📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : আগ্রহ (اَلشَّوْقُ)

📄 মানযিল : আগ্রহ (اَلشَّوْقُ)


আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
مَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ اللَّهِ فَإِنَّ أَجَلَ اللَّهِ لَآتٍ "আল্লাহর সাথে যে সাক্ষাতের আশা করে (তার জানা উচিত), আল্লাহর নির্ধারিত সময় আসবেই।"[৭৩৪]
বলা হয়েছে: এই আয়াতটি তাদের জন্য সুখবর ও সান্ত্বনা, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ পেতে আগ্রহী। অর্থাৎ আমি জানি যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে, তারা আমার প্রতি প্রবল আগ্রহী। তবে আমি এর জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে রেখেছি; অচিরেই তার আগমন ঘটবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। যা কিছুর আগমন ঘটবে, তা তো নিকটবর্তীই।
নবি তাঁর দুআয় বলতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ لَذَةَ النَّظْرِ إِلَى وَجْهِكَ، وَالشَّوْقَ إِلَى لِقَائِكَ “হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট আপনার চেহারার দিকে তাকানোর স্বাদ এবং আপনার সাক্ষাতের আগ্রহ প্রার্থনা করছি।”[৭৩৫]
আগ্রহ (الشوق) হলো: মহব্বতের প্রভাব ও বহিঃপ্রকাশ। কারণ প্রিয় মানুষের প্রতি অন্তর সবসময়ই ধাবিত হয়।
কেউ কেউ বলেছেন, 'আগ্রহ হলো: অন্তরকে প্রিয় মানুষের সাক্ষাতের জন্য উদ্বুদ্ধ করে তোলা।'
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, 'আমি সারি সাকাতি -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'শাওক (আগ্রহ) হলো আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি মানযিল। কেউ যখন আগ্রহের মানযিলে পৌঁছে যায়, তখন সে তার আগ্রহের বিষয় ব্যতীত সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে চলে। ১০৯। এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, জান্নাতের অধিবাসীরা আল্লাহ তাআলার দর্শন ও নৈকট্য লাভ করা সত্ত্বেও প্রতি মুহূর্তে তাঁর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
আগ্রহের দুটি স্তর রয়েছে: ১. ইবাদাতকারীর জান্নাতের আগ্রহ এবং ২. আল্লাহ তাআলার প্রতি আগ্রহ। তবে এটি জান্নাতের প্রতি আগ্রহ থাকার বিপরীত নয়। কেননা জান্নাতের সর্বোত্তম নিয়ামাত হলো আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করা, তাঁর দর্শন পাওয়া, তাঁর কথা শ্রবণ করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করা।

টিকাঃ
[৭৩৪] সূরা আনকাবুত, ২৯ : ৫।
[৭৩৫] নাসাঈ, ১৩০৫।
[৭৩৬] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৪৯৯।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : স্বাদ আস্বাদন করা (اَلذَّوْقُ)

📄 মানযিল : স্বাদ আস্বাদন করা (اَلذَّوْقُ)


স্বাদ (الذَّوْقُ) : এটি হলো পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় বস্তুসমূহকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করা। কুরআনের ভাষা ও আরবদের ভাষা অনুযায়ী স্বাদ (الذَّوْقُ) শুধু মুখ দ্বারা অনুভব করার সাথেই সীমাবদ্ধ নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُوْنَ
“অতএব এখন তোমরা তোমাদের কুফরির বিনিময়স্বরূপ আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো।”[৭৩৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ
“ফলে আল্লাহ ক্ষুধা ও ভীতির পোশাকে তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করালেন।”[৭৩৮]
চিন্তা করুন—আল্লাহ তাআলা কীভাবে স্বাদ আস্বাদন করা ও পোশাকের বিষয়টি একসাথে উল্লেখ করেছেন; এটি বোঝানোর জন্য যে, তিনি তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করিয়েছেন দ্রুত ও পরিপূর্ণভাবে। সুতরাং আয়াতটি স্বাদ আস্বাদনের কথা উল্লেখ করে এই সংবাদ দিচ্ছে যে, শাস্তিটি কোনো রকম বিলম্ব ছাড়া দ্রুতই দেওয়া হয়েছিল। কেননা মানুষ কখনো কখনো দেরিতেও ভয় পায়, তাৎক্ষণিকভাবে ভয় পায় না। (স্বাদ যেমন খাওয়ার সাথে সাথেই অনুভূত হয়, তেমনি তাদেরকে ভীতির শাস্তি দ্রুতই দেওয়া হয়েছিল।) আর পোশাকের কথা উল্লেখ করে এই সংবাদ দিচ্ছে যে, শাস্তিটি ছিল পরিপূর্ণভাবে বেষ্টনকারী। যেমন পোশাক শরীরকে সম্পূর্ণরূপে বেষ্টন করে নেয়।
'সহীহ মুসলিম'-এ এসেছে, নবি বলেছেন,
ذَاقَ طَعْمَ الإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا
"সেই ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে, যে রব হিসেবে আল্লাহকে, দ্বীন হিসেবে ইসলামকে এবং রাসূল হিসেবে মুহাম্মাদ-কে পেয়ে সন্তুষ্ট।”[৭৩৯]
নবি জানিয়েছেন যে, ঈমানেরও স্বাদ রয়েছে আর অন্তর তা আস্বাদন করে। যেমন মুখ খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ আস্বাদন করে।
নবি ঈমান ও ইহসানের হাকীকত উপলব্ধি করাকে এবং অন্তরে তা অর্জিত হওয়াকে কখনো স্বাদের মাধ্যমে, কখনো খাবার-পানীয়ের মাধ্যমে আবার কখনো মিষ্টতা অনুভূত হবে বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন ওপরে বর্ণিত হাদীসে আমরা দেখেছি। এমনিভাবে তিনি বলেছেন,
ثَلَاثَ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الإِيْمَانِ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ
“তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করতে পারে- ১. তার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য সব কিছু থেকে প্রিয় হওয়া, ২. কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা এবং ৩. কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপছন্দ।
করা।"[৭৪০]
রাসূলুল্লাহ সাহাবায়ে কেরাম-কে ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করতে যখন নিষেধ করেছিলেন, তখন তারা জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আপনি তো ধারাবাহিকভাবেই পালন করেন?' নবি তখন জবাব দিয়েছিলেন,
إِنِّي لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ إِنِّي أُطْعَمُ وَأُسْقَى
"আমার অবস্থা তোমাদের মতো নয়, আমাকে আহার করানো হয় এবং পানও করানো হয়।”
অপর এক বর্ণনায় এসেছে,
إِنِّي أَبِيْتُ يُطْعِمُنِي رَبِّي وَيَسْقِينِي
"আমি এমন অবস্থায় রাত্রিযাপন করি যে, আমার রব আমাকে খাওয়ান এবং পান করান।”[৭৪১]
যারা ধারণা করে যে, এই খাবার খাওয়ানো এবং পান করানো বস্তুগত খাদ্য ও পানীয়; যা মুখ দিয়ে খাওয়া হয়, তাদের বোধশক্তিতে মোটা পর্দা পড়েছে। তারা যেমন ধারণা করে বিষয়টি যদি এমনই হতো, তা হলে তো নবি সাওম পালনকারীই সাব্যস্ত হবেন না; ধারাবাহিকভাবে তা পালন করা তো দূরের কথা। যখন নবি সাহাবিদের জবাব দিয়েছেন যে, "আমি তোমাদের মতো নই।” তখন তাঁর মাঝে- ও তাদের মাঝে পার্থক্যটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁকে পানাহার করানো হয়। যদি নবি তাঁর পবিত্র মুখ দিয়েই পানাহার করতেন, তা হলে তিনি সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে বলতেন, 'আমিও ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করি না।' সুতরাং যখন 'আপনি তো ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করেন?'- তাদের এই প্রশ্নকে তিনি সমর্থন করেছেন, তখন বোঝা যায় যে, নবি-ও খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকতেন। তাঁর জন্য আল্লাহর-দেওয়া আত্মিক-পানাহারই যথেষ্ট ছিল; যা তাঁকে বাহ্যিক পানাহার থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছিল।
এই স্বাদ গ্রহণের বিষয়টির মাধ্যমে রোম সম্রাট হিরাকূল নুবুওয়াতের বিশুদ্ধতার ওপরে প্রমাণ পেশ করেছিলেন; তিনি আবূ সুফইয়ানকে বলেছিলেন, 'তাদের কেউ কি তাঁর দ্বীনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে তা থেকে ফিরে যায়?' আবূ সুফইয়ান উত্তর দিয়েছিলেন, 'না'। তখন তিনি বলেছিলেন, 'ঈমান এমনই; যখন তার মিষ্টতা ও স্বাদ অন্তরের সাথে মিশে যায়। (তখন আর কেউ তা থেকে ফিরে যায় না।) '[৭৪২]
রোম সম্রাট হিরাকূল নবি ﷺ-এর অনুসারীদের জন্য ঈমানের যে স্বাদ অনুভূত হয়, তার দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন যে, তা হলো নুবুওয়াত ও রিসালাতের দাবি; বাদশাহি ও রাজত্ব লাভের দাবি নয়। আসলে ঈমানের স্বাদ যখন কোনো অন্তরের সাথে মিশে যায়, তখন সে অন্তর আর কখনো ঈমান থেকে বিমুখ হয় না।
মূলকথা হলো: অন্তর ঈমান ও ইহসানের মিষ্টতা অনুভব করে। ঠিক যেমন মুখ বস্তুগত খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ অনুভব করে থাকে। ঈমানের স্বাদ ও মিষ্টতা আস্বাদন করার পূর্ব পর্যন্ত অন্তরে সংশয় ও সন্দেহ আসতেই থাকে। কিন্তু যখন তা অর্জিত হয়, তখন সব সংশয় দূর হয়ে যায়। ঈমানের স্বাদ অন্তরের সাথে মিশে গেলে, ব্যক্তি প্রতিটি আমলেই আনন্দ ও মিষ্টতা অনুভব করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দিন।

টিকাঃ
[৭৩৭] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১০৬।
[৭৩৮] সূরা নাহল, ১৬: ১১২।
[৭৩৯] মুসলিম, ৩৪।
[৭৪০] বুখারি, ১৬; মুসলিম, ৪৩।
[৭৪১] বুখারি, ১৯৬২, ১৯৬৪, ১৯৬৬; মুসলিম, ১১০২-১১০৫।
[৭৪২] বিস্তারিত দেখুন, বুখারি, ৭।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : খুশি ও আনন্দ (اَلْفَرَحُ وَالسُّرُورُ)

📄 মানযিল : খুশি ও আনন্দ (اَلْفَرَحُ وَالسُّرُورُ)


আল্লাহ তাআলা বলেছেন, قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوْا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ )
“হে নবি, আপনি বলে দিন, এটি আল্লাহর মেহেরবানি এবং তাঁর রহমত। সুতরাং এ জন্য তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। তারা যা কিছু জমা করছে, সেসবের চেয়ে এটি অনেক ভালো।”[৭৪৯]
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের আদেশ করেছেন যে, তারা যেন তাঁর মেহেরবানি ও রহমত প্রাপ্তিতে আনন্দিত হয়। এটি যিনি দান ও অনুগ্রহ করেছেন তাঁরও খুশি ও আনন্দিত হওয়ার মাধ্যম। কারণ যে ব্যক্তি কোনো অনুগ্রহ পেয়ে আনন্দিত হয়; তখন যিনি তাকে এই অনুগ্রহ দান করেন তিনি আরও বেশি আনন্দিত হন।
নিচে আমরা এই আয়াতটির অর্থ ব্যাখ্যা করব—
ইবনু আব্বাস, কাতাদা, মুজাহিদ, হাসান বাসরিসহ আরও অনেকেই বলেছেন, 'এই আয়াতে فَضْلُ اللهِ (আল্লাহর মেহেরবানি)-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: ইসলাম এবং رَحْتَتُهُ (তাঁর রহমত)-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: কুরআন।' তাঁরা ফাল বা মেহেরবানির চেয়ে রহমতকে খাছ করেছেন। কারণ তাঁর মেহেরবানি মুসলমানদের জন্য ব্যাপক। আর তাঁর রহমত হলো অনেকের মাঝে মাত্র কয়েকজনকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ফাদল বা মেহেরবানিতে তাদেরকে মুসলিম বানিয়েছেন। আর তাঁর রহমতের কারণে তাদের নিকট কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا كُنْتَ تَرْجُوْ أَنْ يُلْقَى إِلَيْكَ الْكِتَابُ إِلَّا رَحْمَةً مِّنْ رَّبِّكَ
"আপনি আশা করতেন না যে, আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হবে। এটা কেবল আপনার রবের রহমত।"[৭৫০]
আবু সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, 'فَضْلُ اللهِ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: কুরআন। আর رَحْمَةً দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: তিনি আমাদেরকে কুরআনের অধিকারী বানিয়েছেন। '[৭৫১]
আমার অভিমত হলো : এখানে এর দ্বারা উদ্দেশ্য দুইটি বিষয়:
এক. হুবহু আল্লাহর মেহেরবানিই উদ্দেশ্য এবং
দুই. আল্লাহর মেহেরবানি গ্রহণ করার জন্য স্থানকে উপযুক্ত করা উদ্দেশ্য। যেমন: ফসল-উৎপাদনে-উপযোগী-স্থানে বৃষ্টি বর্ষণ করা। এর দ্বারা আল্লাহর ফাদল ও রহমতের যে উদ্দেশ্য তা পূর্ণতা পায়। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
প্রিয়জন ও আকাঙ্ক্ষিত বস্তুর প্রাপ্তিতে অন্তরে স্বাদ অনুভূত হওয়ার অবস্থাকেই ফারাহ্ বা আনন্দ বলে। যেমন প্রিয়জন ও কাঙ্ক্ষিত বস্তুর বিচ্ছেদে সৃষ্টি হয় দুশ্চিন্তা ও কষ্টের অবস্থা। আল্লাহ তাআলা তাঁর দেওয়া মেহেরবানি ও রহমতের কারণে আনন্দিত হওয়ার আদেশ দিয়েছেন নিচের এই আয়াতটি উল্লেখ করার পর পরই-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُمْ مَّوْعِظَةً مِّنْ رَّبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ (3)
“হে লোকসকল, তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নসীহত এসে গেছে। এটি এমন জিনিস যা অন্তরের রোগের নিরাময় এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।”[৭৫২]
আল্লাহ তাআলার মেহেরবানি ও রহমতের চেয়ে অধিক যোগ্য কোনো বস্তু নেই, যা নিয়ে বান্দা আনন্দিত হতে পারে। কারণ তা নসীহত, সমস্ত আত্মিক রোগের ওষুধ, দয়া এবং হিদায়াতকে ধারণ করে। এই কারণে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ দুনিয়াবি যে ধনসম্পদ ও সম্মান অর্জন করে তার চেয়ে বহুগুণ উত্তম হলো তিনি বান্দাদের যে সমস্ত নিয়ামাত দান করেছেন সেগুলো। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো; নসীহত; যা উৎসাহমূলক ও ভীতিমূলক আদেশ-নিষেধ দ্বারা পরিপূর্ণ, আত্মিক রোগের ওষুধ; যা মূর্খতা, জুলুম, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, রাগ ইত্যাদি রোগগুলো দূর করে দেয়। আসলে অন্তরের রোগ শরীরের রোগের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ও যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু মানুষ তাতে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে এর ব্যথা অনুভব করে না। তবে এই দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার সময় মানুষ সেগুলোর ব্যথা ও যন্ত্রণার তীব্রতা উপলব্ধি করবে। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে দান করেছেন হৃদয় প্রশান্তকারী ও নিশ্চয়তা দানকারী হিদায়াত ও রহমত; যা সমস্ত কল্যাণের ধারক এবং সমস্ত অকল্যাণ ও অনিষ্ট দূরকারী।
তাই বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলার দেওয়া এই সমস্ত নিয়ামাতের কারণে আনন্দিত হওয়া উচিত। যে ব্যক্তি এর কারণে আনন্দিত হয়, সে আসলে সর্বশ্রেষ্ঠ বস্তু পাওয়ার কারণেই আনন্দিত হয়। দুনিয়ার প্রাচুর্যতা এর অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এতে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। কেননা এগুলো আরও বিপদ-মুসীবত ডেকে আনে; দুনিয়ার সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, আর অচিরেই তা ধ্বংস হয়ে যাবে; যেমন কেউ ঘুমের মধ্যে অনেক কিছু দেখে এবং জমা করতে থাকে; কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখে কিছুই নেই।
কুরআন মাজীদে الْفَرَحُ বা আনন্দের কথা দুইভাবে এসেছে: শর্তহীনভাবে এবং শর্তযুক্তভাবে।
শর্তহীনভাবে: আল্লাহ তাআলা এর নিন্দা করেছেন। যেমন: لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ "আনন্দের আতিশয্যে গর্ব করো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ গর্বকারীদের ভালোবাসেন না।” [৭৫৩]
শর্তযুক্তভাবে : এটি আবার দুই প্রকার:
এক. দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত আনন্দ; যা ব্যক্তিকে আল্লাহর ফযল, দয়া ও অনুগ্রহ ভুলিয়ে দেয়। এটি নিন্দনীয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُّبْلِسُوْنَ "অতঃপর তারা যখন ওই উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি তাদের সামনে সমৃদ্ধির সকল দরজা খুলে দিলাম। এমনকি তাদেরকে দেওয়া বিষয়াদির জন্য যখন তারা খুব আনন্দিত (গর্বিত) হয়ে পড়ল, তখন আমি তাদেরকে হঠাৎ পাকড়াও করলাম। ফলে তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল।”[৭৫৪]
দুই. যা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের সাথে সম্পৃক্ত। এটি আবার দুই প্রকার :
১. আল্লাহর মেহেরবানি ও রহমতের কারণে আনন্দিত হওয়া। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ “হে নবি, আপনি বলে দিন, এটি আল্লাহর মেহেরবানি এবং তার রহমত। সুতরাং এ জন্য তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। তারা যা কিছু জমা করছে সেসবের চেয়ে এটি অনেক ভালো।"[৭৫৫]
২. আল্লাহ তাআলা যা দান করেন, তার জন্য আনন্দিত হওয়া। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী,
فَرِحِيْنَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ
"আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তাতেই তারা আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত।”[৭৫৬]
সুতরাং আল্লাহ, তাঁর রাসূল, ঈমান, সুন্নাহ, ইলম, কুরআন-এই সব কারণে আনন্দিত হওয়া হলো আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ স্তর। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا مَا أُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ فَمِنْهُم مَّنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيْمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيْمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ )
"আর যখন কোনো সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, 'এর ফলে তোমাদের কার ঈমান বেড়ে গেছে?' আসলে যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং এতে তারা আনন্দিত হয়েছে।”[৭৫৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَالَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَفْرَحُوْنَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ
"এবং আমি আগে যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছিলাম, আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তারা তাতে আনন্দিত হয়।”[৭৫৮]
ইলম, ঈমান এবং সুন্নাহের কারণে আনন্দিত হওয়া-এটাই প্রমাণ করে যে, সেগুলোর প্রতি ব্যক্তির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে এবং সে অন্যান্য বস্তুর ওপর সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। কারণ কোনো বস্তুর প্রতি কারও আনন্দবোধ তখনই হয়, যখন সে সেগুলোকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে এবং সেগুলোর প্রতি আগ্রহ রাখে। তাই যার কোনো বস্তুর প্রতি আগ্রহ নেই, সে বস্তুর প্রাপ্তিতে তার কোনো আনন্দ থাকে না এবং এর অপ্রাপ্তিতে তার কোনো দুঃখবোধও হয় না।
আসলে আনন্দিত হওয়া ভালোবাসা ও আগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ।
(الْإِسْتِبْشَارُ كَ الْفَرَحُ -এ দুটি শব্দের অর্থই আনন্দিত হওয়া।) তবে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে:
الْفَرَحُ হলো : প্রিয় বস্তু অর্জিত হওয়ার পরে আনন্দিত হওয়া আর الإسْتِيْقارُ হলো: প্রিয় বস্তু অর্জিত হওয়ার আগে আনন্দিত হওয়া; যখন অর্জন হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত। এই কারণে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَرِحِينَ بِمَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِمْ مِّنْ خَلْفِهِمْ
"আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তাতেই তারা আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত। আর তাদের পরবর্তী যারা এখনো তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি, তাদের জন্যও তারা আনন্দিত হয়। "[৭৫৯]
الْفَرَحُ-এর মধ্যে পরিপূর্ণতার গুণ রয়েছে। এই কারণে আল্লাহ তাআলা আনন্দিত হওয়ার সর্বোচ্চ ও পূর্ণাঙ্গ রূপটিকে এর সাথে গুণান্বিত করে উল্লেখ করেছেন। যেমন: যে ব্যক্তি মরুভূমিতে নিজের খাদ্য-পানীয়সহ তার বাহন হারিয়ে ফেলে আর তা পাওয়ার আশা থেকে নিরাশ হয়ে যায়, অতঃপর সে যখন তার বাহন পেয়ে যায়; তখন তার খুশির চেয়ে তাওবাকারীর তাওবার কারণে আল্লাহ তাআলা বেশি খুশি হন। [৭৬০]
মূলকথা ফারাহ্ হলো: সর্বোচ্চ স্তরের আত্মিক আনন্দ, প্রফুল্লতা ও খুশি। আসলে আনন্দ ও প্রফুল্লতা হচ্ছে অন্তরের শান্তি আর দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি হচ্ছে অন্তরের শাস্তি। কোনো বস্তুতে আনন্দিত হওয়া তার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার চেয়েও বড়ো বিষয়। কেননা সন্তুষ্টি হলো নিশ্চিন্ততা ও স্থিরতা। আর ফারাহ হলো স্বাদ, আনন্দ ও প্রফুল্লতা। সুতরাং প্রতিটি আনন্দতেই রয়েছে সন্তুষ্টি। পক্ষান্তরে প্রতিটি সন্তুষ্টিতেই আনন্দ নেই। (অনেক সময় আনন্দ না থাকলেও বিভিন্ন কারণে সন্তুষ্ট হতে হয়।)
এই কারণে ফারাহ্ বা আনন্দের বিপরীত হলো হুযন বা দুশ্চিন্তা। আর সন্তুষ্টির বিপরীত হলো রাগ। দুশ্চিন্তা মানুষকে ব্যথা দেয়; কিন্তু রাগে মানুষ ব্যথিত হয় না। তবে যখন প্রতিশোধ নিতে অক্ষম হয়, তখন ব্যথা পায়। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।

টিকাঃ
[৭৪৯] সূরা ইউনুস, ১০:৫৮।
[৭৫০] সূরা কাসাস, ২৮: ৮৬।
[৭৫১] আবুল মুযাফফার সামআনি, তাফসীর, ২/৩৯০।
[৭৫২] সূরা ইউনুস, ১০:৫৭।
[৭৫৩] সূরা কাসাস, ২৮: ৭৬।
[৭৫৪] সূরা আনআম, ৬:৪৪।
[৭৫৫] সূরা ইউনুস, ১০:৫৮।
[৭৫৬] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭০।
[৭৫৭] সূরা তাওবা, ৯: ১২৪।
[৭৫৮] সূরা রা'দ, ১৩: ৩৬।
[৭৫৯] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭০।
[৭৬০] মুসলিম, ২৭৪৪।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 অধ্যায় : সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততা (اَلْقَبْضُ وَالْبَسْطُ)

📄 অধ্যায় : সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততা (اَلْقَبْضُ وَالْبَسْطُ)


সংকীর্ণতা (الْقَبْضُ) দুই প্রকার: অবস্থার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা এবং মূল বস্তুতে সংকীর্ণতা।
অবস্থার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা হলো এমন বিষয়, যা অন্তরে করাঘাত করে অন্তরকে খুশি ও আনন্দ থেকে বিরত রাখে। এটি আবার দুই প্রকার।
১. যার কারণ জানা যায়। যেমন: গুনাহ, শিথিলতা, আল্লাহর থেকে দূরত্ব বেড়ে যাওয়া, রূঢ়তা কিংবা এ ধরনের কোনো বিষয়ের কথা স্মরণ হওয়া।
২. যার কারণ জানা যায় না। বরং সংকীর্ণতা ও অস্থিরতা অন্তরে এসে ভিড় জমায়; যা থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তির সাধ্যের বাইরে। এ ধরনের সংকীর্ণতার প্রতিই সূফিয়ায়ে কেরাম ইঙ্গিত করে থাকেন। এর বিপরীত হলো الْبَسْط বা প্রশস্ততা। তাদের নিকট সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততা অন্তরের এমন দুটি অবস্থা, যা থেকে অন্তর কখনো নিষ্কৃতি পায় না।
আবুল কাসিম জুনাইদ বাগদাদি রহ. বলেছেন, 'সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততার অর্থের মধ্যে ভয় ও আশার অর্থও রয়েছে। আশা আনুগত্যের দিকে নিয়ে যায় আর ভয় গুনাহ থেকে বিরত রাখে।'
সূফিয়ায়ে কেরামের সবাই সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততা সম্পর্কে এই পদ্ধতিতে কথা বলেছেন। এভাবে তারা এগুলোর অনেক প্রকারের কথা উল্লেখ করেছেন— শিষ্টাচারে সংকীর্ণতা, শিক্ষা দেওয়ার জন্য সংকীর্ণতা, একত্রিত করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা এবং পৃথক করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা। এই কারণে কারও মধ্যে যখন এই সংকীর্ণতাগুলো স্থান করে নেয়, তখন সেগুলো তাকে খাবার, পানীয়, কথাবার্তা, তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন এবং নিজ পরিবার-পরিজনদের সাথে ও অন্যান্য মানুষের সাথে প্রফুল্লতা নিয়ে মেলামেশা করা থেকে বিরত রাখে।
শিষ্টাচারে সংকীর্ণতা : এটি হয় অমনোযোগিতা, খারাপ চিন্তা কিংবা নিকৃষ্ট ভাবনার শাস্তিস্বরূপ।
শিক্ষা দেওয়ার জন্য সংকীর্ণতা : এটি ভবিষ্যতে বিরাট প্রশস্ততা আসার জন্য প্রস্তুতিস্বরূপ। সুতরাং প্রশস্ততার পূর্বে সংকীর্ণতায় পতিত হওয়া প্রশস্ততা আসার নির্দেশনা এবং ভূমিকার মতো। যেমন ওহি নাযিল হওয়ার পূর্বে এবং ওহি ধারণের জন্য প্রস্তুতি-গ্রহণ-স্বরূপ নবি -এর দুর্বলতা ও সংকীর্ণতা অনুভব করা। এমনিভাবে সচ্ছলতার পূর্বে দরিদ্রতা, নিরাপত্তার পূর্বে বিপদাপদ, নিশ্চিন্ততার পূর্বে কঠিন ভয় ইত্যাদি। আসলে আল্লাহ তাআলার রীতি হলো, উপকারী ও প্রিয় কিছু অর্জন করতে হলে এর বিপরীত (অর্থাৎ দুঃখ-কষ্টের) দরজা দিয়েই সেগুলোর নিকট প্রবেশ করতে হয়।
একত্রিত করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা : এটি হলো দুনিয়া ও দুনিয়াসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি থেকে অন্তর সংকীর্ণ হয়ে কেবল আল্লাহ তাআলার ওপরই একত্রিত হওয়া। ফলে অন্তরে অনর্থক কোনো বিষয় আর অবশিষ্ট থাকে না এবং অন্তর যার ওপর একত্রিত হয়, তাকে ছাড়া আর অন্য কিছুর দিকে যায় না। এই পরিস্থিতিতে কেউ যদি সেই ব্যক্তির সাথে সখ্যতা বা আলোচনা করতে চায়, যা তাকে সেখান থেকে বের করে দেবে; তা হলে সে যেন ওই ব্যক্তির প্রতি অবিচার করল।
পৃথক করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা : এটি হলো আল্লাহ সম্পর্কে ব্যক্তির অন্তরে সংকীর্ণতার সৃষ্টি হওয়া এবং অন্তর বিভিন্ন দিকে বিক্ষিপ্ত হওয়া। এর সর্বনিম্ন শাস্তি হলো এই সংকীর্ণতায় ব্যক্তি মৃত্যু কামনা করে।
প্রশস্ততা (اَلْبَسْط) হলো : বান্দার বাহ্যিক কাজকর্ম ও অবস্থা ইলমের দাবি অনুসারে পরিচালিত হবে। আর তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা আল্লাহর সান্নিধ্য, ভালোবাসা ও মুরাকাবা বা গভীর ধ্যানে নিমগ্ন থাকবে। ফলে তার ভেতর ও বাহির সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে। তার বাহ্যিক অবস্থা ইলমের দাবি অনুযায়ী আমল করার দরুন সুবাসিত হবে আর অভ্যন্তরীণ অবস্থা মহাব্বত, আশা, ভয়, মুরাকাবা, ভরসা, সান্নিধ্য ইত্যাদি দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে। সুতরাং বাহ্যিক আমল তার জন্য হবে সৌন্দর্যের আবরণ আর মূল সৌন্দর্য থাকবে ভেতরগত অবস্থায়। আল্লাহ তাআলা কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ-এই দুই সৌন্দর্যকে একসাথে উল্লেখ করেছেন:
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيْشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ
"হে বানী আদম, আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবর্তীণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে রাখে এবং অবর্তীণ করেছি সাজসজ্জার বস্ত্র। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম।” [৭৯২]
দয়াময় আল্লাহ তাআলা যে ময়দানকে প্রশস্ততা দান করেছেন তা হলো (অন্তরের প্রশস্ততা)-যা তিনি তাঁর আম্বিয়ায়ে কেরাম ও আউলিয়ায়ে কেরামের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তা হলো রাসূলুল্লাহ যে আচরণ তাঁর পরিবার-পরিজন, সাথিসঙ্গী, কাছের ও দূরের সমস্ত মানুষের সাথে করেছেন; যেমন: অন্তরের প্রশস্ততা, সবসময় হাশিখুশি থাকা, উত্তম ব্যবহার, সাক্ষাৎ হলে সালাম দেওয়া, কেউ থামতে বললে তার জন্য থামা, কখনো কখনো ছোটোবড়ো সবার সাথে সত্য বিষয়ে সামান্য রসিকতা করা, দাওয়াত গ্রহণ করা, সবার সাথেই নম্র ব্যবহার করা ইত্যাদি। এর ফলে প্রত্যেক সাহাবিই মনে করতেন যে, নবিজি তাঁকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। এই অঙ্গনে আপনি ওয়াজিব, মুস্তাহাব আর মুবাহ ছাড়া (খারাপ) কিছু পাবেন না। মুবাহ বিষয়টিও আবার ওয়াজিব ও মুস্তাহাবকে শক্তিশালী করে।
সৃষ্টিজগতের সাথে আম্বিয়ায়ে কেরাম ও আউলিয়ায়ে কেরামের উদার ও নম্র ব্যবহার করাকে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য রহমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
"আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য নম্র ও কোমল হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রুক্ষ স্বভাবের ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তা হলে তারা সবাই আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত!”[৭৯৩]
আল্লাহ তাআলা নবি-রাসূলদের নম্র ও কোমল বানিয়েছেন, যাতে আল্লাহর পথে যারা চলতে চায় তারা তাদের অনুসরণ করতে পারে, পেরেশান ব্যক্তি তাদের মাধ্যমে নিজের পেরেশানি দূর করতে পারে, অসুস্থ ব্যক্তি তাদের দ্বারা সুস্থতা লাভ করতে পারে এবং তাদের জ্ঞান, উপদেশ, নসীহত ও হিদায়াতের নূরের মাধ্যমে নফস ও প্রবৃত্তির অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। সুতরাং তারা যখন নীরব থাকে, আল্লাহর-পথের-পথিকরা তাদের অনুসরণ করে আর যখন কথা বলে, তখন তাদের কথামালা দ্বারা উপকৃত হয়। কেননা তাদের নড়াচড়া, স্থিরতা ও নীরবতা সবই আল্লাহর হুকুমে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় হয়ে থাকে; ফলে সত্যবাদীদের অন্তর তাদের দিকে আকৃষ্ট হয়। যে আলো দিয়ে তারা মানুষদেরকে আলোকিত করেন, তা হলো-ইলম ও মা'রিফাত বা আল্লাহর পরিচয়মূলক জ্ঞানের আলো।
আলিম তিন প্রকার:
এক. এমন আলিম যিনি নিজেও তার ইলমের আলোয় আলোকিত হন এবং লোকজনও তার দ্বারা উপকৃত হয়। এই সমস্ত আলিমগণই রাসূলদের খলীফা এবং ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া বা আম্বিয়ায়ে কেরামের ওয়ারিশ।
দুই. এমন আলিম যে তার ইলম দ্বারা কেবল নিজেই উপকৃত হয়, অন্যরা এর থেকে বঞ্চিত থাকে। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা যদি (আমলে) অবহেলা না করেন, তা হলে তাদের নিজেদের মাঝেই তাদের ইলমের উপকারিতা সীমাবদ্ধ থাকে। এই শ্রেণির আলিম প্রথম শ্রেণির আলিমের চেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন।
তিন. এমন আলিম যার ইলম তার নিজেরও উপকার করে না এবং মানুষজনও তার দ্বারা উপকৃত হয় না। এই ব্যক্তির ইলম তার জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে। মানুষের সাথে এই শ্রেণির আলিমদের মেলামেশা ভয়ংকর ফিতনা। আর প্রথম শ্রেণির আলিমগণ হলেন মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত।

টিকাঃ
[৭৯২] সূরা আ'রাফ, ৭: ২৬।
[৭৯৩] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৫৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00