📄 উপসংহার
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
“তারা যা বর্ণনা করে থাকে, তা থেকে আপনার রব পবিত্র, তিনি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। নবি-রাসূলগণের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর জন্য।”[৮৬০]
এই আয়াতের মাধ্যমেই আমরা আমাদের বইয়ের সমাপ্তি টানছি। আল্লাহ তাআলা যেরকম প্রশংসা ও স্তুতি লাভের যোগ্য এবং তিনি নিজেই যেমন নিজের প্রশংসা করেছেন, আমরা তাঁর জন্য সেরকম প্রশংসাই করছি।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য, উত্তম ও বরকতময় প্রশংসা; যেমন তিনি পছন্দ করেন এবং যে প্রশংসায় তিনি সন্তুষ্ট। তাঁর মহত্ত্ব ও বড়োত্বের উপযোগী প্রশংসা; আর এটিই যথেষ্ট কিংবা শেষ নয়। হে আমাদের রব, আমরা এর থেকে অমুখাপেক্ষীও নই।
আমরা আল্লাহর নিকট তাঁর দেওয়া নিয়ামাতের শোকরিয়া আদায় করার সামর্থ্য কামনা করছি, তাঁর হকসমূহ পালন করার তাওফীক চাচ্ছি, তিনি যেন আমাদেরকে সুন্দরভাবে তাঁর ইবাদাত, যিক্ ও শোকর আদায় করতে সাহায্য করেন সেই প্রার্থনা করছি, আরও প্রার্থনা করছি তিনি যেন এই রচনার কাজসহ আমাদের সমস্ত কাজকর্মকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই বানিয়ে দেন এবং সেগুলোকে তাঁর বান্দাদের জন্য নসীহত হিসেবে কবুল করেন।
প্রিয় পাঠক, এই বইয়ের উপকারিতাগুলো আপনার জন্য আর এর যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির ভার লেখকের ওপর। এর সুমিষ্ট ফলগুলো আপনার জন্য আর এর পরিণামফল লেখকের দায়িত্বে। সুতরাং আপনি এখানে যা কিছু সঠিক ও হক হিসেবে পাবেন, তা গ্রহণ করুন। এর কথকের দিকে ভ্রুক্ষেপ করবেন না; বরং যা বলা হয়েছে তার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখুন, কে বলেছে তার প্রতি নয়। আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তিকে মন্দ বলেছেন, যে শত্রু বলেছে বলে হককে প্রত্যাখ্যান করে, আর পছন্দের কেউ বলেছে বলে তা গ্রহণ করে। কোনো একজন সাহাবি বলেছেন, 'সত্য যে-ই বলুক, তা গ্রহণ কোরো; যদিও সে তোমার শত্রু হয়। আর বাতিলকে প্রত্যাখ্যান কোরো; যদিও এর কথক হয় তোমার বন্ধু।[৮৬১] আর আপনি এই বইয়ে যা কিছু ভুলত্রুটি পাবেন, জেনে রাখবেন— বইটিকে ত্রুটিমুক্ত করতে ও বিশুদ্ধ রাখতে লেখকের চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। আসলে মানুষ দোষত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়, পরিপূর্ণতার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। যেমন কবি বলেন:
وَالنَّقْصُ فِي أَصْلِ الطَّبِيعَةِ كَامِنٌ ... فَبَنُو الطَّبِيعَةِ نَقْصُهُمْ لَا يُجْحَدُ দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণতা প্রোথিত আছে মানুষের স্বভাবের মূলেই, স্বভাবের সন্তানদের ঘাটতি তাই অস্বীকার করা যায় না কিছুতেই।
আর কীভাবেই-বা সেই ব্যক্তি নিজেকে ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্ত ঘোষণা করবে, যাকে সৃষ্টিই করা হয়েছে অজ্ঞ ও অত্যাচারী করে? তবে যার ভুলত্রুটিগুলো তার শুদ্ধ ও সঠিক বিষয়গুলোর তুলনায় কম, তার বিষয়টি বিবেচনা করা যায়।
এই বিষয়ে এবং অন্যান্য বিষয়ে যারা কথা বলে, তাদের জন্য জরুরি হলো: তাদের কথার মূল ভিত্তি হবে হক ও সত্য বিষয় এবং তাদের উদ্দেশ্য থাকবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর কিতাবের প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং তাদের মুসলিম ভাই-বোনদের প্রতি নাসীহা বা কল্যাণকামিতা। আর যদি তারা সত্যকে প্রবৃত্তি ও খাহেশাতের অনুসারী বানায়, তা হলে মানুষের অন্তর, আমল, অবস্থা ও চলার পথ নষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَوِ اتَّبَعَ الْحَقُّ أَهْوَاءَهُمْ لَفَسَدَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيْهِنَّ
"আর সত্য যদি তাদের খেয়াল-খুশির অনুগত হতো, তা হলে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা রয়েছে সবাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ত।"[৮৬২]
নবি বলেছেন, لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُوْنَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ "তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ-না তার প্রবৃত্তি ও খাহেশাত আমি যা কিছু নিয়ে এসেছি তার অনুগত হয়।”[৮৬৩]
ইলম ও আল্ল বা ন্যায়পরায়ণতা হলো সমস্ত কল্যাণের মূল। আর জুলুম ও জাহল বা মূর্খতা হলো সমস্ত অকল্যাণের মূল। আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তাঁকে সবার মাঝে ন্যায়সঙ্গত ফায়সালা করার হুকুম দিয়েছেন এবং কারও খেয়াল-খুশির অনুসরণ না করার আদেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, فَلِذلِكَ فَادْعُ وَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ وَقُلْ آمَنْتُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنْ كِتَابٍ وَأُمِرْتُ لِأَعْدِلَ بَيْنَكُمُ اللهُ رَبُّنَا وَرَبُّكُمْ لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ لَا حُجَّةً بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ اللَّهُ يَجْمَعُ بَيْنَنَا وَإِلَيْهِ الْمَصِيرُ ) “সুতরাং আপনি সে বিষয়ের দিকেই আহ্বান করুন এবং আপনাকে যেরূপ আদেশ করা হয়েছে তার ওপর অবিচল থাকুন আর তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না। আপনি বলুন, 'আমি ঈমান এনেছি (প্রত্যেক) সেই কিতাবের প্রতি, যা আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন এবং আমাকে আদেশ করা হয়েছে তোমাদের মাঝে ন্যায় বিচার করতে। আল্লাহ আমাদেরও রব এবং তোমাদেরও রব। আমাদের জন্য আমাদের কর্ম এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম। আমাদের মাঝে ও তোমাদের মাঝে কোনো বিবাদ-বিসংবাদ নেই। আল্লাহ আমাদের সকলকে একত্র করবেন এবং তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।"।৮৬৪]
প্রশংসা সবই আল্লাহর, যিনি মহাবিশ্বের অধিপতি। আর সালাত, সালাম ও বরকত বর্ষিত হোক সর্বশেষ রাসূল, মুহাম্মাদ-এর ওপর এবং তাঁর পরিবার-পরিজন সবার ওপর।
টিকাঃ
[৮৬০] সূরা সাফফাত, ৩৭: ১৮০-১৮২।
[৮৬১] উবাই ইবনু কা'ব। দেখুন-আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৯/১২১।
[৮৬২] সূরা মুমিনূন, ২৩: ৭১।
[৮৬৩] নববি, আল-আরবাঈন, ৪১।
[৮৬৪] সূরা শূরা, ৪২: ১৫।