📄 ‘আলিমদের পরবর্তী প্রজন্ম
মাযহাবগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের 'আলিমদের যুগে অর্থাৎ, ২৩৫-৩৩৮ হিজরিতে (৮৫০-৯৫০ সাল) ছাত্রদের দ্বিতীয় প্রজন্মে এসে ফিকহশাস্ত্রের ক্রমবিকাশ নিম্নোক্ত বিষয়গুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়:
১. ফিক্হ সংকলন
আইনগত সিদ্ধান্ত প্রদান ও মূলনীতি প্রণয়নের জন্য আগেকার বিশেষজ্ঞগণ হাদীস ও আসার (সাহাবিগণ ও তাঁদের ছাত্রদের কথা ও কাজ)-এর খোঁজে ইসলামি রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশে ভ্রমণের পেছনে প্রচুর সময় ও শ্রম দিয়েছেন। এ যুগে নাবি ﷺ-এর সুন্নাহ নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংগৃহীত হয়ে গিয়েছিল ও হাদীসগুলোকে গ্রন্থ আকারে সংকলন করা হয়েছিল। ফলে এ যুগের বিশেষজ্ঞগণ হাদীসের প্রয়োগ ও পূর্ণ অনুধাবনে মনোনিবেশ করার জন্য প্রচুর সময় পেয়েছেন।
এ যুগে ফিক্হশাস্ত্রও ব্যাপক হারে ও সুবিন্যস্তভাবে সংকলিত করা হয়েছে। কতিপয় বিশেষজ্ঞ আইনগত বিভিন্ন বিষয়ে নিজ মতামতগুলো লিপিবদ্ধ করেন। আবার কেউ কেউ ছাত্রদের সামনে বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধান আলোচনা করেছেন; পরবর্তীকালে ছাত্ররা তা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করেন। যেমন ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল-এর মাযহাব এভাবেই সংকলিত হয়েছে। ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা’ হলো হাদীস ও সাহাবিগণের মতামতগুলোর পাশাপাশি তাঁর নিজ অভিমত সম্বলিত একটি সংকলন। অন্যদিকে ইমাম শাফি’ঈ-র উম্মু শীর্ষক ফিক্হ গ্রন্থে বিভিন্ন বিষয়ে প্রমাণসহ তাঁর আইনি মতামত স্থান পেয়েছে।
২. সংকলনের ধরন
ক. প্রথম দিকের ফিক্হ গ্রন্থগুলো ছিল সাধারণত আইনি সিদ্ধান্ত, হাদীস, সাহাবিগণ ও তাঁদের ছাত্রদের মতামতগুলোর এক একটি সমন্বিত সংকলন। ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা’ এ শ্রেণির গ্রন্থের একটি উত্তম উদাহরণ।
খ. উসুল আল-ফিক্হ বা ফিক্হ শাস্ত্রের মৌলিক নীতিমালার উপরও বেশ কিছু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এসব গ্রন্থের প্রণেতাগণ শুধু তাঁদের নিজ সিদ্ধান্তের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্যই কেবল বিভিন্ন হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফের কিতাব আল-খারাজ ও ইমাম শাফি’ঈ-র কিতাব আল-উম্মু এ ধরনের গ্রন্থের উত্তম উদাহরণ।
গ. ফিকহের অন্যান্য গ্রন্থগুলোর মূল আলোচ্য বিষয় হলো ফিক্হ শাস্ত্রের মূলনীতিগুলোর প্রয়োগ। সেগুলোতে খুব অল্প সংখ্যক হাদীসের উদ্ধৃতি এসেছে। এসব গ্রন্থকে আলোচ্য বিষয়বস্তু অনুযায়ী বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানের(৮) ছয়টি গ্রন্থ ও ইমাম ইবন আল-কাসিমের(৯) আল-মুদাওয়ানাহ এ শ্রেণির গ্রন্থাবলির কিছু নমুনা।
প্রথম দিকে ফিকহের গ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ের প্রমাণ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাদীসগুলোকে সানাদ বা বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করা হতো। ক্রমেই বর্ণনাকারীদের ধারার উপর কম গুরুত্ব দেওয়ার একটা প্রবণতা সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞগণ হাদীসটি কেবল যে গ্রন্থে পাওয়া যাবে তার নাম উল্লেখ করতেন।
হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকা, মূল গ্রন্থের নাম উল্লেখ না করা এবং হাদীসের নির্ভরযোগ্যতা উল্লেখে অনীহা প্রভৃতি অপচর্চার ব্যাপকতার কারণে হাদীসের গুরুত্বকে মানুষ ভুলতে বসে। এমতাবস্থায় মাযহাবের মতামতই যেন প্রধান বিবেচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। এ প্রবণতার কারণে এক পর্যায়ে অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, স্বয়ং আল্লাহর রসূলের সুন্নাহর উপর মাযহাবগুলোর মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া শুরু হয়। এভাবেই সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামির সূচনা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে এই কঠোরতাই মাযহাবকেন্দ্রিক দলাদলির অন্যতম প্রধান কারণে পরিণত হয়। তবে এ যুগের শেষের দিকে কয়েকজন প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ হাদীসের উৎস ও বিশুদ্ধতা বর্ণনার রীতি পুনরায় চালু করে বিকৃত এ ধারাকে কিছুটা রোধ করেন।
২. দরবারি বিতর্ক
খলীফা ও রাজ দরবারের সভাসদদেরকে আনন্দ দেওয়ার জন্য এ যুগে দরবারি বিতর্কের আয়োজন করা হতো। কিছু স্বার্থান্বেষী 'আলিম, জাদুকর, গায়ক, নর্তকী ও ভাঁড়কে দরবারে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়।(১০) খলীফার সান্নিধ্য লাভ করার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত এই 'আলিমরা পরস্পরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত এবং কেবল বিতর্কের জন্য বিভিন্ন নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করত। ফলে ফিক্হ্ শাস্ত্র একটা নতুন মাত্রা পায়। যে ফিকহ্শাস্ত্র সহাবিগণ ও প্রথম যুগের বিশেষজ্ঞদের যুগে এক অনিন্দ্য সুন্দর পরিবেশে বিকশিত হয়েছিল, তা এই পর্যায়ে এসে এদের এসব অপকর্মের কারণে দরবারি বিতর্কের এক হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়।
কথিত এসব 'আলিমদের এই দরবারি বিতর্ক প্রতিযোগিতার মানসিকতা গোঁড়ামিরও জন্ম দেয়। কারণ, বিতর্কে হেরে যাওয়া ব্যক্তি কেবল খলীফার পক্ষ থেকে নির্ধারিত পুরস্কারই নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিগত সম্মানও হারাত। এমনকি ব্যক্তিগত সম্মানহানির মধ্য দিয়ে তাঁর মাযহাবেরও সুনামহানি ঘটত। সঠিক হোক বা ভুল হোক এই 'আলিমরা সর্বাবস্থায় নিজের মাযহাবের মতকে প্রতিষ্ঠা করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকত। ফলে, মাযহাবকেন্দ্রিক দলাদলি দরবারি 'আলিমদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
৩. হাদীস সংকলন
এ পর্যায়ে হাদীস সংকলন ও যাচাই-বাছাই করার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। শুধু মাযহাবি মতামতের উপর নির্ভর না করে একদল 'আলিম সুন্নাহর আলোকে ফিকহি সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করেন। অন্য কথায়, নিছক প্রখ্যাত কোনো 'আলিমের মত বলেই তা অন্ধভাবে অনুসরণ করতে হবে—এমন ভ্রান্ত চিন্তাধারা থেকে তাঁরা অনেকটা সরে আসেন। যথাসম্ভব হাদীসের উপর নির্ভর করার মাধ্যমে তাঁরা প্রথম যুগের মহান ইমামদের নমনীয়তার ধারাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। ফিকহি সমস্যা সমাধানে তাঁরা যথাসাধ্য বিশুদ্ধ হাদীসের উপর নির্ভর করতেন। ইমাম বুখারি (১৯৪-২৫৬ হিজরি) ও ইমাম মুসলিম (২০৪-২৬১ হিজরি) এর মতো প্রখ্যাত হাদীস বিশেষজ্ঞগণ সম্ভাব্য সকল উৎস থেকে নাবি -এর নির্ভরযোগ্য হাদীস ও সাহাবাগণের আসার সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে অনেক শ্রম ও সাধনা করেছেন। ফিক্হ গ্রন্থের বিষয় বিন্যাস অনুযায়ী তাঁরা হাদীস ও আসারগুলোকে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেন। হাদীস সংগ্রহ ও সংকলন করার এই ধারাটির উদ্যোক্তা ছিলেন ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল। তিনি আল মুসনাদ (১১) শিরোনামে হাদীসের সবচেয়ে বৃহৎ গ্রন্থটি সংকলন করেন। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম উভয়েই ছিলেন তাঁর ছাত্রদের অন্যতম।(১২)
৪. ফিক্হ বিন্যাস গ্রিস, রোম, পারস্য ও ভারতের (১০) বিজ্ঞান ও দর্শনবিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থগুলো আরবিতে অনুবাদের ফলে মুসলিম বিশেষজ্ঞগণ যুক্তি উপস্থাপন ও সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার নতুন নতুন পদ্ধতির ব্যাপারে জ্ঞান লাভ করেন। এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁরা ফিক্হশাস্ত্রকে মূলনীতি (উসুল) ও শাখা (ফুর')-এ দু'ভাগে বিন্যস্ত করেছিলেন। সময় পরিক্রমায় এর প্রভাবেই তাফসীর, হাদীস এবং নাহ্ও (ব্যাকরণ) প্রভৃতি বিষয়গুলো ইসলামি শিক্ষার এক একটি বিশেষ শাখায় উন্নীত হয়।
এ যুগে ফিক্হ শাস্ত্রের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞদের মতামতও সংকলন করা হয়। পাশাপাশি ইসলামি আইনের প্রাথমিক উৎসগুলো শনাক্ত করে সেগুলোকে গুরুত্বের ক্রমানুসারে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। (১৪)
টিকাঃ
(৬) মুহাম্মাদ ইব্ন আহমাদ ইব্ন রুশদ, বিদায়াহ আল-মুজতাহিদ, (মিশর, আল মাকতাবাহ আত-তিজারীয়াহ আল-কুবরা), খন্ড ১, পৃ. ৪০৫। আরও দেখুন, আস-সায়্যিদ সাবিক্, ফিক্ আস-সুন্নাহ, (বৈরুত, দার আল-কিতাব আল-'আরাবি), ৩য় সংস্করণ, ১৯৭৭, খন্ড ২, পৃ. ৩৭৮।
(৭) ইমাম আবু হানীফাহর প্রধান ছাত্র।
(৮) ইমাম আবু হানীফাহর প্রধান ছাত্রদের অন্যতম।
(৯) ইমাম মালিকের প্রধান ছাত্র।
(১০) হাসান ইবরাহীম হাসান, ইসলাম: এ রিলিজিয়াস, পলিটিকাল, সোশাল এন্ড ইকোনোমিক স্টাডি, (ইরাক: ইউনিভার্সিটি অব বাগদাদ, ১৯৬৭), পৃ. ৩৫৬-৩৭৮।
(১১) তাঁর এই হাদীসগ্রন্থে বর্ণনাকারী সহাবিদের নামের বর্ণমালাক্রম অনুযায়ী হাদীসগুলোকে সাজানো হয়েছে।
(১২) আল-মাদখাল, পৃ. ১৩৩।
(১৪) আল-মাদখাল, পৃ. ১২৮-১৩৪।
📄 ইসলামি আইনের উৎস
১. আল-কুর'আন কুর'আনই হলো ইসলামি আইনের সর্বপ্রধান উৎস। এর প্রতিটি আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং নির্ভুল। তবে, এর কিছু আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে 'আলিমদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে।
২. আস-সুন্নাহ গুরুত্বের দিক থেকে কুর'আনের পরের অবস্থানে রয়েছে নাবি -এর হাদীসগুলো। তবে, নাবি -এর বিশুদ্ধ হাদীস ছাড়াও দুর্বল ও হাদীস জালকারীদের রচিত বেশ কিছু বানোয়াট হাদীসও প্রচলিত আছে। তাই বিশেষজ্ঞগণ হাদীস গ্রহণ ও প্রয়োগের জন্য বিশুদ্ধতার মানদণ্ড হিসেবে কিছু শর্ত আরোপ করে দিয়েছেন।
৩. সহাবাগণের মতামত সহাবিদের ব্যক্তিগত মতামত ও ইজমা' হলো আইনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাঁদের মতগুলোকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়।
ক. কোনো বিষয়ে তাঁরা সকলে একমত পোষণ করলে তাকে ইজমা' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
খ. কোনো বিষয়ে তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলে প্রত্যেকটি মতকে বলা হয় রা'ই (রায়) বা ব্যক্তিগত মত।
৪. কিয়াস গুরুত্বের দিক থেকে এর পরের অবস্থানে রয়েছে কুর'আন-সুন্নাহতে প্রাপ্ত প্রমাণভিত্তিক ইজতিহাদ বা কিয়াস। কিয়াস হলো সাদৃশ্যপূর্ণ অবস্থার ভিত্তিতে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার একটি পদ্ধতি। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কিয়াসের মাধ্যমেই 'আলিমগণ গাঁজা সেবনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। নাবি নেশাজাতীয় দ্রব্যের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলেছেন:
"প্রত্যেক নেশাজাতীয় দ্রব্য খাম্; আর প্রত্যেক খাম্রই হারাম।"(১৫
গাঁজার মধ্যে নেশাজাতীয় প্রভাব রয়েছে। তাই এটিও খাম্ শ্রেণিভুক্ত এবং হারাম।
৫. ইসতিহসান (আইনগত প্রাধান্য) এই নীতির ভিত্তিতে পারিপার্শ্বিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনো মতকে কিয়াসের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিভিন্ন নামে হলেও এ নীতিটি বেশিরভাগ মাযহাবের বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণ ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বস্তু উৎপাদন ও বিক্রিসংক্রান্ত চুক্তিতে ইসতিহসান-এর প্রয়োগ দেখা যায়। নাবি -এর বক্তব্য, "দখলে আসার আগ পর্যন্ত খাদ্য দ্রব্য বিক্রি করা কারও উচিত নয়।” (১৬) -অনুযায়ী কিয়াস করলে পাওয়া যায়: দখলে আনার আগে কোনো পণ্য বিক্রি করা যাবে না, কারণ এক্ষেত্রে চুক্তির সময় পণ্যটির কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তবে, এ ধরনের চুক্তি ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং এর প্রয়োজনীয়তাও একেবারে স্পষ্ট। তাই কিয়াসের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ইসতিহসান-এর নীতি অনুযায়ী এ ধরনের চুক্তিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
৬. 'উফ (প্রথা) ইসলামের কোনো মূলনীতি বা বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না-হলে স্থানীয় প্রথাগুলো ঐ অঞ্চলের আইনের একটি উৎস হিসেবে গণ্য হতে পারে। দেনমোহর পরিশোধের ব্যাপারে বিয়ের স্থানীয় প্রথা হলো এর একটি উত্তম উদাহরণ। ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিবাহের একটি অংশ হলো পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে দেনমোহর নির্ধারণ করা। তবে, দেনমোহর পরিশোধের ব্যাপারে ইসলাম কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেধে দেয়নি। মিশর ও অন্যান্য কিছু এলাকার প্রথা অনুযায়ী মুকাদ্দাম নামে দেনমোহরের একটি অংশ বিবাহ অনুষ্ঠানের আগেই পরিশোধ করতে হয়, আর মু'আখখার নামক বাকি অংশ কেবল মৃত্যু কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদের সময় পরিশোধ করা হয়। (১৭)
‘উরফ-এর আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো ক্রয়-বিক্রয় বা ভাড়াসংক্রান্ত প্রথাগুলো।
ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিক্রীত পণ্য পুরোপুরি হস্তান্তর করা না হলে মূল্য পরিশোধ জরুরি নয়। তবে, অনেক অঞ্চলে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই ভাড়াকৃত স্থান বা বস্তুটির অগ্রিম ভাড়া পরিশোধ করতে হয়।
ইসলামি আইনের উৎসগুলোর এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাস করার উদ্দেশ্য ছিল ইতিবাচক উন্নয়ন সাধন। তবে দলাদলির চলমান ধারার সাথে মিলিত হয়ে এই শ্রেণিবিন্যাস মাযহাবগুলোর পারস্পরিক ব্যবধানকে আরও বৃদ্ধি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে একই নীতিকে ভিন্ন ভিন্ন নাম দেওয়ায় তা বরং মতপার্থক্যের উৎসে পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মালিকি মাযহাবের ‘আলিমগণ হানাফি মাযহাবের ইসতিহসান নীতিকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিলেও মাসালিহ মুরসালাহ শিরোনামে তাঁরা সেই একই নীতি প্রয়োগ করেছেন। অন্যদিকে শাফি’ই মাযহাব উভয় পরিভাষাকে প্রত্যাখ্যান করে একই নীতি প্রয়োগ করার জন্য ইসতিসহাব পরিভাষাটি ব্যবহার করেছে।
টিকাঃ
(১৩) এ যুগের প্রথমার্ধেই (১৩২-২১৫ হিজরি) অধিকাংশ অনুবাদ সম্পন্ন হয়, তবে তার প্রভাব প্রকটভাবে অনুভূত হয় এ যুগের শেষার্ধে।
(১৫) মুসলিম, খন্ড ৩, পৃ. ১১০৮, হাদীস নং ৪৯৬৩ এবং সুনান আবি দাউদ, খন্ড ৩, পৃ. ১০৪৩, হাদীস নং ৩৬৭২।
(১৬) ইবন 'উমার থেকে বর্ণিত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম মালিক। আল-মুয়াত্তা' ইমাম মালিক, পৃ. ২৯৬, হাদীস নং ১৩২৪।
(১৭) মুহাম্মাদ মুস্তাফা শালাবি, উসুল আল-ফিক্হ আল-ইসলামি, (বৈরুত, লেবানন: দাঁর আন-নাহদাহ আল-'আরাবিয়াহ), দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৭৮, খন্ড ১, পৃ. ৩১৪।
📄 অধ্যায় সারাংশ
এ যুগে ফিক্হশাস্ত্র ইসলামি জ্ঞানের একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে বিকাশ লাভ করে।
উমাইয়া শাসনামলের শেষের দিকে যেসব মাযহাবের উৎপত্তি হয়েছিল সেগুলো এ যুগে বিকশিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে 'আব্বাসি খিলাফাতের সর্বত্র শিক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়।
বিভিন্ন মাযহাবের ফিক্হ বৃহৎ পরিসরে ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রথমবারের মতো সফলতার সাথে সংকলিত হয়।
ফিক্হ শাস্ত্র সুসংগঠিত হয়ে দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়: উসূল (মৌলিক নীতিমালা) ও ফুরু' (শাখা-প্রশাখা)। ইসলামি আইনের প্রধান উৎসগুলোকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ও শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
এ পর্যায়ের শেষের দিকে নাবি ﷺ-এর সব হাদীস সংগ্রহ করে গ্রন্থাকারে সংকলিত করা হয়।
এ যুগের প্রথমার্ধে মাযহাবগুলোর প্রতিষ্ঠাতা 'আলিমগণের মধ্যে ব্যাপক পারস্পরিক মতবিনিময় হতো। তবে, ছাত্রদের দ্বিতীয় প্রজন্মে এসে কঠোরতা ও গোঁড়ামির একটি প্রবণতা দেখা দেয়, যা ছিল পূর্ববর্তী মহান ইমাম ও বিশেষজ্ঞদের উদার মানসিকতার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।