📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 কুর’আনের সাধারণ বিষয়বস্তু

📄 কুর’আনের সাধারণ বিষয়বস্তু


মাক্কায় মুসলিমগণ ছিল নির্যাতিত সংখ্যালঘু। অন্যদিকে মাদীনায় হিজরাত করার পর তারা সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী এবং শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী হন। অবস্থার এই পরিবর্তনের ফলে কুর'আনিক আইনের ধরন প্রকৃতির মধ্যেও এমন কিছু বৈচিত্র্য আসে যার ফলে দুটি স্তরের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য দৃশ্যমান হয়。
মাক্কি যুগ (৬০৯-৬২২ সাল) এ যুগের শুরু মাক্কায় নুবুওয়াতের সূচনা থেকে, আর সমাপ্তি মক্কা ছেড়ে মাদীনায় নাবি ﷺ -এর হিজরতের মধ্য দিয়ে। এ যুগের ওয়াহয়ির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ঈমান ও ইসলামের ভিত্তি নির্মাণ, যেন নবদীক্ষিত সহাবিদেরকে ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কঠিন কাজের জন্য প্রস্তুত করা যায়। মাক্কায় অবতীর্ণ ওয়াহয়ির আলোচ্য বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের মূল তত্ত্বগুলোকেই কোনো না কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছে। নিচে এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করা হলো:
ক) তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ব
প্রাচীন কাল থেকেই মাক্কার লোকেরা আল্লাহকে বিশ্বাস করত। তবে একই সাথে তারা কিছু দেবতাকে আল্লাহর ক্ষমতার অংশীদার অথবা মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও বিশ্বাস করত। তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসকে নির্মূল করতে এ সময়ের ওয়াহয়ির বাণীতে আল্লাহ -র একত্বের ঘোষণা করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ ভালো-মন্দ কিছু করার ক্ষমতা রাখে না।
খ) আল্লাহর অস্তিত্ব
মাক্কার কিছু সংখ্যক লোক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করত না। তাই আল্লাহর অস্তিত্বকে প্রমাণ করতে ওয়াহয়ির মাধ্যমে কিছু অকাট্য যুক্তি তাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
গ) পরকাল
পরকাল সম্পর্কে জানার কোনো মাধ্যম মানুষের কাছে নেই, তাই মাক্কি যুগের ওয়াহয়িতে পরকালের বিস্ময়, রহস্য ও বিভীষিকাগুলো সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে।
ঘ) ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন জনগোষ্ঠী
বেশ কিছু মাক্কি আয়াতেই 'আঁদ ও সামূদ জাতির মতো ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন সভ্যতাগুলোর উদাহরণ উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করার কারণেই তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। এসব আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম অমান্যকারীদের সতর্ক করা হয়েছে এবং ঈমানদারদের কাছে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
ঙ) সলাত সলাত ও তাওহীদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই মাক্কি যুগে ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে কেবল সুলাতকেই তাওহীদের সাথে ফার্দ করা হয়েছে।
চ) চ্যালেঞ্জ কুর'আঁন কোনো সাধারণ বই নয়, বরং এটি বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এক মহান গ্রন্থ। অন্য যেকোনো গ্রন্থ থেকে এটি একেবারেই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী অনন্য ও অতুলনীয় এক গ্রন্থ। মাক্কার মুশরিকদের সামনে এই বিষয়টি প্রমাণের জন্য কিছু আয়াতে আরববাসীকে এর অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনা করার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে।(৬)
মাদানি যুগ: ১-১১ হিজরি (৬২২-৬৩২ সাল) হিজরাতের মাধ্যমে এ যুগের সূচনা। আর এ যুগের সমাপ্তি ঘটে ১১ হিজরিতে (৬৩২ সাল) নাবি-এর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে। মাদীনায় ইসলামের প্রসার লাভের পর নাবি সেখানে হিজরাত করেন এবং মাদীনার শাসক নিযুক্ত হন এবং মুসলিম জনগোষ্ঠী পরিণত হয় একটি উদীয়মান রাষ্ট্র শক্তিতে। এ প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ ওয়াহয়ির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নবগঠিত মুসলিম রাষ্ট্রটিকে সুসংহত করা। আর এ সময়েই ইসলামি শারী'আহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক আইনের সিংহভাগ অবতীর্ণ হয়। মাক্কি যুগে ঈমান ও তাওহীদের যে-মৌলিক শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল মাদানি যুগের ওয়াহয়ির মাধ্যমে সেসবের ভিত্তি আরও মজবুত করা হয়েছিল। তবে মাদীনায় অবতীর্ণ ওয়াহয়ির নিম্নোক্ত মৌলিক বিষয়বস্তুর বেশিরভাগ এমন সব আইনের প্রতিই অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে, যা একটি ইসলামি রাষ্ট্রের ক্রমবিকাশের জন্য অপরিহার্য।

টিকাঃ
(৬) আল-মাদখাল, পৃ. ৫১-৫৫।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 কুর’আনে আলোচিত আইনসংক্রান্ত বিষয়

📄 কুর’আনে আলোচিত আইনসংক্রান্ত বিষয়


মহাগ্রন্থ আল-কুর'আঁনে অবতীর্ণ আইনকানুনগুলো মূলত মানব জাতির সামগ্রিক কল্যাণের জন্য তাদের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া বিধিবিধান। এধরনের বিধিবিধানগুলোকে দুটি মৌলিক ভাগে ভাগ করা যায়:
১. হাক্কুল্লাহ বা মানুষের উপর মহান আল্লাহর অধিকারসংক্রান্ত বিষয়। সকল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা 'ইবাদাতই আল্লাহর প্রাপ্য এসব অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। তবে এগুলোর মধ্যে কিছু 'ইবাদাত রয়েছে এমন, যেগুলোর সঙ্গে অন্য মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই; যেমন: সলাত ও সিয়াম। আবার কিছু 'ইবাদাত রয়েছে এমন যার সাথে আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন বিষয় জড়িত; যেমন: যাকাত। আবার কিছু 'ইবাদাত রয়েছে এমন যেগুলোর সাথে সামাজিক ও শারীরিক সংশ্লিষ্টতা বিদ্যমান, যেমন: হাজ্জ। ঈমানের পর এ চারটি 'ইবাদাতই হলো ইসলামের মূল স্তম্ভ।
২. মানুষের উপর মানুষের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়। এ ধরনের আইনগুলোকে বিষয়বস্তুর বিবেচনায় চারটি উপভাগে ভাগ করা যায়:
ক. ইসলামের সুরক্ষা ও প্রচার-প্রসার নিশ্চিতকরণ সংক্রান্ত আইন। এতে রয়েছে সশস্ত্র ও নিরস্ত্র জিহাদের বিধিবিধানগুলো।
খ. পরিবার গঠন ও তা সুরক্ষার জন্য পারিবারিক আইন। এর মধ্যে রয়েছে বিয়ে, তলাক ও উত্তরাধিকার ইত্যাদি সংক্রান্ত আইন।
গ. ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত আইন, যার মধ্যে রয়েছে লেনদেন ও বিভিন্ন চুক্তিনামা সম্পাদনসংক্রান্ত নিয়মনীতি ইত্যাদি।
ঘ. ফৌজদারি আইন; যার অধীনে রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, চুক্তি, ভাড়াসহ অন্যান্য যাবতীয় বিষয়ে আইন ভঙ্গ করে সংগঠিত অপরাধের শাস্তি বিষয়ক বিধিবিধান। (৯)

টিকাঃ
(৯) তারীখ আত-তাশরী' আল-ইসলামি, পৃ. ৩৪-৩৫।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 কুর’আনে আইন প্রণয়নের ভিত্তি

📄 কুর’আনে আইন প্রণয়নের ভিত্তি


স্বয়ং কুর'আনেই বলা হয়েছে যে, এ গ্রন্থ অবতীর্ণের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবজাতির চিন্তা-চেতনা, আদর্শ-বিশ্বাস ও সভ্যতা-সংস্কৃতির সংস্কার সাধন। প্রাক-ইসলামি যুগের সকল আচারপ্রথাকে ইসলাম নির্বিচারে বাতিল ঘোষণা করেনি, বরং কেবল মানব সমাজের জন্য ক্ষতিকর সকল বিকৃত প্রথা ও কুসংস্কারগুলোকেই বাতিল করেছে। যেমন, ইসলামি আইন সুদি কারবারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কারণ, এ শোষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিত্তবানরা সমাজের অসহায় মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে প্রাচুর্যের পাহাড় গড়ে তোলে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত এসব কুপ্রথার আরেকটি হলো ব্যভিচার। এ অনাচার নারী নির্যাতন ও পারিবারিক বন্ধন ধ্বংসের প্রধান কারণ। তাই ইসলাম এই জঘন্য অশ্লীলতাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ব্যক্তি ও সমাজের শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতাকে মারাত্মকভাবে কলুষিত করে বলে নেশা জাতীয় দ্রব্যকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পারস্পরিক সম্মতিকে ব্যবসার ভিত্তি ঘোষণা করা হয়েছে। সকল প্রকার প্রতারণামূলক ব্যবসা-বাণিজ্যকে নিষিদ্ধ করে ব্যবসাসংক্রান্ত আইন-কানুনের ব্যাপক সংস্কার সাধন করা হয়েছে। বিয়েশাদির প্রচলিত ব্যবস্থাকেও সংস্কার করা হয়েছে। ইসলামি মূল্যবোধের সাথে সংগতিপূর্ণ কিছু পদ্ধতিকে বহাল রেখে বাকিগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ এসব প্রথাগুলো ছিল মূলত বিয়ের নামে ব্যভিচার কিংবা তার মতোই কিছু প্রক্রিয়া। তলাক প্রদানের নিয়মকে নীতিগতভাবে যদিও ইসলামে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে; তবে তার প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিকে অনেকটা পরিমার্জিত করা হয়েছে।
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইসলাম কখনোই মানব সভ্যতা, নৈতিকতা ও আচার প্রথাকে বিশেষ কোনো শত্রুতামূলক মনোভাব নিয়ে ধ্বংস করতে আসেনি। তাই নতুন সভ্যতা বিনির্মাণে ইসলাম সব কিছুকে দেখেছে মানব কল্যাণের মহৎ দৃষ্টিকোণ থেকে। ইসলাম সব সময়ই ক্ষতিকর আচার প্রথা ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করেছে এবং কল্যাণকর নিয়মনীতিগুলো বহাল রেখেছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ ও কুর'আনে বলেন:
... يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَنْهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ... (১৫৭)
"এটা তাদের সৎকাজের আদেশ দেয়, আর অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে। কল্যাণকর জিনিসগুলোকে হালাল ও ক্ষতিকর জিনিসগুলোকে হারাম করে।" (আল-আ'রাফ ৭: ১৫৭)
নীতিগতভাবেই ইসলাম একটি গঠনমূলক জীবনব্যবস্থা; ধ্বংসাত্মক নয়। এর লক্ষ্যই হচ্ছে কেবল সংস্কার সাধন ও পুনর্গঠন; নিছক নিয়ন্ত্রণ ও শাসন নয়। তবে জেনে রাখা দরকার যে, ইসলামি জীবনব্যবস্থায় আরবের কিছু প্রথাকে বহাল রাখার অর্থ এই নয় যে, ইসলাম তার আইন-কানুন ও মূলনীতিগুলো অন্য কোনো উৎস থেকে ধার করেছে। আবার এমন ধারণা করাও উচিত নয় যে, এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া আইন ও বিধি-বিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়। সমাজে প্রচলিত নিয়মনীতির যা কিছু ইসলাম সমর্থন করেছে তা সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে বলেই মনে করতে হবে। কারণ:
ক) আল্লাহ পূর্ববর্তী প্রত্যেক নাবি-রসূলের উপরই কিছু না কিছু 'ইবাদাত ও বিধি-বিধান আরোপ করেছিলেন। সেগুলোরই কিছু কিছু নিয়মনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে আরবরা লাভ করেছে। এর একটি উত্তম উদাহরণ হলো হাজ্জ। এটি চালু করেছিলেন নাবি ইবরাহীম আ. ও ইসমা'ঈল আ.।
খ) ইসলামের মূলনীতিগুলো মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তির সাথে মোটেই সাংঘর্ষিক নয়; এতে অযৌক্তিক কিছুই নেই। এগুলো বরং মানবীয় বিচারবুদ্ধিকে অযৌক্তিকতার হাত থেকে রক্ষা করে। তাই ইসলামি আইনে মানুষের বুদ্ধিপ্রসূত ভালো কাজগুলোকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
গ) ইসলাম সমাজের প্রচলিত যেসব কল্যাণকর প্রthaকে বহাল রেখেছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা ছিল অনস্বীকার্য। অনুমোদিত প্রথাগুলো যদি তৎকালীন সমাজে আগে থেকে না-ও থাকত, তবে মানুষের প্রয়োজনের তাগিদেই ইসলাম হয়তো সেগুলোকে নতুন করেই চালু করত।
তবে বহাল রাখা প্রথার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বাতিলকৃত প্রথার চেয়ে অনেক কম। অধিকন্তু, এগুলোকে হুবহু আগের আকৃতিতে বহাল রাখা হয়নি, কেবল ভিত্তিটুকুই অবিকৃত রয়ে গিয়েছে। (১০)
ইসলামি শারী'আহ সংস্কারের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে কতগুলো আইনগত বিধিনিষেধ জারি করেছে, যেগুলো মুসলিম জাতির সামাজিক আচরণবিধির নৈতিক অবকাঠামো গড়ে তোলে। তবে, মহাগ্রন্থ আল-কুর'আন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত চারটি মৌলিক নীতিকে বিবেচনায় রেখেছে।
১. কাঠিন্য দূরীকরণ
ইসলামি জীবনব্যবস্থা মানুষের কল্যাণের জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে। এটি মানুষের জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। এ দিকনির্দেশনার উদ্দেশ্য হলো মানুষের জন্য এমন একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যেখানে মানুষ আল্লাহর নির্দেশ পালন করে ন্যায়নিষ্ঠ জীবন যাপন করতে পারবে। কারও উপরে তার সাধ্যাতীত কোনো বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কখনোই ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। অন্যান্য ধর্মের মতো আধ্যাত্মিক উন্নতির নামে ইসলাম মানুষের উপর কোনো কঠোরতা চাপিয়ে দেয়নি। এ আইনের উদ্দেশ্য হলো মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক ন্যায়সঙ্গত প্রয়োজনগুলো পূরণ করা। অনুরূপভাবে, ইসলামের বুনিয়াদি বিষয়গুলো থেকে সকল অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা দূর করা হয়েছে। মানুষের জীবনের বিভিন্ন কঠোরতা দূর করে তাদের জীবনযাত্রা সহজ সাবলীল করার নীতি ছড়িয়ে আছে গোটা কুর'আন জুড়েই।
কুর'আনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো এর অল্প কয়েকটি উদাহরণ:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ... ) (২৮৬)
"আল্লাহ কারও ওপরই তার সাধ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব চাপান না।" (আল-বাকারাহ, ২:২৮৬)
... يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ ... "আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের কষ্ট দিতে চান না।" (আল-বাকারাহ, ২:১৮৫)
... وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ... "তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি।" (আল-হাজ্জ, ২২:৭৮)
يُرِيدُ اللَّهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمْ وَخُلِقَ الْإِنسَانُ ضَعِيفًا "আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে (বিধি-নিষেধ) হালকা করতে চান, কারণ মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।" (আন-নিসা' ৪:২৮)
এসব নীতির কারণে আল্লাহ মানুষের জন্য বিভিন্ন ছাড় দিয়েছেন; যেমন, সফরের সময় সিয়াম না রাখা, চার রকা'আত বিশিষ্ট ফার্দ সলাত দুই রকা'আত করে এবং জুহহ্র-'আস্ত্র ও মাগরিব-'ইশাকে মিলিয়ে আদায় করার অনুমতি। অধিকন্তু, তীব্র প্রয়োজনে নিষিদ্ধ বস্তু (যেমন শূকরের গোশত ও অ্যালকোহল ইত্যাদি) গ্রহণের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفٌ لِإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ "তবে যদি কোন ব্যক্তি তীব্র ক্ষুধার তাড়নায় (হারাম খেতে) বাধ্য হয় তাহলে নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী।" (আল-মা'ইদাহ, ৫:৩)
নাবি ছিলেন ইসলামি আইনগুলো বাস্তব প্রয়োগের সর্বোত্তম উদাহরণ। বর্ণিত আছে যে, যখনই তাঁর সামনে দুটি বৈধ পন্থা খোলা থাকত তখন তিনি সব সময়ই অপেক্ষাকৃত সহজ পন্থাটিকে বেছে নিতেন। (১১) আরেকটি ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, কিছু সহাবিকে ইয়েমেনে পাঠানোর প্রাক্কালে তিনি বলেছিলেন,
“(লোকদের জন্য) বিভিন্ন বিষয় সহজ করে দিয়ো, কঠিন করে দিয়ো না।” (১২) ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞগণ সকলেই বলেছেন যে, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দয়াময় আল্লাহ মানুষের দুর্বলতার দিকটি বিবেচনায় রেখেই তাদের উপর থেকে কাঠিন্য দূরীকরণের এই নীতিটি অনুসরণ করেছেন। বাস্তব জীবনে ইসলামি বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ইসলামি আইনবিদগণ এই মূলনীতির ভিত্তিতে বেশ কিছু ইজতিহাদি নীতি নির্ধারণ করছেন। (১৩)
২. বিধিনিষেধের সংখ্যা হ্রাস উল্লিখিত কাঠিন্য দূরীকরণের মূলনীতির সাথে সংগতি রেখেই ইসলামে আরোপিত শার'ই বিধিনিষেধের সংখ্যা খুবই সীমিত রাখা হয়েছে। প্রত্যক্ষ নিষিদ্ধ কাজ বা হারাম ঘোষিত বস্তুর সংখ্যা ইসলামি আইনে খুবই অল্প। কুর'আনে হালাল-হারাম নির্ধারণের পদ্ধতির উপর একটু গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে এ নীতির পরিষ্কার প্রতিফলন দেখা যায়। নিষিদ্ধ বস্তুর তালিকা দেওয়া হয়েছে, অথচ অনুমোদিত বস্তুর সংখ্যার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই; তাই কোনো তালিকা উল্লেখ না করে এগুলোর ক্ষেত্রে একটি সাধারণ অনুমোদন দিয়ে দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যে সব নারীর সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ তাদের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ (٤)
"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, কন্যা, বোন, ফুফু ...।" (আন-নিসা', ৪:২৩)
বিয়ে করা নিষিদ্ধদের এ তালিকা দেওয়ার পর আল্লাহ বলেন,
وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءَ ذَلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَلِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ
"এরা ছাড়া তোমাদের সম্পদ দিয়ে (মোহর আদায় করে) অন্য যেকোনো নারীকে এই শর্তে তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে যে, তোমরা তাদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করবে, অবাধ যৌন লালসা তৃপ্ত করবে না।" (আন-নিসা', ৪:২৪)
আবার নিষিদ্ধ খাদ্যবস্তুরও একটি বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কুর'আন বলছে,
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ
"তোমাদের জন্য হারাম করে দেওয়া হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে জবাইকৃত পশু এবং নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে মরে যাওয়া পশু...।" (আল-মা'ইদাহ, ৫:৩)
অন্যদিকে হালাল খাদ্যের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
الْيَوْمَ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَتُ وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حِلٌّ لَّكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلَّ لَّهُمْ .)
"আজ তোমাদের জন্য সকল কল্যাণকর বস্তুকে হালাল করে দেওয়া হয়েছে। আহলুল-কিতাবিদের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল এবং তোমাদের খাদ্যও তাদের জন্য হালাল।' (আল-মা'ইদাহ, ৫:৫)
অধিকন্তু, নিষিদ্ধ বস্তুর সংখ্যা খুবই অল্প হওয়া সত্ত্বেও নিরুপায় ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ বস্তু গ্রহণ করে তবে তার কোনো গুনাহ হবে না। এর উদাহরণ ইতিপূর্বেই দেওয়া হয়েছে। এ অব্যাহতির কথা আল্লাহ কুর'আনের বেশ কয়েক জায়গায় উল্লেখ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ:
فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغِ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ) (۱۷۳
"অবশ্য যে-লোক নিরুপায় হয়ে পড়ে এবং নাফরমানি ও সীমালঙ্ঘনকারী না-হয়, তার জন্য কোনো পাপ নেই। নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।" (আল-বাকারাহ, ২:১৭৩)
মহান দয়াময় আল্লাহ কুর'আন অনুসরণে আগ্রহী মানুষদের জন্য কোনো কঠোরতা সৃষ্টি করতে চাননি। তাই কুর'আনে সামগ্রিক আইনগুলোর খুব বেশি খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ দেওয়া হয়নি। কুর'আনের বেশ কিছু আয়াতে এ মূলনীতির ইঙ্গিত রয়েছে। নিম্নোক্ত আয়াতটি এগুলোর অন্যতম,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَسْتَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِن تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ وَإِن تَسْتَلُوا عَنْهَا حِينَ يُنَزَّلُ الْقُرْءَانُ تُبْدَ لَكُمْ عَفَا اللَّهُ عَنْهَا وَاللَّهُ غَفُورٌ حَلِيمٌ )
"তোমরা যারা বিশ্বাস করো, এমন কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করো না যা তোমাদের কাছে প্রকাশ করে দেওয়া হলে তোমাদের খারাপ লাগবে। কুর'আন নাযিলের সময় যদি তোমরা সেসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করো তাহলে তা তোমাদের সামনে প্রকাশ করে দেওয়া হবে; আল্লাহ তা থেকে মাফ করুন, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম সহনশীল।" (আল-মা'ইদাহ, ৫:১০১)
এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলো কারও প্রশ্নের কারণে আল্লাহ আবশ্যক করে দিয়েছেন। অথচ তারা যদি প্রশ্ন উত্থাপন না করত, তাহলে হয়তো আল্লাহ সেই বিষয়টিকে ঐচ্ছিক হিসেবে রেখে দিতেন। উপরোক্ত আয়াতটিতে মানুষের জন্য কঠোরতা আরোপ করতে পারে এমন কোনো অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতেই নিষেধ করা হয়েছে। একবার সহাবিদের কেউ কেউ হাজ্জ প্রতি বছর ফার্দ কি না-এ মর্মে নাবি-কে প্রশ্ন করেন। তিনি প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তারা একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে।
অবশেষে তাঁর জবাব থেকে এ ধরনের প্রশ্ন করার উপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিই ফুটে ওঠে। (১৪) তিনি তখন বলেন,
"আমি যদি বলতাম, হ্যাঁ—তাহলে তা বাধ্যতামূলক হয়ে যেত। আমি যেসব বিষয়ে তোমাদের কোনো নির্দেশনা দিইনি সেসব বিষয়ে তোমরা আমাকে কোনো প্রশ্ন কোরো না। কারণ, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন উত্থাপন এবং নাবিদের সাথে যুক্তিতর্ক ও মতবিরোধের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে।” (১৫) আরেকটি বর্ণনায় নাবি বলেন,
"আমি যদি কোনো কিছুর ব্যাপারে নিষেধ করি, তাহলে তা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করো। আর আমি যে বিষয়ের নির্দেশ দিই তা তোমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করো।" (১৬) তিনি আরও বলেন,
"মুসলিমদের বিরুদ্ধে তারাই সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ করেছে যারা এমন বিষয়ে প্রশ্ন করেছে, যা ইতিপূর্বে বৈধ থাকা সত্ত্বেও কেবল তাদের প্রশ্নের কারণেই তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।” (১৭)
ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত কুর'আনিক আইনগুলো হলো মানুষের কল্যাণে মহান আল্লাহ-র সহজীকরণ নীতির আরেকটি উত্তম উদাহরণ। মানুষের জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে এমন কোনো বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বর্ণনা এসব আয়াতে দেওয়া হয়নি; বরং সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য কিছু সাধারণ মূলনীতি দেওয়া হয়েছে। যেমন,
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَوْفُوا۟ بِٱلْعُقُودِ
"তোমরা যারা বিশ্বাস করেছ, তোমাদের অঙ্গীকারগুলো পূর্ণ করো।" (আল-মা'ইদাহ ৫:১)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَوا ..)
"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম।" (আল-বাকারা, ২:২৭৫)
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَلَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِنكُمْ )
"তোমরা যারা বিশ্বাস করো, পারস্পারিক সম্মতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া তোমরা পরস্পরের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (আন-নিসা', ৪:২৯)
৩. জনকল্যাণ নিশ্চিত করা
কিয়ামাত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আসবে সকলের জন্য প্রেরিত নাবি রসূলুল্লাহ। বিশ্ববাসীর সামগ্রিক কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যেই তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছে। আল্লাহ কুর'আনে পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করছেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
"আর আমরা তো তোমাকে সমগ্র মানব জাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছি; কিন্তু বেশির ভাগ লোকই তা বোঝে না।” (সাবা', ৩৪: ২৮)
قُلْ يَتَأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا .....)
"বলে দাও: হে মানব সম্প্রদায়, আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসেবে এসেছি...” (আল-আ'রাফ ৭:১৫৮)
নাস্থ (রহিতকরণ)
আইন প্রণয়নের সামগ্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নাস্থ বা রহিতকরণের নীতি থেকেও মানব কল্যাণকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় রাখার বিষয়টি সুস্পস্ট। আল্লাহ বিশেষ সময়ের জন্য বা বিশেষ কোনো উদ্দ্যেশ্যে সাময়িক কিছু বিধিনিষেধ জারি করেছিলেন। উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন বা সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পূর্বের সাময়িক আইনটির প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়ে যায়। ফলে আইনটিকে রহিত ঘোষণা করা হয়েছে। কুর'আন ও সুন্নাহয় বেশ কিছু মানসূখ বা রহিত আইনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো এগুলোর কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। (১৮)
উত্তরাধিকার (ওয়াসিয়্যাত)
প্রাক-ইসলামি আরব সমাজে উত্তরাধিকার সূত্রে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি কেবল তার সন্তান-সন্ততিরাই লাভ করত। সুনির্দিষ্ট কোনো ওয়াসিয়্যাত থাকলেই কেবল মৃতের পিতা-মাতা সম্পত্তিতে ভাগ পেতেন। (১৯) তাই ইসলামের শুরুর দিকে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়ের জন্য ওয়াসিয়্যাত করাকে আল্লাহ বাধ্যতামূলক করে দেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সম্পদে পরিবার-পরিজনের সকলের অধিকারকে নতুন গড়ে ওঠা মুসলিম সমাজের সামনে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা। এ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়:
كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِن تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَلِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ ﴿١٨٠
"তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে এবং সে যদি ধন-সম্পত্তি রেখে যায়, তাহলে পিতা-মাতা ও নিকট আত্মীয়দের জন্য ন্যায়ানুগভাবে ওয়াসিয়্যাত করে যাওয়াকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যারা আল্লাহর ব্যাপারে সদাসচেতন তাদের জন্য এ নির্দেশ জরুরি।" (আল-বাকারাহ, ২:১৮০)
মুসলিম সমাজ যখন স্বেচ্ছায় এ আইন মেনে নিয়ে যথাযথভাবে তা প্রয়োগ করতে শুরু করে তখন আল্লাহ আইনটিকে পরিষ্কারভাবে বিবৃত উত্তরাধিকার আইনের দ্বারা প্রতিস্থাপন করে দেন। পুরাতন আইনটি রহিতকরণ প্রসঙ্গে নাবি বলেন,
"নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেকের অধিকার সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই এখন থেকে উত্তরাধিকারীদের জন্য কোনো ওয়াসিয়্যাত করা যাবে না।” (২০)
শোক পালনের মেয়াদ
ইসলামের শুরুর দিকে স্বামীর মৃত্যুতে বিধবা স্ত্রী'র জন্য শোক পালনের নির্ধারিত মেয়াদ ছিল এক বছর। এ পূর্ণ সময়ের জন্য ওয়াসিয়্যাত-এর মাধ্যমে তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে যাওয়া স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক ছিল। এ প্রসঙ্গে কুর'আনে বলা হয়েছে:
وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَجًا وَصِيَّةً لِأَزْوَجِهِم مَّتَاعًا إِلَى الْحَوْلِ غَيْرَ إِخْرَاجِ فَإِنْ خَرَجْنَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِى مَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ مِن مَّعْرُوفٍ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ )
"তোমাদের মধ্য থেকে যারা তাদের স্ত্রীদের জীবিত রেখে মারা যায় তারা যেন তাদের স্ত্রীদের এক বছর পর্যন্ত ঘর থেকে বের না করে দেওয়ার এবং সেই এক বছরের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করার জন্য মৃত্যুর পূর্বে ওয়াসিয়্যাত করে যায়। তবে যদি তারা নিজেরাই বের হয়ে যায় তাহলে তাদের নিজেদের ব্যাপারে ন্যায়সঙ্গতভাবে তারা যা কিছুই করুক না কেন তার কোনো দায়-দায়িত্ব তোমাদের ওপর নেই। আল্লাহ সবার ওপর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাশালী এবং প্রজ্ঞাময়।' (আল-বাকারাহ, ২:২৪০)
এরপর শোক পালনের মেয়াদ কমিয়ে চার মাস দশ দিন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কুর'আনে নিম্নোক্ত আয়াতটিতে বলা হয়েছে:
وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ )
"তোমাদের মধ্য থেকে যারা তাদের স্ত্রীদের রেখে মারা যায় সে স্ত্রীরা চার মাস দশ দিন নিজেদের (বিবাহ থেকে) বিরত রাখবে। তারপর তাদের ইদ্দাত পূর্ণ হয়ে গেলে তারা নিজেদের ব্যাপারে ন্যায়সঙ্গতভাবে যা চায় করতে পারে, তোমাদের ওপর এর কোন দায়িত্ব নেই। আল্লাহ তোমাদের সবার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সম্যক অবহিত।" (আল-বাকারাহ, ২: ২৩৪)
পূর্বের বিধানে স্ত্রীর জন্য ওয়াসিয়্যাত করে যাওয়া যদিও বাধ্যতামূলক ছিল পরবর্তীকালে উত্তরাধিকারের আয়াতের মাধ্যমে এই বিধানকে বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি কুর'আনিক আইনেই স্বামীর সম্পদে বিধবা স্ত্রীর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ করে দেওয়া হয়েছে। আর তা হলো, সন্তান-সন্ততি না থাকলে সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ এবং সন্তান-সন্ততি থাকলে এক-অষ্টমাংশ।
ব্যভিচার
প্রথমদিকে সকল ধরনের ব্যভিচার, সমকামিতা ও এমন যৌন অপরাধের শাস্তি ছিল ঘরে বন্দি করে রাখা যতক্ষণ না তারা অনুতপ্ত হয় এবং নিজেদের পরিবর্তনের চেষ্টা করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ কুর'আনে বলেছেন,
وَالَّتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِن نِّسَابِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِّنكُمْ فَإِن شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفَّتْهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلًا وَالَّذَانِ يَأْتِيَانِهَا مِنكُمْ فَتَاذُوهُمَا فَإِن تَابَا وَأَصْلَحَا فَأَعْرِضُوا عَنْهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ تَوَّابًا رَّحِيمًا (1)
“তোমাদের নারীদের মধ্যে থেকে যারা ব্যভিচার করে তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী নিয়ে এসো। তারা যদি সাক্ষ্য দেয় তাহলে তাদেরকে গৃহে আবদ্ধ করে রাখো, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু আসে অথবা আল্লাহ তাদের জন্য কোনো পথ বের করে দেন। আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা দুজন (২১) এতে লিপ্ত হবে তাদেরকে শাস্তি দাও। তারপর যদি তারা তাওবা করে এবং নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তাহলে তাদের ছেড়ে দাও। কেননা আল্লাহ মহান তাওবা কবুলকারী ও অনুগ্রহশীল।' (আন-নিসা' ৪: ১৫-১৬)
পরবর্তী সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সুনির্দিষ্ট বিধানের মাধ্যমে উপরোক্ত আইনটিকে রহিত করা হয়।
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذُكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ )
'ব্যভিচারী পুরুষ ও নারী প্রত্যেককে এক শ বেত্রাঘাত করো। আর আল্লাহর বিধান প্রয়োগের ব্যাপারে তাদের প্রতি কোনো মমত্ববোধ ও করুণা যেন তোমাদের মধ্যে না জাগে, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে থাকো। আর তাদের শাস্তি দেওয়ার সময় মুমিনদের একটি দল যেন উপস্থিত থাকে।' (আন-নূর, ২৪:০২)
নাবি বিবাহিত ব্যভিচারীর (২২) জন্য পাথর নিক্ষেপে হত্যা ও সমকামিতার জন্য মৃত্যুদণ্ডের শাস্তিকে কার্যকর করেছেন। অবশ্য সমকামিতার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো বিশেষ পদ্ধতি তিনি নির্ধারণ করেননি। (২৩)
রহিত আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, কোনোটি পূর্বের আইনের চেয়ে আরও কঠোর আইনের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে; যেমন ব্যভিচারীর শাস্তির আইনটি। এক্ষেত্রে অবরুদ্ধ করে রাখার শাস্তিকে পরিবর্তন করে বেত্রাঘাত ও পাথর নিক্ষেপে হত্যার শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনোটি অপেক্ষাকৃত সহজ আইন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে; যেমন বিধবার শোক পালনের মেয়াদ। আবার কোনোটিকে পূর্বের আইনের সমমানের, কিন্তু অধিকতর উপযোগী আইনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সবগুলো ক্ষেত্রেই রহিত আইনটি ছিল পূর্ববর্তী সময় ও পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত। অবস্থার পরিবর্তনের পর নতুন আইন জারি করা হয়েছে। রহিত আইনগুলোকে কেবল তৎকালীন সামাজিক অবস্থার বিবেচনায়ই প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে সার্বজনীন স্থায়ী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সাময়িক সেই বিধানের মধ্যে কী প্রজ্ঞা নিহিত ছিল।
প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় না আনা হলে রহিতকারী আইনটি হয়তো প্রথমেই জারি করা হতো। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বিধবা মহিলার প্রসঙ্গটি বিবেচনা করা যাক। প্রথমদিকে তার উপর বাধ্যতামূলক ছিল পুরো এক বছর তার স্বামীর গৃহে অবস্থান করে শোক পালন করা। এ সময়ে সে বিয়ে করতে পারত না। তখন আরব সমাজে এমন কুপ্রথা চালু ছিল যে, তারা বিধবাদের আটকে রেখে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বিয়েতে বাধা দিতো। এর মেয়াদ এক বছর থেকে অনেক সময় গোটা জীবনব্যাপীও হতো। অবরুদ্ধ সময়ে তাদের সবচেয়ে খারাপ পোষাক পরিধান করতে বাধ্য করা হতো। (২৪)
এরূপ সামাজিক অবস্থায় শুরুতেই যদি ইদ্দাতের সময়কে কমিয়ে চার মাস দশ দিন করা হতো ও বিধবার নিজ সিদ্ধান্তে গৃহ পরিত্যাগের অনুমতি দেওয়া হতো, তাহলে সদ্য ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্য তা মেনে নেওয়া হতো কঠিন। তাই প্রথমে শোক পালনের মেয়াদ এক বছর নির্ধারণ করা হলো। পাশাপাশি বাতিল করা হলো আটকে রাখার প্রথা, আর বাধ্যতামূলক করা হলো ভরণপোষণ। এ পরিবর্তন মেনে নেওয়া ও এর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পরপরই শোকের সময়কালকে কমিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়।
ন্যূনতম বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষের পক্ষে এটা অনুধাবন করা কঠিন নয় যে, রহিতকরণের এ প্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত রয়েছে মানবীয় অবস্থার বিবেচনা ও তাদের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা। নাবি -এর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে নুবুওয়াত যুগের পরিসমাপ্তি ঘটেছে, তাই এরপর আর ইসলামি শারী'আহ কোনো বিধান রহিতকরণের কোনো অবকাশ নেই। (২৫)
নুবুওয়াত যুগ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সব সময়ই মানব সমাজের সার্বিক কল্যাণকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কেননা, নুবুওয়াত যুগেও ইসলামি আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে।
কুর'আনের অনেক আয়াতেই আইন প্রণয়নের সাথে সাথে তার কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেগুলোর কিছু উদাহরণ:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ )
"তোমরা যারা বিশ্বাস করেছ, তোমাদের ওপর সিয়াম পালন ফার্দ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফার্দ করা হয়েছিল। এতে আশা করা যায়, তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে।" (আল-বাকারাহ, ২:১৮৩)
خُذْ مِنْ أَمْوَلِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا ... (..)
"তুমি তাদের ধন-সম্পদ থেকে কিছু সাদাকাহ গ্রহণ করো, তা দিয়ে তাদেরকে পবিত্র করো এবং তাদের পরিশুদ্ধ করো।" (আত-তাওবাহ, ৯:১০৩)
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ )
"শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও সলাত থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। তবুও তোমরা কি এসব থেকে বিরত হবে না?" (আল-মা'ইদাহ, ৫:৯১)
নাবি কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রায়ই তার নেপথ্য কারণটি উল্লেখ করতেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইসলামের প্রাথমিক যুগে কবর জিয়ারাত করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে নাবি বলেছেন,
"আমি তোমাদের কবর জিয়ারাত করতে নিষেধ করেছিলাম। তবে, আমাকে আমার মায়ের কবর জিয়ারাতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, তোমরাও মৃত ব্যক্তিদের কবর জিয়ারাত করতে পারো, কারণ তা পরকালের জীবনকে স্মরণ করিয়ে দেয়।” (২৬)
আইন প্রণয়নের নেপথ্য কারণের ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, কোনো আইনের প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে তা প্রণয়নের কারণটি বিদ্যমান থাকা বা না-থাকার উপর। যে কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল তা যদি বিদ্যমান থাকে, তাহলে আইনটিও বহাল থাকবে। অবস্থার পরিবর্তনের ফলে যখন আইনটির প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায় তখন নতুন আইনের দ্বারা এটিকে প্রতিস্থাপন করা হয়। কারণ, এ অবস্থায় সে আইনের আর কোনো সার্থকতা থাকে না।
অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে নাবি যাকাতের একটি অংশ তাদের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন। তবে উল্লিখিত মূলনীতির ভিত্তিতেই 'উমার ইবন আল-খাত্তাব তা স্থগিত করে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর এ সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, উৎসাহ প্রদানের প্রয়োজনীয়তা তখনই ছিল যখন ইসলাম উত্থানের পর্যায়ে ও সমর্থনের মুখাপেক্ষী ছিল। যেহেতু তাঁর শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল তাই তিনি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে মানব সমাজের প্রয়োজন ও কল্যাণ বিবেচনায় রাখার প্রমাণ পাওয়া যায় স্বয়ং এর প্রণয়ন পদ্ধতির মধ্যেই। সময় কিংবা অবস্থার পরিবর্তনে সব আইনের কার্যকারিতা ও তার অন্তর্নিহিত কল্যাণ আবার হারিয়ে যায় না। এ ধরনের সার্বজনীন ও চিরস্থায়ী আইনের ক্ষেত্রে আল্লাহ পরিষ্কারভাবে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও 'ইবাদাহ, বিয়ে, তলাক ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত পারিবারিক আইন, খুন, ব্যভিচার, চুরি ও অপবাদ আরোপ-এগুলোর উপকারিতা কিংবা ক্ষতি কোনোটিই যুগের পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত হয়ে যায় না। তাই এ ধরনের বিষয়ে যেসব আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা চিরন্তন ও সার্বজনীন। আবার, স্থান ও কালের পরিবর্তনে অনেক আইনের ফলাফল পরিবর্তন হতে পারে। এ সকল বিষয়ে আল্লাহ সাধারণ নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন-যা মানব সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী সমকালীন শাসকবৃন্দের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে। এ ধরনের আইনের দৃষ্টান্ত রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক অবকাঠামো সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনগুলোর মধ্যে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ
"তোমরা যারা বিশ্বাস করেছ, আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের আর তাদের-যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্বশীল।” (আন-নিসা', ৪:৫৯)
নাবি বলেছেন,
“কোনো পঙ্গু আবসিনিয়ান দাসকেও যদি তোমাদের উপর দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং সে যদি আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী তোমাদের পরিচালিত করে, তাহলে তোমাদের উচিত তার কথা শোনা ও তার (নির্দেশের) আনুগত্য করা।” (২৭)
ইসলামে ব্যক্তিগত কল্যাণের উপর সামগ্রিক কল্যাণকে এবং ছোট ক্ষতির চেয়ে বড় ক্ষতি প্রতিরোধ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আইন প্রণয়নের এ নীতিতেও মানবীয় প্রয়োজন বিবেচনায় রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়। (২৮)
এ মূলনীতির একটি উত্তম উদাহরণ হলো ইসলামে বহুবিবাহের অনুমোদন। ইসলাম এক সাথে সর্বোচ্চ চার জন পর্যন্ত স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছে এবং তাদের প্রতি স্বামীর দায়-দায়িত্বগুলোকেও উল্লেখ করে দিয়েছে। একাধিক স্ত্রী রাখার বিষয়টি অধিকাংশ মহিলার জন্য বেদনাদায়ক। তবে আইনের মাধ্যমে যেসব দেশে বহুবিবাহকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সে সকল দেশের লোকদের চারিত্রিক অধঃপতনের দিকে নজর দিলে বহুবিবাহের বৈধতার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভূত হয়। তাই, নারী-পুরুষ উভয়ের সামগ্রিক কল্যাণের লক্ষ্যে ইসলাম সীমিত পরিসরে বহুবিবাহের স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে নারীর ব্যক্তিগত ভালো লাগার উপরে সমাজের সামগ্রিক কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। (২৯)
৪. সার্বজনীন সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা
ইসলামি আইন সকল মানুষের জন্যই সমান। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের উপরই দায়িত্ব হলো ওয়াহয়ির আইনের সামনে আত্মসমর্পণ করা। আবার তা লঙ্ঘনের শাস্তিও সবার জন্য প্রযোজ্য। কুর'আনে উল্লিখিত আইনগুলো সার্বজনীন, অর্থাৎ বিভিন্ন শ্রেণি বা গোত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য রেখা টানা হয়নি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ
"আল্লাহ ন্যায়নীতির হুকুম দেন..." (আন-নাহল, ১৬:৯০)
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ ..)
"আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যাবতীয় আমানাত যার প্রাপ্য তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার। আর লোকদের মধ্যে ফায়সালা করার সময় 'আদল ও ন্যায়নীতি সহকারে ফায়সালা করো।' (আন-নিসা' ৪:৫৮)
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوَّمِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَتَانُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ )
"তোমরা যারা বিশ্বাস করেছ, আল্লাহর জন্য সাক্ষী হিসেবে ন্যায়পরায়ণতার সাথে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাও। কোনো গোষ্ঠীর শত্রুতা তোমাদের যেন এমন উত্তেজিত না-করে দেয় যার ফলে তোমরা ইনসাফ থেকে সরে যাবে। ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত করো; এটি আল্লাহভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছেন।" (আল-মা'ইদাহ, ৫:৮)
আল্লাহর রসূলের যুগে মাখযূম নামক প্রভাবশালী গোত্রের এক মহিলা কিছু অলংকার চুরি করেছিল। বিষয়টি নাবি -এর কাছে উপস্থাপন করা হলে মহিলাটি দোষ স্বীকার করে। তার গোত্রের লোকেরা চাচ্ছিল না যে, কুর'আনের শাস্তির লজ্জা তার উপর পড়ুক। এজন্য তারা নাবি -এর ঘনিষ্ঠ সহাবি উসামাহ ইবন যাইদকে শাস্তি লঘু করার জন্য সুপারিশ করতে বলল। উসামাহ نাবি ﷺ এর কাছে এ সুপারিশ করলে তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বলেন,
"তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে সুপারিশ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছ? তারপর তিনি লোকদের একত্রিত করে একটি ভাষণ দেন। সে ভাষণে তিনি বলেন, "তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, কারণ তাদের অভিজাত ব্যক্তিবর্গ চুরি করলে তারা ছেড়ে দিত, আর দুর্বল লোকেরা চুরি করলে আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর শপথ! আমার নিজ কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, তাহলে আমি তার হাত কেটে দিতাম।” (৩০)

টিকাঃ
(১০) আল-মাদখাল, পৃ. ৫৭-৫৯
(১১) ‘আ’ইশাহ থেকে বর্ণিত এ হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম বুখারি, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৯১, হাদীস নং ৭৬০; মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ.১২৪৬, হাদীস নং ৫৭৫২ এবং আবু দাউদ, খণ্ড ৩, পৃ. ১৩৪১, হাদীস নং ৪৭৬৭।
(১২) আবু বুরদাহ থেকে বর্ণিত এ হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম বুখারি, খণ্ড ৫, পৃ. ৪৪১-৪৪৩, হাদীস নং ৬৩০; ও মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ৯৪৪, হাদীস নং ৪২৯৮। ইমাম মুসলিম উক্ত হাদীসটি আবু মূসা (হাদীস নং ৪২৯৭) এবং আনাস ইবন মালিক (হাদীস নং ৪৩০০) থেকেও বর্ণনা করেছেন।
(১৩) তারীখ আত-তাশরী' আল-ইসলামি, পৃ. ১৯-২০। আল-মাদখাল, পৃ. ৮৫-৮৯।
(১৪) তারীখ আত-তাশরী' আল-ইসলামি, পৃ. ২০-২১।
(১৫) আবু হুরায়রা বর্ণিত উক্ত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম মুসলিম, খন্ড ২, পৃ. ৬৭৫, হাদীস নং ৩০৯৫।
(১৬) আবু হুরায়রা বর্ণিত উক্ত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম মুসলিম, খন্ড ৪, পৃ. ১২৫৬-১২৫৭, হাদীস নং ৫৮১৮।
(১৭) 'আম্র ইবন সা'দ বর্ণিত উক্ত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১২৫৭, হাদীস নং ৫৮২১।
(১৮) আল-মাদখাল, পৃ. ৮৯-৯০।
(১৯) দেখুন বুখারি, (আরবি-ইংরেজি) খন্ড ৪, পৃ. ৬, হাদীস নং ১০।
(২০) আবু উমামাহ বর্ণিত উক্ত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম আবু দাউদ, খন্ড ২, পৃ. ৮০৮, হাদীস নং ২৮৬৪; তিরমিযি, নার্সা'ই, ইবন মাজাহ ও আহমাদ। শাইখ আলবানী তাঁর সহীহ সুনান আবি দাউদ, গ্রন্থে এটিকে সহীহ বলেছেন।
(২১) এ আয়াতের অনুবাদ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশ অনুবাদক অনুবাদ করেছেন: ক) যদি তোমাদের দুজন অপরাধী হয়... খ) তোমাদের মধ্যে যে-দুজন উক্ত অপরাধ করেছে... গ) আর যে দুজন ব্যক্তি তোমাদের মধ্যে এ অপরাধ সংঘটিত করেছে... আয়াতে ব্যবহৃত 'দু' শব্দের অনিবার্য অর্থ এ নয় যে, উভয়কে একই লিঙ্গের অধিকারী হতে হবে। (IIPH)
(২২) 'উবাদাহ ইব্‌ন আস-সাঁমিত ও ইবন 'আব্বাস বর্ণিত উক্ত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম মুসলিম খন্ড ৩, পৃ. ৯১১, হাদীস নং ৪১৯২ ও পৃ. ৯১২, হাদীস নং ৪১৯৪।
(২৩) ইবন 'আব্বাস বর্ণিত উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু দাউদ, খন্ড ৩, পৃ. ১২৪৫, হাদীস নং ৪৪৭। শাইখ আলবানি এটিকে সহীহ বলেছেন।
(২৪) যায়নাব বিন্ত সালামাহ বর্ণিত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম বুখারি, খন্ড ৭, পৃ. ১৯০-১৯২, হাদীস নং ২৫১।
(২৫) আল-মাদখাল, পৃ. ৯০-৯৩।
(২৬) আবু হুরায়রা ও বুরায়দাহ কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ. ৪৬৩-৪৬৪, হাদীস নং ২১৩০-২১৩১ এবং তিরমিযি।
(২৭) ইয়াহুয়া ইবন হুসাইন বর্ণিত হাদীসটি সংকলন করেছেন ইমাম মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১, হাদীস নং ১০২১।
(২৮) আল-মাদখাল, পৃ. ৯৩-৯৫।
(২৯) বিষয়টির আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যার জন্য দেখুন Plural Marriage in Islam, (রিয়াদ: ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক পাবলিশিং হাউজ, ২য় সংস্করণ, ১৯৮৭), পৃ. ১-৯।
(৩০) 'আ'ইশাহ বর্ণিত উক্ত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম বুখারি, মুসলিম খন্ড ৩, পৃ. ৯০৯-৯১০, হাদীস নং ৪১৮৭ ও সুনান আবি দাউদ, খন্ড ৩, পৃ. ১২১৮, হাদীস নং ৪৩৬০।

📘 মাযহাব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ > 📄 ইসলামি আইনের উৎস

📄 ইসলামি আইনের উৎস


আল্লাহর রসূলের সময়ে ইসলামি আইনের উৎস ছিল ওয়াহয়ি; অর্থাৎ কুর'আন ও সুন্নাহ। সুন্নাহ হলো নাবিﷺ এর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতি অর্থাৎ তাঁর উপস্থিতিতে সংঘটিত যেসব বিষয়কে তিনি নিষেধ করেননি। সুন্নাহ হলো ওয়াহয়ির দ্বিতীয় ধরন। কুর'আনের নিম্নোক্ত আয়াতটি থেকেও এ বিষয়টি প্রতিপন্ন হয়:
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى (٢) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (١)
"তিনি নিজের খেয়ালখুশী মতো কোনো কথা বলেন না। যা তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয় তা ওয়াহয়ি ছাড়া আর কিছুই নয়।" (আন-নাজম, ৫৩:৩-৪)
নাবি ﷺ কে মানবজাতির নিকট আল্লাহ তা'আলার চূড়ান্ত বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
يَتَأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ...)
“হে রসূল! তোমার প্রভুর পক্ষ থেকে তোমার কাছে যা কিছু নাজিল করা হয়েছে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দাও।” (আল-মা'ইদাহ, ৫:৬৭)
একই সাথে মানুষের সামনে আল্লাহর চূড়ান্ত বার্তাকে ব্যাখ্যা করে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও তাঁর উপর অর্পণ করা হয়েছিল।
.... وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ )
"...এ বাণী তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি লোকদের কাছে তা ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিতে পারো, যা তাদের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে; এবং লোকেরা (নিজেরাও) যেন চিন্তা-ভাবনা করে।" (আন-নাহল, ১৬:৪৪)
নাবি কখনো বক্তব্যের মাধ্যমে কুর'আনের আয়াতের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, আবার কখনো ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর কাজের মাধ্যমে। কখনো কথা ও কাজ-উভয়ের মাধ্যমেও। যেমন, কুর'আনে মুসলিমদের সলাত কায়েম করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, অথচ তা কীভাবে আদায় করতে হবে-কুর'আঁন তা বিস্তারিত বর্ণনা করেনি। অতঃপর, নাবি তাঁর অনুসারীদের সামনে সলাত আদায় করে বলেন,
"আমাকে যেভাবে সলাত আদায় করতে দেখেছ, তোমরা সেভাবে সলাত আদায় করো।” (৩১)
অন্য একটি ঘটনায় এসেছে, নাবি সলাত আদায়কালে এক ব্যক্তি এসে তাঁকে সালাম দিলেন। জবাবে তিনি ডান হাত তুলে সাড়া দিলেন। (৩২) তাঁর স্ত্রী 'আ'ইশাহ (রদিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন যে, সাজদাহ করার সময় নাবি তাঁর পায়ের গোড়ালিগুলোকে মিলিয়ে রাখতেন। (৩৩) অন্য আরেকটি ঘটনায়, নাবি ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ইবন মাস'উদ তখন সলীতে ডান হাতের উপর বাম হাত রেখেছিলেন। তা দেখে নাবি ইবন মাসউদের ডান হাতটিকে উঠিয়ে বাম হাতের উপর রেখে দিলেন। (৩৪) তিনি আরও বলেছেন,
"সাজদাহ করার সময় তোমাদের উটের ন্যায় বসা উচিত নয়। বরং (মাটিতে) হাঁটু রাখার আগে হাত রাখা উচিত।" (৩৫)
সুতরাং সুন্নাহ হলো কুর'আনের ব্যাখ্যা। কুর'আনের সাধারণ নির্দেশাবলির ব্যাখ্যা এবং এর আয়াতের সুনির্দিষ্ট অর্থকে সুন্নাহতে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে দেখা যাবে যে, সুন্নাহ সবকিছুকেই কুর'আনেও নির্দেশ করা হয়েছে; কখনো সরাসরি, আবার কোথাও আকার-ইঙ্গিতে। কুর'আনের কোনো কোনো আয়াতে এত ব্যাপক অর্থে এই নির্দেশ এসেছে যে, গোটা সুন্নাহই তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। যেমন কুর'আঁনে বলা হয়েছে,
... وَمَا عَاتَنكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ... )
"রসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।" (আল-হাশ্র, ৫৯:৭)
অনেক সময় আইনটি কুর'আনে সাধারণভাবে উল্লেখ থাকে, কিন্তু এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা থাকে সুন্নাহতে। অতএব, সুন্নাহতে থাকে আইনের প্রয়োগ-পদ্ধতি, নেপথ্য কারণ, শর্তাবলি এবং প্রয়োগের স্থান ও পাত্র অথবা এমন অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যা সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। 'অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ' এর একটি দৃষ্টান্ত হলো নিষিদ্ধ খাবারের তালিকা। কুর'আঁনে যেসব খাদ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার বাইরেও আরও কিছু খাদ্য হাদীসের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নাবি মুহাম্মাদ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
... وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَيتَ ...
"তিনি তাদের জন্য কল্যাণকর ও পবিত্র জিনিসগুলোকে হালাল এবং অকল্যাণকর ও অপবিত্র জিনিসগুলোকে হারাম করেন।" (আল-আ'রাফ, ৭:১৫৭)
আনাস ইবন মালিক বলেন,
"খাইবার যুদ্ধের সময় একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী এসে বললেন, "হে রসূলুল্লাহ, গাধাগুলো খেয়ে ফেলা হচ্ছে।" তারপর, আরেকজন এসে বললেন, "হে আল্লাহর রসূল! গাধাগুলোকে ধ্বংস করা হচ্ছে।" তখন রসূলুল্লাহ আবু তলহাকে পাঠালেন এই ঘোষণা দেওয়ার জন্য যে, "আল্লাহ ও তাঁর রসূল তোমাদের জন্য গৃহপালিত গাধা খাওয়াকে নিষেধ করেছেন। কারণ তা খারাপ (এবং অপবিত্র)।" (৩৬)
অনেক ক্ষেত্রে কুর'আনের আয়াতে বর্ণিত থাকে সাধারণ মূলনীতি। সেখান থেকে নাবি খুঁটিনাটি বিধিবিধান বের করে এনেছেন। এগুলো সঠিক হলে আল্লাহ সত্যায়ন করেছেন, অন্যথায় সংশোধন করে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, কুর'আঁন থেকে বের করে আনা নাবি-এর সঠিক সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো একইসাথে খালা-বোন/ঝি কিংবা ফুফু-ভাতিজিকে বিয়ের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ। আল্লাহ মা ও মেয়েকে অথবা একই সাথে দুবোনকে বিয়ে করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এরপর তিনি বলছেন,
.... وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءَ ذَلِكُمْ
"এদের ছাড়া বাদবাকি সমস্ত মহিলাকে বিয়ে করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে..." (আন-নিসা' ৪:২৪)
তবে আবু হুরায়রাহ বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রসূল বলেছেন, "তোমাদের কেউ যেন কোনো মহিলাকে এবং তার ফুফু কিংবা খালাকে একসাথে বিয়ে না করে।" (৩৭)
মা ও মেয়েকে অথবা একসাথে দুবোনকে বিয়ে করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের নেপথ্য কারণ খালা-বোন ঝি কিংবা ফুফু-ভাতিজিকে একসাথে বিয়ে করার মধ্যেও বিদ্যমান। সম্ভবত এ কারণে নাবি কুর'আনের আলোকে এই বিধান দিয়েছেন। কারণ, তিনি এ বিধান জারি করার পর এ কথাও বলেছেন যে, "তোমরা এরূপ করলে পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাবে।"
এই বক্তব্য থেকে নাবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, দুই বোন অথবা মা-মেয়েকে একসাথে বিয়ে করলে একাধিক স্ত্রীর মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে যেভাবে তাদের পবিত্র সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ঠিক তেমনি কোনো খালা- বোন ঝি কিংবা ফুফু-ভাতিজিকে একসাথে বিয়ে করলে তাদের মধ্যকার পারিবারিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নাবি-এর যে সকল সিদ্ধান্ত আল্লাহ সংশোধন করে দিয়েছেন তার মধ্যে জিহার তুলাক্ অন্যতম। খাওলাহ বিন্ত সা'লাবাহ (রদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,
"আমার স্বামী আওস ইব্‌ন আস-সামিত একদিন আমাকে বলেন, "তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পৃষ্ঠদেশের মতো।” ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার জন্য আমি আল্লাহর রসূলের কাছে গেলাম। তবে, আল্লাহর রসূল আমার সাথে ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, "সে তোমার চাচাত ভাই, তুমি আল্লাহকে ভয় করো।" কিন্তু আমি অভিযোগ অব্যাহত রাখি। অবশেষে এই আয়াত অবতীর্ণ হলো:
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ ﴿﴾ الَّذِينَ يُظْهِرُونَ مِنكُم مِّن نِّسَابِهِم مَّا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتِهُمْ إِلَّا الَّتِي وَلَدْنَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنكَرًا مِنَ الْقَوْلِ وَزُورًا ...
"আল্লাহ অবশ্যই সেই নারীর কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার কাছে কাকুতি-মিনতি করছে এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করছে। আল্লাহ তোমাদের দুজনের কথা শুনছেন; তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন। তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে জিহার করে, তাদের স্ত্রীরা তাদের মা নয়। তাদের মা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে প্রসব করেছে। এসব লোক অতি অপছন্দনীয় ও মিথ্যা কথাই বলে থাকে।" (আল-মুজাদালাহ, ৫৮:১-২) (৩৮)
নাবি মনে করেছিলেন, তুলাকের একটি বৈধ পদ্ধতি জিহার। তিনি খাওলাহকেও তা মেনে নিতে বলছিলেন। কিন্তু, আল্লাহ তা অবৈধ ঘোষণা করেন।
নাবি এর নিজের পক্ষ থেকে দেওয়া এমন কিছু মতামতও রয়েছে যেগুলোকে আল্লাহ শার'ঈ বিধান হিসেবে অনুমোদন দেননি। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, সুন্নাহ কেবল দীনি বিধিবিধানের সাথেই সম্পৃক্ত। নাবি তাঁর যেসব ব্যক্তিগত অভ্যাস ও আচার-আচরণ তাঁর সহাবিদের অনুসরণের নির্দেশ দেননি-তা দীনি সুন্নাহর আওতা বহির্ভূত। উদাহরণস্বরূপ, রাফি' ইব্‌ন খাদীজ বর্ণনা করেন যে, নাবি মাদীনায় এসে লোকদের খেজুর গাছে পরাগায়ন করতে দেখে তিনি এর কারণ জানতে চান। তারা বললেন যে, এভাবে কৃত্রিম উপায়ে তারা গাছে পরাগায়ন করছেন। এরপর তিনি বললেন, "সম্ভবত এটা না করলেই ভালো হতো।"
তারা সে কাজ ছেড়ে দিলে সে বছর খেজুরের ফলন অনেক কমে গেল। নাবিকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি বলেন,
"আমি একজন মানুষ। তাই দীনের ব্যাপারে আমি যদি তোমাদের কিছু করতে বলি, তোমরা তা মেনে চলো। তবে, আমি যদি কোনো কিছু ব্যক্তিগত মত থেকে বলি, তাহলে মনে রাখবে আমিও একজন মানুষ।" আনাস বর্ণনা করেন যে, নাবি আরও বলেন,
"পার্থিব ব্যাপারে তোমাদেরই জ্ঞান বেশি।” (৩৯)
নাবি তাঁর সহাবিদের আরও বলেছেন যে, তাঁর কাছে যে সকল অভিযোগ দায়ের করা হয় সেগুলোর ক্ষেত্রেও তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলতে পারেন। কারণ, কোনো কোনো ব্যাপারে তিনি ব্যক্তিগত মতামত অনুযায়ী রায় দিয়ে থাকেন। উম্ম সালামাহ বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রসূল বলেছেন,
"আমি কেবল একজন মানুষ। আর তোমরা আমার নিকট তোমাদের বিচার নিয়ে আসো। হতে পারে তোমাদের কেউ কেউ তার দাবি উপস্থাপনে অপরের তুলনায় অধিক বাগ্মী। আর আমি তাদের কাছ থেকে যা শুনি তার ভিত্তিতেই রায় দিয়ে থাকি। অতএব, আমি যদি কারো পক্ষে এমন কিছুর রায় দিয়ে দিই যা মূলত তার ভাইয়ের পাওনা, তাহলে সেটি তার না নেওয়া উচিত। কারণ, আমি তাকে কেবল জাহান্নামের একটি টুকরাই দিয়েছি।" (৪০)
ব্যক্তিগত বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের ভিত্তিতে প্রদত্ত এসব সিদ্ধান্ত নাবি এর সহাবিদেরকে শারী'আহ বাস্তবায়ন পদ্ধতির একটি কার্যকর প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা এটাও শিখেছেন যে, মানবীয় সাধ্যের অতীত কোনো কারণে অনিচ্ছাকৃত ভুল রায়ের জন্য কোনো বিচারককে দায়ী করা যায় না। এ বিষয়টির উপর বাড়তি গুরুত্ব আরোপ করে নাবি বলেছেন,
"কোনো ব্যক্তি ইজতিহাদের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হলে তার জন্য রয়েছে দুটি পুরস্কার; আর ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হলে একটি পুরস্কার।" (৪১)
তবে, এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই জ্ঞানের ভিত্তিতে হতে হবে। কারণ, আল্লাহর রসূল বলেছেন,
"বিচারক তিন শ্রেণির; এর মধ্যে এক শ্রেণি জান্নাতে আর দুই শ্রেণি জাহান্নামে যাবে। জান্নাতবাসী শ্রেণির বৈশিষ্ট্য হলো এরা সত্যকে জেনে সে অনুযায়ী ফায়সালা করে। আর যে ব্যক্তি সত্যকে জেনে অন্যায় রায় দেবে সে হবে জাহান্নামি। অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়াই মানুষের জন্য ফায়সালা করে দিবে সেও জাহান্নামি।" (৪২)
আইনগত সিদ্ধান্ত প্রদানে দক্ষতা অর্জনের জন্য নাবি তাঁর সহাবিদদের সিদ্ধান্ত প্রদানে উৎসাহিত করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে এমনভাবে প্রস্তুত করা যেন তাঁর ইন্তেকালের পর তারা শারী'আহ যথাযথ বাস্তবায়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে পারেন।
'আলি ইবন আবি তালিব বলেছেন,
"আল্লাহর রসূল আমাকে ইয়েমেনের বিচারক হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল, আপনি আমাকে পাঠাচ্ছেন; অথচ আমার বয়স কম। তাছাড়া বিচার ফায়সালা করার অভিজ্ঞতাও আমার নেই।' তিনি উত্তর দিলেন, "আল্লাহ তোমার অন্তরকে দিকনির্দেশনা দেবেন এবং তোমার জিহ্বাকে (সত্যের উপর) সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন। যখন বাদী-বিবাদী দুজন তোমার সামনে বসবে, তখন তুমি উভয় পক্ষের বক্তব্য ভালোমতো না শুনে কোনো সিদ্ধান্ত দেবে না। কারণ, বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া সঠিক রায় প্রদানের জন্য অধিক সহায়ক।" (৪৩)
আবু সা'ঈদ আল-খুদরি বর্ণনা করেছেন,
"কুরায়জাহ গোত্র এ শর্তে আত্মসমর্পণ করেছিল যে, সা'দ ইব্‌ন মু'আয তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দেবেন। তারপর আল্লাহর রসূল তাঁকে ডেকে পাঠালেন। গাধার পিঠে চড়ে সা'দ মাসজিদ আন-নাবাউইর কাছে এলে আল্লাহর রসূল মাদীনার মুসলিম আনসারদের বললেন, "তোমাদের নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে দাঁড়াও।" তারপর তিনি সা'দকে বললেন, "তোমার সিদ্ধান্ত মেনে নেবে—এই শর্তে লোকগুলো আত্মসমর্পণ করেছে।" সা'দ বললেন, "তাদের যুদ্ধক্ষম সকল পুরুষকে হত্যা করা হোক, আর তাদের নারী ও শিশুদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে গ্রহণ করা হোক।" এ কথা শুনে নাবি বললেন, 'তুমি আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী বিচার করেছ।" (৪৪)
শার'ঈ মূলনীতির আলোকে সমকালীন নানা সমস্যার সমাধানে বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত ও তাতে উপনীত হওয়ার প্রক্রিয়ার নাম ইজতিহাদ। উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামি আইনের ক্রমবিকাশের এ পর্যায়ে নাবি নিজে ও তাঁর সহাবিগণও ইজতিহাদ চর্চা করেছেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, নাবি -এর ইজতিহাঁদগুলো আইনের কোনো সুতন্ত্র উৎস নয়। কারণ, এগুলোর বৈধতা নির্ভর করত অনুমোদনসূচক ঐশী প্রত্যাদেশের ওপর। অতএব, নাবি -এর ইজতিহাদগুলো ছিল মূলত সহাবিদেরকে ইজতিহাদের সঠিক পদ্ধতি শেখানোর মাধ্যম। আর এ পর্যায়ে সহাবিদের ইজতিহাদগুলো ছিল মূলত এক ধরনের অনুশীলন।

টিকাঃ
(৩১) বুখারি, খন্ড ১, পৃ. ৩৪৫, হাদীস নং ৬০৪।
(৩২) সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ১, পৃ. ২৩৬, হাদীস নং ৯২৭। শাইখ আলবানি সহীহ্ সুনান আবি দাউদ, গ্রন্থে এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৩৩) হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন বায়হাকি, আল-হাকিম ও ইব্‌ন খুযায়মাহ। মুসতাফা আল-আ'যামি সহীহ্ ইবন খুযায়মাহ (বৈরুত, আল মাকতাব আল-ইসলামি, প্রথম সংস্করণ, ১৯৭৮, খন্ড ১, পৃ. ৩২৮, হাদীস নং ৬৫৪) গ্রন্থে ও শাইখ আলবানি সিফাহ সলাত আন-নাবি, (বৈরুত, আল মাকতাব আল-ইসলামি, চতুর্দশ সংস্করণ, ১৯৮৭, পৃ. ১০৯) গ্রন্থে এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৩৪) সুনান আবি দাউদ, খন্ড ১, পৃ. ১৯৪, হাদীস নং ৭৫৪। শাইখ আলবানি হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সহীহ সুনান আবু দাউদ, খন্ড ১, পৃ. ১৪৪, হাদীস নং ৬৮৬।
(৩৫) সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ১, পৃ. ২১৫, হাদীস নং ৮৩৯। শাইখ আলবানি সহীহ্ সুনান আবি দাউদ, গ্রন্থে এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৩৬) মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৭২, হাদীস নং ৪৭৭৮।
(৩৭) বুখারি, খন্ড ৭, পৃ. ৩৪, হাদীস নং ৪৫; মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ. ৭০৯-৭১০, হাদীস নং ৩২৬৮; ও সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ২, পৃ. ৫৫১, হাদীস নং ২০৬১।
(৩৮) সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ৩, পৃ. ৫৯৮, হাদীস নং ২২০৮। শাইখ আলবানি হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন; সহীহ্ সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ২, পৃ. ৪১৭-৪১৮।
(৩৯) রাফি' ইবন খাদীজ ও আনাস বর্ণিত উক্ত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১২৫৯, হাদীস নং ৫৮৩১-৫৮৩২।
(৪০) সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ৩, পৃ. ১০১৬, হাদীস নং ৩৫৭৬। শাইখ আলবানি এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৪১) 'আম্র ইবন আল-আঁস বর্ণিত উক্ত হাদীসটি সংকলন করেছেন ইমাম বুখারি, খণ্ড ৯, পৃ. ৩৩০, হাদীস নং ৪৫০ ও সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ৩, পৃ. ১০১৩-১০১৪, হাদীস নং ৩৫৬৭।
(৪২) বুরায়দাহ বর্ণিত হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন। ইমাম আবু দাউদ, খন্ড ৩, পৃ. ১০১৩, হাদীস্ নং ৩৫৬৬। শাইখ আলবানি সাহীহ্ সুনান আবি দাউদ, গ্রন্থে এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৪৩) সুনান আবি দাউদ,, খন্ড ৩, পৃ. ১০১৬, হাদীস নং ৩৫৭৬। শাইখ আলবানি সহীহ সুনান আবি দাউদ, গ্রন্থে এ হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
(৪৪) মুসলিম, খন্ড ৩, পৃ. ৯৬৬, হাদীস নং ৪৩৬৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00