📄 মানযিল : আত্মসমালোচনা (اَلْغَيْرَةُ)
আল্লাহ তাআলা বলেন, قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
“আপনি বলে দিন, আল্লাহ যেসব জিনিস হারাম করেছেন, তা হচ্ছে: প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা...”[৭২৮]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল বলেছেন,
لَا أَحَدَ أَغْيَرُ مِنَ اللَّهِ وَلِذَلِكَ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْمَدْحُ مِنَ اللَّهِ وَلِذَلِكَ مَدَحَ نَفْسَهُ وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعُذْرُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ أَنْزَلَ الْكِتَابَ، وَأَرْسَلَ الرُّسُلَ
* আল্লাহর চেয়ে অধিক আত্মমর্যাদার অধিকারী আর কেউ নেই; এ জন্য তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করেছেন。
* আল্লাহর চেয়ে প্রশংসাপ্রিয় আর কেউ নেই; এ কারণে তিনি নিজেই নিজের প্রশংসা করেছেন。
* আল্লাহর চেয়ে ওজর কবুলকারী আর কেউ নেই; যার ফলে তিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং রাসূল প্রেরণ করেছেন।”[৭২৯]
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَغَارُ وَإِنَّ الْمُؤْمِنَ يَغَارُ وَغَيْرَةُ اللَّهِ أَنْ يَأْتِيَ الْمُؤْمِنُ مَا حَرَّمَ عَلَيْهِ
"আল্লাহ তাআলা আত্মমর্যাদা উপলব্ধি করেন এবং মুমিনরাও আত্মমর্যাদা উপলব্ধি করেন। বান্দার ওপর আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন, বান্দা যখন তাতে লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত আসে।"[৭৩০]
'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এ আরও এসেছে, নবি বলেছেন,
أَتَعْجَبُوْنَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنَي
"তোমরা কি সা'দ (ইবনু উবাদা)-এর আত্মমর্যাদাবোধ দেখে আশ্চর্য হচ্ছো? আমি ওর থেকেও অধিক আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। আর আল্লাহ তাআলা আমার থেকেও অধিক আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী!”[৭৩১]
নিম্নের আয়াতটি আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে:
وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مَّسْتُوْرًا
"আর যখন আপনি কুরআন পাঠ করেন, তখন আপনার মাঝে ও যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মাঝে আমি একটি অদৃশ্য পর্দা স্থাপন করি।"[৭৩২]
সারি সাকাতি তার সাথিদের বলেছেন, 'তোমরা কি জানো সেই অদৃশ্য পর্দাটি কী? আত্মসম্মানবোধের পর্দা। আল্লাহর চেয়ে অধিক আত্মসম্মানবোধের অধিকারী আর কেউ নেই। আল্লাহ তাঁর কালাম বোঝার যোগ্যতা, তাঁর পরিচয়, তাওহীদ ও তাঁকে ভালোবাসার উপযুক্ততা কাফিরদের দান করেননি। ফলে তাদের মাঝে ও তাঁর রাসূল, কালাম ও তাওহীদের মাঝে একটি অদৃশ্য পর্দা স্থাপন করে দিয়েছেন।
আসলে অযোগ্যরা তা পেয়ে যাবে, এই বিষয়টি তাঁর আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে। ১৭০০। আত্মসম্মানবোধের মানযিল হলো অনেক সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ একটি মানযিল। কিন্তু পরবর্তী যুগের কিছু নামধারী সূফি এর বিষয়বস্তুকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে। তারা নিজেরা নতুন একটি বাতিল মাযহাব তৈরি করে নিয়েছে। তারাও এর নাম দিয়েছে 'আত্মসম্মানবোধ' (الْغَيْرَةُ)। অতঃপর অপাত্রে ও ভিন্ন স্থানে তা প্রয়োগ করেছে। তারা বিষয়টি বুঝতে না পেরে বিরাট তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। শীঘ্রই আপনি তা দেখতে পাবেন।
আত্মসম্মানবোধ বা গাইরত দুই ধরনের:
১. কোনো বস্তুর কারণে আত্মসম্মানবোধ (الْغَيْرَةُ مِنَ الشَّيْءِ) এবং
২. কোনো বস্তুর ওপর আত্মসম্মানবোধ (الْغَيْرَةُ عَلَى الشَّيْءِ)।
১. কোনো বস্তুর কারণে আত্মসম্মানবোধ: এটি হলো আপনার ভালোবাসার বস্তুতে অন্যের শরীকানা ও ভিড়কে অপছন্দ করা।
২. কোনো বস্তুর ওপর আত্মসম্মানবোধ: ভালোবাসার বস্তুকে একাই পেতে চাওয়ার প্রচণ্ড লোভ। অন্য কেউ যাতে তাতে অংশীদার না হয় এবং ভাগ না বসায়, তা কামনা করা।
গাইরাতের আরও একটি প্রকার রয়েছে: বান্দার নিজের নফস থেকে নফসের ওপর গাইরাত বা আত্মসম্মানবোধ; যেমন: তার নফস থেকে তার কল্বের ওপর গাইরাত, তার বিচ্ছিন্নতা থেকে তার স্থির থাকার ওপর গাইরাত, তার উপেক্ষা করা থেকে তার উদ্যমী হওয়ার ওপর গাইরাত, তার মন্দ স্বভাব থেকে তার প্রশংসনীয় স্বভাবের ওপর গাইরাত। (অর্থাৎ উত্তম বিষয়গুলো অর্জন করার জন্য আত্মসম্মানবোধ বা গাইরাত থাকা।) এই প্রকার আত্মসম্মানবোধ হলো সম্মানিত ও পবিত্র নফসের বৈশিষ্ট্য। নীচু ও নিম্ন স্বভাবের নফসের জন্য এতে কোনো অংশ নেই। নফসের পবিত্রতা ও সুউচ্চ হিম্মতের পরিমাণ অনুসারে এই আত্মসম্মানবোধ অর্জিত হয়।
আত্মসম্মানবোধের আরও দুটি প্রকার রয়েছে:
১. বান্দার ওপর আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ এবং
২. আল্লাহর জন্য বান্দার আত্মসম্মানবোধ, আল্লাহর ওপরে আত্মসম্মানবোধ নয়।
১. বান্দার ওপর আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ: এটি হলো আল্লাহ তাআলা তাকে অন্য কোনো সৃষ্টির গোলাম বানাবেন না; বরং তাকে কেবল নিজের জন্যই গোলাম হিসেবে গ্রহণ করবেন। এতে কাউকে অংশীদার করবেন না। তাকে শুধু নিজের জন্যই বেছে নেবেন। এটি এই দুই প্রকারের মধ্যে উঁচু স্তরের আত্মসম্মানবোধ।
২. আল্লাহর জন্য বান্দার আত্মসম্মানবোধ: এটি আবার দুই প্রকার: নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ এবং অপরের সাথে আত্মসম্মানবোধ।
বান্দার নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ হলো: বান্দা তার কাজকর্ম, কথাবার্তা, অবস্থা, সময়, শ্বাসপ্রশ্বাস মোটকথা তার ছোটোবড়ো সবকিছু একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই নিবেদন করবে। আল্লাহ ব্যতীত আর কারও জন্য নয়।
আর অপরের সাথে আত্মসম্মানবোধ হলো: কেউ যখন তাকে অন্যায়-অপকর্ম ও হারামে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করবে, তার হকসমূহের ব্যাপারে অবহেলা করবে এবং তা নষ্ট করবে, তখন এ বিষয়গুলো তাকে রাগান্বিত করে তুলবে এবং তার ক্রোধ বাড়িয়ে দেবে।
অপরদিকে আল্লাহ তাআলার ওপর আত্মসম্মানবোধ দেখানো হলো সবচেয়ে বড়ো মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতা। যারা এ আচরণ করে, তারা সবচেয়ে বড়ো মূর্খ এবং চরম বিভ্রান্ত। কখনো কখনো এটি ব্যক্তিকে আল্লাহর সাথে শত্রুতার দিকে ঠেলে দেয়; অথচ সে তা টেরই পায় না। কখনো কখনো মূল দ্বীন ও ইসলাম থেকেই বের করে দেয়। এরা আল্লাহর-পথের-পথিকদের পথচলায় বিঘ্নতা সৃষ্টি করে। এ পথের চোর-ডাকাতের চেয়ে এরা ক্ষতিকর হয়। এরাই প্রকৃত পথরোধকারী। আল্লাহর জন্য যারা আত্মসম্মানবোধ করেন, তাদের সাথে এদের কত পার্থক্য! তারা আল্লাহর জন্য নিজের কাজকর্ম, কথাবার্তা, আচার-আচরণ সবকিছু উৎসর্গ করে দেয়। জ্ঞানীরা আল্লাহর জন্য আত্মসম্মানবোধ করে আর মূর্খরা আল্লাহর ওপর আত্মসম্মানবোধ করে। সুতরাং এটা বলা যাবে না যে, أَنَا أَغَارُ عَلَى اللهِ 'আমি আল্লাহর ওপর আত্মসম্মানবোধ করি।' বরং বলতে হবে أَنَا أَغَارُ لِلهِ 'আমি আল্লাহর জন্য আত্মসম্মানবোধ করি।'
বান্দার নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ অপরের সাথে আত্মসম্মানবোধের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনি যখন আপনার নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ উপলব্ধি করবেন, তখন অপরের সাথে আল্লাহর জন্য আপনার আত্মসম্মানবোধও সঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি যখন নিজেকে বাদ দিয়ে অপরের সাথে আত্মসম্মানী হয়ে উঠবেন, তখন নিশ্চিতভাবেই আপনার আত্মসম্মানবোধ অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত হবে। সুতরাং এটা নিয়ে ভাবুন এবং এর প্রতি সূক্ষ্মদৃষ্টি নিবদ্ধ রাখুন।
এই স্তরের এই কথাগুলো নিয়ে বুদ্ধিমান পথিকদের চিন্তাভাবনা করা উচিত। কারণ এখানে এসে অধিকাংশ পথিকেরই পা পিছলে যায়। আল্লাহ তাআলাই সঠিক পথ দেখান, পথ চলার তাওফীক দেন আর তিনিই তাতে সুদৃঢ় রাখেন।
যেমন (তথাকথিত) এক প্রসিদ্ধ সুফি বলেছেন, 'আমি ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পাই না; যতক্ষণ-না আল্লাহর যিক্র করছে এমন কাউকে দেখি।' এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হলো সে ব্যতীত অন্যান্য গাফিলদের মধ্যে কাউকে যিক্র করতে দেখা। এর চেয়েও আশ্চর্যের হলো এটাকে তার বুজুর্গি ও শ্রেষ্ঠত্ব বলে গণ্য করা হয়!
আরেকজন বলেছেন, 'আমি আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করতে এবং তাঁকে দেখতে পছন্দ করি না।' তাকে বলা হলো, 'কেন?' তিনি জবাব দেন, 'আল্লাহর ওপর আত্মসম্মানবোধের কারণে; আমার মতো ব্যক্তি তাঁকে দেখবে?!'
এটি হলো মন্দ ও নিকৃষ্ট পর্যায়ের আত্মসম্মানবোধ। যা ব্যক্তির মূর্খতার প্রতিই ইঙ্গিত করে। যদিও সে নিজেকে ছোটো মনে করা, বিনয়, নম্রতা, অক্ষমতা ও অপদস্থতার গুণে গুণান্বিত থাকে।
টিকাঃ
[৭২৮] সূরা আ'রাফ, ৭: ৩৩।
[৭২৯] বুখারি, ৪৬৩৪; মুসলিম, ২৭৬০।
[৭৩০] বুখারি, ৫২২৩; মুসলিম, ২৭৬১।
[৭৩১] বুখারি, ৬৮৪৬; মুসলিম, ১৪৯৯।
[৭৩২] সূরা ইসরা, ১৭:৪৫।
[৭৩৩] ইবনু তাইমিয়্যা, আল-ইসতিকামাহ, ২/৪৫।
📄 মানযিল : আগ্রহ (اَلشَّوْقُ)
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
مَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ اللَّهِ فَإِنَّ أَجَلَ اللَّهِ لَآتٍ "আল্লাহর সাথে যে সাক্ষাতের আশা করে (তার জানা উচিত), আল্লাহর নির্ধারিত সময় আসবেই।"[৭৩৪]
বলা হয়েছে: এই আয়াতটি তাদের জন্য সুখবর ও সান্ত্বনা, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ পেতে আগ্রহী। অর্থাৎ আমি জানি যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে, তারা আমার প্রতি প্রবল আগ্রহী। তবে আমি এর জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে রেখেছি; অচিরেই তার আগমন ঘটবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। যা কিছুর আগমন ঘটবে, তা তো নিকটবর্তীই।
নবি তাঁর দুআয় বলতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ لَذَةَ النَّظْرِ إِلَى وَجْهِكَ، وَالشَّوْقَ إِلَى لِقَائِكَ “হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট আপনার চেহারার দিকে তাকানোর স্বাদ এবং আপনার সাক্ষাতের আগ্রহ প্রার্থনা করছি।”[৭৩৫]
আগ্রহ (الشوق) হলো: মহব্বতের প্রভাব ও বহিঃপ্রকাশ। কারণ প্রিয় মানুষের প্রতি অন্তর সবসময়ই ধাবিত হয়।
কেউ কেউ বলেছেন, 'আগ্রহ হলো: অন্তরকে প্রিয় মানুষের সাক্ষাতের জন্য উদ্বুদ্ধ করে তোলা।'
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, 'আমি সারি সাকাতি -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'শাওক (আগ্রহ) হলো আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি মানযিল। কেউ যখন আগ্রহের মানযিলে পৌঁছে যায়, তখন সে তার আগ্রহের বিষয় ব্যতীত সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে চলে। ১০৯। এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, জান্নাতের অধিবাসীরা আল্লাহ তাআলার দর্শন ও নৈকট্য লাভ করা সত্ত্বেও প্রতি মুহূর্তে তাঁর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
আগ্রহের দুটি স্তর রয়েছে: ১. ইবাদাতকারীর জান্নাতের আগ্রহ এবং ২. আল্লাহ তাআলার প্রতি আগ্রহ। তবে এটি জান্নাতের প্রতি আগ্রহ থাকার বিপরীত নয়। কেননা জান্নাতের সর্বোত্তম নিয়ামাত হলো আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করা, তাঁর দর্শন পাওয়া, তাঁর কথা শ্রবণ করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করা।
টিকাঃ
[৭৩৪] সূরা আনকাবুত, ২৯ : ৫।
[৭৩৫] নাসাঈ, ১৩০৫।
[৭৩৬] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৪৯৯।
📄 মানযিল : স্বাদ আস্বাদন করা (اَلذَّوْقُ)
স্বাদ (الذَّوْقُ) : এটি হলো পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় বস্তুসমূহকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করা। কুরআনের ভাষা ও আরবদের ভাষা অনুযায়ী স্বাদ (الذَّوْقُ) শুধু মুখ দ্বারা অনুভব করার সাথেই সীমাবদ্ধ নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُوْنَ
“অতএব এখন তোমরা তোমাদের কুফরির বিনিময়স্বরূপ আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো।”[৭৩৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ
“ফলে আল্লাহ ক্ষুধা ও ভীতির পোশাকে তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করালেন।”[৭৩৮]
চিন্তা করুন—আল্লাহ তাআলা কীভাবে স্বাদ আস্বাদন করা ও পোশাকের বিষয়টি একসাথে উল্লেখ করেছেন; এটি বোঝানোর জন্য যে, তিনি তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করিয়েছেন দ্রুত ও পরিপূর্ণভাবে। সুতরাং আয়াতটি স্বাদ আস্বাদনের কথা উল্লেখ করে এই সংবাদ দিচ্ছে যে, শাস্তিটি কোনো রকম বিলম্ব ছাড়া দ্রুতই দেওয়া হয়েছিল। কেননা মানুষ কখনো কখনো দেরিতেও ভয় পায়, তাৎক্ষণিকভাবে ভয় পায় না। (স্বাদ যেমন খাওয়ার সাথে সাথেই অনুভূত হয়, তেমনি তাদেরকে ভীতির শাস্তি দ্রুতই দেওয়া হয়েছিল।) আর পোশাকের কথা উল্লেখ করে এই সংবাদ দিচ্ছে যে, শাস্তিটি ছিল পরিপূর্ণভাবে বেষ্টনকারী। যেমন পোশাক শরীরকে সম্পূর্ণরূপে বেষ্টন করে নেয়।
'সহীহ মুসলিম'-এ এসেছে, নবি বলেছেন,
ذَاقَ طَعْمَ الإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا
"সেই ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে, যে রব হিসেবে আল্লাহকে, দ্বীন হিসেবে ইসলামকে এবং রাসূল হিসেবে মুহাম্মাদ-কে পেয়ে সন্তুষ্ট।”[৭৩৯]
নবি জানিয়েছেন যে, ঈমানেরও স্বাদ রয়েছে আর অন্তর তা আস্বাদন করে। যেমন মুখ খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ আস্বাদন করে।
নবি ঈমান ও ইহসানের হাকীকত উপলব্ধি করাকে এবং অন্তরে তা অর্জিত হওয়াকে কখনো স্বাদের মাধ্যমে, কখনো খাবার-পানীয়ের মাধ্যমে আবার কখনো মিষ্টতা অনুভূত হবে বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন ওপরে বর্ণিত হাদীসে আমরা দেখেছি। এমনিভাবে তিনি বলেছেন,
ثَلَاثَ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الإِيْمَانِ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ
“তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করতে পারে- ১. তার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য সব কিছু থেকে প্রিয় হওয়া, ২. কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা এবং ৩. কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপছন্দ।
করা।"[৭৪০]
রাসূলুল্লাহ সাহাবায়ে কেরাম-কে ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করতে যখন নিষেধ করেছিলেন, তখন তারা জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আপনি তো ধারাবাহিকভাবেই পালন করেন?' নবি তখন জবাব দিয়েছিলেন,
إِنِّي لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ إِنِّي أُطْعَمُ وَأُسْقَى
"আমার অবস্থা তোমাদের মতো নয়, আমাকে আহার করানো হয় এবং পানও করানো হয়।”
অপর এক বর্ণনায় এসেছে,
إِنِّي أَبِيْتُ يُطْعِمُنِي رَبِّي وَيَسْقِينِي
"আমি এমন অবস্থায় রাত্রিযাপন করি যে, আমার রব আমাকে খাওয়ান এবং পান করান।”[৭৪১]
যারা ধারণা করে যে, এই খাবার খাওয়ানো এবং পান করানো বস্তুগত খাদ্য ও পানীয়; যা মুখ দিয়ে খাওয়া হয়, তাদের বোধশক্তিতে মোটা পর্দা পড়েছে। তারা যেমন ধারণা করে বিষয়টি যদি এমনই হতো, তা হলে তো নবি সাওম পালনকারীই সাব্যস্ত হবেন না; ধারাবাহিকভাবে তা পালন করা তো দূরের কথা। যখন নবি সাহাবিদের জবাব দিয়েছেন যে, "আমি তোমাদের মতো নই।” তখন তাঁর মাঝে- ও তাদের মাঝে পার্থক্যটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁকে পানাহার করানো হয়। যদি নবি তাঁর পবিত্র মুখ দিয়েই পানাহার করতেন, তা হলে তিনি সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে বলতেন, 'আমিও ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করি না।' সুতরাং যখন 'আপনি তো ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করেন?'- তাদের এই প্রশ্নকে তিনি সমর্থন করেছেন, তখন বোঝা যায় যে, নবি-ও খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকতেন। তাঁর জন্য আল্লাহর-দেওয়া আত্মিক-পানাহারই যথেষ্ট ছিল; যা তাঁকে বাহ্যিক পানাহার থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছিল।
এই স্বাদ গ্রহণের বিষয়টির মাধ্যমে রোম সম্রাট হিরাকূল নুবুওয়াতের বিশুদ্ধতার ওপরে প্রমাণ পেশ করেছিলেন; তিনি আবূ সুফইয়ানকে বলেছিলেন, 'তাদের কেউ কি তাঁর দ্বীনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে তা থেকে ফিরে যায়?' আবূ সুফইয়ান উত্তর দিয়েছিলেন, 'না'। তখন তিনি বলেছিলেন, 'ঈমান এমনই; যখন তার মিষ্টতা ও স্বাদ অন্তরের সাথে মিশে যায়। (তখন আর কেউ তা থেকে ফিরে যায় না।) '[৭৪২]
রোম সম্রাট হিরাকূল নবি ﷺ-এর অনুসারীদের জন্য ঈমানের যে স্বাদ অনুভূত হয়, তার দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন যে, তা হলো নুবুওয়াত ও রিসালাতের দাবি; বাদশাহি ও রাজত্ব লাভের দাবি নয়। আসলে ঈমানের স্বাদ যখন কোনো অন্তরের সাথে মিশে যায়, তখন সে অন্তর আর কখনো ঈমান থেকে বিমুখ হয় না।
মূলকথা হলো: অন্তর ঈমান ও ইহসানের মিষ্টতা অনুভব করে। ঠিক যেমন মুখ বস্তুগত খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ অনুভব করে থাকে। ঈমানের স্বাদ ও মিষ্টতা আস্বাদন করার পূর্ব পর্যন্ত অন্তরে সংশয় ও সন্দেহ আসতেই থাকে। কিন্তু যখন তা অর্জিত হয়, তখন সব সংশয় দূর হয়ে যায়। ঈমানের স্বাদ অন্তরের সাথে মিশে গেলে, ব্যক্তি প্রতিটি আমলেই আনন্দ ও মিষ্টতা অনুভব করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দিন।
টিকাঃ
[৭৩৭] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১০৬।
[৭৩৮] সূরা নাহল, ১৬: ১১২।
[৭৩৯] মুসলিম, ৩৪।
[৭৪০] বুখারি, ১৬; মুসলিম, ৪৩।
[৭৪১] বুখারি, ১৯৬২, ১৯৬৪, ১৯৬৬; মুসলিম, ১১০২-১১০৫।
[৭৪২] বিস্তারিত দেখুন, বুখারি, ৭।
📄 মানযিল : খুশি ও আনন্দ (اَلْفَرَحُ وَالسُّرُورُ)
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوْا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ )
“হে নবি, আপনি বলে দিন, এটি আল্লাহর মেহেরবানি এবং তাঁর রহমত। সুতরাং এ জন্য তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। তারা যা কিছু জমা করছে, সেসবের চেয়ে এটি অনেক ভালো।”[৭৪৯]
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের আদেশ করেছেন যে, তারা যেন তাঁর মেহেরবানি ও রহমত প্রাপ্তিতে আনন্দিত হয়। এটি যিনি দান ও অনুগ্রহ করেছেন তাঁরও খুশি ও আনন্দিত হওয়ার মাধ্যম। কারণ যে ব্যক্তি কোনো অনুগ্রহ পেয়ে আনন্দিত হয়; তখন যিনি তাকে এই অনুগ্রহ দান করেন তিনি আরও বেশি আনন্দিত হন।
নিচে আমরা এই আয়াতটির অর্থ ব্যাখ্যা করব—
ইবনু আব্বাস, কাতাদা, মুজাহিদ, হাসান বাসরিসহ আরও অনেকেই বলেছেন, 'এই আয়াতে فَضْلُ اللهِ (আল্লাহর মেহেরবানি)-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: ইসলাম এবং رَحْتَتُهُ (তাঁর রহমত)-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: কুরআন।' তাঁরা ফাল বা মেহেরবানির চেয়ে রহমতকে খাছ করেছেন। কারণ তাঁর মেহেরবানি মুসলমানদের জন্য ব্যাপক। আর তাঁর রহমত হলো অনেকের মাঝে মাত্র কয়েকজনকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ফাদল বা মেহেরবানিতে তাদেরকে মুসলিম বানিয়েছেন। আর তাঁর রহমতের কারণে তাদের নিকট কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا كُنْتَ تَرْجُوْ أَنْ يُلْقَى إِلَيْكَ الْكِتَابُ إِلَّا رَحْمَةً مِّنْ رَّبِّكَ
"আপনি আশা করতেন না যে, আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হবে। এটা কেবল আপনার রবের রহমত।"[৭৫০]
আবু সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, 'فَضْلُ اللهِ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: কুরআন। আর رَحْمَةً দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: তিনি আমাদেরকে কুরআনের অধিকারী বানিয়েছেন। '[৭৫১]
আমার অভিমত হলো : এখানে এর দ্বারা উদ্দেশ্য দুইটি বিষয়:
এক. হুবহু আল্লাহর মেহেরবানিই উদ্দেশ্য এবং
দুই. আল্লাহর মেহেরবানি গ্রহণ করার জন্য স্থানকে উপযুক্ত করা উদ্দেশ্য। যেমন: ফসল-উৎপাদনে-উপযোগী-স্থানে বৃষ্টি বর্ষণ করা। এর দ্বারা আল্লাহর ফাদল ও রহমতের যে উদ্দেশ্য তা পূর্ণতা পায়। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
প্রিয়জন ও আকাঙ্ক্ষিত বস্তুর প্রাপ্তিতে অন্তরে স্বাদ অনুভূত হওয়ার অবস্থাকেই ফারাহ্ বা আনন্দ বলে। যেমন প্রিয়জন ও কাঙ্ক্ষিত বস্তুর বিচ্ছেদে সৃষ্টি হয় দুশ্চিন্তা ও কষ্টের অবস্থা। আল্লাহ তাআলা তাঁর দেওয়া মেহেরবানি ও রহমতের কারণে আনন্দিত হওয়ার আদেশ দিয়েছেন নিচের এই আয়াতটি উল্লেখ করার পর পরই-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُمْ مَّوْعِظَةً مِّنْ رَّبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ (3)
“হে লোকসকল, তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নসীহত এসে গেছে। এটি এমন জিনিস যা অন্তরের রোগের নিরাময় এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।”[৭৫২]
আল্লাহ তাআলার মেহেরবানি ও রহমতের চেয়ে অধিক যোগ্য কোনো বস্তু নেই, যা নিয়ে বান্দা আনন্দিত হতে পারে। কারণ তা নসীহত, সমস্ত আত্মিক রোগের ওষুধ, দয়া এবং হিদায়াতকে ধারণ করে। এই কারণে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ দুনিয়াবি যে ধনসম্পদ ও সম্মান অর্জন করে তার চেয়ে বহুগুণ উত্তম হলো তিনি বান্দাদের যে সমস্ত নিয়ামাত দান করেছেন সেগুলো। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো; নসীহত; যা উৎসাহমূলক ও ভীতিমূলক আদেশ-নিষেধ দ্বারা পরিপূর্ণ, আত্মিক রোগের ওষুধ; যা মূর্খতা, জুলুম, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, রাগ ইত্যাদি রোগগুলো দূর করে দেয়। আসলে অন্তরের রোগ শরীরের রোগের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ও যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু মানুষ তাতে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে এর ব্যথা অনুভব করে না। তবে এই দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার সময় মানুষ সেগুলোর ব্যথা ও যন্ত্রণার তীব্রতা উপলব্ধি করবে। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে দান করেছেন হৃদয় প্রশান্তকারী ও নিশ্চয়তা দানকারী হিদায়াত ও রহমত; যা সমস্ত কল্যাণের ধারক এবং সমস্ত অকল্যাণ ও অনিষ্ট দূরকারী।
তাই বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলার দেওয়া এই সমস্ত নিয়ামাতের কারণে আনন্দিত হওয়া উচিত। যে ব্যক্তি এর কারণে আনন্দিত হয়, সে আসলে সর্বশ্রেষ্ঠ বস্তু পাওয়ার কারণেই আনন্দিত হয়। দুনিয়ার প্রাচুর্যতা এর অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এতে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। কেননা এগুলো আরও বিপদ-মুসীবত ডেকে আনে; দুনিয়ার সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, আর অচিরেই তা ধ্বংস হয়ে যাবে; যেমন কেউ ঘুমের মধ্যে অনেক কিছু দেখে এবং জমা করতে থাকে; কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখে কিছুই নেই।
কুরআন মাজীদে الْفَرَحُ বা আনন্দের কথা দুইভাবে এসেছে: শর্তহীনভাবে এবং শর্তযুক্তভাবে।
শর্তহীনভাবে: আল্লাহ তাআলা এর নিন্দা করেছেন। যেমন: لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ "আনন্দের আতিশয্যে গর্ব করো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ গর্বকারীদের ভালোবাসেন না।” [৭৫৩]
শর্তযুক্তভাবে : এটি আবার দুই প্রকার:
এক. দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত আনন্দ; যা ব্যক্তিকে আল্লাহর ফযল, দয়া ও অনুগ্রহ ভুলিয়ে দেয়। এটি নিন্দনীয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُّبْلِسُوْنَ "অতঃপর তারা যখন ওই উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি তাদের সামনে সমৃদ্ধির সকল দরজা খুলে দিলাম। এমনকি তাদেরকে দেওয়া বিষয়াদির জন্য যখন তারা খুব আনন্দিত (গর্বিত) হয়ে পড়ল, তখন আমি তাদেরকে হঠাৎ পাকড়াও করলাম। ফলে তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল।”[৭৫৪]
দুই. যা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের সাথে সম্পৃক্ত। এটি আবার দুই প্রকার :
১. আল্লাহর মেহেরবানি ও রহমতের কারণে আনন্দিত হওয়া। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ “হে নবি, আপনি বলে দিন, এটি আল্লাহর মেহেরবানি এবং তার রহমত। সুতরাং এ জন্য তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। তারা যা কিছু জমা করছে সেসবের চেয়ে এটি অনেক ভালো।"[৭৫৫]
২. আল্লাহ তাআলা যা দান করেন, তার জন্য আনন্দিত হওয়া। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী,
فَرِحِيْنَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ
"আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তাতেই তারা আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত।”[৭৫৬]
সুতরাং আল্লাহ, তাঁর রাসূল, ঈমান, সুন্নাহ, ইলম, কুরআন-এই সব কারণে আনন্দিত হওয়া হলো আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ স্তর। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا مَا أُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ فَمِنْهُم مَّنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيْمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيْمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ )
"আর যখন কোনো সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, 'এর ফলে তোমাদের কার ঈমান বেড়ে গেছে?' আসলে যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং এতে তারা আনন্দিত হয়েছে।”[৭৫৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَالَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَفْرَحُوْنَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ
"এবং আমি আগে যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছিলাম, আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তারা তাতে আনন্দিত হয়।”[৭৫৮]
ইলম, ঈমান এবং সুন্নাহের কারণে আনন্দিত হওয়া-এটাই প্রমাণ করে যে, সেগুলোর প্রতি ব্যক্তির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে এবং সে অন্যান্য বস্তুর ওপর সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। কারণ কোনো বস্তুর প্রতি কারও আনন্দবোধ তখনই হয়, যখন সে সেগুলোকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে এবং সেগুলোর প্রতি আগ্রহ রাখে। তাই যার কোনো বস্তুর প্রতি আগ্রহ নেই, সে বস্তুর প্রাপ্তিতে তার কোনো আনন্দ থাকে না এবং এর অপ্রাপ্তিতে তার কোনো দুঃখবোধও হয় না।
আসলে আনন্দিত হওয়া ভালোবাসা ও আগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ।
(الْإِسْتِبْشَارُ كَ الْفَرَحُ -এ দুটি শব্দের অর্থই আনন্দিত হওয়া।) তবে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে:
الْفَرَحُ হলো : প্রিয় বস্তু অর্জিত হওয়ার পরে আনন্দিত হওয়া আর الإسْتِيْقارُ হলো: প্রিয় বস্তু অর্জিত হওয়ার আগে আনন্দিত হওয়া; যখন অর্জন হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত। এই কারণে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَرِحِينَ بِمَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِمْ مِّنْ خَلْفِهِمْ
"আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তাতেই তারা আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত। আর তাদের পরবর্তী যারা এখনো তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি, তাদের জন্যও তারা আনন্দিত হয়। "[৭৫৯]
الْفَرَحُ-এর মধ্যে পরিপূর্ণতার গুণ রয়েছে। এই কারণে আল্লাহ তাআলা আনন্দিত হওয়ার সর্বোচ্চ ও পূর্ণাঙ্গ রূপটিকে এর সাথে গুণান্বিত করে উল্লেখ করেছেন। যেমন: যে ব্যক্তি মরুভূমিতে নিজের খাদ্য-পানীয়সহ তার বাহন হারিয়ে ফেলে আর তা পাওয়ার আশা থেকে নিরাশ হয়ে যায়, অতঃপর সে যখন তার বাহন পেয়ে যায়; তখন তার খুশির চেয়ে তাওবাকারীর তাওবার কারণে আল্লাহ তাআলা বেশি খুশি হন। [৭৬০]
মূলকথা ফারাহ্ হলো: সর্বোচ্চ স্তরের আত্মিক আনন্দ, প্রফুল্লতা ও খুশি। আসলে আনন্দ ও প্রফুল্লতা হচ্ছে অন্তরের শান্তি আর দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি হচ্ছে অন্তরের শাস্তি। কোনো বস্তুতে আনন্দিত হওয়া তার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার চেয়েও বড়ো বিষয়। কেননা সন্তুষ্টি হলো নিশ্চিন্ততা ও স্থিরতা। আর ফারাহ হলো স্বাদ, আনন্দ ও প্রফুল্লতা। সুতরাং প্রতিটি আনন্দতেই রয়েছে সন্তুষ্টি। পক্ষান্তরে প্রতিটি সন্তুষ্টিতেই আনন্দ নেই। (অনেক সময় আনন্দ না থাকলেও বিভিন্ন কারণে সন্তুষ্ট হতে হয়।)
এই কারণে ফারাহ্ বা আনন্দের বিপরীত হলো হুযন বা দুশ্চিন্তা। আর সন্তুষ্টির বিপরীত হলো রাগ। দুশ্চিন্তা মানুষকে ব্যথা দেয়; কিন্তু রাগে মানুষ ব্যথিত হয় না। তবে যখন প্রতিশোধ নিতে অক্ষম হয়, তখন ব্যথা পায়। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
টিকাঃ
[৭৪৯] সূরা ইউনুস, ১০:৫৮।
[৭৫০] সূরা কাসাস, ২৮: ৮৬।
[৭৫১] আবুল মুযাফফার সামআনি, তাফসীর, ২/৩৯০।
[৭৫২] সূরা ইউনুস, ১০:৫৭।
[৭৫৩] সূরা কাসাস, ২৮: ৭৬।
[৭৫৪] সূরা আনআম, ৬:৪৪।
[৭৫৫] সূরা ইউনুস, ১০:৫৮।
[৭৫৬] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭০।
[৭৫৭] সূরা তাওবা, ৯: ১২৪।
[৭৫৮] সূরা রা'দ, ১৩: ৩৬।
[৭৫৯] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭০।
[৭৬০] মুসলিম, ২৭৪৪।