📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 বিভিন্ন প্রকার পরিভাষাসংক্রান্ত আলোচনা

📄 বিভিন্ন প্রকার পরিভাষাসংক্রান্ত আলোচনা


( الْإِبْصَالُ ) (সম্পর্ক) এবং ( الْوُصُوْلُ ) (পৌঁছা) দ্বারা সুফিয়ায়ে কেরামের উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক এবং আল্লাহর নিকট পৌঁছে যাওয়া। এর অর্থ এই নয় যে, বান্দার সত্তা আল্লাহর সত্তার সাথে মিলে যাবে, যেরকমভাবে দুটি সত্তা একে অপরের সাথে মিলে যায়; এটিও উদ্দেশ্য নয় যে, একটি অপরটির মধ্যে প্রবেশ করবে। বরং এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহর পথে চলতে নিজের নফস ও সৃষ্টিজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। এ ছাড়া ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যের কথা কল্পনাও করা যায় না, কারণ তা অসম্ভব।
কারণ সালিক বা আল্লাহ-অভিমুখী ব্যক্তি মৃত্যু পর্যন্ত পথ চলতেই থাকে। তার পথচলা কেবল তখনই থেমে যায়, যখন সে মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং এই জীবনে এমন কোনো মর্তবা বা স্তর নেই, যেখানে পৌঁছে গেলে পথচলা ফুরিয়ে যাবে, এমনিভাবে আল্লাহর সাথে বান্দার বাস্তবিকভাবে মিলে যাওয়ারও কোনো অস্তিত্ব নেই, যেখানে পৌঁছলে বান্দা ইবাদাত-বন্দেগি থেকে মুক্তি পাবে।
সুতরাং পথচলা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার দাবি করা হলো: তা'তীল ও ইলহাদ। (অর্থাৎ শারীআতকে অকেজো মনে করা এবং দ্বীন থেকে বের হয়ে যাওয়া।)
আর আল্লাহর সাথে বাস্তবিকভাবে মিলে যাওয়ার দাবি করা হলো: হুলুল ও ইত্তিহাদ। (অর্থাৎ আল্লাহর সত্তার সাথে একীভূত হয়ে যাওয়া এবং তাতে প্রবিষ্ট হওয়া।)
প্রকৃত বিষয় হলো: আল্লাহর পথ থেকে নফস ও সৃষ্টিজগৎকে দূরে রাখা। কারণ এ দুটির সাথে অবস্থান করা মানে আল্লাহ-অভিমুখে পথচলা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। আর এ দুটিকে দূরে রাখাই হলো ইত্তিসাল বা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা।
যারা বলে, সমস্ত সত্তা ও অস্তিত্ব এক। তারা হলো ধর্মত্যাগী, দ্বীন থেকে খারিজ। কারণ তারা বলে বান্দা আল্লাহ তাআলার কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহ তাআলার কার্যাবলি তাঁর গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত। আর তাঁর গুণাবলি হলো তাঁর সত্তার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং ফলাফলস্বরূপ দাঁড়ায়, বান্দা হলো আল্লাহর সত্তার অন্তর্ভুক্ত। তারা যা বলে, তা থেকে আল্লাহ পবিত্র ও বহু ঊর্ধ্বে।
তারা যে জায়গায় ভুল করেছে তা হলো: (তারা বান্দাকে আল্লাহর কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত করেছে, অথচ) বান্দা আল্লাহ তাআলার মাফউলাত তথা কৃতকাজের অন্তর্ভুক্ত, তাঁর আফআলাত বা কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত নয়; যেগুলো তাঁর সত্তার সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহর কৃতকাজ হলো তাঁর কার্যাবলির প্রভাব। আর তাঁর কার্যাবলি হলো তাঁর সেসব গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত, যা তাঁর সত্তার সাথে সংযুক্ত। সুতরাং আল্লাহর জাত তাঁর সিফাত ও কার্যাবলিকে আবশ্যক করে। আর তাঁর কৃতকাজ এর থেকে পৃথক। যা সৃষ্ট এবং ধ্বংসশীল। অপরদিকে আল্লাহ তাঁর জাত, সিফাত ও কার্যাবলিসহ চিরঞ্জীব স্রষ্টা।
সুতরাং আপনি এই সমস্ত পরিভাষাগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকবেন; যেগুলো পথভ্রষ্ট দার্শনিক ও ভ্রান্ত সুফিয়ায়ে কেরাম আবিষ্কার করেছে। কারণ এগুলোই সব সমস্যার মূল। আর এগুলোই হলো সিদ্দীক ও যিন্দীক চেনার উপায়।
আল্লাহ সম্পর্কে দুর্বল মা'রিফাত ও ইলমের অধিকারী ব্যক্তি যখন এই শব্দগুলো শুনবে : ইত্তিসাল, ইনফিসাল, মুসামারাহ, মুকালামাহ, আল্লাহর অস্তিত্ব ছাড়া প্রকৃতপক্ষে আর কোনো অস্তিত্ব নেই; সমগ্র সৃষ্টিজগতের অস্তিত্ব কেবলই জল্পনা আর কল্পনা, এগুলো অন্যের-সাথে-থাকা-ছায়ার অস্তিত্বের মতো—তখন আপনি তার থেকে হুলুল, ইত্তিহাদ ও শাতাহাত সম্পর্কে এমন কিছু শুনবেন, যা আপনার কানকে ভারী করে তুলবে।
আল্লাহর পরিপূর্ণ মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এই সব পরিভাষা ও শব্দকে সঠিক ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করেছেন এবং বিশুদ্ধ অর্থেই তা ব্যবহার করেছেন। কিন্তু পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরা তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে ভুল করার কারণে তাদেরকে গালমন্দ করে এবং তাদেরকে কুফর ও ইলহাদের দিকে সম্পৃক্ত করে। আর এ ক্ষেত্রে তাদের অস্পষ্ট বক্তব্যগুলোকে তির ও ঢাল হিসেবে গ্রহণ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00