📄 কুরআ’ শব্দের অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তি
ভুল ধারণা- ৪: তাক্বী সাহেব লিখেছেন, কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ "যে নারীদেরকে তালাক্ব দিয়েছো তারা তিন কুরু' শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।"২৭
এখানে তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। এজন্যে 'তিন কুরু' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কুরু'-এর আরবী অর্থ "হায়েয' ও 'তুহর' (পবিত্রতা) উভয়, ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়। যদি প্রথমটি অর্থ হিসাবে নেয়া হয় তবে আয়াতের অর্থ হবে, তালাকপ্রাপ্তার-ইদ্দত (সময়সীমা) তিনটি ঋতুস্রাব (মাসিক)। আর যদি অন্যটির অর্থ নেয়া হয়, তবে তা তিনটি পবিত্র অবস্থা নির্দিষ্ট করে। এ অবস্থায় আমাদের জন্য এতটাই জটিলতার সৃষ্টি করে যে, আমরা এই দু'টি অর্থের কোনটির উপর আমল করব? (ফারান, পৃঃ ১২)
সংশোধন: যদি তাক্বী সাহেবের কথাকে সহীহ হিসাবে মেনে নিই, তবে তো প্রমাণিত হয় দ্বীনের মধ্যে খুবই জটিলতা রয়েছে। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সেগুলো পরিষ্কারভাবে সমাধান না দিয়ে গায়রুল্লাহর উপর এর সমাধানের দায়িত্ব দিয়েছেন।
এই জটিল বিধান যদি ফরয হয়ে থাকে, তবে কি এর সমাধান আল্লাহ'র অহীতে নেই? হাঁ, অবশ্যই আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: إِذَا أَتَى قُرْؤُكَ فَلَا تُصَلَّى فَإِذَا مَرَّ قُرْؤُكَ فَتَطَهَّرِي ثُمَّ صَلَّى مَا بَيْنَ الْقُرْءِ إِلَى الْقُرْءِ
“(হে মুসলিম নারীগণ!) যখন তোমাদের কুরু' আসে তখন সালাত আদায় করো না। আর যখন কুরু' চলে যায় তখন গোসল কর এবং পূনরায় এক কুরু' থেকে অন্য কুরু'র মধ্যবর্তী সময়ে সালাত আদায় করতে থাক।”২৮
আসল কথা হল, কুরু'-এর ব্যাখ্যা স্বয়ং হাদীসে মজুদ আছে। অর্থাৎ কুরু' অর্থ হায়েয। আর এটাতো হানাফীদের পক্ষাবলম্বন করে।
[সংযোজন: “সালাফগণ কুরু'র দু'টি অর্থই গ্রহণ করেছেন। এ কারণে দু'টি অর্থই গ্রহণযোগ্য।”২৯ আল্লাহ বলেন: فطلقوهُنَّ لعدتهنَّ "তাদেরকে ইদ্দাতের মধ্যে তালাক দাও।” (সূরা তালাক: ১ আয়াত) এখানে لعدتهن শব্দে লাম তাওক্বীত (لام توقیت)এর জন্য। অর্থাৎ لأول অথবা لاستقبال عدتهন ('ইদ্দাতের শুরুতে) তালাক দাও .... অর্থাৎ যখন স্ত্রী হায়েয থেকে পবিত্র হয়ে যাবে তখন তার সাথে সহবাস না হওয়া অবস্থায় তালাক দাও।.... পবিত্রাবস্থা ঐ 'ইদ্দাতের প্রারম্ভিক অবস্থা।৩০
উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, তালাকু দিতে কুরু' শব্দের ব্যবহার হায়েয ও তুহর দু'টি ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। এক্ষেত্রে তালাক্বাদাতা সুন্নাতপন্থায় তালাকু দেবার ইচ্ছা করলে তার স্ত্রীকে (সূরা তালাকু অনুযায়ী) তুহরের (পবিত্রাবস্থার) প্রথম দিনেই তালাক দিবে যখন সে হায়েয (ঋতুস্রাব) থেকে পবিত্র হয়েছে। এই তুহরে সে স্ত্রীর সাথে মিলবে না এবং (সূরা বাক্বারাহ অনুযায়ী) পরবর্তী হায়েয সম্পূর্ণ শেষ হওয়া এক একটি কুরু' হিসাবে গণ্য হবে। ফলে শাব্দিক ভাবে কুরু' শব্দটির অর্থ (হায়েয না। তুহর/পবিত্রাবস্থা) নিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মাযহাবীগণ যুক্তি দেখান তার নিরসণ হয়। - অনুবাদক]
টিকাঃ
২৭. সূরা বাক্বারাহ: ২২৮ আয়াত।
২৮. সহীহ: আবূ দাউদ- কিতাবুত তাহারাত বারে ফীল মারাতি তুসতাহাযু ওয়ামান কালা তাদাউস সালাতা ফী ইদ্দাতিল আইয়ামিল্লাতী কানাত তাহীযু আয়াতে তাফসীর দ্রষ্টব্য: নার্সবুর রায়াহ ১/২০১-০২ পৃঃ; নাসবুর রায়াতে এ ধরণের কয়েকটি হাদীসের সনদ সম্পর্কে বলা হয়েছে- বর্ণনাকারীগণ সিক্বাহ। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন [তাহক্বীকুকৃত আবূ দাউদ হা/২৮০]
২৯. তাফসীরে ইবনে কাসির, ফতহুল কাদীর সূত্রে সালাহুদ্দীন ইউসুফ, তাফসীরে কুরআনে কারীম উর্দু তরজমা ও তাফসীর (মাদীনা মুনাওওয়ারাহ, বাদশাহ ফাহদ কুরআনে কারীম প্রিন্টিং কমপ্লেক্স, ১৪১৭ হিঃ) পৃঃ ৯৩।
৩০. সালাহুদ্দীন ইউসুফ, তাফসীরে কুরআনে কারীম সূরা তালাক্কের.. ১ আয়াতের টিকা দ্রঃ।
📄 ঝগড়া চাঁদের হাদীস নিয়ে সংশয় নিরসন
ভুল ধারণা- ৫: একটি হাদীসে নবী ﷺ বলেছেন: من لم يترك المخابرة فليأذن بحرب من الله ورসوله “বর্গা ব্যবস্থা যে পরিহার করে না তার বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে রাখ।” (আবু দাউদ)৩১
এখানে বর্গাপ্রথাকে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু বর্গাচাষের অনেকগুলো পদ্ধতি আছে। হাদীসটি এ বিষয়ে নিরব রয়েছে যে, বর্গাপ্রথার কোন পদ্ধতিটি নিষিদ্ধ?
সংশোধন: হাদীসে তো সুস্পষ্টভাবে এই বিষয়টি রয়েছে যে, কোন পদ্ধতির বর্গাচাষ হারাম এবং কোনটি হালাল। যদি তাক্বলীদের কারণে সেটা আপনাদের চোখে না আসে তবে তা ভিন্ন বিষয়।
১) রাফে' বিন খাদিজ বলেছেন: كُنَّا نُكْرِى الْأَرْضُ عَلَى أَنْ لَنَا هَذِهِ وَلَهُمْ هَذِهِ فَرُبَّمَا أَخْرَجَتْ هَذِهِ وَلَمْ تُخْرِجْ هَذِهِ فَنَهَانَا عَنْ ذَلِكَ وَأَمَّا الْوَرِقُ فَلَمْ يُنْهَنَا
"আমরা যমিনকে এই শর্তে ভাড়া দিতাম যে, এই অংশে উৎপন্ন ফসল আমার এবং ঐ অংশে উৎপন্ন ফসল জমি চাষকারীর। ফলে কখনো এই অংশে ফসল উৎপন্ন হত আবার কখনো হত না। এ কারণে রসূলুল্লাহ এই জাতীয় বন্টনকে নিষেধ করলেন, কিন্তু অর্থের বিনিময়ে ভাড়া প্রদান নিষেধ করেন নাই।" (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম- শব্দগুলো সহীহ মুসলিমের)৩২
কেননা প্রথমোক্ত পদ্ধতিতে কোন একপক্ষের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকত। এ কারণে ঐ জাতীয় পদ্ধতি নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে অথবা উৎপাদনকারীকে (উৎপাদিত ফসলের) কোন অংশের বিনিময়ে জমি ভাড়া দেয়া নিষেধ করেন নাই।৩৩
[সংযোজন: মূলত অর্থের বিনিময় বা উৎপাদিত ফসলের অংশের বিষয়টিও ফসল উৎপাদনের সাথেই সম্পৃক্ত। ফসল যদি ঐ জমিতে উৎপাদিতই না হয় বা ধ্বংস হয়ে যায়- সেক্ষেত্রেও ভাড়া হিসাবে নির্ধারিত আর্থিক মূল্য অথবা সুনির্দিষ্টভাবে ফসলের অংশবিশেষ নেয়াটা হাদীসের প্রথমাংশের দাবীনুযায়ী সুদ হবে। তাছাড়া রাফে' বিন খাদিজ বর্ণিত হাদীসগুলোতে স্বর্ণ, রৌপ্য বা অর্থের বিনিময়ে বর্গাচাষের নিষেধাজ্ঞাও বর্ণিত হয়েছে। বর্গা চাষ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণগুলো পরবর্তী ২ ও ৩ নং হাদীস দ্বারা আরো সুস্পষ্ট হয়। -অনুবাদক।]
২) রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: فَأَمَّا شَيْءٌ مَعْلُومٌ مَضْمُونَ فَلَا بَأْسَ بِه "কিন্তু যখন ভাড়ার পরিমাণ নির্ধারণ ও স্পষ্ট করে নেবে তখন জমি ভাড়া দেয়াতে কোন গোনাহ নেই।” [সহীহ মুসলিম- কিতাবুল বুয়ু' বাবে কিরাউল আরদ্বি বিযযাহাবি ওয়াল ওয়ারিকি]
[সংযোজন: ভাড়ার পরিমাণ নির্ধারণ ও স্পষ্ট করার ব্যাখ্যা নিম্নরূপ: ক) রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَنْ أَسْلَفَ فِي تَمْرٍ فَلْيُسْلِفْ فِي كَيْلٍ مَعْلُومٍ وَوَزْنِ مَعْلُومٍ إِلَى أَجَلٍ مَعْلُومٍ "যে কেউ অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় করবে, তাকে নির্ধারিত পরিমাপে বা নির্ধারিত ওজনে এবং নির্ধারিত মেয়াদে তা করবে।" [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম]
এই হাদীসটি থেকে বুঝা গেল, ফসল উৎপাদনকে শর্ত করাটাও এক প্রকার কিরা' (ক্রা) বা ভাড়া। আবার শর্ত সাপেক্ষে (ওজন বা পরিমাণ এবং সময়সীমা নির্ধারণ করে) বাগানের ফলের অগ্রিম বিক্রয়ও বৈধ। সুতরাং ফল-ফসল অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় এবং জমির ভাড়ার বিধান দু'টি পরস্পরের পরিপূরক। (অনুবাদক) সহীহ: মিশকাত (এমদা) ৬/২৭৫৮ নং।
পূর্ববর্তী ২ নং দ্বারা জমি ভাড়ার স্পষ্টতা এবং আলোচ্য 'ক' নং দ্বারা বাগানের ফলের অগ্রিম বিক্রয়ের লেনদেনের স্পষ্টতা থেকে তাদের মধ্যে শর্তগত সাদৃশ্যতা পাওয়া গেল। কেননা যদি কোন জমি একবছরের জন্য ভাড়া দেয়ার ছয় মাস পর কোন প্রাকৃতিক কারণে নদী গতিপথ পরিবর্তন করে জমিটির উপর দিয়ে চলে যায়, বা নদীর ভাঙনের কারণে, বা জমিটি বন্যায় নিমজ্জিত হয়- তখন কিভাবে ঐ জমির পরবর্তী ছয় মাসের ভাড়া বৈধতা পাবে?
খ) রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: أَرَأَيْتَ إِذَا مَنَعَ اللَّهُ الثَّمَرَةَ بِمَ يَأْخُذُ أَحَدُكُمْ مَالَ أَخِيهِ "আল্লাহর সৃষ্ট মড়কে যদি ফল বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে মুসলিম ভাই হতে কিসের বিনিময়ে টাকা আদায় করবে।" [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম।৩৪
এই শর্তটি অগ্রিম বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে সেটা যেভাবে ইনসাফের হয়, তেমনি জমি ভাড়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও ইনসাফের হয়। যদি একটি লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় এবং অন্যটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হয়- তাহলে কি উভয় লেনদেনকেই ইনসাফ বলা যাবে? কক্ষণো না। কেননা উভয় লেনদেনের সংশ্লিষ্টদের মধ্যকার লাভ-ক্ষতির চূড়ান্ত ফলাফল একই।
গ) রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: نَهَى رسول الله ﷺ عَنْ بَيْعِ السِّنِينَ وَأَمَرَ بِوَضْعِ الْحَوَائِحِ "রসূলুল্লাহ নিষেধ করেছেন কয়েক বছরের জন্য অগ্রিম বিক্রি করতে এবং তিনি নির্দেশ দিয়েছেন আহরণের পূর্বে যা বিনষ্ট হয় তার মূল্য কর্তন করতে।” [সহীহ মুসলিম]৩৫
রসূলুল্লাহ ﷺ যে কারণে কয়েক বছরের অগ্রিম বিক্রি নিষিদ্ধ করেছেন সেই কারণটি ভাড়া জমির ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। উপরোক্ত শর্তগুলো আরোপের কারণ হল, যে কোন একটি পক্ষ যেন একতরফা লাভ বা ক্ষতির শিকার না হয়। আর এটিই হল ইসলামী লেনদেনের একটি মূলনীতি। যা লঙ্ঘণ করা প্রকারান্তরে সুদের লেনদেনকেই প্রতিষ্ঠিত করে।
যদি জমি ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে উক্ত নীতিমালাগুলো একইভাবে প্রয়োগ করা না হয়, তাহলে জমিতে ফসল না হলে কি জমির ভাড়াগ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না?৩৬ লক্ষণীয়, জমি বর্গার ১নং হাদীসটিতে ভাড়ার ক্ষেত্রে নবী ﷺ যা নিষেধ করেছেন তা হল: জমির একাংশের উৎপন্নের বিনিময়ে জমির অন্য অংশে চাষাবাদ করা। এক্ষেত্রে কোন একপক্ষের নির্ধারিত অংশে অনেক সময় ফসল না হলে সেই পক্ষ সম্পূর্ণরূপেই ক্ষতিগ্রস্ত হত। এ কারনেই নবী তা নিষেধ করেছেন। এ পর্যায়ে অর্থের বা সোনা-রূপার বিনিময়ে যদি জমির মালিকের জন্য ভাড়ার অর্থ নিশ্চিত করা হয় এবং কৃষকের উৎপাদন শূন্য হয়, তাহলে কিভাবে ঐ ভাড়ার অর্থ জায়েয হবে? অথচ অগ্রিম বাগানের ফল ক্রেতা বা বিক্রেতাকে তাদের ক্রয় বা বিক্রয়ের বেশী বা কম ফল উৎপাদিত হলে বা কিছুই না হলে নবী বিষয়টি পূর্বোক্ত (খ ও গ নং) হাদীসগুলোর নীতিমালা দ্বারা সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন। জমি ভাড়া ও বাগানের ফল বিক্রির পদ্ধতির মধ্যে সাদৃশ্যতাই একটি অপরটির ব্যাখ্যা হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে। সুতরাং এ পর্যায়ে জমি ভাড়ার সহীহ মুসলিমের পূর্বোক্ত ২নং হাদীসের নীতিমালাও সেটাই যা অগ্রিম বাগানের ফসল সম্পর্কে পূর্বের ক, খ ও গ-এ বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া ইয়াহুদীদের খায়বার সম্পর্কীত সামনে বর্ণিত ৩নং হাদীসটিও প্রমাণ করে বর্গা চাষের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। এমনকি স্বয়ং ইয়াহুদীগণও নবী ﷺ এর জমি চাষের আধাআধি পদ্ধতি এবং তা আদায় সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিল তা হল: هَذَا الْحَقُّ وَبِهِ تَقُومُ السَّمَاءُ "এটাই হক্ক, আর এ কারণেই আসমান-যমীন প্রতিষ্ঠিত আছে।"৩৭ তাছাড়া অগ্রিম বাগানের ফসল সংক্রান্ত হাদীসগুলো সুস্পষ্ট করে, ব্যবসায়ীক পণ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়পক্ষের লাভ ও ক্ষতিকে মূল্যায়ন করতে হবে।৩৮
যদি বাকীতে ব্যবসায়িক পণ্য বিক্রি করা হয় তবে অবশ্যই বাকীদাতা বাকীগ্রহীতা ব্যবসায়ী ব্যক্তির লাভ ও ক্ষতিকে মূল্যায়ন করবেন।৩৯ কেবল পণ্য বাকীতে দিয়ে লাভ-ক্ষতির অংশ শরীক না হয়ে সম্পূর্ণ বিক্রয়ের টাকা দাবী করাটা প্রকারান্তরে টাকা ঋণ দিয়ে ঋণের অতিরিক্ত টাকা আদায় করার মতই একই ধরণের সুদ হিসাবে গণ্য। এভাবে ইসলামী ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীকে দেয়া পণ্য বিক্রির নামে সুদকে মুনাফা বলে হালাল গণ্য করছে। অথচ একজন ব্যবসায়ী লাভ-লোকসানের অনেকগুলো স্তর অতিক্রম করে। এ পর্যায়ে ব্যবসায়ীকে দেয়া ঋণ লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে বণ্টন না করে ঋণ দেয়া পণ্যের বিনিময়ে অতিরিক্ত নির্ধারিত আয়ই সুদ। পণ্য ঋণ দেয়ার কারণে তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ হবে মুনাফা, আর টাকার ঋণের অতিরিক্ত আদায়কে বলা হবে সুদ -এমন ধারণা ইসলামে নেই। বরং যে কোন ঋণ থেকে অর্জিত মুনাফা- তা টাকা (রিবা আন-নাসিয়াহ) বা পণ্য (রিবা আল-ফাদল) আকারে দেয়া হোক না কেন উভয়টি ইসলাম ঘোষিত হারাম সুদ। মুনাফা সেটাই যার মধ্যে লাভ-ক্ষতির অংশ রয়েছে। আর যে কোন ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত আয়ই সুদ, সেটা টাকা হোক বা পণ্য। প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক লেনদেনের বিরুদ্ধে মৌলিক নীতিমালা সম্পর্কীত হাদীসগুলোর দু'টি নিম্নরূপ:
১) আমর বিন শু'আয়েব তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَخِلُّ سَلَفَ وَبَيْعٌ وَلَا শَرْطَانِ فِي بَيْعٍ وَلَا رِبْحُ مَا لَمْ يُضْمَنُ وَلَا بَيْعُ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ .
"ঋণ এবং ক্রয়-বিক্রয় একসঙ্গে জায়েয নয়। এক বিক্রয়ের সঙ্গে দু'টি শর্ত জুড়ে দেওয়াও জায়েয নয়। যে বস্তুর খেসারতের দায়িত্ব বর্তে না, তার লাভের অধিকার হাসিল হবে না। আর যেই বস্তু তোমার হস্তগত নয়, তা বিক্রি করা জায়েয না।" (তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী। ইমাম তিরমিযী বলেছেন: এই হাদীসটি সহীহ)৪০
২) 'উবাদাহ বিন সামিত বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ وَالسَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ وَالْمَلْحُ بِالْمِلْحِ مِثْلاً بِمِثْلٍ سَوَاءً بِسَوَاءٍ يَدًا بِيَدِ فَإِذَا اخْتَلَفَتْ هَذِهِ الْأَصْنَافُ فَبِيعُوا كَيْفَ শِئْتُمْ إِذَا كَانَ يَدًا بيد
"সোনার সাথে সোনার, রূপার সাথে রূপার, গমের সাথে গমের, যবের সাথে যবের, খেজুরের সাথে খেজুরের এবং লবণের সাথে লবণের যেমনকার তেমন, সমান সমান ও হাতে হাতে বিনিময় হওয়া উচিত। তবে যদি বিভিন্ন জাতের বস্তুর পরস্পরের সাথে বিনিময়ের ব্যাপার হয়, তাহলে যেভাবে ইচ্ছা বিক্রি করো কিন্তু এক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, লেনদেন হাতে হাতে (নগদে) হতে হবে (বাকী বা ঋণে হবে না)।" (সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৬/২৬৮৪ নং)- অনুবাদক।
৩) রসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে:
أَنَّهُ أَعْطَى خَيْبَرَ الْيَهُودَ عَلَى أَنْ يَعْمَلُوهَا وَيَزْرَعُوهَا وَلَهُمْ শَطْرُ مَا يَخْرُجُ مِنْهَا
"তিনি খয়বরের ইয়াহুদীদেরকে এই শর্তে যমীন (ভাড়া) দিলেন যে, তারা এর মধ্যে চাষাবাদ করবে। আর এখানে যাকিছু উৎপন্ন হবে তাতে তারা অর্ধেক পাবে।” [আহমাদ, আবূ দাউদ, নাসায়ী ২/১৩৫ পৃঃ, হাফিয যাহাবী বলেছেন: এর বর্ণনাকারীগণ সিক্বাহ (নায়লুল আওতার ৫/২৩৬ পৃঃ)।]
আসল বিষয় হল, এ জাতীয় অসংখ্য হাদীস আছে। যদি আপনাদের চোখে না পড়ে তবে তার চিকিৎসা তো একটাই। আর সেটা হল, তাক্বলীদ ছেড়ে দিন, তখন দেখবেন যে, সবকিছুই আপনার চোখে ধরা দেবে আর কোন কিছুতেই জটিলতা দেখবেন না।
টিকাঃ
৩১. মূলত আবু দাউদের (কিতাবুল বয়'- বাবে ফিল মুখাবারাহ) বর্ণনাটি হল : مَنْ لَمْ يَذَرٍ الْمُخَابَرَةَ فَلْيَأْذَنَ بِحَرْبِ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ; আলবানী হাদীসটিকে য'য়ীফ বলেছেন। (তাহক্বীকুকৃত আবূ দাউদ হা/৩৪০৮) তবে তাহাবী তাঁর 'মা'আনিল আসারে' (৪/১০৭) ইয়াহইয়া ইবনে মু'য়ীন থেকে অনুরূপ মর্মে হাদীস এনেছেন। হাকিম (২/৮৬) এটিকে সহীহ মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবী চুপ থেকেছেন। [শায়েখ যুবায়ের আলী ঝাই, তাহক্বীকুকৃত উর্দু আবু দাউদ (দারুস সালাম) ৩/৩৪০৬ নং হাদীসের টিকা।
৩২. সহীহ: মিশকাত (এমদা) ৬/২৭৫৮ নং।
৩৩. মূলত অর্থের বিনিময় বা উৎপাদিত ফসলের অংশের বিষয়টিও ফসল উৎপাদনের সাথেই সম্পৃক্ত। (অনুবাদক।]
৩৪. সহীহ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাত (এমদা) ৬/২৭১৬ নং।
৩৫. সহীহ: মিশকাত (এমদা) ৬/২৭১৭ নং।
৩৬. "নগদ টাকায় জমি লাগানো" এবং "নগদ মূল্যে জমি লাগানো নিষিদ্ধ” সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুনঃ ড. ইউসুফ আল-কারযাভী, ইসলামে হালাল হারামের বিধান (ঢাকা: খায়রুন প্রকাশনী, আগষ্ট'২০১০) পৃঃ ৩৮৬-৯২ পৃ:।
৩৭. হাসান: ইবনে মাজাহ- কিতাবুল বুয়ু বাবে খারসুল নাখলি ওয়াল ইনাবি। আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত ইবনে মাজাহ, হা/১৮২০]
৩৮. বিস্তারিত: হিফযুর রহমান, ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মার্চ'২০০০) "বাণিজ্যিক সুদ” পৃঃ ২১৯।
৩৯. কেউ বলতে পারেন ইসলামী ব্যাংক মূলত বিক্রয় করে। পরবর্তীতে গ্রাহকের অনুরোধে কিস্তির মাধ্যমে ঋণের ব্যবস্থা করে। সুতরাং তারা তো তার সাথে ব্যবসায় করছে না বরং বিক্রয় করছে, ফলে এক্ষেত্রে ঋণ সংঘটিত হলেও বিক্রয় হওয়াই তা সুদ নয়, বরং এটা মুনাফা। এ প্রক্রিয়াই একজন ভোক্তা- যিনি তাৎক্ষণিক পণ্যটি ব্যবহার করছেন, তার ক্ষেত্রে বিক্রয়ের এই পদ্ধতিটি গ্রহণযোগ্য (যদি এক বিক্রিতে দুই বিক্রির বা শর্ত না থাকে)। কেননা তিনি তখনই পণ্য থেকে ফায়দা নিচ্ছেন। পক্ষান্তরে একজন ব্যবসায়ী, লাভ-ক্ষতির অনেকগুলো স্তর অতিক্রম করা ছাড়া ক্রয়কৃত পণ্য থেকে ফায়দা ভোগ করতে পারেন না। এ কারণে নবী ﷺ পূর্বোক্ত বাগানের ফল অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়কে ভোক্তার কাছে বিক্রয় হিসাবে গণ্য করেন নি। বরং ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রয় হিসাবে গণ্য করেছেন। ফলে ফল-ফসলের নির্ধারিত সময় ও ওজন নির্ধারণ করতে বলেছেন। পরিশেষে কমবেশী হলে তারও সমাধান দিয়েছেন। এ থেকে সুস্পষ্ট হয়, নবী ﷺ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রয়ের ৰেত্রে নীতিমালা পৃথক করেছেন। অর্থাৎ ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রয় করলে তার সাথে লাভ-ক্ষতির অংশে শরীক হওয়া ছাড়া বিক্রয়টি বৈধতা পাবে না। যা পরবর্তীতে বর্ণিত আমার বিন শু'আয়েবের হাদীসটি দ্বারা সুস্পষ্ট হবে।
৪০. হাসানঃ মিশকাত (এমদা) ৬/২৭৪৫ নং। আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত মিশকাত ২/২৮৭০ নং
📄 ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ
ভুল ধারণা- ৬: একটি হাদীসে নবী ﷺ বলেছেন: مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٍ فَقِرَاءَةَ الْإِمَامِ لَهُ قِرَاءَة "যার কোন ইমাম আছে, ইমামের ক্বিরাআত তারই ক্বিরাআত।” [ইবনে মাজাহ]
এ থেকে বুঝা যায় যে, সালাতের মধ্যে যখন ইমাম ক্বিরাআত করেন তখন মুক্তাদী চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে।
অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: لا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأُ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ "যে সূরা ফাতিহা পাঠ করে না তার সালাত নেই।" [সহীহ বুখারী]
এই হাদীসটি থেকে বুঝা যায় যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা জরুরী। এ দু'টি হাদীসকে সামনে রাখলে এ জটিলতার সৃষ্টি হয়। প্রথম হাদীসটিকে মৌলিক হিসাবে গণ্য করলে বলা যায়, দ্বিতীয় হাদীসটি ইমাম ও মুনফারিদ৪১ সম্পর্কীত এবং মুক্তাদী থেকে আলাদা। আবার দ্বিতীয় হাদীসটিকে মৌলিক হিসাবে গণ্য করলে বলা যায় যে, প্রথম হাদীসটির অর্থ হল, সূরা ফাতিহা ছাড়া অন্য সূরা (ইমামের পাঠ করাই মুক্তাদীর জন্য যথেষ্ট) এবং সূরা ফাতিহা তা থেকে ভিন্ন (অর্থাৎ মুক্তাদীকে ফাতিহা পাঠ করতে হবে)। (ফারান, পৃঃ ১২-১৩)
সংশোধন: এর প্রথম জবাব হল, দ্বিতীয় হাদীসটি সহীহ মুত্তাসিল সনদযুক্ত। পক্ষান্তরে প্রথমটি মুরসাল হওয়ার কারণে য'য়ীফ। একারণে প্রথমটি দ্বিতীয়টির মোকাবেলায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সহীহ হাদীসটির উপরই আমল করতে হবে।৪২
দ্বিতীয় জবাব হল, যে দু'টি পদ্ধতি আপনি প্রস্তাব করেছেন তারও সমাধান নিম্নোক্ত হাদীসে রয়েছে।
রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: وَلَا تَقْرَءُوا بِশَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ إِذَا جَهَرْتُ إِلَّا بِأَمِّ الْقُرْآنِ
"যখন আমি যেহরী ক্বিরাআত করি তখন কুরআন থেকে কিছুই পাঠ করো না- তবে সূরা ফাতিহা ছাড়া। (আবূ দাউদ ১/১২৬ পৃঃ, নাসায়ী, দারা কুতনী পৃ: ১২১- তিনি বলেছেন: বর্ণনাকারী সবাই সিক্বাহ) অন্য বর্ণনায় আছে: لا صلوة لمن لم يقرأبها
"কেননা সূরা ফাতিহা ছাড়া সালাতই হয় না।” (আবূ দাউদ, তিরমিযী)
এই হাদীস বিভিন্ন সাহাবীদের থেকে অনেকগুলো সনদে বর্ণিত হয়েছে এবং এর শুদ্ধতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। এ সমস্ত হাদীস উপস্থাপনার মাধ্যমে তাক্বী সাহেবের এ সম্পর্কে পূর্বোক্ত সংশয় খণ্ডিত হল। অর্থাৎ মুক্তাদীকে যেহরী ক্বিরাআতে সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে। দ্বিতীয় সূরাটি পাঠ করতে হবে না। যদি এর ব্যাখ্যা হাদীসে না থাকে, তবুও কি কারো জন্য এটা বৈধ হবে যে, সে নিজের তরফ থেকে কোন নিয়ম নির্দিষ্ট করবে। যদি এটা করা যায় তবে তো- এ শরী'আত মনগড়া হয়ে যাবে। আর এটা তো শিরক। তাছাড়া হাদীসে বিদ্যমান ব্যাখ্যা ছাড়া যদি অন্য কোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয় তবে তা দ্বীনের বিকৃতি হয়, যা সুস্পষ্ট কুফরী। এ কারণে এর মাসআলায় হানাফীগণ শিরক ফিত-তাশরি'য়ী ও দ্বীনের বিকৃতি তথা কুফর- এই দু'টি দোষেই দোষী হয়।
টিকাঃ
৪১. মুনফারেদঃ একাকী সালাত আদায়কারী।
৪২. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: "ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ ও মাসায়েলে সাকতা" [-সঙ্কলক: কামাল আহমাদ, আতিফা পাবলিকেশন্স, ঢাকা]।