📄 মানযিল : নিশ্চিন্ততা (اَلطُّمَأْنِينَةُ)
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ (*)
"তারা এমন লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিক্র দ্বারা নিশ্চিন্ত হয়েছে। আর জেনে রেখো, কেবল আল্লাহর যিক্র দ্বারাই অন্তরসমূহ নিশ্চিন্ত হয়।”[৭০৩]
الظمَأْنِينَةُ হলো : কোনো বস্তুর প্রতি অন্তর প্রশান্ত হওয়া এবং অস্থির ও পেরেশান না হওয়া। এ অর্থেই প্রসিদ্ধ একটি হাদীসে এসেছে,
الصِّدْقَ طُمَأْنِينَةُ وَالْكَذِبَ رِيبَةٌ
"সত্য হলো নিশ্চিন্ততা আর মিথ্যা হলো দ্বিধাগ্রস্ততা।”[৭০৪]
অর্থাৎ সত্য শ্রবণে শ্রোতার অন্তর নিশ্চিন্ত হয় এবং প্রশান্তি অনুভব করে। আর মিথ্যা অস্থিরতা ও সংশয় সৃষ্টি করে। যেমন রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
الْبِرُّ مَا اطْمَأَنَّ إِلَيْهِ الْقَلْبُ
"সৎকাজ হলো, যার প্রতি অন্তর নিশ্চিন্ত হয়।”[৭০৫]
অর্থাৎ এর প্রতি শান্তি খুঁজে পায় এবং সব ধরনের খটকা, অস্থিরতা ও দ্বিধা দূর হয়ে যায়।
ওপরে বর্ণিত আয়াতে (ذکر الله )আল্লাহর যিক্স)-এর দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে:
১. এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বান্দা তার রবকে স্মরণ করবে। কারণ আল্লাহর যিকরের মাধ্যমে অন্তর নিশ্চিন্ত হয় এবং শান্তি পায়। সুতরাং অন্তর যখন অস্থির ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে, তখন সে আল্লাহর যিক্ ছাড়া আর কোথাও শান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পাবে না।
২. এখানে 'আল্লাহর যিক্র' দ্বারা 'কুরআন' কে বুঝানো হয়েছে। এটি হলো আল্লাহর যিক্র, যা তিনি তাঁর রাসূলের ওপর অবতীর্ণ করেছেন। কুরআনের মাধ্যমে মুমিনের অন্তর নিশ্চিন্ততা লাভ করে। কেননা অন্তর কেবল ঈমান ও ইয়াকীনের দ্বারাই নিশ্চিন্ত হয়; আর কুরআন ছাড়া ঈমান ও ইয়াকীন অর্জনের আর কোনো পথ নেই। সুতরাং অন্তরের সুকূন ও নিশ্চিন্ততা আসে এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থেকে আর অন্তরের অস্থিরতা ও উদ্বেগ আসে এর প্রতি দ্বিধা ও সংশয় থেকে। কুরআন দৃঢ়তা অর্জনের স্থান, দ্বিধা ও সন্দেহ থেকে বান্দাকে রক্ষা করে। সুতরাং মুমিনের অন্তর কেবল কুরআনের মাধ্যমেই নিশ্চিন্ততা ও প্রশান্তি লাভ করে।
এই ব্যাখ্যাটিই হলো অধিক পছন্দনীয়।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের হৃদয়ে নিশ্চিন্ততা ও প্রশান্তি নিহিত রেখেছেন আর নিশ্চিন্ত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ ও খোশখবর দিয়েছেন। সুতরাং তাদের জন্য সুখবর ও সর্বোত্তম ঠিকানা!
يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ
“হে নিশ্চিন্ত আত্মা, তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও।”[৭০৬]
আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে প্রমাণ রয়েছে যে, আত্মাসমূহ তাঁর নিকট কেবল নিশ্চিন্ত হয়েই ফিরে যাবে। প্রশান্ত আত্মার অধিকারী ব্যক্তিরা তাঁর নৈকট্যশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। সালাফদের দুআর মধ্যে এটিও ছিল যে,
اللَّهُمَّ هَبْ لِي نَفْسًا مُطْمَئِنَّةً إِلَيْكَ 'হে আল্লাহ, আমাকে আপনার প্রতি প্রশান্ত ও নিশ্চিন্ত আত্মা দান করুন।'
আমার মনে হয় الشكية আর الظُّمَأْنِينَهُ এর মধ্যে দুটি পার্থক্য রয়েছে:
১ নং পার্থক্য: সাকীনা বা প্রশান্তি হলো সেই ব্যক্তির ন্যায়, যে শক্তিশালী কোনো শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে, যে তাকে ধ্বংস করে দিতে চায়। এমন অবস্থায় সে তার শত্রু থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, ফলে তার অন্তর শান্তি ও স্বস্তি লাভ করে। আর তুমা'নীনা বা নিশ্চিন্ততা হলো একটি দুর্গের ন্যায়, যা সে উন্মুক্ত অবস্থায় পায়, ফলে তাতে প্রবেশ করে এবং নিরাপদ হয়ে যায়। অতঃপর সেখানে সে তার সাথিসঙ্গী ও আসবাবপত্রের সমাবেশে শক্তিশালী হয়। সুতরাং অন্তরের তিনটি অবস্থা :
১. নিজের সাথে সংঘটিত কোনো ঘটনায় ভয় পাওয়া, অস্থির হওয়া ও পেরেশান হওয়া,
২. সেই ঘটনা দূর হয়ে যাওয়া এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু না ঘটা আর
৩. সংঘটিত ঘটনাটি যে কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল, সেই কাজে সফল হওয়া।
আসলে সাকীনা ও তুমা'নীনা একটি অপরটিকে আবশ্যক করে এবং পরস্পরকে যুক্ত রাখে। নিশ্চিন্ততা প্রশান্তিকে আবশ্যক করে, কখনো বিচ্ছিন্ন হতে দেয় না। এমনিভাবে প্রশান্তিও নিশ্চিন্ততাকে আবশ্যক করে, কখনো পৃথক হতে দেয় না। তবে নিশ্চিন্ততার কারণে প্রশান্তি পাওয়া শক্তিশালী হয়।
২ নং পার্থক্য: নিশ্চিন্ততা বা তুমা'নীনা হলো ব্যাপক। এটি ইলম ও ইয়াকীনের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে। এ কারণেই অন্তরসমূহ কুরআনের মাধ্যমে নিশ্চিন্ত হয়। কেননা কুরআনের মাধ্যমে ঈমান, ইয়াকীন, মা'রিফাত এবং বিভিন্ন পথের সঠিক দিকনির্দেশনা অর্জন করা যায়। কুরআনের মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান হয় এবং এর মাধ্যমেই সব সংশয়, সন্দেহ ও দ্বিধা দূর হয়ে যায়।
আর প্রশান্তি বা সাকীনা হলো ভয়ের সময় অন্তর স্থির থাকা এবং উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা দূর হওয়া। যেমন যুদ্ধের ময়দানে কাফিরদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সৈনিক মুজাহিদগণ তা লাভ করে থাকেন। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
টিকাঃ
[৭০৩] সূরা রা'দ, ১৩: ২৮।
[৭০৪] তিরমিযি, ২৫১৮; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৭২৩।
[৭০৫] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৮০০১।
[৭০৬] সূরা ফাজর, ২৭-২৮।
📄 মানযিল : আত্মসমালোচনা (اَلْغَيْرَةُ)
আল্লাহ তাআলা বলেন, قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
“আপনি বলে দিন, আল্লাহ যেসব জিনিস হারাম করেছেন, তা হচ্ছে: প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা...”[৭২৮]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল বলেছেন,
لَا أَحَدَ أَغْيَرُ مِنَ اللَّهِ وَلِذَلِكَ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْمَدْحُ مِنَ اللَّهِ وَلِذَلِكَ مَدَحَ نَفْسَهُ وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعُذْرُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ أَنْزَلَ الْكِتَابَ، وَأَرْسَلَ الرُّسُلَ
* আল্লাহর চেয়ে অধিক আত্মমর্যাদার অধিকারী আর কেউ নেই; এ জন্য তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করেছেন。
* আল্লাহর চেয়ে প্রশংসাপ্রিয় আর কেউ নেই; এ কারণে তিনি নিজেই নিজের প্রশংসা করেছেন。
* আল্লাহর চেয়ে ওজর কবুলকারী আর কেউ নেই; যার ফলে তিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং রাসূল প্রেরণ করেছেন।”[৭২৯]
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَغَارُ وَإِنَّ الْمُؤْمِنَ يَغَارُ وَغَيْرَةُ اللَّهِ أَنْ يَأْتِيَ الْمُؤْمِنُ مَا حَرَّمَ عَلَيْهِ
"আল্লাহ তাআলা আত্মমর্যাদা উপলব্ধি করেন এবং মুমিনরাও আত্মমর্যাদা উপলব্ধি করেন। বান্দার ওপর আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন, বান্দা যখন তাতে লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত আসে।"[৭৩০]
'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এ আরও এসেছে, নবি বলেছেন,
أَتَعْجَبُوْنَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنَي
"তোমরা কি সা'দ (ইবনু উবাদা)-এর আত্মমর্যাদাবোধ দেখে আশ্চর্য হচ্ছো? আমি ওর থেকেও অধিক আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। আর আল্লাহ তাআলা আমার থেকেও অধিক আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী!”[৭৩১]
নিম্নের আয়াতটি আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে:
وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مَّسْتُوْرًا
"আর যখন আপনি কুরআন পাঠ করেন, তখন আপনার মাঝে ও যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মাঝে আমি একটি অদৃশ্য পর্দা স্থাপন করি।"[৭৩২]
সারি সাকাতি তার সাথিদের বলেছেন, 'তোমরা কি জানো সেই অদৃশ্য পর্দাটি কী? আত্মসম্মানবোধের পর্দা। আল্লাহর চেয়ে অধিক আত্মসম্মানবোধের অধিকারী আর কেউ নেই। আল্লাহ তাঁর কালাম বোঝার যোগ্যতা, তাঁর পরিচয়, তাওহীদ ও তাঁকে ভালোবাসার উপযুক্ততা কাফিরদের দান করেননি। ফলে তাদের মাঝে ও তাঁর রাসূল, কালাম ও তাওহীদের মাঝে একটি অদৃশ্য পর্দা স্থাপন করে দিয়েছেন।
আসলে অযোগ্যরা তা পেয়ে যাবে, এই বিষয়টি তাঁর আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে। ১৭০০। আত্মসম্মানবোধের মানযিল হলো অনেক সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ একটি মানযিল। কিন্তু পরবর্তী যুগের কিছু নামধারী সূফি এর বিষয়বস্তুকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে। তারা নিজেরা নতুন একটি বাতিল মাযহাব তৈরি করে নিয়েছে। তারাও এর নাম দিয়েছে 'আত্মসম্মানবোধ' (الْغَيْرَةُ)। অতঃপর অপাত্রে ও ভিন্ন স্থানে তা প্রয়োগ করেছে। তারা বিষয়টি বুঝতে না পেরে বিরাট তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। শীঘ্রই আপনি তা দেখতে পাবেন।
আত্মসম্মানবোধ বা গাইরত দুই ধরনের:
১. কোনো বস্তুর কারণে আত্মসম্মানবোধ (الْغَيْرَةُ مِنَ الشَّيْءِ) এবং
২. কোনো বস্তুর ওপর আত্মসম্মানবোধ (الْغَيْرَةُ عَلَى الشَّيْءِ)।
১. কোনো বস্তুর কারণে আত্মসম্মানবোধ: এটি হলো আপনার ভালোবাসার বস্তুতে অন্যের শরীকানা ও ভিড়কে অপছন্দ করা।
২. কোনো বস্তুর ওপর আত্মসম্মানবোধ: ভালোবাসার বস্তুকে একাই পেতে চাওয়ার প্রচণ্ড লোভ। অন্য কেউ যাতে তাতে অংশীদার না হয় এবং ভাগ না বসায়, তা কামনা করা।
গাইরাতের আরও একটি প্রকার রয়েছে: বান্দার নিজের নফস থেকে নফসের ওপর গাইরাত বা আত্মসম্মানবোধ; যেমন: তার নফস থেকে তার কল্বের ওপর গাইরাত, তার বিচ্ছিন্নতা থেকে তার স্থির থাকার ওপর গাইরাত, তার উপেক্ষা করা থেকে তার উদ্যমী হওয়ার ওপর গাইরাত, তার মন্দ স্বভাব থেকে তার প্রশংসনীয় স্বভাবের ওপর গাইরাত। (অর্থাৎ উত্তম বিষয়গুলো অর্জন করার জন্য আত্মসম্মানবোধ বা গাইরাত থাকা।) এই প্রকার আত্মসম্মানবোধ হলো সম্মানিত ও পবিত্র নফসের বৈশিষ্ট্য। নীচু ও নিম্ন স্বভাবের নফসের জন্য এতে কোনো অংশ নেই। নফসের পবিত্রতা ও সুউচ্চ হিম্মতের পরিমাণ অনুসারে এই আত্মসম্মানবোধ অর্জিত হয়।
আত্মসম্মানবোধের আরও দুটি প্রকার রয়েছে:
১. বান্দার ওপর আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ এবং
২. আল্লাহর জন্য বান্দার আত্মসম্মানবোধ, আল্লাহর ওপরে আত্মসম্মানবোধ নয়।
১. বান্দার ওপর আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ: এটি হলো আল্লাহ তাআলা তাকে অন্য কোনো সৃষ্টির গোলাম বানাবেন না; বরং তাকে কেবল নিজের জন্যই গোলাম হিসেবে গ্রহণ করবেন। এতে কাউকে অংশীদার করবেন না। তাকে শুধু নিজের জন্যই বেছে নেবেন। এটি এই দুই প্রকারের মধ্যে উঁচু স্তরের আত্মসম্মানবোধ।
২. আল্লাহর জন্য বান্দার আত্মসম্মানবোধ: এটি আবার দুই প্রকার: নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ এবং অপরের সাথে আত্মসম্মানবোধ।
বান্দার নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ হলো: বান্দা তার কাজকর্ম, কথাবার্তা, অবস্থা, সময়, শ্বাসপ্রশ্বাস মোটকথা তার ছোটোবড়ো সবকিছু একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই নিবেদন করবে। আল্লাহ ব্যতীত আর কারও জন্য নয়।
আর অপরের সাথে আত্মসম্মানবোধ হলো: কেউ যখন তাকে অন্যায়-অপকর্ম ও হারামে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করবে, তার হকসমূহের ব্যাপারে অবহেলা করবে এবং তা নষ্ট করবে, তখন এ বিষয়গুলো তাকে রাগান্বিত করে তুলবে এবং তার ক্রোধ বাড়িয়ে দেবে।
অপরদিকে আল্লাহ তাআলার ওপর আত্মসম্মানবোধ দেখানো হলো সবচেয়ে বড়ো মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতা। যারা এ আচরণ করে, তারা সবচেয়ে বড়ো মূর্খ এবং চরম বিভ্রান্ত। কখনো কখনো এটি ব্যক্তিকে আল্লাহর সাথে শত্রুতার দিকে ঠেলে দেয়; অথচ সে তা টেরই পায় না। কখনো কখনো মূল দ্বীন ও ইসলাম থেকেই বের করে দেয়। এরা আল্লাহর-পথের-পথিকদের পথচলায় বিঘ্নতা সৃষ্টি করে। এ পথের চোর-ডাকাতের চেয়ে এরা ক্ষতিকর হয়। এরাই প্রকৃত পথরোধকারী। আল্লাহর জন্য যারা আত্মসম্মানবোধ করেন, তাদের সাথে এদের কত পার্থক্য! তারা আল্লাহর জন্য নিজের কাজকর্ম, কথাবার্তা, আচার-আচরণ সবকিছু উৎসর্গ করে দেয়। জ্ঞানীরা আল্লাহর জন্য আত্মসম্মানবোধ করে আর মূর্খরা আল্লাহর ওপর আত্মসম্মানবোধ করে। সুতরাং এটা বলা যাবে না যে, أَنَا أَغَارُ عَلَى اللهِ 'আমি আল্লাহর ওপর আত্মসম্মানবোধ করি।' বরং বলতে হবে أَنَا أَغَارُ لِلهِ 'আমি আল্লাহর জন্য আত্মসম্মানবোধ করি।'
বান্দার নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ অপরের সাথে আত্মসম্মানবোধের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনি যখন আপনার নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ উপলব্ধি করবেন, তখন অপরের সাথে আল্লাহর জন্য আপনার আত্মসম্মানবোধও সঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি যখন নিজেকে বাদ দিয়ে অপরের সাথে আত্মসম্মানী হয়ে উঠবেন, তখন নিশ্চিতভাবেই আপনার আত্মসম্মানবোধ অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত হবে। সুতরাং এটা নিয়ে ভাবুন এবং এর প্রতি সূক্ষ্মদৃষ্টি নিবদ্ধ রাখুন।
এই স্তরের এই কথাগুলো নিয়ে বুদ্ধিমান পথিকদের চিন্তাভাবনা করা উচিত। কারণ এখানে এসে অধিকাংশ পথিকেরই পা পিছলে যায়। আল্লাহ তাআলাই সঠিক পথ দেখান, পথ চলার তাওফীক দেন আর তিনিই তাতে সুদৃঢ় রাখেন।
যেমন (তথাকথিত) এক প্রসিদ্ধ সুফি বলেছেন, 'আমি ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পাই না; যতক্ষণ-না আল্লাহর যিক্র করছে এমন কাউকে দেখি।' এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হলো সে ব্যতীত অন্যান্য গাফিলদের মধ্যে কাউকে যিক্র করতে দেখা। এর চেয়েও আশ্চর্যের হলো এটাকে তার বুজুর্গি ও শ্রেষ্ঠত্ব বলে গণ্য করা হয়!
আরেকজন বলেছেন, 'আমি আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করতে এবং তাঁকে দেখতে পছন্দ করি না।' তাকে বলা হলো, 'কেন?' তিনি জবাব দেন, 'আল্লাহর ওপর আত্মসম্মানবোধের কারণে; আমার মতো ব্যক্তি তাঁকে দেখবে?!'
এটি হলো মন্দ ও নিকৃষ্ট পর্যায়ের আত্মসম্মানবোধ। যা ব্যক্তির মূর্খতার প্রতিই ইঙ্গিত করে। যদিও সে নিজেকে ছোটো মনে করা, বিনয়, নম্রতা, অক্ষমতা ও অপদস্থতার গুণে গুণান্বিত থাকে।
টিকাঃ
[৭২৮] সূরা আ'রাফ, ৭: ৩৩।
[৭২৯] বুখারি, ৪৬৩৪; মুসলিম, ২৭৬০।
[৭৩০] বুখারি, ৫২২৩; মুসলিম, ২৭৬১।
[৭৩১] বুখারি, ৬৮৪৬; মুসলিম, ১৪৯৯।
[৭৩২] সূরা ইসরা, ১৭:৪৫।
[৭৩৩] ইবনু তাইমিয়্যা, আল-ইসতিকামাহ, ২/৪৫।
📄 মানযিল : আগ্রহ (اَلشَّوْقُ)
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
مَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ اللَّهِ فَإِنَّ أَجَلَ اللَّهِ لَآتٍ "আল্লাহর সাথে যে সাক্ষাতের আশা করে (তার জানা উচিত), আল্লাহর নির্ধারিত সময় আসবেই।"[৭৩৪]
বলা হয়েছে: এই আয়াতটি তাদের জন্য সুখবর ও সান্ত্বনা, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ পেতে আগ্রহী। অর্থাৎ আমি জানি যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে, তারা আমার প্রতি প্রবল আগ্রহী। তবে আমি এর জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে রেখেছি; অচিরেই তার আগমন ঘটবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। যা কিছুর আগমন ঘটবে, তা তো নিকটবর্তীই।
নবি তাঁর দুআয় বলতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ لَذَةَ النَّظْرِ إِلَى وَجْهِكَ، وَالشَّوْقَ إِلَى لِقَائِكَ “হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট আপনার চেহারার দিকে তাকানোর স্বাদ এবং আপনার সাক্ষাতের আগ্রহ প্রার্থনা করছি।”[৭৩৫]
আগ্রহ (الشوق) হলো: মহব্বতের প্রভাব ও বহিঃপ্রকাশ। কারণ প্রিয় মানুষের প্রতি অন্তর সবসময়ই ধাবিত হয়।
কেউ কেউ বলেছেন, 'আগ্রহ হলো: অন্তরকে প্রিয় মানুষের সাক্ষাতের জন্য উদ্বুদ্ধ করে তোলা।'
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, 'আমি সারি সাকাতি -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'শাওক (আগ্রহ) হলো আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি মানযিল। কেউ যখন আগ্রহের মানযিলে পৌঁছে যায়, তখন সে তার আগ্রহের বিষয় ব্যতীত সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে চলে। ১০৯। এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, জান্নাতের অধিবাসীরা আল্লাহ তাআলার দর্শন ও নৈকট্য লাভ করা সত্ত্বেও প্রতি মুহূর্তে তাঁর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
আগ্রহের দুটি স্তর রয়েছে: ১. ইবাদাতকারীর জান্নাতের আগ্রহ এবং ২. আল্লাহ তাআলার প্রতি আগ্রহ। তবে এটি জান্নাতের প্রতি আগ্রহ থাকার বিপরীত নয়। কেননা জান্নাতের সর্বোত্তম নিয়ামাত হলো আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করা, তাঁর দর্শন পাওয়া, তাঁর কথা শ্রবণ করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করা।
টিকাঃ
[৭৩৪] সূরা আনকাবুত, ২৯ : ৫।
[৭৩৫] নাসাঈ, ১৩০৫।
[৭৩৬] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৪৯৯।
📄 মানযিল : স্বাদ আস্বাদন করা (اَلذَّوْقُ)
স্বাদ (الذَّوْقُ) : এটি হলো পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় বস্তুসমূহকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করা। কুরআনের ভাষা ও আরবদের ভাষা অনুযায়ী স্বাদ (الذَّوْقُ) শুধু মুখ দ্বারা অনুভব করার সাথেই সীমাবদ্ধ নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُوْنَ
“অতএব এখন তোমরা তোমাদের কুফরির বিনিময়স্বরূপ আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো।”[৭৩৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ
“ফলে আল্লাহ ক্ষুধা ও ভীতির পোশাকে তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করালেন।”[৭৩৮]
চিন্তা করুন—আল্লাহ তাআলা কীভাবে স্বাদ আস্বাদন করা ও পোশাকের বিষয়টি একসাথে উল্লেখ করেছেন; এটি বোঝানোর জন্য যে, তিনি তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করিয়েছেন দ্রুত ও পরিপূর্ণভাবে। সুতরাং আয়াতটি স্বাদ আস্বাদনের কথা উল্লেখ করে এই সংবাদ দিচ্ছে যে, শাস্তিটি কোনো রকম বিলম্ব ছাড়া দ্রুতই দেওয়া হয়েছিল। কেননা মানুষ কখনো কখনো দেরিতেও ভয় পায়, তাৎক্ষণিকভাবে ভয় পায় না। (স্বাদ যেমন খাওয়ার সাথে সাথেই অনুভূত হয়, তেমনি তাদেরকে ভীতির শাস্তি দ্রুতই দেওয়া হয়েছিল।) আর পোশাকের কথা উল্লেখ করে এই সংবাদ দিচ্ছে যে, শাস্তিটি ছিল পরিপূর্ণভাবে বেষ্টনকারী। যেমন পোশাক শরীরকে সম্পূর্ণরূপে বেষ্টন করে নেয়।
'সহীহ মুসলিম'-এ এসেছে, নবি বলেছেন,
ذَاقَ طَعْمَ الإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا
"সেই ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে, যে রব হিসেবে আল্লাহকে, দ্বীন হিসেবে ইসলামকে এবং রাসূল হিসেবে মুহাম্মাদ-কে পেয়ে সন্তুষ্ট।”[৭৩৯]
নবি জানিয়েছেন যে, ঈমানেরও স্বাদ রয়েছে আর অন্তর তা আস্বাদন করে। যেমন মুখ খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ আস্বাদন করে।
নবি ঈমান ও ইহসানের হাকীকত উপলব্ধি করাকে এবং অন্তরে তা অর্জিত হওয়াকে কখনো স্বাদের মাধ্যমে, কখনো খাবার-পানীয়ের মাধ্যমে আবার কখনো মিষ্টতা অনুভূত হবে বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন ওপরে বর্ণিত হাদীসে আমরা দেখেছি। এমনিভাবে তিনি বলেছেন,
ثَلَاثَ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الإِيْمَانِ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ
“তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করতে পারে- ১. তার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য সব কিছু থেকে প্রিয় হওয়া, ২. কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা এবং ৩. কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপছন্দ।
করা।"[৭৪০]
রাসূলুল্লাহ সাহাবায়ে কেরাম-কে ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করতে যখন নিষেধ করেছিলেন, তখন তারা জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আপনি তো ধারাবাহিকভাবেই পালন করেন?' নবি তখন জবাব দিয়েছিলেন,
إِنِّي لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ إِنِّي أُطْعَمُ وَأُسْقَى
"আমার অবস্থা তোমাদের মতো নয়, আমাকে আহার করানো হয় এবং পানও করানো হয়।”
অপর এক বর্ণনায় এসেছে,
إِنِّي أَبِيْتُ يُطْعِمُنِي رَبِّي وَيَسْقِينِي
"আমি এমন অবস্থায় রাত্রিযাপন করি যে, আমার রব আমাকে খাওয়ান এবং পান করান।”[৭৪১]
যারা ধারণা করে যে, এই খাবার খাওয়ানো এবং পান করানো বস্তুগত খাদ্য ও পানীয়; যা মুখ দিয়ে খাওয়া হয়, তাদের বোধশক্তিতে মোটা পর্দা পড়েছে। তারা যেমন ধারণা করে বিষয়টি যদি এমনই হতো, তা হলে তো নবি সাওম পালনকারীই সাব্যস্ত হবেন না; ধারাবাহিকভাবে তা পালন করা তো দূরের কথা। যখন নবি সাহাবিদের জবাব দিয়েছেন যে, "আমি তোমাদের মতো নই।” তখন তাঁর মাঝে- ও তাদের মাঝে পার্থক্যটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁকে পানাহার করানো হয়। যদি নবি তাঁর পবিত্র মুখ দিয়েই পানাহার করতেন, তা হলে তিনি সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে বলতেন, 'আমিও ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করি না।' সুতরাং যখন 'আপনি তো ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করেন?'- তাদের এই প্রশ্নকে তিনি সমর্থন করেছেন, তখন বোঝা যায় যে, নবি-ও খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকতেন। তাঁর জন্য আল্লাহর-দেওয়া আত্মিক-পানাহারই যথেষ্ট ছিল; যা তাঁকে বাহ্যিক পানাহার থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছিল।
এই স্বাদ গ্রহণের বিষয়টির মাধ্যমে রোম সম্রাট হিরাকূল নুবুওয়াতের বিশুদ্ধতার ওপরে প্রমাণ পেশ করেছিলেন; তিনি আবূ সুফইয়ানকে বলেছিলেন, 'তাদের কেউ কি তাঁর দ্বীনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে তা থেকে ফিরে যায়?' আবূ সুফইয়ান উত্তর দিয়েছিলেন, 'না'। তখন তিনি বলেছিলেন, 'ঈমান এমনই; যখন তার মিষ্টতা ও স্বাদ অন্তরের সাথে মিশে যায়। (তখন আর কেউ তা থেকে ফিরে যায় না।) '[৭৪২]
রোম সম্রাট হিরাকূল নবি ﷺ-এর অনুসারীদের জন্য ঈমানের যে স্বাদ অনুভূত হয়, তার দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন যে, তা হলো নুবুওয়াত ও রিসালাতের দাবি; বাদশাহি ও রাজত্ব লাভের দাবি নয়। আসলে ঈমানের স্বাদ যখন কোনো অন্তরের সাথে মিশে যায়, তখন সে অন্তর আর কখনো ঈমান থেকে বিমুখ হয় না।
মূলকথা হলো: অন্তর ঈমান ও ইহসানের মিষ্টতা অনুভব করে। ঠিক যেমন মুখ বস্তুগত খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ অনুভব করে থাকে। ঈমানের স্বাদ ও মিষ্টতা আস্বাদন করার পূর্ব পর্যন্ত অন্তরে সংশয় ও সন্দেহ আসতেই থাকে। কিন্তু যখন তা অর্জিত হয়, তখন সব সংশয় দূর হয়ে যায়। ঈমানের স্বাদ অন্তরের সাথে মিশে গেলে, ব্যক্তি প্রতিটি আমলেই আনন্দ ও মিষ্টতা অনুভব করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দিন।
টিকাঃ
[৭৩৭] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১০৬।
[৭৩৮] সূরা নাহল, ১৬: ১১২।
[৭৩৯] মুসলিম, ৩৪।
[৭৪০] বুখারি, ১৬; মুসলিম, ৪৩।
[৭৪১] বুখারি, ১৯৬২, ১৯৬৪, ১৯৬৬; মুসলিম, ১১০২-১১০৫।
[৭৪২] বিস্তারিত দেখুন, বুখারি, ৭।