📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 প্রবন্ধ : অন্তর বিনষ্টকারী বস্তুসমূহ

📄 প্রবন্ধ : অন্তর বিনষ্টকারী বস্তুসমূহ


অন্তর বিনষ্টকারী বস্তু হলো পাঁচটি: ১. মানুষের সাথে অধিক মেলামেশা করা, ২. অতিরিক্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা করা, ৩. গাইরুল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক রাখা, ৪. সবসময় পরিতৃপ্তির সাথে খাওয়া এবং ৫. বেশি বেশি ঘুমানো।
জেনে রাখুন—নূর, হায়াত, শক্তি, আত্মিক সুস্থতা, দৃঢ়তা, চোখ ও কানের সুস্থতা, ব্যস্ততা ও বিচ্ছিন্নতা থেকে দূরে থাকা—এগুলোর মাধ্যমে অন্তর আল্লাহ তাআলার দিকে ও আখিরাতের প্রতি ধাবিত হয়।
কিন্তু উপরিউক্ত এই পাঁচটি বস্তু অন্তরের নূরকে নিভিয়ে দেয়, অন্তর্দৃষ্টিকে নিস্তেজ করে ফেলে, বান্দার কানকে ভারী করে তোলে; যদি একেবারে বধির করতে না পারে তবে প্রচণ্ড দুর্বল করে দেয়, অন্তরের সুস্থতায় ব্যাঘাত ঘটায় এবং দৃঢ়তায় স্থবিরতা এনে দেয়। যে ব্যক্তি এগুলো অনুভব করতে পারে না, সে মৃত অন্তরের অধিকারী। কারণ মৃত ব্যক্তির শরীরে আঘাত করলে সে কোনো ব্যথা অনুভব করে না। ফলে পরিপূর্ণতা অর্জনের পথে এটি বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং যে উদ্দেশ্যে মানুষের সৃষ্টি, তাতে পৌঁছাতে বিঘ্নতা সৃষ্টি করে।
এই পাঁচটি বস্তু বান্দার অন্তরে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, কল্যাণ অর্জনের পথ রুদ্ধ করে, পথ চলতে বাধা দেয়, অন্তরে বিভিন্ন রকমের রোগ সৃষ্টি করে; যা থেকে নিরাময়ের ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অন্তরের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।
অধিক মেলামেশার প্রভাব: অধিক মেলামেশার ফলে আদম সন্তানদের শ্বাসপ্রশ্বাসের ধোঁয়ায় অন্তর ভরে ওঠে; এক পর্যায়ে এর প্রভাবে অন্তর কালো হয়ে যায়। বিক্ষিপ্ততা, বিভক্তি, দুঃখ-কষ্ট, পেরেশানি ও দুর্বলতার সৃষ্টি করে। অধিক মেলামেশার কারণে এমন ভার বহন করতে হয়, যা বহন করার ক্ষমতা ব্যক্তির থাকে না; যেমন: অসৎ বন্ধুদের জন্য খরচ করা, নিজের উপকার-কল্যাণকে নষ্ট করে তাদের সময় দেওয়া, তাদের সান্নিধ্য আর তাদের বিষয়াদির মধ্যে ডুবে থাকার কারণে নিজের ভালোমন্দ থেকে অমনোযোগী থাকা, তাদের চাওয়া-পাওয়ার উপত্যকায় নিজের চিন্তাভাবনাকে বিসর্জন দেওয়া ইত্যাদি। সুতরাং (এগুলোর পরে) আল্লাহ তাআলার জন্য এবং আখিরাতের জন্য তার আর কী অবশিষ্ট থাকে?!
এগুলোর পাশাপাশি মানুষের সাথে মেলামেশা আরও কত ধরনের যে বিপদ ও শাস্তি ডেকে আনে! আর কত নিয়ামাত থেকে দূরে রাখে! কত পরিশ্রম আর কাজ যে নামিয়ে আনে এবং কত কাজ যে পণ্ড করে দেয়! (তার কোনো হিসাব নেই।) মানুষের জন্য মানুষ ছাড়া আর কি কোনো বিপদ আছে? আবূ তালিবের মৃত্যুর সময় তার অসৎ বন্ধুদের চেয়ে তার জন্য অধিক ক্ষতিকর আর কিছু কি ছিল?! তারা সবসময় তার সাথে লেগে ছিল; তারা তার মাঝে ও একটি কালিমার মাঝে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল; যে কালিমা তার জন্য চিরস্থায়ী সৌভাগ্য ও শান্তি বয়ে আনত।
দুনিয়ার জীবনে ভালোবাসা ও মহাব্বতের এই সম্পর্কগুলো, যেখানে একজন আরেকজনের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেয়; সেই সম্পর্কগুলোই কিয়ামাতের দিন শত্রুতায় রূপান্তরিত হবে, মেলামেশাকারী ব্যক্তি অনুশোচনায় আফসোসে নিজের হাত কামড়াতে থাকবে। (হায়, যদি তাদের সাথে সম্পর্কে না জড়াতাম!) যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُوْلِ سَبِيلًا ( يَا وَيْلَتُى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيْلًا لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنْسَانِ خَذُوْلًا (3)
"জালিমরা সেদিন নিজেদের হাত কামড়াতে থাকবে এবং বলতে থাকবে, 'হায় আফসোস, আমি যদি রাসূলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম! হায় আমার দুর্ভাগ্য! হায়, আমি যদি অমুককে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে-ই আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। মানুষের জন্য শয়তান বড়োই বিশ্বাসঘাতক প্রমাণিত হয়েছে।” [৮৫৩]
মানুষের সাথে মেলামেশা করার ক্ষেত্রে উপকারী একটি মূলনীতি হলো: সব ধরনের কল্যাণকর কাজে তাদের সাথে মিশবে। যেমন: জুমুআর সালাতে, জামাআতে, ঈদের সালাতে, হাজ্জে, ইলম শিখতে, জিহাদ করতে, উপদেশ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইত্যাদি। আর অকল্যাণ ও মন্দ কাজের ক্ষেত্রে তাদের থেকে দূরে থাকবে। এমনিভাবে ফায়দাহীন বৈধ কাজেও মানুষজন থেকে পৃথক থাকবে। হ্যাঁ যদি মন্দ ও খারাপ কোনো বিষয়ে তাদের সাথে মেশার প্রয়োজন পড়ে এবং তাদের থেকে দূরে থাকা সম্ভব না হয়; তা হলে তাদের সাথে একমত হওয়া থেকে কঠোরভাবে বেঁচে থাকবে এবং তাদের দেওয়া কষ্ট সহ্য করবে। কারণ কারও যদি শক্তি ও সাহায্যকারী না থাকে, তা হলে অবশ্যই তারা তাকে কষ্ট দেবে। তবে এই কষ্টের পরেই তার জন্য রয়েছে ইজ্জত-সম্মান, মহাব্বত, শ্রদ্ধা ও প্রশংসা; তা মানুষের নিকট থেকেও সে পাবে আবার সমস্ত মুমিন এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেও পাবে। কিন্তু যদি তাদের সাথে একমত পোষণ করে, তা হলে এর পরে সে পাবে অপমান, লাঞ্ছনা, শাস্তি ও নিন্দা; মানুষের কাছ থেকেও এবং সমস্ত মুমিন এবং আল্লাহর কাছ থেকেও।
সুতরাং মানুষের দেওয়া কষ্ট ও পেরেশানিতে সবর করাই হলো কল্যাণকর। এর পরিণতি উত্তম ও প্রশংসিত। আর যদি বৈধ কিন্তু অতিরঞ্জিত কোনো বিষয়ে তাদের সাথে মিশতেই হয়, তা হলে যদি শক্তি-সামর্থ্য থাকে সেই মজলিসকে আল্লাহ তাআলার যিকরের মজলিসে পরিণত করবে, এ ক্ষেত্রে নিজেকে উৎসাহিত করবে এবং অন্তরকে দৃঢ় রাখবে। তখন শয়তানি ওয়াসওয়াসার প্রতি ভ্রুক্ষেপও করবে না; যেমন: এটা তো রিয়া (লোক-দেখানো আমল), মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কামানো, নিজের ইলম ও অবস্থান প্রকাশ করা ইত্যাদি। (এগুলোর প্রতি তোয়াক্কা না করে) শয়তানের সাথে লড়াই করবে এবং আল্লাহ তাআলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে। আর যথাসাধ্য মানুষজনকে কল্যাণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে।
অতিরিক্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রভাব: আশা-আকাঙ্ক্ষা এমন এক সমুদ্র, যার কোনো কূল-কিনারা নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্ব ব্যক্তিরাই কেবল এই সমুদ্র পাড়ি জমায়। যেমন বলা হয়, 'অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা হলো সম্বলহীন দেউলিয়া মানুষদের মূলধন।' আর তাদের পাথেয় হলো শয়তানের প্রবঞ্চনা, অসম্ভব ও মিথ্যা কল্পনা। ফলে মিথ্যে আশা ও জল্পনা-কল্পনা তাদের নিয়ে খেলতে থাকে; যেমন কুকুর কোনো মৃতদেহ নিয়ে খেলায় মেতে ওঠে। আসলে এগুলো হলো প্রতিটি ছোটো, নীচ ও অপদস্থ নফসের পাথেয়। তাদের মধ্যে কোনো উচ্চ হিম্মত থাকে না, যার দ্বারা বাস্তবে কোনোকিছু অর্জন করবে। বরং তারা কেবল আশাই করতে থাকে; বাস্তব কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। অধিকাংশ মানুষই নিজের অবস্থা অনুসারে: শক্তি ও কর্তৃত্বের, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করার, ধনসম্পদ ও প্রাচুর্যতা কামানোর অথবা উত্তম স্ত্রী ও সন্তানের আকাঙ্ক্ষা করে। আশা পোষণকারী ব্যক্তি যে বিষয়ের আশা পোষণ করে, তার একটা চিত্র মনের মধ্যে এঁকে নেয়; আর ভাবে সে তা অর্জন করে ফেলেছে এবং এ কারণে আনন্দও বোধ করে। এভাবেই চলতে থাকে; কিন্তু যখন জেগে ওঠে, তখন সে কেবল নিজের হাত আর মাদুরই দেখতে পায়।
আর উচ্চ মনোবল ও হিম্মতের অধিকারী ব্যক্তিদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ইলম ও ঈমান অর্জন করার জন্যই তৃষ্ণার্ত থাকে, যে আমল আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী করে, তারা সে আমলের প্রতিই আগ্রহী থাকে। এই ব্যক্তির আশা হলো ঈমান, নূর ও হিকমত; আর ওই সব ব্যক্তির আশা হলো ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা।
নবি কল্যাণ-প্রত্যাশীর প্রশংসা করেছেন। কিছু বিষয়ে কখনো কখনো তাদের প্রতিদান সরাসরি কাজ সম্পন্নকারীদের প্রতিদানের সমান বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন: কেউ বলল, 'যদি আমার সম্পদ থাকত, তা হলে আমি অমুক ব্যক্তির ন্যায় আমল করতাম'; যে তার সম্পদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে এবং সম্পদের হকও আদায় করে। এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে নবি বলেছেন,
فَهُمَا فِي الْأَجْرِ سَوَاءٌ “সাওয়াবের ক্ষেত্রে তারা দুজন সমান।” [৮৫৪]
গাইরুল্লাহ বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সাথে গভীর সম্পর্ক রাখার প্রভাব: এটি অন্তরের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। এর চেয়ে অনিষ্টকর আর কিছু নেই। বান্দাকে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে এটি মূল ভূমিকা পালন করে। এটি কল্যাণ ও সৌভাগ্য থেকেও ব্যক্তিকে বঞ্চিত রাখে। কারণ কেউ যখন (ইবাদাতের ক্ষেত্রে) আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কারও সাথে সম্পর্কে জড়ায়, তখন আল্লাহ তাকে সেই ব্যক্তির ওপরই ন্যস্ত করে দেন এবং তার মাধ্যমেই তাকে অপমানিত ও অপদস্থ করেন। ফলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সে সম্পর্ক রাখে, তা-ও সফল হয় না। সমস্ত আশা-উদ্দেশ্য নস্যাৎ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاتَّخَذُوا مِنْ دُوْنِ اللَّهِ آلِهَةً لَّعَلَّهُمْ يُنْصَرُوْنَ (3) لَا يَسْتَطِيعُونَ نَصْرَهُمْ وَهُمْ لَهُمْ جُنْدٌ مُحْضَرُونَ
"তারা আল্লাহর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে; এই আশায় যে, তাদের সাহায্য করা হবে। অথচ এসব উপাস্য তাদেরকে সাহায্য করার সক্ষমতা রাখে না; বরং তারা হবে এদের (মতোই শাস্তিপ্রাপ্ত) এক বাহিনী, যাদের হাজির করা হবে।" [৮৫৫]
সুতরাং মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারও সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। কেননা এর কারণে যে কল্যাণ, সৌভাগ্য ও সফলতা সে হারায়; তা অনেক বড়ো; যা সে অপরের সাথে সম্পর্ক করে পায় তার তুলনায়। আর তা তো ক্ষণিকের পাওয়া। অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। গাইরুল্লাহর সাথে সম্পর্ককারীর উপমা হলো সেই ব্যক্তির মতো, যে তাপ কিংবা ঠান্ডা থেকে বাঁচতে মাকড়সার ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেয়; যা সবচেয়ে দুর্বল ঘর!
পরিতৃপ্তির সাথে খাদ্যগ্রহণের প্রভাব: অন্তর বিনষ্টকারী খাদ্য দুই প্রকার:
এক. এমন খাবার, যার মূল উপাদানই অন্তরের বিনাস সাধন করে। যেমন হারাম বস্তুসমূহ। এটি আবার দুই প্রকার। এক প্রকার হলো: আল্লাহ তাআলার হকের ক্ষেত্রে; যেমন: মৃতবস্তু, রক্ত, শূকরের গোশত, সুচালো দাঁতবিশিষ্ট প্রাণী, ধারালো নখবিশিষ্ট পাখি ইত্যাদি খাওয়া।
আরেক প্রকার হলো: বান্দার হকের ক্ষেত্রে; যেমন: চুরি করা বস্তু, আত্মসাৎকৃত সম্পদ, ছিনতাই করা অর্থ, এমনিভাবে সেই অর্থকড়ি; যা কারও সন্তুষ্টি ব্যতীত গ্রহণ করা হয় হয়তো জোরজবরদস্তি করে অথবা লজ্জায় ফেলে দিয়ে।
দুই. এমন খাবার, যা পরিমাণ ও সীমালঙ্ঘনের কারণে অন্তরের ক্ষতি করে; যেমন: হালাল বিষয়ে অপচয় করা, অতিরিক্ত পরিতৃপ্ত হওয়া। কেননা এগুলো ব্যক্তিকে ইবাদাতে ভারী করে তোলে। অর্থ ও খাদ্য সংগ্রহে ব্যস্ত রাখে। খাওয়া-দাওয়া করা আর এর ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকতেই অধিকাংশ সময় চলে যায়। এর দ্বারা ব্যক্তির শাহওয়াত (প্রবৃত্তি) শক্তিশালী হয়। শয়তানের আসা-যাওয়ার পথ তৈরি করে দেয় এবং সেই পথকে প্রশস্ত বানায়। কেননা শয়তান মানুষের রক্তনালী ও রগে রগে বিচরণ করে। এই কারণে সাওম শয়তানের পথকে সংকীর্ণ রাখে এবং বন্ধ করে দেয়। আর পেট ভরে পরিতৃপ্তির সাথে খাবার গ্রহণ করা শয়তানের পথ প্রশস্ত করে। যে ব্যক্তি বেশি খায়, বেশি পান করে সে ঘুমায়ও বেশি; ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তও হয় বেশি। একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে এসেছে, নবি বলেছেন,
مَا مَلَا آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِّنْ بَطْنٍ، بِحَسْبِ ابْنِ آدَمَ أُكُلَاتٌ يُقِمْنَ صُلْبَهُ، فَإِنْ كَانَ لَا مَحَالَةَ: فَثُلُثٌ لِطَعَامِهِ، وَثُلُثٌ لِشَرَابِهِ وَثُلُثٌ لِنَفْسِهِ
“পেট হতে অধিক নিকৃষ্ট কোনো পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে, এমন কয়েক লোকমা খাবারই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। আর তার চেয়ে বেশি যদি খেতেই হয়, তা হলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য অবশিষ্ট রাখবে।” [৮৫৬]
বেশি বেশি ঘুমানোর প্রভাব: অধিক নিদ্রা অন্তরকে মেরে ফেলে, শরীরকে ভারী বানায়, সময় নষ্ট করে, অত্যধিক অমনোযোগিতা ও অলসতা সৃষ্টি করে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘুম সবসময়ই অপছন্দনীয় ও শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
সবচেয়ে উপকারী ঘুম হলো: যখন ঘুমের চাহিদা তীব্র হয়, তখন ঘুমানো। রাতের শেষ প্রহরে ঘুমানোর চেয়ে প্রথম প্রহরে ঘুমানো অধিক প্রশংসনীয় ও কল্যাণকর। আর মধ্যরাতের ঘুম রাতের দুই প্রান্তের ঘুমের চেয়ে বেশি উপকারী। যখনই ঘুম দুই প্রান্তের নিকটবর্তী হয়, তখন উপকার কমতে থাকে এবং ক্ষতি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।। বিশেষ করে আসরের সময় ও দিনের শুরুর সময় (ফজরের পর) ঘুমানো বেশি ক্ষতিকর; তবে বিশেষ প্রয়োজনে রাত্রিজাগরণ করতে হলে ভিন্নকথা।
নিন্দনীয় ও অপছন্দনীয় ঘুমের মধ্যে অন্যতম হলো: ফজরের সালাত ও সূর্য উদিত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে ঘুমানো। কারণ এই সময়টা হলো বরকতময় ও গনীমতপূর্ণ সময়। সালিকীনদের নিকট এই সময়ে সফর করার আলাদা বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব রয়েছে। কেননা এটি হলো দিনের শুরু, দিনের চাবি এবং রিস্ক অবতীর্ণ হওয়ার সময়। এ সময় রিযক বণ্টন করা হয় এবং আসমান থেকে বরকত অবতীর্ণ হয়। এর দ্বারাই দিন অস্তিত্বে আসে। এই সময়ের অবস্থা অনুসারেই পুরা দিনটা কেমন যাবে, তা নির্ধারিত হয়। সুতরাং এ সময় একান্ত অপারগতা ব্যতীত ঘুমানো অনুচিত।
মোটকথা ভারসাম্যপূর্ণ ও সবচেয়ে উপকারী ঘুম হলো রাতের প্রথম অর্ধেক এবং শেষের এক-ষষ্ঠাংশ সময় ঘুমানো।

টিকাঃ
[৮৫৩] সূরা ফুরকান, ২৫: ২৭-২৯।
[৮৫৪] বিস্তারিত দেখুন-তিরমিযি, ২৩২৫; ইবনু মাজাহ, ৪২২৮, সহীহ।
[৮৫৫] সূরা ইয়া-সীন, ৩৬: ৭৪।
[৮৫৬] তিরমিযি, ২৩৮০; ইবনু মাজাহ, ৩৩৪৯।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 প্রবন্ধ : আখিরাত থেকে দূরে থাকার যত কারণ

📄 প্রবন্ধ : আখিরাত থেকে দূরে থাকার যত কারণ


যদি প্রশ্ন করেন: চিরসুখের জীবন, যার কোনো তুলনা নেই, সে জীবন অন্বেষণ করা থেকে নফসের দূরে থাকার কারণ কী? কীসে তাকে এর থেকে ভুলিয়ে রাখছে? আর এই ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রতি কেন তার এত আগ্রহ; যা কল্পনা আর স্বপ্নের মতো? উপলব্ধির ঘাটতি নাকি আখিরাতকে অস্বীকার করার কারণে? নাকি বুদ্ধি-বিবেচনা ক্ষতিগ্রস্ত, ফলে তা থেকে অন্ধ হয়ে আছে? নাকি যা অনুপস্থিত, ঈমানের মাধ্যমে জানা যায়, তার ওপর বর্তমানে যা চোখে দেখা যাচ্ছে তাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে?
উত্তর হলো: প্রশ্নোক্ত সবগুলোই এর কারণ।
আর এর সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ হলো ঈমানের দুর্বলতা। কেননা ঈমান হলো আমলের রূহ। ঈমানই ব্যক্তিকে আমলে উদ্বুদ্ধ করে, উত্তম ও নেককাজ করতে আদেশ দেয়, অশ্লীল ও অপকর্মে লিপ্ত হওয়া থেকে নিষেধ করে। ঈমানের শক্তি অনুসারেই ব্যক্তি আমলে অগ্রসর হয় এবং আদেশ-নিষেধ পালনে তৎপরতা দেখায়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُلْ بِئْسَمَا يَأْمُرُكُمْ بِهِ إِيْمَانُكُمْ إِنْ كُنتُمْ مُّؤْمِنِينَ "যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো, তা হলে এ কেমন ঈমান, যা তোমাদের এমন খারাপ কাজের নির্দেশ দেয়?" [৮৫৭]
মূলকথা হলো : যখন ঈমানের শক্তি পূর্ণতা পায়, তখন আখিরাতের জীবনের প্রতি আগ্রহও শক্তিশালী হয় এবং তা অন্বেষণে ব্যক্তির তৎপরতাও বেড়ে যায়।
দুই নং কারণ: অন্তরে অমনোযোগিতা এসে ভিড় করা। কেননা অমনোযোগিতা হলো অন্তরের নিদ্রা। আর এ কারণেই আপনি অনেক মানুষকে এমন পাবেন, যারা বাহ্যিকভাবে জাগ্রত; কিন্তু প্রকৃতার্থে ঘুমন্ত। আপনি তাদেরকে দেখবেন তারা জাগ্রত; অথচ তারা ঘুমিয়ে রয়েছে। এর বিপরীত অবস্থা হলো তাদের, যাদের অন্তর জাগ্রত; কিন্তু তারা শারীরিকভাবে ঘুমন্ত। কেননা অন্তর যখন প্রাণবন্ত থাকে, তখন শরীর ঘুমিয়ে পড়লেও অন্তর ঘুমায় না। সবচেয়ে বেশি প্রাণশক্তিম্পন্ন অন্তরের অধিকারী ছিলেন আমাদের নবি এবং সেই ব্যক্তি, যার অন্তরকে আল্লাহ নবিজির মহাব্বতে ও তাঁর রিসালাতের পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে জাগ্রত করে দিয়েছেন।
আসলে সচেতনতা ও অসচেতনতা সৃষ্টি হয় অনুভূতি, বোধবুদ্ধি ও অন্তরে। অন্তরের জাগ্রত ও ঘুমন্ত ব্যক্তি হলো শারীরিকভাবে জাগ্রত ও ঘুমন্ত ব্যক্তি ন্যায়। বাহ্যিক জাগরণ যেমন দুই প্রকার; তেমনি অভ্যন্তরীণ জাগরণও দুই প্রকার।
বাহ্যিক জাগরণের প্রথম প্রকার: এই গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি তার বাহ্যিক সমস্ত কাজকর্মকে যথাযথভাবে আঞ্জাম দেয়, গভীর মনোযোগ ও সচেতনতার সাথে সেগুলোতে সফলতা অর্জন করার চেষ্টা করে এবং তাতে উত্তম পন্থা অবলম্বন করে।
বাহ্যিক জাগরণের দ্বিতীয় প্রকার: নিজ সত্তা ও অন্তরের প্রতি মনোযোগী হয়। ফলে বান্দা তাতে পরিপূর্ণতা অর্জনের চেষ্টার মশগুল হয়। উত্তম-অনুত্তম ও ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করে নীচ গুণাবলির ওপর উত্তম গুণাবলিকে প্রাধান্য দেয়। দুটি বিষয়ের মধ্যে যেটা উত্তম, সেটাকে বেছে নেয়। দুটি মন্দের মধ্যে পরিণতিতে যেটা হালকা, সেটা গ্রহণ করে; এই আশঙ্কায় যে, শক্তিশালী ও বেশি মন্দ বিষয়টি যেন তার অংশে চলে না আসে। সে সব ধরনের সুন্দর আচার-আচরণে নিজেকে সুসজ্জিত করে; ফলে তার বাহ্যিক অবয়ব সুন্দর হয়ে যায়। আর তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা বাহ্যিক অবস্থার চেয়েও পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিরা উত্তম স্বভাব-চরিত্র অর্জনে সেভাবেই তৎপর হয়ে ওঠে, যেভাবে সম্পদ লোভীরা দীনার-দিরহামের জন্য প্রতিযোগিতা করে। এই ধরনের জাগরণ ও সচেতনতার মাধ্যমে ব্যক্তি অন্য দুইটি বিষয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে তোলে।
এক. এর মাধ্যমে সে চিরস্থায়ী সুখের জীবন অর্জনে উদ্যমী হয়ে ওঠে; যে জীবনের কোনো তুলনা হয় না। দুনিয়ার এই জীবন তো ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী; যার কোনো মূল্যই নেই।
এখন যদি আপনি প্রশ্ন করেন: ক্ষণস্থায়ী ধ্বংসশীল এ জীবনে অবস্থান করে কীভাবে আমি অনন্তকালীন জীবনের সুখ-শান্তি অর্জন করব? কীভাবে এটি হতে পারে? আমি বুঝতে পারছি না! আমার জন্য বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করুন।
এর উত্তরে আমি বলব : এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে অন্তর ঘুমন্ত বলে; বরং বলা যায় এটি হলো অন্তরের মৃত্যুর ফল। ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ায় অবস্থান করা ছাড়া আর কোথা থেকে আখিরাতের অনন্তজীবন লাভ করা যায়? যেমন আপনি আপনার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করেন নিভু নিভু কোনো একটি প্রদীপ থেকে; যা প্রায় নিভে যাওয়ার উপক্রম। এর ফলে আপনার প্রদীপটি জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে, তার আলোয় আশপাশ আলোকিত হয়, আর প্রথম প্রদীপটি নিভে যায়। দুনিয়ার জীবনে অবস্থান করে আখিরাতের জীবনকে আবাদকারী ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী বাসস্থান থেকে চিরস্থায়ী বাসস্থানে স্থানান্তরিত হয়। এই দুই বাসস্থানের একটি থেকে অপরটিতে যাওয়ার মাধ্যম ও সেতু হলো মৃত্যু; যা পাড়ি দেওয়া ব্যতীত কেউই আখিরাতে যেতে পারে না। মৃত্যু হলো আখিরাতে প্রবেশের একমাত্র দরজা। দুনিয়া ও আখিরাত দুইটি জীবন; মাঝে রয়েছে কেবল মৃত্যু। যেরকমভাবে আখিরাতের জীবনের আলো দুনিয়ার এই জীবনেই অর্জন করতে হয়; তেমনিভাবে দুনিয়ার জীবনেই আখিরাতের জীবন অর্জন করে নিতে হয়। সুতরাং দুনিয়ার এই জীবনে ঈমানের আলো যেমন হবে, আখিরাতের জীবনে ব্যক্তি তেমন আলোই লাভ করবে। আবার দুনিয়ার এই জীবন যতটুকু ঈমানি জিন্দেগি হবে, আখিরাতের জীবনেও ততটুকু সুখ-শান্তি লাভ করবে।
দুনিয়ার জীবনের এই আলো ও ঈমানি অবস্থা কবরজীবনে হারিয়ে যাবে না; বরং ব্যক্তির জন্য তা আলো হয়ে থাকবে। এমনিভাবে কিয়ামাতের ময়দানে, পুলসিরাতে সব জায়গায় তা ঈমানদারদের সঙ্গ দেবে; যতক্ষণ-না তারা আখিরাতের স্থায়ী ঠিকানায় পৌঁছে যায়। সূর্যের আলো নিভে যাবে; কিন্তু এই আলো কখনো নিভে।
যাবে না। দুনিয়ার এ জীবন শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু সে জীবন কখনো ফুরাবে না। এটি হলো অভ্যন্তরীণ জাগরণের প্রথম প্রকার।
অভ্যন্তরীণ জাগরণের দ্বিতীয় প্রকার: এই জাগরণ এমন জীবনের প্রতি উদ্‌বুদ্ধ করে, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কল্পনাও সে পর্যন্ত বিচরণ করতে অক্ষম। শব্দের মাধ্যমে তার বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। সেই জীবনের উপমা হলো প্রিয় মানুষের সাথে ব্যক্তির জীবন; যাকে ব্যতীত তার অন্তর, রূহ ও জীবনের কোনো মূল্য নেই, এক পলকও যার থেকে অমুখাপেক্ষী থাকা যায় না, যাকে ছাড়া চোখের শীতলতা, অন্তরের নিশ্চিন্ততা আর রূহের স্থিরতা নেই। সে তার প্রতি নিজের কান, চোখ, খাবার; এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি মুখাপেক্ষী। সে ব্যতীত তার জীবন দুঃখকষ্ট ও আযাবময়। তার নৈকট্য, ভালোবাসা ও সঙ্গ পাওয়ার মাঝেই তার জীবন সীমাবদ্ধ। সে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার শাস্তি, অন্যান্য শাস্তি থেকে বেশি যন্ত্রণাদায়ক। যেমন আখিরাতে আল্লাহকে দেখার প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে গেলে অন্তর যে আনন্দ ও তৃপ্তি অনুভব করবে, তা খাওয়া-পান করা এবং হৃরদের সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর তৃপ্তি থেকে বহুগুণ বেশি হবে। এমনিভাবে আল্লাহকে না দেখে আড়ালে থাকার শাস্তি, জাহান্নামের শাস্তির চেয়ে তীব্র। এই কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর আউলিয়াদের জন্য এই দুই প্রকার নিয়ামাতের কথাই উল্লেখ করেছেন-
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ
"যারা সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে 'হুসনা' এবং আরও বেশি।”[৮৫৮]
এখানে 'হুসনা' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: জান্নাত এবং 'আরও বেশি' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: জান্নাতে আদনে আল্লাহ তাআলার দর্শন। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর শত্রুদের ব্যাপারে এই দুই প্রকার আযাবের কথাই উল্লেখ করেছেন-
كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُوْنَ * ثُمَّ إِنَّهُمْ لَصَالُو الجَحِيمِ
"কখনো নয়, নিশ্চিতভাবেই সেদিন তাদেরকে তাদের রবের দর্শন থেকে বঞ্চিত রাখা হবে। অতঃপর তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। "[৮৫৯]
মোটকথা অমনোযোগিতার কারণে আখিরাতের জীবন অন্বেষণ করা থেকে অন্তর ঘুমিয়ে থাকে। আর এটিই হলো অন্তরের পর্দা।
যদি এই অমনোযোগিতার পর্দাকে আল্লাহ তাআলার যিকিরের মাধ্যমে দূর করা হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় তা আরও ঘনীভূত হবে। একসময়ে তা অলসতা, খেলাধুলা ও অনর্থক বিষয়াদিতে মশগুল হওয়ার পর্দায় পরিণত হবে।
যদি দ্রুত এই পর্দা দূর করার প্রতি মনোযোগী হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় আরও ঘনীভূত হয়ে একসময় তা অবাধ্যতা ও সগীরা গুনাহের পর্দায় পরিণত হবে; যা ব্যক্তিকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।
যদি দ্রুত এই পর্দা দূর করার প্রতি মনোযোগী হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় আরও ঘনীভূত হয়ে একপর্যায়ে তা কবীরা গুনাহের পর্দায় পরিণত হবে; যা আল্লাহর ক্রোধ, গজব ও লা'নতকে আবশ্যক করবে।
যদি দ্রুত এই পর্দা দূর করার প্রতি মনোযোগী হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় আরও ঘনীভূত হয়ে একসময়ে তা আমলি বিদআতের পর্দায় পরিণত হবে। যার দ্বারা ব্যক্তি নিজেই নিজেকে শাস্তি দেবে এবং আমল করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাবে, কিন্তু কোনো ধরনের কল্যাণ ও উপকারিতার দেখা পাবে না।
যদি দ্রুত এই পর্দা অপসারণ করার প্রতি মনোযোগী হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় তা আরও ঘনীভূত হয়ে একসময়ে কওলি বিদআতের পর্দায় পরিণত হবে; যা আকীদা-বিশ্বাসকে নষ্ট করে দেবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর মিথ্যা আরোপ করা এবং রাসূল ﷺ যে সত্য নিয়ে এসেছেন, তা মিথ্যা সাব্যস্ত করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
যদি দ্রুত এই পর্দা দূর করার প্রতি মনোযোগী হয়, (তা হলে তো ভালো); অন্যথায় তা আরও ঘনীভূত হয়ে একসময়ে সংশয় ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করার পর্দায় পরিণত হবে; যা ইসলামের পাঁচটি ভিত্তিতেই সংশয় সৃষ্টি করবে। ইসলামের পাঁচটি ভিত্তি হলো:
১. আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান,
২. ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান,
৩. আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, ৪. রাসূলগণের প্রতি ঈমান এবং ৫. আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাতের প্রতি ঈমান।
ওই ব্যক্তির অন্তরে যে পর্দা পড়েছে তা মোটা, ঘন, কালো ও অন্ধকার হওয়ার দরুন সে ঈমানের মর্ম বুঝতে পারে না। শয়তান তার মাঝে জায়গা করে নেয়, তাকে প্রতিশ্রুতি দান করে আর আশার ধোঁকায় ফেলে রাখে। তার নফসে আম্মারা তাকে মন্দ ও অশ্লীল কাজকর্মে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করে। প্রবৃত্তির শক্তি ঈমানের শক্তির ওপর বিজয় লাভ করে। যদি তা ধ্বংস করতে না পারে, তবে তাকে বন্দি করে ও আটকে রাখে। ফলে প্রবৃত্তির শক্তিই পুরা দেহরাজ্য পরিচালনা করে এবং চাহিদার সৈন্যসামন্তকে দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করিয়ে নেয়। নেক আমল করার স্পৃহা নষ্ট করে দেয়। সচেতনতা ও জাগ্রত হওয়ার দরজা বন্ধ করে দেয়। অন্তরে গাফলত ও অমনোযোগিতার প্রহরী নিযুক্ত করে এবং বলে, 'সাবধান! তোমার দিক থেকে যেন নেক আমলের কোনো আগ্রহ-উদ্দীপনা প্রবেশ করতে না পারে।' প্রবৃত্তির সৈন্যদের থেকে একজনকে দারোয়ান বানিয়ে দিয়ে তাকে বলে, 'তোমার কাছ থেকে যেন কেউ ভেতরে প্রবেশ করে আমার নিকট আসতে না পারে। হ্যাঁ কেউ এলে তুমি তার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। আমাদের এই রাজত্বের যাবতীয় বিষয়াদি তোমার ও প্রহরীর নিকট ন্যস্ত রইল। সুতরাং হে গাফলতের প্রহরী, হে প্রবৃত্তির দারোয়ান, তোমরা নিজের সীমানা খুব ভালো করে আগলে রাখবে, যদি হেরফের হয়, তা হলে আমাদের রাজত্ব হাতছাড়া হয়ে যাবে, শাসনক্ষমতা আবার আমাদের ভিন্ন অন্য কারও নিকট চলে যাবে, ঈমানের শক্তি আমাদের পরাজিত করে ফেলবে; তা কত-না নিকৃষ্ট অপমান ও অপদস্থতা! আমরা আর কোনোদিন এই শহরে (দেহের ভেতরে) আনন্দ-উল্লাস করতে পারব না!
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! যদি এই সৈন্যবাহিনী অন্তরে জমা হয়; আর সাথে থাকে ঈমানের দুর্বলতা, রসদের স্বল্পতা, আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখতা, দুনিয়াদারদের পদাঙ্ক অনুসরণ এবং দীর্ঘ আশা, যা মানুষকে শেষ করে দেয়-তা হলে উপস্থিত, বর্তমান দুনিয়া প্রাধান্য পেয়ে যাবে অনুপস্থিত আখিরাতের ওপর, যা এই পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হওয়ার পরে সামনে আসবে। আল্লাহ তাআলাই সাহায্য-লাভের একমাত্র উৎস। ভরসা করতে হবে কেবল তারই ওপর।

টিকাঃ
[৮৫৭] সুরা বাকারা, ২: ৯০।
[৮৫৮] সূরা ইউনুস, ১০: ২৬।
[৮৫৯] সূরা মুতাফফিফীন, ৮৩: ১৫-১৬।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 প্রবন্ধ : বিভিন্ন আমলের ফলাফল ও উপকারিতা

📄 প্রবন্ধ : বিভিন্ন আমলের ফলাফল ও উপকারিতা


ভয়ের ফল-তাকওয়া, দৃঢ়তা ও ছোটো আশা।
আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখার ফল-যুহুদ বা দুনিয়াবিমুখতা।
মা'রিফাতের ফল-মহাব্বত, ভয় ও আশা।
অল্পেতুষ্টির ফল-সন্তুষ্টি।
যিক্র বা আল্লাহর স্মরণের ফল-অন্তরের প্রাণবন্ত জীবন।
তাকদীরের ওপর বিশ্বাসের ফল-তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা।
আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলিতে অবিরাম চিন্তাভাবনার ফল-মা'রিফাত বা আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান।
আল্লাহভীতির ফল-দুনিয়াবিমুখতা।
তাওবার ফল-মহাব্বত বা ভালোবাসা।
সবসময় যিক্র করার দ্বারাও মহাব্বত সৃষ্টি হয়।
সন্তুষ্টির ফল-শোকর।
সংকল্পের দৃঢ়তা ও ধৈর্যের ফল-সব ধরনের হাল (বিশেষ অবস্থা) ও মাকাম।
ইখলাস ও সত্যবাদিতা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। একটি অপরটির ফল এবং একটি অপরটিকে দাবি করে।
মা'রিফাত বা আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানের ফল-উত্তম আখলাক।
চিন্তা-ফিকিরের ফল-সংকল্পের দৃঢ়তা।
মুরাকাবা বা ধ্যান করার ফল-সময়ের সদ্ব্যবহার ও এর হেফাজত এবং লজ্জা, ভয় ও আল্লাহমুখিতা।
নফসকে মেরে ফেলা এবং অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করার দ্বারা অন্তরের প্রকৃত জীবন, সম্মান ও ইজ্জত লাভ হয়।
নিজের নফস ও নফসের চাহিদা এবং নিজের আমলের কমতি ও পাপাচারের আধিক্য সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জাশীলতাকে আবশ্যক করে।
সঠিক অন্তর্দৃষ্টির ফল-ইয়াকীন বা দৃঢ় বিশ্বাস।
যেসব নিদর্শন মানুষ নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করে এবং শ্রবণ করে তাতে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করার ফল-সঠিক অন্তর্দৃষ্টি।
এই সবগুলোর মূল হলো দুইটি বিষয়: ১. আপনি আপনার অন্তরকে দুনিয়ার আবাস থেকে স্থানান্তরিত করে আখিরাতের আবাসে বসবাস করাবেন। (প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনার আগ্রহ, উদ্দীপনা থাকবে আখিরাতমুখী।)
২. এবং পরিপূর্ণ মনোযোগের সাথে কুরআনের শব্দ, অর্থ, উদ্দেশ্য, তাৎপর্য, নাযিল হওয়ার কারণ ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। প্রতিটি আয়াত থেকে নিজের করণীয় ও বর্জনীয় কী, তা গ্রহণ করবেন এবং নিজের অন্তরের রোগ নিরাময়ে সেগুলোকে প্রয়োগ করবেন।
(বইয়ের শুরু থেকে নিয়ে এই পর্যন্ত যা আলোচনা) এই হলো সুমহান বন্ধু (আল্লাহ) পর্যন্ত পৌঁছার সংক্ষিপ্ত, সহজ ও নিকটতম পথ। এটি এমন নিরাপদ পথ, যে পথে চলতে পথিকের কোনো ভয় নেই, কোনো ক্ষয় নেই, কোনো ক্ষুধা-তৃষ্ণা নেই। আর এ পথে কোনো বিপদাপদও নেই। এতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রহরী ও নিরাপত্তারক্ষী নিযুক্ত থাকে, যারা পথিকদের সুরক্ষা দেয় এবং পথের বিপদাপদ থেকে বাঁচায়। এই পথের মর্যাদা কেবল তারাই অনুধাবন করতে পারবে, যারা মানুষের তৈরি পথসমূহ এবং সে পথের বিপদাপদ, প্রতিবন্ধকতা ও চোর-ডাকাত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। আল্লাহ তাআলাই সাহায্য-লাভের একমাত্র উৎস।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00