📘 মাদারিজুস সালিকীন 📄 প্রবন্ধ : আখিরাত থেকে দূরে থাকার যত কারণ

📄 প্রবন্ধ : আখিরাত থেকে দূরে থাকার যত কারণ


যদি প্রশ্ন করেন: চিরসুখের জীবন, যার কোনো তুলনা নেই, সে জীবন অন্বেষণ করা থেকে নফসের দূরে থাকার কারণ কী? কীসে তাকে এর থেকে ভুলিয়ে রাখছে? আর এই ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রতি কেন তার এত আগ্রহ; যা কল্পনা আর স্বপ্নের মতো? উপলব্ধির ঘাটতি নাকি আখিরাতকে অস্বীকার করার কারণে? নাকি বুদ্ধি-বিবেচনা ক্ষতিগ্রস্ত, ফলে তা থেকে অন্ধ হয়ে আছে? নাকি যা অনুপস্থিত, ঈমানের মাধ্যমে জানা যায়, তার ওপর বর্তমানে যা চোখে দেখা যাচ্ছে তাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে?
উত্তর হলো: প্রশ্নোক্ত সবগুলোই এর কারণ।
আর এর সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ হলো ঈমানের দুর্বলতা। কেননা ঈমান হলো আমলের রূহ। ঈমানই ব্যক্তিকে আমলে উদ্বুদ্ধ করে, উত্তম ও নেককাজ করতে আদেশ দেয়, অশ্লীল ও অপকর্মে লিপ্ত হওয়া থেকে নিষেধ করে। ঈমানের শক্তি অনুসারেই ব্যক্তি আমলে অগ্রসর হয় এবং আদেশ-নিষেধ পালনে তৎপরতা দেখায়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُلْ بِئْسَمَا يَأْمُرُكُمْ بِهِ إِيْمَانُكُمْ إِنْ كُنتُمْ مُّؤْمِنِينَ "যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো, তা হলে এ কেমন ঈমান, যা তোমাদের এমন খারাপ কাজের নির্দেশ দেয়?" [৮৫৭]
মূলকথা হলো : যখন ঈমানের শক্তি পূর্ণতা পায়, তখন আখিরাতের জীবনের প্রতি আগ্রহও শক্তিশালী হয় এবং তা অন্বেষণে ব্যক্তির তৎপরতাও বেড়ে যায়।
দুই নং কারণ: অন্তরে অমনোযোগিতা এসে ভিড় করা। কেননা অমনোযোগিতা হলো অন্তরের নিদ্রা। আর এ কারণেই আপনি অনেক মানুষকে এমন পাবেন, যারা বাহ্যিকভাবে জাগ্রত; কিন্তু প্রকৃতার্থে ঘুমন্ত। আপনি তাদেরকে দেখবেন তারা জাগ্রত; অথচ তারা ঘুমিয়ে রয়েছে। এর বিপরীত অবস্থা হলো তাদের, যাদের অন্তর জাগ্রত; কিন্তু তারা শারীরিকভাবে ঘুমন্ত। কেননা অন্তর যখন প্রাণবন্ত থাকে, তখন শরীর ঘুমিয়ে পড়লেও অন্তর ঘুমায় না। সবচেয়ে বেশি প্রাণশক্তিম্পন্ন অন্তরের অধিকারী ছিলেন আমাদের নবি এবং সেই ব্যক্তি, যার অন্তরকে আল্লাহ নবিজির মহাব্বতে ও তাঁর রিসালাতের পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে জাগ্রত করে দিয়েছেন।
আসলে সচেতনতা ও অসচেতনতা সৃষ্টি হয় অনুভূতি, বোধবুদ্ধি ও অন্তরে। অন্তরের জাগ্রত ও ঘুমন্ত ব্যক্তি হলো শারীরিকভাবে জাগ্রত ও ঘুমন্ত ব্যক্তি ন্যায়। বাহ্যিক জাগরণ যেমন দুই প্রকার; তেমনি অভ্যন্তরীণ জাগরণও দুই প্রকার।
বাহ্যিক জাগরণের প্রথম প্রকার: এই গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি তার বাহ্যিক সমস্ত কাজকর্মকে যথাযথভাবে আঞ্জাম দেয়, গভীর মনোযোগ ও সচেতনতার সাথে সেগুলোতে সফলতা অর্জন করার চেষ্টা করে এবং তাতে উত্তম পন্থা অবলম্বন করে।
বাহ্যিক জাগরণের দ্বিতীয় প্রকার: নিজ সত্তা ও অন্তরের প্রতি মনোযোগী হয়। ফলে বান্দা তাতে পরিপূর্ণতা অর্জনের চেষ্টার মশগুল হয়। উত্তম-অনুত্তম ও ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করে নীচ গুণাবলির ওপর উত্তম গুণাবলিকে প্রাধান্য দেয়। দুটি বিষয়ের মধ্যে যেটা উত্তম, সেটাকে বেছে নেয়। দুটি মন্দের মধ্যে পরিণতিতে যেটা হালকা, সেটা গ্রহণ করে; এই আশঙ্কায় যে, শক্তিশালী ও বেশি মন্দ বিষয়টি যেন তার অংশে চলে না আসে। সে সব ধরনের সুন্দর আচার-আচরণে নিজেকে সুসজ্জিত করে; ফলে তার বাহ্যিক অবয়ব সুন্দর হয়ে যায়। আর তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা বাহ্যিক অবস্থার চেয়েও পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিরা উত্তম স্বভাব-চরিত্র অর্জনে সেভাবেই তৎপর হয়ে ওঠে, যেভাবে সম্পদ লোভীরা দীনার-দিরহামের জন্য প্রতিযোগিতা করে। এই ধরনের জাগরণ ও সচেতনতার মাধ্যমে ব্যক্তি অন্য দুইটি বিষয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে তোলে।
এক. এর মাধ্যমে সে চিরস্থায়ী সুখের জীবন অর্জনে উদ্যমী হয়ে ওঠে; যে জীবনের কোনো তুলনা হয় না। দুনিয়ার এই জীবন তো ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী; যার কোনো মূল্যই নেই।
এখন যদি আপনি প্রশ্ন করেন: ক্ষণস্থায়ী ধ্বংসশীল এ জীবনে অবস্থান করে কীভাবে আমি অনন্তকালীন জীবনের সুখ-শান্তি অর্জন করব? কীভাবে এটি হতে পারে? আমি বুঝতে পারছি না! আমার জন্য বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করুন।
এর উত্তরে আমি বলব : এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে অন্তর ঘুমন্ত বলে; বরং বলা যায় এটি হলো অন্তরের মৃত্যুর ফল। ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ায় অবস্থান করা ছাড়া আর কোথা থেকে আখিরাতের অনন্তজীবন লাভ করা যায়? যেমন আপনি আপনার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করেন নিভু নিভু কোনো একটি প্রদীপ থেকে; যা প্রায় নিভে যাওয়ার উপক্রম। এর ফলে আপনার প্রদীপটি জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে, তার আলোয় আশপাশ আলোকিত হয়, আর প্রথম প্রদীপটি নিভে যায়। দুনিয়ার জীবনে অবস্থান করে আখিরাতের জীবনকে আবাদকারী ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী বাসস্থান থেকে চিরস্থায়ী বাসস্থানে স্থানান্তরিত হয়। এই দুই বাসস্থানের একটি থেকে অপরটিতে যাওয়ার মাধ্যম ও সেতু হলো মৃত্যু; যা পাড়ি দেওয়া ব্যতীত কেউই আখিরাতে যেতে পারে না। মৃত্যু হলো আখিরাতে প্রবেশের একমাত্র দরজা। দুনিয়া ও আখিরাত দুইটি জীবন; মাঝে রয়েছে কেবল মৃত্যু। যেরকমভাবে আখিরাতের জীবনের আলো দুনিয়ার এই জীবনেই অর্জন করতে হয়; তেমনিভাবে দুনিয়ার জীবনেই আখিরাতের জীবন অর্জন করে নিতে হয়। সুতরাং দুনিয়ার এই জীবনে ঈমানের আলো যেমন হবে, আখিরাতের জীবনে ব্যক্তি তেমন আলোই লাভ করবে। আবার দুনিয়ার এই জীবন যতটুকু ঈমানি জিন্দেগি হবে, আখিরাতের জীবনেও ততটুকু সুখ-শান্তি লাভ করবে।
দুনিয়ার জীবনের এই আলো ও ঈমানি অবস্থা কবরজীবনে হারিয়ে যাবে না; বরং ব্যক্তির জন্য তা আলো হয়ে থাকবে। এমনিভাবে কিয়ামাতের ময়দানে, পুলসিরাতে সব জায়গায় তা ঈমানদারদের সঙ্গ দেবে; যতক্ষণ-না তারা আখিরাতের স্থায়ী ঠিকানায় পৌঁছে যায়। সূর্যের আলো নিভে যাবে; কিন্তু এই আলো কখনো নিভে।
যাবে না। দুনিয়ার এ জীবন শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু সে জীবন কখনো ফুরাবে না। এটি হলো অভ্যন্তরীণ জাগরণের প্রথম প্রকার।
অভ্যন্তরীণ জাগরণের দ্বিতীয় প্রকার: এই জাগরণ এমন জীবনের প্রতি উদ্‌বুদ্ধ করে, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কল্পনাও সে পর্যন্ত বিচরণ করতে অক্ষম। শব্দের মাধ্যমে তার বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। সেই জীবনের উপমা হলো প্রিয় মানুষের সাথে ব্যক্তির জীবন; যাকে ব্যতীত তার অন্তর, রূহ ও জীবনের কোনো মূল্য নেই, এক পলকও যার থেকে অমুখাপেক্ষী থাকা যায় না, যাকে ছাড়া চোখের শীতলতা, অন্তরের নিশ্চিন্ততা আর রূহের স্থিরতা নেই। সে তার প্রতি নিজের কান, চোখ, খাবার; এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি মুখাপেক্ষী। সে ব্যতীত তার জীবন দুঃখকষ্ট ও আযাবময়। তার নৈকট্য, ভালোবাসা ও সঙ্গ পাওয়ার মাঝেই তার জীবন সীমাবদ্ধ। সে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার শাস্তি, অন্যান্য শাস্তি থেকে বেশি যন্ত্রণাদায়ক। যেমন আখিরাতে আল্লাহকে দেখার প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে গেলে অন্তর যে আনন্দ ও তৃপ্তি অনুভব করবে, তা খাওয়া-পান করা এবং হৃরদের সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর তৃপ্তি থেকে বহুগুণ বেশি হবে। এমনিভাবে আল্লাহকে না দেখে আড়ালে থাকার শাস্তি, জাহান্নামের শাস্তির চেয়ে তীব্র। এই কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর আউলিয়াদের জন্য এই দুই প্রকার নিয়ামাতের কথাই উল্লেখ করেছেন-
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ
"যারা সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে 'হুসনা' এবং আরও বেশি।”[৮৫৮]
এখানে 'হুসনা' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: জান্নাত এবং 'আরও বেশি' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: জান্নাতে আদনে আল্লাহ তাআলার দর্শন। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর শত্রুদের ব্যাপারে এই দুই প্রকার আযাবের কথাই উল্লেখ করেছেন-
كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُوْنَ * ثُمَّ إِنَّهُمْ لَصَالُو الجَحِيمِ
"কখনো নয়, নিশ্চিতভাবেই সেদিন তাদেরকে তাদের রবের দর্শন থেকে বঞ্চিত রাখা হবে। অতঃপর তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। "[৮৫৯]
মোটকথা অমনোযোগিতার কারণে আখিরাতের জীবন অন্বেষণ করা থেকে অন্তর ঘুমিয়ে থাকে। আর এটিই হলো অন্তরের পর্দা।
যদি এই অমনোযোগিতার পর্দাকে আল্লাহ তাআলার যিকিরের মাধ্যমে দূর করা হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় তা আরও ঘনীভূত হবে। একসময়ে তা অলসতা, খেলাধুলা ও অনর্থক বিষয়াদিতে মশগুল হওয়ার পর্দায় পরিণত হবে।
যদি দ্রুত এই পর্দা দূর করার প্রতি মনোযোগী হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় আরও ঘনীভূত হয়ে একসময় তা অবাধ্যতা ও সগীরা গুনাহের পর্দায় পরিণত হবে; যা ব্যক্তিকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।
যদি দ্রুত এই পর্দা দূর করার প্রতি মনোযোগী হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় আরও ঘনীভূত হয়ে একপর্যায়ে তা কবীরা গুনাহের পর্দায় পরিণত হবে; যা আল্লাহর ক্রোধ, গজব ও লা'নতকে আবশ্যক করবে।
যদি দ্রুত এই পর্দা দূর করার প্রতি মনোযোগী হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় আরও ঘনীভূত হয়ে একসময়ে তা আমলি বিদআতের পর্দায় পরিণত হবে। যার দ্বারা ব্যক্তি নিজেই নিজেকে শাস্তি দেবে এবং আমল করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাবে, কিন্তু কোনো ধরনের কল্যাণ ও উপকারিতার দেখা পাবে না।
যদি দ্রুত এই পর্দা অপসারণ করার প্রতি মনোযোগী হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় তা আরও ঘনীভূত হয়ে একসময়ে কওলি বিদআতের পর্দায় পরিণত হবে; যা আকীদা-বিশ্বাসকে নষ্ট করে দেবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর মিথ্যা আরোপ করা এবং রাসূল ﷺ যে সত্য নিয়ে এসেছেন, তা মিথ্যা সাব্যস্ত করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
যদি দ্রুত এই পর্দা দূর করার প্রতি মনোযোগী হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় তা আরও ঘনীভূত হয়ে একসময়ে সংশয় ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করার পর্দায় পরিণত হবে; যা ইসলামের পাঁচটি ভিত্তিতেই সংশয় সৃষ্টি করবে। ইসলামের পাঁচটি ভিত্তি হলো:
১. আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান,
২. ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান,
৩. আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, ৪. রাসূলগণের প্রতি ঈমান এবং ৫. আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাতের প্রতি ঈমান।
ওই ব্যক্তির অন্তরে যে পর্দা পড়েছে তা মোটা, ঘন, কালো ও অন্ধকার হওয়ার দরুন সে ঈমানের মর্ম বুঝতে পারে না। শয়তান তার মাঝে জায়গা করে নেয়, তাকে প্রতিশ্রুতি দান করে আর আশার ধোঁকায় ফেলে রাখে। তার নফসে আম্মারা তাকে মন্দ ও অশ্লীল কাজকর্মে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করে। প্রবৃত্তির শক্তি ঈমানের শক্তির ওপর বিজয় লাভ করে। যদি তা ধ্বংস করতে না পারে, তবে তাকে বন্দি করে ও আটকে রাখে। ফলে প্রবৃত্তির শক্তিই পুরা দেহরাজ্য পরিচালনা করে এবং চাহিদার সৈন্যসামন্তকে দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করিয়ে নেয়। নেক আমল করার স্পৃহা নষ্ট করে দেয়। সচেতনতা ও জাগ্রত হওয়ার দরজা বন্ধ করে দেয়। অন্তরে গাফলত ও অমনোযোগিতার প্রহরী নিযুক্ত করে এবং বলে, 'সাবধান! তোমার দিক থেকে যেন নেক আমলের কোনো আগ্রহ-উদ্দীপনা প্রবেশ করতে না পারে।' প্রবৃত্তির সৈন্যদের থেকে একজনকে দারোয়ান বানিয়ে দিয়ে তাকে বলে, 'তোমার কাছ থেকে যেন কেউ ভেতরে প্রবেশ করে আমার নিকট আসতে না পারে। হ্যাঁ কেউ এলে তুমি তার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। আমাদের এই রাজত্বের যাবতীয় বিষয়াদি তোমার ও প্রহরীর নিকট ন্যস্ত রইল। সুতরাং হে গাফলতের প্রহরী, হে প্রবৃত্তির দারোয়ান, তোমরা নিজের সীমানা খুব ভালো করে আগলে রাখবে, যদি হেরফের হয়, তা হলে আমাদের রাজত্ব হাতছাড়া হয়ে যাবে, শাসনক্ষমতা আবার আমাদের ভিন্ন অন্য কারও নিকট চলে যাবে, ঈমানের শক্তি আমাদের পরাজিত করে ফেলবে; তা কত-না নিকৃষ্ট অপমান ও অপদস্থতা! আমরা আর কোনোদিন এই শহরে (দেহের ভেতরে) আনন্দ-উল্লাস করতে পারব না!
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! যদি এই সৈন্যবাহিনী অন্তরে জমা হয়; আর সাথে থাকে ঈমানের দুর্বলতা, রসদের স্বল্পতা, আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখতা, দুনিয়াদারদের পদাঙ্ক অনুসরণ এবং দীর্ঘ আশা, যা মানুষকে শেষ করে দেয়-তা হলে উপস্থিত, বর্তমান দুনিয়া প্রাধান্য পেয়ে যাবে অনুপস্থিত আখিরাতের ওপর, যা এই পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হওয়ার পরে সামনে আসবে। আল্লাহ তাআলাই সাহায্য-লাভের একমাত্র উৎস। ভরসা করতে হবে কেবল তারই ওপর।

টিকাঃ
[৮৫৭] সুরা বাকারা, ২: ৯০।
[৮৫৮] সূরা ইউনুস, ১০: ২৬।
[৮৫৯] সূরা মুতাফফিফীন, ৮৩: ১৫-১৬।

📘 মাদারিজুস সালিকীন 📄 প্রবন্ধ : বিভিন্ন আমলের ফলাফল ও উপকারিতা

📄 প্রবন্ধ : বিভিন্ন আমলের ফলাফল ও উপকারিতা


ভয়ের ফল-তাকওয়া, দৃঢ়তা ও ছোটো আশা।
আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখার ফল-যুহুদ বা দুনিয়াবিমুখতা।
মা'রিফাতের ফল-মহাব্বত, ভয় ও আশা।
অল্পেতুষ্টির ফল-সন্তুষ্টি।
যিক্র বা আল্লাহর স্মরণের ফল-অন্তরের প্রাণবন্ত জীবন।
তাকদীরের ওপর বিশ্বাসের ফল-তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা।
আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলিতে অবিরাম চিন্তাভাবনার ফল-মা'রিফাত বা আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান।
আল্লাহভীতির ফল-দুনিয়াবিমুখতা।
তাওবার ফল-মহাব্বত বা ভালোবাসা।
সবসময় যিক্র করার দ্বারাও মহাব্বত সৃষ্টি হয়।
সন্তুষ্টির ফল-শোকর।
সংকল্পের দৃঢ়তা ও ধৈর্যের ফল-সব ধরনের হাল (বিশেষ অবস্থা) ও মাকাম।
ইখলাস ও সত্যবাদিতা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। একটি অপরটির ফল এবং একটি অপরটিকে দাবি করে।
মা'রিফাত বা আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানের ফল-উত্তম আখলাক।
চিন্তা-ফিকিরের ফল-সংকল্পের দৃঢ়তা।
মুরাকাবা বা ধ্যান করার ফল-সময়ের সদ্ব্যবহার ও এর হেফাজত এবং লজ্জা, ভয় ও আল্লাহমুখিতা।
নফসকে মেরে ফেলা এবং অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করার দ্বারা অন্তরের প্রকৃত জীবন, সম্মান ও ইজ্জত লাভ হয়।
নিজের নফস ও নফসের চাহিদা এবং নিজের আমলের কমতি ও পাপাচারের আধিক্য সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জাশীলতাকে আবশ্যক করে।
সঠিক অন্তর্দৃষ্টির ফল-ইয়াকীন বা দৃঢ় বিশ্বাস।
যেসব নিদর্শন মানুষ নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করে এবং শ্রবণ করে তাতে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করার ফল-সঠিক অন্তর্দৃষ্টি।
এই সবগুলোর মূল হলো দুইটি বিষয়: ১. আপনি আপনার অন্তরকে দুনিয়ার আবাস থেকে স্থানান্তরিত করে আখিরাতের আবাসে বসবাস করাবেন। (প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনার আগ্রহ, উদ্দীপনা থাকবে আখিরাতমুখী।)
২. এবং পরিপূর্ণ মনোযোগের সাথে কুরআনের শব্দ, অর্থ, উদ্দেশ্য, তাৎপর্য, নাযিল হওয়ার কারণ ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। প্রতিটি আয়াত থেকে নিজের করণীয় ও বর্জনীয় কী, তা গ্রহণ করবেন এবং নিজের অন্তরের রোগ নিরাময়ে সেগুলোকে প্রয়োগ করবেন।
(বইয়ের শুরু থেকে নিয়ে এই পর্যন্ত যা আলোচনা) এই হলো সুমহান বন্ধু (আল্লাহ) পর্যন্ত পৌঁছার সংক্ষিপ্ত, সহজ ও নিকটতম পথ। এটি এমন নিরাপদ পথ, যে পথে চলতে পথিকের কোনো ভয় নেই, কোনো ক্ষয় নেই, কোনো ক্ষুধা-তৃষ্ণা নেই। আর এ পথে কোনো বিপদাপদও নেই। এতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রহরী ও নিরাপত্তারক্ষী নিযুক্ত থাকে, যারা পথিকদের সুরক্ষা দেয় এবং পথের বিপদাপদ থেকে বাঁচায়। এই পথের মর্যাদা কেবল তারাই অনুধাবন করতে পারবে, যারা মানুষের তৈরি পথসমূহ এবং সে পথের বিপদাপদ, প্রতিবন্ধকতা ও চোর-ডাকাত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। আল্লাহ তাআলাই সাহায্য-লাভের একমাত্র উৎস।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية