📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মা‘রিফাতের আলামত ও নিদর্শন

📄 মা‘রিফাতের আলামত ও নিদর্শন


কেউ কেউ বলেছেন, ‘আল্লাহর মা'রিফাত প্রাপ্তির একটি আলামত হলো : আল্লাহর ভয় হাসিল হওয়া। যার মা'রিফাত বা আল্লাহর ব্যাপারে জানাশোনা যত বেশি হবে, তার আল্লাহর ভয়ও তত বেশি হবে। [৮০২]
আরিফ বা আল্লাহ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তির কিছু আলামত হলো: সে কারও কাছে কোনোকিছু চাইবে না, কারও সাথে ঝগড়ায় জড়াবে না, কাউকে গালি দেবে না, কারও ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখবে না এবং কারও ওপর তার কোনো হক নজরে পড়বে না।
তার আরও কিছু নিদর্শন হলো: সে হারিয়ে যাওয়া আর না-পাওয়া কোনোকিছুর জন্য হাহুতাশ করবে না এবং কোনোকিছুর প্রাপ্তিতে উল্লসিতও হবে না। কারণ সে বস্তুজগতের প্রতি এ দৃষ্টিভঙ্গিই রাখে যে, এর সবকিছু নশ্বর ও ধ্বংসশীল। কেননা এই জগৎ তো প্রকৃতপক্ষে ছায়া আর কল্পনারই নামান্তর।
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, ‘আরিফ ততক্ষণ পর্যন্ত আরিফ হতে পারে না, যতক্ষণ-না সে জমিনের মতো হয়; যার ওপর দিয়ে সৎ-অসৎ সবাই অতিক্রম করে এবং যতক্ষণ-না মেঘের মতো হয়; যা সবাইকেই ছায়া দান করে এবং যতক্ষণ-না বৃষ্টির মতো হয়; যা পছন্দের-অপছন্দের সবাইকেই সিক্ত করে। [৮০৩]
ইয়াহইয়া ইবনু মুআয বলেছেন, ‘আরিফ বা মা'রিফাতের অধিকারী ব্যক্তি পার্থিব জগৎ থেকে বের হয়ে যায়। দুটি বিষয়ে সে কখনো অবহেলা করে না: ১. নিজের ওপর ক্রন্দন, ২. রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন।।৮০৪]
এটি অনেক সুন্দর ও অর্থবহ একটি কথা। কারণ এটি নিজের দোষত্রুটির পরিচয়ের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করে এবং আল্লাহ তাআলার বড়োত্ব, মহত্ত্ব ও পূর্ণাঙ্গতারও প্রমাণ বহন করে। তাই সে সবসময় নিজের ওপর কান্না করতে থাকে আর আল্লাহ তাআলার প্রশংসায় রত হয়।
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক-কে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো, 'কীভাবে আমরা আল্লাহ তাআলার পরিচয় পাব?' তিনি জবাবে বললেন, 'এভাবে যে, তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগৎ থেকে পৃথক হয়ে আসমানসমূহের ওপর আরশে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।'[৮০৫]
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক এখানে প্রকৃত মা'রিফাতের কথাই বলেছেন, যা ব্যতীত আল্লাহ তাআলার পরিচয়, মা'রিফাত ও স্বীকৃতি সঠিক হয় না। আর তা হলো: ১. সৃষ্টিজগৎ থেকে আল্লাহ তাআলার বিচ্ছিন্নতা ও ২. আরশে আযীমে অধিষ্ঠিত থাকা।
মা'রিফাতের ক্ষেত্রে এবং ঈমানের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির পা ততক্ষণ পর্যন্ত স্থির হয় না; যতক্ষণ পর্যন্ত-না সে আল্লাহ তাআলার সমস্ত গুণাবলির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, সেগুলো সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অবগত হয় এবং রব সম্পর্কে মূর্খতার সীমা থেকে বেরিয়ে যায়। আসলে আল্লাহ তাআলার গুণাবলির ওপর বিশ্বাস রাখা এবং তা সম্পর্কে জানা হলো-ইসলামের ভিত্তি, ঈমানের খুঁটি এবং ইহসান বৃক্ষের ফল। যে ব্যক্তি আল্লাহর গুণাবলিকে অস্বীকার করে, সে ব্যক্তি আরিফ বা আল্লাহর মা'রিফাতের অধিকারী হওয়া দূরের কথা, সে তো ইসলামের ভিত্তি, ঈমানের খুঁটি এবং ইহসানকেই ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর সিফাত অস্বীকারকারী ব্যক্তিদেরকে তাঁর প্রতি খারাপ-ধারণা-পোষণকারী বলে সাব্যস্ত করেছেন। আর তাদেরকে এমন শাস্তির কথা বলেছেন; যা মুশরিক, কাফির ও কবীরা গুনাহকারীদেরকেও বলেননি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا كُنتُمْ تَسْتَتِرُونَ أَنْ يَشْهَدَ عَلَيْكُمْ سَمْعُكُمْ وَلَا أَبْصَارُكُمْ وَلَا جُلُودُكُمْ وَلَكِنْ ظَنَنْتُمْ أَنَّ اللهَ لَا يَعْلَمُ كَثِيرًا مِّمَّا تَعْمَلُوْنَ وَذُلِكُمْ ظَنُّكُمُ الَّذِي ظَنَنْتُمْ بِرَبِّكُمْ أَرْدَاكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ مِّنَ الخَاسِرِينَ
"তোমরা এ থেকে গোপনীয়তা অবলম্বন করতে না যে, তোমাদের কান, চোখ ও চামড়া তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে; তোমরা তো বরং মনে করেছিলে যে, তোমাদের বহু সংখ্যক কাজকর্মের খবর আল্লাহও রাখেন না। তোমাদের এই ধারণা-যা তোমরা তোমাদের রব সম্পর্কে করেছিলে-তোমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে; ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছ।"[৮০৬]
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর গুণসমূহ থেকে একটি গুণ (অর্থাৎ সমস্ত কাজকর্ম সম্পর্কে অবগত হওয়াকে) তারা যে অস্বীকার করেছে, তা হলো আল্লাহর প্রতি তাদের খারাপ ধারণা আর এটিই তাদের ধ্বংস করে দেবে। আল্লাহ তাআলার প্রতি খারাপ ধারণা পোষণকারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
عَلَيْهِمْ دَابِرَةُ السَّوْءِ وَغَضِبَ اللهُ عَلَيْهِمْ وَلَعَنَهُمْ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
"তাদের জন্য রয়েছে মন্দ পরিণাম। আল্লাহ তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন এবং তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত করে রেখেছেন; যা অত্যন্ত জঘন্য জায়গা!"[৮০৭]
আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা পোষণকারীদের ছাড়া আর কারও প্রতি এমন ধমকি ও শাস্তির কথা আসেনি। আর আল্লাহর সিফাতসমূহ অস্বীকার করা এবং তাঁর নামসমূহের প্রকৃত মর্মকে না মানাই হলো আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বড়ো খারাপ ধারণা।
আকল বা বুদ্ধি আল্লাহর সিফাতসমূহের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করতে অক্ষম। কারণ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না যে, আল্লাহ কেমন। এটিই হলো সালাফদের بِلا كَيْف কথার অর্থ। অর্থাৎ আল্লাহর অবস্থা উপলব্ধি করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা যাঁর মৌলিক উপাদান ও উপকরণই জানা যায় না, তাঁর গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যাবলি জানা কীভাবে সম্ভব? কিন্তু এই বিষয়টি ঈমান আনার ক্ষেত্রে এবং এর অর্থ অনুধাবনের বিষয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। কাইফিয়্যাত বা প্রকৃত অবস্থা তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়। যেমন আখিরাত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা যে সংবাদ দিয়েছেন, তার মর্মার্থ আমরা অনুধাবন করতে পারি। কিন্তু এটি কীভাবে হবে, তার প্রকৃত অবস্থা আমরা জানি না। অথচ এগুলোর সবই মাখলুক বা সৃষ্ট বস্তু; তা হলে আমরা কীভাবে খালিক বা স্রষ্টার হাকীকত সম্পর্কে জানতে পারব? মাখলুকের সাথে যাঁর কোনো তুলনাই হয় না? যিনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে?
সুতরাং আমরা কীভাবে সীমাবদ্ধ, সংকীর্ণ ও সৃষ্ট বোধবুদ্ধি নিয়ে সেই সত্তার প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করতে পারব, সবদিক দিয়েই যাঁর রয়েছে পূর্ণাঙ্গতা, যিনি সমস্ত সৌন্দর্যের মালিক, যাঁর রয়েছে সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ ইলম, পরিপূর্ণ কুদরত, বড়োত্ব ও সব ধরনের ক্ষমতা? সেই সত্তা যাঁর চেহারা থেকে পর্দা সরানো হলে উজ্জ্বলতার আধিক্যে আসমান-জমিন, এর মধ্যবর্তী অংশ এবং এদুয়ের মধ্যে যা কিছু রয়েছে সবকিছু পুড়ে যাবে? যিনি সবকটি আসমানকে আপন হাতে ধারণ করেছেন; ফলে তা প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে, যেমন সরিষার দানা আমাদের হাতের তালুতে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। যাঁর ইলমের তুলনায় সৃষ্টিজগতের সমগ্র ইলম, ইলমের সমুদ্রে চড়ুই পাখির একটি ঠোঁকরের পরিমাণের চেয়েও কম। যদি সাতসমুদ্র কালি হয় আর সৃষ্টির শুরু থেকে নিয়ে কিয়ামাত পর্যন্ত পৃথিবীর সব গাছ কলম হয়, অতঃপর সেগুলো দিয়ে লিখতে আরম্ভ করা হয়, তা হলে কালি ও কলম একসময় ফুরিয়ে যাবে; কিন্তু সেই মহান সত্তার কথামালা তখনো ফুরাবে না। পৃথিবীর শুরু থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত যত মানুষ, জিন, যারা কথা বলতে পারে এবং যারা কথা বলতে পারে না, এমন সবকিছুকে যদি একটি কাতারে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তবুও তারা সেই সত্তাকে বেষ্টন করতে পারবে না। যিনি সমস্ত আসমানকে একটি আঙুলে, সমস্ত জমিনকে একটি আঙুলে, সমস্ত পাহাড়কে একটি আঙুলে এবং সমস্ত গাছপালাকে আরেকটি আঙুলে স্থাপন করবেন, অতঃপর সেগুলোকে নাড়া দিয়ে বলবেন, 'আনা লিল্লাহ' আমিই সবকিছুর মালিক।'
একটি তাহকীক: আল্লাহ তাআলার গুণাবলি তাঁর নামের মধ্যে শামিল রয়েছে। সুতরাং নাম হিসাবে 'আল্লাহ', 'রব', 'ইলাহ' ইত্যাদি এমন কোনো নাম নয়, যা গুণাবলি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কেননা গুণমুক্ত কোনো সত্তার অস্তিত্ব অসম্ভব। এটি একটি অলীক কল্পনা। 'আল্লাহ', 'রব', 'ইলাহ্'-এগুলো হলো এমন সত্তার নাম, যা সব ধরনের পূর্ণাঙ্গতা, বড়োত্ব ও মহত্ত্বের অধিকারী। যেমন: ইলম, কুদরত, হায়াত, ইচ্ছা, কথা, শ্রবণ, দর্শন, স্থায়িত্ব ও অবিনশ্বরতাসহ এমন সব গুণাবলি, যা আল্লাহ তাআলার সত্তার জন্য উপযুক্ত। সুতরাং বোঝা যায় এই গুণাবলি হলো তাঁর সত্তার অন্তর্ভুক্ত। আসলে সত্তা থেকে গুণাবলিকে মুক্ত করা এবং গুণাবলি থেকে সত্তাকে মুক্ত করা একটি কল্পনা; যার কোনো বাস্তবতা নেই। (তবে মনে রাখতে হবে,) এটি একটি গৌণ বিষয়, এতে তেমন কোনো উপকারিতা নেই এবং এর ওপর ঈমান-আমলের কোনোকিছু নির্ভরশীল নয়। আর এটি মৌলিক জ্ঞানেরও কোনো বিষয় নয়। (তাই এসব বিষয়ে বাড়াবাড়ি পরিত্যাজ্য।)

টিকাঃ
[৮০২] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৪৭৭। আবূ আলি দাক্কাক-এর বাণী।
[৮০৩] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়‍্যা, ২/৪৮০।
[৮০৪] ইবনুল মুলাক্কিন, তবাকাতুল আউলিয়া, ৩২৪।
[৮০৫] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ৫/২৮০।
[৮০৬] সূরা ফুসসিলাত, ৪১: ২৬।
[৮০৭] সূরা ফাতহ, ৪৮: ৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00