📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 জীবনের অনেকগুলো স্তর রয়েছে

📄 জীবনের অনেকগুলো স্তর রয়েছে


জীবনের অনেকগুলো স্তর রয়েছে : এক. মূর্খতার মৃত্যু থেকে ইলমের মাধ্যমে জীবন লাভ করা; কেননা মূর্খ মানুষের মূর্খতা মৃত্যুর সমতুল্য। যেমন কবি বলেন,
وَفِي الْجَهْلِ قَبْلَ الْمَوْتِ مَوْتُ لِأَهْلِهِ ... وَأَجْسَامُهُمْ قَبْلَ الْقُبُورِ قُبُورُ وَأَرْوَاحُهُمْ فِي وَحْشَةٍ مِنْ جُسُومِهِمْ ... فَلَيْسَ لَهُمْ حَتَّى النُّشُورِ نُشُورُ
মূর্খ ব্যক্তির মূর্খতার মাঝে মৃত্যুর পূর্বেই রয়েছে মৃত্যু; কবরস্থ হওয়ার আগেই কবর হয়ে যায় তাদের শরীর। তাদের দেহ ছাড়িয়ে তাদের অন্তরে থাকে নিঃসঙ্গতা; মহাজাগরণের পূর্বে আর হয় না তাদের জেগে ওঠা।
আসলে জাহিল ব্যক্তিরা অন্তর ও রূহের দিক দিয়ে মৃত। যদিও তাদের দেহ থাকে জীবিত। তার শরীর একটা কবর; যা নিয়ে সে জমিনের বুকে হেঁটে বেড়ায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ
“আর যে মৃত ছিল অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি...।”[৭৮০]
তিনি আরও বলেন, إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ وَقُرْآنٌ مُّبِينٌ لَيُنْذِرَ مَنْ كَانَ حَيًّا وَيَحِقَّ الْقَوْلُ عَلَى الْكَافِرِينَ "এটা তো এক উপদেশ ও প্রকাশ্য কুরআন। যাতে তিনি সতর্ক করেন জীবিতকে এবং যাতে কাফিরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।”[৭৮১]
তিনি আরও বলেন, إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَنْ يَشَاءُ وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي الْقُبُورِ "আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, তাকে শুনান। আর যারা কবরে রয়েছে, আপনি তাদেরকে শুনাতে পারবেন না।”[৭৮২]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরের মৃত্যুর কারণে তাদেরকে কবরবাসীদের সাথে তুলনা করেছেন। কারণ তাদের রূহ প্রাণহীন আর তাদের শরীর পরিণত হয়েছে (জীবন্ত) কবরে। তাই কবরবাসীদেরকে যেমন কোনোকিছু শুনানো যায় না, তেমনি তাদেরকেও কিছু শুনানো যায় না। জীবন তো অনুভূতি ও নড়াচড়া করা এবং এ দুটির সংশ্লিষ্টতার নাম। তাই অন্তরও যখন ইলম ও ঈমানকে অনুভব করে না এবং এসবের কারণে জেগে ওঠে না, তখন তা প্রকৃত মৃত্যুরই শামিল। এখানে যে সাদৃশ্য দেওয়া হয়েছে তা শরীরের মৃত্যুর কারণে নয়; বরং তা হলো অন্তর ও রূহের মৃত্যুর কারণে।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল তার ‘কিতাবুয যুহদ’-গ্রন্থে লোকমান হাকীমের কথা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি তার ছেলেকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন: يَا بُنَيَّ، جَالِسِ الْعُلَمَاءَ وَزَاحِمُهُمْ بِرُكْبَتَيْكَ فَإِنَّ اللهَ يُحْيِي الْقُلُوْبَ بِنُورِ الْحِكْمَةِ كَمَا يُحْيِي الْأَرْضَ الْمَيْتَةَ بِوَابِلِ السَّمَاءِ 'ছেলে আমার, উলামায়ে কেরামের সান্নিধ্যে যাবে, তাদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসবে। কারণ আল্লাহ তাআলা প্রজ্ঞার আলো দিয়ে অন্তরকে জীবিত করেন; যেমন মৃত জমিনকে আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে জীবিত করেন। ৭৮৩]
মুআয ইবনু জাবাল বলেন, 'ইলম অর্জন করুন। কারণ আল্লাহর জন্য ইলম শেখা অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করে, ইলম অন্বেষণ করা ইবাদাত, তা নিয়ে আলোচনা করা তাস্বীহ, এতে গবেষণা করা জিহাদ, যে জানে না তাকে শিক্ষা দেওয়া সদাকা, উপযুক্ত ব্যক্তির জন্য তা খরচ করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম; কারণ ইলম হলো হালাল-হারামের নিদর্শন, ইলম জান্নাতের পথ দেখায়, নিঃসঙ্গতায় সঙ্গ দেয়, একাকিত্ব দূর করে, নির্জনতায় আলাপ করে, সুখে-দুঃখে পাশে থাকে, শত্রুর মোকাবিলায় অস্ত্র হিসেবে কাজ করে, বন্ধুদের নিকট সুশোভিত করে তোলে, আল্লাহ তাআলা ইলমের মাধ্যমে অনেকের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন, তাদেরকে কল্যাণকর কাজে ইমাম ও নেতা বানিয়ে দেন; যার ফলে তাদের কাজকর্মের অনুসরণ করা হয়, তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ফায়সালা করা হয়, ফেরেশতারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী হয়, তাদের পদতলে নিজেদের ডানা বিছিয়ে দিয়ে সম্মান দেখায়, শুকনো ও সিক্ত প্রতিটি বস্তু তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, জল-স্থলের সমস্ত প্রাণী তাদের জন্য দুআ করতে থাকে; কারণ ইলম মূর্খতা থেকে অন্তরকে জীবিত করে, অন্ধকার থেকে আলোতে আসতে চোখের জন্য প্রদীপের ভূমিকা রাখে, ইলমের মাধ্যমে ব্যক্তি দুনিয়া-আখিরাতে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা অর্জন করে নেয়, ইলম নিয়ে চিন্তাভাবনা করা সিয়াম পালনের সমতুল্য, এ ব্যাপারে পরস্পর আলোচনা করা তাহাজ্জুদ আদায়ের সমপর্যায়ের, এর মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো সুদৃঢ় রাখা যায়, হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধের পরিচয় পাওয়া যায়, ইলম হলো আমলের ইমাম আর আমল হলো তার অনুসারী, সৌভাগ্যবানদের ইলম দান করা হয় আর দুর্ভাগাদের ইলম থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। [৭৮৪]
অনেকেই এই রিওয়ায়াতটিকে নবি-এর বাণী বলে বর্ণনা করেন; তবে এটি সাহাবির কথা হিসেবেই অধিক বিশুদ্ধ।
দুই. হিম্মত ও ইচ্ছাশক্তির জীবন: মানুষের অন্তর যখন দুর্বল থাকে, তখন তার হিম্মত ও সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়ে। আর অন্তর যখন প্রাণশক্তিতে ভরপুর থাকে, তখন হিম্মত থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের এবং তখন তার ভালোবাসা ও ইচ্ছাও হয় শক্তিশালী। কেননা ইচ্ছা ও ভালোবাসা হয় প্রিয় ব্যক্তির প্রতি অনুভূতি এবং অন্তর সুস্থ থাকা অনুপাতে; অন্তরের বিভিন্ন অসুস্থতা ব্যক্তির মাঝে এবং তার ইচ্ছা ও চাওয়ার মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। (ফলে ভালোবাসা ও সংকল্পে ঘাটতি আসে।)
সুতরাং হিম্মত ও ইচ্ছাশক্তিতে দুর্বলতা আসার কারণ হয়তো অনুভূতি ও উপলব্ধির ঘাটতি অথবা প্রাণশক্তিতে দুর্বলতা আনে এমন রোগের উপস্থিতি। ইচ্ছা ও উপলব্ধি শক্তিশালী হওয়া প্রাণশক্তি শক্তিশালী হওয়ার প্রমাণ বহন করে। এমনিভাবে ইচ্ছা ও উপলব্ধি দুর্বল হওয়া প্রাণশক্তি দুর্বল হওয়ার প্রমাণ বহন করে। যেরকমভাবে উচ্চ হিম্মত পরিপূর্ণ প্রাণশক্তির প্রমাণ বহন করে। পূর্ণাঙ্গ ও পবিত্র জীবন লাভের জন্য এগুলো হলো মাধ্যম। কেননা উত্তম, পবিত্র ও প্রশান্তিময় জীবনের নাগাল তো উচ্চ হিম্মত, খাঁটি ভালোবাসা এবং ভরপুর ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমেই পাওয়া যায়। এগুলোর পরিমাণ অনুপাতে উত্তম ও প্রশান্তিময় জীবন লাভ হয়। যার হিম্মত, ভালোবাসা ও কোনোকিছু অর্জনের ইচ্ছাশক্তি যত কম ও দুর্বল, তার জীবন তত যন্ত্রণার ও নিম্নমানের। সেসময় তার জীবনের চেয়ে পশুপাখির জীবন উত্তম বলে বিবেচিত হয়।
যেরকমভাবে খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে শরীরে প্রাণশক্তি আসে, ঠিক তেমনি অন্তরও প্রাণবন্ত হয় অবিরাম আল্লাহর স্মরণ, আল্লাহর প্রতি ধাবমানতা এবং পাপাচার থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে।
অন্তরে শেকড়-গেড়ে-বসা গাফলতি, নোংরা-অশ্লীলতার সাথে সার্বক্ষণিক সম্পৃক্ততা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ ব্যক্তির প্রাণ ও জীবনীশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। এই দুর্বলতা ও নিস্তেজতা বাড়তেই থাকে। অবশেষে তা অন্তরকে মেরে ফেলে। অন্তরের মৃত্যুর আলামত হলো ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দ বলে বোঝার অনুভূতি হারিয়ে ফেলা।
প্রকৃত মানুষ তো সে-ই ব্যক্তি, যে তার অন্তরের মৃত্যুর ভয় করে, তার দেহের মৃত্যুর নয়। কারণ অধিকাংশ মানুষই তাদের শারীরিক মৃত্যুর ভয়ে ভীত; কিন্তু অন্তরের মৃত্যুর কোনো পরোয়াই করে না। তারা বাহ্যিক এই জীবন ব্যতীত আর কোনো জীবনের কথা জানেই না। এটি আসলে কল্প ও রূহের মৃত্যুর কারণে হয়ে থাকে। কেননা বাহ্যিক এই জীবন আসলে ক্ষণস্থায়ী কোনো ছায়ার মতো অথবা দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া কোনো ঘাসের মতো কিংবা ঘুমের ঘোরে দেখা আপাত সত্য কোনো স্বপ্নের মতো; ঘুম ভেঙে গেলে পরে এই উপলব্ধি হয় যে, এর সবই ছিল কল্পনা। যেমন উমর ইবনুল খাত্তাব বলেছেন, 'যদি কোনো ব্যক্তিকে পার্থিব এই দুনিয়ার শুরু থেকে শেষ সবকিছু দিয়ে দেওয়া হয়; অতঃপর মৃত্যু এসে তার কাছে উপস্থিত হয়, তা হলে তার অবস্থা হবে সেই ঘুমন্ত ব্যক্তির মতো; যে স্বপ্নে আনন্দদায়ক অনেক কিছু দেখে, এরপর জেগে উঠে দেখে তার হাতে কিছুই নেই।'
কেউ কেউ বলেছেন, 'মৃত্যু দুই প্রকার: স্বেচ্ছায় মৃত্যু এবং স্বাভাবিক মৃত্যু। যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করবে, স্বাভাবিক মৃত্যু তার জন্য (প্রকৃত) জীবন হবে।'
এর ব্যাখ্যা হলো: স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করার মানে হচ্ছে খাহেশাত ও প্রবৃত্তির চাহিদাকে দমিয়ে রাখা, এর জ্বলন্ত আগুনকে নিভিয়ে দেওয়া এবং এর ধ্বংসাত্মক উত্তেজনাকে শান্ত করা। এর ফলে ব্যক্তির কীসে পূর্ণাঙ্গতা ও সফলতা তা নিয়ে অন্তর ও রূহ চিন্তাভাবনা করার এবং তাতে নিমগ্ন হওয়ার সুযোগ পায়। তখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে, দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী ছায়াকে চিরস্থায়ী সুখ-শান্তির ওপর প্রাধান্য দেওয়া সর্বোচ্চ ক্ষতির কারণ।
এটি এমন একটি বিষয়, যা কেবল বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী ব্যক্তিরাই বুঝতে পারে। আর এর দাবি অনুযায়ী কেবল উচ্চ মনোবল ও পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিরাই আমল করে থাকে।
তিন. সুন্দর গুণাবলি ও উত্তম আচরণের প্রাণশক্তি: এই গুণে গুণান্বিত ব্যক্তির সুদৃঢ় ও শক্তিশালী জীবন হাসিল হয়। এই ব্যক্তির জন্য পরিপূর্ণতার স্তরে পৌঁছাতে খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয় না। তার উত্তম আখলাক ও প্রশংসনীয় গুণাবলির কারণে এর জন্য তাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না। সে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যদি গুণাবলি থেকে সে পৃথক হয়ে যায়, তা হলে তার তবিয়ত ও সহজাত বৈশিষ্ট্য থেকেই সে পৃথক হয়ে যায়। সুতরাং যে ব্যক্তি সৃষ্টিগতভাবেই লাজুকতা, পবিত্রতা, উদারতা, দানশীলতা, মানবিকতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত সেই ব্যক্তির জীবন ওই ব্যক্তির জীবনের তুলনায় পরিপূর্ণ, যে নিজের নফসের সাথে মুজাহাদা ও কঠোর পরিশ্রম করে এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেননা এই ব্যক্তি হলো সেই ব্যক্তির মতো, যে অসুস্থতা থেকে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে আরোগ্য লাভ করেছে। আসলে যে রোগ থেকে সুস্থতা লাভ করেছে আর যে আগে থেকেই সুস্থ-এই দুই ব্যক্তি যেমন শারীরিক দিক থেকে এক নয়, তেমনি তারাও সমশ্রেণির হয় না।
যখন কারও মাঝে সুন্দর গুণাবলির পূর্ণ সমাবেশ ঘটবে, তখন তার জীবনীশক্তিও বেশ শক্তিশালী ও পরিপূর্ণ হবে। এ কারণেই লাজুকতার গুণটি (اَلْحَيَاءُ) শব্দগত ও অর্থগত উভয় দিক দিয়েই জীবনীশক্তি (اَلْحَيَاةُ) থেকে উৎসারিত হয়েছে। ফলে পরিপূর্ণ জীবনীশক্তির অধিকারী ব্যক্তির লাজুকতাও বেশি থাকে। আর যার লাজুকতা কম তার জীবনীশক্তিতেও ঘাটতি থাকে। কেননা রূহ যখন মারা যায়, তখন খারাপ ও নোংরা কিছুর কারণে তার কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না। ফলে সে কোনো লজ্জা অনুভব করে না। আর যদি কল্ব ও রূহ জীবিত থাকে, তা হলে তা অশ্লীলতা অনুভব করে এবং তাতে লজ্জা পায়। এমনিভাবে অন্যান্য উত্তম গুণাবলির ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রাণশক্তির পূর্ণতায় সেগুলোও পূর্ণতা পায় এবং প্রাণশক্তির ঘাটতিতে সেগুলোতেও ঘাটতি আসে।
চার. আনন্দ, খুশি ও আল্লাহর প্রতি চোখের শীতলতার জীবন: এই স্তরের জীবন লাভ হয় উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার পরে। যার দ্বারা এর অন্বেষণকারীর চক্ষু শীতল হয়। এটি ব্যতীত কোনো উপকারী জীবন নেই। এ রকম জীবন লাভের জন্যই সমস্ত মানুষ আকাঙ্ক্ষা করে; কিন্তু স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তি বাদে সবাই ভুল পথে পা বাড়ায়, বিভিন্ন পথে ঘুরতে থাকে। সবাই এই জীবনেরই সন্ধান করে; কিন্তু অধিকাংশই এর থেকে বঞ্চিত থাকে।
বঞ্চিত থাকার কারণ হলো: বুদ্ধির স্বল্পতা, সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকরণে দুর্বলতা, দূরদর্শিতা, উচ্চ মনোবল ও হিম্মতের অভাব। কারণ এর উপকরণ হলো সুউচ্চ মনোবল এবং শাণিত অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতা; যা অন্ধ ব্যক্তিকেও পথ দেখায়, পরিপূর্ণ জ্যোতিতে তাকে আলোকিত করে। উপরিউক্ত দোষত্রুটিগুলো কখনো কখনো সৃষ্টিগতভাবেই থাকে, আবার কখনো বিভিন্ন কারণে সৃষ্টি হয়।
মোটকথা জীবনের এই স্তরটিই সর্বোচ্চ মর্যাদার স্তর। কিন্তু এই স্তরে সেই ব্যক্তি কীভাবে পৌঁছুবে, যার বুদ্ধি-বিবেচনা সবসময় খাহেশাত আর প্রবৃত্তির শহরেই বন্দি থাকে, যার আশা-আকাঙ্ক্ষা স্বাদ আর বিলাসিতার অনুসন্ধানেই সীমাবদ্ধ, যার জীবন কেটে যায় মন্দ স্বভাবের তাড়নায়, যার দ্বীন গুনাহ আর অপকর্মের কারণে ধ্বংস হওয়ার দ্বারপ্রান্তে, যার মনোবল নিম্ন পর্যায়ের আর যার আকীদা-বিশ্বাস নববি আকীদা-বিশ্বাসের বিপরীত!?
আপনি যদি প্রশ্ন করেন: আপনি যে জীবনের কথা বললেন, যে জীবন থেকে অধিকাংশ মানুষই বঞ্চিত এবং মৃত-সে জীবনে পৌঁছার পথ সম্পর্কে কি বিশদ বিবরণ দিতে পারবেন, যাতে আমি সেখানে পৌঁছতে পারি, তার স্বাদ আস্বাদন করতে পারি? এবং যাতে আমার সামনে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আমরা যে জীবনযাপন করছি তা পশু-প্রাণীর জীবন, কখনো কখনো আমাদের থেকে পশুর জীবনও উত্তম হয়ে ওঠে, তারা গুনাহ ও অপকর্ম থেকে মুক্ত এবং তাদের কোনো শেষ পরিণতি নেই বলে!
তা হলে আমি বলব: আল্লাহর শপথ! আপনার এই জীবনের প্রতি আগ্রহ, এর সম্পর্কে জানা ও জ্ঞান লাভ করার যে উদ্দীপনা তা-ই প্রমাণ করে যে আপনি জীবন্ত, নিশ্চিতভাবেই আপনি অন্যান্য মৃতদের কাতারে না।
এ পথের প্রথম কাজ হলো আল্লাহ তাআলাকে চিনে নেওয়া এবং এমন পন্থা অবলম্বন করা, যা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে এবং দূরদর্শিতার উজ্জ্বলতায় স্বভাবের সব অন্ধকার দূর করে দেবে; ফলে অন্তরে আখিরাতের দিকে আহ্বানকারী একজন নিযুক্ত হবে, যে তাকে পরিপূর্ণভাবে সে দিকে টেনে নেবে, ধ্বংসশীল সমস্ত সম্পর্ক থেকে বাঁচিয়ে রাখবে, খাঁটি তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করবে, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব আদেশ পালন করতে এবং নিষেধকৃত সব কাজকর্ম পরিত্যাগ করতে উদ্দীপনা জোগাবে; অতঃপর তার অন্তরে প্রহরী হিসাবে অবস্থান করবে, ফলে আল্লাহ তাআলা অপছন্দ করেন এমন প্রতিটি চিন্তা-চেতনার ব্যাপারে কোনো ছাড় দেবে না এবং অহেতুক অপকারী ভাবনা থেকেও (অন্তরকে) দূরে রাখবে। যার দরুন অন্তর কুচিন্তা ও ওয়াসওয়াসা থেকে স্বচ্ছ হবে। তখন আল্লহ তাআলার স্মরণে, তাঁর ভালোবাসায় এবং তাঁর দিকে ধাবিত হতে অন্তর মুক্ত হবে। নফস ও সৃষ্টিগত তবিয়তের খোলস থেকে বেরিয়ে আপন রবের সান্নিধ্য ও স্মরণে নিমগ্ন হবে। যেমন কবি বলেন,
وَأَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الْبُيُوتِ لَعَلَّنِي ... أُحَدِّثُ عَنْكَ النَّفْسَ بِالسِّرِّ خَالِيًا ঘরবাড়ি ছেড়ে আমি বেরিয়ে এসেছি এই আশায় বেঁধে মন, নির্জনতায় তোমার সাথে হবে হৃদয়ের গোপন কথোপকথন।
আসলে তখন তার অন্তর, চিন্তা-চেতনা, হৃদয়ে উদিত ভাবনা, আল্লাহর সন্ধান করা এবং আল্লাহর প্রতি আগ্রহ-এ সবই আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী হয়।
এ ব্যাপারে সে একনিষ্ঠ ও সত্যবাদী হলে তাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসা দান করা হবে, নবি ﷺ-এর রূহানিয়্যাত তার অন্তরে স্থান করে নেবে। ফলে সে নবিজিকে নিজের ইমাম, পথপ্রদর্শক, শিক্ষক, শাইখ ও নেতা হিসাবে গ্রহণ করবে। যেভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবি, রাসূল ও তাঁর দিকে পথ প্রদর্শনকারী বানিয়েছেন। এরপর সে নবি ﷺ-এর সীরাত, তাঁর প্রাথমিক বিষয়াদি, কীভাবে তাঁর ওপর ওহি অবতীর্ণ হতো ইত্যাদি সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে আরম্ভ করবে, তাঁর গুণাবলি, আখলাক-চরিত্র, আচার-আচরণ, চলাফেরা, জাগরণ-নিদ্রা, ইবাদাত- বন্দেগি, নিজ পরিবারের লোকজন এবং সাথিসঙ্গীদের সাথে আচার-ব্যবহারে রীতিনীতি কেমন ছিল তাও জানতে থাকবে। এক পর্যায়ে তার অবস্থা এমন হবে, যেন সে নবি ﷺ-এর সঙ্গী হয়ে তাঁর সাথে অবস্থান করছে।
তার অন্তর যখন এ বিষয়টিতে মজবুত ও দৃঢ় হবে, তখন তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ-ওহি বোঝার যোগ্যতা দান করা হবে; তা এমনভাবে যে, যদি কোনো সূরা পাঠ করে, তা হলে যে বিষয়ে তা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তা দ্বারা যে উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে, তার অন্তর সেটা প্রত্যক্ষ করবে। সেই সূরা থেকে প্রশংসনীয় গুণাবলি, আদব-আখলাক গ্রহণ করবে, তাতে পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করতে পরিশ্রম করবে এবং অপছন্দনীয় বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে; যেমন ভয়ংকর কোনো অসুখ থেকে সুস্থতা লাভ করতে চেষ্টা করে থাকে।
এতে সফল হলে তার অন্তরে ভিন্ন একটি চোখ খুলে যাবে, যার দ্বারা সে আল্লাহ তাআলার গুণাবলি দেখতে পাবে। একসময় তার অন্তর স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার মতো অবস্থায় পৌঁছে যাবে। ফলে সে সৃষ্টিজগতের ওপর আল্লাহ তাআলার কার্যক্রম দেখতে পাবে। সে দেখতে পাবে আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়া, তাঁর নিকট থেকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁর বিভিন্ন হুকুম অবতীর্ণ হওয়া, ওহি নিয়ে জিবরীলের সাথে কথা বলা, তাকে যা ইচ্ছা যার নিকট ইচ্ছা পাঠিয়ে দেওয়া, সমস্ত বিষয়াদি আল্লাহর নিকট আসা, আল্লাহর সামনে পেশ করা ইত্যাদি।
এর ফলে তার অন্তর আল্লাহ তাআলাকে প্রত্যক্ষ করবে যে, তিনি তাঁর বান্দাদের ওপর প্রতাপশালী, আদেশদাতা, নিষেধকারী, নবি-রাসূল প্রেরণকারী, আসমানি কিতাব অবতীর্ণকারী এবং তিনি হলেন অনুসরণীয় মা'বুদ, যাঁর কোনো শরীক নেই, সমকক্ষ ও সদৃশ নেই, যাঁর সাথে কোনো বিষয়ে কারও অণুপরিমাণও অংশীদারত্ব নেই, বরং সমস্ত বিষয় রয়েছে কেবল তাঁরই কবজায়। সে আল্লাহর রাজত্ব ও ক্ষমতা সরাসরি দেখতে পাবে-নড়াচড়া করা, স্থির থাকা, উপকার করা, ক্ষতি করা, দান করা, দান করা থেকে বিরত থাকা, সম্প্রসারিত হওয়া, সংকুচিত হওয়া সবই কেবল তাঁরই ক্ষমতায় ও পরিচালনায় পরিচালিত হয়। সে দেখতে পাবে পুরা সৃষ্টিজগৎ তাঁর হুকুমেই পরিচালিত। তবে তিনি নিজে নিজেই প্রতিষ্ঠিত, তাঁকে কেউ চালিত করে না; বরং তিনিই সবকিছুকে পরিচালিত করেন।
যখন ব্যক্তির অন্তরে এই বিষয়গুলো বসে যায়, তখন তার সামনে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সান্নিধ্যের দরজা উন্মুক্ত করা হয়। ফলে আসমানের ওপরে আল্লাহর আরশে সমাসীন থাকা, সৃষ্টিজগৎ থেকে পৃথক থাকা, সবকিছু পরিচালনা করা, সৃষ্টি করা, আদেশ দেওয়া ইত্যাদি যাবতীয় সক্রিয়তা সত্ত্বেও সে নিজের সাথে আল্লাহকে দেখতে পায়, তার থেকে তিনি কখনো অনুপস্থিত থাকেন না, বরং তিনি তার নিকটেই অবস্থান করেন। শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে সে আল্লাহর এই সমস্ত সিফাতসহ তাঁর সান্নিধ্য লাভ করে। নিঃসঙ্গতার পরে তার এই সঙ্গ লাভ হয়, দুর্বলতার পরে এর মাধ্যমে সে শক্তিশালী হয়, পেরেশানি ও অস্থিরতার পরে সে এর দ্বারা আনন্দিত হয়, নিঃস্ব অবস্থা দূর হয়ে সে প্রাচুর্যতার অধিকারী হয়। এ পর্যায়ে এসে সে রাসূল ﷺ-এর বর্ণিত এই হাদীসের স্বাদ অনুভব করে-
وَلَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَى بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَلَبِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَبِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ
"আমার বান্দা নফল আমল দ্বারা প্রতিনিয়ত আমার অধিক নৈকট্য হাসিল করতে থাকে। অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। আর যখন আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে; আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে; আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে এবং আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। যদি সে আমার কাছে কোনোকিছু চায়, তবে অবশ্যই আমি তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে নিশ্চিতভাবেই আমি তাকে আশ্রয় দিই।”[৭৮৫]
উত্তম ও প্রশান্তিময় জীবন বলতে এই ব্যক্তির জীবনকেই বোঝায়। সে আল্লাহকে ভালোবাসে, আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন, সে আল্লাহর নিকটবর্তী, আল্লাহও তার নিকটবর্তী। তার অন্তরে আল্লাহর প্রভাব প্রকট হওয়ার কারণে, সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করার কারণে এবং তার ইচ্ছা আল্লাহর সন্তুষ্টির অধীন হওয়ার কারণে সে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়। এমনকি সে আল্লাহর কান, চোখ, হাত ও পায়ে পরিণত হয়। আর এগুলো হলো তার উপলব্ধি, আমল ও কাজকর্ম করার মাধ্যম। সুতরাং সে যদি শোনে আল্লাহর পছন্দনীয় বিষয়ই শোনে, যদি দেখে আল্লাহর প্রিয় বস্তুই দেখে, যদি কিছু ধরে তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই ধরে আর যদি চলে তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই চলে।
বিষয়টির উপলব্ধি যদি আপনার কাছে কঠিন মনে হয় যে, পরিপূর্ণ ভালোবাসা পোষণকারী ব্যক্তি তার প্রিয় মানুষের কান দিয়ে শুনবে, তার চোখ দিয়ে দেখবে, তার হাত দিয়ে ধরবে, তার পা দিয়ে হাঁটবে; অথচ সে তার থেকে অনুপস্থিত!? তা হলে আপনি এর থেকে চোখ বন্ধ করে রাখুন এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ছেড়ে দিন। কবি বলেন,
خَلِ الْهَوَى لِأُنَاسِ يُعْرَفُوْنَ بِهِ ... قَدْ كَابَدُوا الْحُبَّ حَتَّى لَانَ أَصْعَبُهُ
কিছু মানুষের জন্য ছেড়ে দিন ভালোবাসার বিষয়, ভালোবাসার মাধ্যমেই পাওয়া যায় তাদের পরিচয়। ভালোবাসার জন্য তারা করে বেশ কঠোর পরিশ্রম; ফলে অতি কষ্টের বস্তুও তাদের জন্য হয় মনোরম।
পাঁচ. শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে রূহের জীবন: দুনিয়ার এই জেলখানা ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি পাবার পর রূহ আসল জীবন লাভ করে। কারণ দুনিয়ার ওপারেই রয়েছে প্রশস্ততা, আরাম-আয়েশ আর পরিপূর্ণ সুখের জীবন। রূহের নিকট আখিরাতের জীবনের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে মায়ের পেটের মতো কিংবা তার চেয়েও সংকীর্ণ মনে হয়।
আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ বলেছেন, 'দুনিয়া থেকে বের হওয়ার জন্য তোমার তৎপরতা হোক ঠিক সেরকম, যেরকম সংকীর্ণ কারাগার থেকে প্রিয়জনদের নিকট ফিরে যেতে এবং তাদের সাথে মনোরম পরিবেশে একত্রিত হতে তৎপর থাকো।'
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَأَمَّا إِنْ كَانَ مِنَ الْمُقَرَّبِينَ فَرَوْحٌ وَرَيْحَانٌ وَجَنَّتُ نَعِيمٍ ۞
"যদি সে নৈকট্যশীলদের একজন হয়; তা হলে তার জন্য রয়েছে আরাম-আয়েশ, উত্তম রিস্ক এবং নিয়ামাতে-ভরা-উদ্যান।” [৭৮৬]
আখিরাতের জীবন সুখময় হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সেখানে সুউচ্চ বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ হবে আর দুনিয়ার স্বার্থপর ও আঘাত দানকারী বন্ধুরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে; যাদের সাক্ষাৎ ও দর্শন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলত। মৃত্যু আখিরাতের জীবনের প্রবেশদ্বার ও সেতু; মৃত্যুর মধ্যে যদি এটি ছাড়া আর কোনো কল্যাণ না-ও থাকত, তবুও মৃত্যু মুমিনের জন্য উপহার হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতো।
সুতরাং দুনিয়ার এই সংক্ষিপ্ত ও সংকীর্ণ জীবনে পরিশ্রম করা, মেহনত করা, দুঃখ-কষ্ট-মুসীবত সহ্য করা কেবল সেই জীবনের জন্যই। ইলম ও আমল তাতে পৌঁছার মাধ্যম। আখিরাতের জীবন হলো জাগ্রত অবস্থা আর এর পূর্বে যা ছিল তা ঘুমন্ত অবস্থা। আখিরাতের জীবন হলো মূল আর এর পূর্বে যা ছিল তা এর অধীন। আখিরাতের জীবন এমন, যাতে সবকিছু পাওয়া যাবে। সেখানে পছন্দনীয় কোনো কিছুরই অপ্রাপ্তি থাকবে না। সুখ, শান্তি, স্বাদ, স্বস্তি, আরাম-আয়েশ সবকিছুই মিলবে সেখানে। এর প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করতে মানুষ অক্ষম। কারণ এটি এমন এক আবাস, যার ব্যাপারে আমাদের কোনো জানাশোনা নেই। আমাদের মাঝে আর সেখানকার বাসিন্দাদের মাঝে কোনো সংযোগও নেই। যার ফলে নফস দুনিয়ার এই সংকীর্ণ জীবনে অনেক সময় ধরে অবস্থান করার কারণে এখান থেকে সেখানে স্থানান্তরিত হতে অপছন্দ করে এবং এই দুনিয়া ছেড়ে যেতে বিষণ্ণ বোধ করে।
আমাদের নিকট আখিরাতের জীবন সম্পর্কে জ্ঞান এসেছে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত, জ্ঞানী ও হিতাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি মুহাম্মাদ ﷺ-এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার পাঠানো খবর ও সংবাদের দরুন। ফলে মুমিনদের অন্তরে তা চোখে দেখার ন্যায় বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
এই স্তরে শহীদদের জীবন সম্পর্কে জানা যায় যে, তাদের রবের নিকট হতে তাদেরকে রিস্ক দেওয়া হয়, তাদের জীবন হলো দুনিয়ার জীবনের তুলনায় পরিপূর্ণ ও প্রশান্তিময়; যদিও তাদের শরীর ক্ষয় হয়ে গিয়েছে, গোশত ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে, হাড়-হাড্ডি শরীর থেকে পৃথক হয়ে পচে গিয়েছে। কিন্তু তাদের আমল বৃথা যায়নি। তাদের জন্য তাদের রবের নিকট রয়েছে সমূহ মর্যাদা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلاَ تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ )
“যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, আপনি তাদেরকে কখনো মৃত মনে করবেন না। বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত এবং তাদেরকে রিস্ক দেওয়া হচ্ছে।” [৭৮৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ )
"আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত, তবে তোমরা তা টের পাও না।”[৭৮৮]
শহীদ ব্যক্তিগণ কবরের জীবনে এই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করেছে নবি-রাসূলদের নির্দেশিত পথে চলার কারণে এবং তাদেরকে অনুসরণ করার মাধ্যমে। তা হলে নবি-রাসূলদের কবরজীবন কেমন হবে বলে আপনার ধারণা?!
দুনিয়ার জীবনের তুলনায় সেখানে আম্বিয়ায়ে কেরাম, শহীদ ও সিদ্দীকদের জীবন হবে পরিপূর্ণ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। দুনিয়ার জীবন তো সামান্য সময়ের। প্রতিটি ব্যক্তিই তার দুনিয়ার জীবনযাপন অনুযায়ী সেই জীবনে সুখ-শান্তি লাভ করবে। আল্লাহ তাআলাই একমাত্র সাহায্য-লাভের উৎস।
ছয়. চিরস্থায়ী অনন্ত জীবন: দুনিয়ার জীবন ফুরিয়ে যাবার পর এই জীবনের দেখা মিলবে, যা কখনো ফুরাবে না। এটিই হলো সেই জীবন যার দিকে আগ্রহীরা দ্রুত ধাবিত হয়, প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করে আর অগ্রগামীরা এ দিকেই অগ্রসর হয়। এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই আমাদের আলোচনা, সমস্ত আসমানি কিতাব ও নবি-রাসূল এর প্রতিই আহ্বান করেছেন। যে ব্যক্তি এই জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি, সে এ জীবন সম্পর্কে বলবে:
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا وَجِيْءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي ) فَيَوْمَئِذٍ لَّا يُعَذِّبُ عَذَابَهُ أَحَدٌ وَلَا يُوْثِقُ وَثَاقَهُ أَحَدٌ )
"কখনই নয়, পৃথিবীকে যখন চূর্ণবিচূর্ণ করে বালুকাময় করে দেওয়া হবে এবং আপনার রব এমন অবস্থায় দেখা দেবেন, যখন ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে। সেদিন জাহান্নামকে সামনে আনা হবে। সেদিন মানুষ বুঝবে; কিন্তু তার বুঝতে পারা তখন কী কাজে আসবে? সে বলবে, 'হায়, আমি যদি নিজের জীবনের জন্য অগ্রীম কিছু পাঠিয়ে দিতাম!' সেদিন আল্লাহ যে শাস্তি দেবেন, তেমন শাস্তি কেউ দিতে পারবে না। আর আল্লাহ যেমন বাঁধবেন, তেমন আর কেউ বাঁধতে পারবে না।” [৭৮৯]
এই জীবন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهُمْ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُوْنَ
“এই দুনিয়ার জীবন একটি খেলা ও মন ভুলানোর সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। পরকালের আবাসই প্রকৃত জীবন। হায়, যদি তারা জানত!”[৭৯০]
পরকালীন জীবনের তুলনায় এই জীবন হলো ঘুমের ন্যায়। এর পূর্বে যত আলোচনা হয়েছে-আল্লাহর-পথের-পথিকদের পথচলা ও এর বিভিন্ন মানযিলসমূহের বিবরণ-সবকিছুই হলো এই জীবনে পৌঁছার মাধ্যম। নবি দুনিয়ার জীবন ও আখিরাতের জীবনের একটি সুন্দর উপমা দিয়েছেন:
مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا كَمَا يُدْخِلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ فِي الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ تَرْجِعُ
“দুনিয়া আখিরাতের তুলনায় এতটুকু, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রের পানিতে তার একটি আঙুল ডুবিয়ে তুলে আনল। সে লক্ষ করে দেখুক, তার আঙুল কতটুকু পানি নিয়ে ফিরেছে।”[৭৯১]
যেমন বলা হয়ে থাকে, ‘আখিরাত শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করেছে। দুনিয়া হলো এর শ্বাসপ্রশ্বাসের একটি অংশ। সৌভাগ্যবানরা এর উত্তম অংশ পেয়েছে; ফলে তারা তার ওপরই আমল করে থাকে। অপরদিকে দুর্ভাগারা পেয়েছে মন্দ অংশ; আর তারা তার ওপরই আমল করে থাকে।'
ঈমানদার ও নেককার ব্যক্তিদের জীবন যখন এই দুনিয়াতেই উত্তম ও প্রশান্তিময় হয়, তখন কবরজগতে তাদের জীবন কেমন হবে বলে আপনার ধারণা, যখন তারা দুনিয়ার কারাগার ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে?! অতঃপর তাদের অনন্তকালের অফুরান জান্নাতি জীবন কেমন হবে? যার সুখ-শান্তি কখনো ফুরাবে না, আর তারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের রবের দর্শন লাভ করবে এবং তাঁর সম্ভাষণ শ্রবণ করতে থাকবে!?

টিকাঃ
[৭৭৯] সূরা নাহল, ১৬: ৩০।
[৭৮০] সূরা আনআম, ৬: ১২২।
[৭৮১] সূরা ইয়া-সীন, ৩৬: ৬৯-৭০।
[৭৮২] সূরা ফাতির, ৩৫: ২২।
[৭৮৩] আহমাদ, কিতাবুয যুহদ, ৫৫২; মালিক, আল-মুওয়াত্তা, ৩৬৭০।
[৭৮৪] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলমি ও ফাদলিহী, ২৬৯; যামাখশারি, রবিউল আবরার, ৪/১৫।
[৭৮৫] বুখারি, ৬৫০২।
[৭৮৬] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬: ৮৮-৮৯।
[৭৮৭] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৬৯।
[৭৮৮] সূরা বাকারা, ২: ১৫৪।
[৭৮৯] সূরা ফাজর, ৮৯ : ২১-২৬।
[৭৯০] সূরা ২৯: ৬৪।
[৭৯১] মুসলিম, ২৮৫৮; তিরমিযি, ২৩২৩; ইবনু মাজাহ, ৪১০৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00