📄 ফিক্হশাস্ত্রের ক্রমবিকাশ
ফিশাস্ত্রের ক্রমবিকাশের এ যুগে মাযহাবগুলোর বিবর্তনে দুটি প্রধান ধারা পরিলক্ষিত হয়। প্রথম ধারাটি দেখা যায় প্রধান মাযহাবগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যক্তি বিখ্যাত ইমাম ও তাঁদের বিশিষ্ট ছাত্রদের যুগে। যদিও এ মাযহাবগুলো খুব দ্রুত স্বতন্ত্র রূপ লাভ করছিল, কিন্তু সিদ্ধান্ত প্রদান ও মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা প্রথম যুগের পরমতসহিষুতার ধারা বজায় রাখতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয় ধারাটি পরিলক্ষিত হয় মাযহাবগুলোর বিশিষ্ট ইমাম ও 'আলিমদের ইন্তেকালের পর। তখন থেকেই ফিকহি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রদান করার ক্ষেত্রে কঠোরতার সূচনা হয়। এটি পরবর্তী প্রজন্মের ফিকহশাস্ত্র ও মাযহাবগুলোর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
📄 মহান ইমামিদের যুগ
মহান ইমাম ও তাদের প্রধান ছাত্রদের যুগে অর্থাৎ আনুমানিক হিজরি ১৩২-২৩৫ সালে (৭৫০-৮৫০ সাল) নিমোক্ত বিষয়গুলো ফিশাস্ত্রের ক্রমবিকাশকে প্রভাবিত করে।
১. বিশেষজ্ঞদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সমর্থন
প্রথম দিককার 'আব্বাসি খলীফাগণ ইসলামি আইন ও এর বিশেষজ্ঞদের প্রতি খুবই সম্মান প্রদর্শন করতেন। কারণ শারী'আহ ও এর সঠিক ব্যাখ্যাভিত্তিক খিলাফাতের দিকে ফিরে যাবেন-এমন একটি দাবি নিয়েই তারা ক্ষমতায় এসেছিলেন। ফলে এ যুগের 'আব্বাসি খলীফাগণের প্রায় প্রত্যেকেই জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে নিজ সন্তানদের তৎকালীন প্রধান 'আলিমদের কাছে পাঠিয়ে গর্ববোধ করতেন। এমনকি কতিপয় খলীফা নিজেরাও ইসলামি আইনের বিশেষজ্ঞে পরিণত হয়েছিলেন, যেমন খলীফা হারুন আর-রাশীদ, যার শাসনকাল হলো ১৭০ হিজরি (৭৮৬ সাল) থেকে ১৯৩ হিজরি (৮০৯ সাল) পর্যন্ত। তাছাড়া, তখন খলীফাগণ পুনরায় ফিকহি বিধিবিধানের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ফাকীহদের সাথে পরামর্শ করার রীতি চালু করেন। উদাহরণস্বরূপ, ইমাম মালিককে নাবি -এর সুন্নাহর উপর একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন খলীফা আল-মানসুর। রচনা সম্পন্ন হওয়ার পর খলীফা গ্রন্থটিকে রাষ্ট্রের সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করার জন্য ইমাম মালিকের সাথে পরামর্শ করেন। এমনটি করা হলে ইমাম মালিকের মাযহাব গোটা মুসলিম জাতির উপর বাধ্যতামূলক হয়ে যেত। কিন্তু ইমাম মালিক এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। কারণ, তিনি জানতেন যে তার সংকলনে কেবল তাঁর জন্মভূমি ও নিজ মাযহাবের বিকাশকেন্দ্র হিজায অঞ্চলে প্রাপ্ত নাবি -এর সুন্নাহগুলোই স্থান পেয়েছে। তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কোনো একক মাযহাব গোটা মুসলিম জাতির উপর বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত নয়। কারণ, যেকোনো একক মাযহাবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া সহাবিদের মাধ্যমে বর্ণিত অনেক হাদীসই বাদ পড়ে যাবে। নিঃসন্দেহে এ মনোভাব মহান ইমামদের দূরদৃষ্টি ও উদারতার সুস্পষ্ট উদাহরণ। ফিকহশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করায় এসময় অনেক মাযহাব বিকশিত হয়। এই মাযহাবগুলোর উন্মেষ ঘটেছিল মূলত উমাইয়া যুগের শেষের দিকে।
উল্লেখ্য যে, বিশেষজ্ঞ ও বিচারকদের মত প্রকাশের বিপুল স্বাধীনতা দেওয়া হলেও সরকারি সিদ্ধান্তের বিপরীত মত দেওয়ার কারণে তাদের প্রায়ই কঠোর শাস্তি পেতে হতো। উদাহরণস্বরূপ, 'আব্বাসি খলীফার একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফাতওয়া দেওয়ার কারণে ইমাম মালিককে কারারুদ্ধ করে নির্যাতন করা হয়। খলীফার প্রণীত সেই নীতি অনুযায়ী লোকদের এই মর্মে শপথ বাক্য পাঠ করানো হতো যে, খলীফার প্রতি আনুগত্যের শপথ ভঙ্গ করলেই স্ত্রীদের সাথে তাদের তুলাক হয়ে যাবে। কিন্তু ইমাম মালিক ফাতওয়া দিয়েছিলেন যে, ইসলামি বিধান অনুযায়ী তুলার্কের ব্যাপারে এধরনের আইনের কোনো কার্যকারিতা নেই।
২. শিক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি এ পর্যায়ে উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের রাষ্ট্রগুলো 'আব্বাসি সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে 'আব্বাসি রাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারিত হয়ে সমগ্র পারস্য, ভারত ও দক্ষিণ রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল। যদিও রাজধানীকে আর কখনোই বাগদাদে ফিরিয়ে আনা হয়নি। ফলে, শিক্ষাকেন্দ্র ও মাযহাবের সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
ইসলামি রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকা সমকালীন বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণ আইনের বিভিন্ন বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্তে উপনীত হতেন তা জানার জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীগণ তাদের কাছে এসে জড়ো হতেন। এর একটি উত্তম উদাহরণ হলো, জ্ঞানার্জনের জন্য ইমাম আবু হানীফাহর প্রখ্যাত ছাত্র মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানের পরিভ্রমণ। ইমাম মালিক এর অধীনে অধ্যয়ন ও তাঁর হাদীসগ্রন্থ আল-মুয়াত্তা’ মুখস্থ করার লক্ষ্যে তিনি ইরাক থেকে মাদীনায় গমন করেন। অনুরূপভাবে, ইমাম শাফি’ই ইমাম মালিকের অধীনে অধ্যয়নের জন্য প্রথমে হিজায যান। তারপর মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানের অধীনে অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে তিনি ইরাক যান। সর্বশেষ লায়সি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম লাইস ইবন সা’দ এর অধীনে অধ্যয়ন করার জন্য তিনি মিশর সফর করেন। এসব ভ্রমণের ফলস্বরূপ ‘আলিমগণের কিছু মতপার্থক্যের নিষ্পত্তি হয় এবং পরিশেষে বিভিন্ন মাযহাবের মতপার্থক্যপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে ঐক্যের একটি ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইমাম শাফি’ই ইরাক ও মিশরের ফিক্হের সাথে হিজাযের ফিক্হের সমন্বয় সাধন করে একটি নতুন ধারা সূচনা করেন। এ থেকে প্রথম যুগের ইমামদের মধ্যে সত্যের অন্বেষণে নিজের মত পরিত্যাগের উদার মানসিকতার সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।
৩. মত বিনিময় ও আলোচনার বিস্তৃতি বিশেষজ্ঞ ‘আলিম অথবা তাদের শিষ্যদের পরস্পরের সাথে সাক্ষাৎ হলেই তাঁরা তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে মত বিনিময় করতেন। কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দিলে তাঁরা সাধারণত দুটি উপায়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করতেন: ক. আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মতৈক্যে উপনীত হওয়া। খ. বিশুদ্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে প্রাপ্ত ভিন্ন ভিন্ন সমাধান গ্রহণ করা।
আইনগত বিষয়ে এসব মত বিনিময় অনেক সময় চিঠিপত্রের মাধ্যমেও চলত। দৃষ্টান্তস্বরূপ ইমাম মালিক মাদীনার প্রথাকে ইসলামি আইনের একটি উৎস হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু ইমাম লাইস ইবন সা'দ তার সাথে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন এবং চিঠিপত্রের মাধ্যমে ইমাম মালিকের সাথে এ বিষয়ে মত বিনিময় করেছিলেন।
এ সময় বিভিন্ন মাযহাবের ইমাম ও তাঁদের ছাত্রদের মধ্যে চিঠিপত্রের মাধ্যমে বা মুখোমুখি মত বিনিময়ের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইসলামি আইনের ব্যাখ্যা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং কিছু ভুল সিদ্ধান্তকে ফাকীহগণ সংশোধন করে নেন।
মাযহাবগুলোর ক্রমবিকাশের এই প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ইমামগণ ও তাঁদের ছাত্রদের মধ্যে কঠোরতা ও গোঁড়ামির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। অর্থাৎ, যে কোনো সমস্যাকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করে প্রাপ্ত প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া হতো। ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম শাফি'ই এ ব্যাপারে বলেছেন যে, কোনো হাদীস বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে তা-ই তাঁদের মাযহাব হিসেবে বিবেচিত হবে। মদ ও অন্যান্য নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবনের উপর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত বিধানটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।
ইমাম আবু হানীফাহ রায় দিয়েছিলেন যে, মদের উপর নিষেধাজ্ঞা কেবল গাঁজানো আঙুরের রস (খাম্র-এর আক্ষরিক অর্থ) থেকে তৈরি মদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এছাড়া অন্য কোনো নেশাজাতীয় দ্রব্যের উপর এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ ইমাম আবু হানীফাহ এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আঙুর ব্যতীত অন্যান্য উপাদান থেকে প্রস্তুতকৃত মদ খাওয়া অনুমোদিত, কেবল যদি তা সেবনে পানকারী মাতাল না হয়। তবে তাঁর প্রধান তিন ছাত্র (আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসান ও যুফার) পরবর্তীকালে তাদের শিক্ষকের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। কারণ তাঁরা এ ব্যাপারে নাবি ﷺ-এর একটি নির্ভরযোগ্য হাদীস জানতে পেরেছিলেন; যেখানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, খাম্র-এর অর্থের মধ্যে সব ধরনের নেশা জাতীয় দ্রব্য অন্তর্ভুক্ত হবে।
এরকম স্বাধীন মতবিনিময় ও মাযহাব প্রতিষ্ঠাতা ইমামদের মতের বিপরীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে গোঁড়ামি ও দলাদলির অনুপস্থিতি পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। অথচ পরবর্তী যুগে কঠোরতা ও গোঁড়ামি মারাত্মক আকার ধারণ করে।
টিকাঃ
(৩) মুহাম্মাদ রহীমুদ্দীন, আল-মুয়াত্তা' ইমাম মালিক এর অনুবাদ, (নয়া দিল্লি: কিতাব ভবন, প্রথম সংস্করণ, ১৯৮১), মুখবন্ধ পৃ. ৫।
(৪) ‘আব্দুর-রহমান ইবন মু’আওউইয়াহ নামক এক উমাইয়া রাজপুত্র ‘আব্বাসিদের হাত থেকে কোনোক্রমে বেঁচে স্পেনে পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়। সেখানে সে ১৩৮ হিজরিতে (৭৫৬ সাল) কর্ডোভাতে উমাইয়া রাজত্বের ভিত্তি স্থাপন করে।
(৫) ইমাম মালিক মাদীনাবাসীর মতামতকে ইসলামি আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করলে ইমাম লাইস তাতে আপত্তি করেন।
📄 ‘আলিমদের পরবর্তী প্রজন্ম
মাযহাবগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের 'আলিমদের যুগে অর্থাৎ, ২৩৫-৩৩৮ হিজরিতে (৮৫০-৯৫০ সাল) ছাত্রদের দ্বিতীয় প্রজন্মে এসে ফিকহশাস্ত্রের ক্রমবিকাশ নিম্নোক্ত বিষয়গুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়:
১. ফিক্হ সংকলন
আইনগত সিদ্ধান্ত প্রদান ও মূলনীতি প্রণয়নের জন্য আগেকার বিশেষজ্ঞগণ হাদীস ও আসার (সাহাবিগণ ও তাঁদের ছাত্রদের কথা ও কাজ)-এর খোঁজে ইসলামি রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশে ভ্রমণের পেছনে প্রচুর সময় ও শ্রম দিয়েছেন। এ যুগে নাবি ﷺ-এর সুন্নাহ নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংগৃহীত হয়ে গিয়েছিল ও হাদীসগুলোকে গ্রন্থ আকারে সংকলন করা হয়েছিল। ফলে এ যুগের বিশেষজ্ঞগণ হাদীসের প্রয়োগ ও পূর্ণ অনুধাবনে মনোনিবেশ করার জন্য প্রচুর সময় পেয়েছেন।
এ যুগে ফিক্হশাস্ত্রও ব্যাপক হারে ও সুবিন্যস্তভাবে সংকলিত করা হয়েছে। কতিপয় বিশেষজ্ঞ আইনগত বিভিন্ন বিষয়ে নিজ মতামতগুলো লিপিবদ্ধ করেন। আবার কেউ কেউ ছাত্রদের সামনে বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধান আলোচনা করেছেন; পরবর্তীকালে ছাত্ররা তা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করেন। যেমন ইমাম আবু হানীফাহ ও ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল-এর মাযহাব এভাবেই সংকলিত হয়েছে। ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা’ হলো হাদীস ও সাহাবিগণের মতামতগুলোর পাশাপাশি তাঁর নিজ অভিমত সম্বলিত একটি সংকলন। অন্যদিকে ইমাম শাফি’ঈ-র উম্মু শীর্ষক ফিক্হ গ্রন্থে বিভিন্ন বিষয়ে প্রমাণসহ তাঁর আইনি মতামত স্থান পেয়েছে।
২. সংকলনের ধরন
ক. প্রথম দিকের ফিক্হ গ্রন্থগুলো ছিল সাধারণত আইনি সিদ্ধান্ত, হাদীস, সাহাবিগণ ও তাঁদের ছাত্রদের মতামতগুলোর এক একটি সমন্বিত সংকলন। ইমাম মালিকের আল-মুয়াত্তা’ এ শ্রেণির গ্রন্থের একটি উত্তম উদাহরণ।
খ. উসুল আল-ফিক্হ বা ফিক্হ শাস্ত্রের মৌলিক নীতিমালার উপরও বেশ কিছু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এসব গ্রন্থের প্রণেতাগণ শুধু তাঁদের নিজ সিদ্ধান্তের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্যই কেবল বিভিন্ন হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফের কিতাব আল-খারাজ ও ইমাম শাফি’ঈ-র কিতাব আল-উম্মু এ ধরনের গ্রন্থের উত্তম উদাহরণ।
গ. ফিকহের অন্যান্য গ্রন্থগুলোর মূল আলোচ্য বিষয় হলো ফিক্হ শাস্ত্রের মূলনীতিগুলোর প্রয়োগ। সেগুলোতে খুব অল্প সংখ্যক হাদীসের উদ্ধৃতি এসেছে। এসব গ্রন্থকে আলোচ্য বিষয়বস্তু অনুযায়ী বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আল-হাসানের(৮) ছয়টি গ্রন্থ ও ইমাম ইবন আল-কাসিমের(৯) আল-মুদাওয়ানাহ এ শ্রেণির গ্রন্থাবলির কিছু নমুনা।
প্রথম দিকে ফিকহের গ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ের প্রমাণ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাদীসগুলোকে সানাদ বা বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করা হতো। ক্রমেই বর্ণনাকারীদের ধারার উপর কম গুরুত্ব দেওয়ার একটা প্রবণতা সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞগণ হাদীসটি কেবল যে গ্রন্থে পাওয়া যাবে তার নাম উল্লেখ করতেন।
হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকা, মূল গ্রন্থের নাম উল্লেখ না করা এবং হাদীসের নির্ভরযোগ্যতা উল্লেখে অনীহা প্রভৃতি অপচর্চার ব্যাপকতার কারণে হাদীসের গুরুত্বকে মানুষ ভুলতে বসে। এমতাবস্থায় মাযহাবের মতামতই যেন প্রধান বিবেচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। এ প্রবণতার কারণে এক পর্যায়ে অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, স্বয়ং আল্লাহর রসূলের সুন্নাহর উপর মাযহাবগুলোর মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া শুরু হয়। এভাবেই সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামির সূচনা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে এই কঠোরতাই মাযহাবকেন্দ্রিক দলাদলির অন্যতম প্রধান কারণে পরিণত হয়। তবে এ যুগের শেষের দিকে কয়েকজন প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ হাদীসের উৎস ও বিশুদ্ধতা বর্ণনার রীতি পুনরায় চালু করে বিকৃত এ ধারাকে কিছুটা রোধ করেন।
২. দরবারি বিতর্ক
খলীফা ও রাজ দরবারের সভাসদদেরকে আনন্দ দেওয়ার জন্য এ যুগে দরবারি বিতর্কের আয়োজন করা হতো। কিছু স্বার্থান্বেষী 'আলিম, জাদুকর, গায়ক, নর্তকী ও ভাঁড়কে দরবারে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়।(১০) খলীফার সান্নিধ্য লাভ করার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত এই 'আলিমরা পরস্পরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত এবং কেবল বিতর্কের জন্য বিভিন্ন নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করত। ফলে ফিক্হ্ শাস্ত্র একটা নতুন মাত্রা পায়। যে ফিকহ্শাস্ত্র সহাবিগণ ও প্রথম যুগের বিশেষজ্ঞদের যুগে এক অনিন্দ্য সুন্দর পরিবেশে বিকশিত হয়েছিল, তা এই পর্যায়ে এসে এদের এসব অপকর্মের কারণে দরবারি বিতর্কের এক হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়।
কথিত এসব 'আলিমদের এই দরবারি বিতর্ক প্রতিযোগিতার মানসিকতা গোঁড়ামিরও জন্ম দেয়। কারণ, বিতর্কে হেরে যাওয়া ব্যক্তি কেবল খলীফার পক্ষ থেকে নির্ধারিত পুরস্কারই নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিগত সম্মানও হারাত। এমনকি ব্যক্তিগত সম্মানহানির মধ্য দিয়ে তাঁর মাযহাবেরও সুনামহানি ঘটত। সঠিক হোক বা ভুল হোক এই 'আলিমরা সর্বাবস্থায় নিজের মাযহাবের মতকে প্রতিষ্ঠা করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকত। ফলে, মাযহাবকেন্দ্রিক দলাদলি দরবারি 'আলিমদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
৩. হাদীস সংকলন
এ পর্যায়ে হাদীস সংকলন ও যাচাই-বাছাই করার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। শুধু মাযহাবি মতামতের উপর নির্ভর না করে একদল 'আলিম সুন্নাহর আলোকে ফিকহি সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করেন। অন্য কথায়, নিছক প্রখ্যাত কোনো 'আলিমের মত বলেই তা অন্ধভাবে অনুসরণ করতে হবে—এমন ভ্রান্ত চিন্তাধারা থেকে তাঁরা অনেকটা সরে আসেন। যথাসম্ভব হাদীসের উপর নির্ভর করার মাধ্যমে তাঁরা প্রথম যুগের মহান ইমামদের নমনীয়তার ধারাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। ফিকহি সমস্যা সমাধানে তাঁরা যথাসাধ্য বিশুদ্ধ হাদীসের উপর নির্ভর করতেন। ইমাম বুখারি (১৯৪-২৫৬ হিজরি) ও ইমাম মুসলিম (২০৪-২৬১ হিজরি) এর মতো প্রখ্যাত হাদীস বিশেষজ্ঞগণ সম্ভাব্য সকল উৎস থেকে নাবি -এর নির্ভরযোগ্য হাদীস ও সাহাবাগণের আসার সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে অনেক শ্রম ও সাধনা করেছেন। ফিক্হ গ্রন্থের বিষয় বিন্যাস অনুযায়ী তাঁরা হাদীস ও আসারগুলোকে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেন। হাদীস সংগ্রহ ও সংকলন করার এই ধারাটির উদ্যোক্তা ছিলেন ইমাম আহমাদ ইবন হানবাল। তিনি আল মুসনাদ (১১) শিরোনামে হাদীসের সবচেয়ে বৃহৎ গ্রন্থটি সংকলন করেন। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম উভয়েই ছিলেন তাঁর ছাত্রদের অন্যতম।(১২)
৪. ফিক্হ বিন্যাস গ্রিস, রোম, পারস্য ও ভারতের (১০) বিজ্ঞান ও দর্শনবিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থগুলো আরবিতে অনুবাদের ফলে মুসলিম বিশেষজ্ঞগণ যুক্তি উপস্থাপন ও সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার নতুন নতুন পদ্ধতির ব্যাপারে জ্ঞান লাভ করেন। এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁরা ফিক্হশাস্ত্রকে মূলনীতি (উসুল) ও শাখা (ফুর')-এ দু'ভাগে বিন্যস্ত করেছিলেন। সময় পরিক্রমায় এর প্রভাবেই তাফসীর, হাদীস এবং নাহ্ও (ব্যাকরণ) প্রভৃতি বিষয়গুলো ইসলামি শিক্ষার এক একটি বিশেষ শাখায় উন্নীত হয়।
এ যুগে ফিক্হ শাস্ত্রের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞদের মতামতও সংকলন করা হয়। পাশাপাশি ইসলামি আইনের প্রাথমিক উৎসগুলো শনাক্ত করে সেগুলোকে গুরুত্বের ক্রমানুসারে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। (১৪)
টিকাঃ
(৬) মুহাম্মাদ ইব্ন আহমাদ ইব্ন রুশদ, বিদায়াহ আল-মুজতাহিদ, (মিশর, আল মাকতাবাহ আত-তিজারীয়াহ আল-কুবরা), খন্ড ১, পৃ. ৪০৫। আরও দেখুন, আস-সায়্যিদ সাবিক্, ফিক্ আস-সুন্নাহ, (বৈরুত, দার আল-কিতাব আল-'আরাবি), ৩য় সংস্করণ, ১৯৭৭, খন্ড ২, পৃ. ৩৭৮।
(৭) ইমাম আবু হানীফাহর প্রধান ছাত্র।
(৮) ইমাম আবু হানীফাহর প্রধান ছাত্রদের অন্যতম।
(৯) ইমাম মালিকের প্রধান ছাত্র।
(১০) হাসান ইবরাহীম হাসান, ইসলাম: এ রিলিজিয়াস, পলিটিকাল, সোশাল এন্ড ইকোনোমিক স্টাডি, (ইরাক: ইউনিভার্সিটি অব বাগদাদ, ১৯৬৭), পৃ. ৩৫৬-৩৭৮।
(১১) তাঁর এই হাদীসগ্রন্থে বর্ণনাকারী সহাবিদের নামের বর্ণমালাক্রম অনুযায়ী হাদীসগুলোকে সাজানো হয়েছে।
(১২) আল-মাদখাল, পৃ. ১৩৩।
(১৪) আল-মাদখাল, পৃ. ১২৮-১৩৪।
📄 ইসলামি আইনের উৎস
১. আল-কুর'আন কুর'আনই হলো ইসলামি আইনের সর্বপ্রধান উৎস। এর প্রতিটি আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং নির্ভুল। তবে, এর কিছু আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে 'আলিমদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে।
২. আস-সুন্নাহ গুরুত্বের দিক থেকে কুর'আনের পরের অবস্থানে রয়েছে নাবি -এর হাদীসগুলো। তবে, নাবি -এর বিশুদ্ধ হাদীস ছাড়াও দুর্বল ও হাদীস জালকারীদের রচিত বেশ কিছু বানোয়াট হাদীসও প্রচলিত আছে। তাই বিশেষজ্ঞগণ হাদীস গ্রহণ ও প্রয়োগের জন্য বিশুদ্ধতার মানদণ্ড হিসেবে কিছু শর্ত আরোপ করে দিয়েছেন।
৩. সহাবাগণের মতামত সহাবিদের ব্যক্তিগত মতামত ও ইজমা' হলো আইনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাঁদের মতগুলোকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়।
ক. কোনো বিষয়ে তাঁরা সকলে একমত পোষণ করলে তাকে ইজমা' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
খ. কোনো বিষয়ে তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলে প্রত্যেকটি মতকে বলা হয় রা'ই (রায়) বা ব্যক্তিগত মত।
৪. কিয়াস গুরুত্বের দিক থেকে এর পরের অবস্থানে রয়েছে কুর'আন-সুন্নাহতে প্রাপ্ত প্রমাণভিত্তিক ইজতিহাদ বা কিয়াস। কিয়াস হলো সাদৃশ্যপূর্ণ অবস্থার ভিত্তিতে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার একটি পদ্ধতি। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কিয়াসের মাধ্যমেই 'আলিমগণ গাঁজা সেবনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। নাবি নেশাজাতীয় দ্রব্যের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলেছেন:
"প্রত্যেক নেশাজাতীয় দ্রব্য খাম্; আর প্রত্যেক খাম্রই হারাম।"(১৫
গাঁজার মধ্যে নেশাজাতীয় প্রভাব রয়েছে। তাই এটিও খাম্ শ্রেণিভুক্ত এবং হারাম।
৫. ইসতিহসান (আইনগত প্রাধান্য) এই নীতির ভিত্তিতে পারিপার্শ্বিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনো মতকে কিয়াসের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিভিন্ন নামে হলেও এ নীতিটি বেশিরভাগ মাযহাবের বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণ ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বস্তু উৎপাদন ও বিক্রিসংক্রান্ত চুক্তিতে ইসতিহসান-এর প্রয়োগ দেখা যায়। নাবি -এর বক্তব্য, "দখলে আসার আগ পর্যন্ত খাদ্য দ্রব্য বিক্রি করা কারও উচিত নয়।” (১৬) -অনুযায়ী কিয়াস করলে পাওয়া যায়: দখলে আনার আগে কোনো পণ্য বিক্রি করা যাবে না, কারণ এক্ষেত্রে চুক্তির সময় পণ্যটির কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তবে, এ ধরনের চুক্তি ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং এর প্রয়োজনীয়তাও একেবারে স্পষ্ট। তাই কিয়াসের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ইসতিহসান-এর নীতি অনুযায়ী এ ধরনের চুক্তিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
৬. 'উফ (প্রথা) ইসলামের কোনো মূলনীতি বা বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না-হলে স্থানীয় প্রথাগুলো ঐ অঞ্চলের আইনের একটি উৎস হিসেবে গণ্য হতে পারে। দেনমোহর পরিশোধের ব্যাপারে বিয়ের স্থানীয় প্রথা হলো এর একটি উত্তম উদাহরণ। ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিবাহের একটি অংশ হলো পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে দেনমোহর নির্ধারণ করা। তবে, দেনমোহর পরিশোধের ব্যাপারে ইসলাম কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেধে দেয়নি। মিশর ও অন্যান্য কিছু এলাকার প্রথা অনুযায়ী মুকাদ্দাম নামে দেনমোহরের একটি অংশ বিবাহ অনুষ্ঠানের আগেই পরিশোধ করতে হয়, আর মু'আখখার নামক বাকি অংশ কেবল মৃত্যু কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদের সময় পরিশোধ করা হয়। (১৭)
‘উরফ-এর আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো ক্রয়-বিক্রয় বা ভাড়াসংক্রান্ত প্রথাগুলো।
ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিক্রীত পণ্য পুরোপুরি হস্তান্তর করা না হলে মূল্য পরিশোধ জরুরি নয়। তবে, অনেক অঞ্চলে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই ভাড়াকৃত স্থান বা বস্তুটির অগ্রিম ভাড়া পরিশোধ করতে হয়।
ইসলামি আইনের উৎসগুলোর এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাস করার উদ্দেশ্য ছিল ইতিবাচক উন্নয়ন সাধন। তবে দলাদলির চলমান ধারার সাথে মিলিত হয়ে এই শ্রেণিবিন্যাস মাযহাবগুলোর পারস্পরিক ব্যবধানকে আরও বৃদ্ধি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে একই নীতিকে ভিন্ন ভিন্ন নাম দেওয়ায় তা বরং মতপার্থক্যের উৎসে পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মালিকি মাযহাবের ‘আলিমগণ হানাফি মাযহাবের ইসতিহসান নীতিকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিলেও মাসালিহ মুরসালাহ শিরোনামে তাঁরা সেই একই নীতি প্রয়োগ করেছেন। অন্যদিকে শাফি’ই মাযহাব উভয় পরিভাষাকে প্রত্যাখ্যান করে একই নীতি প্রয়োগ করার জন্য ইসতিসহাব পরিভাষাটি ব্যবহার করেছে।
টিকাঃ
(১৩) এ যুগের প্রথমার্ধেই (১৩২-২১৫ হিজরি) অধিকাংশ অনুবাদ সম্পন্ন হয়, তবে তার প্রভাব প্রকটভাবে অনুভূত হয় এ যুগের শেষার্ধে।
(১৫) মুসলিম, খন্ড ৩, পৃ. ১১০৮, হাদীস নং ৪৯৬৩ এবং সুনান আবি দাউদ, খন্ড ৩, পৃ. ১০৪৩, হাদীস নং ৩৬৭২।
(১৬) ইবন 'উমার থেকে বর্ণিত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম মালিক। আল-মুয়াত্তা' ইমাম মালিক, পৃ. ২৯৬, হাদীস নং ১৩২৪।
(১৭) মুহাম্মাদ মুস্তাফা শালাবি, উসুল আল-ফিক্হ আল-ইসলামি, (বৈরুত, লেবানন: দাঁর আন-নাহদাহ আল-'আরাবিয়াহ), দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৭৮, খন্ড ১, পৃ. ৩১৪।