৬।
[৫] শাহ ওয়ালীউল্লাহ দাহলাউই, আল ইনসাফ ফী বায়ান আসবাব আল-ইখতিলাফ, (বৈরুত, লেবানন, দাঁর আন-নাফাইস), দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৭৮, পৃ. ৩৯।
📄 আওযা‘ই মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আওযা'ই রহিমাহুল্লাহ (৮৮-১৫৭ হিজরি; ৭০৮-৭৭৪ সাল)
এ মাযহাবটির নামকরণ করা হয় বিশেষজ্ঞ 'আলিম আব্দুর-রহমান ইব্ন আল-আওযা'ইর নামানুসারে। তিনি ৮৯ হিজরিতে লেবাননের বা'লাবাক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সিরিয়ার অধিবাসী। হিজরি দ্বিতীয় শতকের একজন প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ হিসেবে তিনি সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। কুর'আন অথবা সুন্নাহতে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে এমন বিষয়ে তিনি কিয়াস ও অন্যান্য যুক্তিভিত্তিক পদ্ধতির অতিরিক্ত প্রয়োগের বিরোধী ছিলেন। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি বৈরুতে কাটালেও তাঁর মাযহাব সিরিয়া, জর্দান, ফিলিস্তিন, লেবানন ও স্পেনে বিস্তৃতি লাভ করে। ১৫৭ হিজরিতে তিনি বৈরুতে ইন্তেকাল করেন।
মাযহাবটির বিলুপ্তির কারণ:
দশম শতকে শাফি'ই মাযহাবের অনুসারী আবু যার 'আহ মুহাম্মাদ ইবন 'উসমান দামেশকের বিচারক নিযুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত আওযা'ই মাযহাবই ছিল সিরিয়ার প্রধান মাযহাব। আবু যার 'আহ শাফি'ই মাযহাবের গ্রন্থ, মুখতাসার আল-মুযানী (শাফি'ই ফিকহের একটি বই) মুখস্থকারী প্রত্যেককে একশ দিনার পুরস্কার প্রদান করার প্রথা চালু করেন। ফলে সিরিয়াতে শাফি'ই মাযহাব এত দ্রুত সম্প্রসারিত হয় যে, আওযা'ইর অনুসারীর সংখ্যা কমে আসতে থাকে। একাদশ শতাব্দিতে সেটা নেমে আসে শূন্যের কোঠায়। তবে এরপরেও ফিক্হশাস্ত্রে তাঁর অবদান তুলনামূলক ফিক্হের উপর রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়।॥৬৷
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম আওযা'ই রহিমাহুল্লাহ (৮৮-১৫৭ হিজরি; ৭০৮-৭৭৪ সাল)
এ মাযহাবটির নামকরণ করা হয় বিশেষজ্ঞ 'আলিম আব্দুর-রহমান ইব্ন আল-আওযা'ইর নামানুসারে। তিনি ৮৯ হিজরিতে লেবাননের বা'লাবাক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সিরিয়ার অধিবাসী। হিজরি দ্বিতীয় শতকের একজন প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ হিসেবে তিনি সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। কুর'আন অথবা সুন্নাহতে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে এমন বিষয়ে তিনি কিয়াস ও অন্যান্য যুক্তিভিত্তিক পদ্ধতির অতিরিক্ত প্রয়োগের বিরোধী ছিলেন। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি বৈরুতে কাটালেও তাঁর মাযহাব সিরিয়া, জর্দান, ফিলিস্তিন, লেবানন ও স্পেনে বিস্তৃতি লাভ করে। ১৫৭ হিজরিতে তিনি বৈরুতে ইন্তেকাল করেন।
মাযহাবটির বিলুপ্তির কারণ:
দশম শতকে শাফি'ই মাযহাবের অনুসারী আবু যার 'আহ মুহাম্মাদ ইবন 'উসমান দামেশকের বিচারক নিযুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত আওযা'ই মাযহাবই ছিল সিরিয়ার প্রধান মাযহাব। আবু যার 'আহ শাফি'ই মাযহাবের গ্রন্থ, মুখতাসার আল-মুযানী (শাফি'ই ফিকহের একটি বই) মুখস্থকারী প্রত্যেককে একশ দিনার পুরস্কার প্রদান করার প্রথা চালু করেন। ফলে সিরিয়াতে শাফি'ই মাযহাব এত দ্রুত সম্প্রসারিত হয় যে, আওযা'ইর অনুসারীর সংখ্যা কমে আসতে থাকে। একাদশ শতাব্দিতে সেটা নেমে আসে শূন্যের কোঠায়। তবে এরপরেও ফিক্হশাস্ত্রে তাঁর অবদান তুলনামূলক ফিক্হের উপর রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়।॥৬৷
📄 মালিকি মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ (৯৩-১৭৯ হিজরি; ৭১৭-৮০১ সাল)
এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা বিশেষজ্ঞ মালিক ইব্ন আনাস ইবন 'আঁমির ৯৩ হিজরিতে মাদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদা 'আঁমির ছিলেন মাদীনার প্রধান সহাবিদের অন্যতম। হাদীসের তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ইমাম আয-যুহরি ও বিখ্যাত হাদীস বর্ণনাকারী 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের আযাদকৃত গোলাম নাফি'র তত্ত্বাবধানে ইমাম মালিক হাদীস অধ্যয়ন করেন। কেবল হাজ্জের উদ্দেশ্য ব্যতীত তিনি কখনো মাদীনার বাইরে ভ্রমণ করতেন না। ফলে, তাঁর জ্ঞান অনেকাংশে মাদীনায় প্রাপ্ত হাদীসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
'আব্বাসি শাসকদের সরকারি আইনে বলা হয়েছিল, কোনো ব্যক্তি খলীফার আনুগত্যের শপথ ভঙ্গ করলে অবধারিতভাবে তার স্ত্রী তুলাক্ হয়ে যাবে। ইমাম মালিক সরকারি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার কারণে ১৪৭ হিজরিতে (৭৬৪ সাল) মাদীনার শাসকের নির্দেশে তাঁকে মারাত্মকভাবে নির্যাতন করা হয়। ইমাম মালিককে বেঁধে এমনভাবে প্রহার করা হয়েছিল যে, তাঁর হাত মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল। কিছু কিছু বর্ণনায় আছে যে, ঐ আঘাতের ফলে তিনি সলাতে তাঁর হাত বুকের উপর রাখতে অক্ষম হয়ে পড়েন এবং হাত ছেড়ে দিয়েই সলাত আদায় করেন।
ইমাম মালিক মাদীনাতে চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে হাদীসের পাঠ দান করেন। তিনি আল-মুয়াত্তা' নামে নাবি ﷺ-এর হাদীস এবং সহাবি ও তাঁবি 'উনদের আসার সম্বলিত একটি গ্রন্থ সংকলন করেছিলেন। 'আব্বাসি খলীফা আবু জা'ফার আল-মানসুর (শাসনকাল ১৩৬-১৫৮ হিজরি; ৭১৭-৮০১ সাল) নাবি ﷺ-এর সুন্নাহভিত্তিক একটি সার্বজনীন সংবিধান চেয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধেই ইমাম মালিক হাদীস সংকলনের এই কাজ শুরু করেন। তবে, গ্রন্থের সংকলন সমাপ্ত হওয়ার পর ইমাম মালিক গ্রন্থটিকে সকলের উপর বাধ্যতামূলক করে দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তিনি বলেন যে, সহাবিগণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা নিশ্চয় সুন্নাহ এমন বিষয় জানেন, যা তার এই গ্রন্থে সংকলিত হয়নি। তাই রাষ্ট্রে সার্বজনীন কোনো আইন জারির ক্ষেত্রে সেগুলোকে অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।
খলীফা হারুন আর-রাশীদও ইমাম মালিককে একই অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর প্রস্তাবকেও তিনি নাকচ করে দেন। ১৭৯ হিজরিতে (৮০১ সাল) ৮৭ বছর বয়সে ইমাম মালিক তার জন্মস্থান মাদীনায় ইন্তেকাল করেন।
মালিকি মাযহাবের গঠন
ইমাম মালিকের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল হাদীস বর্ণনা করা ও সমকালীন সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত হাদীসের প্রয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করা। তিনি ইসলামি আইনের বিভিন্ন বিষয়ের উপর হাদীস ও আসার বর্ণনা করে তার ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য ছাত্রদের বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর ছাত্রদের নিজ নিজ এলাকায় উদ্ভূত সমস্যাগুলোও আলোচনা করে তার সমাধানকল্পে যথোপযুক্ত হাদীস অথবা আসার বর্ণনা করতেন।
আল-মুয়াত্তা' রচনা সমাপ্ত করার পর তিনি তা নিজ মাযহাব হিসেবে তাঁর ছাত্রদের সামনে তুলে ধরতেন। তবে, নতুন কোনো বিশুদ্ধ তথ্য পাওয়া গেলে তিনি প্রয়োজনে তাতে সংযোজন ও বিয়োজন করতেন। তিনি সবসময়ই কল্পনা ও কল্পনাপ্রসূত ফিক্হকে এড়িয়ে চলতেন। আর এভাবে তাঁর মাযহাব ও অনুসারীবৃন্দ আহলুল-হাদীস নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
মালিকি মাযহাবে আইনের উৎস
ইমাম মালিক নিম্নলিখিত উৎসগুলো থেকে ইসলামি আইন বের করে আনতেন। গুরুত্বের ক্রমধারা অনুযায়ী নিচে সেগুলো উল্লেখ করা হলো:
১. আল-কুর'আঁন
অন্যান্য ইমামদের মতো ইমাম মালিকও কুর'আঁনকে ইসলামি আইনের প্রধান উৎস মনে করতেন। এর প্রয়োগে তিনি কোনো পূর্বশর্ত আরোপ করেননি।
২. সুন্নাহ
সুন্নাহকে ইমাম মালিক ইসলামি আইনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে, ইমাম আবু হানীফাহর মতো তিনিও হাদীস ব্যবহারের জন্য কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। কোনো হাদীস মাদীনার প্রথার পরিপন্থী হলে তিনি তা গ্রহণ করতেন না।
তিনি অবশ্য ইমাম আবু হানীফাহ-র মতো হাদীসটি মাশহুর বা সুপ্রসিদ্ধ হওয়ার উপর জোর দেননি। বরং হাদীসের বর্ণনাকারীদের কেউ পরিচিত মিথ্যুক কিংবা চরম দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী না হলে প্রত্যেকটি হাদীসকে তিনি গ্রহণ করতেন।
৩. মাদীনাবাসীর 'আমাল
মাদীনাবাসীদের অনেকেই সহাবিগণের সরাসরি বংশধর। মাদীনাতেই নাবি তাঁর জীবনের শেষ দশ বছর কাটিয়েছেন। তাই ইমাম মালিকের যুক্তি অনুযায়ী, মাদীনার সাধারণ সব অভ্যাসই অনুমোদিত। কারণ, যদি তা না হতো তবে নাবি নিশ্চয়ই এগুলোকে নিরুৎসাহিত করতেন।
এভাবে ইমাম মালিক মাদীনাবাসীর সাধারণ প্রথাকে নির্ভরযোগ্য সুন্নাহর একটি প্রকার হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যা কথা নয় বরং কাজের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। ৮।
৪. সহাবিদের ইজমা' ইমাম আবু হানীফাহ্ মতো ইমাম মালিকও সহাবিগণ ও পরবর্তী যুগের বিশেষজ্ঞদের ইজমা'কে ইসলামি আইনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস মনে করতেন।
৫. সহাবিদের ব্যক্তিগত অভিমত ইমাম মালিক সহাবিগণের ঐক্যমত্য বা মতপার্থক্যপূর্ণ উভয় মতামতকেই পূর্ণমাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে তাঁর হাদীস গ্রন্থ আল-মুয়াত্তা'য় সন্নিবেশিত করেছেন। তবে, সহাবিদের মতৈক্যকে তাঁদের ব্যক্তিগত মতের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।
কোনো বিষয়ে ঐকমত্য না থাকলে, তাঁদের ব্যক্তিগত মতকেও ইমাম মালিক তাঁর নিজের মতের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।
৬. কিয়াস উল্লিখিত উৎসগুলোতে কোনো বিষয় না পাওয়া গেলে ইমাম মালিক তাঁর নিজ বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করতেন। তবে এ ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। কারণ, এ ধরনের মতামত একান্তই ব্যক্তিগত।
৭. মাদীনাবাসীদের প্রথা হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক না হলে ইমাম মালিক মাদীনার কিছু সংখ্যক লোকের মধ্যে প্রচলিত প্রথাগুলোকেও কিছুটা গুরুত্ব দিতেন। তাঁর মতে, এসব প্রথা বিচ্ছিন্ন হলেও সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে যে, তা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এবং সহাবিগণ কিংবা নাবি ﷺ নিজে এগুলোকে সমর্থন করেছেন।
৮. ইসতিসলাহ
ইমাম আবু হানীফাহ-র উদ্ভাবিত ইসতিহসান নীতিটি ইমাম মালিক ও তাঁর ছাত্ররাও প্রয়োগ করেছেন। তবে, তাঁরা নীতিটির নাম দিয়েছেন ইসতিসলাহ। এর সরল অর্থ হলো অধিক উপযুক্ত আইনগত সিদ্ধান্ত খুঁজে বের করা। মানুষের জন্য কল্যাণকর অথচ তা শারী'আহয় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে ইসতিসলাহ নীতিটি প্রযোজ্য।
'আলি -এর একটি আইনগত সিদ্ধান্তে ইসতিসলাহ-এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। সংঘবদ্ধ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী দলের সবাই দোষী যদিও প্রকৃত হত্যাকাণ্ডটি হয়তো তাদের মধ্য থেকে মাত্র একজনই ঘটিয়েছে। এক্ষেত্রে শারী'আহ আইনে কেবল মূল হত্যাকারী সম্পর্কে বলা হয়েছে। আরেকটি উদাহরণ হলো, রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী শাসক ধনী মানুষের নিকট থেকে যাকাতের পাশাপাশি অন্যান্য কর আদায় করতে পারবে। অথচ, শারী'আহতে কেবল যাকাতের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বিধান দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কিয়াসের পরিবর্তে পরিস্থিতির সাথে অধিক সংগতিপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইমাম মালিকও ইসতিসলাহ নীতিটি ব্যবহার করেছেন।
৯. 'উরফ (প্রথা)
ইমাম আবু হানীফাহ মতো ইমাম মালিকও শারী'আহর সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন সামাজিক প্রtha ও রীতি-নীতিগুলোকে দ্বিতীয় পর্যায়ের আইনের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে মেনে নিয়েছেন।১৯৪
দৃষ্টান্তস্বরূপ, সিরিয়ার আঞ্চলিক প্রথা অনুযায়ী দাব্বাহ শব্দ দ্বারা ঘোড়াকে বোঝায়। অথচ, আরবি ভাষায় এর সরল অর্থ হলো চতুষ্পদী জন্তু। অতএব, সিরিয়ার কোনো চুক্তিতে দাব্বাহ পরিশোধের শর্ত দেওয়া হলে তার অর্থ হবে 'ঘোড়া'। পক্ষান্তরে, আরব বিশ্বের অন্য কোথাও দাঁব্বাহ শব্দটি দ্বারা ঘোড়া বোঝাতে চাইলে আরও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
মালিকি মাযহাবের প্রধান ছাত্ররা
ইমাম মালিক-এর যেসব ছাত্র পরবর্তীতে নিজেদের আলাদা কোনো মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেননি তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন আল-কাসিম ও ইব্ন ওয়াহব।
আবু আব্দুর-রহমান ইবন আল-কাসিম (১৩২-১৯১ হিজরি; ৭৪৫-৮১৩ সাল)
ইমাম কাসিমের জন্ম মিশরে। পরবর্তীকালে তিনি মাদীনায় ভ্রমণ করে তাঁর শিক্ষক ইমাম মালিকের তত্ত্বাবধানে বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অধ্যয়ন করেন। মালিকি মাযহাবের ফিক্হের উপর তিনি আল- মুদাওওয়ানাহ নামক একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থটি এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, তা ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা' কেও অনেকটা ম্লান করে দেয়।
আবু 'আব্দুল্লাহ ইব্ন ওয়াহব (১২৫-১৯৭ হিজরি; ৭৪২-৮১৯ সাল)
ইমাম ইব্ন ওয়াহবও ইমাম মালিকের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করার জন্য মিশর থেকে মাদীনায় গমন করেছিলেন। তিনি কুর'আন ও সুন্নাহ থেকে মাসআলাহ বের করার ক্ষেত্রে এতটাই পারদর্শী ছিলেন যে, খোদ ইমাম মালিক তাঁকে আল-মুফতি উপাধি দিয়েছিলেন।
ইব্ন ওয়াহবকে মিশরের বিচারক হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, শাসকের ইচ্ছার অধীনস্থ না হয়ে স্বাধীনভাবে নিজের সততাকে ধরে রাখার জন্য তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ।১০।
অন্যান্য মাযহাবের প্রখ্যাত 'আলিমদের মধ্যেও ইমাম মালিকের বেশ কিছু ছাত্র রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ইমাম মালিকের শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজ নিজ মাযহাবে কিছুটা পরিবর্তন সাধন করেছেন। যেমন, ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান শায়বানি। তিনি ছিলেন ইমাম আবু হানীফাহর প্রথম সারির একজন ছাত্র।
আবার কিছু বিশেষজ্ঞ ইমাম মালিকের শিক্ষাকে অন্যদের শিক্ষার সাথে সমন্বয় করে নিজেদের পৃথক মাযহাব তৈরি করেছেন, যেমন ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস শাফি'ঈ। তিনি বহু বছর যাবৎ ইমাম মালিক ও আবু হানীফার ছাত্র মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান শায়বানির নিকট অধ্যয়ন করেছেন।
মালিকি মাযহাবের অনুসারী
বর্তমানে এ মাযহাবের অনুসারীদের বেশিরভাগই বসবাস করে মিশর, সুদান, উত্তর আফ্রিকা (তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কো), পশ্চিম আফ্রিকা (মালি, নাইজেরিয়া ও চাদ প্রভৃতি) এবং আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে (কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন)।
টিকাঃ
[৬] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৫-২০৬। আরও দেখুন 'আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ আল- জাঁবুরি, ফিক্হ আল ইমাম আওযা'ই, (ইরাক, মাতবা'আহ আল-ইরশাদ), ১৯৭৭।
[৭] আল-মাদখাল, পৃ. ১৮৪-১৮৭।
[৮] মুহাম্মাদ আবু যাহরাহ, তারীখ আল- মাযাহিব আল-ইসলামিয়্যাহ, (কায়রো, দাঁর আল- ফিক্স আল-'আরাবি), খন্ড ২, পৃ. ২১৬-২১৭।
[৯] আল-মাদখাল, পৃ. ১৮৭।
[১০] আল-মাদখাল, পৃ. ১৮৭।
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ (৯৩-১৭৯ হিজরি; ৭১৭-৮০১ সাল)
এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা বিশেষজ্ঞ মালিক ইব্ন আনাস ইবন 'আঁমির ৯৩ হিজরিতে মাদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদা 'আঁমির ছিলেন মাদীনার প্রধান সহাবিদের অন্যতম। হাদীসের তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ইমাম আয-যুহরি ও বিখ্যাত হাদীস বর্ণনাকারী 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের আযাদকৃত গোলাম নাফি'র তত্ত্বাবধানে ইমাম মালিক হাদীস অধ্যয়ন করেন। কেবল হাজ্জের উদ্দেশ্য ব্যতীত তিনি কখনো মাদীনার বাইরে ভ্রমণ করতেন না। ফলে, তাঁর জ্ঞান অনেকাংশে মাদীনায় প্রাপ্ত হাদীসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
'আব্বাসি শাসকদের সরকারি আইনে বলা হয়েছিল, কোনো ব্যক্তি খলীফার আনুগত্যের শপথ ভঙ্গ করলে অবধারিতভাবে তার স্ত্রী তুলাক্ হয়ে যাবে। ইমাম মালিক সরকারি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার কারণে ১৪৭ হিজরিতে (৭৬৪ সাল) মাদীনার শাসকের নির্দেশে তাঁকে মারাত্মকভাবে নির্যাতন করা হয়। ইমাম মালিককে বেঁধে এমনভাবে প্রহার করা হয়েছিল যে, তাঁর হাত মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল। কিছু কিছু বর্ণনায় আছে যে, ঐ আঘাতের ফলে তিনি সলাতে তাঁর হাত বুকের উপর রাখতে অক্ষম হয়ে পড়েন এবং হাত ছেড়ে দিয়েই সলাত আদায় করেন।
ইমাম মালিক মাদীনাতে চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে হাদীসের পাঠ দান করেন। তিনি আল-মুয়াত্তা' নামে নাবি ﷺ-এর হাদীস এবং সহাবি ও তাঁবি 'উনদের আসার সম্বলিত একটি গ্রন্থ সংকলন করেছিলেন। 'আব্বাসি খলীফা আবু জা'ফার আল-মানসুর (শাসনকাল ১৩৬-১৫৮ হিজরি; ৭১৭-৮০১ সাল) নাবি ﷺ-এর সুন্নাহভিত্তিক একটি সার্বজনীন সংবিধান চেয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধেই ইমাম মালিক হাদীস সংকলনের এই কাজ শুরু করেন। তবে, গ্রন্থের সংকলন সমাপ্ত হওয়ার পর ইমাম মালিক গ্রন্থটিকে সকলের উপর বাধ্যতামূলক করে দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তিনি বলেন যে, সহাবিগণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা নিশ্চয় সুন্নাহ এমন বিষয় জানেন, যা তার এই গ্রন্থে সংকলিত হয়নি। তাই রাষ্ট্রে সার্বজনীন কোনো আইন জারির ক্ষেত্রে সেগুলোকে অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।
খলীফা হারুন আর-রাশীদও ইমাম মালিককে একই অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর প্রস্তাবকেও তিনি নাকচ করে দেন। ১৭৯ হিজরিতে (৮০১ সাল) ৮৭ বছর বয়সে ইমাম মালিক তার জন্মস্থান মাদীনায় ইন্তেকাল করেন।
মালিকি মাযহাবের গঠন
ইমাম মালিকের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল হাদীস বর্ণনা করা ও সমকালীন সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত হাদীসের প্রয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করা। তিনি ইসলামি আইনের বিভিন্ন বিষয়ের উপর হাদীস ও আসার বর্ণনা করে তার ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য ছাত্রদের বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর ছাত্রদের নিজ নিজ এলাকায় উদ্ভূত সমস্যাগুলোও আলোচনা করে তার সমাধানকল্পে যথোপযুক্ত হাদীস অথবা আসার বর্ণনা করতেন।
আল-মুয়াত্তা' রচনা সমাপ্ত করার পর তিনি তা নিজ মাযহাব হিসেবে তাঁর ছাত্রদের সামনে তুলে ধরতেন। তবে, নতুন কোনো বিশুদ্ধ তথ্য পাওয়া গেলে তিনি প্রয়োজনে তাতে সংযোজন ও বিয়োজন করতেন। তিনি সবসময়ই কল্পনা ও কল্পনাপ্রসূত ফিক্হকে এড়িয়ে চলতেন। আর এভাবে তাঁর মাযহাব ও অনুসারীবৃন্দ আহলুল-হাদীস নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
মালিকি মাযহাবে আইনের উৎস
ইমাম মালিক নিম্নলিখিত উৎসগুলো থেকে ইসলামি আইন বের করে আনতেন। গুরুত্বের ক্রমধারা অনুযায়ী নিচে সেগুলো উল্লেখ করা হলো:
১. আল-কুর'আঁন
অন্যান্য ইমামদের মতো ইমাম মালিকও কুর'আঁনকে ইসলামি আইনের প্রধান উৎস মনে করতেন। এর প্রয়োগে তিনি কোনো পূর্বশর্ত আরোপ করেননি।
২. সুন্নাহ
সুন্নাহকে ইমাম মালিক ইসলামি আইনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে, ইমাম আবু হানীফাহর মতো তিনিও হাদীস ব্যবহারের জন্য কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। কোনো হাদীস মাদীনার প্রথার পরিপন্থী হলে তিনি তা গ্রহণ করতেন না।
তিনি অবশ্য ইমাম আবু হানীফাহ-র মতো হাদীসটি মাশহুর বা সুপ্রসিদ্ধ হওয়ার উপর জোর দেননি। বরং হাদীসের বর্ণনাকারীদের কেউ পরিচিত মিথ্যুক কিংবা চরম দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী না হলে প্রত্যেকটি হাদীসকে তিনি গ্রহণ করতেন।
৩. মাদীনাবাসীর 'আমাল
মাদীনাবাসীদের অনেকেই সহাবিগণের সরাসরি বংশধর। মাদীনাতেই নাবি তাঁর জীবনের শেষ দশ বছর কাটিয়েছেন। তাই ইমাম মালিকের যুক্তি অনুযায়ী, মাদীনার সাধারণ সব অভ্যাসই অনুমোদিত। কারণ, যদি তা না হতো তবে নাবি নিশ্চয়ই এগুলোকে নিরুৎসাহিত করতেন।
এভাবে ইমাম মালিক মাদীনাবাসীর সাধারণ প্রথাকে নির্ভরযোগ্য সুন্নাহর একটি প্রকার হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যা কথা নয় বরং কাজের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। ৮।
৪. সহাবিদের ইজমা' ইমাম আবু হানীফাহ্ মতো ইমাম মালিকও সহাবিগণ ও পরবর্তী যুগের বিশেষজ্ঞদের ইজমা'কে ইসলামি আইনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস মনে করতেন।
৫. সহাবিদের ব্যক্তিগত অভিমত ইমাম মালিক সহাবিগণের ঐক্যমত্য বা মতপার্থক্যপূর্ণ উভয় মতামতকেই পূর্ণমাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে তাঁর হাদীস গ্রন্থ আল-মুয়াত্তা'য় সন্নিবেশিত করেছেন। তবে, সহাবিদের মতৈক্যকে তাঁদের ব্যক্তিগত মতের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।
কোনো বিষয়ে ঐকমত্য না থাকলে, তাঁদের ব্যক্তিগত মতকেও ইমাম মালিক তাঁর নিজের মতের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।
৬. কিয়াস উল্লিখিত উৎসগুলোতে কোনো বিষয় না পাওয়া গেলে ইমাম মালিক তাঁর নিজ বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করতেন। তবে এ ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। কারণ, এ ধরনের মতামত একান্তই ব্যক্তিগত।
৭. মাদীনাবাসীদের প্রথা হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক না হলে ইমাম মালিক মাদীনার কিছু সংখ্যক লোকের মধ্যে প্রচলিত প্রথাগুলোকেও কিছুটা গুরুত্ব দিতেন। তাঁর মতে, এসব প্রথা বিচ্ছিন্ন হলেও সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে যে, তা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এবং সহাবিগণ কিংবা নাবি ﷺ নিজে এগুলোকে সমর্থন করেছেন।
৮. ইসতিসলাহ
ইমাম আবু হানীফাহ-র উদ্ভাবিত ইসতিহসান নীতিটি ইমাম মালিক ও তাঁর ছাত্ররাও প্রয়োগ করেছেন। তবে, তাঁরা নীতিটির নাম দিয়েছেন ইসতিসলাহ। এর সরল অর্থ হলো অধিক উপযুক্ত আইনগত সিদ্ধান্ত খুঁজে বের করা। মানুষের জন্য কল্যাণকর অথচ তা শারী'আহয় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে ইসতিসলাহ নীতিটি প্রযোজ্য।
'আলি -এর একটি আইনগত সিদ্ধান্তে ইসতিসলাহ-এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। সংঘবদ্ধ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী দলের সবাই দোষী যদিও প্রকৃত হত্যাকাণ্ডটি হয়তো তাদের মধ্য থেকে মাত্র একজনই ঘটিয়েছে। এক্ষেত্রে শারী'আহ আইনে কেবল মূল হত্যাকারী সম্পর্কে বলা হয়েছে। আরেকটি উদাহরণ হলো, রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী শাসক ধনী মানুষের নিকট থেকে যাকাতের পাশাপাশি অন্যান্য কর আদায় করতে পারবে। অথচ, শারী'আহতে কেবল যাকাতের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বিধান দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কিয়াসের পরিবর্তে পরিস্থিতির সাথে অধিক সংগতিপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইমাম মালিকও ইসতিসলাহ নীতিটি ব্যবহার করেছেন।
৯. 'উরফ (প্রথা)
ইমাম আবু হানীফাহ মতো ইমাম মালিকও শারী'আহর সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন সামাজিক প্রtha ও রীতি-নীতিগুলোকে দ্বিতীয় পর্যায়ের আইনের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে মেনে নিয়েছেন।১৯৪
দৃষ্টান্তস্বরূপ, সিরিয়ার আঞ্চলিক প্রথা অনুযায়ী দাব্বাহ শব্দ দ্বারা ঘোড়াকে বোঝায়। অথচ, আরবি ভাষায় এর সরল অর্থ হলো চতুষ্পদী জন্তু। অতএব, সিরিয়ার কোনো চুক্তিতে দাব্বাহ পরিশোধের শর্ত দেওয়া হলে তার অর্থ হবে 'ঘোড়া'। পক্ষান্তরে, আরব বিশ্বের অন্য কোথাও দাঁব্বাহ শব্দটি দ্বারা ঘোড়া বোঝাতে চাইলে আরও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
মালিকি মাযহাবের প্রধান ছাত্ররা
ইমাম মালিক-এর যেসব ছাত্র পরবর্তীতে নিজেদের আলাদা কোনো মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেননি তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন আল-কাসিম ও ইব্ন ওয়াহব।
আবু আব্দুর-রহমান ইবন আল-কাসিম (১৩২-১৯১ হিজরি; ৭৪৫-৮১৩ সাল)
ইমাম কাসিমের জন্ম মিশরে। পরবর্তীকালে তিনি মাদীনায় ভ্রমণ করে তাঁর শিক্ষক ইমাম মালিকের তত্ত্বাবধানে বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অধ্যয়ন করেন। মালিকি মাযহাবের ফিক্হের উপর তিনি আল- মুদাওওয়ানাহ নামক একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থটি এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, তা ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা' কেও অনেকটা ম্লান করে দেয়।
আবু 'আব্দুল্লাহ ইব্ন ওয়াহব (১২৫-১৯৭ হিজরি; ৭৪২-৮১৯ সাল)
ইমাম ইব্ন ওয়াহবও ইমাম মালিকের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করার জন্য মিশর থেকে মাদীনায় গমন করেছিলেন। তিনি কুর'আন ও সুন্নাহ থেকে মাসআলাহ বের করার ক্ষেত্রে এতটাই পারদর্শী ছিলেন যে, খোদ ইমাম মালিক তাঁকে আল-মুফতি উপাধি দিয়েছিলেন।
ইব্ন ওয়াহবকে মিশরের বিচারক হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, শাসকের ইচ্ছার অধীনস্থ না হয়ে স্বাধীনভাবে নিজের সততাকে ধরে রাখার জন্য তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ।১০।
অন্যান্য মাযহাবের প্রখ্যাত 'আলিমদের মধ্যেও ইমাম মালিকের বেশ কিছু ছাত্র রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ইমাম মালিকের শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজ নিজ মাযহাবে কিছুটা পরিবর্তন সাধন করেছেন। যেমন, ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান শায়বানি। তিনি ছিলেন ইমাম আবু হানীফাহর প্রথম সারির একজন ছাত্র।
আবার কিছু বিশেষজ্ঞ ইমাম মালিকের শিক্ষাকে অন্যদের শিক্ষার সাথে সমন্বয় করে নিজেদের পৃথক মাযহাব তৈরি করেছেন, যেমন ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস শাফি'ঈ। তিনি বহু বছর যাবৎ ইমাম মালিক ও আবু হানীফার ছাত্র মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান শায়বানির নিকট অধ্যয়ন করেছেন।
মালিকি মাযহাবের অনুসারী
বর্তমানে এ মাযহাবের অনুসারীদের বেশিরভাগই বসবাস করে মিশর, সুদান, উত্তর আফ্রিকা (তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কো), পশ্চিম আফ্রিকা (মালি, নাইজেরিয়া ও চাদ প্রভৃতি) এবং আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে (কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন)।
টিকাঃ
[৬] আল-মাদখাল, পৃ. ২০৫-২০৬। আরও দেখুন 'আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ আল- জাঁবুরি, ফিক্হ আল ইমাম আওযা'ই, (ইরাক, মাতবা'আহ আল-ইরশাদ), ১৯৭৭।
[৭] আল-মাদখাল, পৃ. ১৮৪-১৮৭।
[৮] মুহাম্মাদ আবু যাহরাহ, তারীখ আল- মাযাহিব আল-ইসলামিয়্যাহ, (কায়রো, দাঁর আল- ফিক্স আল-'আরাবি), খন্ড ২, পৃ. ২১৬-২১৭।
[৯] আল-মাদখাল, পৃ. ১৮৭।
[১০] আল-মাদখাল, পৃ. ১৮৭।
📄 যাইদি মাযহাব
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম যাইদ রহিমাহুল্লাহ (৮১-১২২ হিজরি; ৭০০-৭৪০ সাল)
'আলি-এর বংশধর হুসাইনের এক দৌহিত্রের মাধ্যমে এ মাযহাবের উৎপত্তি। ইমাম যাইদের পিতা 'আলি যাইন আল-'আবিদীন আইন শাস্ত্রে অসামান্য জ্ঞান ও হাদীস বর্ণনার কারণে সুপরিচিত ছিলেন। ৮১ হিজরিতে মাদীনায় জন্মগ্রহণকারী যাইদ ইবন 'আলি অল্প সময়ের মধ্যেই 'আলাউই বংশের প্রথম সারির একজন বিশেষজ্ঞ 'আলিমে পরিণত হন। তাঁর বড় ভাই মুহাম্মাদ আল-বাকিরাসহ অন্যান্য অনেক আত্মীয়ের কাছ থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন।
ইরাকের কুফাহ, বাসরাহ ও ওয়াসিতের অন্যান্য শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণের মাধ্যমে ইমাম যাইদ তাঁর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন। ওয়াসিতে তিনি ইমাম আবু হানীফাহ ও সুফ্যান আস্-সাওরির মতো সমকালীন বিশেষজ্ঞদের সাথে মত বিনিময় করেছেন।
উমাইয়া খলীফা হিশাম ইবন আব্দিল মালিক (শাসনকাল ১০৫-১২৫ হিজরি; ৭২৪-৭৪৩ সাল) 'আলাউই পরিবারকে খাটো ও অপমানিত করার সুযোগ কখনো হাতছাড়া করতেন না। বিশেষত যাইদ ইবন 'আলীকে প্রায়ই অপমান করা হতো। গভর্নরের অনুমতি ছাড়া তাঁকে মাদীনার বাইরে যেতে দেওয়া হতো না। অনুমতি চাইলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হতো। এমতাবস্থায়, ইমাম যায়দই হলেন 'আলির বংশের প্রথম ব্যক্তি যিনি কারবালার বিপর্যয়ের পর উমাইয়াদের কাছ থেকে খিলাফাহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন।
তিনি গোপনে কুফাহ গমন করেন। সেখানে ইরাকের ওয়াসিত ও অন্যান্য এলাকার শী'আরা তাঁর সাথে মিলিত হয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তবে তাঁর কিছু আত্মীয় কুফাবাসীদের উপর আস্থা রাখতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ ইমাম হুসাইনের সাথে তাদের বিশ্বাসঘাতকতাই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু, তিনি তাদের সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করেননি।
ইমাম যাইদের নব্য অনুসারীরা অনুসন্ধান করে বের করল যে, তাঁর পিতামহের কাছ থেকে খিলাফাহ ‘চুরির’ অভিযোগে প্রথম খলীফাদ্বয় আবু বাক্স ও ‘উমারকে তিনি মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগী মনে করেন না। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ দেখা দেয়। অধিকাংশ অনুসারীরাই তাঁর কাছ থেকে কেটে পড়ে এবং তাঁর পরিবর্তে তাঁর ভাতিজা জা'ফার আস-সাদিককে যুগের ইমাম ঘোষণা করে। খলীফা হিশামের সেনাবাহিনী এ মতবিরোধের সদ্ব্যবহার করে অতর্কিত কুফাহ আক্রমণ করে। মাত্র চার শ’র সামান্য কিছু বেশি অনুসারী ইমাম যাইদের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এ যুদ্ধেই তিনি নিহত হন। ১২।
যায়দি মাযহাবের গঠন
ইমাম যাইদ ছিলেন প্রধানত হাদীস বর্ণনা ও কুর’আন তিলাওয়াতে একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। মাদীনা, বাসরাহ, কুফাহ ও ওয়াসিতের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে তিনি পাঠদান করতেন। এর ফলে তাঁর ছাত্রের সংখ্যা ছিল অনেক। ইমাম যাইদের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল হাদীস বর্ণনা ও কুর’আন তিলাওয়াহ শিখানো।
আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তিনি নিজে তার সমাধান দিতেন, অথবা ফাক্বীহ্ আব্দুর-রহমান ইবন আবি লাইলার মতো সমসাময়িক বিশেষজ্ঞদের কোনো একজনের মতকে বেছে নিতেন। মাযহাবের আইনগত সিদ্ধান্তগুলো ইমাম যাইদ নিজে লিপিবদ্ধ করেননি এবং তিনি কাউকে তা করার নির্দেশও দেননি। তাঁর ছাত্রবৃন্দ নিজ উদ্যোগে সেসব সিদ্ধান্ত সংকলন করেছেন।
যায়দি মাযহাবে আইনের উৎস
এ মাযহাবের আইন বিশেষজ্ঞগণের মতে, ইমাম যাইদ নিম্নোক্ত উৎসগুলো থেকে আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তার মাযহাবের পরবর্তী 'আলিমগণও এসব উৎস থেকেই আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।
১. আল-কুর'আন কুর'আঁনকে ইসলামি আইনের প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিদ্যমান ত্রিশ জুষ (পারা) কুর'আঁনকেই সম্পূর্ণ মনে করা হতো। অনেক চরমপন্থী শী'আহ গোষ্ঠী কুর'আঁনের কিছু অংশ মুছে ফেলা বা লুকিয়ে রাখার যে অভিযোগ উত্থাপন করে, তার সাথে তাঁরা একমত পোষণ করতেন না।
২. সুন্নাহ নাবি ﷺ-এর কথা, কাজ ও সম্মতিকে ইসলামি আইনের দ্বিতীয় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। 'আলাউই পরিবার কিংবা তাদের অনুসারীদের বর্ণিত হাদীসের মধ্যে সীমিত না রেখে সকল নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকে যায়দি মাযহাবে সুন্নাহ মনে করা হতো।
৩. 'আলি রাঃ-এর বক্তব্য একান্তই ব্যক্তিগত মত ছাড়া 'আলি ইবন আবি তালিবের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যকে ইমাম যাইদ সুন্নাহর অংশ মনে করতেন। অর্থাৎ, কোনো বক্তব্যের ক্ষেত্রে 'আলি রাঃ যদি বিশেষভাবে সেটিকে একান্ত নিজের মত বলে উল্লেখ না করতেন, তাহলে ইমাম যাইদ ধরেই নিতেন যে, তা নাবি ﷺ-এর মত। তবে, 'আলির সব সিদ্ধান্তকেই যে তিনি গ্রহণ করতেন তা নয়। বরং মাঝে মধ্যে তিনি 'আলির সিদ্ধান্তের বিপরীত সিদ্ধান্তও দিয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বর্ণিত আছে যে, 'আলি রাঃ-এর মতে ইয়াতিমের নিকট থেকে যাকাত আদায় করা যাবে। পক্ষান্তরে ইমাম যাইদ সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, ইয়াতিমের নিকট থেকে যাকাত আদায় করা যাবে না।
৪. সহাবিগণের ইজমা' ইমাম যাইদ সহাবিগণের ইজমা'কে ইসলামি আইনের একটি উৎস মনে করতেন। তবে আবু বাক্স ও 'উমারের তুলনায় তিনি তাঁর পিতামহকে নেতৃত্বের জন্য অধিক উপযুক্ত মনে করতেন। তথাপিও তাঁদের খিলাফাতকে যেহেতু সহাবিগণ সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তাই তিনিও তা মেনে নেওয়া সকলের উপর বাধ্যতামূলক হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করতেন।
৫. কিয়াস এ মাযহাবের আইনজ্ঞদের মতে, ইসতিহসান ও ইসতিসলাহ্ শীর্ষক উভয় নীতিই এক প্রকার কিয়াস। তাই, এ নীতিগুলোকে তাঁরা অন্যান্য মাযহাবের কিয়াসেরই একটি অংশ মনে করতেন।
৬. 'আকূল (বুদ্ধিমত্তা) যেসব ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী উৎসগুলোতে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না সেসবক্ষেত্রে মানবীয় বুদ্ধিমত্তাকে এ মাযহাবের ইসলামি আইনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যুবক বয়সে ইমাম যাইদ মু'তাযিলি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসিল ইবন 'আতার তত্ত্বাবধানে কিছু দিন শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মু'তাযিলারা সর্বপ্রথম 'আক্ল বা বুদ্ধিমত্তাকে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের যুক্তি মতে বিবেকবুদ্ধিতে যা ভালো মনে হবে তা-ই ভালো এবং যা মন্দ মনে হবে তা-ই মন্দ। কুর'আন ও সুন্নাহর পরেই 'আক্লের স্থান। এ কারণেই তারা কিয়াসের পাশাপাশি সহাবিগণের মতামতকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে, ইমাম যাইদ কিয়াসকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং 'আক্লকে স্থান দিয়েছেন সবার শেষে।
যায়দি মাযহাবের প্রধান ছাত্ররা এ মাযহাব সংরক্ষিত হয়েছে ইমাম যাইদের ছাত্রদের মাধ্যমে। তাঁরা ইমাম যাইদের সিদ্ধান্তগুলোর পাশাপাশি 'আলাউই বংশের অন্যান্য ইমাম এবং সমসাময়িক অনেক বিশেষজ্ঞের আইনগত সিদ্ধান্তগুলোও তাঁদের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
আবু খালিদ, 'আম্র ইব্ন খালিদ ওয়াসিতি (মৃত্যু ২৭৬ হিজরি; ৮৮৯ সাল)
'আম্র ইব্ন খালিদ সম্ভবত ইমাম যাইদের ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন সর্বাধিক খ্যাতিসম্পন্ন। ইমাম যাইদের সাথে তিনি মাদীনায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন এবং অধিকাংশ সফরে তিনি তাঁর সাথে থাকতেন। 'আম্র দুটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থে ইমাম যাইদের শিক্ষাগুলো সংকলন করেন। গ্রন্থ দুটি হলো মাজমু' আল-হাদীস ও মাজমু' আল-ফিক্হ। এগুলোকে একত্রে বলা হয় আল মাজমু' আল-কাবীর। মাজমু' আল-হাদীস গ্রন্থের সকল হাদীসই 'আলাউই পরিবারের বর্ণনা থেকে নেওয়া হলেও এর সবগুলো বর্ণনাই সিহাহ সিত্তাহর বিখ্যাত গ্রন্থগুলোতে রয়েছে।
আল-হাঁদি ইলী আল-হাক্, ইয়াহইয়া ইবন আল-হুসাইন (২৪৬-২৯৮ হিজরি; ৮৬০-৯১১ সাল)
যায়দিগণ 'আলাউই বংশের হুসাইনি শাখার সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ আল-কাঁসিম ইবন ইবরাহীম আল-হাসানি (১৭০-২৪৩ হিজরি; ৭৮৭-৮৫৭ সাল)-এর মতামতগুলোও যায়দি মাযহাবে স্থান পেয়েছে। তবে, এ মাযহাবের উপর তাঁর চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন কাসিমের দৌহিত্র আল-হাঁদি ইলা আল-হাক্ক। তাকে ইয়েমেনের ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি যায়দি মাযহাবের শিক্ষা অনুযায়ী ইয়েমেনের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন। এ সময়ে সে অঞ্চলে যায়দি মাযহাবের ভিত্তি এতটাই মজবুত হয়ে গিয়েছিল যে, এর বদৌলতে তা অদ্যাবধি টিকে আছে।
আল-হাসান ইবন 'আলি আল হুসাইনি (২৩০-৩০৪ হিজরি; ৮৪৫- ৯১৭ সাল)
আল-হাসান ছিলেন হাঁদির সমসাময়িক। তিনি আন-নাসির আল-কাবীর নামে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি দাইলাম ও জীলানে যাইদি মাযহাব প্রচার করেন। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ এবং তাঁর পরবর্তী লোকেরা তাঁকেই যায়দি মাযহাবের পুনর্জাগরক মনে করেন। ১০।
যায়দি মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ
বর্তমানে এ মাযহাবের অনুসারীবৃন্দের অধিকাংশই বসবাস করতেন ইয়েমেনে। এখনও ইয়েমেনের অনেক নাগরিক যায়িদী মাযহাবের অনুসারী।
টিকাঃ
[১১] শী'আদের উপস্থাপিত বারো ইমামের পঞ্চমজন।
[১২] তারীখ আল-মাযহাব আল-ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭৪৯-৭৯৩।
[১৩] তারীখ আল-মাযাহিব আল-ইসলামিয়্যাহ, খন্ড ২, পৃ. ৫২৫।
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইমাম যাইদ রহিমাহুল্লাহ (৮১-১২২ হিজরি; ৭০০-৭৪০ সাল)
'আলি-এর বংশধর হুসাইনের এক দৌহিত্রের মাধ্যমে এ মাযহাবের উৎপত্তি। ইমাম যাইদের পিতা 'আলি যাইন আল-'আবিদীন আইন শাস্ত্রে অসামান্য জ্ঞান ও হাদীস বর্ণনার কারণে সুপরিচিত ছিলেন। ৮১ হিজরিতে মাদীনায় জন্মগ্রহণকারী যাইদ ইবন 'আলি অল্প সময়ের মধ্যেই 'আলাউই বংশের প্রথম সারির একজন বিশেষজ্ঞ 'আলিমে পরিণত হন। তাঁর বড় ভাই মুহাম্মাদ আল-বাকিরাসহ অন্যান্য অনেক আত্মীয়ের কাছ থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন।
ইরাকের কুফাহ, বাসরাহ ও ওয়াসিতের অন্যান্য শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণের মাধ্যমে ইমাম যাইদ তাঁর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন। ওয়াসিতে তিনি ইমাম আবু হানীফাহ ও সুফ্যান আস্-সাওরির মতো সমকালীন বিশেষজ্ঞদের সাথে মত বিনিময় করেছেন।
উমাইয়া খলীফা হিশাম ইবন আব্দিল মালিক (শাসনকাল ১০৫-১২৫ হিজরি; ৭২৪-৭৪৩ সাল) 'আলাউই পরিবারকে খাটো ও অপমানিত করার সুযোগ কখনো হাতছাড়া করতেন না। বিশেষত যাইদ ইবন 'আলীকে প্রায়ই অপমান করা হতো। গভর্নরের অনুমতি ছাড়া তাঁকে মাদীনার বাইরে যেতে দেওয়া হতো না। অনুমতি চাইলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হতো। এমতাবস্থায়, ইমাম যায়দই হলেন 'আলির বংশের প্রথম ব্যক্তি যিনি কারবালার বিপর্যয়ের পর উমাইয়াদের কাছ থেকে খিলাফাহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন।
তিনি গোপনে কুফাহ গমন করেন। সেখানে ইরাকের ওয়াসিত ও অন্যান্য এলাকার শী'আরা তাঁর সাথে মিলিত হয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তবে তাঁর কিছু আত্মীয় কুফাবাসীদের উপর আস্থা রাখতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ ইমাম হুসাইনের সাথে তাদের বিশ্বাসঘাতকতাই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু, তিনি তাদের সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করেননি।
ইমাম যাইদের নব্য অনুসারীরা অনুসন্ধান করে বের করল যে, তাঁর পিতামহের কাছ থেকে খিলাফাহ ‘চুরির’ অভিযোগে প্রথম খলীফাদ্বয় আবু বাক্স ও ‘উমারকে তিনি মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগী মনে করেন না। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ দেখা দেয়। অধিকাংশ অনুসারীরাই তাঁর কাছ থেকে কেটে পড়ে এবং তাঁর পরিবর্তে তাঁর ভাতিজা জা'ফার আস-সাদিককে যুগের ইমাম ঘোষণা করে। খলীফা হিশামের সেনাবাহিনী এ মতবিরোধের সদ্ব্যবহার করে অতর্কিত কুফাহ আক্রমণ করে। মাত্র চার শ’র সামান্য কিছু বেশি অনুসারী ইমাম যাইদের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এ যুদ্ধেই তিনি নিহত হন। ১২।
যায়দি মাযহাবের গঠন
ইমাম যাইদ ছিলেন প্রধানত হাদীস বর্ণনা ও কুর’আন তিলাওয়াতে একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। মাদীনা, বাসরাহ, কুফাহ ও ওয়াসিতের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে তিনি পাঠদান করতেন। এর ফলে তাঁর ছাত্রের সংখ্যা ছিল অনেক। ইমাম যাইদের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল হাদীস বর্ণনা ও কুর’আন তিলাওয়াহ শিখানো।
আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তিনি নিজে তার সমাধান দিতেন, অথবা ফাক্বীহ্ আব্দুর-রহমান ইবন আবি লাইলার মতো সমসাময়িক বিশেষজ্ঞদের কোনো একজনের মতকে বেছে নিতেন। মাযহাবের আইনগত সিদ্ধান্তগুলো ইমাম যাইদ নিজে লিপিবদ্ধ করেননি এবং তিনি কাউকে তা করার নির্দেশও দেননি। তাঁর ছাত্রবৃন্দ নিজ উদ্যোগে সেসব সিদ্ধান্ত সংকলন করেছেন।
যায়দি মাযহাবে আইনের উৎস
এ মাযহাবের আইন বিশেষজ্ঞগণের মতে, ইমাম যাইদ নিম্নোক্ত উৎসগুলো থেকে আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তার মাযহাবের পরবর্তী 'আলিমগণও এসব উৎস থেকেই আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।
১. আল-কুর'আন কুর'আঁনকে ইসলামি আইনের প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিদ্যমান ত্রিশ জুষ (পারা) কুর'আঁনকেই সম্পূর্ণ মনে করা হতো। অনেক চরমপন্থী শী'আহ গোষ্ঠী কুর'আঁনের কিছু অংশ মুছে ফেলা বা লুকিয়ে রাখার যে অভিযোগ উত্থাপন করে, তার সাথে তাঁরা একমত পোষণ করতেন না।
২. সুন্নাহ নাবি ﷺ-এর কথা, কাজ ও সম্মতিকে ইসলামি আইনের দ্বিতীয় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। 'আলাউই পরিবার কিংবা তাদের অনুসারীদের বর্ণিত হাদীসের মধ্যে সীমিত না রেখে সকল নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকে যায়দি মাযহাবে সুন্নাহ মনে করা হতো।
৩. 'আলি রাঃ-এর বক্তব্য একান্তই ব্যক্তিগত মত ছাড়া 'আলি ইবন আবি তালিবের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যকে ইমাম যাইদ সুন্নাহর অংশ মনে করতেন। অর্থাৎ, কোনো বক্তব্যের ক্ষেত্রে 'আলি রাঃ যদি বিশেষভাবে সেটিকে একান্ত নিজের মত বলে উল্লেখ না করতেন, তাহলে ইমাম যাইদ ধরেই নিতেন যে, তা নাবি ﷺ-এর মত। তবে, 'আলির সব সিদ্ধান্তকেই যে তিনি গ্রহণ করতেন তা নয়। বরং মাঝে মধ্যে তিনি 'আলির সিদ্ধান্তের বিপরীত সিদ্ধান্তও দিয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বর্ণিত আছে যে, 'আলি রাঃ-এর মতে ইয়াতিমের নিকট থেকে যাকাত আদায় করা যাবে। পক্ষান্তরে ইমাম যাইদ সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, ইয়াতিমের নিকট থেকে যাকাত আদায় করা যাবে না।
৪. সহাবিগণের ইজমা' ইমাম যাইদ সহাবিগণের ইজমা'কে ইসলামি আইনের একটি উৎস মনে করতেন। তবে আবু বাক্স ও 'উমারের তুলনায় তিনি তাঁর পিতামহকে নেতৃত্বের জন্য অধিক উপযুক্ত মনে করতেন। তথাপিও তাঁদের খিলাফাতকে যেহেতু সহাবিগণ সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তাই তিনিও তা মেনে নেওয়া সকলের উপর বাধ্যতামূলক হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করতেন।
৫. কিয়াস এ মাযহাবের আইনজ্ঞদের মতে, ইসতিহসান ও ইসতিসলাহ্ শীর্ষক উভয় নীতিই এক প্রকার কিয়াস। তাই, এ নীতিগুলোকে তাঁরা অন্যান্য মাযহাবের কিয়াসেরই একটি অংশ মনে করতেন।
৬. 'আকূল (বুদ্ধিমত্তা) যেসব ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী উৎসগুলোতে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না সেসবক্ষেত্রে মানবীয় বুদ্ধিমত্তাকে এ মাযহাবের ইসলামি আইনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যুবক বয়সে ইমাম যাইদ মু'তাযিলি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসিল ইবন 'আতার তত্ত্বাবধানে কিছু দিন শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মু'তাযিলারা সর্বপ্রথম 'আক্ল বা বুদ্ধিমত্তাকে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের যুক্তি মতে বিবেকবুদ্ধিতে যা ভালো মনে হবে তা-ই ভালো এবং যা মন্দ মনে হবে তা-ই মন্দ। কুর'আন ও সুন্নাহর পরেই 'আক্লের স্থান। এ কারণেই তারা কিয়াসের পাশাপাশি সহাবিগণের মতামতকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে, ইমাম যাইদ কিয়াসকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং 'আক্লকে স্থান দিয়েছেন সবার শেষে।
যায়দি মাযহাবের প্রধান ছাত্ররা এ মাযহাব সংরক্ষিত হয়েছে ইমাম যাইদের ছাত্রদের মাধ্যমে। তাঁরা ইমাম যাইদের সিদ্ধান্তগুলোর পাশাপাশি 'আলাউই বংশের অন্যান্য ইমাম এবং সমসাময়িক অনেক বিশেষজ্ঞের আইনগত সিদ্ধান্তগুলোও তাঁদের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
আবু খালিদ, 'আম্র ইব্ন খালিদ ওয়াসিতি (মৃত্যু ২৭৬ হিজরি; ৮৮৯ সাল)
'আম্র ইব্ন খালিদ সম্ভবত ইমাম যাইদের ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন সর্বাধিক খ্যাতিসম্পন্ন। ইমাম যাইদের সাথে তিনি মাদীনায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন এবং অধিকাংশ সফরে তিনি তাঁর সাথে থাকতেন। 'আম্র দুটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থে ইমাম যাইদের শিক্ষাগুলো সংকলন করেন। গ্রন্থ দুটি হলো মাজমু' আল-হাদীস ও মাজমু' আল-ফিক্হ। এগুলোকে একত্রে বলা হয় আল মাজমু' আল-কাবীর। মাজমু' আল-হাদীস গ্রন্থের সকল হাদীসই 'আলাউই পরিবারের বর্ণনা থেকে নেওয়া হলেও এর সবগুলো বর্ণনাই সিহাহ সিত্তাহর বিখ্যাত গ্রন্থগুলোতে রয়েছে।
আল-হাঁদি ইলী আল-হাক্, ইয়াহইয়া ইবন আল-হুসাইন (২৪৬-২৯৮ হিজরি; ৮৬০-৯১১ সাল)
যায়দিগণ 'আলাউই বংশের হুসাইনি শাখার সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ আল-কাঁসিম ইবন ইবরাহীম আল-হাসানি (১৭০-২৪৩ হিজরি; ৭৮৭-৮৫৭ সাল)-এর মতামতগুলোও যায়দি মাযহাবে স্থান পেয়েছে। তবে, এ মাযহাবের উপর তাঁর চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন কাসিমের দৌহিত্র আল-হাঁদি ইলা আল-হাক্ক। তাকে ইয়েমেনের ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি যায়দি মাযহাবের শিক্ষা অনুযায়ী ইয়েমেনের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন। এ সময়ে সে অঞ্চলে যায়দি মাযহাবের ভিত্তি এতটাই মজবুত হয়ে গিয়েছিল যে, এর বদৌলতে তা অদ্যাবধি টিকে আছে।
আল-হাসান ইবন 'আলি আল হুসাইনি (২৩০-৩০৪ হিজরি; ৮৪৫- ৯১৭ সাল)
আল-হাসান ছিলেন হাঁদির সমসাময়িক। তিনি আন-নাসির আল-কাবীর নামে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি দাইলাম ও জীলানে যাইদি মাযহাব প্রচার করেন। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ এবং তাঁর পরবর্তী লোকেরা তাঁকেই যায়দি মাযহাবের পুনর্জাগরক মনে করেন। ১০।
যায়দি মাযহাবের অনুসারীবৃন্দ
বর্তমানে এ মাযহাবের অনুসারীবৃন্দের অধিকাংশই বসবাস করতেন ইয়েমেনে। এখনও ইয়েমেনের অনেক নাগরিক যায়িদী মাযহাবের অনুসারী।
টিকাঃ
[১১] শী'আদের উপস্থাপিত বারো ইমামের পঞ্চমজন।
[১২] তারীখ আল-মাযহাব আল-ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭৪৯-৭৯৩।
[১৩] তারীখ আল-মাযাহিব আল-ইসলামিয়্যাহ, খন্ড ২, পৃ. ৫২৫।