📄 ইসতিগফার ও মাগফিরাতের অর্থ
ইসতিগফার অর্থ ক্ষমা চাওয়া। আর প্রকৃত ক্ষমা বা মাগফিরাত হলো অপরাধীর কীর্তিকলাপ গোপন রাখার পাশাপাশি তাকে তার অপরাধের মন্দ পরিণাম হতে মুক্তি দেওয়া। পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতে ইসতিগফারের আলোচনা রয়েছে। কোনো কোনো আয়াতে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ইসতিগফারের নির্দেশ দান করেছেন। যেমন, আল্লাহ বলেন: وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“আর আল্লাহর কাছেই মাগফিরাত কামনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুণাময়। "
আরেক আয়াতে তিনি বলেন: وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ "আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অনন্তর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ করো।”
অন্যত্র আল্লাহ ইসতিগফার তথা ক্ষমাপ্রার্থী বান্দার প্রশংসা করে বলেন: وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ "এবং শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।”
وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ "রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করতো।"
অন্য এক আয়াতে বলেন: وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ "তারা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোনো মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের ওপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।"
ইসতিগফারের নির্দেশ এবং ইসতিগফারে মগ্ন বান্দার প্রশংসার পাশাপাশি আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত এ কথাও বলে রেখেছেন যে, ক্ষমাপ্রার্থী বান্দাকে তিনি ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ বলেন: وَمَن يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا "যে গুনাহ করে কিংবা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল-করুণাময় হিসেবে পাবে।”
টিকাঃ
৪৬. মুসনাদে আহমাদ: ২১/১৪৬, হাদিস নং: ১৩৪৯৩। সনদ সহীহ লিগাইরিহি।
৪৭. সূরা বাকারা, ২: ১৯৯
৪৮. সূরা হুদ, ১১:৩
৪৯. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৭
৫০. সূরা যারিয়াত, ৫১:১৮
৫১. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৩৫
৫২. সূরা নিসা, ৪: ১১০
📄 ইসতিগফার ও তাওবা
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাওবার আলোচনায় ইসতিগফারকে জুড়ে দেওয়া হয়। মূলত ইসতিগফার হলো আল্লাহ -এর দরবারে মৌখিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করা।
আর তাওবা হলো আন্তরিক অনুশোচনা থেকে সামগ্রিকভাবে গুনাহ থেকে বিরত থাকা। গুনাহ ছেড়ে গুনাহমুক্ত জীবনের দিকে ফিরে আসা।
ক্ষেত্রবিশেষে ইসতিগফার ও মাগফিরাত দ্বারা তাওবা বোঝানো হয়। কুরআন- হাদিসসহ আরও বিভিন্ন বর্ণনায় এর প্রমাণও পাওয়া যায়।
তাই কেউ যদি বলে, 'ইসতিগফার দ্বারা মূলত তাওবা বোঝানো হয়েছে, তবে তা যেমন মেনে নিতে হবে। তেমনিভাবে এ কথাও বলা যেতে পারে যে, ইসতিগফার-বিষয়ক এমন কিছু আয়াত রয়েছে, যা থেকে শুধু মৌখিকভাবে ক্ষমা চাওয়াই বোঝা যায়। অন্য কোনো ব্যাপারে সেখানে চাপাচাপির অবকাশ নেই। যেমন: সূরা আলি ইমরানে বর্ণিত আয়াতটির দিকে লক্ষ করা যেতে পারে। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ক্ষমাপ্রার্থনাকারীকে ক্ষমা করে দেবেন বলে ওয়াদা করেছেন। এর সাথে অন্য কিছু জুড়ে দেননি।
এ ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদিসের প্রমাণের ভিত্তিতে ইসতিগফার একটি স্বতন্ত্র আমল বলে প্রমাণিত হয়।
কেউ যখন বলে, 'اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي' 'হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিন'। তখন অন্যান্য দুআর মতোই একটি দুআ। আল্লাহ চাইলে তার ডাকে সাড়া দেবেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেবেন।
তবে হ্যাঁ, বান্দা যদি গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ভাঙা মন নিয়ে একাগ্রচিত্তে এবং কোনো এক সময় কবুল হওয়ার আশা নিয়ে শেষরাতে বা প্রতি নামাজের পর নিয়মিত দুআ করতে থাকে, তবে তো তা বিশেষ কিছুই বলতে হয়।
লুকমান হাকীম তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন,
يَا بُنَيَّ عَوَّدْ لِسَانَكَ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، فَإِنَّ لِلَّهِ سَاعَاتٍ لَا يَرُدُّ فِيهَا سَائِلٌ
"বেটা, জবানে সব সময় 'اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي' 'হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিন' দুআ করতে থাকবে। কেননা, আল্লাহ-এর এমন কিছু সময় রয়েছে যখন তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না।”
হাসান বসরী বলেন,
أَكْثِرُوا مِنَ الاسْتِغْفَارِ فِي بُيُوتِكُمْ، وَعَلَى مَوَائِدِكُمْ، وَفِي طُرُقِكُمْ، وَفِي أَسْوَاقِكُمْ، وَفِي مَجَالِسِكُمْ، أَيْنَمَا كُنْتُمْ فَإِنَّكُمْ مَا تَدْرُونَ مَتَى تَنْزِلُ الْمَغْفِرَةُ
“তোমরা ঘরে, খাবারের দস্তরখানে, পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে এবং বৈঠকে- মজলিসে যেখানেই থাকো বেশি বেশি ইসতিগফার পাঠ করো। কেননা, কারও জানা নেই, মাগফিরাত কখন অবতীর্ণ হবে।”
আবু হুরাইরা রাসূল-এর ইরশাদ নকল করেন, তিনি বলেন,
بَيْنَمَا رَجُلٌ مُسْتَلْقٍ إِذْ نَظَرَ إِلَى السَّمَاءِ وَإِلَى النُّجُومِ، فَقَالَ: إِنِّي لَأَعْلَمُ أَنَّ لَكِ رَبًّا خَالِقًا، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، فَغَفَرَ لَهُ
কোনো ব্যক্তি পথ চলতে গিয়ে আকাশ ও তারকারাজি দেখে। তখন সে যদি বলে, 'আমি জানি তোমার একজন প্রতিপালক রয়েছেন, হে আল্লাহ, আপনি আমায় ক্ষমা করে দিন।' আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
মুওয়াররিক বলেন,
كَانَ رَجُلٌ يَعْمَلُ السَّيِّئَاتِ، وَإِنَّهُ خَرَجَ إِلَى الْبَرِّيَّةِ فَجَمَعَ تُرَابًا فَاضْطَجَعَ عَلَيْهِ مُسْتَلْقِيًّا فَقَالَ: يَا رَبِّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي فَقَالَ: إِنَّ هَذَا لِيَعْرِفُ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ وَيُعَذِّبُ فَغَفَرَ لَهُ
"জনৈক ব্যক্তি সব সময় গুনাহে লিপ্ত থাকত। একদিন সে খোলা ময়দানে বেরিয়ে এসে কিছু মাটি জমা করল। অতঃপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিয়ে চলতে চলতে বলতে লাগল, হে আমার রব, আমার গুনাহ মাফ করে দিন। আল্লাহ তাআলা বললেন, 'সে জানে, তার একজন প্রতিপালক আছেন যিনি ক্ষমা করতে পারেন আবার শাস্তিও দিতে পারেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন।'”
মুগীছ বিন সুমাই বলেন,
بَيْنَمَا رَجُلٌ خَبِيثُ، فَتَذَكَّرَ يَوْمًا، فَقَالَ: اللَّهُمَّ غُفْرَانَكَ، اللَّهُمَّ غُفْرَانَكَ، اللَّهُمَّ غُفْرَانَكَ، ثُمَّ مَاتَ فَغُفِرَ لَهُ
“খুবই মন্দ প্রকৃতির এক লোক ছিল। একদিন সে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করল। বলতে লাগল, হে আল্লাহ, ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ, ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ, ক্ষমা করে দিন। এভাবে বলতে বলতে সে মারা গেল। অতঃপর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো।”
বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত এক হাদিসে উপর্যুক্ত হাদিস দুটির সমর্থন পাওয়া যায়। রাসূল বলেন,
إِنَّ عَبْدًا أَذْنَبَ ذَنْبًاء فَقَالَ: رَبِّ أَذْنَبْتُ. فَاغْفِرْ لِي، فَقَالَ رَبُّهُ: أَعَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِهِ؟ غَفَرْتُ لِعَبْدِي، ثُمَّ مَكَثَ مَا شَاءَ اللهُ ثُمَّ أَذْنَبَ ذَنْبًا، فَقَالَ: رَبِّ أَذْنَبْتُ آخَرَ، فَاغْفِرْهُ؟ فَقَالَ: أَعَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِهِ؟ غَفَرْتُ لِعَبْدِي، ثُمَّ مَكَثَ مَا شَاءَ اللهُ، ثُمَّ أَذْنَبَ ذَنْبًا، قَالَ: رَبِّ أَذْنَبْتُ آخَرَ، فَاغْفِرْهُ لِي، فَقَالَ: أَعَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِهِ؟ غَفَرْتُ لِعَبْدِي ثَلَاثًا، فَلْيَعْمَلْ مَا شَاءَ
"এক বান্দা গুনাহ করল। তারপর সে বলল, হে আমার রব, আমি তো গুনাহ করে ফেলেছি। তাই আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন। তার প্রতিপালক বললেন, আমার বান্দা কি এ কথা জেনেছে যে, তার রয়েছে একজন রব— যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং এর কারণে শাস্তিও দেন। আমার বান্দাকে আমি মাফ করে দিলাম। তারপর সে আল্লাহর ইচ্ছে অনুযায়ী কিছুকাল অবস্থান করল এবং সে আবার গুনাহ করে বসল। বান্দা আবার বলল, হে আমার প্রতিপালক, আমি তো আবার গুনাহ করে বসেছি। আমার এ গুনাহ মাফ করে দিন। তখন আল্লাহ বললেন, আমার বান্দা কি জেনেছে যে, তার আছে একজন রব— যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং এর কারণে শাস্তিও দেন। এরপর সে বান্দা আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী কিছুকাল সে অবস্থায় থাকল। আবারও সে গুনাহতে জড়িয়ে গেল। সে বলল, হে আমার রব, আমি তো আরও একটি গুনাহ করে ফেলেছি। আমার এ গুনাহ মাফ করে দিন। তখন আল্লাহ বললেন, আমার বান্দা কি জেনেছে যে, তার একজন রব আছেন— যিনি গুনাহ মাফ করেন এবং এর কারণে শাস্তিও দেন। আমি আমার এ বান্দাকে মাফ করে দিলাম। এ রকম তিনবার বলে বললেন, “এখন সে যা ইচ্ছা করুক”।”
মুসলিম শরীফের বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে ‘اعْمَلْ مَا شِئْتَ فَقَدْ غَفَرْتُ ' “তোমার যা ইচ্ছা করো, তোমাকে আমি ক্ষমা করে দিলাম”।
অর্থাৎ গুনাহ হওয়ার সাথে সাথেই ইসতিগফার পাঠ করা চাই। সর্বদা এ বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি। আর বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইসতিগফারের সাথে অন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
যেমন: আবু বকর বলেন, রাসূল বলেছেন,
مَا أَصَرَّ مَنِ اسْتَغْفَرَ، وَإِنْ عَادَ فِي الْيَوْمِ سَبْعِينَ مَرَّةٍ
“যে ব্যক্তি ইসতিগফার পাঠ করে সে বারবার গুনাহকারী বান্দা বলে গণ্য হবে না। এমনকি দিনে সত্তরবার (গুনাহ ও ইসতিগফার) করলেও না।”
টিকাঃ
৫৩. হুসনুষ যন্নি বিল্লাহ: ১/১১১, বর্ণনা নং: ১১৯
৫৪. আত তাওবাতু লি ইবনি আবিদ দুনিয়া: ১/১২৫, বর্ণনা নং: ১৫৮
৫৫. হুসনুষ যন্নি বিল্লাহ: ১/১০৩, বর্ণনা নং: ১০৭; তাফসীরে কুরতুবী: ৪/৩১৪, সূরা আলে ইমরানের ১৯১ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়। ইবনুল হাজার আসকালানী-এর মতে হাদিসে অপরিচিত বর্ণনাকারী রয়েছে। আল কাফিউশ শাফ: ৩৬, হাদিস নং: ৩০৩
৫৬. হুসনুষ যন্নি বিল্লাহ: ১/১০৩, বর্ণনা নং: ১০৮
৫৭. হুসনুষ যন্নি বিল্লাহ: ১/১০৪, বর্ণনা নং: ১০৯
৫৮. সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৭৫০৭। অধ্যায়: ৯৭, তাওহীদ। অনুচ্ছেদ: আল্লাহর বাণী: "তারা আল্লাহর ওয়াদাকে বদলে দিতে চায়।"-সূরা আল ফাতহ, ৪৮: ১৫। হাদিসটিতে বর্ণনাকারী একই অর্থবিশিষ্ট দু- ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছেন। এখানে এক শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫৯. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৭৫৮। অধ্যায়: ৪৯, তাওবা। অনুচ্ছেদ: ৫, বারবার গুনাহ করলেও তাওবা করা।
📄 কখনো কখনো ইসতিগফারও দুআ কবুলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়
অন্তরে গুনাহ পুষে রেখে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুখে ইসতিগফার পাঠ করা একটি স্বতন্ত্র আমল। আল্লাহ চাইলে মাফ করবেন। না চাইলে ফিরিয়েও দিতে পারেন। তবে কখনো কখনো মনের মধ্যে গুনাহের আগ্রহ পুষে রেখে অনিচ্ছায় বা অন্যের চাপাচাপিতে মুখে ইসতিগফার পাঠে হিতে বিপরীত হতে পারে।
মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রাসূল-এর হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
وَيْلٌ لِلْمُصِرِّينَ الَّذِينَ يُصِرُّونَ عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ
"ধ্বংস তাদের জন্য যারা নিজেদের অপকর্ম সম্পর্কে জেনেও বারংবার তা করে যাচ্ছে।”
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাসূল-এর হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ ، وَالْمُسْتَغْفِرُ مِنْ ذَنْبٍ وَهُوَ مُقِيمٌ عَلَيْهِ كَالْمُسْتَهْزِي بِرَبِّهِ
গুনাহ হতে তাওবাকারী ব্যক্তি এমন, যেন তার কোনো গুনাহই নেই। আর গুনাহে লিপ্ত থেকে ইসতিগফার পাঠকারী যেন তার প্রতিপালকের সাথে উপহাস করছে।
ইমাম যাহহাক বলেন, 'তিন ব্যক্তির দুআ কবুল হয় না। তন্মধ্যে একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে কোনো নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত থাকে। প্রতিবার নিজের দুষ্কর্ম চরিতার্থ করার পর সে আল্লাহ -এর নিকট ক্ষমা চেয়ে বলে, 'হে আল্লাহ, অমুক নারীর সাথে আমি যা করেছি তা মাফ করে দিন'।
তখন আল্লাহ বলেন, 'তুমি সেই নারীর আশেপাশে ঘুরঘুর করবে আর আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো? যতক্ষণ তুমি এই অপকর্মে লিপ্ত থাকবে আমি তোমাকে ক্ষমা করব না।'
আরেকজন হলো সেই ব্যক্তি, যে মানুষের সম্পদ অবৈধভাবে দখল করে। সে যখন দুআ করে তখন বলে, 'হে আমার রব, আমি যে অমুকের সম্পদ গ্রাস করেছি তা মাফ করে দিন।'
আল্লাহ বলেন, 'তুমি আগে তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দাও। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। তা না হলে ক্ষমা করব না।'
টিকাঃ
৬০. সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং: ৩৫৫৯। অধ্যায় ৪৫, দুআ। অনুচ্ছেদ: ১০৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৫১৪। অধ্যায়: ২, নামায। অনুচ্ছেদ: ৩৬১, ইসতিগফার। সনদ দুর্বল。
৬১. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ৬৫৪১। সনদ হাসান。
৬২. আত তাওবাতু লি ইবনি আবিদ দুনিয়া: ১/৮৬, বর্ণনা নং: ৮৫; আত তাওবাতু লি ইবনি আসাকির: ১/৪১, হাদিস নং: ৯। সাঈদ আল হিমসীর কারণে হাদিসটি দুর্বল। হাদিসটির মারফু সনদ পরিত্যাজ্য। তবে মাওকূফ সনদ গ্রহণ করা যেতে পারে。
📄 পরিপূর্ণ ও মাকবুল ইসতিগফারের স্বরূপ
আল্লাহ-এর দরবারে কবুল হওয়ার মতো ইসতিগফার করতে হলে অন্তরের অন্তস্থল থেকে করতে হবে। মন গুনাহে ডুবিয়ে রেখে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুখে মুখে তাওবা-ইসতিগফার কতটুকু কাজে দেবে তা আল্লাহই ভালো জানেন।
তেমনিভাবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, জোর করে তাওবা করা বা করানো যায় না। আমাদের দেশে অনেকে আলেম বা দীনদার ব্যক্তির মাধ্যমে তাওবা পাঠ করে থাকেন। এ ধরনের তাওবা আসলে কতটুকু কার্যকর তা ভাবার বিষয়।
বান্দা যখন 'أَسْتَغْفِرُ اللهَ' 'আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি' বলে তখন সে মাগফিরাত কামনা করে। এটা ‘اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي' 'হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিন' বলার মতোই। অর্থাৎ শব্দ ও শব্দার্থে পার্থক্য থাকলেও মূল উদ্দেশ্য এক। ক্ষমাপ্রার্থনা।
আল্লাহ -এর দরবারে কবুল হওয়ার মতো ইসতিগফার করার জন্য অন্তরে গুনাহের প্রতি অনুতাপ ও তা পরিত্যাগের সংকল্প তৈরি হওয়া চাই। তা না করে শুধু মুখে বারবার ইসতিগফার পাঠ পরিপূর্ণ তাওবা বা ইসতিগফার বলে গণ্য হবে না।
অন্তরের অন্তস্থল হতে যারা ইসতিগফার করেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র কালামে তাদের প্রশংসা করেছেন এবং ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সুফিসাধক আরিফীনদের কেউ কেউ বলেন,
مَنْ لَمْ يَكُنْ ثَمَرَةُ اسْتِغْفَارِهِ تَصْحِيحَ تَوْبَتِهِ، فَهُوَ كَاذِبُ فِي اسْتِغْفَارِهِ
"যার ইসতিগফার তাকে তাওবার সঠিক পথ দেখাতে পারে না, তার ইসতিগফার মিথ্যা।”
আবার কেউ কেউ বলেছেন, 'আমাদের ইসতিগফারের যা অবস্থা, তাতে এমন ইসতিগফার থেকে বেঁচে থাকতে বেশি বেশি ইসতিগফার করা উচিত!'
অনেক আল্লাহওয়ালাকে বলতে শুনেছি,
أَسْتَغْفِرُ اللهَ مِنْ أَسْتَغْفِرُ اللهَ ... مِنْ لَفْظَةٍ بَدَرَتْ خَالَفْتُ مَعْنَاهَا
وَكَيْفَ أَرْجُو إِجَابَاتِ الدُّعَاءِ وَقَدْ ... سَدَدْتُ بِالذَّنْبِ عِنْدَ اللَّهِ مَجْرَاهَا
ক্ষমা চাই আমি দরবারে খোদার এমন ক্ষমাপ্রার্থনা হতে
যার আবেদন জিভেই রয়, কর্মে নিরেট ফাঁকি!
কিসের আশায় তার ভরসায় থাকতে পারি বলো
ক্ষমা চেয়ে ফের গুনাহ নিয়ে নিত্য পড়ে থাকি!
ইসতিগফারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম হলো মন থেকে গুনাহের যাবতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা মুছে ফেলে খাঁটি মনে ইসতিগফার পাঠ করা। তখন একে বলা হবে তাওবাতুন নাসূহা। আর যদি অন্তর হতে গুনাহের ইচ্ছা বের না করে শুধু মুখে ইসতিগফার পাঠ করে, তাহলে সেটা হবে সাধারণ ক্ষমাপ্রার্থনা। যেমন: আমরা বলে থাকি 'আল্লাহুম্মাগফির লি'। এটা সাধারণ সাওয়াবের কাজ। এ ক্ষেত্রে দুআ কবুলের আশা করা যেতে পারে।
এখন কথা হলো, কেউ যদি মিথ্যা তাওবা করে অর্থাৎ গুনাহমুক্ত জীবনযাপনের সংকল্প ছাড়াই জবানে তাওবা ও ইসতিগফার করে, তবে তা তাওবা বলে গণ্য হবে না। অধিকাংশ সাধারণ মানুষই মনে করে তাওবা কোনোরকম করলে বা করিয়ে দিলেই হলো। কিন্তু সত্য ও সঠিক কথা হলো, জোর করে কাউকে তাওবা করানো যায় না। নিজেও করা যায় না।
টিকাঃ
৬৩. তাফসীরে ইবনে রজব হাম্বলি: ১/১৫২,১৫৩।