📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 তাক্বলীদের পক্ষে উপস্থাপিত কুরআনের আয়াতের সহীহ ব্যাখ্যা

📄 তাক্বলীদের পক্ষে উপস্থাপিত কুরআনের আয়াতের সহীহ ব্যাখ্যা


এরপর তাক্বী সাহেব তাক্বলীদের বৈধতা বরং ওয়াজিব হওয়া সম্পর্কে কুরআন ও হাদীস থেকে দলিল উল্লেখ করে বলেছেন:

ভুল ধারণা- ১১: এটা এমন বিষয় যার বৈধতা বরং ওয়াজিব হওয়া কুরআন ও সুন্নাতের অনেক দলিল থেকে প্রমাণিত আছে। এর কিছু দলিল নিচে দেয়া হল:

ওয়ালাও রাদ্দুহু ইলার রসূলি ওয়া ইলা উলিল আমরি মিনহুম লাআলিমানহুল্লাযীনা ইয়াসতামবিতুনাহু মিনহুম।
"আর যদি লোকেরা এ বিষয়টি রসূল ও উলুল আমরের কাছে পেশ করত, তবে যাদের ইস্তিম্বাত করার (সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত নেবার) যোগ্যতা আছে তারা বিষয়টি উদঘাটন করত (সমাধান দিতে পারত)।" [সূরা নিসা: ৮৩ আয়াত]

এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, যে লোকদের সিদ্ধান্ত নেবার যোগ্যতা নেই তাদের উচিৎ ঐসব লোকদের তাক্বলীদ করবে যারা ইজতিহাদ (গবেষণা) ও ইস্তিম্বাতের (সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তের) যোগ্যতা রাখে। (ফারান, পৃঃ ১৪)

সংশোধন: আমরা জানি না, তাক্বী সাহেব উল্লিখিত আয়াতের প্রথমাংশের উদ্ধৃতি কেন দেন নি? যদি তিনি আয়াতটির প্রথমাংশ দেখে নিতেন তবে এই ভুল ধারণার সৃষ্টি হতো না। আর তিনি যদি সম্পূর্ণ উদ্ধৃতি দিতেন তবে পাঠকরা ধোঁকায় পড়ত না। পূর্ণাঙ্গ আয়াতটি হল:

ওয়া ইযা জাআহুম আমরুম মিনাল আমনি আওল খাওফি আযাউ বিহি ওয়ালাও রাদ্দুহু ইলার রসূলি ওয়া ইলা উলিল আমরি মিনহুম লাআলিমানহুল্লাযীনা ইয়াসতামবিতুনাহু মিনহুম।
"আর যখন তাদের কাছে শান্তি বা শঙ্কা সংক্রান্ত খবর আসে তখন তারা সেটার প্রচারে লেগে যায়। অথচ খবরটি যদি রসূল বা উলূল 'আমর (দায়িত্বশীল)-দের কাছে নিয়ে যেত তবে ইস্তিম্বাত (সূক্ষ্ম বিচারশক্তি)-এর অধিকারী ব্যক্তিগণ বিষয়টির (রহস্য) উদঘাটন করতে পারতো।"

এ আয়াতের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, অর্থাৎ শান্তি বা যুদ্ধের সময় গুজব ছড়ানো উচিৎ নয়। বরং দায়িত্বশীলদের কাছে সেগুলো পেশ করা উচিৎ, যেন তারা বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন। বলুন তো, এ আয়াতের সাথে তাক্বলীদের সম্পর্ক কি? এখন যদি একে তাক্বলীদের দিকে টেনে নেয়া হয়, তবে এর মধ্যে কোন মৃত মানুষের (যেসব ইমাম মারা গেছেন তাঁদের) তাক্বলীদের দলিল কোথায়? যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন তবে দেখবেন, এখানে তাক্বলীদকে খণ্ডন করা হয়েছে। কেননা আয়াতটির মূল দাবী হল, কোন খবরকে বিনা তদন্তে গ্রহণ করবে না। বরং বিশ্লেষণ করতে না পারলে কারো দ্বারা বিশ্লেষণ করে নেবে। কিন্তু মুক্বাল্লিদ তো সব ফতোয়া বেদলিল হিসাবেই গ্রহণ করে। তাদের কখনই এই যোগ্যতা নেই যে, যেসব মাসআলা তার কাছে এসেছে সে এটা পর্যালোচনা করবে- সেটা সহীহ না অসহীহ। তাক্বী সাহেব তরজমার দিকে লক্ষ্য রেখে এটা বলেছেন যে, 'উলূল আমরের' মধ্যে কেউ তো 'আহলে ইস্তিম্বাত' (সিদ্ধান্ত নেবার যোগ্যতা) এর অধিকারী থাকবে। তার কাছ থেকে জেনে নেবে মাসআলাটি কি হবে? এখন তাক্বী সাহেব আমাদেরকে বলুন, 'উলুল আমর'-এর অর্থ কি? মুজতাহিদ না মুক্বাল্লিদ? যদি 'মুজতাহিদ' উদ্দেশ্য হয় তবে- মুজতাহিদ কি দুই প্রকারের হয়ে থাকে? 'আহলে ইস্তিম্বাত' এবং 'গায়ের আহলে ইস্তিম্বাত'? কক্ষনই হতে পারে না।

এখন এ আয়াতটির শানেনুযূল শুনুন: “মদীনা মুনাওওয়ারাহতে গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, রসূলুল্লাহ তাঁর পবিত্র সহধর্মিনীগণকে তালাক দিয়েছেন। উমার-এর কাছে যখন এ খবর পৌঁছল তখন তিনি স্বয়ং রসূলুল্লাহ-এর কাছে গেলেন এবং বিশ্লেষণের পরে আমাদেরকে এ কথা বললেন যে, এ গুজব মিথ্যা। এরপর উমার বলেন: ফাকুনতু আনা আসতামবাত্তু যালিকাল আমরা। “এই খবরের ইস্তিম্বাত আমিই করেছিলাম।” এই শানে নুযূলকে সামনে রেখে বলা যায় যে, সেটা সংবাদ বা খবর সংক্রান্ত ছিল যার পর্যালোচনা করা হয়েছিল অথবা মাসআলা ছিল- যে সম্পর্কে ফাতাওয়া জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।

ভুল ধারণা- ১২: অন্যত্র আল্লাহ বলেন: ফালাওলা নাফারা মিন কুল্লি ফিরকাতিম মিনহুম তয়িফাতুল লিয়াতাফাক্কাহু ফিদ দ্বীনি ওয়ালি ইউনযিরু ক্বাওমাহুম ইযা রাজাউ ইলাইহিম লাআল্লাহুম ইয়াহযারুন।
"তাদের প্রত্যেক গোত্র থেকে একটি ছোট দল এই উদ্দেশ্যে কেন বের হলো না যে, তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে ফিরে আসত এবং নিজেদের গোত্রকে সতর্ক করত, যেন, লোকেরা (আল্লাহর নাফরমানি করা থেকে) বিরত থাকে।" [তাওবা : ১২২ আয়াত]

এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট হয়, ইলমে দ্বীন অর্জনকারীদের জন্য এটা জরুরী যে, নিজের গোত্রে ফিরে এসে তারা দ্বীন ও শরী'আতী আহকামের মধ্যে নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখবে। তাছাড়া ঐ গোত্রের জন্যও এটা জরুরী যে, তারা ঐ আলেমদের দ্বারা উপস্থাপিত মাসায়েলের উপর বিশ্বাস করে আমল করবে।

সংশোধন: এ আয়াতের দাবীর উপর এখনো আমল করা যেতে পারে, নাকি পারে না? যদি আমল করা যায়, তবে সেক্ষেত্রে এ যামানায় যেসব (জীবিত) আলেম আছেন তাদের তাক্বলীদ হয়, নাকি মৃত চার ইমামের তাক্বলীদ হয়? মূলত আয়াতটি দ্বারা তো আপনাদের তাক্বলীদই খণ্ডন হয়। আপনারা তো ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার এই আয়াত দ্বারাই আপনাদের দৃষ্টিতে ইজতিহাদের দরজা খুলে রেখেছেন।

ভুল ধারণা- ১৩: অন্যত্র আল্লাহ বলেন: ওয়াত্তাবিউ সাবিলা মান আনাবা ইলাইয়্যা। "ঐ লোকদের রাস্তার অনুসরণ কর যারা আমার দিকে ঝুঁকে আছে।"

এ আয়াতে এটা বলা হয় নাই যে, আমার পথের অনুসরণ কর। কেননা, আল্লাহর আনুগত্যের রাস্তাকে ঠিক ঐভাবে বোঝা যেভাবে ঐ রাস্তাকে বোঝা উচিৎ। এটা প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব না। এজন্যে এই পথ নির্দেশনার জন্য যে ব্যক্তির মন-প্রাণ আল্লাহর দিকে ঝুঁকে আছে এবং আল্লাহর পছন্দ-অপছন্দকে বুঝার জন্য নিজের যিন্দেগীকে বিলিয়ে দিয়েছে- তার আনুগত্য করার মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য হয়ে যাবে। (ফারান, পৃ:১৪)

সংশোধন: ১. প্রত্যেক মু'মিনই আল্লাহর দিকে ঝুঁকে থাকে। তাফসীরে ইবনে কাসিরে "মান আনাবা ইলাইয়া" এর তাফসীরে মু'মিনগণকে বলা হয়েছে। সুতরাং তাক্বী সাহেবের বর্ণনানুযায়ী আয়াতের অর্থ হয়, সকল মু'মিনের তাক্বলীদ করা উচিৎ (ব্যক্তি বিশেষ মু'মিনের নয়)। এ থেকে তাক্বলীদে শাখসী প্রমাণিত হয় না। ২. আয়াতটির দাবী হল, “যারা আল্লাহর রাস্তার অনুসরণ করে”। কিন্তু তাক্বী সাহেব এর ব্যাখ্যা নিয়েছেন “আল্লাহওয়ালাদের অনুসরণ কর।” রাস্তার উপর চলতে চলতে তো তারা ভুল করতে পারে। কেননা, প্রত্যেক মানুষ ভুল-ত্রুটির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যে রাস্তার উপর তারা চলছে- তা ভুল নয়। সুতরাং আয়াতটিতে ইসলামের উপর চলার হুকুম রয়েছে, 'তাক্বলীদে শাখসী' বা ব্যক্তি বিশেষকে (মৃত ইমামের) অনুসরণ নয়। ৩. আয়াম্মিয়ে দ্বীন তাক্বলীদ করতে নিষেধ করেছেন। এ কারণে তাদের রাস্তার অনুসরণ হল- তাক্বলীদ না করা।

টিকাঃ
৪৯. বইটির বাংলা অনুবাদের আলোচ্য আয়াতের পর্যালোচনায় তাক্বী সাহেব নিজের বক্তব্য উল্লেখ করার পর ইমাম রাযী ও নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালীর উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
৫০. সূরা নিসাঃ ৮৩ আয়াত।
৫১. সহীহ : সহীহ মুসলিম- কিতাবুত তালাক।
৫২. তাক্বী উসমানী সাহেবের উর্দু বইটির বাংলা অনুবাদ 'মাযহাব কি ও কেন?' এর ২২-২৪ পৃষ্ঠার আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পূনরায় বলতে হচ্ছে- এ আয়াতটি একটি ঘটনা বা মাসআলার সত্যতা নির্ণয়ের তাহক্বীকু (বিশ্লেষণ) সংক্রান্ত ছিল।
৫৩. তাক্বী সাহেবের বাংলা অনুবাদটিতে আমরা এ পর্যায়ে আবূ বকর জাসসাস -এর উদ্ধৃতিও পেয়েছি।
৫৪. সূরা লুকমান: ১৫ আয়াত।
৫৫. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বলেছেন: "তুমি আমার তাক্বলীদ করো না; মালিক, শাফে’য়ী, আওযা’য়ী, সাওরী এদেরও তাক্বলীদ করো না। বরং তাঁরা যেখান থেকে (সমাধান) গ্রহণ করেন তুমি সেখান থেকেই তা গ্রহণ কর।"
৫৬. ইমাম আবূ হানিফা বলেছেন: "হাদীস বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হলে ওটাই আমার মাযহাব।" (ফাতাওয়ায়ে শামী)

ফন্ট সাইজ
15px
17px