📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 তাওহীদপন্থিদের পরস্পরের মাঝে পার্থক্য

📄 তাওহীদপন্থিদের পরস্পরের মাঝে পার্থক্য


কোনো সন্দেহ নেই যে, তাওহীদপন্থিদের পরস্পরের ভেতর তাওহীদের ক্ষেত্রে তাদের ইলম, আমল, মা'রিফাত ও অবস্থা অনুসারে অনেক পার্থক্য রয়েছে; যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ হিসেব করতে সক্ষম নয়।
মানুষের মধ্যে তাওহীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ছিলেন আম্বিয়ায়ে কেরাম। আবার তাদের চেয়েও বেশি পরিপূর্ণ ছিলেন রাসূলগণ।
তাদের মধ্যে আবার অগ্রগামী ছিলেন, যারা দৃঢ়তার অধিকারী )أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ(। তারা হলেন: নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা ও মুহাম্মাদ।
তাদের মধ্যে আবার শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হলেন: আল্লাহর দুই খলীল, মুহাম্মাদ ও ইবরাহীম। কারণ তাঁরা দুজন ইলম, মা'রিফাত, অবস্থা, মানুষকে এর প্রতি দাওয়াত দেওয়া, জিহাদ করা ইত্যাদি সার্বিক বিবেচনায় তাওহীদকে এমনভাবে ধারণ করেছিলেন, যা আর কেউ পারেনি।
সমস্ত রাসূল যে স্তরের তাওহীদের অধিকারী ছিলেন, তার চেয়ে পরিপূর্ণ তাওহীদ আর নেই। এর প্রতিই তারা দাওয়াত দিয়েছেন এবং এর ওপরেই তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন।
এ কারনেই আল্লাহ তাআলা নবি-কে এ ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী রাসূলদের অনুসরণ করার আদেশ করেছেন। যেমন: ইবরাহীম-এর আলোচনা এবং তাঁর পিতা ও সম্প্রদায়ের সাথে শিরকের ভ্রান্তি ও তাওহীদের বিশুদ্ধতা নিয়ে ইবরাহীম-এর বাবিতণ্ডা উল্লেখ করার পর আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أُولَبِكَ الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ فَإِنْ تَكْفُرْ بِهَا هُؤُلَاءِ فَقَدْ وَكَلْنَا بِهَا قَوْمًا لَّيْسُوا بِهَا بِكَافِرِينَ * أُولَبِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِةُ
"তাদেরকেই আমি কিতাব, শারীআত ও নুবুওয়াত দান করেছি। অতএব, এখন যদি এরা আপনার নুবুওয়াত অস্বীকার করে, তা হলে (কোনো পরোয়া নেই।) এর জন্য এমন সম্প্রদায় নির্দিষ্ট করেছি, যারা এতে অবিশ্বাসী হবে না। (হে মুহাম্মাদ,) তারাই আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াত প্রাপ্ত ছিল। অতএব, আপনি তাদের পথ অনুসরণ করুন।"[৮৩৬]
সুতরাং তাওহীদের ক্ষেত্রে তাঁদের চেয়ে পরিপূর্ণ আর কেউ নেই। কারণ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-কে তাঁদের অনুসরণ করার আদেশ করা হয়েছে।
যখন নবি-রাসূলগণ ইলম, আমল, দাওয়াত ও জিহাদের ক্ষেত্রে তাওহীদের হাকীকতকে পরিপূর্ণরূপে ধারণ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে সৃষ্টিকুলের জন্য ইমাম বানিয়ে দিয়েছেন, যারা আল্লাহর প্রতি পথপ্রদর্শন করবেন এবং তাঁর দিকেই দাওয়াত দেবেন। আর সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে তাদের অধীন বানিয়েছেন; যারা তাঁদের অনুসরণ করবে এবং তাঁদের দেখানো পথে চলবে। আল্লাহ তাআলা নবি-রাসূলদের অনুসারীদের সৌভাগ্য, সফলতা ও হিদায়াতের অধিকারী বলে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন এবং তাদের বিরোধিতা-কারীদেরকে পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ বলে চিহ্নিত করেছেন। নবি-রাসূলদের ইমাম ও তাদের শাইখ ইবরাহীম-কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا قَالَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ ""আমি তোমাকে সকল মানুষের ইমাম বানাব।' ইবরাহীম বলল, 'আমার সন্তানদের সাথেও কি এই অঙ্গীকার?' তিনি বললেন, 'আমার এ অঙ্গীকার জালিমদের ব্যাপারে নয়।" [৮৩৭]
অর্থাৎ ইমাম বানানোর এই অঙ্গীকার মুশরিকদের ব্যাপারে নয়।
এ কারনেই আল্লাহ তাআলা নবি-কে মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করতে বলেছেন। আর নবি তাঁর সাহাবিদের শেখাতেন- "যখন সকাল হবে, তখন তোমরা বলবে,
أَصْبَحْنَا عَلَى فِطْرَةِ الْإِسْلَامِ، وَعَلَى كَلِمَةِ الْإِخْلَاصِ، وَعَلَى دِيْنِ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ ، وَعَلَى مِلَّةِ أَبِيْنَا إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا مُسْلِمًا، وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ. "আমরা সকাল করলাম ইসলামের ফিতরাতের ওপর, ইখলাসের কালিমার ওপর, আমাদের নবি মুহাম্মাদ-এর দ্বীনের ওপর, আমাদের পিতা ইবরাহীম-এর মিল্লাতের ওপর; যিনি ছিলেন একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী। আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”[৮০৮]
মিল্লাতু ইবরাহীম হলো: তাওহীদ। মুহাম্মাদ-এর দ্বীন হলো: আল্লাহর নিকট হতে তিনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন-কথা, কাজ ও আকীদা-বিশ্বাস। ইখলাসের কালিমা হলো: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য দেওয়া। আর ইসলামের ফিতরাত হলো: আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে স্বভাবের ওপর সৃষ্টি করেছেন; তাঁর প্রতি ভালোবাসা, একক অদ্বিতীয় সত্তার ইবাদাত করা এবং গোলাম হিসেবে, বিনয়ী হয়ে, তাঁর সবকিছু মেনে নিয়ে, সবসময় তাঁকে স্মরণে রেখে তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণ করা।
এটি হলো বিশিষ্টজনদের তাওহীদ। যে ব্যক্তি এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে হলো সৃষ্টিজগতের মধ্যে সবচেয়ে নির্বোধ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ * إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمَ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ )
"ইবরাহীমের দ্বীন থেকে কে মুখ ফেরায়? যে নিজেকে মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতায় আচ্ছন্ন করেছে, সে ছাড়া আর কে এ কাজ করতে পারে? ইবরাহীমকে তো আমি দুনিয়ায় নিজের জন্য নির্বাচিত করেছিলাম আর আখিরাতে সে সৎকর্মশীলদের মধ্যে গণ্য হবে। তার অবস্থা ছিল এই যে, যখন তার রব তাকে বলল, 'আত্মসমর্পণ করো', তখনই সে বলে উঠল, 'আমি বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালকের প্রতি আত্মসমর্পণ করলাম।” [৮৩১]
উপরিউক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টিকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: ১. সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্বোধ এবং ২. বুদ্ধিমান। নির্বোধ হলো: যে ব্যক্তি ইবরাহীম -এর মিল্লাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে শিরকের প্রতি ধাবিত হয়। আর বুদ্ধিমান হলো: যে ব্যক্তি মৌখিকভাবে, কাজের মাধ্যমে এবং ভাবভঙ্গিতে শির্ক থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করে। ফলে তার কথা হয় তাওহীদ, তার কাজ হয় তাওহীদ, তার অবস্থা হয় তাওহীদ এবং তার দাওয়াতও হয় তাওহীদ।

টিকাঃ
[৮৩৬] সূরা আনআম, ৬: ৮৯-৯০।
[৮৩৭] সূরা বাকারা, ২: ১২৪।
[৮৩৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৫৩৬০; নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ১০১৭৫।
[৮৩১] সূরা বাকারা, ২: ১৩০-১৩১।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 সাধারণ মুসলমানদের দলীল-প্রমাণ

📄 সাধারণ মুসলমানদের দলীল-প্রমাণ


কোনো সন্দেহ নেই যে, অধিকাংশ মানুষ সুন্দরভাবে দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারে না। তাদের অন্তরে তাওহীদের উপস্থিতির চেয়ে এটি অতিরিক্ত একটি বিষয়। কোনোকিছু অর্জন হলে, কোনো বিষয় সম্পর্কে জানলে এবং কোনোকিছুতে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করলেই সবাই তার ওপর সুন্দর করে প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারে না, তা দৃঢ়ভাবে সাব্যস্ত করতে পারে না এবং তাতে আরোপিত আপত্তিগুলো প্রতিহতও করতে পারে না। এ রকম যোগ্যতা থাকা এক বিষয় আর সে সম্পর্কে জানা, বিশ্বাস করা আরেক বিষয়। তবে তাওহীদ সম্পর্কে জানা ও বিশ্বাস করার সাথে সাথে এক প্রকার দলীল-প্রমাণও বান্দার নিকট থাকতে হবে। যদিও তা তার্কিকরা যেমন সুন্দর করে বিন্যস্তভাবে উপস্থাপন করে সেরকম হওয়া জরুরি।
নয়। আসলে তাওহীদ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য এটি কোনো শর্তও নয়। আর তাওহীদ সম্পর্কে জানতে এবং সে অনুযায়ী আমল করতেও এর কোনো প্রয়োজন নেই। প্রত্যেকেই নিজ নিজ সামর্থ্য ও অবস্থা অনুসারে প্রমাণ পেশ করবে। আসলে প্রমাণ উপস্থাপনের প্রকার, পদ্ধতি ও স্তর অসংখ্য; আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তা গণনা করার সক্ষমতা রাখে না। আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যই রয়েছে পথপ্রদর্শক।
প্রতিটি সহীহ ইলম ও ইয়াকীনের দলীল রয়েছে; যা সেই বিষয়কে আবশ্যক করে এবং এর সাক্ষীও রয়েছে; যার মাধ্যমের তার বিশুদ্ধতা নির্ণীত হয়। কিন্তু কখনো কখনো সেই ইলম ও ইয়াকীনের অধিকারী ব্যক্তি তা উপস্থাপন করতে পারে না; অক্ষমতা বা মূর্খতার কারণে। যদি কখনো সেই বিষয়ে কথা বলে, তখন জ্ঞানীদের পরিভাষা ও শব্দ ব্যবহার করতে পারে না। (তবে তাদের মধ্যেও অনেক উপকারী বিষয় পাওয়া যায়।) অনেক দলীল এমন রয়েছে, যেগুলো দ্বারা সত্যের পরিচয় সুস্পষ্ট হয়; সেগুলো দার্শনিকদের দলীল ও প্রস্তাবনার চেয়ে বেশি বিশুদ্ধ, সংশয় থেকে অনেক দূরবর্তী এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বেশ কাছাকাছি হয়।
যে ব্যক্তি মানুষজনের অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, সে ব্যক্তি অধিকাংশ মুসলিমকেই এমন পায় যে, তারা তাওহীদ, মা'রিফাত ও ঈমানের ক্ষেত্রে অধিকাংশ দার্শনিক, তার্কিক ও যুক্তিবিদের চেয়ে বেশি অগ্রগামী ও মজবুত। সাধারণ মুসলিমদের নিকট সে এমন এমন দলীল ও নিদর্শনাদিও পেয়ে যায়, যা তাদের বিশুদ্ধ ঈমানের পরিচায়ক, যা মুতাকাল্লিমীন বা দার্শনিকদের নিকট থাকা দলীল-প্রমাণের চেয়ে সুস্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন।
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে প্রাকৃতিক নিদর্শনাদির প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এগুলোর মাধ্যমে তাঁর তাওহীদ, সিফাত, কার্যাবলি ও রাসূলদের সত্যবাদিতার ওপর প্রমাণ উপস্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। সেই নিদর্শনগুলো ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে প্রত্যক্ষ করা যায়, আকল দ্বারা উপলব্ধি করা যায় এবং সেগুলো মানুষের তবিয়তে সৃষ্টিগতভাবেই রয়েছে। যা বোঝার জন্য পর্যবেক্ষণকারীর প্রয়োজন পড়ে না যে, সে তার্কিক ও দার্শনিকদের পথ, মত, পরিভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গির অনুসরণ করবে। সুস্থ অনুভূতি ও পার্থক্যকারী বোধবুদ্ধির অধিকারী প্রতিটি ব্যক্তিই তা চিনতে পারে, তা স্বীকার করে এবং সেসব নিদর্শন যা বোঝায়, তা হৃদয়ঙ্গম করে। কুরআন মাজীদে এ রকম প্রায় দশ হাজার সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে। যে ব্যক্তি কুরআন মুখস্থ করেনি; যখন সে তা শুনবে, বুঝার চেষ্টা করবে এবং তা উপলব্ধিতে আনবে, তখন আয়াতগুলো যা বোঝাতে চেয়েছে, তার মস্তিষ্ক সে দিকে খুব দ্রুতই ধাবিত হবে এবং তা স্বীকার করে নেবে।
মোটকথা কোনোকিছু সম্পর্কে জানে এমন প্রতিটি ব্যক্তিই সে সম্পর্কে দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারে না। আবার দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারে এমন প্রতিটি ব্যক্তিই তা সুবিন্যস্তভাবে গুছিয়ে বলতে পারে না, প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না এবং সে সম্পর্কে কোনো আপত্তির খণ্ডনও করতে পারে না।
আমরা দুচোখে যা দেখি, তা-ই দলীল। যেমন: নির্মিত বস্তুর মাধ্যমে নির্মাতার ওপর এবং সৃষ্ট বস্তুর মাধ্যমে স্রষ্টার ওপর দলীল উপস্থাপন। এটি হলো কুরআনের পন্থা; যার চেয়ে উত্তম আর কোনো পন্থা নেই।

টিকাঃ
[৮৩৯] সূরা বাকারা, ২: ১৩০-১৩১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00