📄 ফিক্হের ক্রমবিকাশ
দ্রষ্টব্য
১. ফিকহশাস্ত্রের ইতিহাস ও ক্রমবিকাশের উপর লিখিত এ বইয়ে 'ইসলামি আইন' পরিভাষাটি ফিক্হী ও শার'ঈ—উভয় আইনকে বোঝাতেই ব্যবহৃত হবে। তবে, পার্থক্য করার প্রয়োজন পড়লে ফিক্হ অথবা ফিক্হী আইন এবং শারী'আহ কিংবা শারী'আহ আইন পরিভাষাটি ব্যবহার করা হবে।
২. এ বইয়ে ব্যবহৃত আরবি শব্দগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে বইয়ের শেষে; সেখানে ব্যবহৃত শব্দগুলোর বহুবচন দেওয়া হয়েছে। বহুল পরিচিত আরবি বহুবচন বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, মুসলিমুন এর পরিবর্তে মুসলিমগণ এবং সুওয়ার এর পরিবর্তে সূরাগুলো।
ফিকহের ক্রমবিকাশ
ফিকহের ক্রমবিকাশকে ঐতিহাসিকভাবে ছয়টি প্রধান পর্যায়ে বিন্যস্ত করা যায়। যথা: ভিত্তি, প্রতিষ্ঠা, নির্মাণ, বিকাশ, সুসংহতকরণ এবং বন্ধ্যাত্ব ও অবনতি। এ পর্যায়গুলো নিম্নোক্ত সময়ে সংঘটিত হয়েছে:
ক) ভিত্তি : নাবি মুহাম্মাদ ﷺ-এর নুবুওয়াতের যুগ (৬০৯-৬৩২ সাল)।
খ) প্রতিষ্ঠা : ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার যুগ তথা নাবি ﷺ-এর মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে 'আলি Ÿ-এর খিলাফাতের শেষ সময় পর্যন্ত, ১১-৪০ হিজরি (৬৩২-৬৬১ সাল)।
গ) নির্মাণ : ৪১ হিজরি (৬৬১ সাল) তথা উমাইয়া শাসনের শুরু থেকে প্রায় ১৩১ হিজরিতে (৭৪৯ সালে) এর পতন পর্যন্ত।
ঘ) বিকাশ : ১৩১ হিজরিতে আব্বাসি রাজত্বের উত্থান থেকে শুরু করে আনুমানিক ৩৪০ হিজরিতে (প্রায় ৯৫০ সাল) এর পতনের শুরু হওয়া পর্যন্ত।
ঙ) সুসংহতকরণ : ৩৪০ হিজরিতে 'আব্বাসি রাজত্বের অবনতি থেকে শুরু করে ৬৫৬ হিজরিতে (১২৫৮ সাল) মঙ্গোলিয়োদের হাতে সর্বশেষ আব্বাসি খলীফা খুন হওয়া পর্যন্ত।
চ) বন্ধ্যাত্ব ও অবনতি : হিজরি ৬৫৬ সালে বাগদাদ ধ্বংস থেকে নিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত।
এ বইটিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ উল্লিখিত পর্যায়গুলোকে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হবে। এই পর্যায়গুলো সম্পকে বিস্তারিত জানতে পারলে পাঠকগণ প্রতিটি মাযহাবের ক্রমবিকাশ ও ফিক্হশাস্ত্রের উন্নয়ন সাধনে মাযহাবগুলোর সার্বিক অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে সক্ষম হবেন। এ বিষয়টিও তাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, কোনো একক মাযহাবই গোটা ইসলামি আইন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরার দাবি করতে পারে না। অন্য কথায় কোনো একটি মাযহাবের মাধ্যমে ফিকহ শাস্ত্রকে সঠিকভাবে নিরূপণ করাও সম্ভব নয়।
শারী'আহ্ ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিটি মাযহাবেরই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। স্থান-কাল ও সাংস্কৃতিক পটভূমির ভিন্নতা সত্ত্বেও যৌথভাবে শারী'আহ ও ফিক্হই পারে গোটা মুসলিম উম্মাহকে একতাবদ্ধ করতে। বস্তুত, যে নির্ভুল মাযহাবটি প্রশ্নাতীতভাবে সকল ক্ষেত্রে অনুসরণীয় তা হলো নাবি মুহাম্মাদ -এর মাযহাব। শারী'আহ্ র ব্যাপারে একমাত্র তাঁর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত ও কিয়ামাত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য অনুসরণীয়। অন্য কোনো মাযহাবই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত নয়; বরং তা মানবীয় চেষ্টার ফল, তাই স্বাভাবিক কারণেই এগুলো মানবীয় ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়।
শাফি'ই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আশ-শাফি'ই রহীমাহুল্লাহ এ ব্যাপারে বলেছেন, "আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই যে আল্লাহর রসূল ﷺ-এর সব হাদীস সম্পর্কে জানেন; অথবা যেসব হাদীস শুনেছেন তার কোনটিই ভুলে যাননি। কাজেই, আমার প্রণীত আইন বা মূলনীতিতে স্বাভাবিক কারণেই আল্লাহর রসূল ﷺ-এর হাদীসের সাথে অসংগতিপূর্ণ কিছু থাকতেই পারে। অতএব, আল্লাহর রসূল ﷺ যা বলেছেন সেটাই হলো একমাত্র চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আর সেটাই আমার প্রকৃত মাযহাব।” (৭)
টিকাঃ
(৭) ইমাম শাফি'ই থেকে নির্ভরযোগ্য ইসনাঁদসহ এ বক্তব্যটি সংকলন করেছেন আল-হাকিম (ইবন 'আসাকির, তারীখ দিমাশক, খন্ড ১৫, অনুচ্ছেদ ১, পৃ. ৩) এবং ইবন আল-কায়্যিম, ই'লাম আল-মুক্'িঈন, (মিশর: আল-হাজ্জ 'আব্দুস-সালাম প্রেস, ১৯৬৮, খন্ড ২, পৃ. ৩৬৩)।
📄 উপসংহার
পূবের্ অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখেছি যে, মাযহাবগুলো মূলত চারটি মৌলিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। নেপথ্যে রয়েছে নিম্নোক্ত কারণগুলো:
১. ঐক্যবদ্ধ বা বিশৃঙ্খল বিভিন্ন অবস্থায় মুসলিম রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি
২. দীনি নেতৃত্বের অবস্থা (একীভূত ও রক্ষণশীল, বিচ্ছিন্ন ও অরক্ষণশীল)
৩. বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যোগাযোগ。
প্রাথমিক যুগে ইসলামি রাষ্ট্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ। তখন নেতৃত্বও ছিল একীভূত এবং শাসকগণ ছিলেন ধর্মপরায়ণ। সে সময় মুসলিম বিশেষজ্ঞগণও একে অপরের কাছাকাছি ছিলেন। ফলে তখন যোগাযোগ ছিল অনেক সহজ। এ কারণেই তখন কেবল একটি মাযহাবই বিদ্যমান ছিল; আর তা ছিল নাবি -এর মাযহাব অথবা ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার মাযহাব। তারপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে ভাঙন ধরে। শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞগণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নিবাস স্থাপন করেন। যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতার কারণে বিশেষজ্ঞগণ পারস্পরিক পরামর্শের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করতে বাধ্য হন।
এভাবে একসময় গড়ে উঠে অসংখ্য মাযহাব। তবে অধিক নির্ভরযোগ্য হাদীসভিত্তিক অন্যের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তৎক্ষণাৎ নিজের মত পরিত্যাগে এই বিশেষজ্ঞগণ মোটেও দ্বিধা করতেন না। ফলে তারা পূর্ববর্তী যুগের বিশেষজ্ঞদের উদার মানসিকতার ধারাকে অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে 'আব্বাসি খিলাফাতের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে ভাঙনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশেষজ্ঞগণও অনেকটা জড়িয়ে পড়েন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত দরবারি বিতর্ক এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। এই অবাঞ্ছিত বিতর্কে বিজয়ী ব্যক্তি ও তাদের মাযহাবকে বিশেষ রাজকীয় আনুকূল্য এনে দেয়। মূলত এটি ছিল গোঁড়ামিপূর্ণ দলাদলিরই আরেকটি ধাপ। আর এর মাধ্যমে বিদ্যমান চারটি মাযহাবের অনুসারীদের অনেকেই ব্যক্তিগত সুখ্যাতি লাভ করেছেন।
গতিশীল ফিক্হ
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থা মূলত পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোরই একটি সংমিশ্রণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি পুনরায় মুসলিম 'আলিমদের পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এর বহু আগেই মুসলিম বিশ্ব বিভিন্ন আর্থ-রাজনৈতিক সরকার পদ্ধতির ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদী সত্তায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পরিণতিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে। বর্তমান পৃথিবীর মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় দুই বিলিয়ন। কেবল আল্লাহ ও তাঁর নাবি -এর প্রতি বিশ্বাসই এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একটি অন্যরকম ঐক্যের সূত্রে আবদ্ধ করে রেখেছে। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র চার মাযহাবের যেকোনো একটি দিয়ে ধর্মীয় শাসনতন্ত্রের আইন পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। এই প্রচেষ্টা পূর্বের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কিছুটা কম গোঁড়া। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানেও মাযহাবকেন্দ্রিক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে এখনও রয়ে গিয়েছে। এ কারণেই শাসনতন্ত্রের এই ব্যবস্থাও মুসলিম সমাজের মধ্যে বিভিন্ন রকম বিভেদ সৃষ্টি করছে।
তবে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর দীনকে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে একটি আশাব্যঞ্জক প্রেরণা জেগে উঠেছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু সংস্কৃতি বিদ্যমান। উপরন্তু, দ্রুত পরিবর্তনশীল এ বিশ্বে প্রাত্যহিক জীবন থেকে উদ্ভূত সমস্যা ও বিষয়াবলি ক্রমবর্ধমান হারে বৈচিত্র্য লাভ করছে। ফলে অনেক মুসলিম বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন থেকে উপলব্ধি করছেন যে, কেবল গতিশীল-ফিক্হ-চর্চার-ধারা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই মুসলিমদের জীবনবিধান হিসেবে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। এ বিষয়টি আমরা ইতিপূর্বেও "বিকাশ পর্যায়” শিরোনামে উল্লেখ করেছি। সব ধরনের গোঁড়ামি ও দলীয় চিন্তা দূরীভূত করে মাযহাবগুলোর পুনরায় একত্রীকরণ এবং ফিক্হশাস্ত্রকে গতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে ইজতিহাদের দ্বার পুনরায় খুলে দেওয়া আবশ্যক। এতে করে মুসলিম আইনজ্ঞগণ এমন বস্তুনিষ্ঠ আইন প্রণয়নে সক্ষম হবেন যেগুলো দিয়ে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শারী'আহ আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এরূপ সংস্কারের সম্ভাব্য প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেবল ইসলামে নবদীক্ষিত লোকদের উপরই নয় বরং মুসলিম হিসেবে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের উপরও এর প্রভাব পড়বে। নতুন ইসলাম গ্রহণকারীরা বিভিন্ন মাযহাবের মতপার্থক্যের জটিলতা থেকে রেহাই পাবে। আর মুসলিম সমাজে জন্ম নেওয়া মুসলিমদের নতুন প্রজন্ম মাযহাবগুলোর মতপার্থক্যের কারণে সৃষ্ট হতাশা থেকে মুক্তি পাবে। তখন তাঁরা সকল মাযহাব ও প্রথম যুগের বিশেষজ্ঞদের অসাধারণ অবদানকে বর্জন করার অদূরদর্শী চিন্তাধারাও পরিহার করতে পারবে।
পূবের্ অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখেছি যে, মাযহাবগুলো মূলত চারটি মৌলিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। নেপথ্যে রয়েছে নিম্নোক্ত কারণগুলো:
১. ঐক্যবদ্ধ বা বিশৃঙ্খল বিভিন্ন অবস্থায় মুসলিম রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি
২. দীনি নেতৃত্বের অবস্থা (একীভূত ও রক্ষণশীল, বিচ্ছিন্ন ও অরক্ষণশীল)
৩. বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যোগাযোগ。
প্রাথমিক যুগে ইসলামি রাষ্ট্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ। তখন নেতৃত্বও ছিল একীভূত এবং শাসকগণ ছিলেন ধর্মপরায়ণ। সে সময় মুসলিম বিশেষজ্ঞগণও একে অপরের কাছাকাছি ছিলেন। ফলে তখন যোগাযোগ ছিল অনেক সহজ। এ কারণেই তখন কেবল একটি মাযহাবই বিদ্যমান ছিল; আর তা ছিল নাবি -এর মাযহাব অথবা ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার মাযহাব। তারপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে ভাঙন ধরে। শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞগণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নিবাস স্থাপন করেন। যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতার কারণে বিশেষজ্ঞগণ পারস্পরিক পরামর্শের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করতে বাধ্য হন।
এভাবে একসময় গড়ে উঠে অসংখ্য মাযহাব। তবে অধিক নির্ভরযোগ্য হাদীসভিত্তিক অন্যের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তৎক্ষণাৎ নিজের মত পরিত্যাগে এই বিশেষজ্ঞগণ মোটেও দ্বিধা করতেন না। ফলে তারা পূর্ববর্তী যুগের বিশেষজ্ঞদের উদার মানসিকতার ধারাকে অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে 'আব্বাসি খিলাফাতের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে ভাঙনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশেষজ্ঞগণও অনেকটা জড়িয়ে পড়েন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত দরবারি বিতর্ক এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। এই অবাঞ্ছিত বিতর্কে বিজয়ী ব্যক্তি ও তাদের মাযহাবকে বিশেষ রাজকীয় আনুকূল্য এনে দেয়। মূলত এটি ছিল গোঁড়ামিপূর্ণ দলাদলিরই আরেকটি ধাপ। আর এর মাধ্যমে বিদ্যমান চারটি মাযহাবের অনুসারীদের অনেকেই ব্যক্তিগত সুখ্যাতি লাভ করেছেন।
গতিশীল ফিক্হ
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থা মূলত পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোরই একটি সংমিশ্রণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি পুনরায় মুসলিম 'আলিমদের পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এর বহু আগেই মুসলিম বিশ্ব বিভিন্ন আর্থ-রাজনৈতিক সরকার পদ্ধতির ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদী সত্তায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পরিণতিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে। বর্তমান পৃথিবীর মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় দুই বিলিয়ন। কেবল আল্লাহ ও তাঁর নাবি -এর প্রতি বিশ্বাসই এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একটি অন্যরকম ঐক্যের সূত্রে আবদ্ধ করে রেখেছে। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র চার মাযহাবের যেকোনো একটি দিয়ে ধর্মীয় শাসনতন্ত্রের আইন পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। এই প্রচেষ্টা পূর্বের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কিছুটা কম গোঁড়া। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানেও মাযহাবকেন্দ্রিক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে এখনও রয়ে গিয়েছে। এ কারণেই শাসনতন্ত্রের এই ব্যবস্থাও মুসলিম সমাজের মধ্যে বিভিন্ন রকম বিভেদ সৃষ্টি করছে।
তবে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর দীনকে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে একটি আশাব্যঞ্জক প্রেরণা জেগে উঠেছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু সংস্কৃতি বিদ্যমান। উপরন্তু, দ্রুত পরিবর্তনশীল এ বিশ্বে প্রাত্যহিক জীবন থেকে উদ্ভূত সমস্যা ও বিষয়াবলি ক্রমবর্ধমান হারে বৈচিত্র্য লাভ করছে। ফলে অনেক মুসলিম বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন থেকে উপলব্ধি করছেন যে, কেবল গতিশীল-ফিক্হ-চর্চার-ধারা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই মুসলিমদের জীবনবিধান হিসেবে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। এ বিষয়টি আমরা ইতিপূর্বেও "বিকাশ পর্যায়” শিরোনামে উল্লেখ করেছি। সব ধরনের গোঁড়ামি ও দলীয় চিন্তা দূরীভূত করে মাযহাবগুলোর পুনরায় একত্রীকরণ এবং ফিক্হশাস্ত্রকে গতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে ইজতিহাদের দ্বার পুনরায় খুলে দেওয়া আবশ্যক। এতে করে মুসলিম আইনজ্ঞগণ এমন বস্তুনিষ্ঠ আইন প্রণয়নে সক্ষম হবেন যেগুলো দিয়ে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শারী'আহ আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এরূপ সংস্কারের সম্ভাব্য প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেবল ইসলামে নবদীক্ষিত লোকদের উপরই নয় বরং মুসলিম হিসেবে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের উপরও এর প্রভাব পড়বে। নতুন ইসলাম গ্রহণকারীরা বিভিন্ন মাযহাবের মতপার্থক্যের জটিলতা থেকে রেহাই পাবে। আর মুসলিম সমাজে জন্ম নেওয়া মুসলিমদের নতুন প্রজন্ম মাযহাবগুলোর মতপার্থক্যের কারণে সৃষ্ট হতাশা থেকে মুক্তি পাবে। তখন তাঁরা সকল মাযহাব ও প্রথম যুগের বিশেষজ্ঞদের অসাধারণ অবদানকে বর্জন করার অদূরদর্শী চিন্তাধারাও পরিহার করতে পারবে।
📄 প্রস্তাবিত পদক্ষেপ
একটি কার্যকর মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ মাযহাব, একটি কার্যকর সংস্থা এবং একটি প্রাণবন্ত ফিকহশাস্ত্র প্রয়োজন। এর মাধ্যমে গোটা মুসলিম জাতি সম্মিলিতভাবে মানবজাতির সার্বজনীন স্বার্থ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামি জীবনব্যবস্থার বাস্তবমুখিতা তুলে ধরবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মাযহাবগুলোর পুনরেকত্রীকরণ ও একটি গতিশীল ফিক্হশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই অনস্বীকার্য। এখন প্রশ্ন হলো, এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে? প্রথমত, প্রথম যুগের মহান ইমাম ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। মাযহাবগুলোর বর্তমান অবস্থার সাথে এর প্রধান বিশেষজ্ঞদের অবস্থানের যে ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা বাস্তবসম্মত উপায়ে দূর করতে হবে।
উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জ্ঞানী-গুণী বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে যোগ্য নেতৃত্বের জন্য আহ্বান জানাতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তন সাধনে উৎসাহী ও উদ্যমী ব্যক্তিবর্গকে এ লক্ষ্যে অন্যান্য আগ্রহী পক্ষের সাথে যোগাযোগ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। সমস্যা নিরসনের এসব পদক্ষেপের মধ্যে থাকবে:
১. সমাধানের নেপথ্য প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, ২. সর্বাধিক উপযোগী সমাধান নির্বাচন, ৩. বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পন্থা নির্ধারণ, ৪. সর্বাধিক উপযোগী পদ্ধতি নির্বাচন, এবং ৫. সমাধান বাস্তবায়ন।
এ ধরনের পরিকল্পনার প্রত্যেকটি স্তরে পদক্ষেপগুলোকে বাস্তবসম্মত পদ্ধতিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তাত্ত্বিক পর্যায়ে মাযহাবগুলোর মধ্যকার বিভিন্ন মতপার্থক্য নিরসনের পরামর্শ দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। তবে এটা একটি অনস্বীকার্য সত্য যে, গতিশীল ফিশাস্ত্রের পুনরুজ্জীবন ও মাযহাবগুলোর পুনরেকত্রীকরণের এ কাজ মোটেই কোনো সহজসাধ্য বিষয় নয়। তবে কষ্টসাধ্য হলেও তা নিশ্চয়ই সম্ভব। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রথম যুগের ইমামদের প্রণীত পদ্ধতিভিত্তিক নিম্নোক্ত কাঠামোটি বিভিন্ন সময়ে অনেক উদার মানসিকতার বিশেষজ্ঞগণ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
একটি কার্যকর মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ মাযহাব, একটি কার্যকর সংস্থা এবং একটি প্রাণবন্ত ফিকহশাস্ত্র প্রয়োজন। এর মাধ্যমে গোটা মুসলিম জাতি সম্মিলিতভাবে মানবজাতির সার্বজনীন স্বার্থ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামি জীবনব্যবস্থার বাস্তবমুখিতা তুলে ধরবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মাযহাবগুলোর পুনরেকত্রীকরণ ও একটি গতিশীল ফিক্হশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই অনস্বীকার্য। এখন প্রশ্ন হলো, এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে? প্রথমত, প্রথম যুগের মহান ইমাম ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। মাযহাবগুলোর বর্তমান অবস্থার সাথে এর প্রধান বিশেষজ্ঞদের অবস্থানের যে ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা বাস্তবসম্মত উপায়ে দূর করতে হবে।
উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জ্ঞানী-গুণী বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে যোগ্য নেতৃত্বের জন্য আহ্বান জানাতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তন সাধনে উৎসাহী ও উদ্যমী ব্যক্তিবর্গকে এ লক্ষ্যে অন্যান্য আগ্রহী পক্ষের সাথে যোগাযোগ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। সমস্যা নিরসনের এসব পদক্ষেপের মধ্যে থাকবে:
১. সমাধানের নেপথ্য প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, ২. সর্বাধিক উপযোগী সমাধান নির্বাচন, ৩. বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পন্থা নির্ধারণ, ৪. সর্বাধিক উপযোগী পদ্ধতি নির্বাচন, এবং ৫. সমাধান বাস্তবায়ন।
এ ধরনের পরিকল্পনার প্রত্যেকটি স্তরে পদক্ষেপগুলোকে বাস্তবসম্মত পদ্ধতিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তাত্ত্বিক পর্যায়ে মাযহাবগুলোর মধ্যকার বিভিন্ন মতপার্থক্য নিরসনের পরামর্শ দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। তবে এটা একটি অনস্বীকার্য সত্য যে, গতিশীল ফিশাস্ত্রের পুনরুজ্জীবন ও মাযহাবগুলোর পুনরেকত্রীকরণের এ কাজ মোটেই কোনো সহজসাধ্য বিষয় নয়। তবে কষ্টসাধ্য হলেও তা নিশ্চয়ই সম্ভব। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রথম যুগের ইমামদের প্রণীত পদ্ধতিভিত্তিক নিম্নোক্ত কাঠামোটি বিভিন্ন সময়ে অনেক উদার মানসিকতার বিশেষজ্ঞগণ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
📄 বহুমুখী ও বিপরীতমুখী মতপার্থক্য
মাযহাবগুলোর মতপার্থক্যগুলো প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত:
প্রথমত, বহুমুখী মতপার্থক্য বা ইখতিলাফ তানাওউ'। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে 'আলিমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত থাকলেও এগুলোর বিভিন্নতা গ্রহণযোগ্য এবং এদের সহাবস্থানও সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, সলাতে নাবি-এর বিভিন্নভাবে বসার পদ্ধতি। হয়তো একটি বসার ধরণকে একটি মাযহাব অপরটির উপর প্রাধান্য দিয়েছে।
বেশ কিছু বিষয়ে কুর'আন, সুন্নাহ ও সহাবিগণের ইজমা' কিংবা কিয়াস সমর্থিত একাধিক সমাধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী সিদ্ধান্তগুলোকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্যবহার উপযোগী বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আর এগুলো হচ্ছে উল্লিখিত যৌক্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য মতপার্থক্যের একটি অংশ। এই ধরনের বিষয়কে দ্বন্দ্ব সংঘাত ও বিরোধের উৎসে পরিণত করা একেবারেই অনুচিত। কারণ, সকল বর্ণনাই স্বয়ং নাবি-এর কাছ থেকে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, পরস্পর বিপরীতমুখী মতপার্থক্য বা ইখতিলাফ তাদাঁদ। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে এমন বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত দেখা যায়, যার সবগুলো যৌক্তিকভাবে একই সময়ে সঠিক হতে পারে না। যেমন, কিছু জিনিষকে এক মাযহাব হয়তো হালাল ঘোষণা করছে, আর অপর মাযহাব তাকে হারাম সাব্যস্ত করছে। এই ধরনের মতপার্থক্য নিরসনে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত:
১. শব্দের অর্থ ও ব্যাকরণগত ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে উদ্ভূত অধিকাংশ মতপার্থক্য নিরসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশুদ্ধ হাদীস অনুসরণ করতে হবে। হাদীসকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করলে উক্ত শব্দটির বাঞ্ছিত অর্থ সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা সম্ভব। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অর্থকে অন্য সব ব্যাখ্যার উপর প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
২. একইভাবে হাদীসভিত্তিক নয় কিংবা দুর্বল তথা অনির্ভরযোগ্য হাদীসের ভিত্তিতে দেওয়া আইনগত সিদ্ধান্তকে পরিত্যাগ করে নির্ভরযোগ্য হাদীসের ভিত্তিতে দেওয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।
৩. বিতর্কিত মূলনীতি কিংবা কিয়াসের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোকে কুর'আঁন, সুন্নাহ ও ইজমা'র আলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। তারপর এগুলোর সাথে সংগতিপূর্ণ সিদ্ধান্তকে গ্রহণ ও অসংগতিপূর্ণগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত।
মাযহাবগুলোর মতপার্থক্য নিরসনের এই তাত্ত্বিক রূপরেখা ফিক্ শাস্ত্রের বস্তুনিষ্ঠ অধ্যয়নে নিবেদিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধিক কার্যকর। এধরনের শিক্ষাকেন্দ্র হলো এমন প্রতিষ্ঠান যেখানে কোনো মাযহাবকেই অন্য মাযহাবের উপর প্রাধান্য দেওয়া হবে না; বরং কোনো বিষয়কে গ্রহণ বা বর্জনের একমাত্র মানদণ্ড হবে বিশুদ্ধ দলিল। এ অবস্থায় ইসলামি আইনকে এর মূল উৎস থেকে অধ্যয়ন করা যাবে এবং বিভিন্ন মাযহাবের মতকে যৌক্তিক ও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে। এসব শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার মান উন্নত হলে, মাযহাবগুলো পুনরেকত্রীতকরণের মহৎ পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত সাফল্যের প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করা যাবে। দলীয় চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও বিশুদ্ধ জ্ঞানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি ঐক্যবদ্ধ মাযহাবই মুসলিম বিশ্বের জন্য বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। একই সাথে বিশ্বব্যাপী শারী'আহ আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলনগুলোকেও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।
মাযহাবগুলোর একীভূত করা ও ইসলামি আইনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সফলতা এলে, আমরা তখন উম্মাহর পুনরেকত্রীকরণ ও সত্যিকারের খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে দৃষ্টি দিতে পারব। আল্লাহ চাইলে এ উদ্যোগ বিশ্বের সর্বত্র আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ভিত্তি ও দিকনির্দেশনা প্রদানে সক্ষম হবে।
মাযহাবগুলোর মতপার্থক্যগুলো প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত:
প্রথমত, বহুমুখী মতপার্থক্য বা ইখতিলাফ তানাওউ'। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে 'আলিমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত থাকলেও এগুলোর বিভিন্নতা গ্রহণযোগ্য এবং এদের সহাবস্থানও সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, সলাতে নাবি-এর বিভিন্নভাবে বসার পদ্ধতি। হয়তো একটি বসার ধরণকে একটি মাযহাব অপরটির উপর প্রাধান্য দিয়েছে।
বেশ কিছু বিষয়ে কুর'আন, সুন্নাহ ও সহাবিগণের ইজমা' কিংবা কিয়াস সমর্থিত একাধিক সমাধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী সিদ্ধান্তগুলোকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্যবহার উপযোগী বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আর এগুলো হচ্ছে উল্লিখিত যৌক্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য মতপার্থক্যের একটি অংশ। এই ধরনের বিষয়কে দ্বন্দ্ব সংঘাত ও বিরোধের উৎসে পরিণত করা একেবারেই অনুচিত। কারণ, সকল বর্ণনাই স্বয়ং নাবি-এর কাছ থেকে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, পরস্পর বিপরীতমুখী মতপার্থক্য বা ইখতিলাফ তাদাঁদ। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে এমন বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত দেখা যায়, যার সবগুলো যৌক্তিকভাবে একই সময়ে সঠিক হতে পারে না। যেমন, কিছু জিনিষকে এক মাযহাব হয়তো হালাল ঘোষণা করছে, আর অপর মাযহাব তাকে হারাম সাব্যস্ত করছে। এই ধরনের মতপার্থক্য নিরসনে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত:
১. শব্দের অর্থ ও ব্যাকরণগত ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে উদ্ভূত অধিকাংশ মতপার্থক্য নিরসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশুদ্ধ হাদীস অনুসরণ করতে হবে। হাদীসকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করলে উক্ত শব্দটির বাঞ্ছিত অর্থ সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা সম্ভব। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অর্থকে অন্য সব ব্যাখ্যার উপর প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
২. একইভাবে হাদীসভিত্তিক নয় কিংবা দুর্বল তথা অনির্ভরযোগ্য হাদীসের ভিত্তিতে দেওয়া আইনগত সিদ্ধান্তকে পরিত্যাগ করে নির্ভরযোগ্য হাদীসের ভিত্তিতে দেওয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।
৩. বিতর্কিত মূলনীতি কিংবা কিয়াসের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোকে কুর'আঁন, সুন্নাহ ও ইজমা'র আলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। তারপর এগুলোর সাথে সংগতিপূর্ণ সিদ্ধান্তকে গ্রহণ ও অসংগতিপূর্ণগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত।
মাযহাবগুলোর মতপার্থক্য নিরসনের এই তাত্ত্বিক রূপরেখা ফিক্ শাস্ত্রের বস্তুনিষ্ঠ অধ্যয়নে নিবেদিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধিক কার্যকর। এধরনের শিক্ষাকেন্দ্র হলো এমন প্রতিষ্ঠান যেখানে কোনো মাযহাবকেই অন্য মাযহাবের উপর প্রাধান্য দেওয়া হবে না; বরং কোনো বিষয়কে গ্রহণ বা বর্জনের একমাত্র মানদণ্ড হবে বিশুদ্ধ দলিল। এ অবস্থায় ইসলামি আইনকে এর মূল উৎস থেকে অধ্যয়ন করা যাবে এবং বিভিন্ন মাযহাবের মতকে যৌক্তিক ও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে। এসব শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার মান উন্নত হলে, মাযহাবগুলো পুনরেকত্রীতকরণের মহৎ পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত সাফল্যের প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করা যাবে। দলীয় চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও বিশুদ্ধ জ্ঞানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি ঐক্যবদ্ধ মাযহাবই মুসলিম বিশ্বের জন্য বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। একই সাথে বিশ্বব্যাপী শারী'আহ আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলনগুলোকেও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।
মাযহাবগুলোর একীভূত করা ও ইসলামি আইনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সফলতা এলে, আমরা তখন উম্মাহর পুনরেকত্রীকরণ ও সত্যিকারের খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে দৃষ্টি দিতে পারব। আল্লাহ চাইলে এ উদ্যোগ বিশ্বের সর্বত্র আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ভিত্তি ও দিকনির্দেশনা প্রদানে সক্ষম হবে।