📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 মতবিরোধের কারণ

📄 মতবিরোধের কারণ


আহলুল-হাদীস ও আহলুর-রা'ই 'আঁলিমদের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণের পেছনে সক্রিয় ছিলো কিছু রাজনৈতিক ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি। ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার সর্বশেষ খলীফা 'আলি ইবন আবি তালিব-এর শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী ইরাকে স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীকালে রাজধানীকে সরিয়ে সিরিয়ায় নেওয়া হয়। এ কারণে রাষ্ট্রের কেন্দ্রে সংঘটিত বিভিন্ন গোলযোগ, বিদেশি সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার প্রভাব থেকে হিজায (৭) অঞ্চল কিছুটা মুক্ত ছিল। রাজধানী থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ার কারণে হিজাযের জীবনযাত্রা ছিলো বেশ সহজ-সরল ও সাদামাটা। হিজায ছিল নাবি-এর আবাস ও ইসলামি রাষ্ট্রের জন্মভূমিও। ফলে হাদীসের প্রাচুর্যের পাশাপাশি এ অঞ্চলে ছিল প্রথম তিন খলীফা আবু বাক্স, 'উমার ও উসমান-এর প্রণীত ফিকহি সিদ্ধান্তের এক বিশাল ভান্ডার।
অন্যদিকে ইরাক ছিল মুসলিমদের জন্য সম্পূর্ণ এক নতুন দেশ। সেখানে যখন ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী স্থাপন করা হলো, তখন তা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে এমন অনেক পরিস্থিতি ও ঘটনার উদ্ভব হতে থাকে যেগুলো ছিল ঐ সময়ের মুসলিম বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতার বাইরে। অধিকন্তু, ইরাকে বসবাসকারী সহাবিদের সংখ্যা কম হওয়ায় সেখানে প্রাপ্ত হাদীসের পরিমাণও ছিল মাদীনার তুলনায় কম। একই সাথে ইরাক পরিণত হয় জাল হাদীসের জন্মভূমি এবং প্রথম দিকের অধিকাংশ বিভ্রান্ত দলগুলোর বিকাশকেন্দ্রে। হাদীস জালকারীদের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের কারণে হাদীসের বিশুদ্ধতা নিয়ে বিভিন্ন রকম সংশয় সৃষ্টি হওয়ায় ইরাকের বিশেষজ্ঞগণ কেবল তাঁদের দৃষ্টিতে সঠিক মনে হওয়া হাদীসগুলোকেই গ্রহণ করতেন। অত্যন্ত কঠোর কিছু শর্ত সাপেক্ষে তাঁরা এই হাদীসগুলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতেন। ক্রমবিকাশের স্বাভাবিক এ প্রেক্ষাপটে ইরাকি মাযহাব ও সেখানকার বিশেষজ্ঞগণ যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার উপর অনেক বেশি নির্ভর করতেন। (৮)

টিকাঃ
(৭) মাক্কা ও মাদীনাসহ আরব উপদ্বীপের পশ্চিম উপকূল।
(৮) আল-মাদখাল, পৃ. ১২৬-১২৭।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 ফিক্‌হ সংকলন

📄 ফিক্‌হ সংকলন


হিজরি ১১-৪০ (৬৩২-৬৬১ সাল) সালের মধ্যে অর্থাৎ ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার যুগে সহাবিগণের দেওয়া কোনো ফাতওয়া সংকলন করা হয়নি। সেসময় মুসলিম রাষ্ট্রটি খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল; আর সবকিছুই ছিল দ্রুত পরিবর্তনশীল। ব্যাপক হারে হাদীসের বর্ণনা সবেমাত্র শুরু হয়েছিল। প্রথম যুগের বিশিষ্ট সহাবিগণ নতুন মুসলিম জাতিটিকে দিক নির্দেশনা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শুরু করেছিলেন মাত্র। তাই সহাবিগণের ফাতওয়া ও মতামতগুলোর সংকলন প্রস্তুত করার মতো সময় ও সুযোগ-কোনোটাই তাঁদের ছিল না। অধিকন্তু, সহাবিগণ নিজেদের ইজতিহাদি সিদ্ধান্তগুলোকে গোটা মুসলিম জাতির উপর বাধ্যতামূলকও মনে করতেন না। বরং তাঁরা সেগুলোকে নিছক তাঁদের বিশেষ সময় ও অবস্থার জন্য প্রযোজ্য মতামত হিসেবে বিবেচনা করতেন।
উমাইয়া শাসনামলেই সর্বপ্রথম ফিকহি সিদ্ধান্তগুলোর একটি সংকলন প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। কারণ, এ যুগে সরকার কাঠামো খিলাফাহ থেকে রাজতন্ত্রে পরিবর্তিত হওয়ার পর প্রায়ই সহাবিগণের মতামতের পরিপন্থী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সহাবিদের অধীনে যারা পড়াশোনা করেছিলেন তাঁরা অনুধাবন করলেন যে, প্রাথমিক যুগের আইনগত সিদ্ধান্তগুলোকে সংরক্ষণ করার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না-হলে পরবর্তী মুসলিম প্রজন্ম সহাবিদের অবদান থেকে উপকৃত হওয়ার কোনো সুযোগ পাবে না। এ কারণেই, তখন হিজাযের বিশেষজ্ঞগণ 'আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আব্দুল্লাহ ইবন 'উমার এবং 'আ'ইশাহ বিনতু আবি বাক্ (৯)-এর আইনগত মতামতগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। একইভাবে ইরাকি বিশেষজ্ঞগণ 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'ঊদ ও 'আলি ইবন আবি তালিব-এর আইনগত মতামতগুলো সংকলন করেন। দুর্ভাগ্যবশত এসব সংকলনের কোনোটিই আদি রূপে টিকে নেই। তবে, পরবর্তী প্রজন্মের বিশেষজ্ঞদের লেখা গ্রন্থগুলোতে উল্লিখিত তাঁদের উদ্ধৃতিগুলো থেকে তাঁদের মতামত জানা যায়। আদি সংকলনগুলোর অনেক আইনগত সিদ্ধান্ত ও মতামত—হাদীস, ইতিহাস ও পরবর্তী যুগে রচিত ফিকহের গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত আছে।

টিকাঃ
(৯) নাবি -এর তৃতীয় স্ত্রী।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 অধ্যায় সারাংশ

📄 অধ্যায় সারাংশ


উমাইয়া শাসনামলে ফিক্হ সংকলনের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ যুগের বিশেষজ্ঞগণ সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের এক দলকে আহলুল-হাদীস এবং অন্য দলকে আহলুর-রা'ই নামে অভিহিত করা হতো। ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষজ্ঞ 'আঁলিমদের ছড়িয়ে পড়ার কারণে ব্যক্তিগত ইজতিহা- দের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। এভাবেই বেশ কয়েকটি নতুন মাযহাব বিকাশ লাভ করে।
ন্যায়নিষ্ঠ বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণ উমাইয়া খলীফাদের দরবার পরিহার করায় ইজমা' ও পরামর্শভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার নীতিমালা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
উমাইয়াগণ সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাই ইসলামের মৌলিক নীতিমালা সংরক্ষণ করতে খিলাফাতের কেন্দ্র থেকে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়া বিশেষজ্ঞগণ নিজেরাই ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাধ্যানুযায়ী হাদীসের উপর নির্ভর করতেন। আর তাঁরাই সবচেয়ে প্রখ্যাত সহাবিদের আইনগত সিদ্ধান্তগুলো সংকলনের উদ্যোগ নেন।
সামাজিক অস্থিরতা ও গোলযোগ ছিল এ যুগের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এ সময়ে বেশ কয়েকটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উপদলের সৃষ্টি হয়।
এ যুগেই প্রথম বারের মতো দলকেন্দ্রিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনে ব্যাপক পরিমাণ জাল হাদীস বিস্তার লাভ করে। ফলে, বিশেষজ্ঞগণ ৭ হাদীস সংকলন ও হাদীসের যাচাই-বাছাইমূলক পর্যালোচনার প্রয়োজ- নীয়তা অনুভব করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00