📄 তাওবা : সালিকীনদের সর্বশেষ মানযিল
সালিক বা আল্লাহর-পথের-পথিকদের সর্বশেষ মানযিল হলো—তাওবা বা আল্লাহর দিকে ফেরা। যা তাদের মানযিলসমূহের সূচনা ছিল।
এটা শুনে আপনার কান হয়তো চূড়ান্তভাবে তা অপছন্দ করবে, আর আপনি বলবেন, 'এটা হলো সেই ব্যক্তির কথা, তাসাওউফের পথঘাট সম্পর্কে যার জানা নেই এবং যে এর মানযিলসমূহে অবতরণও করেনি।' আল্লাহর শপথ! অনেক মানুষ আপনার সাথে একমত পোষণ করবে এবং বলবে, 'আমরা কোথায়? আমরা যাচ্ছি কোথায়? আমরা তো অনেক আগেই তাওবার মানযিল অতিক্রম করে এসেছি। আমাদের মাঝে আর এর মাঝে রয়েছে অসংখ্য মাকাম! আমরা কি তা হলে এত সব মাকাম ছেড়ে আবার সেখানে ফিরে যাব, আর একেই সালিকীনদের সর্বশেষ মানযিল বলে সাব্যস্ত করব?'
তা হলে এখন শুনুন এবং স্মরণ রাখুন। দ্রুতই অস্বীকার করতে ও প্রতিহত করতে উদ্যত হবেন না। নিজের পরিচয় পাওয়ার জন্য, আপনার প্রতি আল্লাহ তাআলার হক ও অনুগ্রহ এবং তাঁর প্রতি আপনার করণীয় কী সে সম্পর্কে উপলব্ধি করতে নিজের মস্তিষ্ককে উন্মুক্ত করুন। অতঃপর আপনার আমল, অবস্থা ও যে সমস্ত মানযিল আপনি অতিক্রম করেছেন—খাঁটি দিলে সবকিছুকে আল্লাহ তাআলার বড়োত্ব ও মহত্ত্বের বিশালতার দিকে খেয়াল রেখে এবং তিনি যার উপযোগী ও উপযুক্ত সেদিকে মনোযোগী হয়ে তাঁর নিকট তা পেশ করুন।
যদি দেখেন আপনার যে আমল ও অবস্থা, তা আপনার ওপর আল্লাহর যে হক ও অনুগ্রহ রয়েছে তার জন্য যথেষ্ট এবং আপনার আমল সেগুলোর সমান; তা হলে তাওবার কোনো প্রয়োজন নেই। তাওবার দিকে ফিরে আসা, তখন আপনার জন্য হবে উঁচু মর্যাদা থেকে নিচু স্তরের দিকে আসা। উচ্চ মর্তবা থেকে নিম্ন মর্তবায় নেমে যাওয়া এবং শেষ থেকে শুরুর দিকে প্রত্যাবর্তন। এটা দূরে নয় যে, অনেকেই এমন দাবি করে থাকে। তারা নিজেদের আমল, অবস্থা, মা'রিফাত ও ইলমের কারণে ধোঁকায় পড়ে রয়েছে!
আর যদি দেখেন সত্যবাদিতা, একনিষ্ঠতা, অগ্রসরমানতা, তাওয়াক্কুল, যুহদ, ইবাদাত-বন্দেগিসহ আপনার সমস্ত আমল, আল্লাহ তাআলার যে হক আপনার ওপর রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র হকটিরও সমপরিমাণ নয়। আপনার প্রতি আল্লাহর যে অনুগ্রহ রয়েছে, তার থেকে একটি অনুগ্রহেরও সমান নয় আর আল্লাহ তাআলা যে বড়োত্ব ও মহত্ত্বের অধিকারী, সমস্ত সৃষ্টিজগৎ যা ধারণ করে তার চেয়েও তা বড়ো, মহৎ ও সুউচ্চ।
তা হলে এখন জেনে রাখুন, প্রতিটি আরিফ বা আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির শেষ মানযিল এবং আল্লাহর পথের প্রতিটি পথিকের চূড়ান্ত ঠিকানা হলো তাওবা। যেভাবে এটি ছিল সূচনা, তেমনিভাবে তা শেষ। শেষ পর্যায়ে এসে তাওবার প্রয়োজন শুরুর পর্যায়ের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রকট হয়। বরং পথের শেষে এসে তাওবা জরুরি পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
এখন শুনুন এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে জীবনের শেষ সময়ে কী বলে সম্বোধন করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ -ও তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে কত কঠোরভাবে বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফারের প্রতি মনোযোগী ছিলেন (তাওবা লক্ষ করুন)। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوْبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوْفٌ رَّحِيمٌ )
"নিশ্চয় আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন নবি, মুহাজির ও আনসারদের, যারা সংকট-মুহূর্তে নবির সঙ্গে ছিল, তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হওয়ার পরেও তিনি তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান, পরম দয়ালু।"[৮০৮]
এই আয়াতটি আল্লাহ তাআলা নাযিল করেছেন তাবুক যুদ্ধের পরে। আর এটিই ছিল নবি -এর সশরীরে-অংশ নেওয়া-সর্বশেষ যুদ্ধ। আল্লাহ তাআলা তাদের এই জিহাদ ও কঠিন আমলের প্রতিদানস্বরূপ তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন ا ( عَلَيْهِمْ)।
আল্লাহ তাআলা নবি -এর শেষ জীবনে নাযিল করেছেন- إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا )
"যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি তাওবা গ্রহণকারী। "[৮০৯]
'সহীহ বুখারি'-তে এসেছে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়া পর নবি যে সালাতই আদায় করতেন তার রুকূ-সাজদাতে এই দুআটি পাঠ করতেন- سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
"হে আল্লাহ, হে আমাদের রব, আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।”[৮১০] এটি ছিল নবি -এর জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে।
এই কারণে এ সূরা থেকে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যারা আলিম ছিলেন-যেমন উমর ইবনুল খাত্তাব, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস -তারা বুঝেছেন, এটি রাসূলুল্লাহ -এর জীবনসীমা নির্দেশ করছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে তা জানিয়ে দিয়েছেন। নবিজি সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও জীবনের শেষ সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ইস্তিগফার করার নির্দেশ দিয়েছেন।
রবের সান্নিধ্যে যাবার পূর্ব মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ -এর মুখ নিঃসৃত সর্বশেষ যে বাণী শোনা গিয়েছে, তা হলো-
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَأَلْحِقْنِي بِالرَّفِيقِ الْأَعْلَى
“হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমার প্রতি রহম করো আর আমাকে মহান বন্ধুর সঙ্গে মিলিয়ে দাও।”[৮১১]
নবি প্রতিটি নেক আমল ইস্তিগফার আদায়ের মাধ্যমে শেষ করতেন। যেমন: সাওম, সালাত, হাজ্জ, জিহাদ। কেননা তিনি যখন জিহাদ কিংবা হাজ্জ থেকে ফিরতেন এবং মদীনায় প্রবেশ করতেন, তখন বলতেন,
آيِبُونَ تَائِبُوْنَ عَابِدُونَ سَاجِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ
“(আমরা) প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী, ইবাদাতগুজার, আমরা আমাদের প্রতিপালককে সাজদাকারী এবং তাঁর প্রশংসাকারী।"[৮১২]
শারীআতে যেকোনো মজলিসের শেষে ইস্তিগফার করার হুকুম দেওয়া হয়েছে; যদিও কল্যাণ ও নেককাজের মজলিস হয়।[৮১৩]
এমনিভাবে এরও হুকুম দেওয়া হয়েছে যে, বান্দা তার দিন শুরু করবে ইস্তিগফারের মাধ্যমে। দিনের শুরুতে সে বলবে:
أَسْتَغْفِرُ اللهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيَّ الْقَيُّوْمَ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ
"আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, যিনি চিরঞ্জীব ও অবিনশ্বর সত্তা এবং আমি তাঁর নিকট তাওবা করছি।” [৮১৪]
মানুষকে ঘুমানোর আগে এবং সকাল-সন্ধ্যা সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার পাঠ করারও হুকুম দেওয়া হয়েছে। [৮১৫]
যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সম্পর্কে এবং তাঁর নামসমূহ, গুণাবলি ও হক সম্পর্কে অবগত, সে জানে যে, সর্বশেষ পর্যায়ে বান্দা তাওবার দিকেই সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী থাকে।
মূলকথা হলো সালিকীন বা আল্লাহ-অভিমুখীদের পথের সমাপ্তিতে রয়েছে দাসত্বকে পরিপূর্ণ করা। আর এটি কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সমস্ত সৃষ্টিজগতের মধ্যে মাত্র দুজনের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তারা এই গুণের অধিকারী ছিলেন। একজন হলেন ইবরাহীম ; যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি দাসত্বের হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করেছেন। আরেকজন হলেন বানী আদমদের সর্দার মুহাম্মাদ । কারণ তিনি দাসত্বের স্তর পূর্ণাঙ্গরূপে আদায় করেছেন। পরিণতিতে তিনি সমস্ত সৃষ্টিজগতের চেয়ে অগ্রগামী হয়েছেন। তিনি ওসীলা ও সুপারিশের অধিকারী হয়েছেন; যা থেকে সমস্ত রাসূলও পিছিয়ে থাকবেন। (কিয়ামাতের দিন সমস্ত উম্মাহ যখন নবি-রাসূলদের নিকট থেকে নিরাশ হয়ে নবি -এর নিকট সুপারিশের জন্য যাবেন,) তখন তিনি বলবেন, أَنَا لَهَا أَنا لَهَا “আমিই এর উপযুক্ত, আমিই এর উপযুক্ত।” [৮১৬] এ কারণেই অর্থাৎ নবি -এর পরিপূর্ণ বন্দেগি ও দাসত্বের কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁকে দাসত্বের উচ্চ মাকাম ও সম্মানের সাথে উল্লেখ করেছেন। যেমন বলেছেন, سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا
"পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন।”[৮১৭]
এ কারণেই সবাই যখন সুপারিশের জন্য ঈসা-এর কাছে যাবে, তখন তিনি বলবেন,
اذْهَبُوا إِلَى مُحَمَّدٍ عَبْدٍ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ
"আপনারা মুহাম্মাদের কাছে যান; তিনি এমন বান্দা, আল্লাহ তাআলা যার আগে-পরের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।”[৮১৮]
রাসূলুল্লাহ এই সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন আল্লাহর দাসত্ব পরিপূর্ণভাবে আদায় করার কারণে এবং আল্লাহর পরিপূর্ণ ক্ষমা প্রাপ্তির দরুন।
সুতরাং বোঝা গেল, সমস্ত মানযিল ও মাকামের শেষ হলো তাওবা ও খাঁটি গোলামি। নিজের সত্তা ও অস্তিত্বকে জমিয়ে রাখা এবং নিজের সম্পৃক্ততাকে বিলুপ্ত করে দিয়ে ফানা হয়ে যাওয়া সমস্ত মানযিল ও মাকামের শেষ নয়। (যেমনটি ধারণা করে থাকে কিছু সৃফিসাধক।)
যদি প্রশ্ন করেন: এই জমিয়ে রাখা তো খাঁটি তাওবা ও পরিপূর্ণ দাসত্বের মাধ্যমেই অর্জিত হয়?
উত্তর: বিষয়টি আসলে এমন নয়। বরং এর মাধ্যমে যে বিষয়টি অর্জিত হয়, তা হলো রাসূল ও তাদের খলীফাদের জমিয়ে রাখা। আর সেটি হলো: মহাব্বত, ইনাবাত, তাওয়াক্কুল, ভয়, আশা ও মুরাকাবার মাধ্যমে নিজের হিম্মত ও মনোবলকে আল্লাহর ওপর জমিয়ে রাখা। এমনিভাবে জিহাদ ও দাওয়াতের মাধ্যমে সৃষ্টিজগতের মাঝে আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করতে হিম্মত ও মনোবলকে জমিয়ে রাখা।
এখানে দুইটি বিষয়: ১. অন্তরকে একমাত্র আল্লাহ তাআলার ওপরেই জমিয়ে রাখা এবং ২. নিজের ইচ্ছা ও মনোবল শুধু আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের ওপরেই সীমাবদ্ধ রাখা।
যদি প্রশ্ন করেন: এই দুই প্রকার জমানোর ব্যাপারে কি কোনো দলীল-প্রমাণ রয়েছে?
আমি বলব : পুরা কুরআনেই এর দলীল রয়েছে। সূরা ফাতিহার এই আয়াত থেকেই তা গ্রহণ করুন-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
"আমরা কেবল তোমারই ইবাদাত করি আর তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।" [৮১৯]
إِيَّكَ )একমাত্র) এই শব্দটি নিয়ে ভাবুন। এখানে ইবাদাত ও সাহায্য প্রার্থনা করাকে কেবল আল্লাহ তাআলার পবিত্র সত্তার সাথেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। نَعْبُدُ "আমরা তোমার ইবাদাত করি” এই শব্দটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন। যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয়কালকেই বোঝায় এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের ইবাদাতকেই অন্তর্ভুক্ত করে। ইবাদাতের সমস্ত প্রকারই এর মধ্যে শামিল; বর্তমান-ভবিষ্যৎ, কথা-কর্ম, প্রকাশ্য-গোপনসহ সমস্ত ইবাদাত। এমনিভাবে اَلْإِسْتِعَانَةُ বা সাহায্য প্রার্থনা করার বিষয়টিও পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর নিকটেই, অন্য কারও নিকট নয়। এই কারণে বলা যায় (সালিকীনদের) সমস্ত পথই এই দুই শব্দের মধ্যে নিহিত রয়েছে। এটিই সুফিয়ায়ে কেরামের এই বাক্যের মর্ম - الطَّرِيقُ فِي : إِيَّاكَ أُرِيدُ بِمَا تُرِيدُ )প্রকৃত পথ নিহিত রয়েছে এর মধ্যে: আপনি যা ইচ্ছা করেন, আমারও তা-ই ইচ্ছা।) উদ্দেশ্য এক হওয়া এবং তিনি যা পছন্দ করেন ও ভালোবাসেন নিজের ইচ্ছাকে তাতেই নিবদ্ধ রাখা। নবি-রাসূলগণ শুরু থেকে শেষ সবাই এর প্রতিই আহ্বান করেছেন, আমলকারীরা এটিকেই আঁকড়ে ধরেছেন এবং আগ্রহীরা এ পথেই অগ্রসর হয়েছেন। সমস্ত মানযিল ও মাকাম শুরু থেকে শেষ এরই আওতাধীন এবং এরই ফল।
সুতরাং দাসত্ব পূর্ণ বিনয়ের সাথে পূর্ণ ভালোবাসাকে এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি মোতাবেক তাঁর আদেশসমূহকে পরিপূর্ণভাবে মেনে নেওয়াকে আবশ্যক করে। এটিই হলো শেষ গন্তব্য; এর ওপরে আর কোনো গন্তব্য নেই। দাসত্বে যথাযথভাবে পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করার যখন কোনো পথ নেই, তখন তাওবাই হলো শেষ ঠিকানা ও আশ্রয়স্থল। শুরুতে তাওবার যেমন প্রয়োজন, শেষে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন। যেমনটি আপনি আগেই জেনে এসেছেন। যদি তাওবার বিষয়টি না থাকত, তা হলে ব্যক্তির মাঝে ও রব্বুল আলামীনের নিকট পৌঁছার মাঝে নিরাশার সৃষ্টি হতো। এ রকমটা হয় বান্দা যখন তার ওপর যে দায়িত্ব ও হক রয়েছে, তা যথাযথভাবে পালন করে। সুতরাং ওই ব্যক্তির অবস্থা কেমন হবে যে গাফলত, অলসতা আর অমনোযোগিতায় নিমগ্ন, যে অধিকাংশ সময়ই নিজের হককে রবের হকের ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে; যা থেকে সে কখনো মুক্তি পায় না? বিশেষ করে আল্লাহর-পথের-পথিক; যে ফানা ও জমার পথে অগ্রসর হয়? কারণ আল্লাহ তাআলা তার কাছ থেকে দাসত্ব ও গোলামি তলব করে, আর তার নফস জমা ও ফানা তলব করে! যদি নিজের নফসের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয় এবং সঠিকভাবে এর হিসাব গ্রহণ করা হয়, তা হলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, স্বার্থচিন্তা ও আনন্দ অর্জনে সে মত্ত।
হ্যাঁ, প্রত্যেকেই তাতে লিপ্ত। তবে পার্থক্য হলো কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পছন্দনীয় বস্তুর মাঝে তা খোঁজে আর কেউ নিজের নফসের পছন্দের মাঝে খোঁজে। (সুতরাং স্পষ্ট হলো যে, তাওবা সবার জন্য জরুরি এবং তাওবাই হলো আল্লাহর পথের পথিকের শুরু ও শেষ মানযিল।) আল্লাহ তাআলাই তাওফীক দাতা।
টিকাঃ
[৮০৮] সূরা তাওবা, ৯: ১১৭।
[৮০৯] সূরা নাসর, ১১০: ১-৩।
[৮১০] বুখারি, ৭৯৪; মুসলিম, ৪৮৪।
[৮১১] বুখারি, ৫৬৭৪; মুসলিম, ২৪৪৪।
[৮১২] বুখারি, ১৭৯৭; মুসলিম, ১৩৪৪।
[৮১৩] আবূ দাউদ, ৪৮৫৯; দারিমি, ২৬৬১।
[৮১৪] আবূ দাউদ, ১৫১৭; মুনযিরি, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ১৬২২।
[৮১৫] বুখারি, ৬৩০৬। সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার হলো: اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَى وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ “হে আল্লাহ, তুমি আমার রব। তুমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই বান্দা। আমি তোমার সঙ্গে কৃত প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের ওপর অবিচল থাকার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। আমি যা কিছু করেছি তার অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। তুমি আমাকে যে নিয়ামাত দান করেছ তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। কারণ তুমি ছাড়া গুনাহের ক্ষমাকারী আর কেউ নেই।"
[৮১৬] বিস্তারিত দেখুন-ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৯/৪৯১।
[৮১৭] সূরা ইসরা, ১৭: ১।
[৮১৮] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১/২৯৪; বুখারি, ৩৩৪০; মুসলিম, ১৯৬।
[৮১৯] সূরা ফাতিহা, ১:৫।