📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 ইসলামি আইনের উৎস

📄 ইসলামি আইনের উৎস


১. আল-কুর'আন কুর'আনই হলো ইসলামি আইনের সর্বপ্রধান উৎস। এর প্রতিটি আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং নির্ভুল। তবে, এর কিছু আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে 'আলিমদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে।
২. আস-সুন্নাহ গুরুত্বের দিক থেকে কুর'আনের পরের অবস্থানে রয়েছে নাবি -এর হাদীসগুলো। তবে, নাবি -এর বিশুদ্ধ হাদীস ছাড়াও দুর্বল ও হাদীস জালকারীদের রচিত বেশ কিছু বানোয়াট হাদীসও প্রচলিত আছে। তাই বিশেষজ্ঞগণ হাদীস গ্রহণ ও প্রয়োগের জন্য বিশুদ্ধতার মানদণ্ড হিসেবে কিছু শর্ত আরোপ করে দিয়েছেন।
৩. সহাবাগণের মতামত সহাবিদের ব্যক্তিগত মতামত ও ইজমা' হলো আইনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাঁদের মতগুলোকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়।
ক. কোনো বিষয়ে তাঁরা সকলে একমত পোষণ করলে তাকে ইজমা' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
খ. কোনো বিষয়ে তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলে প্রত্যেকটি মতকে বলা হয় রা'ই (রায়) বা ব্যক্তিগত মত।
৪. কিয়াস গুরুত্বের দিক থেকে এর পরের অবস্থানে রয়েছে কুর'আন-সুন্নাহতে প্রাপ্ত প্রমাণভিত্তিক ইজতিহাদ বা কিয়াস। কিয়াস হলো সাদৃশ্যপূর্ণ অবস্থার ভিত্তিতে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার একটি পদ্ধতি। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কিয়াসের মাধ্যমেই 'আলিমগণ গাঁজা সেবনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। নাবি নেশাজাতীয় দ্রব্যের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলেছেন:
"প্রত্যেক নেশাজাতীয় দ্রব্য খাম্; আর প্রত্যেক খাম্রই হারাম।"(১৫
গাঁজার মধ্যে নেশাজাতীয় প্রভাব রয়েছে। তাই এটিও খাম্ শ্রেণিভুক্ত এবং হারাম।
৫. ইসতিহসান (আইনগত প্রাধান্য) এই নীতির ভিত্তিতে পারিপার্শ্বিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনো মতকে কিয়াসের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিভিন্ন নামে হলেও এ নীতিটি বেশিরভাগ মাযহাবের বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণ ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বস্তু উৎপাদন ও বিক্রিসংক্রান্ত চুক্তিতে ইসতিহসান-এর প্রয়োগ দেখা যায়। নাবি -এর বক্তব্য, "দখলে আসার আগ পর্যন্ত খাদ্য দ্রব্য বিক্রি করা কারও উচিত নয়।” (১৬) -অনুযায়ী কিয়াস করলে পাওয়া যায়: দখলে আনার আগে কোনো পণ্য বিক্রি করা যাবে না, কারণ এক্ষেত্রে চুক্তির সময় পণ্যটির কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তবে, এ ধরনের চুক্তি ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং এর প্রয়োজনীয়তাও একেবারে স্পষ্ট। তাই কিয়াসের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ইসতিহসান-এর নীতি অনুযায়ী এ ধরনের চুক্তিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
৬. 'উফ (প্রথা) ইসলামের কোনো মূলনীতি বা বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না-হলে স্থানীয় প্রথাগুলো ঐ অঞ্চলের আইনের একটি উৎস হিসেবে গণ্য হতে পারে। দেনমোহর পরিশোধের ব্যাপারে বিয়ের স্থানীয় প্রথা হলো এর একটি উত্তম উদাহরণ। ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিবাহের একটি অংশ হলো পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে দেনমোহর নির্ধারণ করা। তবে, দেনমোহর পরিশোধের ব্যাপারে ইসলাম কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেধে দেয়নি। মিশর ও অন্যান্য কিছু এলাকার প্রথা অনুযায়ী মুকাদ্দাম নামে দেনমোহরের একটি অংশ বিবাহ অনুষ্ঠানের আগেই পরিশোধ করতে হয়, আর মু'আখখার নামক বাকি অংশ কেবল মৃত্যু কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদের সময় পরিশোধ করা হয়। (১৭)
‘উরফ-এর আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো ক্রয়-বিক্রয় বা ভাড়াসংক্রান্ত প্রথাগুলো।
ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিক্রীত পণ্য পুরোপুরি হস্তান্তর করা না হলে মূল্য পরিশোধ জরুরি নয়। তবে, অনেক অঞ্চলে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই ভাড়াকৃত স্থান বা বস্তুটির অগ্রিম ভাড়া পরিশোধ করতে হয়।
ইসলামি আইনের উৎসগুলোর এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাস করার উদ্দেশ্য ছিল ইতিবাচক উন্নয়ন সাধন। তবে দলাদলির চলমান ধারার সাথে মিলিত হয়ে এই শ্রেণিবিন্যাস মাযহাবগুলোর পারস্পরিক ব্যবধানকে আরও বৃদ্ধি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে একই নীতিকে ভিন্ন ভিন্ন নাম দেওয়ায় তা বরং মতপার্থক্যের উৎসে পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মালিকি মাযহাবের ‘আলিমগণ হানাফি মাযহাবের ইসতিহসান নীতিকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিলেও মাসালিহ মুরসালাহ শিরোনামে তাঁরা সেই একই নীতি প্রয়োগ করেছেন। অন্যদিকে শাফি’ই মাযহাব উভয় পরিভাষাকে প্রত্যাখ্যান করে একই নীতি প্রয়োগ করার জন্য ইসতিসহাব পরিভাষাটি ব্যবহার করেছে।

টিকাঃ
(১৩) এ যুগের প্রথমার্ধেই (১৩২-২১৫ হিজরি) অধিকাংশ অনুবাদ সম্পন্ন হয়, তবে তার প্রভাব প্রকটভাবে অনুভূত হয় এ যুগের শেষার্ধে।
(১৫) মুসলিম, খন্ড ৩, পৃ. ১১০৮, হাদীস নং ৪৯৬৩ এবং সুনান আবি দাউদ, খন্ড ৩, পৃ. ১০৪৩, হাদীস নং ৩৬৭২।
(১৬) ইবন 'উমার থেকে বর্ণিত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম মালিক। আল-মুয়াত্তা' ইমাম মালিক, পৃ. ২৯৬, হাদীস নং ১৩২৪।
(১৭) মুহাম্মাদ মুস্তাফা শালাবি, উসুল আল-ফিক্হ আল-ইসলামি, (বৈরুত, লেবানন: দাঁর আন-নাহদাহ আল-'আরাবিয়াহ), দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৭৮, খন্ড ১, পৃ. ৩১৪।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 অধ্যায় সারাংশ

📄 অধ্যায় সারাংশ


এ যুগে ফিক্হশাস্ত্র ইসলামি জ্ঞানের একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে বিকাশ লাভ করে।
উমাইয়া শাসনামলের শেষের দিকে যেসব মাযহাবের উৎপত্তি হয়েছিল সেগুলো এ যুগে বিকশিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে 'আব্বাসি খিলাফাতের সর্বত্র শিক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়।
বিভিন্ন মাযহাবের ফিক্হ বৃহৎ পরিসরে ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রথমবারের মতো সফলতার সাথে সংকলিত হয়।
ফিক্হ শাস্ত্র সুসংগঠিত হয়ে দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়: উসূল (মৌলিক নীতিমালা) ও ফুরু' (শাখা-প্রশাখা)। ইসলামি আইনের প্রধান উৎসগুলোকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ও শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
এ পর্যায়ের শেষের দিকে নাবি ﷺ-এর সব হাদীস সংগ্রহ করে গ্রন্থাকারে সংকলিত করা হয়।
এ যুগের প্রথমার্ধে মাযহাবগুলোর প্রতিষ্ঠাতা 'আলিমগণের মধ্যে ব্যাপক পারস্পরিক মতবিনিময় হতো। তবে, ছাত্রদের দ্বিতীয় প্রজন্মে এসে কঠোরতা ও গোঁড়ামির একটি প্রবণতা দেখা দেয়, যা ছিল পূর্ববর্তী মহান ইমাম ও বিশেষজ্ঞদের উদার মানসিকতার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00