📄 কখনো কখনো ইসতিগফারও দুআ কবুলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়
অন্তরে গুনাহ পুষে রেখে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুখে ইসতিগফার পাঠ করা একটি স্বতন্ত্র আমল। আল্লাহ চাইলে মাফ করবেন। না চাইলে ফিরিয়েও দিতে পারেন। তবে কখনো কখনো মনের মধ্যে গুনাহের আগ্রহ পুষে রেখে অনিচ্ছায় বা অন্যের চাপাচাপিতে মুখে ইসতিগফার পাঠে হিতে বিপরীত হতে পারে।
মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রাসূল-এর হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
وَيْلٌ لِلْمُصِرِّينَ الَّذِينَ يُصِرُّونَ عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ
"ধ্বংস তাদের জন্য যারা নিজেদের অপকর্ম সম্পর্কে জেনেও বারংবার তা করে যাচ্ছে।”
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাসূল-এর হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ ، وَالْمُسْتَغْفِرُ مِنْ ذَنْبٍ وَهُوَ مُقِيمٌ عَلَيْهِ كَالْمُسْتَهْزِي بِرَبِّهِ
গুনাহ হতে তাওবাকারী ব্যক্তি এমন, যেন তার কোনো গুনাহই নেই। আর গুনাহে লিপ্ত থেকে ইসতিগফার পাঠকারী যেন তার প্রতিপালকের সাথে উপহাস করছে।
ইমাম যাহহাক বলেন, 'তিন ব্যক্তির দুআ কবুল হয় না। তন্মধ্যে একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে কোনো নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত থাকে। প্রতিবার নিজের দুষ্কর্ম চরিতার্থ করার পর সে আল্লাহ -এর নিকট ক্ষমা চেয়ে বলে, 'হে আল্লাহ, অমুক নারীর সাথে আমি যা করেছি তা মাফ করে দিন'।
তখন আল্লাহ বলেন, 'তুমি সেই নারীর আশেপাশে ঘুরঘুর করবে আর আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো? যতক্ষণ তুমি এই অপকর্মে লিপ্ত থাকবে আমি তোমাকে ক্ষমা করব না।'
আরেকজন হলো সেই ব্যক্তি, যে মানুষের সম্পদ অবৈধভাবে দখল করে। সে যখন দুআ করে তখন বলে, 'হে আমার রব, আমি যে অমুকের সম্পদ গ্রাস করেছি তা মাফ করে দিন।'
আল্লাহ বলেন, 'তুমি আগে তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দাও। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। তা না হলে ক্ষমা করব না।'
টিকাঃ
৬০. সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং: ৩৫৫৯। অধ্যায় ৪৫, দুআ। অনুচ্ছেদ: ১০৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৫১৪। অধ্যায়: ২, নামায। অনুচ্ছেদ: ৩৬১, ইসতিগফার। সনদ দুর্বল。
৬১. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ৬৫৪১। সনদ হাসান。
৬২. আত তাওবাতু লি ইবনি আবিদ দুনিয়া: ১/৮৬, বর্ণনা নং: ৮৫; আত তাওবাতু লি ইবনি আসাকির: ১/৪১, হাদিস নং: ৯। সাঈদ আল হিমসীর কারণে হাদিসটি দুর্বল। হাদিসটির মারফু সনদ পরিত্যাজ্য। তবে মাওকূফ সনদ গ্রহণ করা যেতে পারে。
📄 পরিপূর্ণ ও মাকবুল ইসতিগফারের স্বরূপ
আল্লাহ-এর দরবারে কবুল হওয়ার মতো ইসতিগফার করতে হলে অন্তরের অন্তস্থল থেকে করতে হবে। মন গুনাহে ডুবিয়ে রেখে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুখে মুখে তাওবা-ইসতিগফার কতটুকু কাজে দেবে তা আল্লাহই ভালো জানেন।
তেমনিভাবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, জোর করে তাওবা করা বা করানো যায় না। আমাদের দেশে অনেকে আলেম বা দীনদার ব্যক্তির মাধ্যমে তাওবা পাঠ করে থাকেন। এ ধরনের তাওবা আসলে কতটুকু কার্যকর তা ভাবার বিষয়।
বান্দা যখন 'أَسْتَغْفِرُ اللهَ' 'আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি' বলে তখন সে মাগফিরাত কামনা করে। এটা ‘اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي' 'হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিন' বলার মতোই। অর্থাৎ শব্দ ও শব্দার্থে পার্থক্য থাকলেও মূল উদ্দেশ্য এক। ক্ষমাপ্রার্থনা।
আল্লাহ -এর দরবারে কবুল হওয়ার মতো ইসতিগফার করার জন্য অন্তরে গুনাহের প্রতি অনুতাপ ও তা পরিত্যাগের সংকল্প তৈরি হওয়া চাই। তা না করে শুধু মুখে বারবার ইসতিগফার পাঠ পরিপূর্ণ তাওবা বা ইসতিগফার বলে গণ্য হবে না।
অন্তরের অন্তস্থল হতে যারা ইসতিগফার করেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র কালামে তাদের প্রশংসা করেছেন এবং ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সুফিসাধক আরিফীনদের কেউ কেউ বলেন,
مَنْ لَمْ يَكُنْ ثَمَرَةُ اسْتِغْفَارِهِ تَصْحِيحَ تَوْبَتِهِ، فَهُوَ كَاذِبُ فِي اسْتِغْفَارِهِ
"যার ইসতিগফার তাকে তাওবার সঠিক পথ দেখাতে পারে না, তার ইসতিগফার মিথ্যা।”
আবার কেউ কেউ বলেছেন, 'আমাদের ইসতিগফারের যা অবস্থা, তাতে এমন ইসতিগফার থেকে বেঁচে থাকতে বেশি বেশি ইসতিগফার করা উচিত!'
অনেক আল্লাহওয়ালাকে বলতে শুনেছি,
أَسْتَغْفِرُ اللهَ مِنْ أَسْتَغْفِرُ اللهَ ... مِنْ لَفْظَةٍ بَدَرَتْ خَالَفْتُ مَعْنَاهَا
وَكَيْفَ أَرْجُو إِجَابَاتِ الدُّعَاءِ وَقَدْ ... سَدَدْتُ بِالذَّنْبِ عِنْدَ اللَّهِ مَجْرَاهَا
ক্ষমা চাই আমি দরবারে খোদার এমন ক্ষমাপ্রার্থনা হতে
যার আবেদন জিভেই রয়, কর্মে নিরেট ফাঁকি!
কিসের আশায় তার ভরসায় থাকতে পারি বলো
ক্ষমা চেয়ে ফের গুনাহ নিয়ে নিত্য পড়ে থাকি!
ইসতিগফারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম হলো মন থেকে গুনাহের যাবতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা মুছে ফেলে খাঁটি মনে ইসতিগফার পাঠ করা। তখন একে বলা হবে তাওবাতুন নাসূহা। আর যদি অন্তর হতে গুনাহের ইচ্ছা বের না করে শুধু মুখে ইসতিগফার পাঠ করে, তাহলে সেটা হবে সাধারণ ক্ষমাপ্রার্থনা। যেমন: আমরা বলে থাকি 'আল্লাহুম্মাগফির লি'। এটা সাধারণ সাওয়াবের কাজ। এ ক্ষেত্রে দুআ কবুলের আশা করা যেতে পারে।
এখন কথা হলো, কেউ যদি মিথ্যা তাওবা করে অর্থাৎ গুনাহমুক্ত জীবনযাপনের সংকল্প ছাড়াই জবানে তাওবা ও ইসতিগফার করে, তবে তা তাওবা বলে গণ্য হবে না। অধিকাংশ সাধারণ মানুষই মনে করে তাওবা কোনোরকম করলে বা করিয়ে দিলেই হলো। কিন্তু সত্য ও সঠিক কথা হলো, জোর করে কাউকে তাওবা করানো যায় না। নিজেও করা যায় না।
টিকাঃ
৬৩. তাফসীরে ইবনে রজব হাম্বলি: ১/১৫২,১৫৩।
📄 একই সাথে তাওবা ও ইসতিগফার পাঠ করার বিধান
বান্দা যখন দুআ করতে গিয়ে বলে, 'أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ 'আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তার প্রতি প্রত্যাবর্তন করি'। তখন তার এই দুআর দুটি অর্থ দাঁড়ায়।
এক. এই কথা সে তার মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলেছে। মন গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার সংকল্প করেনি, কিন্তু সে মুখে বলে বসে আছে। তাহলে দুআকারী ব্যক্তি একজন মিথ্যুক। তার 'وَأَتُوبُ إِلَيْهِ' 'এবং তারই প্রতি ফিরে আসি' বাক্যটি মিথ্যা। কেননা, প্রকৃত অর্থে সে তাওবা করেনি। তাই এ ধরনের দুআর পর নিজেকে তাওবাকারী হিসেবে দাবি করা জায়িয হবে না। সে এখনো তাওবাকারী হতে পারেনি।
দুই. অন্তর হতে গুনাহ ত্যাগের সংকল্প নিয়ে সে এই কথা বলেছে।
যদি তা-ই হয়, তবে এ নিয়েও উলামায়ে আসলাফের মতবিরোধ রয়েছে।
পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের মধ্য হতে কেউ কেউ একে মাকরূহ বলেছেন।
ইমাম আবু হানীফা এবং তাঁর সঙ্গীগণ এই মত ব্যক্ত করেছেন। ইমাম তহাবী তা বর্ণনা করেছেন।
অনুবাদকের কথা : গ্রন্থকার ইমাম ইবনু রজব হাম্বলি এখানে ইমাম তহাবী -এর উদ্ধৃতি দিয়ে ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর সঙ্গীগণের কথা বলেছেন। কিন্তু উল্লেখিত বক্তব্যটি ইমাম আবু হানীফা এর সমকালীন ও তাঁর শিষ্যদের কারও থেকে প্রমাণিত নয়। বক্তব্যটি মূলত মিসরীয় হানাফী ইমাম ইবনু আবী ইমরান -এর। তার মতে 'أَسْتَغْفِرُ اللهِ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ ' বলা মাকরূহ। এভাবে না বলে বরং 'أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَسْأَلُهُ التَّوْبَةَ ' 'আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তার নিকট ফিরে আসার আকুতি জানাচ্ছি' বলা উত্তম। ইমাম তহাবী বলেন, 'আমি নিজের মতাদর্শের অনেককেই ব্যাপারটি সমর্থন করে 'আসতাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি' বলা মাকরূহ মনে করতে দেখেছি। এ ব্যাপারে তাদের মন্তব্য হলো, 'তাওবা হলো গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং পুনরায় গুনাহ করা থেকে বিরত থাকা। বান্দা যখন 'أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ' বলে তখন সে আল্লাহ তাআলার সাথে এই ওয়াদা করে বসে। অথচ অধিকাংশ তাওবাকারীই বিষয়টার প্রতি খেয়াল রাখে না। এতে করে সে আল্লাহ তাআলার সাথে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে বসে। যা খুবই মারাত্মক।
এর চেয়ে বরং 'أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَسْأَلُهُ التَّوْبَةَ ' 'আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তার নিকট ফিরে আসার আকুতি জানাচ্ছি' বলা উত্তম।
এখানে প্রথম লক্ষণীয় বিষয় হলো, কোনো হানাফী আলেম বা ইমামের মতে ইসতিগফার ও তাওবা একসাথে করা মাকরূহ নয়। হানাফী মাজহাবের বিভিন্ন উসূল, ফিকাহ বা ফাতওয়ার কিতাবে আপনি এর প্রমাণ পাবেন।
যেমন: ইহরাম পরা ব্যক্তির শিকার করা প্রাণীর গোশত অন্য কোনো ইহরাম পরা বা হালাল ব্যক্তি খেলে তার করণীয় সম্পর্কে ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়াতে ইমাম তহাবী -এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, فَلَا شَيْءَ عَلَيْهِ إِلَّا الإِسْتِغْفَارُ وَالتَّوْبَةُ بِالْإِجْمَاعِ 'সর্বসম্মতভাবে তার জন্য ইসতিগফার ও তাওবা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই'।
দ্বিতীয় কথা হলো, ইবনু আবি ইমরান সহ দ্বিতীয় প্রজন্মের যে সকল হানাফী আলেম ইসতিগফার ও তাওবা একসাথে করার ক্ষেত্রে তাওবার শব্দচয়ন নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করেছেন, তাদের কথার স্বপক্ষে দলিল রয়েছে।
গ্রন্থকার ইবনু রজব হাম্বলি নিজেই তা তুলে ধরেছেন। প্রখ্যাত তাবেঈ রবী বিন খুছাইম বলেন,
لَا يَقُولُ أَحَدُكُمْ إِنِّي أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ ثُمَّ يَعُودُ فَيَكُونُ كَذِبُهُ، وَيَكُونُ ذَنْبًا، وَلَكِنْ لِيَقُلِ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَتُبْ عَلَيَّ
তোমাদের কেউ যেন إِنِّي أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ' না বলে। কেননা, এ কথা বলার পর সে হয়তো আবার গুনাহ করবে এবং নিজের কথায় নিজেই মিথ্যুক প্রমাণিত হবে। আর এতে তার গুনাহও হবে। তার চেয়ে বরং সে এ কথা বলতে পারে, اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَتُبْ عَلَيَّ' 'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আপনার দিকে প্রত্যাবর্তন করার সুযোগ দিন'।
হিজরি দ্বিতীয় শতকের বিখ্যাত সাধক মুহাম্মাদ বিন সূকাহ তার ইসতিগফারে নিম্নোক্ত দুআটি পাঠ করতেন,
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَسْأَلُهُ تَوْبَةٌ نَصُوحًا
আমি মহান আল্লাহ -এর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ (উপাস্য) নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও সকল কিছুর ধারক। এবং আমি পরিপূর্ণরূপে তাঁর প্রতি প্রত্যাবর্তনের তাওফীক কামনা করছি।”
সাহাবী হুযাইফাতুল ইয়ামান বলেন,
بِحَسْبِ الْمَرْءِ مِنَ الْعِلْمِ أَنْ يَخْشَى اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ وَبِحَسْبِهِ مِنَ الْكَذِبِ أَنْ يَقُولَ: أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ ثُمَّ يَعُودُ ثُمَّ يَعُودُ
"একজন মানুষের আলেম হওয়ার জন্য আল্লাহ-এর ভয়ই যথেষ্ট। আর মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য 'أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ 'আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর প্রতি প্রত্যাবর্তন করি' বলে পুনরায় গুনাহ করাই যথেষ্ট।”
মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ ইবনে শিখখীর একবার এক লোককে أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ ‘আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর প্রতি প্রত্যাবর্তন করি' বলতে শুনে বিরক্ত হলেন। তিনি তাকে বললেন, 'তোমার এরূপ বলা ঠিক না।'
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তিনি ইসতিগফারের সাথে ‘وَأَتُوبُ إِلَيْهِ বাক্য দ্বারা তাওবা করা অপছন্দ করতেন। কেননা, পরিপূর্ণ তাওবার উদ্দেশ্য হলো পুনরায় গুনাহ না করা। পরবর্তীকালে আর কখনোই গুনাহ না করা। এ ধরনের সংকল্পের পরও যারা গুনাহ করে, তারা নিজেদের কথায় মিথ্যাবাদী হয়ে যায়।
মুহাম্মাদ বিন কাব আল কুরাযী-এর নিকট গুনাহ না করার ওয়াদা করে পুনরায় গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'তার চেয়ে মারাত্মক গুনাহগার আর কে হতে পারে, যে আল্লাহ -এর সাথে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে?' ইমাম ইবনুল জাওযী তার এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সুফইয়ান বিন উআইনাহ হতেও এই মত বর্ণিত রয়েছে।
তবে জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে ইসতিগফারের সাথে وَأَتُوبُ إِلَيْهِ বাক্যে তাওবা করা জায়েয। বান্দা যখন এই বাক্য বা অন্য কোনো বাক্য দ্বারা আল্লাহ-এর সাথে এই ওয়াদা করে যে, সে আর কোনো গুনাহ করবে না। তখন এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তার জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়। তবে ওয়াদা ভঙ্গ করার পরও ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত রয়ে যায়। রহমান, রহীম ও গাফফার রবের দুয়ার খোলা থাকে। ইতিপূর্বে আমরা আবু বকর-এর পক্ষ হতে হাদিস জেনেছি, রাসূল বলেছেন,
مَا أَصَرَّ مَنِ اسْتَغْفَرَ، وَإِنْ عَادَ فِي الْيَوْمِ سَبْعِينَ مَرَّةٍ
“যে ব্যক্তি ইসতিগফার পাঠ করে, সে বারবার গুনাহকারী বান্দা বলে গণ্য হবে না। এমনকি দিনে সত্তরবার গুনাহ ও ইসতিগফার করলেও না।”
বারবার গুনাহ করে তাওবা-ইসতিগফারকারীকেও আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করেন এবং সুযোগ দেন। পূর্বের এক হাদিসে আমরা পড়েছি,
غَفَرْتُ لِعَبْدِي ثَلَاثًا، فَلْيَعْمَلْ مَا شَاءَ
“(পরপর তিনবার গুনাহ করে তাওবা করার পর আল্লাহ তাআলা বলেন) আমি আমার এ বান্দাকে মাফ করে দিলাম। এ রকম তিনবার বলে বলেন, 'এখন সে যা ইচ্ছা করুক'।"
মজলিসের কাফফারা-বিষয়ক হাদিসসমূহে তাওবা ও ইসতিগফারের উল্লেখিত বাক্যদ্বয় একসাথে রয়েছে। সুনানে আবু দাউদের এক হাদিসে আবু বারজাহ আসলামী বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، يَقُولُ: بِأَخَرَةٍ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَقُومَ مِنَ الْمَجْلِسِ: «سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ» فَقَالَ رَجُلُ : يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّكَ لَتَقُولُ قَوْلًا مَا كُنْتَ تَقُولُهُ فِيمَا مَضَى، فَقَالَ: «كَفَّارَةُ لِمَا يَكُونُ فِي الْمَجْلِسِ
"রাসূল যখন কোনো মজলিস শেষ করে চলে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন তখন سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ' এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল, এখন আপনি যে বাক্য পড়লেন তা তো আগে কখনো আপনি পাঠ করেননি? তিনি বললেন, মজলিসে যা কিছু (ভুলত্রুটি) হয়ে থাকে এ কথাগুলো তার কাফফারা।”
সুনানে আবু দাউদের আরেক বর্ণনায় এসেছে, 'চুরির দায়ে জনৈক ব্যক্তির হাত কেটে দেয়া হয়। এরপর রাসূল তাকে বলেন,
اسْتَغْفِرِ اللَّهَ وَتُبْ إِلَيْهِ» فَقَالَ: أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ، فَقَالَ: «اللَّهُمَّ تُبْ» عَلَيْهِ ثَلَاثًا
আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর নিকট তাওবা করো। সে বলল, আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি এবং তাওবা করছি। অতঃপর তিনি তিনবার বলেন, হে আল্লাহ, তুমি তার তাওবা কবুল করো।
টিকাঃ
৬৪. মূল নাম আবু জাফর আহমাদ বিন আবী ইমরান মূসা বিন ঈসা আল বাগদাদী। তিনি হিজরি দ্বিতীয় শতকের একদম শেষের দিকে জন্মগ্রহণ করেন এবং মিসরে স্থায়ী হন। ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ এ-এর শিষ্যগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। ইমাম তহাবী তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছেন। তিনি ২৮০ হিজরির দিকে ইনতিকাল করেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৩৩৪-৩৩৫, ব্যক্তি নং: ১৫৩。
৬৫. শরহু মাআনিল আছার: ৪/২৮৮। অধ্যায়: মাকরূহ। অনুচ্ছেদ: যে ব্যক্তি أَسْتَغْفِرُ اللهِ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ বলে。
৬৬. ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/২৫২। অধ্যায়: কিতাবুল মানাসিক হজ্জ। অনুচ্ছেদ: ০৯, শিকার-বিষয়ক。
৬৭. শরহু মাআনিল আছার : ৪/২৮৮, বর্ণনা নং: ৬৯৪৮। ইবনু রজব হাম্বলি -এর বর্ণনায় শব্দের সামান্য ভিন্নতা রয়েছে। এখানে শরহু মাআনিল আছারের মতন তুলে ধরা হয়েছে。
৬৮. শেষোক্ত 'নাস্হা' শব্দটি বাদ দিয়ে ইয়াহইয়াই উলুমিদ্দীন গ্রন্থে হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে দুআটি রয়েছে। দ্রষ্টব্য: তাখরীজু ইয়াহইয়াই উলুমিদ্দীন ইরাকী: ২/৮৫৪, হাদিস নং: ১১০১। মুআজ বিন জাবাল হতে। সনদ দুর্বল。
৬৯. আল ইলমু লি যুহাইর বিন হারব: ১/৯, বর্ণনা নং: ১৪। সুলাইম নামক বর্ণনাকারীর পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে。
৭০. আল বয়ানু ওয়াত তাবয়ীন, আবু উসমান আমর ইবনুল বাহর জাহিয আল কিনানী (১৫৯-২৫৬ হি.): ৩/২৭২। মূল গ্রন্থে রাগ বা বিরক্তির কথা নেই। সেখানে বলা হয়েছে, 'তিনি তার হাত ধরে কথাটি বলেছেন।'
৭১. সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং: ৩৫৫১। অধ্যায় ৪৫, দুআ। অনুচ্ছেদ: ১০৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৫১৪। অধ্যায়: ২. নামায। অনুচ্ছেদ: ৩৬১, ইসতিগফার। সনদ দুর্বল。
৭২. সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৭৫০৭। অধ্যায়: ১৭, তাওহীদ। অনুচ্ছেদ: আল্লাহর বাণী: তারা আল্লাহর ওয়াদাকে বদলে দিতে চায়।-সূরা আল ফাতহ, ৪৮: ১৫। হাদিসটিতে বর্ণনাকারী একই অর্থবিশিষ্ট দু-ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছেন। এখানে এক শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে。
৭৩. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং : ৪৮৫৯। সনদ সহীহ। অধ্যায়: ৩৬, শিষ্টাচার। অনুচ্ছেদ: ৩২, মজলিসের কাফফারা。
৭৪. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৩৮০। আবু উমাইয়া মাখজুমী হতে। শুআইব আরনাউত এ-এর মতে সনদ সহীহ লিগাইরিহি। অধ্যায়: ৩৩, অপরাধ ও দণ্ড। অনুচ্ছেদ: ৩২, দণ্ড প্রয়োগের সময় যে কথা বলতে বলা হয়。
📄 ইসতিগফারের সাথে তাওবার বাক্য ‘وَأَتُوبُ إِلَيْهِ’ যুক্ত করা
আসলাফ তথা পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম ও দীনের সাধকগণের একটি বড় অংশ ইসতিগফার ও তাওবা একসাথে করতে পছন্দ করতেন। তারা 'أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ' 'আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি এবং তাওবা করছি' বলা পছন্দ করতেন।
বর্ণিত আছে যে, উমর এক ব্যক্তিকে أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ 'আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি এবং তাওবা করছি' দুআ করতে শুনে বললেন, 'আরে বোকা! তুমি এভাবে বলো,
تَوْبَةَ مَنْ لَا يَمْلِكُ لِنَفْسِهِ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَلَا مَوْتًا وَلَا حَيَاةً وَلَا nُشُورًا
'এমন ব্যক্তির তাওবা, যে নিজের মালিক নিজে নয়। তার ভালো মন্দের মালিক সে নয়। এবং জীবন, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মালিকও সে নয়'।
ইমাম আব্দুর রহমান আল আওযাঈ -এর নিকট প্রশ্ন করা হলো, "এই দুআ করা যাবে কি?
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الحَيَّ القَيُّومَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
'মহান আল্লাহ তাআলার নিকট আমি ক্ষমা প্রার্থনা করি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, যিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী এবং আমি তাঁর কাছে তাওবা করি।
তিনি বললেন, এ তো খুবই ভালো। তবে দুআকারী এভাবেও বলতে পারে, 'رَبِّ اغْفِرْ لِي 'হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমায় ক্ষমা করে দিন'। ইসতিগফার পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত এভাবেই দুআ করবে।”
টিকাঃ
৭৫. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২/৪১২। সূরা ফুরকানের ৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে এ কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। (শামেলা)
৭৬. দুআটি তিরমিযির হাদিসে রয়েছে। হাদিস নং: ৩৫৭৭। যায়িদ হতে। সনদ সহীহ। অধ্যায়: ৪৫, দুআ। অনুচ্ছেদ: ১১৮, মেহমানের দুআ。
৭৭. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২/৪১২