📄 ইসলাম সুস্পষ্ট ও সংশয়মুক্ত
শিক্ষণীয় দিক: তাক্বী সাহেবের উপস্থাপিত তিনটি অস্পষ্ট 'ও জটিল বিষয় হাদীস দ্বারাই সমাধান হল। সুতরাং তাক্বলীদের আর কোন প্রয়োজন থাকল না। ইসলামী শরী'আতকে অস্পষ্ট ও দূর্বোধ্য গণ্য করাটা নিচের হাদীসগুলোর বিরোধী।
১. আবু দারদা বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: وَايْمُ اللَّهِ لقد ترکتکم علی مثل البيضاء ليلها ونهارها سواء
"আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে সুস্পষ্ট শরী'আতের উপর ছেড়ে দিয়েছি। এর রাত ও দিন দু'টিতেই সমান আলো বিদ্যমান।"৪৩
২. জাবির বিন 'আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: أَمْتَهَوِّكُونَ أَنْتُمْ كَمَا تَهَوَّكَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى ، لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةٌ
"তোমরা কি এরকম অস্পষ্টতার মধ্যে আছ যেভাবে ইয়াহুদী ও নাসারাগণ আছে? নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট দ্বীন এনেছি।"৪৪
তাক্বী সাহেব! এই দ্বীন তো সুস্পষ্ট, এর মধ্যে অস্পষ্টতা কোথায়? আল্লাহ বলেন: وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ
"আল্লাহ নিজের নূরকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, যদিও কাফিরদের কাছে তা কতইনা অপছন্দনীয়।" [সূরা সফ: ৮ আয়াত]
নূরে হিদায়াতও তো পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেছে। এখন অন্ধকার কোথায় এবং সংশয়ের অবকাশ কোথায়?
লক্ষণীয় দিক: ধরা যাক, শরী'আতে যদি সংশয় থাকে, কিংবা অস্পষ্টতা থাকে তবে এটা দূর করার একমাত্র পথই কি তাক্বলীদ করা? কক্ষণই না। শিষ্য উস্তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করবে, অজ্ঞ আলেমের কাছে জিজ্ঞাসা করবে এবং এক আলেম অন্য আলেমের সাথে আলাপ-আলোচনা করে ঐ অস্পষ্টতা দূর করতে পারে।
টিকাঃ
৪৩ হাসান: ইবনে মাজাহ- কিতাবুল ঈমান ওয়া ফাযায়েলে সাহাবাহ বাবে ইত্তিবাউ সুন্নাহ ; আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। (তাহ: ইবনে মাজাহ হা/৫) অনুরূপ মুসনাদে আহমাদে 'ইরবাষ থেকে বর্ণিত হয়েছে। (বুলুগুল আমানী ১/১৮৯ পৃঃ, এর সনদ সহীহ)
৪৪. হাসান: আহমাদ, বায়হাক্বী 'শু'আবুল ঈমান, তাহক্বীক মিশকাত হা/১৭৭।
📄 সালাফদের অনুসরণ বনাম মাযহাবের অনুসরণ
ভুল ধারণা- ৭: আপনারা লক্ষ্য করেছেন, কুরআন ও হাদীস থেকে আহকাম নির্ণয়ে এ জাতীয় অনেক জটিলতা পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে একটি পথ হল, নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উপর নির্ভর করে এ জাতীয় বিষয়ে স্বয়ং নিজেরাই ফায়সালা গ্রহণ করা। দ্বিতীয় পন্থা হল, আমরা এটা দেখব যে, এ সমস্ত বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাতের নির্দেশকে আমাদের সম্মানিত সালাফগণ (পূর্ববর্তী নেককারগণ) কিভাবে বুঝেছিলেন। (ফারান, ১৩ পৃঃ)
সংশোধন: যে জটিলতা আপনি উপস্থাপন করেছেন সেগুলোর সবইতো সমাধান করে দিয়েছি। সুতরাং কুরআন ও হাদীস বুঝার ক্ষেত্রে কোনই জটিলতা থাকল না, শর্ত হল 'ইলম থাকা। এখন যদি কেউ আলেম হওয়া সত্ত্বেও জাহেলে পরিণত হয় তবে তো সেটা তাঁর নিতান্তই মন্দ ভাগ্য।
এটা তো ঠিকই যে, কুরআন ও হাদীস সালাফগণ (সাহাবীগণ) যেভাবে বুঝেছিলেন সেভাবেই আমাদেরকে বুঝতে হবে। সেটার কোন নতুন ব্যাখ্যা করা যাবে না। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, সালাফদের কোন এক ব্যক্তির ফায়সালাকে গ্রহণ করতে হবে এবং তার বিপরীতে অধিকাংশ পূর্বসূরীদের ফায়সালার ব্যাপারে অন্ধ থাকতে হবে। এখন যদি আমরা এটাকে ফরয হিসাবে গ্রহণ করি যে, এই ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ-ই নেই তবে তো এটা অনেক বড় বোকামী হবে। কেননা, হতে পারে ঐ ব্যক্তির কাছে সুনির্দিষ্ট বিষয়ের হাদীসটি পৌছে নি। এ কারণে হাদীস থাকা সত্ত্বেও ঐ ব্যক্তির কথাকে কিভাবে দলিল হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে? ৪৫
ভুল ধারণা- ৮ : ইসলামের প্রথম যুগের বুযূর্গদের মধ্যে যাকে কুরআন ও সুন্নাতের ব্যাপারে জ্ঞানের দিক থেকে বেশী দক্ষ দেখব, তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উপর আস্থা রাখব এবং তিনি যা কিছু বুঝবেন- সেই মোতাবেক আমল করব। (ফারান, পৃ:১৩)
সংশোধন: যদি মুক্বাল্লিদ এটা বুঝতেই পারত যে, কোন বুযূর্গ কুরআন ও সুন্নাতের দিকে দিয়ে বেশী অভিজ্ঞ- তবে তো সে ঐ বুযুর্গের চেয়ে বেশী বেশী জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে সমস্ত বুযূর্গদের ফেক্বাহ অবগত হয়ে জ্ঞানের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদি এখনও সে তাক্বলীদ করে তবে এর অর্থ দাঁড়ায়, সে নিজের চেয়ে অল্প জ্ঞানী ব্যক্তির তাক্বলীদ করে- যা সম্পূর্ণরূপে হাস্যস্পদ বিষয়ে পরিণত হয়।
তাক্বী সাহেব এটা বলুন তো, এ মুহূর্তে দুনিয়ার যে কোটি কোটি মুক্বাল্লিদ আছে, তাদের মধ্যে কে কে এটা অবগত যে কোন বুযুর্গ কুরআন ও হাদীসের ব্যাপারে বেশী অভিজ্ঞ। যদি কেউই না জানে তবে (মূর্খ) মুক্বাল্লিদ কিভাবে এটা বুঝবে? তাহলে কেন এটা বলা যাবে না যে, তাদের ভেতরে বাপ-দাদার তাক্বলীদ সংক্রমিত হয়েছে। অর্থাৎ বাপের মাযহাব হয়েছে ছেলের মাযহাব। যদি সে হানাফী পরিবারে জন্মে তবে তারা ইমাম আবু হানিফাকে সবচেয়ে বড় ইমাম জানবে। যদি সে শাফে'য়ী পরিবারে জন্মে তবে সে ইমাম শাফে'য়ীকে বেশী জ্ঞানী জানবে। যদিও কোন বুযুর্গের ছেলে আলেম হোক না কেন মুক্বাল্লিদ পরিচয়েই তার জন্ম হয়। এভাবে মুক্বাল্লিদ সব-সময়ই মুজতাহিদ ও নিজের বাপ-দাদার মুক্বাল্লিদ হয়। এ দু'টো তাক্বলীদের তিরষ্কারই কুরআনের আয়াতে আছে। আফসোস! এ জাতীয় তাক্বলীদের ব্যাপারে। আচ্ছা, তাক্বী সাহেব! এটা বলুন তো- আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু অনেক বড় ইমাম ছিলেন, না ইমাম আবূ হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি? আপনি তো যাকে বড় আলেম মনে করেন তাঁর তাক্বলীদ করেন। এ পর্যায়ে আপনার কাছে কি আবূ হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বড় ইমাম?
ভুল ধারণা- ৯ : পূর্ববর্তী আলোচনার দিকে লক্ষ্য রেখে যদি আমরা নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনার উপর আস্থা স্থাপনের পরিবর্তে বিভিন্ন জটিল বিষয় ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সালাফদের মধ্যে কোন আলেম যেটা বুঝেছেন সেটাকে গ্রহণ করি- তখন এ প্রক্রিয়াকেই বলা হয়, আমরা অমুক আলেমের তাক্বলীদ করি। (ফারান, পৃঃ ১৩)
সংশোধন: মুক্বাল্লিদের এতটা জ্ঞান কোথা থেকে আসবে যার ফলে সে বুঝবে- সালাফদের মধ্যে থেকে অমুক আলেমের উদ্দেশ্যটি সঠিক। এর সমাধান তো কেবল আলেমই করতে পারে, জাহেল পারবে না। এটা সত্যিই বিস্ময়কর যে, কখনো আপনারা আলেমকে জাহেল বানাচ্ছেন- যেন সে তাক্বলীদকে বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করে। আবার কখনো মুক্বাল্লিদকে এত বড় আলেম বানাচ্ছেন যে, সে কোন ইমামের উক্তি সম্পর্কীত ফায়সালাটির সঠিক বা বেঠিক নির্ণয় করতে পারে।
[অর্থাৎ তাক্বলীদ ছেড়ে দেয়া আলেমদের দায়িত্ব। অজ্ঞ ব্যক্তি সহীহ বুখারী এবং হিদায়াহ বা ফাতাওয়ায়ে আলমগীরের কোনটি অনুসরণ করতে হবে- এক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্ত দানের ক্ষমতা নেই। -অনুবাদক]
টিকাঃ
৪৫ এ অবস্থাগুলোকে তাক্বলীদ গণ্য করে মাযহাবী ও কোন কোন সালাফী আলেমরা ভুল করছেন। (অনুবাদক)
📄 শরী‘আত প্রণেতা বনাম শরী‘আতের ব্যাখ্যাদাতা
ভুল ধারণা- ১০ : উপরের আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, কোন ইমাম ও মুজতাহিদের তাক্বলীদের উদ্দেশ্য কখনই এটা নয় যে তাকে শরী'আত প্রণেতার মর্যাদা দিতে হবে। বরং এর উদ্দেশ্য হল, কুরআন ও সুন্নাতের অনুসরণ করা। শুধুমাত্র কুরআন ও সুন্নাতের উদ্দেশ্য বুঝার জন্য এবং শরী'আতী আইনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেই তার উপর নির্ভর করা হয়ে থাকে। (ফারান, পৃঃ ১৩)
সংশোধন: তাক্বলীদের যে ব্যাখ্যা এবং মুক্বাল্লিদের যে আক্বীদা পূর্বে উসূলে ফিক্বাহর কিতাবগুলো থেকে উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, তা থেকে এটা বুঝা যায় - যেহেতু সে শরী'য়াত প্রণেতা এ কারণে মুক্বাল্লিদের জন্যে সেগুলো পালন করা ওয়াজিব।
সব রায়ই যা তাঁর পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়, তা আমার জন্য ধ্রুব সত্য হিসেবে গৃহীত। [তৌযীহ তালবীহ]
"যা ইমাম আবূ হানিফার রায়, সেটাই আমার জন্য পালন করা ওয়াজিব।"
এখানে ইমামের রায়কেই প্রকৃত উদ্দেশ্য বানানো হয়েছে। এ সুযোগ রাখা হয় নি যে, যদি তার রায় ভুল হয় তবে ছেড়ে দেব। কেননা, ইমামের প্রতিটি রায়কে সে নিজের জন্য ওয়াজিব গণ্য করে নিয়েছে। এভাবে সে নিজের ইমামকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার মর্যাদা দিয়ে দিয়েছে-আর এটাইতো শিরক।
এভাবে যদি আপনি তাক্বলীদের দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টি দেন তবে দেখতে পাবেন, সুস্পষ্ট সহীহ হাদীসের মোকাবেলায় তারা ইমামের রায়কে গ্রহণ করছে। যদি এটা শরী'আতদাতা নির্ধারণ না হয়, তবে এটাকে আর কি বলা যাবে? এজন্য শাহ্ 'আব্দুল 'আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী লিখেছেন:
علماء را به پیغمبری رسانیده شود بلکه بخدائے
"মুকাল্লিদগণ আলেমদের রসূলের মর্যাদা দিয়েছে। এমনকি আল্লাহর মর্যাদায়ও অধিষ্ঠিত করেছে।" [ফাতাওয়ায়ে 'আযীযিয়াহ ১/১৭৬ পৃঃ]
হানাফী ফিক্বাহতে এমনও অনেক মাসায়েলের স্তুপ আছে- যা কুরআন ও হাদীসের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরং কিছু কিছু তো সুস্পষ্টভাবে কুরআন ও হাদীসের বিরোধী। এটা কি শরী'আতকে বিকৃত করা নয়? যদি সেটা না-ই হয়, তবে এ জাতীয় মাসায়েলের পক্ষে কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেন? যদি না পারেন, তাহলে কি শরী'আতদাতা বানানো হলো না? এটা কি শিরক নয়? (এ জাতীয় কিছু মাসায়েলের উদাহরণ এই বইয়ের শুরুতে দেয়া হয়েছে)
আপনারা বলছেন যে, আমরা তাকে (ইমামকে) শরী'আতদাতা মনে করি না, বরং ব্যাখ্যাকারী মনে করি। কিন্তু এটাও তো সহীহ নয়। কেননা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই শরী'আতের ব্যাখ্যাদাতা।
আল্লাহ নিজেই বলেন: ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ "অতঃপর এর ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমারই।"৪৬
কুরআনের ব্যাখ্যার দায়িত্ব যখন আল্লাহ রসূলের নিকট অহীর মাধ্যমে প্রেরণ করে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন এবং ঐ অহীর অধীন রসূলকে এর ব্যাখ্যা পৌছে দেবার পদমর্যাদা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ দলিল হিসাবে নির্ধারণ করেছেন।
আল্লাহ বলেন: وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ “(হে রসূল!) আমি এ শরী'আত আপনার উপর নাযিল করেছি, যেন আপনি লোকদের জন্যে তাদের প্রতি নাযিলকৃত শরী'আতের ব্যাখ্যা করেন।"৪৭
আসল কথা হল, ব্যাখ্যার প্রমাণও সেটাই যা রসূলের মাধ্যমে পাওয়া যায়। আর যে ব্যাখ্যা রসূলের ব্যাখ্যা ছাড়া পৌঁছে নি, বরং কৃত্রিমভাবে রচিত তবে এটা আল্লাহর দেয়া ব্যাখ্যার মোকাবেলায় উপস্থাপিত হলে - সেটাই শিরক। শরী'আতদাতা ও ব্যাখ্যাকারী উভয়ই আল্লাহ। যদি ইমামকেও আপনারা ব্যাখ্যাদাতা মনে করেন তবে এটাও শিরক। [যেখানে কুরআন ও রসূলের সুন্নাতে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকার পরও উলামাদের অনুসরণের নামে ভিন্ন ব্যাখ্যার অনুসরণ করা হয় - তখনই সেটা বিধানগত শিরক হয়। (অনুবাদক)]
প্রশ্নঃ রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَنْ أَدْرَكَ مِنْ الصُّبْحِ رَكْعَةً قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ فَقَدْ أَدْرَكَ الصُّبْحَ
“যে সূর্যোদয়ের পূর্বে ফজরের এক রাক'আত পেয়েছে- সে ফজরের সালাত পেয়েছে।”৪৮
বলুন, এই হুকুমের মধ্যে জটিলতা কোথায়?
আপনারা কেন এই হাদীসকে গ্রহণ করেন না?
এ ব্যাপারে কোন দলিল আছে কি?
আপনারা কি কেবল কিয়াসের সাহায্যে এটা খণ্ডন করেন না?
যদি আপনারা একথা বলেন, সূর্য উঠার সময় সালাত আদায় করা নিষিদ্ধ, সেজন্য আমরা এ হাদীস গ্রহণ করি না। তাহলে জবাব দিন, ঐ সময় ফরয সালাত শুরু করা নিষিদ্ধ, নাকি শুরু করা ফরয সালাত পূর্ণ করাটাও নিষিদ্ধ? দু'টি হাদীসের উদ্দেশ্যতো পরিষ্কার। অর্থাৎ এমন সময় সালাত আদায় নিষিদ্ধ - তবে ঐ ফরয সালাত এর ব্যতিক্রম যার এক রাক'আত ওয়াক্তের ভিতর আদায় করা হয়েছে।
যদি আপনারা এ বিষয়ে জেদ করে বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা 'আম (ব্যাপকার্থক) -এ জন্যে আমরা একে স্বতন্ত্র হিসাবে গ্রহণ করি নাই।
তাহলে প্রশ্ন হলো- যখন হাদীস খাস (সুনির্দিষ্ট অর্থবোধক) হয় তখন কার দুঃসাহস আছে সেটা গ্রহণ করবে না? আর যদি আপনারা খাসকে গ্রহণ না করেন, তাহলে 'আসরের সালাতের ক্ষেত্রে খাসকে কেন গ্রহণ করেছেন? আপনারা আসরের এক রাক'আত সূর্যাস্তের সময় পড়ার অনুমতি দেন। অথচ সূর্যাস্তের সময়ও সালাত পড়ার নিষেধাজ্ঞা আছে। এখানে 'আম হুকুমকে কিভাবে খাস হিসাবে গণ্য করলেন, আবার ফজরের সালাতের ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করলেন না? প্রকৃতপক্ষে আপনারা না 'আম হাদীস মানেন, আর না খাস হাদীস। বরং দু'টিকেই সাংঘর্ষিক মনে করে দু'টিকেই বাতিল করে দিয়েছেন। অতঃপর কেবল কিয়াসের মাধ্যমে সূর্যাস্তের পূর্বে এক রাক'আত আদায়ের অনুমতি দেন, আবার সেই ক্বিয়াসের দ্বারাই সূর্যোদয়ের সময় এক রাক'আত আদায়ের অনুমতি দেন না। বিস্তারিত দেখুন -শরহে বেকায়াহ ও অন্যান্য ফিক্বাহর কিতাব।
বলুন, এটা শরী'আত না ব্যাখ্যা? এরপরও যদি বলেন, আপনারা মুজতাহিদকে শরী'আতদাতা মানেন না- তবে আমরা কেবল 'ইন্না লিল্লাহ' ছাড়া আর কি বলতে পারি? এর স্বপক্ষে আপনার উদ্ধৃতিই পেশ করছি:
"যদি কোন ব্যক্তি কোন ইমামকে শরী'আতদাতার মর্যাদা দিয়ে তাঁর অনুসরণকে ওয়াজিব বলে মনে করে। তবে নিঃসন্দেহে একে শিরক বলা যাবে।” (মাসিক ফারান, পৃ:১৩)
টিকাঃ
৪৬ সূরা ক্বিয়ামাহ: ১৯ আয়াত।
৪৭ সূরা নহল : ৪৪ আয়াত।
৪৮. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ২/৫৫৩ নং।
📄 তাক্বলীদের পক্ষে উপস্থাপিত কুরআনের আয়াতের সহীহ ব্যাখ্যা
এরপর তাক্বী সাহেব তাক্বলীদের বৈধতা বরং ওয়াজিব হওয়া সম্পর্কে কুরআন ও হাদীস থেকে দলিল উল্লেখ করে বলেছেন:
ভুল ধারণা- ১১: এটা এমন বিষয় যার বৈধতা বরং ওয়াজিব হওয়া কুরআন ও সুন্নাতের অনেক দলিল থেকে প্রমাণিত আছে। এর কিছু দলিল নিচে দেয়া হল:
ওয়ালাও রাদ্দুহু ইলার রসূলি ওয়া ইলা উলিল আমরি মিনহুম লাআলিমানহুল্লাযীনা ইয়াসতামবিতুনাহু মিনহুম।
"আর যদি লোকেরা এ বিষয়টি রসূল ও উলুল আমরের কাছে পেশ করত, তবে যাদের ইস্তিম্বাত করার (সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত নেবার) যোগ্যতা আছে তারা বিষয়টি উদঘাটন করত (সমাধান দিতে পারত)।" [সূরা নিসা: ৮৩ আয়াত]
এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, যে লোকদের সিদ্ধান্ত নেবার যোগ্যতা নেই তাদের উচিৎ ঐসব লোকদের তাক্বলীদ করবে যারা ইজতিহাদ (গবেষণা) ও ইস্তিম্বাতের (সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তের) যোগ্যতা রাখে। (ফারান, পৃঃ ১৪)
সংশোধন: আমরা জানি না, তাক্বী সাহেব উল্লিখিত আয়াতের প্রথমাংশের উদ্ধৃতি কেন দেন নি? যদি তিনি আয়াতটির প্রথমাংশ দেখে নিতেন তবে এই ভুল ধারণার সৃষ্টি হতো না। আর তিনি যদি সম্পূর্ণ উদ্ধৃতি দিতেন তবে পাঠকরা ধোঁকায় পড়ত না। পূর্ণাঙ্গ আয়াতটি হল:
ওয়া ইযা জাআহুম আমরুম মিনাল আমনি আওল খাওফি আযাউ বিহি ওয়ালাও রাদ্দুহু ইলার রসূলি ওয়া ইলা উলিল আমরি মিনহুম লাআলিমানহুল্লাযীনা ইয়াসতামবিতুনাহু মিনহুম।
"আর যখন তাদের কাছে শান্তি বা শঙ্কা সংক্রান্ত খবর আসে তখন তারা সেটার প্রচারে লেগে যায়। অথচ খবরটি যদি রসূল বা উলূল 'আমর (দায়িত্বশীল)-দের কাছে নিয়ে যেত তবে ইস্তিম্বাত (সূক্ষ্ম বিচারশক্তি)-এর অধিকারী ব্যক্তিগণ বিষয়টির (রহস্য) উদঘাটন করতে পারতো।"
এ আয়াতের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, অর্থাৎ শান্তি বা যুদ্ধের সময় গুজব ছড়ানো উচিৎ নয়। বরং দায়িত্বশীলদের কাছে সেগুলো পেশ করা উচিৎ, যেন তারা বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন। বলুন তো, এ আয়াতের সাথে তাক্বলীদের সম্পর্ক কি? এখন যদি একে তাক্বলীদের দিকে টেনে নেয়া হয়, তবে এর মধ্যে কোন মৃত মানুষের (যেসব ইমাম মারা গেছেন তাঁদের) তাক্বলীদের দলিল কোথায়? যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন তবে দেখবেন, এখানে তাক্বলীদকে খণ্ডন করা হয়েছে। কেননা আয়াতটির মূল দাবী হল, কোন খবরকে বিনা তদন্তে গ্রহণ করবে না। বরং বিশ্লেষণ করতে না পারলে কারো দ্বারা বিশ্লেষণ করে নেবে। কিন্তু মুক্বাল্লিদ তো সব ফতোয়া বেদলিল হিসাবেই গ্রহণ করে। তাদের কখনই এই যোগ্যতা নেই যে, যেসব মাসআলা তার কাছে এসেছে সে এটা পর্যালোচনা করবে- সেটা সহীহ না অসহীহ। তাক্বী সাহেব তরজমার দিকে লক্ষ্য রেখে এটা বলেছেন যে, 'উলূল আমরের' মধ্যে কেউ তো 'আহলে ইস্তিম্বাত' (সিদ্ধান্ত নেবার যোগ্যতা) এর অধিকারী থাকবে। তার কাছ থেকে জেনে নেবে মাসআলাটি কি হবে? এখন তাক্বী সাহেব আমাদেরকে বলুন, 'উলুল আমর'-এর অর্থ কি? মুজতাহিদ না মুক্বাল্লিদ? যদি 'মুজতাহিদ' উদ্দেশ্য হয় তবে- মুজতাহিদ কি দুই প্রকারের হয়ে থাকে? 'আহলে ইস্তিম্বাত' এবং 'গায়ের আহলে ইস্তিম্বাত'? কক্ষনই হতে পারে না।
এখন এ আয়াতটির শানেনুযূল শুনুন: “মদীনা মুনাওওয়ারাহতে গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, রসূলুল্লাহ তাঁর পবিত্র সহধর্মিনীগণকে তালাক দিয়েছেন। উমার-এর কাছে যখন এ খবর পৌঁছল তখন তিনি স্বয়ং রসূলুল্লাহ-এর কাছে গেলেন এবং বিশ্লেষণের পরে আমাদেরকে এ কথা বললেন যে, এ গুজব মিথ্যা। এরপর উমার বলেন: ফাকুনতু আনা আসতামবাত্তু যালিকাল আমরা। “এই খবরের ইস্তিম্বাত আমিই করেছিলাম।” এই শানে নুযূলকে সামনে রেখে বলা যায় যে, সেটা সংবাদ বা খবর সংক্রান্ত ছিল যার পর্যালোচনা করা হয়েছিল অথবা মাসআলা ছিল- যে সম্পর্কে ফাতাওয়া জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।
ভুল ধারণা- ১২: অন্যত্র আল্লাহ বলেন: ফালাওলা নাফারা মিন কুল্লি ফিরকাতিম মিনহুম তয়িফাতুল লিয়াতাফাক্কাহু ফিদ দ্বীনি ওয়ালি ইউনযিরু ক্বাওমাহুম ইযা রাজাউ ইলাইহিম লাআল্লাহুম ইয়াহযারুন।
"তাদের প্রত্যেক গোত্র থেকে একটি ছোট দল এই উদ্দেশ্যে কেন বের হলো না যে, তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে ফিরে আসত এবং নিজেদের গোত্রকে সতর্ক করত, যেন, লোকেরা (আল্লাহর নাফরমানি করা থেকে) বিরত থাকে।" [তাওবা : ১২২ আয়াত]
এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট হয়, ইলমে দ্বীন অর্জনকারীদের জন্য এটা জরুরী যে, নিজের গোত্রে ফিরে এসে তারা দ্বীন ও শরী'আতী আহকামের মধ্যে নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখবে। তাছাড়া ঐ গোত্রের জন্যও এটা জরুরী যে, তারা ঐ আলেমদের দ্বারা উপস্থাপিত মাসায়েলের উপর বিশ্বাস করে আমল করবে।
সংশোধন: এ আয়াতের দাবীর উপর এখনো আমল করা যেতে পারে, নাকি পারে না? যদি আমল করা যায়, তবে সেক্ষেত্রে এ যামানায় যেসব (জীবিত) আলেম আছেন তাদের তাক্বলীদ হয়, নাকি মৃত চার ইমামের তাক্বলীদ হয়? মূলত আয়াতটি দ্বারা তো আপনাদের তাক্বলীদই খণ্ডন হয়। আপনারা তো ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার এই আয়াত দ্বারাই আপনাদের দৃষ্টিতে ইজতিহাদের দরজা খুলে রেখেছেন।
ভুল ধারণা- ১৩: অন্যত্র আল্লাহ বলেন: ওয়াত্তাবিউ সাবিলা মান আনাবা ইলাইয়্যা। "ঐ লোকদের রাস্তার অনুসরণ কর যারা আমার দিকে ঝুঁকে আছে।"
এ আয়াতে এটা বলা হয় নাই যে, আমার পথের অনুসরণ কর। কেননা, আল্লাহর আনুগত্যের রাস্তাকে ঠিক ঐভাবে বোঝা যেভাবে ঐ রাস্তাকে বোঝা উচিৎ। এটা প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব না। এজন্যে এই পথ নির্দেশনার জন্য যে ব্যক্তির মন-প্রাণ আল্লাহর দিকে ঝুঁকে আছে এবং আল্লাহর পছন্দ-অপছন্দকে বুঝার জন্য নিজের যিন্দেগীকে বিলিয়ে দিয়েছে- তার আনুগত্য করার মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য হয়ে যাবে। (ফারান, পৃ:১৪)
সংশোধন: ১. প্রত্যেক মু'মিনই আল্লাহর দিকে ঝুঁকে থাকে। তাফসীরে ইবনে কাসিরে "মান আনাবা ইলাইয়া" এর তাফসীরে মু'মিনগণকে বলা হয়েছে। সুতরাং তাক্বী সাহেবের বর্ণনানুযায়ী আয়াতের অর্থ হয়, সকল মু'মিনের তাক্বলীদ করা উচিৎ (ব্যক্তি বিশেষ মু'মিনের নয়)। এ থেকে তাক্বলীদে শাখসী প্রমাণিত হয় না। ২. আয়াতটির দাবী হল, “যারা আল্লাহর রাস্তার অনুসরণ করে”। কিন্তু তাক্বী সাহেব এর ব্যাখ্যা নিয়েছেন “আল্লাহওয়ালাদের অনুসরণ কর।” রাস্তার উপর চলতে চলতে তো তারা ভুল করতে পারে। কেননা, প্রত্যেক মানুষ ভুল-ত্রুটির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যে রাস্তার উপর তারা চলছে- তা ভুল নয়। সুতরাং আয়াতটিতে ইসলামের উপর চলার হুকুম রয়েছে, 'তাক্বলীদে শাখসী' বা ব্যক্তি বিশেষকে (মৃত ইমামের) অনুসরণ নয়। ৩. আয়াম্মিয়ে দ্বীন তাক্বলীদ করতে নিষেধ করেছেন। এ কারণে তাদের রাস্তার অনুসরণ হল- তাক্বলীদ না করা।
টিকাঃ
৪৯. বইটির বাংলা অনুবাদের আলোচ্য আয়াতের পর্যালোচনায় তাক্বী সাহেব নিজের বক্তব্য উল্লেখ করার পর ইমাম রাযী ও নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালীর উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
৫০. সূরা নিসাঃ ৮৩ আয়াত।
৫১. সহীহ : সহীহ মুসলিম- কিতাবুত তালাক।
৫২. তাক্বী উসমানী সাহেবের উর্দু বইটির বাংলা অনুবাদ 'মাযহাব কি ও কেন?' এর ২২-২৪ পৃষ্ঠার আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পূনরায় বলতে হচ্ছে- এ আয়াতটি একটি ঘটনা বা মাসআলার সত্যতা নির্ণয়ের তাহক্বীকু (বিশ্লেষণ) সংক্রান্ত ছিল।
৫৩. তাক্বী সাহেবের বাংলা অনুবাদটিতে আমরা এ পর্যায়ে আবূ বকর জাসসাস -এর উদ্ধৃতিও পেয়েছি।
৫৪. সূরা লুকমান: ১৫ আয়াত।
৫৫. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বলেছেন: "তুমি আমার তাক্বলীদ করো না; মালিক, শাফে’য়ী, আওযা’য়ী, সাওরী এদেরও তাক্বলীদ করো না। বরং তাঁরা যেখান থেকে (সমাধান) গ্রহণ করেন তুমি সেখান থেকেই তা গ্রহণ কর।"
৫৬. ইমাম আবূ হানিফা বলেছেন: "হাদীস বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হলে ওটাই আমার মাযহাব।" (ফাতাওয়ায়ে শামী)