📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 অপরিচিতির প্রকারভেদ

📄 অপরিচিতির প্রকারভেদ


অপরিচিতি তিন প্রকার:
১. দুনিয়ার সব মানুষের মাঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসারীদের অপরিচিতি: এটি এমন অপরিচিতি (বা গুরবাহ) রাসূলুল্লাহ ﷺ যার প্রশংসা করেছেন এবং তিনি যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন, তার ব্যাপারে বলেছেন بَدَأُ غَرِيبًا "এর সূচনা হয়েছে অপরিচিত অবস্থায়" এবং অচিরেই তা আবার শুরুর মতো অপরিচিত হয়ে যাবে। এই গুণের অধিকারীদের তিনি গুরাবা বা অপরিচিত বলে অভিহিত করেছেন।
স্থান, সময় ও সম্প্রদায়ভেদে এই অপরিচিতি পার্থক্য হয়। তবে এই গুণের অধিকারী সবাই আল্লাহওয়ালা। কারণ তারা আল্লাহকে ছাড়া অন্য কোথাও আশ্রয় গ্রহণ করেন না, রাসূল ﷺ-কে বাদ দিয়ে অন্য কোনো আদর্শের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন না এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন, তা ব্যতীত অন্য কোনো মতাদর্শের প্রতি কাউকে দাওয়াতও দেন না।
তাদেরর জন্য এই অপরিচিতি একাকিত্ব হয়ে দাঁড়ায় না। বরং মানুষ যখন একাকিত্ব অনুভব করে, তখন তারা (আল্লাহর সাথে) ঘনিষ্ঠ হয়। আর মানুষ যখন পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয়, তখন তারা (অপরিচিত হওয়ার কারণে) একাকিত্ব অনুভব করে; (যদিও তারা সবসময় আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠ থাকে)। গুরাবা ব্যক্তিবর্গের অভিভাবক আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল এবং মুমিন বান্দারা; যদিও অধিকাংশ মানুষ তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে এবং তাদের বিরোধিতা করে।
অপরিচিত বা গুরাবা শ্রেণির মধ্যে ওই সমস্ত ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত, যাদের কথা আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত এই হাদীসে এসেছে: নবি বলেছেন, كَمْ مِّنْ أَشْعَثَ أَغْبَرَ ذِي طِمْرَيْنِ لَا يُؤْبَهُ لَهُ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ
"এলোমেলো অগোছালো চুলবিশিষ্ট, ধূলিমলিন ও পুরাতন দুখানা ছেঁড়া কাপড় পরিহিত এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছে, যাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপই করা হয় না। অথচ তারা আল্লাহর নামে কসম করলে, আল্লাহ তা সত্যে পরিণত করেন।” [৭৬৭]
হাসান বস্ত্রি বলেছেন, 'দুনিয়াতে মুমিন ব্যক্তি হলেন অচেনা লোকের মতো; যিনি অপমানে ধৈর্যহারা হন না, সম্মান অর্জনে প্রতিযোগিতাও করেন না। মানুষ থাকে এক অবস্থায় আর তিনি থাকেন অন্য অবস্থায়। মানুষজন তার থেকে শান্তি ও স্বস্তিতে থাকে; কিন্তু তিনি নিজের (আমল) নিয়ে বেশ পরিশ্রমের মধ্যে থাকেন।'[৭৬৮]
এই সমস্ত অপরিচিত বা গুরাবাদের ব্যাপারে স্বয়ং নবি ঈর্ষাবোধ করেছেন। তাদের বৈশিষ্ট্য হলো: তারা সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে; যখন মানুষ এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। দ্বীনের নামে লোকজন নতুন যা উদ্ভাবন করে, তারা তা পরিত্যাগ করে; যদিও মানুষের নিকট তা খুব প্রসিদ্ধ কোনো রীতি হোক না কেন। তারা তাওহীদকে খাঁটি রাখে; যদিও অধিকাংশ মানুষ তা অস্বীকার করে। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ব্যতীত অন্য কারও প্রতি সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকে; তারা না কোনো শাইখের প্রতি সম্পৃক্ত হয় আর না কোনো পথ বা দলের প্রতি। বরং তারা ইবাদাতের ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তার অনুসরণের সাথেই সম্পৃক্ত থাকে। তারাই সত্যিকারার্থে জ্বলন্ত অঙ্গার ধারণকারী। আর অধিকাংশ মানুষ; বরং বলা যায় সমস্ত মানুষই তাদেরকে তিরস্কার করে। মানুষজনের সাথে অপরিচিতির কারণে মানুষ তাদেরকে বৃহৎ দল থেকে বিচ্ছিন্ন, আলাদা ও পথভ্রষ্ট হিসেবে গণ্য করে!
আসলে যে মুমিন আল্লাহর পথ অনুসরণ করে জীবন কাটায়, সে কীভাবেই-বা সেই সমস্ত ব্যক্তিদের থেকে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা হয়ে থাকবে না, যারা সবসময় নিজেদের খেয়াল-খুশি আর প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে!?
আর এ কারণেই বর্তমান সময়ের একজন সত্যবাদী খাঁটি মুসলিম, যে দ্বীনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে, তার প্রতিদান হবে পঞ্চাশজন সাহাবির প্রতিদানের সমান।
'সুনানু আবী দাউদ'-এ এসেছে, আবূ সা'লাবা খুশানি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ-কে এই আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَّنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
“হে ঈমানদারগণ, নিজেদের কথা চিন্তা করো, অন্য কারোর গোমরাহিতে তোমাদের কোনো ক্ষতি নেই, যদি তোমরা নিজেরা সত্য সঠিক পথে থাকো।” [৭৬৯]
রাসূলুল্লাহ উত্তরে বললেন,
بَلِ الْتَمِرُوا بِالْمَعْرُوفِ، وَتَنَاهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ ، حَتَّى إِذَا رَأَيْتَ شُحًا مُطَاعًا، وَهَوًى مُتَّبَعًا، وَدُنْيَا مُؤْثَرَةً، وَإِعْجَابَ كُلِّ ذِي رَأْي بِرَأْيِهِ، فَعَلَيْكَ - يَعْنِي - بِنَفْسِكَ، وَدَعْ عَنْكَ الْعَوَامَ، فَإِنَّ مِنْ وَرَابِكُمْ أَيَّامَ الصَّبْرِ ، الصَّبْرُ فِيْهِ مِثْلُ قَبْضٍ عَلَى الْجَمْرِ، لِلْعَامِلِ فِيْهِمْ مِثْلُ أَجْرِ خَمْسِينَ رَجُلًا يَعْمَلُوْنَ مِثْلَ عَمَلِهِ
"বরং তোমরা পরস্পরকে ভালো কাজের আদেশ দাও এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখো। অবশেষে যখন দেখবে, কৃপণতার আনুগত্য করা হচ্ছে, প্রবৃত্তির অনুসরণ করা হচ্ছে, পার্থিব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে আর প্রত্যেকেই নিজের মতকে প্রাধান্য দিচ্ছে, তখন তুমি নিজের ব্যাপারে যত্নবান হোয়ো এবং জনসাধারণের সংশোধন-চিন্তা পরিত্যাগ কোরো। কেননা তোমাদের সামনে ধৈর্য ধরার যুগ আসছে, যখন ধৈর্য ধরা জ্বলন্ত অঙ্গার মুষ্টিবদ্ধ করে রাখার মতো কষ্টকর হবে। সে সময় আমলকারীকে তার মতো পঞ্চাশজন আমলকারীর আমলের সমান সাওয়াব দেওয়া হবে।"
আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, তাদের মধ্যকার পঞ্চাশজন? জবাবে তিনি বললেন, "তোমাদের মধ্যকার পঞ্চাশজনের সমান সাওয়াব দেওয়া হবে।” [৭৭০]
এই বিশাল সাওয়াব প্রাপ্তির কারণ হলো: মানুষের মাঝে অজ্ঞাত ও অপরিচিত হয়ে থাকা এবং লোকজন যেখানে প্রবৃত্তি আর খাহেশাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা।
২. অপরিচিতির দ্বিতীয় প্রকার-নিন্দিত অপরিচিতি: এটি হলো বাতিলপন্থি ও পাপাচারীদের অপরিচিতি। তারা আল্লাহর সফলতাপ্রাপ্ত দল থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ। তাদের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও তারা একাকী ও নিঃসঙ্গ। কারণ তারা পৃথিবীবাসীর কাছে পরিচিত, কিন্তু আসমানবাসীর নিকট অপরিচিত।
৩. সাধারণ অপরিচিতি: যা প্রশংসিতও নয় আবার ঘৃণিতও নয়। এটি হলো নিজ ঘরবাড়ি থেকে দূরে গিয়ে অপরিচিত হয়ে থাকা। কেননা এই দুনিয়াতে সব মানুষই গৃহহীন, অপরিচিত। কারণ এখানে কারও কোনো স্থায়ী ঘর নেই আর এর জন্য মানুষজনকে সৃষ্টিও করা হয়নি। নবি আবদুল্লাহ ইবনু উমর-কে বলেছিলেন,
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيْلٍ
“তুমি দুনিয়াতে অবস্থান করো যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি অথবা পথচারী।” [৭৭১]
দুনিয়ার বাস্তবতা আসলে এমনই। বিষয়টি অন্তর দিয়ে অনুধাবন করতে এবং এর সঠিক পরিচয় হাসিল করতে (কুরআন-হাদীসে) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আর কীভাবেই-বা মানুষ এই দুনিয়াতে মুসাফির হিসেবে থাকবে না? সে তো সর্বদাই সফর করে চলেছে! তার এই সফর কেবল কবরবাসীদের নিকট পৌঁছার পরেই ক্ষান্ত হবে। আসলে মানুষ হচ্ছে বসে-থাকা-অবয়বে চলন্ত মুসাফির। কবি বলেন,
وَمَا هُذِهِ الْأَيَّامُ إِلَّا مَرَاحِلُ ... يَحُتُّ بِهَا دَاعٍ إِلَى الْمَوْتِ قَاصِدُ وَأَعْجَبُ شَيْءٍ لَوْ تَأَمَّلْتَ أَنَّهَا ... مَنَازِلُ تُطْوًى وَالْمُسَافِرُ قَاعِدُ
এই সব দিনরাত্রি কেবলই একেকটা করে মানযিল, এর দ্বারা মৃত্যুর দূত সবাইকে আমলে উদ্বুদ্ধ করছে। তবে যদি চিন্তা করেন সবচেয়ে আশ্চর্যের যা দেখবেন: মানযিলসমূহ রয়েছে গুটানো আর মুসাফিররা উপবিষ্ট।

টিকাঃ
[৭৬৬] সূরা আনআম, ৬: ১১৬।
[৭৬৭] তিরমিযি, ৩৮৫৪; মুসলিম, ২৬২২; ইবনু হিব্বান, ৬৪৮৩।
[৭৬৮] ইবনু রজব, জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, ৩/১১২৬; ইবনু আবী শাইবা, ৩৫২১০।
[৭৬৯] সূরা মায়িদা, ৫: ১০৫।
[৭৭০] আবূ দাউদ, ৪৩৪১; তিরমিযি, ৩০৬০।
[৭৭১] বুখারি, ৬৪১৬; তিরমিযি, ২৩৩৩; ইবনু মাজাহ, ৪১১৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00