📄 অন্তরে আড়াল সৃষ্টিকারী পর্দা দশটি
১. আল্লাহকে নিষ্ক্রিয় মনে করা এবং তাঁর নাম ও গুণাবলির হাকীকতকে অস্বীকার করার পর্দা: এটি সবচেয়ে মোটা পর্দা। যার ফলে এই রকম পর্দার অধিকারী ব্যক্তির জন্য আল্লাহর পরিচয় পাওয়া এবং তাঁর নিকট পৌঁছা কখনো সম্ভব হয় না। যেমন পাথরের জন্য ওপরে আরোহণ করা সম্ভব হয় না।
২. শিরকের পর্দা: এটি হলো অন্তর দ্বারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদাত করা।
৩. বিদআতি কথার পর্দা যেমন: প্রবৃত্তিপূজারি এবং যারা নিজেদের মনমতো বাতিল কথাবার্তা বলে, তাদের পর্দা।
৪. বিদআতি আমলের পর্দা যেমন: বিদআতপন্থিদের পর্দা; যারা তাদের পথ ও অভিমতে নতুন কিছু সৃষ্টি করে নেয়।
৫. গোপন-কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের পর্দা: যেমন: অহংকার, রিয়া, হিংসা, আত্মগর্ব, দাম্ভিকতা ইত্যাদিতে লিপ্ত ব্যক্তিদের পর্দা।
৬. প্রকাশ্য-কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের পর্দা এদের পর্দা গোপন-কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের পর্দার চেয়ে ক্ষতিকর ও তীক্ষ্ণ। কারণ যারা গোপনে গুনাহ করে তাদের গোপন-গুনাহ থাকলেও তারা ইবাদাত-বন্দেগি করে। সুতরাং তারা প্রকাশ্য-কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের তুলনায় তাওবার বেশি কাছাকাছি থাকে। কারণ প্রকাশ্য-কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি মানুষের সামনে গুনাহে লিপ্ত হতে কোনো লজ্জা অনুভব করে না এবং ইবাদাত-বন্দেগিও তেমন করে না, ফলে তাদের অনুতপ্ত হওয়া বেশ কঠিন। তাদের অন্তর গোপনে কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের চেয়ে নিকৃষ্ট।
৭. সগীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের পর্দা।
৮. বৈধ বিষয়ে বিলাসিতাকারীদের পর্দা।
৯. গাফিলদের পর্দা: যারা তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য থেকে গাফিল। তাদের ওপর আল্লাহর কী হক রয়েছে; যেমন: সবসময় তাঁর যিক্র করা, তাঁর শুকরিয়া আদায় করা, তাঁর ইবাদাত করা ইত্যাদি থেকে তারা উদাসীন ও অমনোযোগী।
১০. আল্লাহর পথে পরিশ্রমী ব্যক্তিগণ, যারা উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে পথ চলতে থাকে তাদের পর্দা।
আল্লাহ তাআলার মাঝে ও বান্দার অন্তরের মাঝে এই দশটি পর্দা রয়েছে; যার কারণে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক তৈরিতে প্রতিবন্ধকতা আসে। এই পর্দাগুলো সৃষ্টি হয় চারটি উপাদান থেকে: নফস, শয়তান, দুনিয়া ও অবৈধ কামনা। সুতরাং অন্তরে এই উপাদানগুলোর মূল উপস্থিত থাকা অবস্থায় অন্তরের পর্দাগুলো দূর করা সম্ভব নয়।
অন্তরে এই চারটি উপাদান প্রকট হওয়া না-হওয়ার ভিত্তিতে কথা, কাজ, ইচ্ছা ও পথ সবকিছুর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এগুলো কথা, কাজ ও ইচ্ছার পথকে অন্তর পর্যন্ত পৌঁছতে বাধা সৃষ্টি করে। যদি তা কোনোভাবে অন্তর পর্যন্ত পৌঁছে, তা হলে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার পথ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করে। কথা ও কাজ এবং অন্তরের মাঝে একটি দূরত্ব রয়েছে। ফলে তা অন্তরে পৌঁছিয়ে দিতে বান্দাকে সফর করতে হয়। যাতে সেখানকার আশ্চর্য দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে পারে। কিন্তু এই পথের চোর-ডাকাত হলো সেই উপাদানগুলো। যদি কেউ সেগুলোর সাথে যুদ্ধ করে সফল হয় এবং আমলকে অন্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, তা হলে আমল তার আশেপাশে ঘুরতে থাকে এবং আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার পথ খোঁজে। কারণ তাঁর নিকট না পৌঁছানো ব্যতীত কিছুই স্থির হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَنَّ إِلَى رَبِّكَ الْمُنْتَهَى )
“তোমার পালনকর্তার কাছেই সবকিছুর সমাপ্তি।”[৮৫০]
যখন তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়, তখন তিনি এর কারণে আমলকারীর ঈমান, ইয়াকীন, ইলম, মা'রিফাত, বুদ্ধি-বিবেচনা আরও বাড়িয়ে দেন, তার ভেতর-বাহির সুন্দর করে দেন। এর কারণে নেক আমল ও উত্তম আখলাকের পথ দেখান, মন্দ আমল ও স্বভাব থেকে দূরে রাখেন। আল্লাহ তাআলা অন্তরের জন্য ইলমকে সৈন্য হিসেবে নিযুক্ত করেন; ফলে সে আমলসমূহ অন্তর পর্যন্ত পৌঁছার পথে পথদস্যুদের সাথে লড়াই করবে। দুনিয়ার সাথে লড়াই করবে যুহদ বা দুনিয়াবিরাগের মাধ্যমে এবং অন্তর থেকে দুনিয়াকে বের করে দেওয়ার মাধ্যমে। তবে দুনিয়ার প্রাচুর্যতা ব্যক্তির হাতে ও ঘরে থাকলে তা তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না এবং তার আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস করা থেকেও বিরত রাখে না। শয়তানের সাথে যুদ্ধ করবে প্রবৃত্তির আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার মাধ্যমে। কারণ শয়তান সবসময় কুপ্রবৃত্তির সাথে থাকে; এর থেকে সে কখনো পৃথক হয় না। এমনিভাবে অবৈধ কামনার সাথে যুদ্ধ করবে আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন করার মাধ্যমে এবং সব ক্ষেত্রেই ইসলামের বিধিনিষেধ অনুসরণ করার মাধ্যমে। অবশেষে ব্যক্তির করা না- করা কোনো কাজেই অবৈধ কামনার কোনো অংশ থাকে না। আর নফসের সাথে যুদ্ধ করবে ইখলাসের শক্তি দিয়ে।
এর সবগুলো তখনই হবে, যখন আমল অন্তর থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট যাওয়ার পথ পাবে। আর যদি পথ না পেয়ে সেখানেই ঘুরতে থাকে, তা হলে নফস তার ওপর ঝাপিয়ে পড়বে, তাকে নিজের কবজায় নিয়ে নেবে এবং তাকে নিজের সৈন্য বানিয়ে ফেলবে। ফলে উলটো সে এর দ্বারা আক্রমণ করবে, আত্মগর্বে লিপ্ত হবে এবং বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করতে থাকবে। এক পর্যায়ে সে নিজেকে সবচেয়ে দুনিয়াবিমুখ, ইবাদাতকারী এবং প্রচণ্ড পরিশ্রমী ও সাধক হিসেবে মনে করবে। অথচ সে তখন থাকে আল্লাহ থেকে সবচেয়ে দূরে। তার চেয়ে কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির অন্তর আল্লাহর বেশি নিকটবর্তী থাকে এবং তারা তার চেয়েও ইখলাস ও নাজাতের বেশি কাছাকাছি অবস্থান করে।
সুতরাং সেই ব্যক্তির প্রতি লক্ষ করুন—যে অধিক সাজদাকারী, ইবাদাতকারী, দুনিয়াবিমুখ এবং যার কপালে রয়েছে সাজদার চিহ্ন, কীভাবে তার আমলের অহংকার তাকে নবি -এর ওপর আপত্তি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে! সে এর কারণে অন্যান্য মুসলমানদের তুচ্ছ মনে করেছে; এমনকি তাদের বিরুদ্ধে সে তরবারি নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে, তাদের রক্তকে বৈধ মনে করেছে।[৮৫১]
আর সেই মদ্যপায়ী মাতাল ব্যক্তির প্রতিও লক্ষ করুন, যাকে মাতাল অবস্থায় বহুবার নবি -এর নিকট আনা হয়েছিল; অতঃপর এর কারণে তাকে হদ অর্থাৎ বেত্রাঘাত করা হয়েছিল। তার এই পরিমাণ ঈমান ও ইয়াকীনের শক্তি ছিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা, নম্রতা ও বিনয় এই পরিমাণ ছিল যে, নবি তার ওপর অভিশাপ দিতে নিষেধ করেছেন![৮৫২]
এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, পরিণতির দিক দিয়ে ইবাদাত-বন্দেগির অহংকার ও বাড়াবাড়ির চেয়ে গুনাহের আধিক্য বিপদমুক্ত ও নিরাপদ।
টিকাঃ
[৮৪৮] সূরা মুতাফফিফীন, ৮৩: ১৪।
[৮৪৯] বাগাবি, তাফসীর, ৪/৪৬০; তাবারি, তাফসীর, ২৪/২০২।
[৮৫০] সূরা নাজম, ৫৩: ৪২।
[৮৫১] এখানে যুল-খুওয়াইসিরা নামক এক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। বিস্তারিত দেখুন-বুখারি ৪৩৫১; মুসলিম, ১০৬৪।
[৮৫২] এখানে আবদুল্লাহ হিমার নামক এক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। বিস্তারিত দেখুন-বুখারি, ৬৭৮০।