📄 ইসলামি আইনের উৎস
আল্লাহর রসূলের সময়ে ইসলামি আইনের উৎস ছিল ওয়াহয়ি; অর্থাৎ কুর'আন ও সুন্নাহ। সুন্নাহ হলো নাবিﷺ এর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতি অর্থাৎ তাঁর উপস্থিতিতে সংঘটিত যেসব বিষয়কে তিনি নিষেধ করেননি। সুন্নাহ হলো ওয়াহয়ির দ্বিতীয় ধরন। কুর'আনের নিম্নোক্ত আয়াতটি থেকেও এ বিষয়টি প্রতিপন্ন হয়:
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى (٢) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (١)
"তিনি নিজের খেয়ালখুশী মতো কোনো কথা বলেন না। যা তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয় তা ওয়াহয়ি ছাড়া আর কিছুই নয়।" (আন-নাজম, ৫৩:৩-৪)
নাবি ﷺ কে মানবজাতির নিকট আল্লাহ তা'আলার চূড়ান্ত বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
يَتَأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ...)
“হে রসূল! তোমার প্রভুর পক্ষ থেকে তোমার কাছে যা কিছু নাজিল করা হয়েছে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দাও।” (আল-মা'ইদাহ, ৫:৬৭)
একই সাথে মানুষের সামনে আল্লাহর চূড়ান্ত বার্তাকে ব্যাখ্যা করে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও তাঁর উপর অর্পণ করা হয়েছিল।
.... وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ )
"...এ বাণী তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি লোকদের কাছে তা ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিতে পারো, যা তাদের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে; এবং লোকেরা (নিজেরাও) যেন চিন্তা-ভাবনা করে।" (আন-নাহল, ১৬:৪৪)
নাবি কখনো বক্তব্যের মাধ্যমে কুর'আনের আয়াতের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, আবার কখনো ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর কাজের মাধ্যমে। কখনো কথা ও কাজ-উভয়ের মাধ্যমেও। যেমন, কুর'আনে মুসলিমদের সলাত কায়েম করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, অথচ তা কীভাবে আদায় করতে হবে-কুর'আঁন তা বিস্তারিত বর্ণনা করেনি। অতঃপর, নাবি তাঁর অনুসারীদের সামনে সলাত আদায় করে বলেন,
"আমাকে যেভাবে সলাত আদায় করতে দেখেছ, তোমরা সেভাবে সলাত আদায় করো।” (৩১)
অন্য একটি ঘটনায় এসেছে, নাবি সলাত আদায়কালে এক ব্যক্তি এসে তাঁকে সালাম দিলেন। জবাবে তিনি ডান হাত তুলে সাড়া দিলেন। (৩২) তাঁর স্ত্রী 'আ'ইশাহ (রদিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন যে, সাজদাহ করার সময় নাবি তাঁর পায়ের গোড়ালিগুলোকে মিলিয়ে রাখতেন। (৩৩) অন্য আরেকটি ঘটনায়, নাবি ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ইবন মাস'উদ তখন সলীতে ডান হাতের উপর বাম হাত রেখেছিলেন। তা দেখে নাবি ইবন মাসউদের ডান হাতটিকে উঠিয়ে বাম হাতের উপর রেখে দিলেন। (৩৪) তিনি আরও বলেছেন,
"সাজদাহ করার সময় তোমাদের উটের ন্যায় বসা উচিত নয়। বরং (মাটিতে) হাঁটু রাখার আগে হাত রাখা উচিত।" (৩৫)
সুতরাং সুন্নাহ হলো কুর'আনের ব্যাখ্যা। কুর'আনের সাধারণ নির্দেশাবলির ব্যাখ্যা এবং এর আয়াতের সুনির্দিষ্ট অর্থকে সুন্নাহতে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে দেখা যাবে যে, সুন্নাহ সবকিছুকেই কুর'আনেও নির্দেশ করা হয়েছে; কখনো সরাসরি, আবার কোথাও আকার-ইঙ্গিতে। কুর'আনের কোনো কোনো আয়াতে এত ব্যাপক অর্থে এই নির্দেশ এসেছে যে, গোটা সুন্নাহই তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। যেমন কুর'আঁনে বলা হয়েছে,
... وَمَا عَاتَنكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ... )
"রসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।" (আল-হাশ্র, ৫৯:৭)
অনেক সময় আইনটি কুর'আনে সাধারণভাবে উল্লেখ থাকে, কিন্তু এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা থাকে সুন্নাহতে। অতএব, সুন্নাহতে থাকে আইনের প্রয়োগ-পদ্ধতি, নেপথ্য কারণ, শর্তাবলি এবং প্রয়োগের স্থান ও পাত্র অথবা এমন অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যা সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। 'অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ' এর একটি দৃষ্টান্ত হলো নিষিদ্ধ খাবারের তালিকা। কুর'আঁনে যেসব খাদ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার বাইরেও আরও কিছু খাদ্য হাদীসের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নাবি মুহাম্মাদ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
... وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَيتَ ...
"তিনি তাদের জন্য কল্যাণকর ও পবিত্র জিনিসগুলোকে হালাল এবং অকল্যাণকর ও অপবিত্র জিনিসগুলোকে হারাম করেন।" (আল-আ'রাফ, ৭:১৫৭)
আনাস ইবন মালিক বলেন,
"খাইবার যুদ্ধের সময় একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী এসে বললেন, "হে রসূলুল্লাহ, গাধাগুলো খেয়ে ফেলা হচ্ছে।" তারপর, আরেকজন এসে বললেন, "হে আল্লাহর রসূল! গাধাগুলোকে ধ্বংস করা হচ্ছে।" তখন রসূলুল্লাহ আবু তলহাকে পাঠালেন এই ঘোষণা দেওয়ার জন্য যে, "আল্লাহ ও তাঁর রসূল তোমাদের জন্য গৃহপালিত গাধা খাওয়াকে নিষেধ করেছেন। কারণ তা খারাপ (এবং অপবিত্র)।" (৩৬)
অনেক ক্ষেত্রে কুর'আনের আয়াতে বর্ণিত থাকে সাধারণ মূলনীতি। সেখান থেকে নাবি খুঁটিনাটি বিধিবিধান বের করে এনেছেন। এগুলো সঠিক হলে আল্লাহ সত্যায়ন করেছেন, অন্যথায় সংশোধন করে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, কুর'আঁন থেকে বের করে আনা নাবি-এর সঠিক সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো একইসাথে খালা-বোন/ঝি কিংবা ফুফু-ভাতিজিকে বিয়ের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ। আল্লাহ মা ও মেয়েকে অথবা একই সাথে দুবোনকে বিয়ে করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এরপর তিনি বলছেন,
.... وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءَ ذَلِكُمْ
"এদের ছাড়া বাদবাকি সমস্ত মহিলাকে বিয়ে করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে..." (আন-নিসা' ৪:২৪)
তবে আবু হুরায়রাহ বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রসূল বলেছেন, "তোমাদের কেউ যেন কোনো মহিলাকে এবং তার ফুফু কিংবা খালাকে একসাথে বিয়ে না করে।" (৩৭)
মা ও মেয়েকে অথবা একসাথে দুবোনকে বিয়ে করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের নেপথ্য কারণ খালা-বোন ঝি কিংবা ফুফু-ভাতিজিকে একসাথে বিয়ে করার মধ্যেও বিদ্যমান। সম্ভবত এ কারণে নাবি কুর'আনের আলোকে এই বিধান দিয়েছেন। কারণ, তিনি এ বিধান জারি করার পর এ কথাও বলেছেন যে, "তোমরা এরূপ করলে পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাবে।"
এই বক্তব্য থেকে নাবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, দুই বোন অথবা মা-মেয়েকে একসাথে বিয়ে করলে একাধিক স্ত্রীর মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে যেভাবে তাদের পবিত্র সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ঠিক তেমনি কোনো খালা- বোন ঝি কিংবা ফুফু-ভাতিজিকে একসাথে বিয়ে করলে তাদের মধ্যকার পারিবারিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নাবি-এর যে সকল সিদ্ধান্ত আল্লাহ সংশোধন করে দিয়েছেন তার মধ্যে জিহার তুলাক্ অন্যতম। খাওলাহ বিন্ত সা'লাবাহ (রদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,
"আমার স্বামী আওস ইব্ন আস-সামিত একদিন আমাকে বলেন, "তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পৃষ্ঠদেশের মতো।” ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার জন্য আমি আল্লাহর রসূলের কাছে গেলাম। তবে, আল্লাহর রসূল আমার সাথে ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, "সে তোমার চাচাত ভাই, তুমি আল্লাহকে ভয় করো।" কিন্তু আমি অভিযোগ অব্যাহত রাখি। অবশেষে এই আয়াত অবতীর্ণ হলো:
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ ﴿﴾ الَّذِينَ يُظْهِرُونَ مِنكُم مِّن نِّسَابِهِم مَّا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتِهُمْ إِلَّا الَّتِي وَلَدْنَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنكَرًا مِنَ الْقَوْلِ وَزُورًا ...
"আল্লাহ অবশ্যই সেই নারীর কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার কাছে কাকুতি-মিনতি করছে এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করছে। আল্লাহ তোমাদের দুজনের কথা শুনছেন; তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন। তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে জিহার করে, তাদের স্ত্রীরা তাদের মা নয়। তাদের মা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে প্রসব করেছে। এসব লোক অতি অপছন্দনীয় ও মিথ্যা কথাই বলে থাকে।" (আল-মুজাদালাহ, ৫৮:১-২) (৩৮)
নাবি মনে করেছিলেন, তুলাকের একটি বৈধ পদ্ধতি জিহার। তিনি খাওলাহকেও তা মেনে নিতে বলছিলেন। কিন্তু, আল্লাহ তা অবৈধ ঘোষণা করেন।
নাবি এর নিজের পক্ষ থেকে দেওয়া এমন কিছু মতামতও রয়েছে যেগুলোকে আল্লাহ শার'ঈ বিধান হিসেবে অনুমোদন দেননি। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, সুন্নাহ কেবল দীনি বিধিবিধানের সাথেই সম্পৃক্ত। নাবি তাঁর যেসব ব্যক্তিগত অভ্যাস ও আচার-আচরণ তাঁর সহাবিদের অনুসরণের নির্দেশ দেননি-তা দীনি সুন্নাহর আওতা বহির্ভূত। উদাহরণস্বরূপ, রাফি' ইব্ন খাদীজ বর্ণনা করেন যে, নাবি মাদীনায় এসে লোকদের খেজুর গাছে পরাগায়ন করতে দেখে তিনি এর কারণ জানতে চান। তারা বললেন যে, এভাবে কৃত্রিম উপায়ে তারা গাছে পরাগায়ন করছেন। এরপর তিনি বললেন, "সম্ভবত এটা না করলেই ভালো হতো।"
তারা সে কাজ ছেড়ে দিলে সে বছর খেজুরের ফলন অনেক কমে গেল। নাবিকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি বলেন,
"আমি একজন মানুষ। তাই দীনের ব্যাপারে আমি যদি তোমাদের কিছু করতে বলি, তোমরা তা মেনে চলো। তবে, আমি যদি কোনো কিছু ব্যক্তিগত মত থেকে বলি, তাহলে মনে রাখবে আমিও একজন মানুষ।" আনাস বর্ণনা করেন যে, নাবি আরও বলেন,
"পার্থিব ব্যাপারে তোমাদেরই জ্ঞান বেশি।” (৩৯)
নাবি তাঁর সহাবিদের আরও বলেছেন যে, তাঁর কাছে যে সকল অভিযোগ দায়ের করা হয় সেগুলোর ক্ষেত্রেও তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলতে পারেন। কারণ, কোনো কোনো ব্যাপারে তিনি ব্যক্তিগত মতামত অনুযায়ী রায় দিয়ে থাকেন। উম্ম সালামাহ বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রসূল বলেছেন,
"আমি কেবল একজন মানুষ। আর তোমরা আমার নিকট তোমাদের বিচার নিয়ে আসো। হতে পারে তোমাদের কেউ কেউ তার দাবি উপস্থাপনে অপরের তুলনায় অধিক বাগ্মী। আর আমি তাদের কাছ থেকে যা শুনি তার ভিত্তিতেই রায় দিয়ে থাকি। অতএব, আমি যদি কারো পক্ষে এমন কিছুর রায় দিয়ে দিই যা মূলত তার ভাইয়ের পাওনা, তাহলে সেটি তার না নেওয়া উচিত। কারণ, আমি তাকে কেবল জাহান্নামের একটি টুকরাই দিয়েছি।" (৪০)
ব্যক্তিগত বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের ভিত্তিতে প্রদত্ত এসব সিদ্ধান্ত নাবি এর সহাবিদেরকে শারী'আহ বাস্তবায়ন পদ্ধতির একটি কার্যকর প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা এটাও শিখেছেন যে, মানবীয় সাধ্যের অতীত কোনো কারণে অনিচ্ছাকৃত ভুল রায়ের জন্য কোনো বিচারককে দায়ী করা যায় না। এ বিষয়টির উপর বাড়তি গুরুত্ব আরোপ করে নাবি বলেছেন,
"কোনো ব্যক্তি ইজতিহাদের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হলে তার জন্য রয়েছে দুটি পুরস্কার; আর ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হলে একটি পুরস্কার।" (৪১)
তবে, এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই জ্ঞানের ভিত্তিতে হতে হবে। কারণ, আল্লাহর রসূল বলেছেন,
"বিচারক তিন শ্রেণির; এর মধ্যে এক শ্রেণি জান্নাতে আর দুই শ্রেণি জাহান্নামে যাবে। জান্নাতবাসী শ্রেণির বৈশিষ্ট্য হলো এরা সত্যকে জেনে সে অনুযায়ী ফায়সালা করে। আর যে ব্যক্তি সত্যকে জেনে অন্যায় রায় দেবে সে হবে জাহান্নামি। অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়াই মানুষের জন্য ফায়সালা করে দিবে সেও জাহান্নামি।" (৪২)
আইনগত সিদ্ধান্ত প্রদানে দক্ষতা অর্জনের জন্য নাবি তাঁর সহাবিদদের সিদ্ধান্ত প্রদানে উৎসাহিত করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে এমনভাবে প্রস্তুত করা যেন তাঁর ইন্তেকালের পর তারা শারী'আহ যথাযথ বাস্তবায়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে পারেন।
'আলি ইবন আবি তালিব বলেছেন,
"আল্লাহর রসূল আমাকে ইয়েমেনের বিচারক হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল, আপনি আমাকে পাঠাচ্ছেন; অথচ আমার বয়স কম। তাছাড়া বিচার ফায়সালা করার অভিজ্ঞতাও আমার নেই।' তিনি উত্তর দিলেন, "আল্লাহ তোমার অন্তরকে দিকনির্দেশনা দেবেন এবং তোমার জিহ্বাকে (সত্যের উপর) সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন। যখন বাদী-বিবাদী দুজন তোমার সামনে বসবে, তখন তুমি উভয় পক্ষের বক্তব্য ভালোমতো না শুনে কোনো সিদ্ধান্ত দেবে না। কারণ, বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া সঠিক রায় প্রদানের জন্য অধিক সহায়ক।" (৪৩)
আবু সা'ঈদ আল-খুদরি বর্ণনা করেছেন,
"কুরায়জাহ গোত্র এ শর্তে আত্মসমর্পণ করেছিল যে, সা'দ ইব্ন মু'আয তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দেবেন। তারপর আল্লাহর রসূল তাঁকে ডেকে পাঠালেন। গাধার পিঠে চড়ে সা'দ মাসজিদ আন-নাবাউইর কাছে এলে আল্লাহর রসূল মাদীনার মুসলিম আনসারদের বললেন, "তোমাদের নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে দাঁড়াও।" তারপর তিনি সা'দকে বললেন, "তোমার সিদ্ধান্ত মেনে নেবে—এই শর্তে লোকগুলো আত্মসমর্পণ করেছে।" সা'দ বললেন, "তাদের যুদ্ধক্ষম সকল পুরুষকে হত্যা করা হোক, আর তাদের নারী ও শিশুদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে গ্রহণ করা হোক।" এ কথা শুনে নাবি বললেন, 'তুমি আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী বিচার করেছ।" (৪৪)
শার'ঈ মূলনীতির আলোকে সমকালীন নানা সমস্যার সমাধানে বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত ও তাতে উপনীত হওয়ার প্রক্রিয়ার নাম ইজতিহাদ। উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামি আইনের ক্রমবিকাশের এ পর্যায়ে নাবি নিজে ও তাঁর সহাবিগণও ইজতিহাদ চর্চা করেছেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, নাবি -এর ইজতিহাঁদগুলো আইনের কোনো সুতন্ত্র উৎস নয়। কারণ, এগুলোর বৈধতা নির্ভর করত অনুমোদনসূচক ঐশী প্রত্যাদেশের ওপর। অতএব, নাবি -এর ইজতিহাদগুলো ছিল মূলত সহাবিদেরকে ইজতিহাদের সঠিক পদ্ধতি শেখানোর মাধ্যম। আর এ পর্যায়ে সহাবিদের ইজতিহাদগুলো ছিল মূলত এক ধরনের অনুশীলন।
টিকাঃ
(৩১) বুখারি, খন্ড ১, পৃ. ৩৪৫, হাদীস নং ৬০৪।
(৩২) সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ১, পৃ. ২৩৬, হাদীস নং ৯২৭। শাইখ আলবানি সহীহ্ সুনান আবি দাউদ, গ্রন্থে এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৩৩) হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন বায়হাকি, আল-হাকিম ও ইব্ন খুযায়মাহ। মুসতাফা আল-আ'যামি সহীহ্ ইবন খুযায়মাহ (বৈরুত, আল মাকতাব আল-ইসলামি, প্রথম সংস্করণ, ১৯৭৮, খন্ড ১, পৃ. ৩২৮, হাদীস নং ৬৫৪) গ্রন্থে ও শাইখ আলবানি সিফাহ সলাত আন-নাবি, (বৈরুত, আল মাকতাব আল-ইসলামি, চতুর্দশ সংস্করণ, ১৯৮৭, পৃ. ১০৯) গ্রন্থে এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৩৪) সুনান আবি দাউদ, খন্ড ১, পৃ. ১৯৪, হাদীস নং ৭৫৪। শাইখ আলবানি হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সহীহ সুনান আবু দাউদ, খন্ড ১, পৃ. ১৪৪, হাদীস নং ৬৮৬।
(৩৫) সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ১, পৃ. ২১৫, হাদীস নং ৮৩৯। শাইখ আলবানি সহীহ্ সুনান আবি দাউদ, গ্রন্থে এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৩৬) মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৭২, হাদীস নং ৪৭৭৮।
(৩৭) বুখারি, খন্ড ৭, পৃ. ৩৪, হাদীস নং ৪৫; মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ. ৭০৯-৭১০, হাদীস নং ৩২৬৮; ও সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ২, পৃ. ৫৫১, হাদীস নং ২০৬১।
(৩৮) সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ৩, পৃ. ৫৯৮, হাদীস নং ২২০৮। শাইখ আলবানি হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন; সহীহ্ সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ২, পৃ. ৪১৭-৪১৮।
(৩৯) রাফি' ইবন খাদীজ ও আনাস বর্ণিত উক্ত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১২৫৯, হাদীস নং ৫৮৩১-৫৮৩২।
(৪০) সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ৩, পৃ. ১০১৬, হাদীস নং ৩৫৭৬। শাইখ আলবানি এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৪১) 'আম্র ইবন আল-আঁস বর্ণিত উক্ত হাদীসটি সংকলন করেছেন ইমাম বুখারি, খণ্ড ৯, পৃ. ৩৩০, হাদীস নং ৪৫০ ও সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ৩, পৃ. ১০১৩-১০১৪, হাদীস নং ৩৫৬৭।
(৪২) বুরায়দাহ বর্ণিত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন। ইমাম আবু দাউদ, খন্ড ৩, পৃ. ১০১৩, হাদীস্ নং ৩৫৬৬। শাইখ আলবানি সাহীহ্ সুনান আবি দাউদ, গ্রন্থে এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৪৩) সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ৩, পৃ. ১০১৬, হাদীস নং ৩৫৭৬। শাইখ আলবানি সহীহ সুনান আবি দাউদ, গ্রন্থে এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৪৪) মুসলিম, খন্ড ৩, পৃ. ৯৬৬, হাদীস নং ৪৩৬৮।
📄 অধ্যায় সারাংশ
১ প্রাথমিক যুগের ইসলামি আইন ছিল মূলত শারী'আহ আইনের সমষ্টি। এগুলো ওয়াহয়ি আকারে অবতীর্ণ হয়ে কুর'আন ও সুন্নাহতে সংরক্ষিত ছিল। এ সকল আইনের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু ছিল ইসলামের ভিত্তি তথা ঈমান ও উদীয়মান মুসলিম রাষ্ট্রের সংগঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থ- সামাজিক বিধিবিধানসংক্রান্ত।
২ কুর'আনে আইন প্রণয়নের ভিত্তি ছিল মানব জাতির সংস্কার সাধন। এ উদ্দেশ্যে মানব জাতির জন্য প্রচলিত কল্যাণকর প্রথাগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসলামিক আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৩ সংস্কারের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কুর'আনিক আইনে নিম্নোক্ত মূলনী- তিগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে:
৩.ক. কাঠিন্য দূরীকরণ ৩.খ. বিধিবিধানের সংখ্যা হ্রাস ৩.গ. জনকল্যাণ নিশ্চিত করা ৩.ঘ. সার্বজনীন সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা।
৪ এ যুগেই ফিক্হশাস্ত্র ক্রমবিকাশের সূচনা হয়। নাবি নিজে কুর'আন ও সুন্নাহ থেকে আইনি সিদ্ধান্তগ্রহণের মাধ্যমে এই শাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেন।
৫ নাবি নিজে সহাবিদদেরকে ইজতিহাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। আর এভাবে এ যুগেই গঠিত হয়েছিল প্রথম মাযহাবটি।