📘 মাগফিরাতের পথ ও পাথেয় 📄 দিনে ক’বার ইসতিগফার করবে?

📄 দিনে ক’বার ইসতিগফার করবে?


বুখারীর এক বর্ণনায় আবু হুরাইরা রাসূল হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً
'আল্লাহর শপথ! আমি দিনে সত্তরবারেরও বেশি আল্লাহ -এর দরবারে ইসতিগফার ও তাওবা করে থাকি।'
সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আগার বিন ইয়াসার আল মুযানী বলেন, রাসূল বলেছেন,
إِنَّهُ لَيُغَانُ عَلَى قَلْبِي، وَإِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ
'নিশ্চয়ই আমার অন্তরেও ঢাকনা পড়ে যায়। আর আমি দিনে একশ বার ইসতিগফার পাঠ করি।'
মুসনাদে আহমাদের এক বর্ণনায় হুযাইফা রাসূল -এর নিকট এসে বলেন,
يَا رَسُولَ اللهِ، إِنِّي ذَرِبُ اللَّسَانِ، وَإِنَّ عَامَّةَ ذَلِكَ عَلَى أَهْلِي، فَقَالَ: « أَيْنَ أَنْتَ مِنَ الاسْتِغْفَارِ؟ » ، فَقَالَ: « إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ فِي الْيَوْمِ وَاللَّيْلَةِ أَوْ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ
“ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি খুব কঠোর ভাষী মানুষ। আর সাধারণত আমার পরিবারের লোকজনের সাথেই এর প্রয়োগ হয়ে থাকে। তিনি বললেন, 'তোমার ইসতিগফার কোথায় গেল?' এ কথা বলে তিনি আরও বলেন, 'আমি দিনে রাতে বা শুধু দিনে একশ বার ইসতিগফার করি'।”
আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল বলেছেন,
مَنِ أَكْثَرَ مِنَ الاسْتِغْفَارِ ، جَعَلَ اللهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمَّ فَرَجًا، وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
"যে ব্যক্তি অধিক পরিমাণে ইসতিগফার পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে সর্বপ্রকার বিপদাপদ হতে মুক্ত করবেন ও সব রকম দুশ্চিন্তা হতে রক্ষা করবেন এবং তার জন্য এমন স্থান হতে রিজিকের ব্যবস্থা করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।"
আবু হুরাইরা বলেন,
إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ كُلَّ يَوْمٍ أَلْفَ مَرَّةٍ، وَذَلِكَ عَلَى قَدْرِ دِيَتِي 'আমি দিনে হাজারবার ইসতিগফার পাঠ করি। এ যেন আমার রক্তমূল্যের বরাবর।”
আম্মাজান আয়িশা বলেন,
طُوبَى لِمَنْ وَجَدَ فِي صَحِيفَتِهِ اسْتِغْفَارًا كَثِيرًا 'যে ব্যক্তি তার আমলনামায় অধিক পরিমাণে 'ইসতিগফার' যোগ করতে পেরেছে, তার জন্য সুসংবাদ।"
আবুল মিনহাল আব্দুর রহমান বিন মুতইম বলেন,
مَا جَاوَرَ عَبْدُ فِي قَبْرِهِ مِنْ جَارٍ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنِ اسْتِغْفَارٍ كَثِيرٍ 'অধিক পরিমাণে ইসতিগফারের চেয়ে কবরে মানুষের সর্বোত্তম সঙ্গী আর কিছু হতে পারে না।'

টিকাঃ
৮৪. সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৬৩০৭। অধ্যায়: ৮০, দুআ। অনুচ্ছেদ: ৩, দিনে ও রাতে রাসূল -এর ইসতিগফার。
৮৫. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৭০২। অধ্যায়: ৪৮, জিকির, দুআ, তাওবা ও ইসতিগফার। অনুচ্ছেদ: ১২, ইসতিগফার করতে পছন্দ করা এবং বেশি বেশি করা。
৮৬. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৩৩৬২। হুযাইফা -এর কঠোর ভাষী হওয়ার বক্তব্যসহ সনদটি দুর্বল। তবে ২৩৩৪০ নং হাদিসে সহীহ সনদে একই ধরনের বক্তব্য থাকায় হাদিসটি সহীহ লিগাইরিহি。
৮৭. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ২২৩৪। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস হতে। সনদ যঈফ। আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৫১৮। অধিক পরিমাণে পড়ার পরিবর্তে নিয়মিত পড়ার উল্লেখ রয়েছে。
৮৮. মারিফাতুস সাহাবা: ১৮৯১ (আবু নুআইম রচিত ও দারুল ওয়াতান প্রকাশিত)। তবে সেখানে ১২ হাজারের উল্লেখ রয়েছে。
৮৯. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী ৬৩৭। হাদিসটি ইবনে মাজাহতে রাসূল হতে বর্ণিত আছে। হাদিস নং: ৩৮১৮। আব্দুল্লাহ বিন বুসর হতে। সনদ সহীহ。
৯০. আল ফাউজুল আজীম ফি লিকাইল কারীম: ১১৯; শরহু ছুলাছিয়াতি মুসনাদি আহমাদ: ২/৫৯৯

📘 মাগফিরাতের পথ ও পাথেয় 📄 গুনাহের প্রতিষেধক হলো ইসতিগফার

📄 গুনাহের প্রতিষেধক হলো ইসতিগফার


এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই যে গুনাহের অন্যতম ওষুধ বা প্রতিষেধক হলো ইসতিগফার। বেশি বেশি আল্লাহ -এর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা। এক মারফু বর্ণনায় আলী বলেন,
إِنَّ لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، وَإِنَّ دَوَاءَ الذُّنُوبِ الإِسْتِغْفَارُ
"প্রত্যেক রোগের প্রতিষেধক রয়েছে। গুনাহের প্রতিষেধক হলো 'ইসতিগফার'। "
কাতাদা বলেন,
إِنَّ الْقُرْآنَ يَدُلُّكُمْ عَلَى دَائِكُمْ وَدَوَائِكُمْ، أَمَّا دَاؤُكُمْ فَذُنُوبُكُمْ، وَأَمَّا دَوَاؤُكُمْ فَالِاسْتِغْفَارُ
'নিশ্চয় কুরআন তোমাদের রোগ এবং তার প্রতিষেধক বাতলে দিয়েছে। তোমাদের রোগ হলো 'গুনাহ', আর তার প্রতিষেধক হলো 'ইসতিগফার'। '
সালাফগণের কেউ কেউ বলেন,
إِنَّمَا مِعْوَلُ الْمُذْنِبِينَ الْبُكَاءُ وَالاسْتِغْفَارُ، فَمَنْ أَهَمَّتْهُ ذُنُوبُهُ، أَكْثَرَ لَهَا مِنَ الاسْتِغْفَارِ
“কান্নাকাটি এবং ইসতিগফার হলো গুনাহগারদের জন্য কুঠারের মতো। যে ব্যক্তি নিজের গুনাহকে গুরুত্ব দেয়, তার বেশি বেশি ইসতিগফার করা উচিত।”
রিয়াহ আল-কাইসী বলেন, 'আমার চল্লিশটিরও বেশি গুনাহ ছিল। প্রতিটি গুনাহের জন্য আল্লাহ-এর দরবারে এক হাজার বার করে ইসতিগফার করেছি।'
জনৈক বুযুর্গের ঘটনা জানা যায় যে, একদিন তিনি সাবালক হওয়ার পর থেকে যত ভুলভ্রান্তি হয়েছে তা গণনা করলেন। সারা জীবনে মাত্র ৩৬টি ভুলভ্রান্তি পাওয়া গেল। প্রতিটি ভুলের জন্য তিনি এক হাজার বার করে ইসতিগফার পাঠ করলেন। প্রতিটি ভুলের জন্য এক হাজার রাকাআত করে নামায আদায় করলেন। প্রতি রাকাতের শেষে তিনি বলতেন,
فَإِنِّي غَيْرُ آمِنٍ سَطْوَةَ رَبِّي أَنْ يَأْخُذَنِي بِهَا، وَأَنَا عَلَى خَطَرٍ مِنْ قَبُولِ التَّوْبَةِ
'এতকিছুর পরও আমি আল্লাহ তাআলার পাকড়াও হতে নিরাপদ নই। আমি নিজের তাওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে শঙ্কায় ভুগছি।'

টিকাঃ
১১. জামিউস সগীর, হাদিস নং: ৭৩০৭। যঈফুল জামি, হাদিস নং: ৪৭১৭। গ্রন্থকার আবু যর গিফারী ২৩-এর নাম উল্লেখ করলেও আসল বর্ণনাকারী আলী। সনদ দুর্বল。
১২. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী ১/৩৪৭। বর্ণনা নং: ৬৭৪৫। সনদ দুর্বল। তাফসীরে ইবনে হাতিম: ২৩১৯, সূরা বনী-ইসরাঈলের ৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়。
৯৩. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৬/১৯৪

📘 মাগফিরাতের পথ ও পাথেয় 📄 যাদের গুনাহ কম তাদের নিকট ইসতিগফারের দুআ কামনা করা

📄 যাদের গুনাহ কম তাদের নিকট ইসতিগফারের দুআ কামনা করা


যে ব্যক্তি তার অত্যধিক গুনাহের ব্যাপারে খুব বেশি চিন্তিত। সে মাঝে মাঝে এমন লোকদের কাছে নিজের মাগফিরাতের জন্য দুআ চাইতে পারে, যাদের গুনাহ কম বা নেই। উমর শিশু-কিশোরদের কাছে ইসতিগফারের দুআ চেয়ে বলতেন, 'তোমাদের তো গুনাহ নেই'।
আবু হুরাইরা মকতবের শিশুদের বলতেন,
قُولُوا: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي هُرَيْرَةَ
“বলো, হে আল্লাহ, আপনি 'আবু হুরাইরাকে' মাফ করে দিন।"
তাদের দুআর প্রতি আবু হুরাইরা-এর আস্থা ছিল।
তাবিঈ বকর বিন আব্দুল্লাহ আল-মুযানী বলেন, 'কারও পক্ষে যদি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ফকির-মিসকিনের মতো ইসতিগফারের দুআ ভিক্ষা করা সম্ভব হয়, সে যেন তা-ই করে।'
যার গুনাহের পরিমাণ এত বেশি যে, তার কোনো গণনা বা হিসাব নেই। তাহলে সে আল্লাহ তাআলার ইলমে যা আছে তার জন্য ইসতিগফার করবে।
কেননা, আল্লাহ প্রতিটি বিষয় লিখে রাখেন এবং তার হিসাব রাখেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللهُ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا أَحْصَاهُ اللَّهُ وَنَسُوهُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ
“যে দিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুজ্জীবিত করে উঠাবেন, অতঃপর তারা যে আমল করেছিল তা তাদেরকে জানিয়ে দেবেন। আল্লাহ তা হিসাব করে রেখেছেন, যদিও তারা তা ভুলে গেছে। আর আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী।”
শাদ্দাদ বিন আউস বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের বলতে শিখাতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الثَّبَاتَ فِي الأَمْرِ، وَأَسْأَلُكَ عَزِيمَةَ الرُّشْدِ، وَأَسْأَلُكَ شُكْرَ نِعْمَتِكَ، وَحُسْنَ عِبَادَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ لِسَانًا صَادِقًا، وَقَلْبًا سَلِيمًا، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا تَعْلَمُ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ مَا تَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ مِمَّا تَعْلَمُ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الغُيُوبِ
'হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করি কাজেকর্মে দৃঢ়তা, সৎপথে দৃঢ়তা, আপনার দেয়া নিআমাতের কৃতজ্ঞতা ও নিষ্ঠার সাথে আপনার ইবাদাত করার যোগ্যতা। আমি আপনার নিকট আরও প্রার্থনা করি সত্যবাদী জিহ্বা ও বিশুদ্ধ অন্তর। আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই আপনার জানা সকল মন্দ হতে এবং কামনা করি আপনার জানা সকল কল্যাণ। আমি ক্ষমা চাই আপনার জানা সর্বপ্রকারের অপকর্ম হতে। অবশ্যই আপনি অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞাত।'
কবির ভাষায়,
أَسْتَغْفِرُ اللهَ مِمَّا يَعْلَمُ اللَّهُ *** إِنَّ الشَّقِيَّ لَمَنْ لَا يَرْحَمُ اللَّهُ
مَا أَحْلَمَ اللَّهُ عَمَّنْ لَا يُرَاقِبُهُ *** كُلُّ مُسِيءٌ وَلَكِنْ يَحْلُمُ اللَّهُ
فَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ مِمَّا كَانَ مِنْ زَلَلٍ *** طُوبَى لِمَنْ كَفَّ عَمَّا يَكْرَهُ اللَّهُ
طُوبَى لِمَنْ حَسُنَتْ مِنْهُ سَرِيرَتُهُ *** طُوبَى لِمَنْ يَنْتَهِي عَمَّا نَهَى اللَّهُ
ক্ষমা চাও আজ আল্লাহ পাকের মহান দরবারে
সবার খবর জানেন তিনি, মালিক সবই জানে।
দুর্ভাগা সেই বান্দা তাহার দেখেনি যার পানে,
দয়ার নজরে রাখেনি যারে মালিক রহমানে।
ভালো ও মন্দ সবকিছু তাঁর রয়েছে নিখুঁত জানা,
কিছু না করে সুযোগ দিয়ে দেখেন রাব্বানা।
তাই বলি আর দেরি কোরো না, লুটিয়ে পড়ো আজ,
ক্ষমার ভিখারী, ক্ষমা চাওয়াই তোমার বড় কাজ।
এমন কপাল ক'জনার জোটে ইহকালে,
বেঁধে রাখে যে নিজেরে তার রবের বেড়াজালে।
গোপনে যার চলেছে বেড়ে পুণ্যের খতিয়ান,
কপালে তার জুটেছে রবের মধুর আহবান।
রবের নিষেধ জেনে বুঝে যে রয়েছে সাবধান,
তার প্রতি তিনি চিরখুশি আল্লাহ মহীয়ান।”

টিকাঃ
১৪. সূরা মুজাদালাহ, ৫৮: ৬
১৫. সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং: ৩৪০৭। অধ্যায় ৪৫, দুআ। অনুচ্ছেদ: ২৩। সনদ শুআইব আরনাউতের মতে হাসান লিগাইরিহী। আলবানীর মতে যঈফ। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ১৭১৩৩
১৬. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ৮৪৩। মাহির ইয়াসিন ফিহল সম্পাদিত।

ফন্ট সাইজ
15px
17px