📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 মতপার্থক্য নিরসনের পদ্ধতি

📄 মতপার্থক্য নিরসনের পদ্ধতি


নবী ﷺ তাঁর উম্মাতকে কিতাবের মধ্যকার ইখতিলাফ নিরসনের পদ্ধতি বলে গেছেন। 'আমর ইবনে শু'আয়িব তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন: "নবী ﷺ একদল লোককে কুরআনের বিষয়ে বিতর্ক করতে শুনলেন। তখন তিনি বললেন: তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তারা এ কারণেই হালাক (ধ্বংস) হয়েছে। তারা আল্লাহর কিতাবের এক অংশকে অপর অংশ দ্বারা বাতিল করার চেষ্টা করেছিল। অথচ কিতাবুল্লাহ নাযিল হয়েছে এর এক অংশ অপর অংশের সমর্থক হিসাবে। সুতরাং তোমরা এর এক অংশকে অপর অংশ দ্বারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করবে না। বরং যা তোমরা জান কেবল তা-ই বলবে। আর যা জান না তা যে জানে তার কাছে সপর্দ করবে।"২০৮

হাদীসটি থেকে সুস্পষ্ট হল, দ্বীনি বিষয়ে বিতর্ক নিষিদ্ধ। শরী'আতে বর্ণিত বিষয়গুলো কখনই স্ববিরোধী হতে পারে না। তেমনি সহীহ হাদীসও পরস্পরের বিরোধী নয়। কখনো এমনটি পরিদৃষ্ট হলে যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে তার সমাধান নিতে হবে।

টিকাঃ
২০৮. হাসান: আহমাদ, মিশকাত [ঢাকা: এমদাদিয়া লাইব্রেরী। ২য় খণ্ড- হা/২২১। নাসিরুদ্দীন আলবানী হাদীসটিকে 'হাসান' বলেছেন- আলবানীর তাহক্বীকুকৃত মিশকাত ১/২৩৮ পৃঃ। শায়েখ যুবায়ের আলী ঝাই আহমাদের বর্ণনাটিকে যুহরীর তাদলীসের কারণে য'য়ীফ বলেছেন। তবে তাক্বদীর নিয়ে সাহাবীদের বিতর্ক শুনে নবী ﷺ বলেছিলেন: بهذا أمرتم أو لهذا خلقتম তضربون القرآن بعضه ببعض بهذا هلكت الأمم قبلكم. "তোমাদের কি এ কাজের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, অথবা এর জন্য কি তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে? তোমরা তো কুরআনের কতক আয়াতকে কতক আয়াতের মোকাবেলায় উপস্থাপন করছো। এ জন্যই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাত ধ্বংস হয়েছে।” (ইবনে মাজাহ হা/৮৫) শায়েখ যুবায়ের আলী ঝাই পূর্বোক্ত বিশ্লেষণের পর এই হাদীসটি সম্পর্কে লিখেছেন: "এই হাদীসটি হাসান। আর বুসীরী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [আযওয়াহউল মাসাবীহ ফী তাহক্বীকে মিশকাতুল মাসাবীহ ১/৩০০ পৃঃ হা/২৩৭] সর্বোপরি সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আহমাদের বর্ণনাটি হাসান। আল্লাহ-ই তাওফিকুদাতা।

📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 সহীহ হাদীস পরস্পরের বিরোধী নয়?

📄 সহীহ হাদীস পরস্পরের বিরোধী নয়?


ইমাম শাফে'য়ী বলেন: "কোন ভাবেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত আল্লাহর কিতাবের খেলাফ হতে পারে না।" [আর-রিসালাহ ১/৫৪৬ পৃঃ]

ইমাম ইবনে খুযায়মাহ বলেন: "আমি এমন কোন সহীহ হাদীস জানি না যা পরস্পরের বিরোধী। যদি কোন ব্যক্তি (সহীহ হাদীসে) বিরোধ মনে করে, সে যেন আমার কাছে সেটা নিয়ে আসে। তাহলে তাদের পারস্পরিক (সমাধানের) অবস্থাগুলো দেখব।" (সিদ্দীক হাসান খান, মিনহাজুল উসূল ইলা ইসলাহী আহাদীসির রসূল; হাফেয ইরাক্বী, শরহে তাবসিরাহ ও তাযকিরাহ)২০৯

সুতরাং যদি হাদীসের মধ্যকার বিতর্ক নিজ সীমাবদ্ধতা ও 'ইলমের কমতির কারণে বুঝা না যায়, তবে যেন তারা হাদীস বিশেষজ্ঞদের স্মরণাপন্ন হয়। এ মর্মে রিসালাহ ইবনে কুতায়বাহ, ইমাম শাফে'য়ীর কিতাবুল 'উম, ইমাম শওকানীর 'ইরশাদুল ফুহুল; কিংবা সিদ্দিক হাসান খান-এর তিনটি কিতাব 'মিনহাজুল উসূল ইলা ইসলাহী আহাদীসির রসূল', 'হুসূলুল মামূল মিন 'ইলমিল উসূল' ও 'হিদায়াতুস সাইল ইলা আদিল্লাতিহিল মাসায়িল' দ্রষ্টব্য।

উল্লেখ্য একজন বিশেষজ্ঞের কাছে সমাধান নাও থাকতে পারে। তাছাড়া বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে কুরআন ও হাদীসের বিষয়ে সমাধানের জন্য। তার রায় জানার জন্য নয়। এজন্য বিশেষজ্ঞদের কাছে গিয়ে কুরআন ও হাদীসের বিষয়ে সমাধান জানাটা তাক্বলীদ নয়। তাক্বলীদ হল, কুরআন ও সহীহ হাদীসের সমাধান উপস্থাপনের পরেও কারো ভুল সিদ্ধান্তকে এই চিন্তায় আঁকড়ে থাকা যে, তিনিই তো আমার ইমাম। সুতরাং তিনি যা বলবেন- সেটাই আমার কাছে ইসলামী শরী'য়াহ তথা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান। অথচ আল্লাহ সেটা নাযিল করেন নি। আর এটাই শিরক ফিল হুকুম। যা ইয়াহুদীগণ করত। [বিস্তারিত দেখুনঃ তাফসীর- হুকুম বিগয়রি মাআনঝালাল্লাহ]

টিকাঃ
২০৯. মুহাম্মাদ আবুল হাসান শিয়ালকোটি, আয-যাফরুল মুবীন ফী রদ্দে মুগালিতাতুল মুক্বাল্লিদীন (পাকিস্তান, মাকতাবাহ মুহাম্মাদিয়া, এপ্রিল ২০০২) পৃঃ৬৩।

📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 যে সমস্ত বিষয়ে শরী‘আত নিরব সে সমস্ত ক্ষেত্রে করণীয়

📄 যে সমস্ত বিষয়ে শরী‘আত নিরব সে সমস্ত ক্ষেত্রে করণীয়


আল্লাহ বলেন: "তোমাদের জন্য যেগুলো হারাম তা তিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।"২১০

এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ বলেছেন: "আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তাই হালাল এবং যা হারাম করেছেন তাই হারাম এবং যা থেকে নীরব থেকেছেন তা মাফযোগ্য। সুতরাং যা মাফযোগ্য তা তোমরা আল্লাহ্'র পক্ষ থেকে গ্রহণ কর। কেননা, নিশ্চয় আল্লাহ কিছু ভুলেন না।" অতঃপর তিলাওয়াত করলেন: "তোমাদের রব ভুলেন না। [সূরা মারইয়াম : ৬৪ আয়াত]"২১১

অন্যত্র নবী বলেছেন: "আমি একজন মানুষ। আমি যখন তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে নির্দেশ দিই, তখন তা তোমরা গ্রহণ করবে, আর আমি যখন আমার রায় অনুসারে তোমাদেরকে কোন বিষয়ে নির্দেশ দিই, তখন আমিও একজন মানুষ।"২১২

অন্যত্র নবী বলেছেন: "আমি যেসব বিষয় বর্ণনা না করে তোমাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছি, সেসব ব্যাপারে আমাকে ছেড়ে দাও।"২১৩

সুস্পষ্ট হল, যেসব ক্ষেত্রে শরী'য়াত নিরব সেসব ক্ষেত্রে উন্মুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং ঐ সব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণের বাধ্য-বাধকতা ইসলামে নেই। এ পর্যায়ে যা কুরআন ও নবী ﷺ-এর সুন্নাহর বিরোধী নয় সেসব ক্ষেত্রে খলীফ-আমীর (মাজলিশে শুরা), পিতামাতা, শিক্ষক, বয়োজ্যৈষ্ঠ, উর্ধ্বতনের নিয়ম-নীতি মেনে নেয়াটা অনুমোদিত।

এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ বলেছেন: "নাফরমানীর ব্যাপারে ইতা'আত নেই। ইতা'আত কেবল ন্যায়সঙ্গত কাজে।"২১৪ অন্যত্র তিনি বলেন: "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীর মধ্যে কোন সৃষ্টির ইতা'আত নেই।"২১৫ তেমনি আল্লাহ -ও কুরআন মাজীদে বলেছেন:

"হে মু'মিনগণ! আল্লাহর ইতা'আত করো এবং রসূলের ইতা'আত করো। আর তোমাদের মধ্যে যার 'উলুল আমর' তাদেরও। যদি তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তাহলে সে বিষয়ে আল্লাহ ও রসূলের দিকে ফিরে আস। যদি তোমরা ঈমান আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাক। আর এটিই হল ভাল এবং পরিণামে খুবই উত্তম।" [সূরা নিসা: ৫৯ আয়াত]

আশা করি পাঠকের কাছে এখন সুস্পষ্ট যে, ইসলামে মতপার্থক্য ভাল, উৎকৃষ্ট, রহমত এবং এর যৌক্তিকতার জ্ঞানগর্ভ আলোচনা পড়ে বা শুনে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। কেননা ঐ জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ইসলামী আক্বীদার বিরোধী।

টিকাঃ
২১০. সূরা আনয়াম : ১১৯ আয়াত।
২১১. সহীহ: হাকিম- কিতাবুত তাফসীর বাবে সূরা মারইয়াম। হাকিম এর সনদকে সহীহ বলেছেন। উক্ত মর্মে বাযযার সলেহ সনদে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। [ফতহুল বারী ১৩/৩৭৮ পৃঃ; নায়লুল আওতার ৮/৪২৮ পৃঃ।
২১২. সহীহ: সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ১/১৪০ নং।
২১৩. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন ১/১৫৬ নং।
২১৪. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত [এমদা] ৭/৩৪৯৬ নং।
২১৫. সহীহঃ শরহে সুন্নাহ, মিশকাত [এমদা] ৭/৩৫২৭ নং। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন [তাহক্বীকৃত মিশকাত ২/১০৬২ পৃঃ)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px