📄 এ যুগের ফিক্হের বৈশিষ্ট্য
ফিশাস্ত্রের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ ও মাযহাবগুলোর বিবর্তনের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাই যে, রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ধাপে ফিক্হশাস্ত্র বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে।
প্রথমত, ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার যুগে ফিক্হশাস্ত্রের বিশেষত্ব ছিল এর অসাধারণ বাস্তববাদী রূপ (realism)। অর্থাৎ, অনুমান বা কল্পনার পরিবর্তে এ যুগের ফিক্হশাস্ত্র গড়ে উঠেছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সংঘটিত বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে। উমাইয়া শাসনামলে ইরাকের কুফায় আহলুর-রা’ই হিসেবে পরিচিত বিশিষ্ট ফাকীহগণ সম্ভাব্য সমস্যার সমাধানকেন্দ্রিক যে-ফিকহশাস্ত্র গড়ে তুলেছিলেন, তা থেকে আলাদা করতে পরবর্তীকালে বাস্তব সমস্যাকেন্দ্রিক ফিক্হশাস্ত্রকে আল-ফিক্হ আল-ওয়াক্‘ইই বা বাস্তববাদী ফিক্হ বলে অভিহিত করা হতো।
দ্বিতীয়ত, ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফা আইনগত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করলেও তাঁদের কেউই গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য সর্বাবস্থায় অনুসরণীয় সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নির্ধারণ করে দেননি। তাছাড়া, কুর’আন-সুন্নাহ থেকে বের করে আনা বিধিবিধানের কোনো সংকলনও তাঁরা প্রস্তুত করেননি। তাঁদের এই কর্মপন্থা থেকে দুটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
১. শারী‘আতে যেসব বিষয় সুনির্দিষ্ট নয় সেসব ক্ষেত্রে সহাবিগণ উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ফলে কুর’আন-সুন্নাহর আলোকে গৃহীত ভিন্ন মতের প্রতিও তাঁদের সম্মানবোধ ফুটে উঠেছে। উল্লেখ্য যে, তাঁদের এ মানসিকতা পরবর্তী পর্যায়ের ‘আলিমদের কারও কারও মধ্যে দৃশ্যমান কঠোরতা থেকে ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
২. কুর’আনে যেসব বিধান আলোচিত হয়নি সেসব বিধানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পেছনে না-লেগে তাঁরা কুর’আন অধ্যয়নে জনগণকে উৎসাহিত করেছেন। সহাবিগণের এ দৃষ্টিভঙ্গিও নিঃসন্দেহে উপরোক্ত মানসিকতার সাথে ছিল সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।
এ যুগে বিকশিত ফিক্হশাস্ত্রের তৃতীয় বিশেষত্বটি ছিল আইনগত সিদ্ধান্ত প্রদানে ব্যক্তিগত মতামত ব্যবহারের বৈচিত্র্য। অধিকাংশ সহাবি কুর’আন ও সুন্নাহ্ আক্ষরিক অর্থগুলো আঁকড়ে ধরাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সাধারণত তাঁরা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা প্রদানকে এড়িয়ে চলতেন। ইবন 'উমার ছিলেন একজন প্রথম সারির আইনবিদ। তিনি সারা জীবন মাদীনায় বসবাস করেছেন এবং এ নীতির অনুসরণ করেছেন। অন্যদিকে, সহাবিদের অনেকেই কুর'আন-সুন্নাহয় আলোচিত হয়নি এমন সব বিষয়ে ব্যাপক হারে ব্যক্তিগত মত ব্যবহার করতেন। তবে, এক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভুলকে তাঁরা সম্পূর্ণরূপে নিজেদের প্রতি আরোপ করতেন, যেন তাঁদের ভুলের কারণে ইসলামি আইনের কোনো দুর্নাম না ঘটে। এমন চিন্তাধারার সহাবিদের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'ঊদ ছিলেন অন্যতম। তিনি পরবর্তীকালে স্থায়ীভাবে ইরাকে বসবাস শুরু করেন।
ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার যুগে ফিরে চতুর্থ বিশেষত্বটি ছিল শারী'আহ আইনের কিছু সংস্কারের সাথে সংশ্লিষ্ট। মূলত দুটি কারণে এ সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এগুলো হলো:
১. আইনের নেপথ্য কারণের অনুপস্থিতি। খলীফা 'উমার বাইতুল-মাল বা কেন্দ্রীয় কোষাগার থেকে নওমুসলিম ও ইসলাম গ্রহণেচ্ছু ব্যক্তিদের নগদ উপহার প্রদানের ধারাকে স্থগিত করে দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, নাবি ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে এমনটি করেছেন। কারণ, তখন ইসলামের সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল; কিন্তু, এখন আর দান-সাদাকাহ করে সমর্থক সংগ্রহের প্রয়োজন নেই।
২. সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন। বিবাহ-বিচ্ছেদ আইনের পরিবর্তন এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। নতুন বিজিত অঞ্চলগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে সম্পদ আগমনের ফলে এক ও একাধিক বিবাহ সম্পাদন তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যায়। অন্যদিকে বিবাহ-বিচ্ছেদের হারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। বিবাহ-বিচ্ছেদের বৈধতার অপব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে খলীফা 'উমার এ সংক্রান্ত আইনের কিছুটা সংস্কার সাধন করেন। নাবি-এর যুগে একই সময়ে তিন তলাকের উচ্চারণকে কেবল এক তলাক হিসেবে গণ্য করা হতো এবং তা ছিল প্রত্যাহারযোগ্য। খলীফা 'উমার একই সময়ে একাধিক তলাক প্রদান করলে তাকে কার্যকর ও অপ্রত্যাহারযোগ্য ঘোষণা করেন।
পঞ্চমত, ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার যুগে একটিই মাযহাব ছিল এবং নাবি -এর যুগের ন্যায় তা রাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। প্রত্যেক খলীফার যুগে খলীফার মাযহাবই ছিল একমাত্র মাযহাব। কারণ, ইজতিহাদ ও ইজমা' সংক্রান্ত প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে খলীফার মতামতই ছিল চূড়ান্ত। খলীফার জীবদ্দশায় কেউই কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে তাঁর গৃহীত কোনো সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য বিরোধিতা করতেন না। তবে, অন্য কোনো খলীফা ক্ষমতায় আসার পর তাঁর মতকে পূর্ববর্তী খলীফার মতামতের উপর প্রাধান্য দেওয়া হতো। অনেক সময় পূর্ববর্তী খলীফার সিদ্ধান্তগুলোকে পরিবর্তন করে নতুন খলীফার মতকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত প্রণয়ন করা হতো।
📄 অধ্যায় সারাংশ
ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার যুগেই কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে ফিকহের মূলনীতি অর্থাৎ ইজমা' ও কিয়াস তথা ইজতিহাদের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।
নতুন নতুন অঞ্চলের বিজয়ের ফলে মুসলিমগণ বিভিন্ন জাতির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসে। এর ফলে জন্ম নেয় বেশ কিছু নতুন সমস্যা যেগুলো শারী'আহ আইনে সুনির্দিষ্টভাবে আলোচিত হয়নি।
শারী'আতে সুস্পষ্ট বিধান নেই এমন অনেক বিষয়ে আইন প্রণয়ন অপরিহার্য হয়ে উঠে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে মতপার্থক্যকে যেন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায় সে লক্ষ্যে ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফা পর্যায়ক্রমে ইজতিহাদের কিছু পদ্ধতি প্রণয়ন করেন।
সহাবিগণও সাধারণত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। এগুলো কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া থেকে এড়িয়ে চলতে তাঁদেরকে সাহায্য করত।
সহাবিগণ ও ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার সমন্বিত অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আইনগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো। ফলে তাঁদের মধ্যে ঐক্য বৃদ্ধি পেত এবং এ কারণেই সে যুগের মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যে কোনো দলাদলির সৃষ্টি হয়নি।
৬ ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার যুগে কেবল একটি মাযহাবই ছিল। আইন প্রণয়নে একতাবদ্ধ পন্থা অনুসরণের ফলে এ যুগের শেষ অবধি রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো মাযহাব গড়ে ওঠেনি।
৭ জনগণ কুর'আন অধ্যয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিত। অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে হাদীসের মাত্রাতিরিক্ত উদ্ধৃতি প্রদানকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল।
৮ যদিও ব্যক্তিগত মত প্রয়োগের ক্ষেত্রে সহাবিগণের পরস্পরের মধ্যে পদ্ধতিগত কিছু পার্থক্য ছিল, তবে সে পার্থক্য ঐ যুগে কোনো রূপ দলাদলিতে পর্যবসিত হয়নি।
৯ ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার যুগে ফিক্হশাস্ত্রের ক্ষেত্রে একটি সার্বজনীন পদ্ধতিকে অনুসরণ করা হয়েছে; অর্থাৎ তখন একটি মাযহাবই চালু ছিল। তবে, ব্যক্তিগত মত প্রদান প্রসঙ্গে মাদীনায় ইবন 'উমার ও ইরাকের কুফায় 'আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ এর মতো বিশিষ্ট সহাবিদের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য ছিল। উল্লেখ্য যে, তাঁদের এই মতপার্থক্যকে পরবর্তী যুগের 'আঁলিমদের বিভিন্ন মাযহাবে বিভক্ত হওয়ার সূচনাবিন্দু কিংবা প্রচ্ছন্ন পূর্বাভাষ হিসেবে দেখা যেতে পারে।