📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 ফিক্‌হশাস্ত্রের উপর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলো

📄 ফিক্‌হশাস্ত্রের উপর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলো


ফিকহশাস্ত্র ও মাযহাবগুলোর বিবর্তনের ইতিহাসে এ যুগটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে এ যুগের সাথে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দিকগুলো সবিস্তারে নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১. মুসলিম উম্মাহ্র বিভাজন
এ যুগের প্রথম দিকেই মুসলিম জাতির উপর নেমে আসে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাত। এর পরিণতিতে বেশ কয়েকটি দল ও উপদলের উৎপত্তি ঘটে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ছিল খাওয়ারিজ (২), শী'আহ (৩) এবং 'আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আয-যুবাইর ও তাঁর অনুসারীদের(৪) বিদ্রোহ। শাসনক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে বিবাদমান এ দলগুলোর নিরন্তর দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ফলে সৃষ্টি হয় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা।
খাওয়ারিজ ও শী'আহ এই দুটি উপদল পরবর্তীকালে স্বতন্ত্র ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কুর'আন ও সুন্নাহর অপব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে এরা নিজেদের বিকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সংগতিপূর্ণ মনগড়া এক পৃথক ফিকহশাস্ত্র গড়ে তোলে। তারা ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফা ও অধিকাংশ সহাবির অবদানকে অস্বীকার করে। এমনকি তাঁদেরকে মুরতাদ ঘোষণা করে নিজেদের নেতৃবৃন্দকে আইন প্রণেতার আসনে বসিয়ে দেয়।
২. উমাইয়া খলীফাদের বিচ্যুতি
উমাইয়া খলীফাগণ তৎকালীন বাইজান্টাইন, পারস্য ও হিন্দুস্তানের অনৈসলামি রাষ্ট্রগুলোতে প্রচলিত বেশ কিছু প্রথাকে নিজ দরবারে চালু করেন।
এসব কুপ্রথার অনেকগুলোই ছিল ইসলামের প্রথম যুগের রীতিনীতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কেন্দ্রীয় কোষাগার (বাইতুল-মাল) খলীফা ও তাঁর পরিবারের লোকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার হীন উদ্দ্যেশ্যে সাধারণ জনগণের উপর শারী'আহ সমর্থিত নয় এমন ধরনের করও আরোপ করা হয়। খলীফার দরবারে বিনোদনের নামে সংগীত, নর্তকী, গায়িকা, জাদুকর ও জ্যোতির্বিদদের সরকারিভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অধিকন্তু, ৫৯ হিজরিতে (৬৭৯ সাল) খলীফা মু'আউইয়াহ তাঁর পুত্র ইয়াযীদকে তার পরবর্তী শাসক হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। তখন থেকেই খিলাফাহ ব্যবস্থা এক ধরনের বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। এ পর্যায়ে এসে রাষ্ট্রের সাথে ফিকহশাস্ত্র ও ফাকীহদের সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং 'আঁলিমদের মতামতের মধ্যে ঐক্য রক্ষা করার সুযোগটি প্রায় একেবারেই হাতছাড়া হয়ে যায়। এসব কারণে এ যুগের ন্যায়নিষ্ঠ 'আঁলিমগণ খলীফার সভাসদ হওয়াকে এড়িয়ে চলতেন। ফলে পরামর্শভিত্তিক শাসন বা শূরী' নীতিটিও প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রত্যেক নতুন খলীফার শাসনামলেই শাসনব্যবস্থার অবনতি হতে হতে একসময় তা তৎকালীন অনৈসলামি সরকারগুলোর ন্যায় একনায়কতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের রূপ ধারণ করে। কতিপয় খলীফা নিজেদের নীতিহীনতাকে বৈধ করার উদ্দেশ্যে ফিকহশাস্ত্রকে ব্যবহার করার অপচেষ্টা করেন। এ বিকৃতির মোকাবিলা করতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিশুদ্ধ ফিকহশাস্ত্র রেখে যাওয়ার লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণ প্রথম যুগের ফিকহশাস্ত্রকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংকলন করতে শুরু করেন।
৩. বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া
উমাইয়া শাসনামলে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই সংঘাত, সংশয় ও বিবাদমান দলগুলোর হানাহানি থেকে বাঁচার জন্য রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলো থেকে দূরে সরে পড়েন। বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষজ্ঞগণ ছড়িয়ে পড়ার কারণে ইজমা'র মূলনীতিগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হারিয়ে যায়। এমনকি কোনো নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইজমা'য় উপনীত হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞগণ নিজ নিজ এলাকায় বহু নতুন সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য ব্যাপক হারে ব্যক্তিগত ইজতিহাদের উপর নির্ভর করতেন। ফলে ইজতিহাদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যখনই কোনো এলাকায় ফিকহশাস্ত্রে অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটত, তখনই সে এলাকার শিক্ষার্থী ও 'আলিমগণ তাঁর কাছে জড়ো হতেন। মাঝেমধ্যে অন্যান্য এলাকার শিক্ষার্থী ও 'আলিমগণও তাঁদের সাথে এসে যোগ দিতেন। আর এভাবেই গড়ে উঠেছিল ইসলামি আইন তথা ফিকহশাস্ত্রের বিভিন্ন মাযহাব। এ যুগে কুফাতে ইমাম আবু হানীফাহ ও সুফ্যান আস-সাওরি, মাদীনায় মালিক ইব্‌ন আনাস, বৈরুতে আল-আওযা'ই এবং মিশরে আল-লাইস ইবন সা'দ প্রমুখ প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
৪. হাদীস জালকরণ
এ পর্যায়ে এসে বিভিন্ন বিষয়ে আইনগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য তথ্যের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়, ফলে হাদীস বর্ণনার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে অঘোষিতভাবেই নাবি -এর সুন্নাহর অনুসরণ একরকম বন্ধ হয়ে যায়। তখন বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সঠিক মাসআলা নির্ধারণের জন্য বিশেষজ্ঞগণ সাহাবি ও তাঁদের ছাত্রদের মাধ্যমে বর্ণিত প্রতিটি হাদীসকে খুঁজে বের করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এই সময়ে একটি জঘন্য প্রবণতাও দেখা দেয়। আর তা হলো, এই প্রথমবারের মতো বিভিন্ন কথা ও কাজকে নাবি-এর প্রতি মিথ্যাভাবে আরোপ করা হয় যা তিনি বলেননি বা করেননি। হাদীস জালকারীরা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য জাল হাদীসের পাশাপাশি কিছু সঠিক হাদীসও বর্ণনা করত। এমতাবস্থায় বিশুদ্ধ হাদীসগুলো সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে হাদীস সংকলনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। জাল হাদীসগুলোকে সহীহ হাদীস থেকে আলাদা করার জন্য বিকশিত হয় হাদীসশাস্ত্র। এগুলো পরবর্তী যুগের বিশেষজ্ঞদের ইজতিহাদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হাদীসশাস্ত্র বিকাশ লাভের পূর্বে সত্য ও মিথ্যা বর্ণনার মিশ্রিত কিছু বিষয় ইসলামি জ্ঞানের ভান্ডারে স্থান করে নেয় এবং সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ 'আলিম অসাবধানতাবশত তা ব্যবহারও করেন। এভাবে, অশুদ্ধ ফিক্হের একটি ধারা গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে কতিপয় বিশেষজ্ঞের কিছু আইনগত সিদ্ধান্তের কারণে এই অশুদ্ধ ফিক্হ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর এর প্রধানতম কারণ ছিল, 'আলিমদের অনেকেই বেশ কিছু সহীহ হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ, তাঁরা সেসব হাদীস কেবল হাদীস জালকারী হিসেবে পরিচিত এলাকার ঘৃণ্য লোকদের মাধ্যমেই জানতে পেরেছিলেন। (৫)

টিকাঃ
(২) বিস্তারিত জানার জন্য পরিশিষ্ট দেখুন।
(৩) প্রাগুক্ত।
(৪) প্রাগুক্ত।
(৫) আল-মাদখাল, পৃ. ১২১-১২৬।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 উমাইয়া যুগের ফিক্‌হের বৈশিষ্ট্য

📄 উমাইয়া যুগের ফিক্‌হের বৈশিষ্ট্য


এ যুগে বিশেষজ্ঞ 'আলিম ও শিক্ষার্থীগণ দুটি পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এক দল বিশেষজ্ঞ আইনগত সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে সরাসরি কুর'আন ও সুন্নাহ প্রমাণের উপরই নির্ভর করতেন। অন্যদিকে অপর দলটি যুক্তি-বুদ্ধির প্রয়োগের মাধ্যমে ও ইজতিহাদ ও কিয়াসের ব্যাপক ব্যবহারকে বেছে নিয়েছিলেন।
কোনো বিষয়ে কুর'আন ও সুন্নাহর স্পষ্ট প্রমাণ না-থাকলে প্রথম দলটি সে বিষয়ে আইনগত সিদ্ধান্ত প্রদানকে এড়িয়ে চলতেন। তাঁদের অবস্থানের ভিত্তি ছিল কুর'আনের নিম্নোক্ত আয়াতটি:
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ... (٣٦)
"যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তুমি সে বিষয়ের পেছনে পড়ো না।" (আল-ইসরা ১৭:৩৬)
যেসব আইনের উদ্দেশ্যাবলি আল্লাহ অথবা তাঁর রসূল চিহ্নিত করে দিয়েছেন, সেই একই ধরনের উদ্দেশ্য সাধনে উল্লিখিত আইনগুলোকে মূলনীতি হিসেবে ব্যবহার করে অনুরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ (কিয়াস) (৬) করা হতো। পক্ষান্তরে, যেসব আইনের উদ্দেশ্যাবলি কুর'আন ও সুন্নাহতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, কিয়াসের মাধ্যমে বিধিবিধান বের করে আনার ক্ষেত্রে সেসব আইনকে মূলনীতি হিসেবে ব্যবহার করা হতো না। এ নীতি অবলম্বনের কারণে এ মাযহাবের বিশেষজ্ঞদের বলা হতো আহলুল-হাদীস। এই ধারার বিশেষজ্ঞদের কেন্দ্র ছিল মাদীনাহ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাদীনার এ মাযহাবের ফিকহশাস্ত্র ছিল প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে গঠিত।
বিশেষজ্ঞদের অপর দলটির মতে, যদিও আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল ‘শারী'আহর সব আইনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেননি, কিন্তু শারী'আহর প্রত্যেকটি আইনের নেপথ্যেই রয়েছে কোনো-না-কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ। এই দলের বিশেষজ্ঞগণ নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এমন প্রতিটি আইনের সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করেছেন যেগুলোর নেপথ্য কারণ সুষ্পষ্ট নয়। তার পর একই রকমের পরিস্থিতিতে তাঁরা সেই আইনগুলোকে প্রয়োগ করেছেন। তাঁদের এ পদ্ধতির ভিত্তি ছিল কয়েকজন বিশিষ্ট সহাবির কর্মপদ্ধতি-যাঁরা বেশ কিছু ওয়াহয়িভিত্তিক আইনের নেপথ্য কারণ খুঁজে বের করে সে অনুসারে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। যুক্তি-বুদ্ধির ব্যাপক ব্যবহারের কারণে, এ দলের 'আলিমগণ আলুর-রা'ই নামে পরিচিতি লাভ করেন। এই বিশেষজ্ঞদের কেন্দ্র ছিল ইরাকের কুফা। কুফার আইনশাস্ত্র প্রধানত বিকশিত হয়েছিল 'সম্ভাব্য সমস্যার' বিষয়টি সামনে রেখে। অর্থাৎ, ঘটতে পারে এমন ধরনের বিভিন্ন সমস্যাকে চিহ্নিত করা হতো। এর পর সম্ভাব্য পরিস্থিতিকে অনুমান করে তার সমাধান বের করা হতো ও লিপিবদ্ধ করা হতো। তাঁদের আলোচনায় প্রায়ই তাঁরা এমন প্রশ্নের উত্থাপন করতেন যে, 'যদি ব্যাপারটি এমন হয়, তাহলে সমাধান কী হবে?'। উল্লেখ্য যে, এ দুটি ধারা ছিল মূলত সহীবিগণের মধ্যে প্রাথমিকভাবে দৃশ্যমান দুটি ভিন্ন পন্থার সম্প্রসারণ মাত্র।

টিকাঃ
(৬) সাদৃশ্যপূর্ণ অবস্থার ভিত্তিতে যুক্তিযুক্তভাবে বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 মতবিরোধের কারণ

📄 মতবিরোধের কারণ


আহলুল-হাদীস ও আহলুর-রা'ই 'আঁলিমদের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণের পেছনে সক্রিয় ছিলো কিছু রাজনৈতিক ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি। ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার সর্বশেষ খলীফা 'আলি ইবন আবি তালিব-এর শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী ইরাকে স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীকালে রাজধানীকে সরিয়ে সিরিয়ায় নেওয়া হয়। এ কারণে রাষ্ট্রের কেন্দ্রে সংঘটিত বিভিন্ন গোলযোগ, বিদেশি সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার প্রভাব থেকে হিজায (৭) অঞ্চল কিছুটা মুক্ত ছিল। রাজধানী থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ার কারণে হিজাযের জীবনযাত্রা ছিলো বেশ সহজ-সরল ও সাদামাটা। হিজায ছিল নাবি-এর আবাস ও ইসলামি রাষ্ট্রের জন্মভূমিও। ফলে হাদীসের প্রাচুর্যের পাশাপাশি এ অঞ্চলে ছিল প্রথম তিন খলীফা আবু বাক্স, 'উমার ও উসমান-এর প্রণীত ফিকহি সিদ্ধান্তের এক বিশাল ভান্ডার।
অন্যদিকে ইরাক ছিল মুসলিমদের জন্য সম্পূর্ণ এক নতুন দেশ। সেখানে যখন ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী স্থাপন করা হলো, তখন তা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে এমন অনেক পরিস্থিতি ও ঘটনার উদ্ভব হতে থাকে যেগুলো ছিল ঐ সময়ের মুসলিম বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতার বাইরে। অধিকন্তু, ইরাকে বসবাসকারী সহাবিদের সংখ্যা কম হওয়ায় সেখানে প্রাপ্ত হাদীসের পরিমাণও ছিল মাদীনার তুলনায় কম। একই সাথে ইরাক পরিণত হয় জাল হাদীসের জন্মভূমি এবং প্রথম দিকের অধিকাংশ বিভ্রান্ত দলগুলোর বিকাশকেন্দ্রে। হাদীস জালকারীদের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের কারণে হাদীসের বিশুদ্ধতা নিয়ে বিভিন্ন রকম সংশয় সৃষ্টি হওয়ায় ইরাকের বিশেষজ্ঞগণ কেবল তাঁদের দৃষ্টিতে সঠিক মনে হওয়া হাদীসগুলোকেই গ্রহণ করতেন। অত্যন্ত কঠোর কিছু শর্ত সাপেক্ষে তাঁরা এই হাদীসগুলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতেন। ক্রমবিকাশের স্বাভাবিক এ প্রেক্ষাপটে ইরাকি মাযহাব ও সেখানকার বিশেষজ্ঞগণ যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার উপর অনেক বেশি নির্ভর করতেন। (৮)

টিকাঃ
(৭) মাক্কা ও মাদীনাসহ আরব উপদ্বীপের পশ্চিম উপকূল।
(৮) আল-মাদখাল, পৃ. ১২৬-১২৭।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 ফিক্‌হ সংকলন

📄 ফিক্‌হ সংকলন


হিজরি ১১-৪০ (৬৩২-৬৬১ সাল) সালের মধ্যে অর্থাৎ ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার যুগে সহাবিগণের দেওয়া কোনো ফাতওয়া সংকলন করা হয়নি। সেসময় মুসলিম রাষ্ট্রটি খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল; আর সবকিছুই ছিল দ্রুত পরিবর্তনশীল। ব্যাপক হারে হাদীসের বর্ণনা সবেমাত্র শুরু হয়েছিল। প্রথম যুগের বিশিষ্ট সহাবিগণ নতুন মুসলিম জাতিটিকে দিক নির্দেশনা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শুরু করেছিলেন মাত্র। তাই সহাবিগণের ফাতওয়া ও মতামতগুলোর সংকলন প্রস্তুত করার মতো সময় ও সুযোগ-কোনোটাই তাঁদের ছিল না। অধিকন্তু, সহাবিগণ নিজেদের ইজতিহাদি সিদ্ধান্তগুলোকে গোটা মুসলিম জাতির উপর বাধ্যতামূলকও মনে করতেন না। বরং তাঁরা সেগুলোকে নিছক তাঁদের বিশেষ সময় ও অবস্থার জন্য প্রযোজ্য মতামত হিসেবে বিবেচনা করতেন।
উমাইয়া শাসনামলেই সর্বপ্রথম ফিকহি সিদ্ধান্তগুলোর একটি সংকলন প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। কারণ, এ যুগে সরকার কাঠামো খিলাফাহ থেকে রাজতন্ত্রে পরিবর্তিত হওয়ার পর প্রায়ই সহাবিগণের মতামতের পরিপন্থী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সহাবিদের অধীনে যারা পড়াশোনা করেছিলেন তাঁরা অনুধাবন করলেন যে, প্রাথমিক যুগের আইনগত সিদ্ধান্তগুলোকে সংরক্ষণ করার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না-হলে পরবর্তী মুসলিম প্রজন্ম সহাবিদের অবদান থেকে উপকৃত হওয়ার কোনো সুযোগ পাবে না। এ কারণেই, তখন হিজাযের বিশেষজ্ঞগণ 'আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আব্দুল্লাহ ইবন 'উমার এবং 'আ'ইশাহ বিনতু আবি বাক্ (৯)-এর আইনগত মতামতগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। একইভাবে ইরাকি বিশেষজ্ঞগণ 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'ঊদ ও 'আলি ইবন আবি তালিব-এর আইনগত মতামতগুলো সংকলন করেন। দুর্ভাগ্যবশত এসব সংকলনের কোনোটিই আদি রূপে টিকে নেই। তবে, পরবর্তী প্রজন্মের বিশেষজ্ঞদের লেখা গ্রন্থগুলোতে উল্লিখিত তাঁদের উদ্ধৃতিগুলো থেকে তাঁদের মতামত জানা যায়। আদি সংকলনগুলোর অনেক আইনগত সিদ্ধান্ত ও মতামত—হাদীস, ইতিহাস ও পরবর্তী যুগে রচিত ফিকহের গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত আছে।

টিকাঃ
(৯) নাবি -এর তৃতীয় স্ত্রী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00