📄 আবূ বকর ও উমার -এর ইক্তিদা সম্পর্কিত হাদীস ও তার দাবী
ভুল ধারণা- ১৪: কুরআনের কারীমের ন্যায় অনেক হাদীস থেকেও তাক্বলীদের বৈধতা প্রমাণিত হয়। সংক্ষিপ্তভাবে আমি শুধুমাত্র একটি হাদীস উপস্থাপন করছি।
হুযায়ফা বলেন, নবী ﷺ বলেছেন: ইন্নি লা আদরি মা বাক্বায়ি ফিকুম? ফাকতাদু বিল্লাযাইনি মিম বা’দি: আবি বকরিন ওয়া উমার। "আমি জানি না তোমাদের মাঝে কতদিন বেঁচে থাকব। এ কারণে আমার পরে দু'জন ব্যক্তির ইক্তিদা (অনুসরণ) করবে তাদের একজন ইমাম আবূ বকর ও অন্যজন উমার।” (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
এই হাদীসে 'ইক্তিদা' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার দ্বারা শুধু রাষ্ট্রীয় নির্দেশের আনুগত্যের ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয় না। এর একটি অর্থ সেটাও যা আমরা তাক্বলীদের বিষয়ে বলছি। (ফারান, পৃ:১৫)
সংশোধন: ১. তাক্বলীদতো এক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানে তো দু'জন ব্যক্তিকে অনুসরণের নির্দেশনা রয়েছে। আপনারা কি দু'জন ইমামের তাক্বলীদ করা জায়েয মনে করেন? যদি জায়েয মনে করেন তবে তো সেটা তাক্বলীদে শাখসি বা একক ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ হল না।
২. যদি এ হাদীস দ্বারা তাক্বলীদের অর্থ নেয়া হয়- তবে এক্ষেত্রে আপনারা রসূলের নির্দেশ অমান্য করছেন কেন? রসূলুল্লাহ তো কেবল আবূ বকর ও উমার-এর তাক্বলীদ করতে বলেছেন, অথচ আপনারা তাদেরকে ত্যাগ করে অন্যদের তাক্বলীদ করছেন।
৩. যদি হাদীসটির দাবী হয়- আবূ বকর-এর জীবদ্দশায় আবূ বকর-এর এবং উমার-এর জীবদ্দশায় 'উমার-এর তাক্বলীদ করতে হবে। তাহলে এ হাদীসকে তো জীবিত ইমামের তাক্বলীদ প্রমাণিত হয়। সুতরাং আপনারা মৃত ব্যক্তির তাক্বলীদ ছেড়ে জীবিত ব্যক্তির তাক্বলীদ করুন।
৪. আবু বকর যেনাকারীকে কোড়া মারতেন ও নির্বাসন দিতেন। 'উমার-ও এরূপ করতেন। আপনারা কি এসব মাসআলায় তাদের তাক্বলীদ করেন? 'উমার মাসজিদে সালাতুল জানাযাহ আদায় করতেন। এটা কি আপনাদের নিকট জায়েয আছে? উমার ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহাও পাঠ করতেন। আপনারা কি এটা গ্রহণ করেছেন?
৫. এ ঘটনা কি একথার সাক্ষ্য দেয় যে, সাহাবীগণ আবূ বকর ও 'উমার-এর তাক্বলীদ করতেন? কক্ষণো না, বরং এর বিপরীত প্রমাণ আছে।
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: তাক্বী সাহেবের কথানুযায়ী যদি রসূলুল্লাহর তাক্বলীদও তাঁর নিজের জীবিত অবস্থা পর্যন্ত ছিল। তিনি বলেছেন: আমার পরে এ দু'জনের তাক্বলীদ করবে। যদি নবীর তাক্বলীদ চিরস্থায়ী হয়ে থাকে তবে তিনি কেন তা বলবেন? তাক্বী সাহেব, আপনারা কি এটাকে গ্রহণ করেন?
শিক্ষণীয় দিক: এ হাদীস থেকে তাক্বলীদ প্রমাণিত হয় না। বরং নবী ﷺ-এর পরবর্তী খেলাফতের দিকে ইশারা করা হয়েছে -আর এটাই হাদীসটির সহীহ ব্যাখ্যা।
টিকাঃ
৫৭. সহীহ: তিরমিযী- বাবে ফি মানাকুবি আবি বকরিন ওয়া উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কুলিয়াাইহিমা। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত তিরমিযী হা/৩৬৬৩]
৫৮. সহীহ: আলবানী হাদীসটির সনদকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীক্বকৃত তিরমিযী হা/৮২৪]
৫৯. য'য়ীফ: আলবানী হাদীসটিকে য'য়ীফ বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত তিরমিযী হা/২১০১]
৬০. সহীহ: আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত আবূ দাউদ হা/৪৩৯৯]
৬১. সহীহ: হুসাইন সালিম আল-আসাদ হাদীসটির সনদকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত দারেমী হা/৪৩১]
📄 সাহাবীদের যামানায় তাক্বলীদ ছিল- ধারণা খণ্ডন
ভুল ধারণা- ১৫: কেননা, তাক্বলীদ দু' প্রকারের (উন্মুক্ত ও ব্যক্তি তাক্বলীদ) -যা আমি ইতোপূর্বেই বলেছি। নবী ও সাহাবীদের যুগে এই দুটোর উপরই আমল করা হয়েছে। যার অনেকটাই হাদীস ও ইতিহাসের ভাণ্ডারে পাওয়া যায়। (ফারান, পৃঃ ১৫)
সংশোধন: নবী-এর যুগে তাক্বলীদে শাখসী ছিল। কিন্তু কিভাবে? এখনও কি সেই ইমামের তাক্বলীদ হতে পারে না? যদি সাহাবীদের যুগে তাক্বলীদের প্রমাণ দেখাতে পারেন, তবে আমরা কুরআন ও হাদীসের দলিলভিত্তিক পথের ইত্তিবা' ছেড়ে দিয়ে আপনাদের ইমামের ইত্তিবা' করব।
ভুল ধারণা- ১৬: উন্মুক্ত তাক্বলীদের পাশাপাশি সাহাবীদের যামানায় ব্যক্তি তাক্বলীদের উদাহরণও রয়েছে। সহীহ বুখারীতে ইকরামা বর্ণনা করেন: "মদীনাবাসী ইবনে আব্বাস-কে ঐ মহিলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল- যার ফরয তাওয়াফের পরে হায়েয আসে। ইবনে 'আব্বাস বললেন: সে চলে যেতে পারবে। মদীনাবাসী বলল: আমরা আপনার কথার প্রেক্ষিতে যায়িদ বিন সাবিতের বিপরীত আমল করব না।"
সংশোধন: তাক্বী সাহেবের আলোচ্য উদ্ধৃতি থেকে প্রমাণিত হয়,
১. মদীনাবাসীর যায়িদ বিন সাবিতের ফতোয়ার উপর বিশ্বাস ছিল না। অর্থাৎ মদীনাবাসীরা তাঁর তাক্বলীদ করত না, বরং অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ইবনে 'আব্বাসের কাছে গিয়েছিল। এ কারণে ঘটনাটি তাক্বলীদ খণ্ডন করে।
২. ইবনে 'আব্বাস একথা কখনই বলেন নাই যে, তোমরা মুক্বাল্লিদ হওয়ায় তোমাদের পর্যালোচনা ও অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই। বরং তিনি তাদেরকে অনুসন্ধান করতে বলেছেন।
৩. ঐ লোকেরা অনুসন্ধান ছেড়ে দেয় নি। নিজেদের ইমামকেও সংশোধন করেছিল।
৪. ইবনে 'আব্বাস এবং যায়িদ বিন সাবিত -এর মধ্যে ঐ মহিলা সম্পর্কে মতপার্থক্য হল। যায়িদ বলেন: 'সে শেষের দিকে তাওয়াফ করে নেবে।' ইবনে 'আব্বাস বলেন: 'যখন চায় চলে যেতে পারে।' যায়েদ বিন সাবিতের কথা সন্দেহমুক্ত ছিল এবং ইবনে 'আব্বাসের ফতোয়াতে তাদের সন্দেহ ছিল। এ কারণে তারা সন্দেহযুক্ত বিষয় ছেড়ে দেয়।
ভুল ধারণা- ১৭: আবূ মূসা আশ'আরী-এর কাছে কিছু লোক একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করে পুণরায় সে মাসআলাটি 'আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদ-এর কাছে জিজ্ঞাসা করল। আবূ মূসা বললেন: “যতক্ষণ এই জ্ঞানসমুদ্র তোমাদের মধ্যে জীবিত আছেন, ততক্ষণ তোমরা আমাকে জিজ্ঞাসা করা থেকে বিরত থাক।" আবূ মূসা-এর কথা থেকে সবাই বুঝতে পারবে যে, তিনি প্রত্যেক মাসআলার ক্ষেত্রে আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদের সিদ্ধান্তের দিকে ফিরে যাবার পরামর্শ দিতেন। এটাইতো তাক্বলীদে শাখসী। (ফারান, পৃ:১৬)
সংশোধন: ইবনে মাস'উদ ঐ ফতোয়া মোতাবেক ফতোয়া দিতে এই বলে অস্বীকার করলেন যে: "যদি আমি এই ফায়সালা দিই তবে গোমরাহ হয়ে যাব। বরং আমি তো সেই ফায়সালা দেব, যে ফায়সালা নবী দিয়েছিলেন।" তখন ইবনে মাস'উদ হাদীস মোতাবেক সিদ্ধান্ত দিলেন। আবূ মূসা হাদীসের দিকে ফিরে যাবারই নির্দেশ দিয়েছেন, ইবনে মাস'উদের রায়ের অনুসরণ করতে বলেন নি।
ভুল ধারণা- ১৮: তাক্বী সাহেব লিখেছেন: মু'য়ায বিন জাবালকে ইয়ামানের কাযী নিযুক্তির প্রাক্কালে নবী ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন: কিভাবে তুমি উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করবে? মু'য়ায বললেন: কিতাবুল্লাহর আলোকে ফায়সালা করব। ... মু'য়ায বললেন: আমি ইজতিহাদ ও আমার রায়কে ব্যবহার করব। ... এ ঘটনাটি তাক্বলীদ ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে হেদায়েতের আলোকবর্তিকা। এর উদ্দেশ্য কেবলমাত্র এটাই যে, নবী ইয়ামেনবাসীকে তাক্বলীদে শাখসীর অনুমতি দিয়েছিলেন। (ফারান, পৃঃ ১৬-১৭)
সংশোধন: এই হাদীসটি রেওয়ায়াত ও দেরওয়ায়াত কোন দিক থেকেই সহীহ নয়। হাদীসটির সনদের পর্যালোচনা: ইমাম তিরমিযী বলেন, "আমাদের কাছে হাদীসটির এছাড়া আর কোন সনদ নেই এবং আমার কাছে এর সনদ মুত্তাসিল নয়।” ইমাম জাওকানী বলেন: "এই হাদীসটি বাতিল।"
দেরাওয়ায়াতের পর্যালোচনা: এ হাদীস দ্বারা এটা বুঝা যায় যে, কোন মাসআলার সমাধানের ক্ষেত্রে হাদীস কেবলমাত্র ঐ সময় খোঁজ করতে হবে যখন কুরআন মাজীদের তার সমাধান পাওয়া যাবে না। অথচ এটা একদমই ঠিক নয়।
হাদীসটি সহীহ হলেও তাক্বলীদ প্রমাণিত হয় না: ১. হাদীসটিতে গভর্নরের ফায়সালা সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে, কোন আলেমের ফায়সালা সম্পর্কে নয়। ২. গভর্নর ও কাযীদের ফায়সালা প্রদান আকস্মিক ও তাৎক্ষণিক বিষয়ে হয়ে থাকে। অথচ আপনারা মুজতাহিদের ঐ ফতোয়াকে স্থায়ী শরী'আতের মর্যাদা দিচ্ছেন। ৩. মু'য়ায-এর তাক্বলীদ কি এখনো ইয়ামানে আছে?
টিকাঃ
৬২. সহীহ: সহীহ বুখারী- কিতাবুল হজ্জ। এ ঘটনাটি দ্বারা তাক্বলীদ প্রমাণিত হয় না, বরং তাহক্বীকু (গবেষণা/ পর্যালোচনা) প্রমাণিত হয়।
৬৩. সহীহ: আলবানী হাদীসটির সনদকে সহীহ বলেছেন।
৬৪. সহীহ: সহীহ বুখারী- কিতাবুল ফারায়েয।
৬৫. সহীহ: সহীহ মুসলিম- কিতাবুস সালাত।
৬৬. য'য়ীফ: আবু দাউদ- কিতাবুল আকুযীয়্যাহ। আলবানী হাদীসটিকে য'য়ীফ বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত আবূ দাউদ হা/৩৫৯২]
৬৭. সূরা নিসা: ২৪ আয়াত।
৬৮. মাযহাব কি ও কেন? পৃ:৪৮।
৬৯. এ পর্যায়ে তাক্বী সাহেবের ঐ সব উদাহরণের জবাব হয়ে গেল, যেখানে তিনি মু'য়ায় বিন জাবালকে লোকজন কর্তৃক সমস্যা সমাধানে তাঁর শরণাপন্ন হওয়ার কথা বর্ণনা করেছেন।
৭০. য'য়ীফ: আলবানী হাদীসটিকে য'য়ীফ বলেছেন (তাহক্বীককৃত আবূ দাউদ হা/২৯১২)।
৭১. সহীহ: আবূ দাউদ- কিতাবুল হুদুদ।
৭২. হাসান: আবু দাউদ- কিতাবুল ক্বাযা। আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
📄 ফক্বীহ ও মুজতাহিদগণ বৈধকে অবৈধ করতে পারেন না
ভুল ধারণা- ১৯: আল্লাহ'র অশেষ রহমত বর্ষিত হোক আমাদের পূর্ববর্তী ফুকাহায়ে মুজতাহিদের উপর। তারা পরবর্তীদের জন্য অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তাক্বলীদে মতলকের (উন্মুক্ত অনুসরণের) পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। (ফারান, পৃঃ১৭)
সংশোধন: যে বিষয় আল্লাহ হালাল করেছেন, সেটা ফুক্বাহাগণ হারাম করেছিলেন- এর অধিকার ফুক্বাহাগণ কি আল্লাহর তরফ থেকে পেয়েছেন? তারা কি শরী'আতদাতা? যখন নবীই হালালকে হারাম করতে পারেন না তখন ফক্বীহগণ কিভাবে তা পারবেন?
ভুল ধারণা- ২০: ফক্বীহগণ যখন বুঝতে পারলেন- ধীরে ধীরে সততা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি তাক্বলীদে মুতলাকের দরজা উন্মুক্ত রাখা হয় তবে অনেক লোক প্রবৃত্তির গোলামীতে নিমজ্জিত হবে। (ফারান, পৃ: ১৭,১৮)
সংশোধন: এটা ভুল ও নিকৃষ্ট চিন্তা। তাক্বী সাহেব এটা বুঝাতে চেয়েছেন- তাক্বলীদে শাখসী এই ধরণের প্রবৃত্তিপূজা থেকে মুক্ত রাখতে পারে। আফসোস, ইত্তেবা' রসূলের মাধ্যমে আরো সুন্দরভাবে প্রবৃত্তিপূজা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব।
ভুল ধারণা- ২১: ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ প্রসঙ্গে বলেছেন: "এই ধরণের লোকেরা (স্বার্থের অনুকূলে) এক সময় ঐ ইমামের তাক্বলীদ করে যে নিকাহ ফাসিদ বলে মত প্রকাশ করেন। আবার অন্য সময় অন্য ইমামের অনুসরণ করে যে ঐ নিকাহকে সহীহ বলে মত প্রকাশ করেন। এভাবে 'আমল করা উম্মাতের ঐকমত্যে নাজায়িয।” (ফারান, পৃঃ ১৮)
সংশোধন: ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ কথাটি মুক্বাল্লিদদের সম্পর্কে বলেছেন। যেহেতু তাক্বলীদ কাজটিই খারাপ- এ কারণেই প্রবৃত্তিপূজার মধ্যে কেউ নিমজ্জিত হতে পারে। তাক্বলীদই প্রবৃত্তিপূজাকে বিস্তার করে। যে ব্যক্তি কারো তাক্বলীদ করে না সে দোদুল্যমান নয়।
ভুল ধারণা- ২৩: সাহাবা ও তাবে'য়ীগণের যুগে সততা ছিল সর্বস্তরে। এজন্য তাক্বলীদে মতলব্ধ ও তাক্বলীদে শাখসী- এই দু'টির উপরই তাদের আমল ছিল। (ফারান, পৃ: ১৯)
সংশোধন: সাহাবা ও তাবে'য়ীন যুগেও অনেক ফেতনা প্রসারিত হয়েছিল। যদি তখন তাক্বলীদের প্রয়োজন না হয়ে থাকে, তবে এই যামানাতে তো এর কোনই প্রয়োজন নেই।
ভুল ধারণা- ২৪ : শাহ ওয়ালীউল্লাহ বলেছেন- "স্মরণ রেখ! প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে তাক্বলীদের রেওয়াজ ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষে তাক্বলীদে শাখসীর উপর আমল শুরু হয় এবং সে যামানাতে এটা ছিল ওয়াজিব।" (ফারান, পৃ: ১৯)
সংশোধন: প্রথমে তাক্বী সাহেব এটা লিখেছিলেন যে সাহাবীদের যুগেও তাক্বলীদে শাখসীর প্রচলন ছিল। আবার এখন লিখেছেন, প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে তাক্বলীদের প্রচলন ছিল না। প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় কথাটিই সঠিক।
ভুল ধারণা- ২৫: সাহাবা ও তাবে'য়ীদের যুগের ঐচ্ছিক বিষয় পরবর্তীকালে এসে ওয়াজিব হতে পারে কিভাবে? শাহ ওয়ালিউল্লাহ লিখেছেন- "যদি কোন মূর্খ লোক এমন এলাকায় থাকে যেখানে অন্য ইমামের আলেম নেই, তবে তার জন্য ইমাম আবু হানিফার তাক্বলীদ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। (ফারান, পৃ:২০)
সংশোধন: শাহ ওয়ালিউল্লাহ-এর আলোচ্য উক্তিটি নিরুপায় অবস্থার বিধানমাত্র। যেভাবে শুকর খাওয়া হালাল মনে করা যাবে না, ঠিক একইভাবে তাক্বলীদকেও হালাল মনে করবে না।
ভুল ধারণা- ২৬ঃ শাহ সাহেব হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহতে লিখেছেন: "এই চার মাযহাব যা সুশৃঙ্খলভাবে গ্রন্থাবদ্ধ হয়েছে, গোটা উম্মাতের ইজমা' মোতাবেক এগুলোর তাক্বলীদ করা বৈধ। ইবনে হাযমের একথা ভুল যে, তাক্বলীদ হারাম।” (ফারান, পৃ:২০)
সংশোধন: এটা মোটেই ঠিক নয় যে, চার মাযহাবের তাক্বলীদের বৈধতার ব্যাপারে উম্মাতের ইজমা' হয়েছে। শাহ সাহেবের উদ্দেশ্য হল, লোকদের বুঝ: "তাক্বলীদ জায়েয এবং এর উপর ইজমা' হয়েছে" -এগুলো সবই ভুল। তিনি লিখেছেন: "বোধশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে"। শাহ সাহেব ইমাম ইবনে হাযমেরই পক্ষপাতিত্ব করেছেন। তাক্বলীদ সম্পর্কে শাহ সাহেবের চূড়ান্ত ফায়সালা: শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী নিজ 'ওয়াসিয়াত নামাহ'-তে লিখেছেন: "তারা ঐ সব মুজতাহিদদের শুকনো কথা মানে নাই যারা কোন আলেমের তাক্বলীদকে শক্তভাবে ধরে রেখেছে এবং সুন্নাতের অনুসরণ ছেড়ে দিয়েছে।"
ভুল ধারণা- ২৭ঃ কুরআন মাজীদের আয়াত: "আর যখন তাদেরকে বলা হয়: অনুসরণ কর যা আল্লাহ নাযিল করেছেন। তখন তারা বলে: কক্ষনো না, আমরা তো কেবল সেই বিষয়ের অনুসরণ করব, যাতে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে দেখেছি।" [সূরা বাক্বারাহ: ১৭০ আয়াত]
সংশোধন: একজন শাফে'য়ী এজন্য শাফে'য়ী যে, সে শাফে'য়ী মা-বাপের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে। এই চার মাযহাবের তাক্বলীদতো কয়েক শত বছর পরে শুরু হয়েছে। মাযহাবীরা পূর্ববর্তী পুরুষদের পরিবর্তে পরবর্তী পুরুষদের অনুসরণ করছে, যারা গোমরাহ হয়েছিল। চার ইমামতো নিজের তাক্বলীদ করতে নিষেধ করে গেছেন।
ভুল ধারণা- ৩০: কেউ কেউ তাক্বলীদের বিষয়ে আয়াতটি উপস্থাপন করেন: "তারা তাদের আলেম ও দরবেশদেরকে আল্লাহর পরিবর্তে রব বানিয়ে নিয়েছে।" (সূরা তাওবা: ৩১ আয়াত)। কিন্তু মুজতাহিদদের তাক্বলীদ শরী'আত প্রবর্তন হিসাবে করা হয় না। (ফারান, পৃঃ ২১)
সংশোধন: আক্বীদার দিক থেকে তো কেউ কখনই শরী'আতদাতা মনে করে না। বরং তারা এদেরকে আমলগত ভাবে শরী'আতদাতা বানিয়ে নিয়েছে। আর এটাই শিরক। ইয়াহুদী নাসারারা নিজেদের উলামা-মাশায়েখ কর্তৃক হালাল ও হারামকৃত বিষয়ের অনুসরণ করত। আর এটাকেই রসূলুল্লাহ ইবাদত বলে অভিহিত করেছেন।
টিকাঃ
৭৩. ক্ষমতার অধিকারী গণ্য করা হয় তবে কি তা শিরক নয়? (অনুবাদক)
৭৪. সহীহ: আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ।
৭৬. আল্লাহ বলেন: “অনুসরণ কর যা তোমার রবের পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে।"
৭৭. আল্লাহ বলেন: “যারা তাগুতের 'ইবাদত থেকে দূরে থাকে এবং আল্লাহ অভিমুখী হয়..."
৭৮. আল্লাহ বলেন: "তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রসূলের..."
৭৯. সূরা বাক্বারাহ: ১৭০ আয়াত।
৮০. সূরা যুমার: ৩ আয়াত।
৮১. হাসান: তিরমিযী- তাফসীরুল কুরআন, সূরা তাওবা।
৮২. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম।
৮৩. সহীহ: শরহে সুন্নাহ।
৮৪. সূরা হিজর : ৯ আয়াত।
৮৫. য'য়ীফ: শরহুস সুন্নাহ।
📄 ফিক্বাহ নিজেই বিকৃত
ফিকাহর প্রচুর মাসআলাই বিকৃত। আমি কিছু মাসআলার উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, এ সমস্ত প্রতিষ্ঠিত মাসআলার পক্ষে কুরআন ও হাদীসের কোন দলিল নেই।
ভুল ধারণা- ৩৮: অভিযোগ করা হয়, হানাফী ফিক্বাহতে পুরুষদের নাভির নিচে হাত বাঁধার স্বপক্ষে কোন হাদীস নেই। অথচ সুনানে আবু দাউদে আলী থেকে বর্ণিত হয়েছে: "সুন্নাত হল- ডান হাতকে বাম হাতের উপর নাভীর নিচে রাখবে।"
সংশোধন: এ হাদীসটি সুস্পষ্ট য'য়ীফ। আমাদের প্রশ্ন ছিল- "নবী কি এই হুকুম দিয়েছিলেন - পুরুষদের নাভীর নিচে এবং নারীদের বুকের উপর হাত বাঁধতে হবে?" তাক্বী সাহেব এর জবাব দেন নাই। সালাতে হাত বাঁধার ব্যাপারে পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে পার্থক্য করাটা প্রকারান্তরে শরী'আতকে বিকৃত করে।
ভুল ধারণা- ৩৯: অভিযোগ করা হয়, হানাফীগণ সালাতে রুকু'তে যেতে এবং রুকু থেকে উঠতে রফ'উল ইয়াদাইন করে না।
সংশোধন: এটা প্রমাণ করুন- রফউল ইয়াদাইন সুন্নাত নয়, বরং মানসুখ (রহিত) হয়েছে। যদি মানসুখ না হয় তবে আপনাদের মাযহাবে এটা গ্রহণ করা হয় নি কেন? যেহেতু সাহাবীগণ আমলটি করেছেন সুতরাং এতে তাদের সওয়াব বেশী হত।
ভুল ধারণা- ৪০ঃ হানাফীগণ প্রথম ও তৃতীয় রাক'আতে সিজদা থেকে উঠে সোজা দাঁড়িয়ে যায়, জলসায়ে ইস্তিরাহাত করে না। অথচ সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে: “নবী সালাতে নিজের পায়ের অগ্রভাগে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।”
সংশোধন: এই হাদীসটি য'য়ীফ, বরং মাওযু'। এ ধরণের মিথ্যা হাদীসকে সহীহ বুখারীর সাথে সম্পৃক্ত করাটা তাক্বী সাহেবের দুঃসাহস। এই হাদীসটি সহীহ বুখারীতে নেই। আপনারা মাওযূ' হাদীসের উপর 'আমল করেছেন ও সহীহ হাদীসটিকে ছেড়ে দিয়েছেন।
ভুল ধারণা- ৪১ঃ হানাফীগণ শেষ বৈঠকেও প্রথম বৈঠকের ন্যায় বাম পায়ের উপর বসে। অথচ সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে আয়েশা বলেন: "রসূলুল্লাহ ﷺ নিজের বাম পা বিছিয়ে দিতেন এবং ডান পা খাড়া রাখতেন।"
সংশোধন: তুয়াররুকে এভাবেই বসতে হয়। এর মধ্যে বাম পায়ের উপর বসার দলিল কোথায়? (সালাতে) পুরুষ ও মহিলাদের বসার পদ্ধতি পৃথক করা কি শরী'আতকে বিকৃত করা নয়?
ভুল ধারণা- ৪২ঃ হানাফীগণ ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করে না। জাবির বিন 'আব্দুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে নাই তার সালাত আদায় হয় নাই। কিন্তু ইমামের পিছনে থাকলে' (স্বতন্ত্র বিষয়)।
সংশোধন: আপনি আয়াত ও হাদীসের বর্ণনার পরিবর্তে কেবল একজন সাহাবীর উক্তি পেশ করেছেন। জাবির-এর ঐ কথাটিকে কি আপনি দলিল মনে করেন? জাবির-এর আলোচ্য উক্তি অনুযায়ী প্রতি রাক'আতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ফরয। অথচ আপনাদের নিকট সূরা ফাতিহা পাঠ ফরয নয়।
ভুল ধারণা- ৪৩ঃ হানাফীগণের ফরয সালাতের তৃতীয় ও চতুর্থ রাক'আতে ক্বিরাআত করা ফরয মনে করে না।
সংশোধন: আয়াতটির দাবী হল, প্রতি রাক'আতে কুরআন পাঠ করা উচিৎ। আবু হুমায়িদ বর্ণনা করেন: "রসূলুল্লাহ ﷺ ... ক্বিরাআত করতেন। ... পুণরায় বাকী সালাতও এভাবে আদায় করতেন'। এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হল, রসূলুল্লাহ ﷺ চার রাক'আতেই ক্বিরাআত করতেন। আবু ক্বাতাদাহ বলেন: "নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ যোহরের প্রথম দু' রাক'আতে সূরা ফাতিহা ও দু'টি সূরা পড়তেন এবং শেষ দু' রাক'আতে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন।" জাবির বলেন: "প্রথম দুই রাক'আতে সূরা ফাতিহা এবং অন্য সূরাও পাঠ করো। আর শেষ দুই রাক'আতে সূরা ফাতিহা পড়ো।"
ভুল ধারণা- ৪৪: হানাফীগণ সালাতে মুখে নিয়্যাত করার অনুমতি দিয়ে থাকে।
সংশোধন: আপনাদের মাধ্যমে শরী'য়াতের জালিয়াতি হচ্ছে, মাসায়েল বিকৃত হচ্ছে, বিদ'য়াত বিস্তার হচ্ছে।
ভুল ধারণা- ৪৫ঃ শহরবাসীদের জন্য 'ঈদের সালাতের পূর্বে কুরবানী করা হাদীসের আলোকে জায়েয নেই। কিন্তু গ্রামের লোকেরা ফজর উদয়ের পর কুরবানী করতে পারে।
সংশোধন: শহর ও গ্রামবাসীকে পৃথক করা সুস্পষ্ট জালিয়াতি। 'ঈদের দিন আল্লাহর মহত্ব বর্ণনা করা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ফরয। আনাস বিন মালিক পরিবার ও প্রতিবেশীদেরকে একত্রিত করতেন এবং শহরবাসীদের মত সালাত পড়াতেন। প্রকৃত প্রশ্ন ছিল কৌশল (হীলা) সম্পর্কে: "শহরবাসীও যদি 'ঈদের সালাতের পূর্বে কুরবানী করতে চায় তবে নিজের কুরবানীর পশু শহরের বাইরে নিয়ে যবেহ করতে পারবে।" এই হীলা জালিয়াতি এবং একটি প্রতারণা।
ভুল ধারণা- ৪৬ঃ যদি কোন মহিলার স্বামী নিখোঁজ (মাফকুদ) হয়, হানাফীদের বিধান হল, “মৃত্যুর খবর আসা পর্যন্ত স্ত্রী অপেক্ষা করবে। যখন স্বামীর সত্তর বছর পূর্ণ হবে, তখন স্ত্রী অন্যকে বিয়ে করতে পারবে।”
সংশোধন: তাক্বী সাহেব যে হাদীস উপস্থাপন করেছেন তা কোন মতেই দলিল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম আবু হাতিম বলেছেন, এই হাদীস মুনকার এবং বর্ণনাকারী মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করতো। বৃদ্ধাকে এক বছর পরে বিয়ের অনুমতি দিচ্ছেন, পক্ষান্তরে যুবতী নারীটিকে পঞ্চাশ বছর পর বিয়ের অনুমতি দিচ্ছেন।
টিকাঃ
৮৬. মূলত আলোচ্য বর্ণনাটি দারাকুতনী ও বায়হাক্বীর সুনানুল কুবরাতে বর্ণিত হয়েছে। আব্দুর রহমান বিন ইসহাকু মাতরুক (পরিত্যাজ্য বর্ণনাকারী)।
৮৭. নাভীর নিচে হাত বাঁধা সম্পর্কীত বর্ণনাগুলো য'য়ীফ হওয়াই তা অগ্রহণযোগ্য।
৮৮. য'য়ীফ: তিরমিযী- কিতাবুস সালাত। আলবানীও হাদীসটিকে য'য়ীফ বলেছেন।
৯২. সূরা মুযযাম্মিল: ২০ আয়াত।
৯৩. সহীহ: আবু দাউদ - কিতাবুস সালাত।
৯৪. হাসান: আবু দাউদ- কিতাবুস সালাত।
৯৫. সহীহ: আবূ দাউদ- কিতাবুস সালাত।
৯৬. সহীহ: সহীহ বুখারী।
৯৭. সহীহ: সহীহ বুখারী।
৯৮. সহীহ: সহীহ বুখারী।
৯৯. সহীহ: সহীহ মুসলিম।
১০০. মুরসাল : দারাকুতনী।
১০২. সহীহ: ইবনে মাজাহ। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
১০৪. শু'আয়েব আরনাউত বলেন: হাদীসটি হাসান।
১০৫. শু'আয়েব আরনাউত বলেন: হাদীসটি য'য়ীফ।
১০৬. সহীহ: সহীহ মুসলিম - কিতাবুল আযহা।
১০৭. সহীহ: শু'আয়েব আরনাউত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
১০৮. সহীহ বুখারী- কিতাবুল 'ঈদায়ীন।
১০৯. আলবানী, সহীহ জামে'উস সগীর হা/৭৮১২।
১১০. সহীহ বুখারী - কিতাবুল 'ঈদায়ীন।
১১১. সহীহ বুখারী - কিতাবুল 'ঈদায়ীন।
১১২. সহীহ: সহীহ বুখারী- কিতাবুল আযহা।
১১৩. আরো জানার জন্য দেখুনঃ সাইয়েদ আবু আ'লা মওদূদী, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার।
১১৪. হাসান: তিরমিযী, ইবনে মাজাহ।
১১৫. সহীহ: সহীহ মুসলিম।