📄 মানযিল : স্বাদ আস্বাদন করা (اَلذَّوْقُ)
স্বাদ (الذَّوْقُ) : এটি হলো পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় বস্তুসমূহকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করা। কুরআনের ভাষা ও আরবদের ভাষা অনুযায়ী স্বাদ (الذَّوْقُ) শুধু মুখ দ্বারা অনুভব করার সাথেই সীমাবদ্ধ নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُوْنَ
“অতএব এখন তোমরা তোমাদের কুফরির বিনিময়স্বরূপ আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো।”[৭৩৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ
“ফলে আল্লাহ ক্ষুধা ও ভীতির পোশাকে তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করালেন।”[৭৩৮]
চিন্তা করুন—আল্লাহ তাআলা কীভাবে স্বাদ আস্বাদন করা ও পোশাকের বিষয়টি একসাথে উল্লেখ করেছেন; এটি বোঝানোর জন্য যে, তিনি তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করিয়েছেন দ্রুত ও পরিপূর্ণভাবে। সুতরাং আয়াতটি স্বাদ আস্বাদনের কথা উল্লেখ করে এই সংবাদ দিচ্ছে যে, শাস্তিটি কোনো রকম বিলম্ব ছাড়া দ্রুতই দেওয়া হয়েছিল। কেননা মানুষ কখনো কখনো দেরিতেও ভয় পায়, তাৎক্ষণিকভাবে ভয় পায় না। (স্বাদ যেমন খাওয়ার সাথে সাথেই অনুভূত হয়, তেমনি তাদেরকে ভীতির শাস্তি দ্রুতই দেওয়া হয়েছিল।) আর পোশাকের কথা উল্লেখ করে এই সংবাদ দিচ্ছে যে, শাস্তিটি ছিল পরিপূর্ণভাবে বেষ্টনকারী। যেমন পোশাক শরীরকে সম্পূর্ণরূপে বেষ্টন করে নেয়।
'সহীহ মুসলিম'-এ এসেছে, নবি বলেছেন,
ذَاقَ طَعْمَ الإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا
"সেই ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে, যে রব হিসেবে আল্লাহকে, দ্বীন হিসেবে ইসলামকে এবং রাসূল হিসেবে মুহাম্মাদ-কে পেয়ে সন্তুষ্ট।”[৭৩৯]
নবি জানিয়েছেন যে, ঈমানেরও স্বাদ রয়েছে আর অন্তর তা আস্বাদন করে। যেমন মুখ খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ আস্বাদন করে।
নবি ঈমান ও ইহসানের হাকীকত উপলব্ধি করাকে এবং অন্তরে তা অর্জিত হওয়াকে কখনো স্বাদের মাধ্যমে, কখনো খাবার-পানীয়ের মাধ্যমে আবার কখনো মিষ্টতা অনুভূত হবে বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন ওপরে বর্ণিত হাদীসে আমরা দেখেছি। এমনিভাবে তিনি বলেছেন,
ثَلَاثَ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الإِيْمَانِ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ
“তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করতে পারে- ১. তার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য সব কিছু থেকে প্রিয় হওয়া, ২. কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা এবং ৩. কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপছন্দ।
করা।"[৭৪০]
রাসূলুল্লাহ সাহাবায়ে কেরাম-কে ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করতে যখন নিষেধ করেছিলেন, তখন তারা জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আপনি তো ধারাবাহিকভাবেই পালন করেন?' নবি তখন জবাব দিয়েছিলেন,
إِنِّي لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ إِنِّي أُطْعَمُ وَأُسْقَى
"আমার অবস্থা তোমাদের মতো নয়, আমাকে আহার করানো হয় এবং পানও করানো হয়।”
অপর এক বর্ণনায় এসেছে,
إِنِّي أَبِيْتُ يُطْعِمُنِي رَبِّي وَيَسْقِينِي
"আমি এমন অবস্থায় রাত্রিযাপন করি যে, আমার রব আমাকে খাওয়ান এবং পান করান।”[৭৪১]
যারা ধারণা করে যে, এই খাবার খাওয়ানো এবং পান করানো বস্তুগত খাদ্য ও পানীয়; যা মুখ দিয়ে খাওয়া হয়, তাদের বোধশক্তিতে মোটা পর্দা পড়েছে। তারা যেমন ধারণা করে বিষয়টি যদি এমনই হতো, তা হলে তো নবি সাওম পালনকারীই সাব্যস্ত হবেন না; ধারাবাহিকভাবে তা পালন করা তো দূরের কথা। যখন নবি সাহাবিদের জবাব দিয়েছেন যে, "আমি তোমাদের মতো নই।” তখন তাঁর মাঝে- ও তাদের মাঝে পার্থক্যটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁকে পানাহার করানো হয়। যদি নবি তাঁর পবিত্র মুখ দিয়েই পানাহার করতেন, তা হলে তিনি সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে বলতেন, 'আমিও ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করি না।' সুতরাং যখন 'আপনি তো ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করেন?'- তাদের এই প্রশ্নকে তিনি সমর্থন করেছেন, তখন বোঝা যায় যে, নবি-ও খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকতেন। তাঁর জন্য আল্লাহর-দেওয়া আত্মিক-পানাহারই যথেষ্ট ছিল; যা তাঁকে বাহ্যিক পানাহার থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছিল।
এই স্বাদ গ্রহণের বিষয়টির মাধ্যমে রোম সম্রাট হিরাকূল নুবুওয়াতের বিশুদ্ধতার ওপরে প্রমাণ পেশ করেছিলেন; তিনি আবূ সুফইয়ানকে বলেছিলেন, 'তাদের কেউ কি তাঁর দ্বীনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে তা থেকে ফিরে যায়?' আবূ সুফইয়ান উত্তর দিয়েছিলেন, 'না'। তখন তিনি বলেছিলেন, 'ঈমান এমনই; যখন তার মিষ্টতা ও স্বাদ অন্তরের সাথে মিশে যায়। (তখন আর কেউ তা থেকে ফিরে যায় না।) '[৭৪২]
রোম সম্রাট হিরাকূল নবি ﷺ-এর অনুসারীদের জন্য ঈমানের যে স্বাদ অনুভূত হয়, তার দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন যে, তা হলো নুবুওয়াত ও রিসালাতের দাবি; বাদশাহি ও রাজত্ব লাভের দাবি নয়। আসলে ঈমানের স্বাদ যখন কোনো অন্তরের সাথে মিশে যায়, তখন সে অন্তর আর কখনো ঈমান থেকে বিমুখ হয় না।
মূলকথা হলো: অন্তর ঈমান ও ইহসানের মিষ্টতা অনুভব করে। ঠিক যেমন মুখ বস্তুগত খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ অনুভব করে থাকে। ঈমানের স্বাদ ও মিষ্টতা আস্বাদন করার পূর্ব পর্যন্ত অন্তরে সংশয় ও সন্দেহ আসতেই থাকে। কিন্তু যখন তা অর্জিত হয়, তখন সব সংশয় দূর হয়ে যায়। ঈমানের স্বাদ অন্তরের সাথে মিশে গেলে, ব্যক্তি প্রতিটি আমলেই আনন্দ ও মিষ্টতা অনুভব করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দিন।
টিকাঃ
[৭৩৭] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১০৬।
[৭৩৮] সূরা নাহল, ১৬: ১১২।
[৭৩৯] মুসলিম, ৩৪।
[৭৪০] বুখারি, ১৬; মুসলিম, ৪৩।
[৭৪১] বুখারি, ১৯৬২, ১৯৬৪, ১৯৬৬; মুসলিম, ১১০২-১১০৫।
[৭৪২] বিস্তারিত দেখুন, বুখারি, ৭।
📄 মানযিল : খুশি ও আনন্দ (اَلْفَرَحُ وَالسُّرُورُ)
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوْا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ )
“হে নবি, আপনি বলে দিন, এটি আল্লাহর মেহেরবানি এবং তাঁর রহমত। সুতরাং এ জন্য তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। তারা যা কিছু জমা করছে, সেসবের চেয়ে এটি অনেক ভালো।”[৭৪৯]
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের আদেশ করেছেন যে, তারা যেন তাঁর মেহেরবানি ও রহমত প্রাপ্তিতে আনন্দিত হয়। এটি যিনি দান ও অনুগ্রহ করেছেন তাঁরও খুশি ও আনন্দিত হওয়ার মাধ্যম। কারণ যে ব্যক্তি কোনো অনুগ্রহ পেয়ে আনন্দিত হয়; তখন যিনি তাকে এই অনুগ্রহ দান করেন তিনি আরও বেশি আনন্দিত হন।
নিচে আমরা এই আয়াতটির অর্থ ব্যাখ্যা করব—
ইবনু আব্বাস, কাতাদা, মুজাহিদ, হাসান বাসরিসহ আরও অনেকেই বলেছেন, 'এই আয়াতে فَضْلُ اللهِ (আল্লাহর মেহেরবানি)-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: ইসলাম এবং رَحْتَتُهُ (তাঁর রহমত)-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: কুরআন।' তাঁরা ফাল বা মেহেরবানির চেয়ে রহমতকে খাছ করেছেন। কারণ তাঁর মেহেরবানি মুসলমানদের জন্য ব্যাপক। আর তাঁর রহমত হলো অনেকের মাঝে মাত্র কয়েকজনকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ফাদল বা মেহেরবানিতে তাদেরকে মুসলিম বানিয়েছেন। আর তাঁর রহমতের কারণে তাদের নিকট কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا كُنْتَ تَرْجُوْ أَنْ يُلْقَى إِلَيْكَ الْكِتَابُ إِلَّا رَحْمَةً مِّنْ رَّبِّكَ
"আপনি আশা করতেন না যে, আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হবে। এটা কেবল আপনার রবের রহমত।"[৭৫০]
আবু সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, 'فَضْلُ اللهِ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: কুরআন। আর رَحْمَةً দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: তিনি আমাদেরকে কুরআনের অধিকারী বানিয়েছেন। '[৭৫১]
আমার অভিমত হলো : এখানে এর দ্বারা উদ্দেশ্য দুইটি বিষয়:
এক. হুবহু আল্লাহর মেহেরবানিই উদ্দেশ্য এবং
দুই. আল্লাহর মেহেরবানি গ্রহণ করার জন্য স্থানকে উপযুক্ত করা উদ্দেশ্য। যেমন: ফসল-উৎপাদনে-উপযোগী-স্থানে বৃষ্টি বর্ষণ করা। এর দ্বারা আল্লাহর ফাদল ও রহমতের যে উদ্দেশ্য তা পূর্ণতা পায়। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
প্রিয়জন ও আকাঙ্ক্ষিত বস্তুর প্রাপ্তিতে অন্তরে স্বাদ অনুভূত হওয়ার অবস্থাকেই ফারাহ্ বা আনন্দ বলে। যেমন প্রিয়জন ও কাঙ্ক্ষিত বস্তুর বিচ্ছেদে সৃষ্টি হয় দুশ্চিন্তা ও কষ্টের অবস্থা। আল্লাহ তাআলা তাঁর দেওয়া মেহেরবানি ও রহমতের কারণে আনন্দিত হওয়ার আদেশ দিয়েছেন নিচের এই আয়াতটি উল্লেখ করার পর পরই-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُمْ مَّوْعِظَةً مِّنْ رَّبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ (3)
“হে লোকসকল, তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নসীহত এসে গেছে। এটি এমন জিনিস যা অন্তরের রোগের নিরাময় এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।”[৭৫২]
আল্লাহ তাআলার মেহেরবানি ও রহমতের চেয়ে অধিক যোগ্য কোনো বস্তু নেই, যা নিয়ে বান্দা আনন্দিত হতে পারে। কারণ তা নসীহত, সমস্ত আত্মিক রোগের ওষুধ, দয়া এবং হিদায়াতকে ধারণ করে। এই কারণে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ দুনিয়াবি যে ধনসম্পদ ও সম্মান অর্জন করে তার চেয়ে বহুগুণ উত্তম হলো তিনি বান্দাদের যে সমস্ত নিয়ামাত দান করেছেন সেগুলো। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো; নসীহত; যা উৎসাহমূলক ও ভীতিমূলক আদেশ-নিষেধ দ্বারা পরিপূর্ণ, আত্মিক রোগের ওষুধ; যা মূর্খতা, জুলুম, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, রাগ ইত্যাদি রোগগুলো দূর করে দেয়। আসলে অন্তরের রোগ শরীরের রোগের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ও যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু মানুষ তাতে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে এর ব্যথা অনুভব করে না। তবে এই দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার সময় মানুষ সেগুলোর ব্যথা ও যন্ত্রণার তীব্রতা উপলব্ধি করবে। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে দান করেছেন হৃদয় প্রশান্তকারী ও নিশ্চয়তা দানকারী হিদায়াত ও রহমত; যা সমস্ত কল্যাণের ধারক এবং সমস্ত অকল্যাণ ও অনিষ্ট দূরকারী।
তাই বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলার দেওয়া এই সমস্ত নিয়ামাতের কারণে আনন্দিত হওয়া উচিত। যে ব্যক্তি এর কারণে আনন্দিত হয়, সে আসলে সর্বশ্রেষ্ঠ বস্তু পাওয়ার কারণেই আনন্দিত হয়। দুনিয়ার প্রাচুর্যতা এর অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এতে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। কেননা এগুলো আরও বিপদ-মুসীবত ডেকে আনে; দুনিয়ার সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, আর অচিরেই তা ধ্বংস হয়ে যাবে; যেমন কেউ ঘুমের মধ্যে অনেক কিছু দেখে এবং জমা করতে থাকে; কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখে কিছুই নেই।
কুরআন মাজীদে الْفَرَحُ বা আনন্দের কথা দুইভাবে এসেছে: শর্তহীনভাবে এবং শর্তযুক্তভাবে।
শর্তহীনভাবে: আল্লাহ তাআলা এর নিন্দা করেছেন। যেমন: لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ "আনন্দের আতিশয্যে গর্ব করো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ গর্বকারীদের ভালোবাসেন না।” [৭৫৩]
শর্তযুক্তভাবে : এটি আবার দুই প্রকার:
এক. দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত আনন্দ; যা ব্যক্তিকে আল্লাহর ফযল, দয়া ও অনুগ্রহ ভুলিয়ে দেয়। এটি নিন্দনীয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُّبْلِسُوْنَ "অতঃপর তারা যখন ওই উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি তাদের সামনে সমৃদ্ধির সকল দরজা খুলে দিলাম। এমনকি তাদেরকে দেওয়া বিষয়াদির জন্য যখন তারা খুব আনন্দিত (গর্বিত) হয়ে পড়ল, তখন আমি তাদেরকে হঠাৎ পাকড়াও করলাম। ফলে তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল।”[৭৫৪]
দুই. যা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের সাথে সম্পৃক্ত। এটি আবার দুই প্রকার :
১. আল্লাহর মেহেরবানি ও রহমতের কারণে আনন্দিত হওয়া। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ “হে নবি, আপনি বলে দিন, এটি আল্লাহর মেহেরবানি এবং তার রহমত। সুতরাং এ জন্য তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। তারা যা কিছু জমা করছে সেসবের চেয়ে এটি অনেক ভালো।"[৭৫৫]
২. আল্লাহ তাআলা যা দান করেন, তার জন্য আনন্দিত হওয়া। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী,
فَرِحِيْنَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ
"আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তাতেই তারা আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত।”[৭৫৬]
সুতরাং আল্লাহ, তাঁর রাসূল, ঈমান, সুন্নাহ, ইলম, কুরআন-এই সব কারণে আনন্দিত হওয়া হলো আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ স্তর। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا مَا أُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ فَمِنْهُم مَّنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيْمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيْمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ )
"আর যখন কোনো সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, 'এর ফলে তোমাদের কার ঈমান বেড়ে গেছে?' আসলে যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং এতে তারা আনন্দিত হয়েছে।”[৭৫৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَالَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَفْرَحُوْنَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ
"এবং আমি আগে যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছিলাম, আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তারা তাতে আনন্দিত হয়।”[৭৫৮]
ইলম, ঈমান এবং সুন্নাহের কারণে আনন্দিত হওয়া-এটাই প্রমাণ করে যে, সেগুলোর প্রতি ব্যক্তির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে এবং সে অন্যান্য বস্তুর ওপর সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। কারণ কোনো বস্তুর প্রতি কারও আনন্দবোধ তখনই হয়, যখন সে সেগুলোকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে এবং সেগুলোর প্রতি আগ্রহ রাখে। তাই যার কোনো বস্তুর প্রতি আগ্রহ নেই, সে বস্তুর প্রাপ্তিতে তার কোনো আনন্দ থাকে না এবং এর অপ্রাপ্তিতে তার কোনো দুঃখবোধও হয় না।
আসলে আনন্দিত হওয়া ভালোবাসা ও আগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ।
(الْإِسْتِبْشَارُ كَ الْفَرَحُ -এ দুটি শব্দের অর্থই আনন্দিত হওয়া।) তবে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে:
الْفَرَحُ হলো : প্রিয় বস্তু অর্জিত হওয়ার পরে আনন্দিত হওয়া আর الإسْتِيْقارُ হলো: প্রিয় বস্তু অর্জিত হওয়ার আগে আনন্দিত হওয়া; যখন অর্জন হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত। এই কারণে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَرِحِينَ بِمَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِمْ مِّنْ خَلْفِهِمْ
"আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তাতেই তারা আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত। আর তাদের পরবর্তী যারা এখনো তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি, তাদের জন্যও তারা আনন্দিত হয়। "[৭৫৯]
الْفَرَحُ-এর মধ্যে পরিপূর্ণতার গুণ রয়েছে। এই কারণে আল্লাহ তাআলা আনন্দিত হওয়ার সর্বোচ্চ ও পূর্ণাঙ্গ রূপটিকে এর সাথে গুণান্বিত করে উল্লেখ করেছেন। যেমন: যে ব্যক্তি মরুভূমিতে নিজের খাদ্য-পানীয়সহ তার বাহন হারিয়ে ফেলে আর তা পাওয়ার আশা থেকে নিরাশ হয়ে যায়, অতঃপর সে যখন তার বাহন পেয়ে যায়; তখন তার খুশির চেয়ে তাওবাকারীর তাওবার কারণে আল্লাহ তাআলা বেশি খুশি হন। [৭৬০]
মূলকথা ফারাহ্ হলো: সর্বোচ্চ স্তরের আত্মিক আনন্দ, প্রফুল্লতা ও খুশি। আসলে আনন্দ ও প্রফুল্লতা হচ্ছে অন্তরের শান্তি আর দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি হচ্ছে অন্তরের শাস্তি। কোনো বস্তুতে আনন্দিত হওয়া তার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার চেয়েও বড়ো বিষয়। কেননা সন্তুষ্টি হলো নিশ্চিন্ততা ও স্থিরতা। আর ফারাহ হলো স্বাদ, আনন্দ ও প্রফুল্লতা। সুতরাং প্রতিটি আনন্দতেই রয়েছে সন্তুষ্টি। পক্ষান্তরে প্রতিটি সন্তুষ্টিতেই আনন্দ নেই। (অনেক সময় আনন্দ না থাকলেও বিভিন্ন কারণে সন্তুষ্ট হতে হয়।)
এই কারণে ফারাহ্ বা আনন্দের বিপরীত হলো হুযন বা দুশ্চিন্তা। আর সন্তুষ্টির বিপরীত হলো রাগ। দুশ্চিন্তা মানুষকে ব্যথা দেয়; কিন্তু রাগে মানুষ ব্যথিত হয় না। তবে যখন প্রতিশোধ নিতে অক্ষম হয়, তখন ব্যথা পায়। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
টিকাঃ
[৭৪৯] সূরা ইউনুস, ১০:৫৮।
[৭৫০] সূরা কাসাস, ২৮: ৮৬।
[৭৫১] আবুল মুযাফফার সামআনি, তাফসীর, ২/৩৯০।
[৭৫২] সূরা ইউনুস, ১০:৫৭।
[৭৫৩] সূরা কাসাস, ২৮: ৭৬।
[৭৫৪] সূরা আনআম, ৬:৪৪।
[৭৫৫] সূরা ইউনুস, ১০:৫৮।
[৭৫৬] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭০।
[৭৫৭] সূরা তাওবা, ৯: ১২৪।
[৭৫৮] সূরা রা'দ, ১৩: ৩৬।
[৭৫৯] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭০।
[৭৬০] মুসলিম, ২৭৪৪।
📄 অধ্যায় : সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততা (اَلْقَبْضُ وَالْبَسْطُ)
সংকীর্ণতা (الْقَبْضُ) দুই প্রকার: অবস্থার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা এবং মূল বস্তুতে সংকীর্ণতা।
অবস্থার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা হলো এমন বিষয়, যা অন্তরে করাঘাত করে অন্তরকে খুশি ও আনন্দ থেকে বিরত রাখে। এটি আবার দুই প্রকার।
১. যার কারণ জানা যায়। যেমন: গুনাহ, শিথিলতা, আল্লাহর থেকে দূরত্ব বেড়ে যাওয়া, রূঢ়তা কিংবা এ ধরনের কোনো বিষয়ের কথা স্মরণ হওয়া।
২. যার কারণ জানা যায় না। বরং সংকীর্ণতা ও অস্থিরতা অন্তরে এসে ভিড় জমায়; যা থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তির সাধ্যের বাইরে। এ ধরনের সংকীর্ণতার প্রতিই সূফিয়ায়ে কেরাম ইঙ্গিত করে থাকেন। এর বিপরীত হলো الْبَسْط বা প্রশস্ততা। তাদের নিকট সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততা অন্তরের এমন দুটি অবস্থা, যা থেকে অন্তর কখনো নিষ্কৃতি পায় না।
আবুল কাসিম জুনাইদ বাগদাদি রহ. বলেছেন, 'সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততার অর্থের মধ্যে ভয় ও আশার অর্থও রয়েছে। আশা আনুগত্যের দিকে নিয়ে যায় আর ভয় গুনাহ থেকে বিরত রাখে।'
সূফিয়ায়ে কেরামের সবাই সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততা সম্পর্কে এই পদ্ধতিতে কথা বলেছেন। এভাবে তারা এগুলোর অনেক প্রকারের কথা উল্লেখ করেছেন— শিষ্টাচারে সংকীর্ণতা, শিক্ষা দেওয়ার জন্য সংকীর্ণতা, একত্রিত করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা এবং পৃথক করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা। এই কারণে কারও মধ্যে যখন এই সংকীর্ণতাগুলো স্থান করে নেয়, তখন সেগুলো তাকে খাবার, পানীয়, কথাবার্তা, তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন এবং নিজ পরিবার-পরিজনদের সাথে ও অন্যান্য মানুষের সাথে প্রফুল্লতা নিয়ে মেলামেশা করা থেকে বিরত রাখে।
শিষ্টাচারে সংকীর্ণতা : এটি হয় অমনোযোগিতা, খারাপ চিন্তা কিংবা নিকৃষ্ট ভাবনার শাস্তিস্বরূপ।
শিক্ষা দেওয়ার জন্য সংকীর্ণতা : এটি ভবিষ্যতে বিরাট প্রশস্ততা আসার জন্য প্রস্তুতিস্বরূপ। সুতরাং প্রশস্ততার পূর্বে সংকীর্ণতায় পতিত হওয়া প্রশস্ততা আসার নির্দেশনা এবং ভূমিকার মতো। যেমন ওহি নাযিল হওয়ার পূর্বে এবং ওহি ধারণের জন্য প্রস্তুতি-গ্রহণ-স্বরূপ নবি -এর দুর্বলতা ও সংকীর্ণতা অনুভব করা। এমনিভাবে সচ্ছলতার পূর্বে দরিদ্রতা, নিরাপত্তার পূর্বে বিপদাপদ, নিশ্চিন্ততার পূর্বে কঠিন ভয় ইত্যাদি। আসলে আল্লাহ তাআলার রীতি হলো, উপকারী ও প্রিয় কিছু অর্জন করতে হলে এর বিপরীত (অর্থাৎ দুঃখ-কষ্টের) দরজা দিয়েই সেগুলোর নিকট প্রবেশ করতে হয়।
একত্রিত করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা : এটি হলো দুনিয়া ও দুনিয়াসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি থেকে অন্তর সংকীর্ণ হয়ে কেবল আল্লাহ তাআলার ওপরই একত্রিত হওয়া। ফলে অন্তরে অনর্থক কোনো বিষয় আর অবশিষ্ট থাকে না এবং অন্তর যার ওপর একত্রিত হয়, তাকে ছাড়া আর অন্য কিছুর দিকে যায় না। এই পরিস্থিতিতে কেউ যদি সেই ব্যক্তির সাথে সখ্যতা বা আলোচনা করতে চায়, যা তাকে সেখান থেকে বের করে দেবে; তা হলে সে যেন ওই ব্যক্তির প্রতি অবিচার করল।
পৃথক করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা : এটি হলো আল্লাহ সম্পর্কে ব্যক্তির অন্তরে সংকীর্ণতার সৃষ্টি হওয়া এবং অন্তর বিভিন্ন দিকে বিক্ষিপ্ত হওয়া। এর সর্বনিম্ন শাস্তি হলো এই সংকীর্ণতায় ব্যক্তি মৃত্যু কামনা করে।
প্রশস্ততা (اَلْبَسْط) হলো : বান্দার বাহ্যিক কাজকর্ম ও অবস্থা ইলমের দাবি অনুসারে পরিচালিত হবে। আর তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা আল্লাহর সান্নিধ্য, ভালোবাসা ও মুরাকাবা বা গভীর ধ্যানে নিমগ্ন থাকবে। ফলে তার ভেতর ও বাহির সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে। তার বাহ্যিক অবস্থা ইলমের দাবি অনুযায়ী আমল করার দরুন সুবাসিত হবে আর অভ্যন্তরীণ অবস্থা মহাব্বত, আশা, ভয়, মুরাকাবা, ভরসা, সান্নিধ্য ইত্যাদি দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে। সুতরাং বাহ্যিক আমল তার জন্য হবে সৌন্দর্যের আবরণ আর মূল সৌন্দর্য থাকবে ভেতরগত অবস্থায়। আল্লাহ তাআলা কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ-এই দুই সৌন্দর্যকে একসাথে উল্লেখ করেছেন:
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيْشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ
"হে বানী আদম, আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবর্তীণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে রাখে এবং অবর্তীণ করেছি সাজসজ্জার বস্ত্র। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম।” [৭৯২]
দয়াময় আল্লাহ তাআলা যে ময়দানকে প্রশস্ততা দান করেছেন তা হলো (অন্তরের প্রশস্ততা)-যা তিনি তাঁর আম্বিয়ায়ে কেরাম ও আউলিয়ায়ে কেরামের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তা হলো রাসূলুল্লাহ যে আচরণ তাঁর পরিবার-পরিজন, সাথিসঙ্গী, কাছের ও দূরের সমস্ত মানুষের সাথে করেছেন; যেমন: অন্তরের প্রশস্ততা, সবসময় হাশিখুশি থাকা, উত্তম ব্যবহার, সাক্ষাৎ হলে সালাম দেওয়া, কেউ থামতে বললে তার জন্য থামা, কখনো কখনো ছোটোবড়ো সবার সাথে সত্য বিষয়ে সামান্য রসিকতা করা, দাওয়াত গ্রহণ করা, সবার সাথেই নম্র ব্যবহার করা ইত্যাদি। এর ফলে প্রত্যেক সাহাবিই মনে করতেন যে, নবিজি তাঁকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। এই অঙ্গনে আপনি ওয়াজিব, মুস্তাহাব আর মুবাহ ছাড়া (খারাপ) কিছু পাবেন না। মুবাহ বিষয়টিও আবার ওয়াজিব ও মুস্তাহাবকে শক্তিশালী করে।
সৃষ্টিজগতের সাথে আম্বিয়ায়ে কেরাম ও আউলিয়ায়ে কেরামের উদার ও নম্র ব্যবহার করাকে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য রহমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
"আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য নম্র ও কোমল হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রুক্ষ স্বভাবের ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তা হলে তারা সবাই আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত!”[৭৯৩]
আল্লাহ তাআলা নবি-রাসূলদের নম্র ও কোমল বানিয়েছেন, যাতে আল্লাহর পথে যারা চলতে চায় তারা তাদের অনুসরণ করতে পারে, পেরেশান ব্যক্তি তাদের মাধ্যমে নিজের পেরেশানি দূর করতে পারে, অসুস্থ ব্যক্তি তাদের দ্বারা সুস্থতা লাভ করতে পারে এবং তাদের জ্ঞান, উপদেশ, নসীহত ও হিদায়াতের নূরের মাধ্যমে নফস ও প্রবৃত্তির অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। সুতরাং তারা যখন নীরব থাকে, আল্লাহর-পথের-পথিকরা তাদের অনুসরণ করে আর যখন কথা বলে, তখন তাদের কথামালা দ্বারা উপকৃত হয়। কেননা তাদের নড়াচড়া, স্থিরতা ও নীরবতা সবই আল্লাহর হুকুমে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় হয়ে থাকে; ফলে সত্যবাদীদের অন্তর তাদের দিকে আকৃষ্ট হয়। যে আলো দিয়ে তারা মানুষদেরকে আলোকিত করেন, তা হলো-ইলম ও মা'রিফাত বা আল্লাহর পরিচয়মূলক জ্ঞানের আলো।
আলিম তিন প্রকার:
এক. এমন আলিম যিনি নিজেও তার ইলমের আলোয় আলোকিত হন এবং লোকজনও তার দ্বারা উপকৃত হয়। এই সমস্ত আলিমগণই রাসূলদের খলীফা এবং ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া বা আম্বিয়ায়ে কেরামের ওয়ারিশ।
দুই. এমন আলিম যে তার ইলম দ্বারা কেবল নিজেই উপকৃত হয়, অন্যরা এর থেকে বঞ্চিত থাকে। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা যদি (আমলে) অবহেলা না করেন, তা হলে তাদের নিজেদের মাঝেই তাদের ইলমের উপকারিতা সীমাবদ্ধ থাকে। এই শ্রেণির আলিম প্রথম শ্রেণির আলিমের চেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন।
তিন. এমন আলিম যার ইলম তার নিজেরও উপকার করে না এবং মানুষজনও তার দ্বারা উপকৃত হয় না। এই ব্যক্তির ইলম তার জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে। মানুষের সাথে এই শ্রেণির আলিমদের মেলামেশা ভয়ংকর ফিতনা। আর প্রথম শ্রেণির আলিমগণ হলেন মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত।
টিকাঃ
[৭৯২] সূরা আ'রাফ, ৭: ২৬।
[৭৯৩] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৫৯।
📄 তাওবা : সালিকীনদের সর্বশেষ মানযিল
সালিক বা আল্লাহর-পথের-পথিকদের সর্বশেষ মানযিল হলো—তাওবা বা আল্লাহর দিকে ফেরা। যা তাদের মানযিলসমূহের সূচনা ছিল।
এটা শুনে আপনার কান হয়তো চূড়ান্তভাবে তা অপছন্দ করবে, আর আপনি বলবেন, 'এটা হলো সেই ব্যক্তির কথা, তাসাওউফের পথঘাট সম্পর্কে যার জানা নেই এবং যে এর মানযিলসমূহে অবতরণও করেনি।' আল্লাহর শপথ! অনেক মানুষ আপনার সাথে একমত পোষণ করবে এবং বলবে, 'আমরা কোথায়? আমরা যাচ্ছি কোথায়? আমরা তো অনেক আগেই তাওবার মানযিল অতিক্রম করে এসেছি। আমাদের মাঝে আর এর মাঝে রয়েছে অসংখ্য মাকাম! আমরা কি তা হলে এত সব মাকাম ছেড়ে আবার সেখানে ফিরে যাব, আর একেই সালিকীনদের সর্বশেষ মানযিল বলে সাব্যস্ত করব?'
তা হলে এখন শুনুন এবং স্মরণ রাখুন। দ্রুতই অস্বীকার করতে ও প্রতিহত করতে উদ্যত হবেন না। নিজের পরিচয় পাওয়ার জন্য, আপনার প্রতি আল্লাহ তাআলার হক ও অনুগ্রহ এবং তাঁর প্রতি আপনার করণীয় কী সে সম্পর্কে উপলব্ধি করতে নিজের মস্তিষ্ককে উন্মুক্ত করুন। অতঃপর আপনার আমল, অবস্থা ও যে সমস্ত মানযিল আপনি অতিক্রম করেছেন—খাঁটি দিলে সবকিছুকে আল্লাহ তাআলার বড়োত্ব ও মহত্ত্বের বিশালতার দিকে খেয়াল রেখে এবং তিনি যার উপযোগী ও উপযুক্ত সেদিকে মনোযোগী হয়ে তাঁর নিকট তা পেশ করুন।
যদি দেখেন আপনার যে আমল ও অবস্থা, তা আপনার ওপর আল্লাহর যে হক ও অনুগ্রহ রয়েছে তার জন্য যথেষ্ট এবং আপনার আমল সেগুলোর সমান; তা হলে তাওবার কোনো প্রয়োজন নেই। তাওবার দিকে ফিরে আসা, তখন আপনার জন্য হবে উঁচু মর্যাদা থেকে নিচু স্তরের দিকে আসা। উচ্চ মর্তবা থেকে নিম্ন মর্তবায় নেমে যাওয়া এবং শেষ থেকে শুরুর দিকে প্রত্যাবর্তন। এটা দূরে নয় যে, অনেকেই এমন দাবি করে থাকে। তারা নিজেদের আমল, অবস্থা, মা'রিফাত ও ইলমের কারণে ধোঁকায় পড়ে রয়েছে!
আর যদি দেখেন সত্যবাদিতা, একনিষ্ঠতা, অগ্রসরমানতা, তাওয়াক্কুল, যুহদ, ইবাদাত-বন্দেগিসহ আপনার সমস্ত আমল, আল্লাহ তাআলার যে হক আপনার ওপর রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র হকটিরও সমপরিমাণ নয়। আপনার প্রতি আল্লাহর যে অনুগ্রহ রয়েছে, তার থেকে একটি অনুগ্রহেরও সমান নয় আর আল্লাহ তাআলা যে বড়োত্ব ও মহত্ত্বের অধিকারী, সমস্ত সৃষ্টিজগৎ যা ধারণ করে তার চেয়েও তা বড়ো, মহৎ ও সুউচ্চ।
তা হলে এখন জেনে রাখুন, প্রতিটি আরিফ বা আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির শেষ মানযিল এবং আল্লাহর পথের প্রতিটি পথিকের চূড়ান্ত ঠিকানা হলো তাওবা। যেভাবে এটি ছিল সূচনা, তেমনিভাবে তা শেষ। শেষ পর্যায়ে এসে তাওবার প্রয়োজন শুরুর পর্যায়ের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রকট হয়। বরং পথের শেষে এসে তাওবা জরুরি পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
এখন শুনুন এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে জীবনের শেষ সময়ে কী বলে সম্বোধন করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ -ও তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে কত কঠোরভাবে বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফারের প্রতি মনোযোগী ছিলেন (তাওবা লক্ষ করুন)। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوْبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوْفٌ رَّحِيمٌ )
"নিশ্চয় আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন নবি, মুহাজির ও আনসারদের, যারা সংকট-মুহূর্তে নবির সঙ্গে ছিল, তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হওয়ার পরেও তিনি তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান, পরম দয়ালু।"[৮০৮]
এই আয়াতটি আল্লাহ তাআলা নাযিল করেছেন তাবুক যুদ্ধের পরে। আর এটিই ছিল নবি -এর সশরীরে-অংশ নেওয়া-সর্বশেষ যুদ্ধ। আল্লাহ তাআলা তাদের এই জিহাদ ও কঠিন আমলের প্রতিদানস্বরূপ তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন ا ( عَلَيْهِمْ)।
আল্লাহ তাআলা নবি -এর শেষ জীবনে নাযিল করেছেন- إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا )
"যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি তাওবা গ্রহণকারী। "[৮০৯]
'সহীহ বুখারি'-তে এসেছে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়া পর নবি যে সালাতই আদায় করতেন তার রুকূ-সাজদাতে এই দুআটি পাঠ করতেন- سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
"হে আল্লাহ, হে আমাদের রব, আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।”[৮১০] এটি ছিল নবি -এর জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে।
এই কারণে এ সূরা থেকে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যারা আলিম ছিলেন-যেমন উমর ইবনুল খাত্তাব, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস -তারা বুঝেছেন, এটি রাসূলুল্লাহ -এর জীবনসীমা নির্দেশ করছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে তা জানিয়ে দিয়েছেন। নবিজি সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও জীবনের শেষ সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ইস্তিগফার করার নির্দেশ দিয়েছেন।
রবের সান্নিধ্যে যাবার পূর্ব মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ -এর মুখ নিঃসৃত সর্বশেষ যে বাণী শোনা গিয়েছে, তা হলো-
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَأَلْحِقْنِي بِالرَّفِيقِ الْأَعْلَى
“হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমার প্রতি রহম করো আর আমাকে মহান বন্ধুর সঙ্গে মিলিয়ে দাও।”[৮১১]
নবি প্রতিটি নেক আমল ইস্তিগফার আদায়ের মাধ্যমে শেষ করতেন। যেমন: সাওম, সালাত, হাজ্জ, জিহাদ। কেননা তিনি যখন জিহাদ কিংবা হাজ্জ থেকে ফিরতেন এবং মদীনায় প্রবেশ করতেন, তখন বলতেন,
آيِبُونَ تَائِبُوْنَ عَابِدُونَ سَاجِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ
“(আমরা) প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী, ইবাদাতগুজার, আমরা আমাদের প্রতিপালককে সাজদাকারী এবং তাঁর প্রশংসাকারী।"[৮১২]
শারীআতে যেকোনো মজলিসের শেষে ইস্তিগফার করার হুকুম দেওয়া হয়েছে; যদিও কল্যাণ ও নেককাজের মজলিস হয়।[৮১৩]
এমনিভাবে এরও হুকুম দেওয়া হয়েছে যে, বান্দা তার দিন শুরু করবে ইস্তিগফারের মাধ্যমে। দিনের শুরুতে সে বলবে:
أَسْتَغْفِرُ اللهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيَّ الْقَيُّوْمَ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ
"আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, যিনি চিরঞ্জীব ও অবিনশ্বর সত্তা এবং আমি তাঁর নিকট তাওবা করছি।” [৮১৪]
মানুষকে ঘুমানোর আগে এবং সকাল-সন্ধ্যা সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার পাঠ করারও হুকুম দেওয়া হয়েছে। [৮১৫]
যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সম্পর্কে এবং তাঁর নামসমূহ, গুণাবলি ও হক সম্পর্কে অবগত, সে জানে যে, সর্বশেষ পর্যায়ে বান্দা তাওবার দিকেই সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী থাকে।
মূলকথা হলো সালিকীন বা আল্লাহ-অভিমুখীদের পথের সমাপ্তিতে রয়েছে দাসত্বকে পরিপূর্ণ করা। আর এটি কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সমস্ত সৃষ্টিজগতের মধ্যে মাত্র দুজনের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তারা এই গুণের অধিকারী ছিলেন। একজন হলেন ইবরাহীম ; যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি দাসত্বের হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করেছেন। আরেকজন হলেন বানী আদমদের সর্দার মুহাম্মাদ । কারণ তিনি দাসত্বের স্তর পূর্ণাঙ্গরূপে আদায় করেছেন। পরিণতিতে তিনি সমস্ত সৃষ্টিজগতের চেয়ে অগ্রগামী হয়েছেন। তিনি ওসীলা ও সুপারিশের অধিকারী হয়েছেন; যা থেকে সমস্ত রাসূলও পিছিয়ে থাকবেন। (কিয়ামাতের দিন সমস্ত উম্মাহ যখন নবি-রাসূলদের নিকট থেকে নিরাশ হয়ে নবি -এর নিকট সুপারিশের জন্য যাবেন,) তখন তিনি বলবেন, أَنَا لَهَا أَنا لَهَا “আমিই এর উপযুক্ত, আমিই এর উপযুক্ত।” [৮১৬] এ কারণেই অর্থাৎ নবি -এর পরিপূর্ণ বন্দেগি ও দাসত্বের কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁকে দাসত্বের উচ্চ মাকাম ও সম্মানের সাথে উল্লেখ করেছেন। যেমন বলেছেন, سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا
"পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন।”[৮১৭]
এ কারণেই সবাই যখন সুপারিশের জন্য ঈসা-এর কাছে যাবে, তখন তিনি বলবেন,
اذْهَبُوا إِلَى مُحَمَّدٍ عَبْدٍ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ
"আপনারা মুহাম্মাদের কাছে যান; তিনি এমন বান্দা, আল্লাহ তাআলা যার আগে-পরের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।”[৮১৮]
রাসূলুল্লাহ এই সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন আল্লাহর দাসত্ব পরিপূর্ণভাবে আদায় করার কারণে এবং আল্লাহর পরিপূর্ণ ক্ষমা প্রাপ্তির দরুন।
সুতরাং বোঝা গেল, সমস্ত মানযিল ও মাকামের শেষ হলো তাওবা ও খাঁটি গোলামি। নিজের সত্তা ও অস্তিত্বকে জমিয়ে রাখা এবং নিজের সম্পৃক্ততাকে বিলুপ্ত করে দিয়ে ফানা হয়ে যাওয়া সমস্ত মানযিল ও মাকামের শেষ নয়। (যেমনটি ধারণা করে থাকে কিছু সৃফিসাধক।)
যদি প্রশ্ন করেন: এই জমিয়ে রাখা তো খাঁটি তাওবা ও পরিপূর্ণ দাসত্বের মাধ্যমেই অর্জিত হয়?
উত্তর: বিষয়টি আসলে এমন নয়। বরং এর মাধ্যমে যে বিষয়টি অর্জিত হয়, তা হলো রাসূল ও তাদের খলীফাদের জমিয়ে রাখা। আর সেটি হলো: মহাব্বত, ইনাবাত, তাওয়াক্কুল, ভয়, আশা ও মুরাকাবার মাধ্যমে নিজের হিম্মত ও মনোবলকে আল্লাহর ওপর জমিয়ে রাখা। এমনিভাবে জিহাদ ও দাওয়াতের মাধ্যমে সৃষ্টিজগতের মাঝে আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করতে হিম্মত ও মনোবলকে জমিয়ে রাখা।
এখানে দুইটি বিষয়: ১. অন্তরকে একমাত্র আল্লাহ তাআলার ওপরেই জমিয়ে রাখা এবং ২. নিজের ইচ্ছা ও মনোবল শুধু আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের ওপরেই সীমাবদ্ধ রাখা।
যদি প্রশ্ন করেন: এই দুই প্রকার জমানোর ব্যাপারে কি কোনো দলীল-প্রমাণ রয়েছে?
আমি বলব : পুরা কুরআনেই এর দলীল রয়েছে। সূরা ফাতিহার এই আয়াত থেকেই তা গ্রহণ করুন-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
"আমরা কেবল তোমারই ইবাদাত করি আর তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।" [৮১৯]
إِيَّكَ )একমাত্র) এই শব্দটি নিয়ে ভাবুন। এখানে ইবাদাত ও সাহায্য প্রার্থনা করাকে কেবল আল্লাহ তাআলার পবিত্র সত্তার সাথেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। نَعْبُدُ "আমরা তোমার ইবাদাত করি” এই শব্দটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন। যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয়কালকেই বোঝায় এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের ইবাদাতকেই অন্তর্ভুক্ত করে। ইবাদাতের সমস্ত প্রকারই এর মধ্যে শামিল; বর্তমান-ভবিষ্যৎ, কথা-কর্ম, প্রকাশ্য-গোপনসহ সমস্ত ইবাদাত। এমনিভাবে اَلْإِسْتِعَانَةُ বা সাহায্য প্রার্থনা করার বিষয়টিও পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর নিকটেই, অন্য কারও নিকট নয়। এই কারণে বলা যায় (সালিকীনদের) সমস্ত পথই এই দুই শব্দের মধ্যে নিহিত রয়েছে। এটিই সুফিয়ায়ে কেরামের এই বাক্যের মর্ম - الطَّرِيقُ فِي : إِيَّاكَ أُرِيدُ بِمَا تُرِيدُ )প্রকৃত পথ নিহিত রয়েছে এর মধ্যে: আপনি যা ইচ্ছা করেন, আমারও তা-ই ইচ্ছা।) উদ্দেশ্য এক হওয়া এবং তিনি যা পছন্দ করেন ও ভালোবাসেন নিজের ইচ্ছাকে তাতেই নিবদ্ধ রাখা। নবি-রাসূলগণ শুরু থেকে শেষ সবাই এর প্রতিই আহ্বান করেছেন, আমলকারীরা এটিকেই আঁকড়ে ধরেছেন এবং আগ্রহীরা এ পথেই অগ্রসর হয়েছেন। সমস্ত মানযিল ও মাকাম শুরু থেকে শেষ এরই আওতাধীন এবং এরই ফল।
সুতরাং দাসত্ব পূর্ণ বিনয়ের সাথে পূর্ণ ভালোবাসাকে এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি মোতাবেক তাঁর আদেশসমূহকে পরিপূর্ণভাবে মেনে নেওয়াকে আবশ্যক করে। এটিই হলো শেষ গন্তব্য; এর ওপরে আর কোনো গন্তব্য নেই। দাসত্বে যথাযথভাবে পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করার যখন কোনো পথ নেই, তখন তাওবাই হলো শেষ ঠিকানা ও আশ্রয়স্থল। শুরুতে তাওবার যেমন প্রয়োজন, শেষে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন। যেমনটি আপনি আগেই জেনে এসেছেন। যদি তাওবার বিষয়টি না থাকত, তা হলে ব্যক্তির মাঝে ও রব্বুল আলামীনের নিকট পৌঁছার মাঝে নিরাশার সৃষ্টি হতো। এ রকমটা হয় বান্দা যখন তার ওপর যে দায়িত্ব ও হক রয়েছে, তা যথাযথভাবে পালন করে। সুতরাং ওই ব্যক্তির অবস্থা কেমন হবে যে গাফলত, অলসতা আর অমনোযোগিতায় নিমগ্ন, যে অধিকাংশ সময়ই নিজের হককে রবের হকের ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে; যা থেকে সে কখনো মুক্তি পায় না? বিশেষ করে আল্লাহর-পথের-পথিক; যে ফানা ও জমার পথে অগ্রসর হয়? কারণ আল্লাহ তাআলা তার কাছ থেকে দাসত্ব ও গোলামি তলব করে, আর তার নফস জমা ও ফানা তলব করে! যদি নিজের নফসের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয় এবং সঠিকভাবে এর হিসাব গ্রহণ করা হয়, তা হলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, স্বার্থচিন্তা ও আনন্দ অর্জনে সে মত্ত।
হ্যাঁ, প্রত্যেকেই তাতে লিপ্ত। তবে পার্থক্য হলো কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পছন্দনীয় বস্তুর মাঝে তা খোঁজে আর কেউ নিজের নফসের পছন্দের মাঝে খোঁজে। (সুতরাং স্পষ্ট হলো যে, তাওবা সবার জন্য জরুরি এবং তাওবাই হলো আল্লাহর পথের পথিকের শুরু ও শেষ মানযিল।) আল্লাহ তাআলাই তাওফীক দাতা।
টিকাঃ
[৮০৮] সূরা তাওবা, ৯: ১১৭।
[৮০৯] সূরা নাসর, ১১০: ১-৩।
[৮১০] বুখারি, ৭৯৪; মুসলিম, ৪৮৪।
[৮১১] বুখারি, ৫৬৭৪; মুসলিম, ২৪৪৪।
[৮১২] বুখারি, ১৭৯৭; মুসলিম, ১৩৪৪।
[৮১৩] আবূ দাউদ, ৪৮৫৯; দারিমি, ২৬৬১।
[৮১৪] আবূ দাউদ, ১৫১৭; মুনযিরি, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ১৬২২।
[৮১৫] বুখারি, ৬৩০৬। সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার হলো: اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَى وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ “হে আল্লাহ, তুমি আমার রব। তুমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই বান্দা। আমি তোমার সঙ্গে কৃত প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের ওপর অবিচল থাকার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। আমি যা কিছু করেছি তার অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। তুমি আমাকে যে নিয়ামাত দান করেছ তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। কারণ তুমি ছাড়া গুনাহের ক্ষমাকারী আর কেউ নেই।"
[৮১৬] বিস্তারিত দেখুন-ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৯/৪৯১।
[৮১৭] সূরা ইসরা, ১৭: ১।
[৮১৮] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১/২৯৪; বুখারি, ৩৩৪০; মুসলিম, ১৯৬।
[৮১৯] সূরা ফাতিহা, ১:৫।