📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 শরী‘আতের বিকৃতি ‘বড় কুফ্র’

📄 শরী‘আতের বিকৃতি ‘বড় কুফ্র’


ফারান: মাহারুল কাদিরী সাহেব লিখেছেন: "আমাদের মতে নওয়াব মুহিউদ্দীন সাহেব যখন হানাফী ছিলেন তখনও তিনি মুসলমান' ছিলেন।" (ফারান, জুন- ১৯৬৪, পৃঃ ২৯)

জবাব: "মুক্বাল্লিদ (অন্ধ ব্যক্তিপূজারী) যে একজন মুসলিম- মাহারুল ক্বাদিরী সাহেব তা প্রমাণ করতে পারেন নাই। তাহলে এটা কিভাবে মানা যাবে যে, "তিনি যখন হানাফী ছিলেন তখন মুসলিমও ছিলেন।" "তালাশে হজ্বে" এটা প্রমাণ করা হয়েছে যে, তাক্বলীদ (ব্যক্তিপূজা) শিরক। সুতরাং হানাফী হবার কারণে ঈমান যে ক্ষতিগ্রস্ত হলো তা সুস্পষ্ট। আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধী ফিক্বহী মাসায়েল মানা, সুন্নাতের বদলে এর স্থানে বিদ'আতী তরীক্বা প্রচলন করা, উম্মাতের মধ্যে চারটি ফিরক্বার সৃষ্টি হওয়া এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধ ও লড়াইয়ের ঘটনা ঘটা, ফিকাহর নিজস্ব কৃত্রিম মাসায়েলকে 'শরী'আতে ইলাহী মনে করা, বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল করা কি দ্বীন ও ঈমানের ক্ষতি নয়?

টিকাঃ
২ মাহারুল কাদিরী সাহেব 'মুসলিম'-কে মুসলমান লিখেছেন। তাই আমরা 'মুসলমান' শব্দটিই অনুবাদে উল্লেখ করলাম। অন্যথায় আমরা 'মুসলিম” শব্দের প্রয়োগই সহীহ ও যথার্থ মনে করি। কেননা কুরআনে একবচনে 'মুসলিম' ও বহুবচনে 'মুসলিমীন' শব্দটির ব্যবহার আছে। মুসলমান শব্দটি আরবী শব্দ নয়। এটি উর্দু ও বাংলাতে মুসলিম শব্দের ভুল প্রয়োগ। (অনু:)
৩ শিরক, কুফর দুই ভাগে বিভক্ত। কোনটি ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কার করে- যেমন বড় শিরক ও বড় কুফর। আর কোনটি কবীরা গুনাহ- যেমন ছোট শিরক ও ছোট কুফর। যখন কেউ শরী'আতি বিধানের মোকাবেলায় মানব রচিত অথবা আলেমদের নামে ফতোয়া ও মাসায়েল মেনে চলে তথা- (ক) হালাল বা জায়েয মনে করে, (খ) শরী'আতের সুস্পষ্ট বিধানকে অস্বীকার, বিরোধীতা ও বিকৃত ব্যাখ্যা করে- তখন তা তাদেরকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে। যা ইয়াহুদী আলেমদেরও অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন "তাফসীরঃ হুকুম বিগয়রি মা-আনঝালাল্লাহ" অনুবাদ ও সঙ্কলন: কামাল আহমাদ।

📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 সিরাতে মুস্তাক্বীম (সোজা) না মুনহানী (বক্র)?

📄 সিরাতে মুস্তাক্বীম (সোজা) না মুনহানী (বক্র)?


ফারান: 'সিরাতে মুস্তাক্বীম'-তো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ'র নাযিলকৃত 'দ্বীন ইসলাম'। হানাফী, শাফে'য়ী, মালেকী, হাম্বলী ফিক্বহী মাযহাবসমূহ ও মসলকে আহলে হাদীস এই সিরাতে মুস্তাক্বীমের (দ্বীনে হক্ক) মধ্যবর্তী স্থানে। আর দলগুলোর অবস্থান সম্পর্কে বেশীর চাইতে বেশী বলা যায় যে, এগুলো সংকীর্ণ পথ। যা এই সিরাতে মুস্তাক্বীম থেকে সৃষ্টি হয়েছে এবং পুনরায় ঐ স্থানে গিয়েই মিলেছে। এর মধ্যকার কোন মসলকই (দল) বাতিল নয়।

জবাব: মাহারুল কাদিরী সাহেবের কথামত যদি ঐ দলগুলো সিরাতে মুস্তাকীমের সাথে মিলে গিয়ে থাকে তবে কেন তাদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য ও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে, তাছাড়া আজ পর্যন্ত তারা আলাদা-আলাদাই থেকে গেল? সিরাতে মুস্তাকীমে মিলে গেল এবং আলাদা-আলাদাও থাকলো- এটা এক আজব ঘটনা!!

যদি আমি (তর্কের খাতিরে) ধরে নিই, এই মাযহাবগুলো সিরাতে মুস্তাক্বীম থেকে বের হয়ে পুনরায় একত্রে মিলে গেছে, তবে প্রশ্ন আসে যে, তারা কেন বের হল? সোজা রাস্তা ছেড়ে সংকীর্ণ পথে চলল এবং পুনরায় সোজা রাস্তায় এসে মিলল, শেষাবধি এ থেকে লাভবান হবার উদ্দেশ্যইবা কি?

পূণরায় একথাও গভীরভাবে লক্ষণীয়, এই সংকীর্ণ পথগুলো মুস্তাক্বীম (مستقیم -সোজা) না মুনহানী (منحنى -বক্র)। যদি সোজা হয় তবে তো এটা অসম্ভব যে, এক সরলরেখা অন্য সরলরেখার দু'টি স্থানকে ছেদ করে। জ্যামিতির সাধারণ ছাত্র- যে এ ব্যাপারে অনভিজ্ঞ সেও বলবে, এটা হবে না। সুতরাং এই সংকীর্ণ পথগুলো কখনো সিরাতে মুস্তাকীমের সাথে মিলতে পারবে না। আর এই সংকীর্ণ পথগুলো যদি বক্র হয় তবে সুস্পষ্ট যে, সেটা সোজা পথ নয়। এ কারণে এটি সিরাতে মুস্তাক্বীমও নয়। বিস্ময়ের বিষয় হল, মাহারুল কাদিরী সাহেব এই সংকীর্ণ পথগুলোকে হেদায়েত বলে মনে করেন- যদিও হাদীসে এরকম চারটি সংকীর্ণ পথকে গোমরাহীর পথ বলা হয়েছে।

জাবির বিন 'আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমরা নবী ﷺ-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। তিনি প্রথমে একটি সোজা রেখা টানলেন এবং তার ডানদিকে দুটো রেখা টানলেন এবং বাঁ দিকেও দুটো রেখা টানলেন। এরপর তিনি রেখার মধ্যবর্তী স্থানে হাত রেখে বললেন: এই সাবিলুল্লাহ। "এটা আল্লাহর রাস্তা।” অতঃপর এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:

ওয়া আন্না হাযা সিরাতি মুস্তাকিমান ফাত্তাবিউহু ওয়া লা তাত্তাবিউস সুবুলা ফাতাফাররাকা বিকুম আন সাবিলিহি।
"এটাই সিরাতে মুস্তাক্বীম। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করবে এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না। করলে, তা তোমাদের তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে।” (সূরা আন'আম : ১৫৩ আয়াত)

অন্য হাদীসে (সাহাবী ইবনে মাস'উদ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, কুল্লু সাবিলিন মিনহা শয়তানুন ইয়াদউ ইলাইহি। "প্রত্যেক সংকীর্ণ পথের উপর শয়তান রয়েছে যে (লোকদেরকে) নিজেদের দিকে ডাকছে।” [আহমাদ, নাসায়ী, দারেমী, মিশকাত (এমদা) ১/১৫৯ নং]

এখন আমরা হাদীসকে মানব না মাহারুল কাদিরী সাহেবকে মানব? "তালাশে হক্ক-এ” লেখা হয়েছিল: “এখন বলুন- ফেক্বাহর কিতাবসমূহে যেসব (বিধান) আছে তার সবই কি আল্লাহর পক্ষ থেকে (নাযিলকৃত)? যদি হয় তবে চোখ বুঝে মেনে নিন, আর যদি না হয় এবং অবশ্যই নয়- তবে এর অনুসরণ হারাম। (তালাশে হক্ক পৃঃ ৩৬, খোলাসায়ে তালাশে হক্ক পৃ: ৩১)

"তালাশে হক্কের” আলোচ্য উদ্ধৃতির উপর পর্যালোচনা করতে যেয়ে মাহারুল কাদিরী সাহেব বলেছেন-

টিকাঃ
৪. সহীহ: ইবনে মাজাহ (বাব اتباع سنة رسول الله ﷺ); আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত ইবনে মাজাহ হা/১১] (অনুঃ)
৫. হাসান: আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। [তাহক্বীকুকৃত মিশকাত ১/১৬৬ নং (অনু:)

📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 ‘উলুল আমর’-এর অনুসরণ

📄 ‘উলুল আমর’-এর অনুসরণ


ফারান: “মাস'উদ সাহেব কতটা নির্বোধের মত কথা বলেছেন, কুরআনুল কারীমে যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল ﷺ-এর অনুসরণের সাথে, অনুসরণের পরে বা অনুসরণ হিসাবে 'উলূল আমর'-এর অনুসরণ করার হুকুম এসেছে। তখন 'উলূল আমর'-এর অনুসরণ কি হারাম হয়? তাক্বলীদের বৈধতা তো কুরআনুল কারীমের এই আয়াতের মাধ্যমেই এসেছে।

জবাব: বিস্ময়ের বিষয় হল, মাহারুল সাহেব এই আয়াতের মাধ্যমে তাক্বলীদের বৈধতা প্রমাণ করেছেন, অথচ এ আয়াত থেকে ফরয হওয়া প্রমাণিত হয়। বুঝতে পারলাম না- মাহারুল সাহেব আল্লাহর হুকুমকে ফরয থেকে দূরে সরিয়ে কিভাবে বৈধ বা জায়েয হিসাবে গণ্য করলেন?!

নিঃসন্দেহে কুরআনুল কারীমে 'উলূল আমর'-কে অনুসরণ করার হুকুম আছে। এখন জিজ্ঞাসা হল, এই অনুসরণ দ্বীনি হুকুমের বিষয়ে না রাষ্ট্রীয় হুকুমের বিষয়ে? যদি দ্বীনি হুকুমের বিষয়ে হয় তবে তার আদেশের মর্যাদা শর'য়ী আইনের মর্যাদা রাখে। তখন মতপার্থক্যের সুযোগ থাকল কোথায়? আর 'উলুল আমর'-এর সাথে যে মতপার্থক্য হলে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে ফেরার নির্দেশ দেয়া হল কেন? এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, তার নির্দেশ শর'য়ী কানুন হবে আবার তার সাথে মতপার্থক্য করা যাবে- অথচ এটা অসম্ভব। সুতরাং প্রমাণিত হল যে, তার হুকুম দ্বীনি হুকুমের মর্যাদা রাখে না। এই হুকুম খণ্ডন করা যেতে পারে এবং কুরআন ও হাদীস থেকে বিশ্লেষণ করে সহীহ মাসআলার উপর আমল করা যেতে পারে; বরং এটাই করা জরুরী। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার হুকুম অনুযায়ী ফারুদ্দুহু ইলাল্লাহি ওয়ার রসূল। "আল্লাহ ও রসূলের দিকে ফিরে যাও” (সূরা নিসা : ৫৯) - হুকুমটি ফরয। আর আমীরের সাথে মতপার্থক্য করা এবং পূনরায় পর্যালোচনা করে হক বোঝা দু'টি বিষয়ই বিদ্যমান আছে, আর এ দু'টি বিষয়ই তাক্বলীদের বিপরীত। মাহারুল কাদিরী সাহেব কর্তৃক একে তাক্বলীদ বলা ও এই আয়াত থেকে দলিল নেয়া- দিনকে রাত বলার নামান্তর।

পক্ষান্তরে আমীরের অনুসরণ যদি বৈষয়িক ও রাষ্ট্রীয় নির্দেশের বিষয়ে হয়- তবে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, শরী'আতি আইন শুধুমাত্র আহকামে ইলাহী, যা অহীর মাধ্যমে নাযিল হয়েছে।

তাছাড়া এ আয়াতে ‘উমারা-এর অনুসরণের বর্ণনা এসেছে, আলেমদের নয়। যদি এটাও মেনে নিই- তবে এর থেকে আলেমদের অনুসরণ ফরয হয়, কিন্তু এর থেকে কিভাবে প্রমাণিত হয় যে, চার ইমামদের মধ্যে কোন একজনের তাক্বলীদ করতে হবে। 'খাস' দাবীর প্রমাণে 'আম দলিল যথেষ্ট নয়।

টিকাঃ
৬. অনেকে সাংগঠনিক আমীরের সাথে মত-পার্থক্যকেও দ্বীন থেকে বহিষ্কার হবার কারণ মনে করেন। আলোচ্য উদ্ধৃতির মাধ্যমে তাদের দাবীও খণ্ডিত হল। (অনুবাদক)

📘 মাযহাব ও তাকলীদ 📄 অনুসরণের সঠিক দাবী

📄 অনুসরণের সঠিক দাবী


ফারান: এভাবে ফিক্বাহর ঐ সমস্ত মাসায়েল যা কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক অথবা তার সাথে সাংঘর্ষিক ও বিরোধী নয়- সেগুলোর ইত্তিবা' ও তাক্বলীদ জায়েয, সেগুলো কেন হারাম হবে? (ফারান, পৃঃ ৩০)

জবাব: এক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হলো, কুরআন ও সুন্নাত মোতাবেক হলে সেগুলোর ইত্তিবা' শুধুমাত্র জায়েয হবে কেন, আর তা আবশ্যকীয় (ফরয) নয় কেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন হল- যে মাসায়েল কুরআন ও সুন্নাত মোতাবেক সেগুলোর ইত্তিবা'তো কুরআন ও সুন্নাতেরই ইত্তিবা'। কুরআন ও সুন্নাত অনুযায়ী সব কথাইতো (যার যার মান অনুযায়ী) আমল করা ওয়াজিব (ফরয)। এরমধ্যে আয়িম্মা ও ফুক্বাহাগণের প্রয়োজনটা কোথায়? বাকী থাকল ঐ মাসায়েল যা কিতাব ও সুন্নাতের বিরোধী সেগুলোর ইত্তিবা' আপনাদের মতেও হারাম। কিন্তু মুক্বাল্লিদগণ তো সবগুলোর উপর আমল করা জরুরী মনে করে। এখন বলুন, কিতাব ও সুন্নাতের বিরোধী মাসায়েলের উপর 'আমল করা কি জায়েয? এই আমল করাকে জরুরী মনে করার কারণে সে কুফরীর দোষে দোষী হয়, না হয় না?

যদি কুরআন ও সুন্নাতের বিরোধী মাসায়েলের উপর আমল করা হারাম হয়, তবে মুক্বাল্লিদ এটা কিভাবে বুঝবে যে অমুক অমুক মাসায়েল (কুরআন-সুন্নাহর) বিরোধী? এ ব্যাপারে তাদের পর্যালোচনার অনুমতি আছে কি? যদি অনুমতি থাকে তবে তারা মুজতাহিদ (গবেষক) হল, নাকি মুক্বাল্লিদ (অন্ধ অনুসারী) হল? আর যদি অনুমতি না থাকে, তবে তো তারা কিতাব ও সুন্নাতের বিরোধী আমল করতে বাধ্য হবে। কেননা ঐ হারাম কাজটি করা শুধুমাত্র তাক্বলীদের কারণেই হয়। সুতরাং তাক্বলীদ হারাম, আর হারামকে হালাল বা ওয়াজিব বলা কুফরী।

মাহারুল কাদিরী সাহেবের কথা হল, "আয়িম্মায়ে উসূলে ফিক্বাহ হানাফীদের নিকট গ্রহণযোগ্য।" আপনি হানাফী মাযহাবের পক্ষে যে কথা বলেছেন তা হানাফীগণ গ্রহণ করে নাই। আপনি তাক্বলীদের যে অর্থ নিয়েছেন- সে অর্থে হানাফী ফিকাহবিদগণ কি এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন?

ফন্ট সাইজ
15px
17px