📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 ফিক্বাহ নিজেই বিকৃত

📄 ফিক্বাহ নিজেই বিকৃত


ফিকাহর প্রচুর মাসআলাই বিকৃত। আমি কিছু মাসআলার উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, এ সমস্ত প্রতিষ্ঠিত মাসআলার পক্ষে কুরআন ও হাদীসের কোন দলিল নেই।

ভুল ধারণা- ৩৮: অভিযোগ করা হয়, হানাফী ফিক্বাহতে পুরুষদের নাভির নিচে হাত বাঁধার স্বপক্ষে কোন হাদীস নেই। অথচ সুনানে আবু দাউদে আলী থেকে বর্ণিত হয়েছে: "সুন্নাত হল- ডান হাতকে বাম হাতের উপর নাভীর নিচে রাখবে।"

সংশোধন: এ হাদীসটি সুস্পষ্ট য'য়ীফ। আমাদের প্রশ্ন ছিল- "নবী কি এই হুকুম দিয়েছিলেন - পুরুষদের নাভীর নিচে এবং নারীদের বুকের উপর হাত বাঁধতে হবে?" তাক্বী সাহেব এর জবাব দেন নাই। সালাতে হাত বাঁধার ব্যাপারে পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে পার্থক্য করাটা প্রকারান্তরে শরী'আতকে বিকৃত করে।

ভুল ধারণা- ৩৯: অভিযোগ করা হয়, হানাফীগণ সালাতে রুকু'তে যেতে এবং রুকু থেকে উঠতে রফ'উল ইয়াদাইন করে না।

সংশোধন: এটা প্রমাণ করুন- রফউল ইয়াদাইন সুন্নাত নয়, বরং মানসুখ (রহিত) হয়েছে। যদি মানসুখ না হয় তবে আপনাদের মাযহাবে এটা গ্রহণ করা হয় নি কেন? যেহেতু সাহাবীগণ আমলটি করেছেন সুতরাং এতে তাদের সওয়াব বেশী হত।

ভুল ধারণা- ৪০ঃ হানাফীগণ প্রথম ও তৃতীয় রাক'আতে সিজদা থেকে উঠে সোজা দাঁড়িয়ে যায়, জলসায়ে ইস্তিরাহাত করে না। অথচ সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে: “নবী সালাতে নিজের পায়ের অগ্রভাগে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।”

সংশোধন: এই হাদীসটি য'য়ীফ, বরং মাওযু'। এ ধরণের মিথ্যা হাদীসকে সহীহ বুখারীর সাথে সম্পৃক্ত করাটা তাক্বী সাহেবের দুঃসাহস। এই হাদীসটি সহীহ বুখারীতে নেই। আপনারা মাওযূ' হাদীসের উপর 'আমল করেছেন ও সহীহ হাদীসটিকে ছেড়ে দিয়েছেন।

ভুল ধারণা- ৪১ঃ হানাফীগণ শেষ বৈঠকেও প্রথম বৈঠকের ন্যায় বাম পায়ের উপর বসে। অথচ সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে আয়েশা বলেন: "রসূলুল্লাহ ﷺ নিজের বাম পা বিছিয়ে দিতেন এবং ডান পা খাড়া রাখতেন।"

সংশোধন: তুয়াররুকে এভাবেই বসতে হয়। এর মধ্যে বাম পায়ের উপর বসার দলিল কোথায়? (সালাতে) পুরুষ ও মহিলাদের বসার পদ্ধতি পৃথক করা কি শরী'আতকে বিকৃত করা নয়?

ভুল ধারণা- ৪২ঃ হানাফীগণ ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করে না। জাবির বিন 'আব্দুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে নাই তার সালাত আদায় হয় নাই। কিন্তু ইমামের পিছনে থাকলে' (স্বতন্ত্র বিষয়)।

সংশোধন: আপনি আয়াত ও হাদীসের বর্ণনার পরিবর্তে কেবল একজন সাহাবীর উক্তি পেশ করেছেন। জাবির-এর ঐ কথাটিকে কি আপনি দলিল মনে করেন? জাবির-এর আলোচ্য উক্তি অনুযায়ী প্রতি রাক'আতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ফরয। অথচ আপনাদের নিকট সূরা ফাতিহা পাঠ ফরয নয়।

ভুল ধারণা- ৪৩ঃ হানাফীগণের ফরয সালাতের তৃতীয় ও চতুর্থ রাক'আতে ক্বিরাআত করা ফরয মনে করে না।

সংশোধন: আয়াতটির দাবী হল, প্রতি রাক'আতে কুরআন পাঠ করা উচিৎ। আবু হুমায়িদ বর্ণনা করেন: "রসূলুল্লাহ ﷺ ... ক্বিরাআত করতেন। ... পুণরায় বাকী সালাতও এভাবে আদায় করতেন'। এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হল, রসূলুল্লাহ ﷺ চার রাক'আতেই ক্বিরাআত করতেন। আবু ক্বাতাদাহ বলেন: "নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ যোহরের প্রথম দু' রাক'আতে সূরা ফাতিহা ও দু'টি সূরা পড়তেন এবং শেষ দু' রাক'আতে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন।" জাবির বলেন: "প্রথম দুই রাক'আতে সূরা ফাতিহা এবং অন্য সূরাও পাঠ করো। আর শেষ দুই রাক'আতে সূরা ফাতিহা পড়ো।"

ভুল ধারণা- ৪৪: হানাফীগণ সালাতে মুখে নিয়‍্যাত করার অনুমতি দিয়ে থাকে।

সংশোধন: আপনাদের মাধ্যমে শরী'য়াতের জালিয়াতি হচ্ছে, মাসায়েল বিকৃত হচ্ছে, বিদ'য়াত বিস্তার হচ্ছে।

ভুল ধারণা- ৪৫ঃ শহরবাসীদের জন্য 'ঈদের সালাতের পূর্বে কুরবানী করা হাদীসের আলোকে জায়েয নেই। কিন্তু গ্রামের লোকেরা ফজর উদয়ের পর কুরবানী করতে পারে।

সংশোধন: শহর ও গ্রামবাসীকে পৃথক করা সুস্পষ্ট জালিয়াতি। 'ঈদের দিন আল্লাহর মহত্ব বর্ণনা করা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ফরয। আনাস বিন মালিক পরিবার ও প্রতিবেশীদেরকে একত্রিত করতেন এবং শহরবাসীদের মত সালাত পড়াতেন। প্রকৃত প্রশ্ন ছিল কৌশল (হীলা) সম্পর্কে: "শহরবাসীও যদি 'ঈদের সালাতের পূর্বে কুরবানী করতে চায় তবে নিজের কুরবানীর পশু শহরের বাইরে নিয়ে যবেহ করতে পারবে।" এই হীলা জালিয়াতি এবং একটি প্রতারণা।

ভুল ধারণা- ৪৬ঃ যদি কোন মহিলার স্বামী নিখোঁজ (মাফকুদ) হয়, হানাফীদের বিধান হল, “মৃত্যুর খবর আসা পর্যন্ত স্ত্রী অপেক্ষা করবে। যখন স্বামীর সত্তর বছর পূর্ণ হবে, তখন স্ত্রী অন্যকে বিয়ে করতে পারবে।”

সংশোধন: তাক্বী সাহেব যে হাদীস উপস্থাপন করেছেন তা কোন মতেই দলিল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম আবু হাতিম বলেছেন, এই হাদীস মুনকার এবং বর্ণনাকারী মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করতো। বৃদ্ধাকে এক বছর পরে বিয়ের অনুমতি দিচ্ছেন, পক্ষান্তরে যুবতী নারীটিকে পঞ্চাশ বছর পর বিয়ের অনুমতি দিচ্ছেন।

টিকাঃ
৮৬. মূলত আলোচ্য বর্ণনাটি দারাকুতনী ও বায়হাক্বীর সুনানুল কুবরাতে বর্ণিত হয়েছে। আব্দুর রহমান বিন ইসহাকু মাতরুক (পরিত্যাজ্য বর্ণনাকারী)।
৮৭. নাভীর নিচে হাত বাঁধা সম্পর্কীত বর্ণনাগুলো য'য়ীফ হওয়াই তা অগ্রহণযোগ্য।
৮৮. য'য়ীফ: তিরমিযী- কিতাবুস সালাত। আলবানীও হাদীসটিকে য'য়ীফ বলেছেন।
৯২. সূরা মুযযাম্মিল: ২০ আয়াত।
৯৩. সহীহ: আবু দাউদ - কিতাবুস সালাত।
৯৪. হাসান: আবু দাউদ- কিতাবুস সালাত।
৯৫. সহীহ: আবূ দাউদ- কিতাবুস সালাত।
৯৬. সহীহ: সহীহ বুখারী।
৯৭. সহীহ: সহীহ বুখারী।
৯৮. সহীহ: সহীহ বুখারী।
৯৯. সহীহ: সহীহ মুসলিম।
১০০. মুরসাল : দারাকুতনী।
১০২. সহীহ: ইবনে মাজাহ। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
১০৪. শু'আয়েব আরনাউত বলেন: হাদীসটি হাসান।
১০৫. শু'আয়েব আরনাউত বলেন: হাদীসটি য'য়ীফ।
১০৬. সহীহ: সহীহ মুসলিম - কিতাবুল আযহা।
১০৭. সহীহ: শু'আয়েব আরনাউত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
১০৮. সহীহ বুখারী- কিতাবুল 'ঈদায়ীন।
১০৯. আলবানী, সহীহ জামে'উস সগীর হা/৭৮১২।
১১০. সহীহ বুখারী - কিতাবুল 'ঈদায়ীন।
১১১. সহীহ বুখারী - কিতাবুল 'ঈদায়ীন।
১১২. সহীহ: সহীহ বুখারী- কিতাবুল আযহা।
১১৩. আরো জানার জন্য দেখুনঃ সাইয়েদ আবু আ'লা মওদূদী, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার।
১১৪. হাসান: তিরমিযী, ইবনে মাজাহ।
১১৫. সহীহ: সহীহ মুসলিম।

📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 ফারানের মন্তব্য

📄 ফারানের মন্তব্য


'মাসিক ফারান', জুন' ১৯৬৪ 'ঈসায়ী সংখ্যায় সম্পাদক সাহেব 'তালাশে হক্কের' উপর নিজের মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন। সম্পাদক সাহেব শেষাবধি একজন সম্মানিত আলেম নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালির উদ্ধৃতির মাধ্যমে আমার উপর অভিযোগ আরোপ করেছেন। যার আসল দাবী ছিল: "তিনি মুক্বাল্লিদগণকেও ফিরক্বায়ে নাজিয়ার অন্তর্ভূক্ত মনে করতেন।"

এর সংক্ষিপ্ত জবাব হল, আমি কারো মুক্বাল্লিদ নই। সুতরাং কোন আলেমের কথা বা লেখার দ্বারা আমার উপর অভিযোগ করার অর্থ- আমার প্রতি জুলুম করা।

নওয়াব সাহেব যদি উক্ত কথাগুলো লিখে থাকেন, তবে তার দায়-দায়িত্ব তাঁরই। নওয়াব সিদ্দিক হাসান সাহেব সূরা আলে-ইমরানের মুবাহালার আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে লিখেছেন: "কিতাব ও সুন্নাতে তাক্বলীদের তিরষ্কার রয়েছে। মুক্বাল্লিদগণ চার ইমামের অনুসরণ ওয়াজিব গণ্য করেছে। তারা শিরক ফিল উলুহিয়্যাত করত, এরা শিরক ফির রিসালাতে লিপ্ত।”

নওয়াব সাহেব আরো লিখেছেন: "কোন আলেম বা দরবেশের তাক্বলীদ আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে শিরক।” নওয়াব সাহেব 'আদ-দ্বীনুল খালেস' গ্রন্থটির শুরুতেই লিখেছেন: "তাক্বলীদ শিরকের প্রকারভেদের একটি প্রকার। আল্লাহ আমাদের এ থেকে হেফাযতে রাখুন।”

মাহারুল কাদিরী সাহেবের কাছে আবেদন, আলোচ্য উদ্ধৃতিগুলো পাঠ করুন এবং নিজেকে সংশোধন করুন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px