📘 মাগফিরাতের পথ ও পাথেয় > 📄 গ্রন্থকার পরিচিতি

📄 গ্রন্থকার পরিচিতি


নাম, উপাধি ও বংশপরিচয়
হাফিয আবুল ফারাজ ইবনু রজব হাম্বলি। তিনি ছিলেন একজন ইমাম ও হাফিয। তাঁর পুরো নাম যাইনুদ্দিন আবদুর রহমান ইবনু আহমাদ ইবনু আব্দুর রহমান ইবনুল হাসান ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবিল বারাকাত মাসউদ আস-সুলামি আল-বাগদাদি আদ-দামিশকি আল-হাম্বলি। তাঁর অন্য নাম আবুল ফারাজ এবং ডাকনাম ইবনু রজব। এটা তাঁর দাদারও ডাকনাম ছিল। তাঁর দাদা রজব মাসে জন্মগ্রহণ করায় তাঁর দাদার ডাকনামও ইবনু রজব ছিল।

জন্ম
তিনি ৭৩৬ হিজরিতে বাগদাদের একটি ইলমসম্পন্ন ও পরহেজগার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর শিক্ষাজীবন
তিনি তাঁর সময়ের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ আলিমদের নিকট হতে ইলম শিক্ষা করেন। তিনি ইবনু কায়্যিমিল জাওযিয়্যাহ, যাইনুদ্দিন আল-ইরাকি, ইবনুন নাকিব, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাইল আল-খাব্বাজ, দাউদ ইবনু ইবরাহিম আল-আত্তার, ইবনু কাতি আল-জাবাল এবং আহমাদ ইবনু আবদুল হাদি আল-হাম্বলি প্রমুখ আলিমদের তত্ত্বাবধানে দামেশকে জ্ঞানার্জন করেন। তিনি মক্কায় আল-ফাখর উসমান ইবনু ইউসুফ আন-নুওয়াইরি, জেরুজালেমে হাফিয আল-আলাঈ এবং মিসরে সদরুদ্দিন আবুল ফাতহ আল-মায়দুমি এবং নাসিরুদ্দিন ইবনুল মুলুকের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ করেন।

তাঁর ছাত্রবৃন্দ
অনেক তালিবুল ইলম তাঁর কাছ এসে দীনের জ্ঞান অর্জন করতেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন ছিলেন: আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনু আবু বকর ইবনু আলি আল-হাম্বলি, আবুল ফাদল আহমাদ ইবনু নাসর ইবনু আহমাদ, দাউদ ইবনু সুলাইমান আল-মাউসিলি, আবদুর রহমান ইবনু আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-মুকরি, যাইনুদ্দিন আবদুর রহমান ইবনু সুলাইমান ইবনু আবুল কারাম, আবু যর আল-যারকাশি, আল-কাযি আলাউদ্দিন ইবনুল লাহাম আল-বালি এবং আহমাদ ইবনু সাইফুদ্দিন আল-হামাউইএ প্রমুখ।

মনীষীদের চোখে ইবনু রজব
ইবনু রজব এ ইলমের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়ই গবেষণা, লেখালেখি, গ্রন্থ প্রণয়ন, শিক্ষকতা এবং ফতোয়া প্রদানের কাজে ব্যয় করেন।
ইবনু রজবের পাণ্ডিত্য, সাধনা এবং ফিকহে হাম্বলির ওপর অসামান্য ব্যুৎপত্তি থাকার কারণে আলিমসমাজ তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ইবনু কাযি শুহবাহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, 'তিনি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পড়াশোনা করে ব্যাপক ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন। তিনি মাযহাবের বিষয়সমূহ পুরোপুরি আয়ত্ত করার পূর্ব পর্যন্ত তাতে নিবিষ্ট ছিলেন। তিনি হাদীসে নববীর সনদ-মতন, তাহকিক ও ব্যাখ্যার কাজে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।”
ইবনু হাজার আল-আসকালানি তাঁর সম্পর্কে বলেন, 'তিনি অনেক উঁচু পর্যায়ের হাদিস-বিশারদ ছিলেন। উসুলুল হাদিস, রিজালশাস্ত্র তথা রাবিদের নাম ও জীবনবৃত্তান্ত, হাদিসের সনদ-মতন এবং হাদিসের মর্মার্থ ও ব্যাখ্যায় পারদর্শী ছিলেন।'
ইবনু মুফলিহ তাঁর সম্পর্কে বলেন, 'তিনি ছিলেন শায়খ, প্রাজ্ঞ আলিম, হাফিয, দুনিয়াবিমুখ এবং হাম্বলি মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ ইমাম। তিনি বহু জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।'"

রচনাবলি
তিনি বহুসংখ্যক কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করেছেন। তন্মধ্যে রয়েছে, 'আল-কাওয়াইদ আল-কুবরা ফিল ফুরু'। এ গ্রন্থ সম্পর্কে বলা হয় যে, 'গ্রন্থটি এ যুগের অন্যতম বিস্ময়।' তাঁর তিরমিযি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থকে সবচেয়ে বিস্তৃত এবং সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলা হয়। তিরমিযি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে তাঁর লেখনী এত সমৃদ্ধ ছিল যে, আল-ইরাকি রাহ. তিরমিযি শরিফের নিজ ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রণয়নের সময় তাঁর সহায়তা নিতেন। ইবনু হাজার আল-আসকালানি যার সম্পর্কে বলেন, 'তিনি ছিলেন তাঁর যুগের বিস্ময়।'
উপরন্তু তিনি বিভিন্ন হাদিসের ব্যাখ্যায় অনেক মূল্যবান শরাহ রচনা করেছেন। যেমন: 'শারহু হাদিস মা যিবানি যাঈআন উরসিলা ফি গানام', 'ইখতিয়ার আল-আওলা শারহু হাদিস ইখতিসাম আল-মালা আল-আলা', 'নুরুল ইকতিবাস ফি শারহু ওয়াসিয়্যাহ আন-নাবিয়্যিল ইবনু আব্বাস' এবং 'কাশফুল কুরবাহ ফি ওয়াসফি আহলিল গুরবাহ'।
তাফসীরশাস্ত্রে তাঁর অবদানসমূহের মধ্যে রয়েছে : 'তাফসীরু সূরা ইখলাস', 'তাফসীরু সূরা ফাতিহা', 'তাফসীরু সূরা নাসর' এবং 'আল-ইস্তিগনা বিল কুরআন'।
হাদিসশাস্ত্রে তাঁর রচনাবলির মধ্যে : 'শারহু ইলালিত তিরমিযি’, ‘ফাতহুল বারী শারহুস সহিহ আল-বুখারি' এবং 'জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম' অন্যতম।
ফিকহশাস্ত্রে তাঁর রচনাবলির মধ্যে রয়েছে : 'আল-ইস্তিখরাজ ফি আহকামিল খারাজ' এবং 'আল-কাওয়াইদ আল-ফিকহিয়্যাহ'।
জীবনীগ্রন্থসমূহের মধ্যে বিস্ময়কর গ্রন্থ 'যাইল আলা তাবাকাতিল হানাবিলাহ'।
তাঁর নসিহাহমূলক গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে: 'লাতাইফুল মাআরিফ' এবং 'আত-তাখওয়ীফ মিনান্নার'।
মৃত্যু
তিনি ৭৯৫ হিজরির রমযান মাসের ৪ তারিখ সোমবার রাতে দামেশকের আল-হুমারিয়্যাহ এ মৃত্যুবরণ করেন।

টিকাঃ
১. ইবনু কাযি আল-শুহবাহ প্রণীত তারিখ: ৩/১৯৫
২. ইবনু হাজার আল-আসকালানি প্রণীত ইনবাউল গামর: ১/৪৬০
৩. আল মাকসাদুল আরশাদ: ২/৮১
৪. ইবনু আবদুল হাদি প্রণীত যাইল আলা তাবাকাত ইবনু রজব: ৩৮

📘 মাগফিরাতের পথ ও পাথেয় > 📄 অনুবাদকের কথা

📄 অনুবাদকের কথা


الْحَمْدُ لِلَّهِ حَمْدًا مُوَافِيًا لِنِعَمِهِ, مُكَافِيًا لِمَزِيدِهِ. وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى خَيْرٍ خَلْقِهِ مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَ أَصْحَابِهِ أَجْمَعِينَ

আলহামদুলিল্লাহ, মহান আল্লাহ রব্বুল ইজ্জতের পাক দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া যে, তিনি তাঁর সীমাহীন দয়া ও মেহেরবানি দ্বারা এই অনভিজ্ঞ, অধম ও অযোগ্য বান্দাকে তাঁর দীনের খিদমাত করার সুযোগ দিয়েছেন।
আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত সমস্ত জিন ও ইনসানকে তাঁর ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর ইবাদাতে মগ্ন থাকা সত্ত্বেও তিনি মানুষকে সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। মানুষ প্রতিনিয়ত নিজের ভুলত্রুটি, অবহেলা, উদাসীনতা ও অন্যায়-অপরাধের দরুন আল্লাহ রব্বুল আলামীনের রহমত ও মেহেরবানির ছায়া হতে দূরে সরে যায়। কিন্তু আল্লাহ আরহামুর রহিমীন, গাফুরুর রহীম। তিনি প্রতিনিয়ত তাঁর বান্দাকে নিজের রহমত ও মাগফিরাতের ছায়াতলে ফিরে আসার পথকে শুধু খোলা রেখেই ছেড়ে দেননি; বরং বান্দাকে নানাভাবে অভয় দিয়ে তার প্রতিপালকের ছায়াতলে ফিরে আসার মহাসুযোগ করে দিয়েছেন। খুলে রেখেছেন ক্ষমা ও মাগফিরাতের সুপ্রসারিত দুয়ার। পাশাপাশি এ কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো বান্দা যেন মনে না করে যে সে নিজ যোগ্যতায়, বিদ্যায়, বুদ্ধিতে কিংবা ইবাদাত-বন্দেগী ও কারামতি দিয়ে ইহকালীন ও পরকালীন সাফল্যের সিঁড়ি মাড়িয়ে উতরে যাবে। আল্লাহ রব্বুল আলামীনের রহমত ও মাগফিরাতসহ তাঁর ইচ্ছা ব্যতিরেকে বান্দা সাফল্যের কোনো বন্দরেই নিজের নোঙর ফেলতে পারবে না। আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত একমাত্র সত্তা, যিনি তাবৎ সৃষ্টিকুল হতে অমুখাপেক্ষী। আর আমরা তাঁর সৃষ্টি, যারা প্রতি মুহূর্তে সেই মহান জাতের মুখাপেক্ষী। আমাদের মতো মুখাপেক্ষী সৃষ্টির প্রতি দয়াময় আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত নিজের দয়া ও মাগফিরাতের চাদর ছড়িয়ে রেখেছেন। তিনি প্রতিটি বান্দাকে তাঁর সাথে সম্পর্ক তৈরি করে মাগফিরাত ও রহমতের মতো অবশ্য প্রয়োজনীয় নিআমাত লাভের সহজ সুযোগ করে দিয়েছেন।

বক্ষ্যমাণ বইটিতে সর্বজনস্বীকৃত ও মুসলিমবিশ্বে তর্কাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য আলিমে দীন ইবনে রজব হাম্বলি -এর অসামান্য ও কালজয়ী কলমের দ্যুতিতে আমরা মাগফিরাত লাভের উপায় ও বিভিন্ন সময়ে ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের পথ ও পন্থা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র।
এখানে আমরা ইবনু রজব হাম্বলি -এর 'আসবাবুল মাগফিরাহ' নামক পুস্তিকার অনুবাদ তুলে ধরেছি।
এটি অবশ্য গ্রন্থকারের জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ জামিউল উলুমি ওয়াল হিকামের ৪২ নং হাদিস ও তার ব্যাখ্যা।
পুস্তিকাটি অনুবাদের ক্ষেত্রে যে সকল মূলনীতি অনুসরণ করা হয়েছে তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কুরআনের আয়াত অনুবাদের ক্ষেত্রে মাআরিফুল কুরআনসহ বিভিন্ন অনুবাদ থেকে নকল করা হয়েছে।
২. বুখারী ও মুসলিম শরীফ ব্যতীত অন্যান্য গ্রন্থের বর্ণনাসমূহের সনদের মান তুলে ধরা হয়েছে।
৩. হাদিসের অনুবাদের ক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তাওহীদ পাবলিকেশন্সসহ কওমী মাদরাসায় পাঠ্য বিভিন্ন অনুবাদগ্রন্থের সাহায্য নেয়া হয়েছে।
৪. সকল আয়াত, হাদিস, তাফসীর ও সালাফের বক্তব্যের আরবি ইবারত ইরাবসহ তুলে ধরা হয়েছে।
৫. সকল তথ্যসূত্র আরবি লিপি হতে নেয়া হয়েছে। কোনো গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ হতে কোনো তথ্যসূত্র নেয়া হয়নি।
৬. অধিকাংশ তথ্যই অনলাইন শামেলা হতে সংগৃহীত।
৭. অনেক ক্ষেত্রেই গ্রন্থকার উদ্ধৃতি দেননি। অনুবাদকের দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ চেষ্টার মাধ্যমে তা সংযুক্ত করা হয়েছে।
৮. অনেক ক্ষেত্রে গ্রন্থকারের বর্ণনার সাথে মূল হাদিস বা তথ্যসূত্রের বর্ণনায় কিছুটা ভিন্নতা পাওয়া গেছে। আমরা মূল তথ্যসূত্রে যেভাবে আছে তা-ই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
৯. গ্রন্থকারের জীবনী সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রখ্যাত লেখক, অনুবাদক ও দীনি ব্যক্তিত্ব জনাব জোজন আরিফ সাহেবের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে।

সর্বাত্মক চেষ্টার পরও মানবিক সীমাবদ্ধতার দরুন কিছু ভুলত্রুটি থেকে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। তবে নিশ্চিতরূপেই এর সবটুকু দায় আমার। তাই তথ্য-উপাত্ত বা মুদ্রণজনিত কোনো ভুল থাকলে পাঠকের নিকট তা শুধরে দেওয়ার বিনীত নিবেদন রইল।
অসামান্য এ গ্রন্থটির অনুবাদের কাজে যাদের আন্তরিক সহযোগিতা আমাকে প্রতিনিয়ত কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছে, তাদের নাম উল্লেখ করতে পারলে খুব ভালো লাগত। কিন্তু আল্লাহ তাআলার এ সকল মুখলিস বান্দা ও বান্দীগণকে আল্লাহ তাআলা পার্থিব পরিচিতি ও সাধুবাদের পরীক্ষায় নিপতিত না করে আখিরাতের চিরসাফল্যে সম্মানিত করুন, এটাই আমার চাওয়া।
দীনের এই সামান্য খিদমাতের উসিলায় আল্লাহ তাআলা এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের আখিরাত সুন্দর করে দিন। আমীন।

আহমাদ ইউসুফ শরীফ
দারুস সালীম মাদরাসা
মাস্টারপাড়া, উত্তরখান, ঢাকা-১২৩০।
২৮ শাবান ১৪৪০ হিজরি মোতাবেক ২২ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ও ৫ মে ২০১৯ ঈসায়ী। রোজ রবিবার।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00