📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 ‘উলুল আমরের অনুসরণ

📄 ‘উলুল আমরের অনুসরণ


ফারান: “মাস'উদ সাহেব কতটা নির্বোধের মত কথা বলেছেন, কুরআনুল কারীমে যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল ﷺ-এর অনুসরণের সাথে, অনুসরণের পরে বা অনুসরণ হিসাবে 'উলূল আমর'-এর অনুসরণ করার হুকুম এসেছে। তখন 'উলূল আমর'-এর অনুসরণ কি হারাম হয়? তাক্বলীদের বৈধতা তো কুরআনুল কারীমের এই আয়াতের মাধ্যমেই এসেছে।

আল্লাহ বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّসُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ “হে মু'মিনগণ! আল্লাহর ইতা'আত করো এবং রসূলের ইতা'আত করো। আর তোমাদের মধ্যে যারা 'উলুল আমর' তাদেরও।” [সূরা নিসা : ৫৯ আয়াত]

'উলূল আমর'-এর তাফসীরে কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ শাসক। আবার কেউ কেউ বলেছেন ফকীহগণ। দ্বিতীয় তাফসীরটি জাবের, 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে।

সংশোধন:
ক. যদি বলা হয় দ্বিতীয় তাফসীরটি ইবনে 'আব্বাস ও অন্যান্যদের থেকে বর্ণিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে এটাও উল্লেখ করা দরকার প্রথম তাফসীরটি আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন: هم الأمراء "অর্থাৎ উলুল আমর হল -শাসক।” [তাফসীরে তাবারী -এর সনদ সহীহ (ফতহুল বারী ৯/৩২৩)]

খ. আফসোস! তাক্বী সাহেব যদি এ সম্পর্কে কোন মারফু' হাদীস পেশ করতেন। এ সম্পর্কে মারফু' হাদীস ইবনে 'আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বর্ণনা করেছেন:
نَزَلَتْ فِي عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حُذَافَةَ بْنِ قَيْسٍ مِنْ عَدِيٍّ بَعْثَهُ رَسُوْلُ الله ﷺ فِي سَرِيَّة
"আয়াতটি আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাফা ইবনে কায়েস ইবনে আদীর সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। যাকে রসূলুল্লাহ ﷺ কোন যুদ্ধে (আমীর হিসাবে) পাঠান।" আলী বর্ণনা করেছেন: بَعَثَ النَّبِيُّ ﷺ سَرِيَّةً فَاسْتَعْمَلَ رَجُلًا مِنَ الْأَنْصَارِ وَأَمَرَهُمْ أَنْ يُطِيعُوهُ “রসূলুল্লাহ ﷺ একটি সৈন্যদলকে প্রেরণ করলেন। তাদের উপর একজন ‘আনসারকে আমীর নিযুক্ত করলেন এবং সৈন্যদলকে বললেন তার আনুগত্য করতে।”

তাক্বী সাহেব! এখন বলুন, এই মারফু' হাদীসগুলোতে কি বলা হয়েছে? এই হাদীসগুলো থেকে কী এটা প্রমাণিত হয় না যে, উলুল আমর অর্থ ‘আমীর? বলুন, মারফু' হাদীস থাকতে সাহাবীদের আসার উপস্থাপনের প্রয়োজন বাকী থাকে কি?

গ. ‘উলুল আমর’ শব্দটিতে আমর (امر) রয়েছে। বলুন, এই মাদ্দাটি (শব্দের মূল) কার সাথে সম্পৃক্ত امراء না علماء -এর সাথে। علماء এর মাদ্দা তো علم এর সাথে, امر এর সাথে নয়। তাহলে আপনি কেন ‘উলুল আমর’ বলতে উলামা নিচ্ছেন?

ঘ. তাক্বী সাহেব! এই আয়াতে ‘উলুল আমর’ দ্বারা কি চার ইমামকেই বুঝানো হয়েছে, নাকি যে কোন একজন ইমামের আনুগত্যকে ওয়াজিব করা হয়েছে? আয়াতটির কোন শব্দ দ্বারা চার ইমাম, অতঃপর কোন একজন ইমামের তাক্বলীদ করাটা ওয়াজিব বলা হয়েছে?

ঙ. তাক্বী সাহেব যে সমস্ত ব্যক্তির উদ্ধৃতির সাহায্যে অত্যন্ত জোড়ালোভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, ‘উলুল আমর’ অর্থ আলেম ও ফক্বীহগণ। ইবনে ‘আব্বাসের উক্তির আলোকে আমি আপনার কথাকে মেনে নিচ্ছি। কিন্তু এরপরেও আয়াতটি দ্বারা তাক্বলীদে শাখসী প্রমাণিত হয় না। বরং উন্মুক্তভাবে আলেমদের তাক্বলীদ প্রমাণিত হয়। অথচ আমাদের আলোচনার বিষয় হল ‘তাক্বলীদে শাখসী’, যা এই আয়াতটি দ্বারাও খণ্ডিত হয়। আপনি যদি তাক্বলীদে শাখসীর সমর্থনে কোন আয়াত পেশ করতেন!!

চ. তাক্বী সাহেব আয়াতটির প্রসঙ্গে 'উলুল আমর' অর্থ আলেম ও শাসক উভয়টিকেই মেনে নিয়েছেন। অর্থাৎ উভয়ের ইতা'আতের একই হুকুম। এ পর্যায়ে প্রশ্ন হল, আলেম ও শাসকের আনুগত্য দ্বীনি বিষয়ে, নাকি দুনিয়াবী বিষয়ে? যদি দুনিয়াবী বিষয়ে হয়, তবে আমাদের ও আপনাদের আলোচনাটি এখানেই শেষ। কেননা সেক্ষেত্রে তাক্বলীদের প্রসঙ্গও আসে না। যদি দ্বীনি বিষয়ে হয়, তবে বলুন: তারা কি পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের আহকাম পৌঁছানোর কারণে ইতা'আতের (আনুগত্যের) অধিকারী? নাকি এই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের মধ্যে নিজের রায়, কিয়াস ও ইজতিহাদ দ্বারা সংযোজনকৃত বিষয়ের ইতা'আতের অধিকারী? শেষোক্তটি কি দ্বীনের মধ্যে বৃদ্ধি তথা বিদ'আত নয়? এরপরেও কি আপনি এ দ্বীনকে কামেল (পূর্ণাঙ্গ) বলতে পারেন? কারো রায় কি দ্বীন হতে পারে? এটা কি শিরক ফিদ দ্বীন (দ্বীনের মধ্যে শিরক) নয়?

ছ. তাক্বী সাহেব! আচ্ছা, আল্লাহকে হাযির-নাযির মনে করে বলুন তো, 'উলুল আমর' দ্বারা জীবিত শাসক ও আলেমদের বুঝানো হয়েছে, না মৃতদের? যদি জীবিতদের বুঝানো হয়ে থাকে, তবে আপনারা মৃতদের তাক্বলীদ করেন কেন? যদি মৃতদেরকে বুঝানো হয়ে থাকে- তবে বলুন, মৃত শাসকের তাক্বলীদ কিভাবে করবেন? যদি মৃত শাসকের ইতা'আত আবশ্যক হয়, তবে তো দুনিয়াতে অনেক বড় ফাসাদের সৃষ্টি হবে। বর্তমান শাসক কি তা মেনে নিবেন? তখন তার ইতা'আত না করে মৃত শাসকের ইতা'আত করা হবে। এটা তো খুবই সমস্যার সৃষ্টি করবে। মৃত শাসকের ইতা'আত করা হবে এবং জীবিত শাসকের বিদ্রোহ করা হবে। যদি মৃত শাসকদের যে কোন একজনের ইতা'আত আবশ্যক হয়, তাহলে তাদের নির্বাচন হবে কিভাবে? যদি আপনি বলেন, আলেমদের ক্ষেত্রে তাক্বলীদটি মৃত আলেমদের করতে হবে। আর শাসকদের ক্ষেত্রে বর্তমান (জীবিত) শাসকের তাক্বলীদ করতে হবে। এই পার্থক্য করার ক্ষেত্রে আপনাদের কাছে কি দলিল আছে?

জ. আলোচ্য (সূরা নিসা, ৫৯ নং) আয়াতটির তাফসীরে বিশটি সহীহ মারফু' হাদীসে দ্বারা শাসকের ইতা'আতের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কোন একটি সহীহ মারফু' হাদীসে কি আলেমদের ইতা'আতের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে? তাক্বী সাহেব! একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন, আপনি এই দলিল পাবেন, 'আলেমদেরকে জিজ্ঞাসা কর।' কিন্তু আলেমদেরকে ইতা'আত কর মর্মে কোন দলিল পাবেন না। আলেমদের কাজ হল, আল্লাহ ও রসূলের বাণী পৌঁছে দেয়া। তারা ইতা'আতের দাবীদার নয়। এ কারণে কোন হাদীসে আলেমদের ইতা'আতকে ফরয করা হয় নি।

ভুল ধারণা- ৫৭: বাকী থাকল, আয়াতটির পরবর্তী বাক্যের বক্তব্য: فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তোমরা তা আল্লাহ ও তাঁর রসূল সমীপেই পেশ করো, যদি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর তোমরা ঈমান এনে থাকো।" (সূরা নিসা: ৫৯ আয়াত)
অর্থাৎ আয়াতটির তাফসীরে মোতাবেক এই স্বতন্ত্র বাক্যটি মুজতাহিদদের উদ্দেশ্যে বর্ণিত হয়েছে।

সংশোধন:
১. তাক্বী সাহেব! আপনি কুরআন মাজীদ ও হাদীস থেকে এ ব্যাপারে কোন দলিল উল্লেখ করেন নি। বলেছেন, এটি স্বতন্ত্র বাক্য। তাহলে কিভাবে আমরা আপনার কথাকে গ্রহণ করব? 'উলামাদের (দলিলহীন) ব্যক্তিগত অভিমত কখনই দলিল নয়।
২. আয়াততো একটিই। আয়াতটির শুরুতে মু'মিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আয়াতের এই আলোচ্য অংশটিও মু'মিনদেরকে সম্ভোধন করা ছাড়া অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করে বলার বক্তব্য আয়াতটির কোথাও নেই।
৩. যদি আয়াতাংশটিতে মুজতাহিদদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে চার মাযহাবের মুজতাহিদরাতো আয়াতটির দাবীর উপর আমল করছেন না? আজ পর্যন্ত কেন ইখতিলাফ (মতবিরোধ) স্থায়ী রয়েছে?
৪. এই আয়াতটির 'উলুল আমর' দ্বারা কি ইমাম আবু হানিফা এবং মুজতাহিদ বলতে কাযী আবূ ইউসূফ ও 'ইমাম আহমাদ প্রমুখকে বুঝানো হয়েছে? তাক্বী সাহেব! প্রকৃতপক্ষে আয়াতের আলোচ্য অংশটিতে সুস্পষ্ট নস (প্রমাণ) দ্বারা তাক্বলীদকে খণ্ডন করা হয়েছে, তা নানা রকম পদ্ধতিতে আপনারা নিজেদের মতামতের (তাক্বলীদের) পক্ষে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন।
৫. এযুগের উলামায়ে মুক্বাল্লিদগণ কি আলোচ্য আয়াতের দাবীর মধ্যে গণ্য নন? যদি তা না হন, তবে কেন একজন আরেকজনকে আলেম বলে থাকেন? নিজেদেরকে কেন জাহেল বলেন না? কেননা প্রকৃতপক্ষে, কোন মুক্বাল্লিদই আলেম নন।

[সংযোজন: এ পর্যায়ে তাক্বী সাহেবের বইটির বাংলা অনুবাদে নিম্নোক্ত বক্তব্য এসেছে: "অবশ্য (সূরা নিসা, ৫৯ নং) আয়াতের শেষ অংশ কারো মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। ইরশাদ হয়েছে: ".... কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তোমরা তা আল্লাহ ও তাঁর রসূল সমীপেই পেশ করো, যদি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর তোমরা ঈমান এনে থাকো।" এ সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য এই যে, আয়াতের প্রথমাংশে সর্বসাধারণকে এবং শেষাংশে মুজতাহিদগণকে সম্বোধন করা হয়েছে।" ..... এরপর তাক্বী সাহেব 'উলুল আমর' এর ব্যাখ্যায় আবু বকর জাসসাস ও নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান সাহেবের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যেখানে 'উলুল আমর' শব্দটিকে আলেম ও মুজতাহিদদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অতঃপর লিখেছেন: "মোটকথা, আলোচ্য আয়াতের প্রথমাংশের নির্দেশমতে সাধারণ লোকেরা উলূল আমর তথা মুজতাহিদগণের বাতানো মাসায়েল মোতাবেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহ ও রসূলের ইতা'আত করবে। পক্ষান্তরে আয়াতের শেষাংশের নির্দেশমতে মুজতাহিদগণ তাদের ইজতিহাদ প্রয়োগের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহ থেকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহন করবেন। সুতরাং ইজতিহাদের যোগ্যতাবঞ্চিত লোকেরাও বিরোধপূর্ণ বিষয়ে কুরআন হাদীস চষে নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে; এ ধরণের দায়িত্ব-জ্ঞানহীন উক্তির কোন অবকাশ আলোচ্য আয়াতে নেই।"

লক্ষণীয়ঃ মূলত আলোচ্য আয়াতটি উম্মাহর সব স্তরের জন্যই প্রযোজ্য। সাধারণ মানুষতো আলেমদের অনুসারী। এ কারণে আলেমরা যখন বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত থাকে, তখন সাধারণ মানুষ ঐ সমস্ত মত ও পথে শরীক হয়ে সেগুলো আরো শক্তিশালী করে। ফলে মতপার্থক্য ও বিরোধ আরো চরমে পৌঁছায়। এ কারণে আয়াতের শেষে আলেমদের সাথে মতপার্থক্য দেখা দিলে মুজতাহিদ, আলেম এমনকি সর্বসাধারণ সবাইকেই কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে এসে মতপার্থক্য নিরসণ করতে বলা হয়েছে। যদি সাধারণ জনগণের প্রতি এই হুকুম প্রযোজ্য না হয়, তবে তো স্বার্থান্বেষী মহল মুসলিমদের মধ্যকার বিরোধকে পুঁজি করে ফায়দা লুটবে।

টিকাঃ
১২৯. বাংলায় প্রকাশিত বইটির ভাবানুবাদটি হল: "প্রায় সকল তাফসীরকারের মতে আলোচ্য আয়াতে 'উলুল আমর' শব্দটি দ্বারা কুরআন-সুন্নাহর 'ইলমের অধিকারী ফক্বীহ ও মুজতাহিদগণকেই নির্দেশ করা হয়েছে। এ মতের স্বপক্ষে রয়েছেন জাবের বিন 'আব্দুল্লাহ, 'আব্দুল্লাহ বিন 'আব্বাস মুজাহিদ, 'আতা বিন আবী বারাহ, 'আতা বিন সাইব, হাসান বসরী ও 'আলিয়াহ সহ জগদ্বরেণ্য আরো অনেক তাফসীরকার..."
১৩০. মারফু': যে হাদীসের সনদ নবী পর্যন্ত পৌঁছেছে।
১৩১. সহীহ : সহীহ মুসলিম- কিতাবুল ইমারাত।
১৩২. সহীহ: সহীহ বুখারী- কিতাবুল মাগাযী।
১৩৩. কেননা এখানে তাক্বলীদ বলতে দ্বীন পূর্ণাঙ্গ ও দলিল সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তি বিশেষের রায়কে দ্বীনি আহকামের উপরে অনুসরণীয় গণ্য করা।
১৩৪. আমাদের দেশে মৃত শাসকদের আদর্শের দোহাই দিয়ে রাজনীতি ও ক্ষমতার লড়াই এই ফিতনা-ফাসাদের অন্যতম উদাহরণ।
১৩৫. মাযহাব কি ও কেন? পৃ: ২১।

📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 আল্লাহ্ -এর বাণী: “আহলে যিকিরের কাছে জিজ্ঞাসা কর”

📄 আল্লাহ্ -এর বাণী: “আহলে যিকিরের কাছে জিজ্ঞাসা কর”


ভুল ধারণা- ৫৮: অতঃপর তাক্বী সাহেব লিখেছেন, আল্লাহ বলেন: فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "তোমাদের ইলম না থাকলে আহলে যিকিরদের কাছে জিজ্ঞাসা কর।"১৩৬

এই আয়াতটিতে নীতিগত হিদায়েত দেয়া হয়েছে, যে লোকেরা কোন 'ইলমের অধিকারী নয়, তারা যেন 'ইলমের অধিকারীদের কাছ থেকে জিজ্ঞাসা করে 'আমল করে। আর এটাকেই তাক্বলীদ বলে।

সংশোধন: তাক্বী সাহেব, সবকিছুতেই আপনার চোখে তাক্বলীদ বলে মনে হয়। যদি এটাই তাক্বলীদ হয়ে থাকে, তবে আজকাল যে লোকেরা হানাফী আলেমদের জিজ্ঞাসা করে, তারা কি ঐ আলেমের মুক্বাল্লিদ? কক্ষনো না, বরং সে ইমাম আবু হানিফার মুক্বাল্লিদ। ঐ আলেমদের জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও তারা ইমাম আবূ হানিফারই মুক্বাল্লিদ। ঠিক তেমনি কুরআন ও সহীহ হাদীসের অনুসারী আলেমদের জিজ্ঞাসার কারণেও সে নবী ﷺ-এরই অনুসারী থাকে। কখনই সে শেষোক্ত আলেমদের মুক্বাল্লিদ হয় না।

একজন হানাফী আলেম একজন অজ্ঞ হানাফীকে ঐ মাসআলাই বলেন, যা ইমাম আবূ হানিফার মাযহাবের সাথে সম্পৃক্ত। আর ঐ অজ্ঞ হানাফীও আলেমটির কাছে এই জন্য প্রশ্ন করেন যে, সেই আলেম তাকে ইমাম আবু হানিফার মাসায়েল বর্ণনা করবে। অর্থাৎ ঐ আলেম ব্যক্তিটি - অজ্ঞ ব্যক্তি ও ইমাম আবূ হানিফার মাঝে একজন মধ্যস্থতাকারী। যেহেতু বর্ণিত মাসআলাটি ইমাম আবু হানিফার নামে প্রচলিত - তাই সে হানাফীই থাকল।

অনুরূপভাবে, কোন মুসলিম যখন কুরআন ও সহীহ হাদীসের অনুসারী আলেমকে প্রশ্ন করে, তখন সে এটাই ভাবে - ঐ আলেম ব্যক্তিটি তাকে আল্লাহ ও রসূলুল্লাহ ﷺ এরই বিধান বলবে। আর এই চিন্তার অনুসারী আলেমটিও নিশ্চিতভাবে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দেয়া বিধানই বর্ণনা করবে। তখন এই আলেমটিও আল্লাহ ও তাঁর রসূলের মাঝে মধ্যস্থতাকারী হয়। সুতরাং ঐ মুসলিম ব্যক্তিটি কুরআন ও সহীহ হাদীসের অনুসারী আলেমের মুখ থেকে তা শুনে মানার কারণে তার মুক্বাল্লিদ হয় না। বরং সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিধানেরই অনুসারী হয়।

একজন মুসলিম যখন কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলেমকে প্রশ্ন করে, তখন সে ভাল ধারণার বশবর্তী হয়ে জিজ্ঞাসা করে যে, সেই আলেম আমাকে নিজস্ব রায়ের মুক্বাল্লিদ বানাবে না। বরং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিধান জানাবে। পক্ষান্তরে একজন মুক্বাল্লিদ তার আলেমের কাছে এটাই আশা করে যে, সে ইমাম আবু হানিফার রায় তাকে বলবে।

এই স্তরে এসে আপনি কি বলবেন, ইমাম আবু হানিফার বক্তব্যই আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিধান? যদি ধরে নেয়া হয়, অজ্ঞ হানাফী ব্যক্তি এবং আল্লাহ ও রসূলের মাঝে ঐ হানাফী আলেম ও ইমাম আবু হানিফা উভয়েই মধ্যস্থতাকারী, তবে তো ঐ অজ্ঞ ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলেরই অনুসারী এবং সে কখনই ইমাম আবু হানিফার রহ.-এর বিধানের অনুসারী নয়। তাহলে কেন বলা হয়, সে আবু হানিফার রহ.-এর মুক্বাল্লিদ? কেন তাকে বলা হয় না, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিধানের অনুসারী? এই ভাবে বললে তো তাক্বলীদ দূর হয়ে যায়। কিন্তু সম্ভবত আপনারা তার অনুমোদন দেবেন না। কেননা এতে তাক্বলীদ ও ইমাম আবূ হানিফার রহ.-এর সাথে সম্পৃক্ততা শেষ হয়ে যায়। যার প্রকৃত দাবী হল, আপনারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ﷺ সাথে সম্পৃক্ততাকে পছন্দ করেন না। এটা কি মু'মিনদের বৈশিষ্ট্য?

তাছাড়া আয়াতটিতে তাক্বলীদে শাখসী (ব্যক্তি তাক্বলীদ) এর দলিল কোথায়? আয়াতটির দাবী যে আলেমের কাছে চাও জিজ্ঞাসা করে নাও। আপনারা ব্যক্তিকে কেন নির্দিষ্ট করছেন। আয়াতটিতে চার ইমামের কোন উল্লেখ নেই- যা আপনারা তাক্বলীদ বা মাযহাব মানার আবশ্যকতা সম্পর্কে উপস্থাপন করেন। তাক্বী সাহেব! এমন কোন আয়াত উপস্থাপন করুন, যা সুনির্দিষ্টভাবে ঐ চার ইমামের তাক্বলীদকে সুস্পষ্ট করে। এটাই আমাদের জিজ্ঞাসা।

তাক্বী সাহেব! আমাদের দা'ওয়াত তো কেবল এটাই যে, আমরা সবাই মিলে একজনকেই ইমাম বানাবো, যাঁকে আল্লাহ ইমাম বানিয়েছেন। আল্লাহর নির্ধারিত ইমামের মোকাবেলায় অন্য ইমাম নির্ধারণের প্রয়োজনটা কি? এভাবে তো ফিরক্বা সৃষ্টি হয়। আপনিও তো ফিরক্বাবন্দী পছন্দ করেন না। যখন আমরা সবাই এক ইমামের ঝাণ্ডার নিচে সমবেত হব, তখন আমাদের আলেমগণ কেবল ঐ বিধানই দিবেন যা কুরআন মাজীদ ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তখন রায় থাকবে না, কোন ইখতিলাফও থাকবে না। আল্লাহ'র দ্বীন খালাস (নিষ্কলুশ) থাকবে। তখন কেবল মুসলিমদের একটি জামা'আতই থাকবে তথা জামা'আতুল মুসলিমীনই থাকবে।

টিকাঃ
১৩৬. সূরা নহল: ৭ আয়াত।

📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 তাক্বলীদের পক্ষে উপস্থাপিত হাদীস

📄 তাক্বলীদের পক্ষে উপস্থাপিত হাদীস


অতঃপর তাক্বী সাহেব "তাক্বলীদের পক্ষে উপস্থাপিত হাদীস..." শিরোনামে যে প্রথম হাদীসটি উল্লেখ করেছেন তার বিশ্লেষণ আমরা 'ভুল ধারণা- ১৪"-তে উল্লেখ করেছি।

এরপর তাক্বী সাহেব আরো কিছু হাদীস দলিল হিসাবে এনেছেন। ঐসব হাদীসের দাবী হল, অজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষ থেকে আলেমকে জিজ্ঞাসা করার বিষয়ে। এর জবাব পূর্বেই গত হয়েছে।

[সংযোজন: তাক্বী সাহেবের বইটির বাংলা অনুবাদে তাক্বলীদের স্বপক্ষে অন্যান্য হাদীসগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "বান্দাদের হৃদয় থেকে ছিনিয়ে নেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ 'ইলমের বিলুপ্তি ঘটাবেন না। বরং আলেম সম্প্রদায়কে উঠিয়ে নিয়ে 'ইলমের বিলুপ্তি ঘটাবেন। একজন আলেমও যখন থাকবে না মানুষ তখন জাহিল মুর্খকেই নেতার মর্যাদা দিয়ে বসবে। আর তারা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে অজ্ঞতাপ্রসূত ফতোয়া দিয়ে নিজেরাও গোমরাহ হবে অন্যদেরও গোমরাহ করবে।"

এই হাদীসটি থেকে মৃত চার ইমামের তাক্বলীদ প্রমাণিত হয় না। বরং জীবিত ব্যক্তিদের তাক্বলীদমুক্ত কুরআন ও সহীহ হাদীসের অনুসারী আলেমদের অনুপস্থিতির ভয়াবহ ফিতনার প্রকাশ ঘটেছে।

তাক্বী সাহেব! হাদীসটির দাবী অনুযায়ী যোগ্য আলেমরা উঠে গেলে তো অযোগ্য লোককে আলেম হিসাবে অনুসরণ করা হবে। আমরা তাক্বলীদের নামে মাযহাবী ফিক্বাহ ও ফতোয়ার কিতাবে সেটাই দেখছি। অথচ কুরআন ও সহীহ হাদীস আজো সংরক্ষিত আছে এবং থাকবে। পক্ষান্তরে মৃত আলেমদের গবেষণা ও সিদ্ধান্তকে কুরআন ও হাদীসের ন্যায় সংরক্ষণের ওয়াদাও আল্লাহ দেন নি। তাছাড়া আমরা এ পর্যন্তকার সমস্ত গোমরাহীর মূলেও মাযহাবী কিতাব ও সেগুলোর অনুসারী, আলেমদেরকেই অগ্রগামী দেখি। শিয়া, খারেজী, কাদিয়ানি, মুতাযিলা, মুরজিয়া, জাহমিয়া এরূপ প্রত্যেকটি 'মতের পক্ষেই অনেক আলেম রয়েছেন।

তাক্বী সাহেবের উপস্থাপিত তৃতীয় হাদীসটি হল, "দলিল-প্রমাণ ব্যতীত কাউকে ফতোয়া দেয়া হলে, তার গুনাহর ভার ফতোয়াদাতার উপর বর্তাবে।" তাক্বী সাহেব এ হাদীসটি থেকেও তাক্বলীদের দলিল নিয়েছেন। অথচ হাদীসটি দ্বারা আলেমদেরকে দলিল ছাড়া ফতোয়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে। যেভাবে চার ইমামও দলিল ছাড়া তাদের রায় মানতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ হাদীসটি প্রকারান্তরে তাক্বলীদকে খণ্ডন করে।

তাক্বলীদের পক্ষে চতুর্থ দলিল হিসাবে নিচের হাদীসটি উল্লেখ করেছেন: "সুযোগ্য উত্তরসূরীরা পূর্বসূরীদের কাছ হতে এই 'ইলম গ্রহণ করবে এবং অতিরঞ্জনকারীদের অতিরঞ্জন, বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচার এবং জাহিলদের ভুল ব্যাখ্যা থেকে এর হেফাযত করবে।"

সম্মানিত পাঠক! হাদীসটি য'য়ীফ। এরপরও আমরা বলব, হাদীসটির অংশগুলো তাক্বলীদের সুস্পষ্ট বিরোধীতা করে। কেননা উত্তরসূরীরা যখন পূর্বসূরীদের কাছ থেকে 'ইলম হাসিল করে তখন তাক্বলীদ আর থাকে না। তাক্বলীদ তো 'ইলমহীন তথা অন্ধ অনুসরণ।

অতঃপর তাক্বী সাহেব তাক্বলীদের পক্ষে পঞ্চম দলিল হিসাবে নিম্নোক্ত হাদীসটি এনেছেন। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমরা (আমাকে দেখে) আমার ইকতিদা করো আর তোমাদের পরবর্তীরা তোমাদের দেখে ইকতিদা করবে।"

হাদীসটির দাবী হল, যে অনুসরণে নবী ﷺ-এর ইকতিদা করা হয়, সে অনুসরণের পরবর্তীদের ইকতিদাও নবীর অনুসরণ। কিন্তু যে ইকতিদাতে নবী ﷺ এর অনুসরণের প্রমাণ নেই, বরং বিরোধীতা আছে সেই অনুসরণও কি উক্ত হাদীসটির দাবী পূরণ করে? মূলতঃ সহীহ হাদীস অনুসরণের মধ্যে উক্ত হাদীসটির বাস্তবায়ন বুঝা যায়।

অতঃপর ষষ্ঠ হাদীসে তাক্বী সাহেব একজন মহিলা কর্তৃক সালাতে ও অন্যান্য কাজে স্বামীর ইকতিদার কথা বর্ণনা করে তাক্বলীদের স্বপক্ষে উপস্থাপন করেছেন। এটা দ্বারাও তাক্বলীদে শাখসী তথা চার মাযহাবের থেকে যে কোন একটি মাযহাবের তাক্বলীদ প্রমাণিত হয় না। এ হাদীস থেকে তো সব স্ত্রীকে চার মাযহাবের পরিবর্তে নিজ নিজ স্বামীকে অনুসরণের বর্ণনা পাওয়া যায়। তাছাড়া মহিলা তার স্বামীর জিহাদের আমলের ন্যায় ঐ মুহূর্তে অন্য কোন ভাল আমলের পরামর্শ চেয়েছেন।

টিকাঃ
১৩৭. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত ২/১৯৬ নং।
১৩৮. মাযহাব কি ও কেন? পৃ: ৩০।
১৩৯. হাসান: ইবনে মাজাহ- বাবে ইত্তিবাউ সুন্নতি রাসূলিল্লাহ ﷺ।
১৪০. য'য়ীফ: বায়হাক্বী তাঁর 'মাদখালে' মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
১৪১. সহীহ: সহীহ মুসলিম, মিশকাত ৩/১০২২ নং।
১৪২. য'য়ীফ: হাদীসটি হল, একজন মহিলা রসূলুল্লাহ ﷺ এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করলেন...।

📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 “সাহাবামুক্ত তাক্বলীদ”

📄 “সাহাবামুক্ত তাক্বলীদ”


ভুল ধারণা- ৫৯ : অতঃপর তাক্বী সাহেব "সাহাবাযুগে মুক্ত তাক্বলীদ” অনুচ্ছেদের অধীনের কিছু বর্ণনা এনেছেন। যেমন: প্রথম নযীর: ইবনে আব্বাস থেকে উমার এর একটি খুতবার বর্ণনা। যেখানে 'উমার বলেছেন: "কুরআন সম্পর্কে তোমাদের কোন প্রশ্ন থাকলে উবাই ইবনে কা'বের কাছে এবং ফারায়েয সম্পর্কে যায়েদ বিন সাবিতের কাছে আর ফিক্বাহ সম্পর্কে মু'আয বিন জাবালের কাছে যাবে।....

সংশোধন: প্রশ্ন হল, 'উবায় ইবনে কা'ব ও অন্যান্যদের কাছে কি জিজ্ঞাসা করতে যাবে, কুরআন হাদীসের 'ইলম না তাঁদের রায়? যদি কুরআন হাদীসের 'ইলম জানতে যায়, তবে আমরা সেটাই করতে বলছি। ছাত্র যদি শিক্ষককে না জিজ্ঞাসা করে, তবে আর কার কাছে জিজ্ঞাসা করবে? এটাই তো তা'লিম দেয়া ও নেয়া। এর সাথে তাক্বলীদের কোনই সম্পর্ক নেই। আর যদি আপনি বলেন, আলেমের কাছে তার রায় সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তবে কারো কোন রায়কে কি আল্লাহর নাযিলকৃত দ্বীন হিসাবে গণ্য করা যাবে? কক্ষনো না।

[সংযোজন: আমি (অনুবাদক) সংক্ষেপে তাক্বী সাহেব কর্তৃক দৃষ্টান্তগুলো নিচে উপস্থাপন করলাম। তাঁর বইটির বাংলা অনুবাদে দ্বিতীয় নযীর হিসাবে উল্লিখিত হয়েছে: ঋণের মেয়াদের পূর্বে আংশিক ঋণ মওকুফের শর্তে অবশিষ্ট ঋণ মওকুফ করা প্রসঙ্গে ইবনে উমার তা নাকচ করে দেন। অতঃপর তাক্বী সাহেব লিখেছেন: "এ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ নির্দেশ সম্বলিত কোন মারফু হাদীস না থাকায় নিশ্চয়ই ধরে নেয়া যায় যে, 'এটাই ইবনে 'উমারের নিজস্ব ইজতিহাদ।"

এই আসারটি সুনির্দিষ্টভাবে চারটি মাযহাবের যে কোন একটি মাযহাব মানার পক্ষে দলিল হয় না। যদি তাক্বী সাহেব এই আসারটি দ্বারা ইবনে 'উমার-এর তাক্বলীদ করার সমর্থনে পেশ করতেন- তবে সে ক্ষেত্রে এটি তার উপস্থাপনার উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত হত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দলিলটি দ্বারা তাক্বী সাহেব নবী ﷺ-এর এই সাহাবীর তাক্বলীদ করাকে জরুরী মনে না করে, ইমাম আবু হানিফার তাক্বলীদ করা জরুরী মনে করেন।

অতঃপর তাক্বী সাহেব তৃতীয় নযীর হিসাবে লিখেছেন, আব্দুর রহমান বলেন: "মুহাম্মাদ ইবনে সীরীনকে আমি হাম্মামখানায় গোসলের বৈধতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, 'উমার এটা অপছন্দ করতেন।" দেখুন মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন প্রশ্নকারীর জবাবে হাদীস-দলিল উল্লেখ না করে 'উমার-এর অপছন্দের কথা জানিয়ে দেয়াই যথেষ্ট মনে করেছেন। যখন বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের সমর্থনে মারফু' হাদীস তথা কুরআন বা সহীহ হাদীসের দলিল থাকবে তখন তা আর তাক্বলীদ হল না।

অতঃপর তাক্বী সাহেব চতুর্থ ও পঞ্চম নযীর হিসাবে যথাক্রমে 'উমার ও সা'আদ ইবনে আবূ ওয়াক্কাসের পরামর্শমূলক সিদ্ধান্তকে তাক্বলীদের পক্ষে উপস্থাপন করেছেন। অষ্টম নযীর হিসাবে তাকী সাহেব উমার কর্তৃক আম্মার বিন ইয়াসারকে শাসক ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদকে শিক্ষক হিসাবে প্রেরণের চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন।

নবম নযীর হিসাবে 'মুয়াত্তা মুহাম্মাদ' থেকে সাহাবী ইবনে 'উমার ও তাবে'য়ী ক্বাসেম বিন মুহাম্মাদ এর ইমামের পিছনে ক্বিরাআত না পড়ার বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন। বর্ণনাটি হল: "ইবনে 'উমার ইমামের পিছনে কখনো ক্বিরাআত পড়তেন না। ক্বাসিম বিন মুহাম্মাদকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে পড়তে পারো আবার না পড়ারও অবকাশ আছে।"

জবাব: ১. প্রকৃতপক্ষে সহীহ বর্ণনা অনুযায়ী ইবনে 'উমার ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়তেন। ২. অনুরূপভাবে ক্বাসেম বিন মুহাম্মাদ রহ. সম্পর্কে 'মুয়াত্তা মালেকে' বর্ণিত হয়েছে যে তিনি সালাতে ইমাম ক্বিরাআত সরবে পড়তেন না সেসব সালাতে ইমামের পিছনে ক্বিরাআত করতেন।

তাক্বী সাহেব উক্ত য'য়ীফ ও মুনকার বর্ণনাটি উল্লেখ করার পর শেষাংশে লিখেছেন: "....এতে দ্ব্যর্থহীনভাবে একথাই প্রমাণিত হয় যে, দলীলে বিভিন্নতার কারণে মুজতাহিদগণের মাঝে মতভিন্নতা দেখা দিলে বিশুদ্ধ নিয়তে যেকোন এক মুজতাহিদের ইকতিদা করা যেতে পারে।" এই উদ্ধৃতিটির দ্বারা তাক্বী সাহেব যেকোন একটি মাযহাবের তাক্বলীদ করার সীমাবদ্ধতাকে প্রকারান্তরে খণ্ডন করেছেন। যা আমাদের পক্ষকেই সমর্থন করল।

দশম নযীর হিসাবে একটি ফতোয়াতে হাসান বসরী রহ. কর্তৃক নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনে আবু বকর রা. ও উমার রা. এর আমলের উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

টিকাঃ
১৪৩. য'য়ীফ: সনদটিতে দু'জন মাজহুল হাল বর্ণনাকারী আছেন।
১৪৪. কুরআন ও সহীহ হাদীসের ন্যায় কারো রায় স্থায়ী শরী'য়াতের মর্যাদা পাবে না।
১৪৫. মুয়াত্তা মালেক হা/২৪৭৯ বাবে মা জাআ ফির রিবা ফিদ দাইনি।
১৪৬. মাযহাব কি ও কেন? পৃঃ ৩৫।
১৪৭. কানযুল উম্মাল ৯/৫৬০/২৭৪১৮ নং।
১৪৮. মাযহাব কি ও কেন? পৃঃ ৩৫-৩৬।
১৪৯. মাযহাব কি ও কেন? পৃঃ ৩৬-৩৭।
১৫০. সম্মানিত পাঠক! তুলনামূলক পর্যালোচনা জন্য, "মাযহাব কি ও কেন?” বইটি সামনে রাখুন।
১৫১. ইরশাদুল হক আসরী, তাওযীহুল কালাম ফি উযুবিল ক্বিরাআত খলফাল ইমাম, পৃঃ ৯৯১।
১৫২. সহীহ: সহীহ ইবনে খুযায়মাহ ১/২৮৭, হা/৫৭২।
১৫৩. সহীহঃ মুয়াত্তা মালেক বাবে ফিল ক্বিরাআতি খলফাল ইমামি ফীমা লা ইউজহারু ফীহি বিল ক্বিরাআতি।
১৫৪. মাযহাব কি ও কোন? পৃঃ ৪১।
১৫৫. হাসান: ইবনে মাজাহ- বাবে ইত্তিবাউ সুন্নতি রাসূলিল্লাহ ﷺ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px