📄 মুখবন্ধ
মানুষের জীবনের সকল কর্মকাণ্ডের আইনি বিধান বর্ণনাই হলো ইসলামি ফিক্হশাস্ত্রের উপজীব্য বিষয়। তাই আল-ফিক্হ আল-ইসলামি হলো মূলত ইসলামি আইনের পূর্ণাঙ্গ সংকলন। মুসলিম জীবনে তাই ফিক্হ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাসের পাঠক মাত্রই জানেন যে, একটি জাতি তার সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও পার্থিব উন্নতির ক্ষেত্রে যত উন্নতির সোপানেই আরোহণ করুক না কেন, যদি সে জাতির মধ্যে আইনের অনুশাসন না থাকে এবং আইনি মূলনীতি বলে কোনো জিনিস না থাকে, যা তাদের সকল আচরণ, মু'আমিলা ও চুক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করবে ও যার উপর ভিত্তি করে তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল বিশৃঙ্খলা দূর করবে, তাহলে তার পতন ত্বরান্বিত হতে বাধ্য; কারণ আইনি মূলনীতির অনুসরণ ও আইনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠাই একটি জাতিকে পুরোপুরি সমৃদ্ধ ও উন্নত করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিগণ (আল্লাহ তাঁদের সবার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন) ও তাঁদের অনুসারী ইসলামের ইমামগণ ও নেতৃবৃন্দ নিজ নিজ যুগে সেটিই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
আল-ফিক্হ আল-ইসলামি ওয়াহয়ি নির্ভর একটি আইনি ব্যবস্থাপনা। আল-কুর'আন ও আস-সুন্নাহ হলো ফিকহের মূল উৎস। এ দুটি উৎসের মূলনীতির আলোকে ইজতিহাদ ও গবেষণার মাধ্যমে ফিক্হশাস্ত্র যুগে যুগে উদ্ভূত সকল নতুন সমস্যারও সমাধান দিয়েছে এবং প্রমাণ করেছে যে, ইসলামি আইন চির আধুনিক, গতিময় ও সকল যুগের সাথেই সংগতিপূর্ণ। ইসলামের অন্যান্য শাখার মতোই ইসলামি ফিক্হে রয়েছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইতিহাস। এমন সুন্দর অবদান যে-ফিক্হের, তার ইতিহাস জানার আগ্রহ ও স্পৃহা কার না রয়েছে!
ড. আবু আমীনাহ বিলাল ফিলিপ্স রচিত “মাযহাব: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ” শীর্ষক বইটি পাঠকদের সে আগ্রহ ও স্পৃহা মেটানোর উদ্দেশ্যেই রচিত। যদিও এ বিষয়ে প্রাচীন কাল থেকেই কম-বেশি লেখা জ্ঞানের ভুবনে আমরা পাই, তবুও এ বিষয়ে আধুনিক অনেক জিজ্ঞাসা আমাদেরকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এসব প্রশ্নের চমৎকার সন্তোষজনক জবাব আমরা এ বইটিতে পাই।
ইসলামি আইন ও ফিকহের ধারাবাহিক বিকাশ ও বিভিন্ন যুগে ফিক্হী ইজতিহাদের ইতিহাস এতে যেমন তুলে ধরা হয়েছে তেমনি ইসলামি আইন বিষয়ক গবেষণার এ ধারাবাহিকতায় কীভাবে বিভিন্ন মত ও মাযহাবগুলো তৈরি হলো, কেন তৈরি হলো, কীভাবে ইসলামি সমাজ তা থেকে উপকৃত হলো কিংবা কখন মাযহাবি কোন্দলের বিভেদে সম্পৃক্ত হলো-সেটিও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি মুসলিম স্কলার ও সাধারণ শিক্ষিত সকল মুসলিমের এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোও তিনি চিহ্নিত করেছেন অত্যন্ত সফলভাবে, যাতে ইতিহাসকে সামনে রেখে উম্মাহ্র ঐক্যের ব্যাপারে তারা নিজেদের কর্মপন্থা স্থির করতে পারে এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে ধৈর্যের সাথে বিভেদ ও হানাহানি ত্যাগ করে আদর্শ মুসলিম সমাজ বিনির্মাণ করতে পারে।
লেখক নিজেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, বিভিন্ন মাযহাব ও মতের অনুসারী আজকের মুসলিমগণ যদি এরকম মহৎ উপলদ্ধি নিয়ে অগ্রসর হতে পারেন, তাহলে বর্তমানে বিরাজমান নানা মতানৈক্য ও বিভেদ সত্ত্বেও সবাই মিলে একপ্রাণ ও এক দেহ হয়ে কাজ করা সম্ভব। এভাবে এ চমৎকার বইটি বিভেদ ও মাযহাবি কোন্দলমুক্ত পরিবেশে জ্ঞান সাধনার একটি তাত্ত্বিক রূপরেখা যেমন পেশ করেছে, তেমনি ইসলামি পরিবেশে সফল সামাজিক কাজের একটি আদর্শিক ভিত্তিও তৈরি করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামি জ্ঞান সাধনার জগতে এ বইটি অত্যন্ত চমৎকার ও অতুলনীয় সংযোজন। আশা করি বইটির ক্ষুরধার বক্তব্য, প্রাঞ্জল উপস্থাপন ও ফিক্হী ইতিহাসের অনুপম বিশ্লেষণ আমাদের পাঠক সমাজে সাড়া ফেলবে। আল্লাহ বইটিকে কবুল করুন এবং এর লেখককে জাযা' খাইর ও হায়াতে তাইয়েবা দান করুন।
📄 ফিক্হ ও শারী‘আহ
ফিশাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস বুঝতে হলে প্রথমেই ফিক্হ ও শারী'আহ শব্দ দুটির অর্থ জানা প্রয়োজন। ফিক্হ শব্দের সরল অনুবাদ হলো ইসলামি আইন-কানুন (Islamic law)। শারী'আহ শব্দটিরও প্রায় একই অর্থ করা হয়। তবে, আরবি ভাষাবিদ কিংবা বিশেষজ্ঞ 'আলিম-কারও কাছেই শব্দ দুটি সর্মাথক নয়।
ফিকহ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো কোনো বিষয়ে সঠিক ও গভীর উপলব্ধি। নাবি ﷺ একটি হাদীসে এই অর্থে শব্দটি প্রয়োগ করেছেন:
"আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি দীনের ফিক্হ (সঠিক উপলব্ধি) দান করেন।" (৫)
পারিভাষিকভাবে ফিক্হ বলতে কুর'আন ও সুন্নাহর বিভিন্ন প্রমাণ থেকে মাসআলা ইসতিম্বাত তথা আইন-কানুন বের করে আনার নীতিকে বোঝায়; ব্যাপক অর্থে কুর'আন সুন্নাহর আলোকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বা আইন সমষ্টিকেও ফিকহ বলা হয়। অন্যদিকে শারী'আহ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো এমন একটি পানির আধার যেখানে প্রতিদিন বিভিন্ন প্রাণী পানি পান করার জন্য ভিড় করে। এর আরেকটি অর্থ হলো সরল-সঠিক পথ। যেমনটি কুর'আনে আছে,
ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَى شَرِيعَةٍ مِّنَ الْأَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
তার পর আমরা তোমাকে একটি শারী'আহ্-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছি। অতএব, তুমি তা অনুসরণ করো। আর যারা জানে না তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না। (আল-জাসিয়াহ, ৪৫:১৮)
ইসলামি পরিভাষায় এ শব্দটি দ্বারা ইসলামের সব বিধানকে বোঝায়, যা নাবি মুহাম্মাদ -এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং আল-কুর'আন ও নাবি -এর জীবনাদর্শ তথা সুন্নাহর মধ্যে লিপিবদ্ধ আছে(৬)।
পার্থক্য
উল্লিখিত সংজ্ঞা দুটি থেকে নিম্নোক্ত তিনটি পার্থক্য বেরিয়ে আসে: ১. শারী'আহ হলো কুর'আন কিংবা হাদীসে উল্লিখিত সামগ্রিক বিধান। অন্যদিকে ফিক্হ হলো নির্ধারিত বিষয়ে শারী'আহ হতে উদ্ভাবিত আইনকানুন।
২. ইসলামি শারী'আহ সুনির্ধারিত ও অপরিবর্তনীয়। অন্যদিকে স্থান, কাল ও পাত্রভেদে ফিক্হের অনেক বিধান পরিবর্তিত হয়।
৩. অধিকাংশ ক্ষেত্রে শারী'আতে ব্যাপক ও সার্বজনীন মৌলিক নীতিগুলো দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ফিক্হের আইনগুলো সুনির্দিষ্ট। অর্থাৎ শারী'আহ্ কোনো বিধানকে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রেক্ষাপটে ঠিক কীভাবে প্রয়োগ করা হবে-তার বিস্তৃত বিবরণ হলো ফিক্হ।
টিকাঃ
(৫) মু'আউইয়াহ থেকে বর্ণিত এই হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম বুখারি; খন্ড ৪, পৃ. ২২৩-২২৪, হাদীস নং ৩৪৬; সহীহ মুসলিম ['আব্দুল হামীদ সিদ্দীকির ইংরেজি অনুবাদ, বৈরুত: দাঁর আল-আরাবিয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৬১, হাদীস নং ৪৭২০;] তিরমিযি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণও হাদীসটি সংকলন করেছেন।
(৬) মুহাম্মাদ সা'লাবি, আল মাদখাল ফিত-তা'রীফ বিল-ফিকহ আল-ইসলামি, (বৈরুত, দার আন-নাদওয়াতিল 'আরাবিয়্যাহ, ১৯৬৯), পৃ. ২৮।
📄 ফিক্হের ক্রমবিকাশ
দ্রষ্টব্য
১. ফিকহশাস্ত্রের ইতিহাস ও ক্রমবিকাশের উপর লিখিত এ বইয়ে 'ইসলামি আইন' পরিভাষাটি ফিক্হী ও শার'ঈ—উভয় আইনকে বোঝাতেই ব্যবহৃত হবে। তবে, পার্থক্য করার প্রয়োজন পড়লে ফিক্হ অথবা ফিক্হী আইন এবং শারী'আহ কিংবা শারী'আহ আইন পরিভাষাটি ব্যবহার করা হবে।
২. এ বইয়ে ব্যবহৃত আরবি শব্দগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে বইয়ের শেষে; সেখানে ব্যবহৃত শব্দগুলোর বহুবচন দেওয়া হয়েছে। বহুল পরিচিত আরবি বহুবচন বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, মুসলিমুন এর পরিবর্তে মুসলিমগণ এবং সুওয়ার এর পরিবর্তে সূরাগুলো।
ফিকহের ক্রমবিকাশ
ফিকহের ক্রমবিকাশকে ঐতিহাসিকভাবে ছয়টি প্রধান পর্যায়ে বিন্যস্ত করা যায়। যথা: ভিত্তি, প্রতিষ্ঠা, নির্মাণ, বিকাশ, সুসংহতকরণ এবং বন্ধ্যাত্ব ও অবনতি। এ পর্যায়গুলো নিম্নোক্ত সময়ে সংঘটিত হয়েছে:
ক) ভিত্তি : নাবি মুহাম্মাদ ﷺ-এর নুবুওয়াতের যুগ (৬০৯-৬৩২ সাল)।
খ) প্রতিষ্ঠা : ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার যুগ তথা নাবি ﷺ-এর মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে 'আলি Ÿ-এর খিলাফাতের শেষ সময় পর্যন্ত, ১১-৪০ হিজরি (৬৩২-৬৬১ সাল)।
গ) নির্মাণ : ৪১ হিজরি (৬৬১ সাল) তথা উমাইয়া শাসনের শুরু থেকে প্রায় ১৩১ হিজরিতে (৭৪৯ সালে) এর পতন পর্যন্ত।
ঘ) বিকাশ : ১৩১ হিজরিতে আব্বাসি রাজত্বের উত্থান থেকে শুরু করে আনুমানিক ৩৪০ হিজরিতে (প্রায় ৯৫০ সাল) এর পতনের শুরু হওয়া পর্যন্ত।
ঙ) সুসংহতকরণ : ৩৪০ হিজরিতে 'আব্বাসি রাজত্বের অবনতি থেকে শুরু করে ৬৫৬ হিজরিতে (১২৫৮ সাল) মঙ্গোলিয়োদের হাতে সর্বশেষ আব্বাসি খলীফা খুন হওয়া পর্যন্ত।
চ) বন্ধ্যাত্ব ও অবনতি : হিজরি ৬৫৬ সালে বাগদাদ ধ্বংস থেকে নিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত।
এ বইটিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ উল্লিখিত পর্যায়গুলোকে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হবে। এই পর্যায়গুলো সম্পকে বিস্তারিত জানতে পারলে পাঠকগণ প্রতিটি মাযহাবের ক্রমবিকাশ ও ফিক্হশাস্ত্রের উন্নয়ন সাধনে মাযহাবগুলোর সার্বিক অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে সক্ষম হবেন। এ বিষয়টিও তাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, কোনো একক মাযহাবই গোটা ইসলামি আইন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরার দাবি করতে পারে না। অন্য কথায় কোনো একটি মাযহাবের মাধ্যমে ফিকহ শাস্ত্রকে সঠিকভাবে নিরূপণ করাও সম্ভব নয়।
শারী'আহ্ ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিটি মাযহাবেরই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। স্থান-কাল ও সাংস্কৃতিক পটভূমির ভিন্নতা সত্ত্বেও যৌথভাবে শারী'আহ ও ফিক্হই পারে গোটা মুসলিম উম্মাহকে একতাবদ্ধ করতে। বস্তুত, যে নির্ভুল মাযহাবটি প্রশ্নাতীতভাবে সকল ক্ষেত্রে অনুসরণীয় তা হলো নাবি মুহাম্মাদ -এর মাযহাব। শারী'আহ্ র ব্যাপারে একমাত্র তাঁর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত ও কিয়ামাত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য অনুসরণীয়। অন্য কোনো মাযহাবই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত নয়; বরং তা মানবীয় চেষ্টার ফল, তাই স্বাভাবিক কারণেই এগুলো মানবীয় ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়।
শাফি'ই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আশ-শাফি'ই রহীমাহুল্লাহ এ ব্যাপারে বলেছেন, "আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই যে আল্লাহর রসূল ﷺ-এর সব হাদীস সম্পর্কে জানেন; অথবা যেসব হাদীস শুনেছেন তার কোনটিই ভুলে যাননি। কাজেই, আমার প্রণীত আইন বা মূলনীতিতে স্বাভাবিক কারণেই আল্লাহর রসূল ﷺ-এর হাদীসের সাথে অসংগতিপূর্ণ কিছু থাকতেই পারে। অতএব, আল্লাহর রসূল ﷺ যা বলেছেন সেটাই হলো একমাত্র চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আর সেটাই আমার প্রকৃত মাযহাব।” (৭)
টিকাঃ
(৭) ইমাম শাফি'ই থেকে নির্ভরযোগ্য ইসনাঁদসহ এ বক্তব্যটি সংকলন করেছেন আল-হাকিম (ইবন 'আসাকির, তারীখ দিমাশক, খন্ড ১৫, অনুচ্ছেদ ১, পৃ. ৩) এবং ইবন আল-কায়্যিম, ই'লাম আল-মুক্'িঈন, (মিশর: আল-হাজ্জ 'আব্দুস-সালাম প্রেস, ১৯৬৮, খন্ড ২, পৃ. ৩৬৩)।
📄 উপসংহার
পূবের্ অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখেছি যে, মাযহাবগুলো মূলত চারটি মৌলিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। নেপথ্যে রয়েছে নিম্নোক্ত কারণগুলো:
১. ঐক্যবদ্ধ বা বিশৃঙ্খল বিভিন্ন অবস্থায় মুসলিম রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি
২. দীনি নেতৃত্বের অবস্থা (একীভূত ও রক্ষণশীল, বিচ্ছিন্ন ও অরক্ষণশীল)
৩. বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যোগাযোগ。
প্রাথমিক যুগে ইসলামি রাষ্ট্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ। তখন নেতৃত্বও ছিল একীভূত এবং শাসকগণ ছিলেন ধর্মপরায়ণ। সে সময় মুসলিম বিশেষজ্ঞগণও একে অপরের কাছাকাছি ছিলেন। ফলে তখন যোগাযোগ ছিল অনেক সহজ। এ কারণেই তখন কেবল একটি মাযহাবই বিদ্যমান ছিল; আর তা ছিল নাবি -এর মাযহাব অথবা ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার মাযহাব। তারপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে ভাঙন ধরে। শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞগণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নিবাস স্থাপন করেন। যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতার কারণে বিশেষজ্ঞগণ পারস্পরিক পরামর্শের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করতে বাধ্য হন।
এভাবে একসময় গড়ে উঠে অসংখ্য মাযহাব। তবে অধিক নির্ভরযোগ্য হাদীসভিত্তিক অন্যের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তৎক্ষণাৎ নিজের মত পরিত্যাগে এই বিশেষজ্ঞগণ মোটেও দ্বিধা করতেন না। ফলে তারা পূর্ববর্তী যুগের বিশেষজ্ঞদের উদার মানসিকতার ধারাকে অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে 'আব্বাসি খিলাফাতের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে ভাঙনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশেষজ্ঞগণও অনেকটা জড়িয়ে পড়েন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত দরবারি বিতর্ক এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। এই অবাঞ্ছিত বিতর্কে বিজয়ী ব্যক্তি ও তাদের মাযহাবকে বিশেষ রাজকীয় আনুকূল্য এনে দেয়। মূলত এটি ছিল গোঁড়ামিপূর্ণ দলাদলিরই আরেকটি ধাপ। আর এর মাধ্যমে বিদ্যমান চারটি মাযহাবের অনুসারীদের অনেকেই ব্যক্তিগত সুখ্যাতি লাভ করেছেন।
গতিশীল ফিক্হ
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থা মূলত পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোরই একটি সংমিশ্রণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি পুনরায় মুসলিম 'আলিমদের পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এর বহু আগেই মুসলিম বিশ্ব বিভিন্ন আর্থ-রাজনৈতিক সরকার পদ্ধতির ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদী সত্তায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পরিণতিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে। বর্তমান পৃথিবীর মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় দুই বিলিয়ন। কেবল আল্লাহ ও তাঁর নাবি -এর প্রতি বিশ্বাসই এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একটি অন্যরকম ঐক্যের সূত্রে আবদ্ধ করে রেখেছে। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র চার মাযহাবের যেকোনো একটি দিয়ে ধর্মীয় শাসনতন্ত্রের আইন পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। এই প্রচেষ্টা পূর্বের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কিছুটা কম গোঁড়া। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানেও মাযহাবকেন্দ্রিক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে এখনও রয়ে গিয়েছে। এ কারণেই শাসনতন্ত্রের এই ব্যবস্থাও মুসলিম সমাজের মধ্যে বিভিন্ন রকম বিভেদ সৃষ্টি করছে।
তবে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর দীনকে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে একটি আশাব্যঞ্জক প্রেরণা জেগে উঠেছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু সংস্কৃতি বিদ্যমান। উপরন্তু, দ্রুত পরিবর্তনশীল এ বিশ্বে প্রাত্যহিক জীবন থেকে উদ্ভূত সমস্যা ও বিষয়াবলি ক্রমবর্ধমান হারে বৈচিত্র্য লাভ করছে। ফলে অনেক মুসলিম বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন থেকে উপলব্ধি করছেন যে, কেবল গতিশীল-ফিক্হ-চর্চার-ধারা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই মুসলিমদের জীবনবিধান হিসেবে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। এ বিষয়টি আমরা ইতিপূর্বেও "বিকাশ পর্যায়” শিরোনামে উল্লেখ করেছি। সব ধরনের গোঁড়ামি ও দলীয় চিন্তা দূরীভূত করে মাযহাবগুলোর পুনরায় একত্রীকরণ এবং ফিক্হশাস্ত্রকে গতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে ইজতিহাদের দ্বার পুনরায় খুলে দেওয়া আবশ্যক। এতে করে মুসলিম আইনজ্ঞগণ এমন বস্তুনিষ্ঠ আইন প্রণয়নে সক্ষম হবেন যেগুলো দিয়ে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শারী'আহ আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এরূপ সংস্কারের সম্ভাব্য প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেবল ইসলামে নবদীক্ষিত লোকদের উপরই নয় বরং মুসলিম হিসেবে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের উপরও এর প্রভাব পড়বে। নতুন ইসলাম গ্রহণকারীরা বিভিন্ন মাযহাবের মতপার্থক্যের জটিলতা থেকে রেহাই পাবে। আর মুসলিম সমাজে জন্ম নেওয়া মুসলিমদের নতুন প্রজন্ম মাযহাবগুলোর মতপার্থক্যের কারণে সৃষ্ট হতাশা থেকে মুক্তি পাবে। তখন তাঁরা সকল মাযহাব ও প্রথম যুগের বিশেষজ্ঞদের অসাধারণ অবদানকে বর্জন করার অদূরদর্শী চিন্তাধারাও পরিহার করতে পারবে।
পূবের্ অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখেছি যে, মাযহাবগুলো মূলত চারটি মৌলিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। নেপথ্যে রয়েছে নিম্নোক্ত কারণগুলো:
১. ঐক্যবদ্ধ বা বিশৃঙ্খল বিভিন্ন অবস্থায় মুসলিম রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি
২. দীনি নেতৃত্বের অবস্থা (একীভূত ও রক্ষণশীল, বিচ্ছিন্ন ও অরক্ষণশীল)
৩. বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যোগাযোগ。
প্রাথমিক যুগে ইসলামি রাষ্ট্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ। তখন নেতৃত্বও ছিল একীভূত এবং শাসকগণ ছিলেন ধর্মপরায়ণ। সে সময় মুসলিম বিশেষজ্ঞগণও একে অপরের কাছাকাছি ছিলেন। ফলে তখন যোগাযোগ ছিল অনেক সহজ। এ কারণেই তখন কেবল একটি মাযহাবই বিদ্যমান ছিল; আর তা ছিল নাবি -এর মাযহাব অথবা ন্যায়নিষ্ঠ চার খলীফার মাযহাব। তারপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে ভাঙন ধরে। শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞগণ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নিবাস স্থাপন করেন। যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতার কারণে বিশেষজ্ঞগণ পারস্পরিক পরামর্শের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করতে বাধ্য হন।
এভাবে একসময় গড়ে উঠে অসংখ্য মাযহাব। তবে অধিক নির্ভরযোগ্য হাদীসভিত্তিক অন্যের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তৎক্ষণাৎ নিজের মত পরিত্যাগে এই বিশেষজ্ঞগণ মোটেও দ্বিধা করতেন না। ফলে তারা পূর্ববর্তী যুগের বিশেষজ্ঞদের উদার মানসিকতার ধারাকে অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে 'আব্বাসি খিলাফাতের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে ভাঙনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশেষজ্ঞগণও অনেকটা জড়িয়ে পড়েন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত দরবারি বিতর্ক এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। এই অবাঞ্ছিত বিতর্কে বিজয়ী ব্যক্তি ও তাদের মাযহাবকে বিশেষ রাজকীয় আনুকূল্য এনে দেয়। মূলত এটি ছিল গোঁড়ামিপূর্ণ দলাদলিরই আরেকটি ধাপ। আর এর মাধ্যমে বিদ্যমান চারটি মাযহাবের অনুসারীদের অনেকেই ব্যক্তিগত সুখ্যাতি লাভ করেছেন।
গতিশীল ফিক্হ
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থা মূলত পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোরই একটি সংমিশ্রণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি পুনরায় মুসলিম 'আলিমদের পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এর বহু আগেই মুসলিম বিশ্ব বিভিন্ন আর্থ-রাজনৈতিক সরকার পদ্ধতির ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদী সত্তায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পরিণতিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে। বর্তমান পৃথিবীর মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় দুই বিলিয়ন। কেবল আল্লাহ ও তাঁর নাবি -এর প্রতি বিশ্বাসই এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একটি অন্যরকম ঐক্যের সূত্রে আবদ্ধ করে রেখেছে। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র চার মাযহাবের যেকোনো একটি দিয়ে ধর্মীয় শাসনতন্ত্রের আইন পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। এই প্রচেষ্টা পূর্বের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কিছুটা কম গোঁড়া। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানেও মাযহাবকেন্দ্রিক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে এখনও রয়ে গিয়েছে। এ কারণেই শাসনতন্ত্রের এই ব্যবস্থাও মুসলিম সমাজের মধ্যে বিভিন্ন রকম বিভেদ সৃষ্টি করছে।
তবে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর দীনকে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে একটি আশাব্যঞ্জক প্রেরণা জেগে উঠেছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু সংস্কৃতি বিদ্যমান। উপরন্তু, দ্রুত পরিবর্তনশীল এ বিশ্বে প্রাত্যহিক জীবন থেকে উদ্ভূত সমস্যা ও বিষয়াবলি ক্রমবর্ধমান হারে বৈচিত্র্য লাভ করছে। ফলে অনেক মুসলিম বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন থেকে উপলব্ধি করছেন যে, কেবল গতিশীল-ফিক্হ-চর্চার-ধারা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই মুসলিমদের জীবনবিধান হিসেবে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। এ বিষয়টি আমরা ইতিপূর্বেও "বিকাশ পর্যায়” শিরোনামে উল্লেখ করেছি। সব ধরনের গোঁড়ামি ও দলীয় চিন্তা দূরীভূত করে মাযহাবগুলোর পুনরায় একত্রীকরণ এবং ফিক্হশাস্ত্রকে গতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে ইজতিহাদের দ্বার পুনরায় খুলে দেওয়া আবশ্যক। এতে করে মুসলিম আইনজ্ঞগণ এমন বস্তুনিষ্ঠ আইন প্রণয়নে সক্ষম হবেন যেগুলো দিয়ে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শারী'আহ আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এরূপ সংস্কারের সম্ভাব্য প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেবল ইসলামে নবদীক্ষিত লোকদের উপরই নয় বরং মুসলিম হিসেবে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের উপরও এর প্রভাব পড়বে। নতুন ইসলাম গ্রহণকারীরা বিভিন্ন মাযহাবের মতপার্থক্যের জটিলতা থেকে রেহাই পাবে। আর মুসলিম সমাজে জন্ম নেওয়া মুসলিমদের নতুন প্রজন্ম মাযহাবগুলোর মতপার্থক্যের কারণে সৃষ্ট হতাশা থেকে মুক্তি পাবে। তখন তাঁরা সকল মাযহাব ও প্রথম যুগের বিশেষজ্ঞদের অসাধারণ অবদানকে বর্জন করার অদূরদর্শী চিন্তাধারাও পরিহার করতে পারবে।