📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : অন্তর্দৃষ্টি বা বিচক্ষণতা (اَلْبَصِيرَةُ)

📄 মানযিল : অন্তর্দৃষ্টি বা বিচক্ষণতা (اَلْبَصِيرَةُ)


আল্লাহ তাআলা বলেছেন, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْمُتَوَسِّمِينَ "নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।”[৬৯১]
এই আয়াতের তাফসীরে মুজাহিদ বলেছেন, 'এটি হলো অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য।' আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেছেন, 'পর্যবেক্ষণকারীদের জন্য।' কাতাদা বলেছেন, 'শিক্ষাগ্রহণকারীদের জন্য।' মুকাতিল বলেছেন, 'চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য।'
এই অভিমতগুলোর মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। কারণ পর্যবেক্ষণকারীরা যখন অস্বীকারকারীদের ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি ও তাদের পরিণাম পর্যবেক্ষণ করবে, তখন তাদের মাঝে অন্তর্দৃষ্টি, চিন্তাশক্তি ও শিক্ষাগ্রহণের ক্ষমতা তৈরি হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের ব্যাপারে বলেছেন, وَلَوْ نَشَاءُ لَأَرَيْنَاكَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُم بِسِيمَاهُمْ وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ "আমি ইচ্ছা করলে তাদেরকে চাক্ষুষ দেখিয়ে দিতাম, তখন আপনি তাদের চেহারা দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন। তবে তাদের বাচনভঙ্গি থেকে আপনি তাদেরকে অবশ্যই চিনে ফেলবেন। আল্লাহ তোমাদের সব আমল ভালো করেই জানেন।”[৬৯২]
এখানে প্রথমটি হলো দেখা ও চোখের ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা আর দ্বিতীয়টি কান ও শোনার ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা।
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, তাদের বাচনভঙ্গি দ্বারাই তাদের চেনা যাবে। কারণ কোনো ব্যক্তির চেহারা ও অন্যান্য আলামত দেখে তাকে যতটা চেনা যায়, তার কথা শুনে তাকে এর চেয়েও বেশি চেনা যায়, তার মনের অবস্থা সম্পর্কে আরও বেশি জানা যায়। কেননা বক্তার উদ্দেশ্য ও তার মনের ইচ্ছা অন্যান্য আলামতের তুলনায় তার কথার দ্বারা বেশি প্রকাশিত হয়। অন্তর্দৃষ্টি বা ফিরাসাতের সম্পর্ক দুটি বস্তুর সাথে দেখা ও শোনা। আবূ সাঈদ খুদূদ্রি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি বলেছেন,
اتَّقُوْا فِرَاسَةَ الْمُؤْمِنِ فَإِنَّهُ يَنْظُرُ بِنُورِ اللَّهِ
"তোমরা মুমিনের অন্তর্দৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকো। কারণ সে আল্লাহর নূরের সাহায্যে দেখে।"
এরপর নবি তিলাওয়াত করলেন,
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْمُتَوَسِّمِينَ )
"নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।” (সূরা হিজর, ১৫: ৭৫)[৬৯৩]
অন্তর্দৃষ্টি (الْفِرَاسَةُ) তিন প্রকার: ১. ঈমানি অন্তর্দৃষ্টি (الْفِرَاسَةُ الْإِيْمَانِيَّةُ) ২. সাধনা, ক্ষুধা, রাত্রিজাগরণ ও নির্জনতা যাপনের মাধ্যমে অর্জিত অন্তর্দৃষ্টি (فِرَاسَةُ الرِّيَاضَةِ وَالْجُوعِ وَالسَّهَرِ وَالتَّخَلِّيَّةِ) ৩. সৃষ্টিগত অন্তর্দৃষ্টি (الْفِرَاسَةُ الْخَلْقِيَّةُ)
১. ঈমানি অন্তর্দৃষ্টি: এই মানযিলে এ প্রকারের অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করাই উদ্দেশ্য।
ঈমানি অন্তর্দৃষ্টি এমন নূর, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তরে দান করেন। এর সাহায্যে বান্দা হক-নাহক ও সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্য করতে পারে।
এর তাৎপর্য হলো: এটি অন্তরে এমন চিন্তাভাবনার উদয় করে, যা ঈমানের বিপরীত বিষয়াদিকে আক্রমণ করে দূর করে দেয়। (ঈমানের বিপরীত বিষয়গুলো দূর করতে) তা অন্তরে এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেমন সিংহ তার শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এই প্রকারের অন্তর্দৃষ্টি ঈমানি শক্তি অনুসারে হয়ে থাকে। যার ঈমানি শক্তি যত বেশি, তার দূরদর্শিতাও তত তীক্ষ্ণ ও শক্তিশালী।
আবূ সাঈদ খাররায বলেছেন, 'যে ব্যক্তি অন্তর্দৃষ্টির আলোয় দেখে, সে আসলে আল্লাহর দেওয়া নূর দিয়েই দেখে। কোনো প্রকার ভুলভ্রান্তি ও গাফলত ছাড়াই তার জ্ঞানের উৎস হয় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। বরং তখন আল্লাহ তাআলার ফায়সালা তাঁর বান্দার জবান দিয়ে প্রকাশ পায়।' [৬৯৪]
ওয়াসিতি বলেছেন, 'ফিরাসাত হলো আলোর কিছু টুকরো, যা অন্তরকে আলোকিত করে তোলে, অদৃশ্য জগতের গোপন রহস্যাবলি অন্তরে উদ্ভাসিত করে। এমনকি বান্দা সবকিছু چাক্ষুষ দেখতে পায়; যেন আল্লাহ তাআলাই তাকে দেখাচ্ছেন। ফলে সে সৃষ্টিজগতের রহস্য সম্পর্কে কথা বলতে থাকে।' [৬৯৫]
দারানি বলেছেন, 'অন্তর্দৃষ্টি বা ফিরাসাত হলো অন্তর উদ্ভাসিত হওয়া এবং গোপন বিষয়াবলি দেখতে পাওয়া। এটি হলো ঈমানের স্তরসমূহের মধ্যে একটি স্তর।'[৬৯৬]
আবূ বকর ছিলেন এই উম্মাতের সবচেয়ে বড়ো বিচক্ষণ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি। তারপরে উমর ইবনুল খাত্তাব। উমর -এর অন্তর্দৃষ্টির কথা তো খুবই প্রসিদ্ধ। তিনি কোনোকিছু সম্পর্কে বলতেন, 'এ ব্যাপারে আমি এই ধারণা করি।' পরে দেখা যেত তিনি যেরকম বলেছেন, ঠিক সেরকমই ঘটেছে। তার ফিরাসাতের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, অনেক জায়গায় আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্তের সাথে তার সিদ্ধান্ত মিলে গিয়েছে।
একবার উমর -এর পাশ দিয়ে সাওয়াদ ইবনু কারিব যাচ্ছিলেন। তখন উমর তাকে চিনতেন না। উমর বললেন, 'আমার ধারণা ভুলও হতে পারে, তবে আমার মনে হয়, এই লোকটি গণক ছিল অথবা জাহিলি যুগে গণকবিদ্যায় পারদর্শী ছিল।' সাওয়াদ ইবনু কারিব যখন তার সামনে বসলেন, তখন তিনি তাকে সে কথাগুলো জানালেন। প্রতিউত্তরে তিনি বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি আমাকে যেভাবে সম্বোধন করলেন এর আগে আপনার সাথিসঙ্গীদের কেউই আমাকে এভাবে সম্বোধন করেনি।' উমর বললেন, 'আমরা তো জাহিলি যুগে এর চেয়েও বেশি ছিলাম। বরং আপনাকে যা জিজ্ঞেস করলাম, সে সম্পর্কে বলুন।' তিনি বলেন, 'আমীরুল মুমিনীন, আপনি সত্য বলেছেন। জাহিলি যুগে আমি গণক ছিলাম।' এরপর তিনি তার পুরা কাহিনি বর্ণনা করতে শুরু করেন।[৬৯৭]
২. সাধনা, ক্ষুধা, রাত্রিজাগরণ ও নির্জনতা যাপনের মাধ্যমে অর্জিত অন্তর্দৃষ্টি : মানুষের অন্তর যখন সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত হয়, তখন তাতে সে অনুপাতে অন্তর্দৃষ্টি ও বিচক্ষণতা আসে। এটি মুমিন-কাফির সবার জন্যই উন্মুক্ত। এটি ঈমানের ও আল্লাহর নৈকট্যশীল হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে না। অনেক জাহিল ও অজ্ঞ ব্যক্তি এর মাধ্যমে ধোঁকায় পড়ে যায়।
৩. সৃষ্টিগত অন্তর্দৃষ্টি: এ বিষয়ে অনেক চিকিৎসকসহ আরও অনেকেই গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারা সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যাবলির মাধ্যমে চারিত্রিক গুণাবলির ওপর প্রমাণ পেশ করেছেন; এ দুটির মধ্যে গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে। যে সম্পর্কগুলো আসলে আল্লাহ তাআলার হিকমতেরই দাবি।
অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি তিনটি অঙ্গের সাথে সম্পর্কিত: চোখ, কান ও অন্তর। চোখের কাজ হলো নিদর্শন, চিহ্ন ও আলামতসমূহ পর্যবেক্ষণ করা। কানের কাজ হলো কথাবার্তা শ্রবণ করা, এর সুস্পষ্ট, অস্পষ্ট, ইশারা-ইঙ্গিত, ভাবভঙ্গি, সারমর্ম, কথা বলার স্বর ও সুর ইত্যাদি আয়ত্ত করতে তৎপর থাকা। আর অন্তরের কাজ হলো দেখা ও শোনা বিষয়গুলোতে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে, দলীল-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করা এবং এর গোপন রহস্যাবলি উদঘাটনে চেষ্টা করা। বাহ্যিক দিক দেখে এর ভেতরে প্রবেশ করা। যেমন সাইরাফি বা স্বর্ণ পরীক্ষক বাইরের নকশা ও ধাতব মুদ্রা দেখেই এর ভেতরে কী পরিমাণ ভেজাল বা খাদ রয়েছে, তা বলে দিতে পারে। এমনিভাবে বিচক্ষণ বা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি বাহ্যিক আকার-আকৃতি ও অবস্থা দেখে রূহ ও অন্তরের ভেতরগত গোপন অবস্থা বলে দিতে পারে। সুতরাং রূহ ও অন্তরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি স্বর্ণ পরীক্ষকের মতো; যে বাইরের নকশা ও চেহারা দেখেই বলে দিতে পারে যে, কতটুকু খাঁটি আর কতটুকু ভেজাল।
অন্তর্দৃষ্টি বা ফিরাসাত অর্জনের দুইটি কারণ রয়েছে:
প্রথম কারণ : অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তির মস্তিষ্কের উৎকৃষ্টতা, অন্তরের তীক্ষ্ণতা এবং মেধার প্রখরতা।
দ্বিতীয় কারণ : সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দলীল-প্রমাণ ও আলামতসমূহ ভালোভাবে প্রকাশিত হওয়া।
সুতরাং কারও মধ্যে যখন দুটি কারণই একত্রিত হয়, তখন তার অন্তর্দৃষ্টি ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে খুব কম। আর দুটি কারণই যখন কারও নিকট অনুপস্থিত থাকে, তখন তার অন্তর্দৃষ্টি সঠিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। যদি কারও একটি কারণ শক্তিশালী থাকে এবং আরেকটি থাকে দুর্বল, তা হলে সেই ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি হবে মাঝামাঝি পর্যায়ের।
ইয়াস ইবনু মুআবিয়া তার যুগের অনেক বড়ো অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। এ ব্যাপারে তার প্রসিদ্ধ অনেক ঘটনা রয়েছে। এমনিভাবে ইমাম শাফিয়ি -ও সুতীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। বলা হয় এ বিষয়ে তার অনেক রচনা রয়েছে।

টিকাঃ
[৬৯১] সূরা হিজর, ১৫: ৭৫।
[৬৯২] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ৩০।
[৬৯৩] তিরমিযি, ৩১২৭।
[৬৯৪] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৩৮৬।
[৬৯৫] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৩৮৬।
[৬৯৬] ইবনু আবিল ইযয, শারহুল আকীদাতিত তহাবিয়্যা, ৪৯৯।
[৬৯৭] বিস্তারিত দেখুন, বুখারি, ৩৮৬৬।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : প্রশান্তি (اَلسَّكِينَةُ)

📄 মানযিল : প্রশান্তি (اَلسَّكِينَةُ)


এই মানযিলটি হলো আল্লাহর দেওয়া মানযিলসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি মানযিল। এটি মানুষের অর্জন ক্ষমতার বাইরে। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদের ছয়টি স্থানে السَّكِينَةُ শব্দটি উল্লেখ করেছেন।[৬৯৮] তার মধ্যে একটি হলো:
ثُمَّ أَنْزَلَ اللهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُوْلِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ
"তারপর আল্লাহ তাঁর প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন তাঁর রাসূলের ওপর ও মুমিনদের ওপর।”[৬৯৯]
প্রশান্তি বা সাকীনার মূল হলো নিশ্চিন্ততা, গাম্ভীর্য ও স্থিরতা, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তরে নাযিল করেন; যখন বান্দা ভয়ভীতি কিংবা পেরেশানিতে অস্থির হয়। ফলে এসব পরিস্থিতিতে সে উদ্বিগ্ন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও অস্থির না হয়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করে। এতে তার ঈমান আরও বেড়ে যায় এবং ইয়াকীনের দৃঢ়তা আসে।
এই কারণে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ ﷺ ও মুমিনদের ওপর পেরেশানি ও অস্থিরতার সময় প্রশান্তি বা সাকীনা অবতীর্ণ করার কথা জানিয়েছেন। যেমন, নবি ﷺ-এর হিজরতের সময়; যখন তিনি ও তাঁর সাথি আবূ বকর ؓ গুহার ভেতরে ছিলেন আর শত্রুপক্ষ ছিল গুহার ওপরে। তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের দিকে তাকাত, তা হলেই তাঁদের দেখতে পেত। এমনিভাবে হুনাইনের যুদ্ধের দিন; যখন কাফিরদের প্রচণ্ড আক্রমণে মুসলিমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, কেউ কারও দিকে ভ্রুক্ষেপ করছিল না। এমনিভাবে হুদাইবিয়ার দিন; যখন কাফিরদের ফায়সালা শুনে, তাদের শর্তগুলো মেনে নিয়ে মুমিনদের অন্তর দুঃখভারাক্রান্ত হয়েছিল। এমন এমন শর্ত ছিল যা কেউ মানতে পারছিল না, উমর -এর মতো সাহসী ও বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিও সেদিন দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে আবূ বকর তাকে শান্ত করেছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. বলেছেন,
كُلُّ سَكِينَةٍ فِي الْقُرْآنِ فَهِيَ طُمَأْنِينَةٌ إِلَّا الَّتِي فِي سُوْرَةِ الْبَقَرَةِ
'সূরা বাকারাতে ব্যতীত কুরআনে উল্লেখিত প্রত্যেকটি সাকীনার অর্থই হলো নিশ্চিন্ততা। [৭০০]
যখন অন্তরে সাকীনা অবতীর্ণ হয়, তখন অন্তর প্রশান্ত হয়, অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে স্থিরতা আসে। সাকীনা গাম্ভীর্য সৃষ্টি করে, জবানকে সঠিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বলায় এবং অশ্লীল, নোংরা, অহেতুক ও বাতিল কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে। ইবনু আব্বাস রা. বলেছেন, 'আমরা পরস্পর বলাবলি করতাম যে, উমর রা.-এর জবানে ও অন্তরে যেন সাকীনাই কথা বলে।' [৭০১]
শাইখুল ইসলাম আবূ ইসমাঈল হারাবি রহ. বলেছেন, 'সাকীনা হলো যা নবি ও মুমিনদের অন্তরে নাযিল করা হয়েছিল। এটি এমন এক বস্তু যা অন্তরে আলো, শক্তি ও সজীবতা আনে; ভীত ব্যক্তি এখানে এসে স্বস্তি পায়, এর মাধ্যমে বিষণ্ণ ও ব্যথিত ব্যক্তি সান্ত্বনা লাভ করে এবং এর মাঝে অবাধ্য, পাপাচারী ও গুনাহগার ব্যক্তিও খুঁজে পায় নিরাপদ আশ্রয়। [৭০২]
এটি হলো তার বাণীসমূহের মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণী। যার ব্যাপারে তার সমবয়সিরাও প্রশংসা করেছেন। যা অন্তরে গেঁথে যায়। এটি তার সুস্থ রুচির পরিচয় বহন করে, শুধু ইলম থেকে কারও এমন উপলব্ধি আসে না।
তিনি উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ তাআলা যে সাকীনা তাঁর রাসূল ﷺ ও তাঁর মুমিন বান্দাদের অন্তরে অবতীর্ণ করেন, তা তিনটি বিষয়কে শামিল করে: আলো, শক্তি ও সজীবতা।
এরপর এর তিনটি ফলাফল উল্লেখ করেছেন: ভীত ব্যক্তির আশ্বস্ত ও নিরাপদ হওয়া, বিষণ্ণ ও ব্যথিত ব্যক্তির সান্ত্বনা লাভ করা এবং অবাধ্য, পাপাচারী ও গুনাহগার ব্যক্তির নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাওয়া।
সজীবতার মধ্যে রয়েছে অন্তরের প্রাণ, সাকীনার মাধ্যমে প্রাপ্ত আলোর দ্বারা অন্তর আলোকিত ও উজ্জ্বল হয় আর শক্তির মাধ্যমে আসে দৃঢ়তা, উদ্যম ও উৎফুল্লতা।
সুতরাং নূর বা আলো ব্যক্তির জন্য ঈমান ও ইয়াকীনের তাৎপর্য ও প্রমাণসমূহকে প্রকাশিত করে। হক ও নাহক, সত্য ও মিথ্যা এবং হিদায়াত ও গোমরাহির মধ্যে পার্থক্য করে দেয়।
প্রাণশক্তি বা সজীবতা মানুষকে পরিপূর্ণরূপে জাগ্রত ও মনোযোগী করে তোলে এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে সাহায্য করে।
আর শক্তি ও সক্ষমতা সত্য কথা বলতে, সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে, কুপ্রবৃত্তির আহ্বানকে দমিয়ে রাখতে এবং নিজেকে দোষত্রুটি ও নোংরামি থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণেই সাকীনার দ্বারা ঈমান কেবল বৃদ্ধিই পায়।
ঈমানের ফল হলো নূর, সজীবতা ও শক্তি-সামর্থ্য। আবার এই তিনটি বিষয় ঈমান আনতে সাহায্য করে এবং ঈমানকে বৃদ্ধি করে। সুতরাং বলা যায় ঈমান এগুলোর দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে।
সাকীনা বা প্রশান্তির দ্বারা যে নূর অর্জিত হয়, তার মাধ্যমে ঈমানের নিদর্শনাদি পরিস্ফুট হয় এবং যে সজীবতা অর্জিত হয়, তার মাধ্যমে গাফলত থেকে সতর্ক হয়ে সজাগ থাকা যায় আর এর দ্বারা যে শক্তি পাওয়া যায়, তার মাধ্যমে কুপ্রবৃত্তি, নফস ও শয়তানকে দমিয়ে রাখা যায়।

টিকাঃ
[৬৯৮] উল্লেখিত স্থানগুলো হলো-সূরা বাকারা, ২: ২৪৮; সূরা তাওবা, ৯: ২৬, ৪০; সূরা ফাতহ, ৪৮ : ৪, ১৮, ২৬।
[৬৯৯] সূরা তাওবা, ৯: ২৬।
[৭০০] বাগাবি, তাফসীর, ৭/২৯৮।
[৭০১] সুয়ূতি, জামিউল আহাদীস, ৩৪৪৫৫; আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ৩৫৮৭৫।
[৭০২] মানাযিলুস সায়িরীন, ৮৪।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : নিশ্চিন্ততা (اَلطُّمَأْنِينَةُ)

📄 মানযিল : নিশ্চিন্ততা (اَلطُّمَأْنِينَةُ)


আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ (*)
"তারা এমন লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিক্র দ্বারা নিশ্চিন্ত হয়েছে। আর জেনে রেখো, কেবল আল্লাহর যিক্র দ্বারাই অন্তরসমূহ নিশ্চিন্ত হয়।”[৭০৩]
الظمَأْنِينَةُ হলো : কোনো বস্তুর প্রতি অন্তর প্রশান্ত হওয়া এবং অস্থির ও পেরেশান না হওয়া। এ অর্থেই প্রসিদ্ধ একটি হাদীসে এসেছে,
الصِّدْقَ طُمَأْنِينَةُ وَالْكَذِبَ رِيبَةٌ
"সত্য হলো নিশ্চিন্ততা আর মিথ্যা হলো দ্বিধাগ্রস্ততা।”[৭০৪]
অর্থাৎ সত্য শ্রবণে শ্রোতার অন্তর নিশ্চিন্ত হয় এবং প্রশান্তি অনুভব করে। আর মিথ্যা অস্থিরতা ও সংশয় সৃষ্টি করে। যেমন রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
الْبِرُّ مَا اطْمَأَنَّ إِلَيْهِ الْقَلْبُ
"সৎকাজ হলো, যার প্রতি অন্তর নিশ্চিন্ত হয়।”[৭০৫]
অর্থাৎ এর প্রতি শান্তি খুঁজে পায় এবং সব ধরনের খটকা, অস্থিরতা ও দ্বিধা দূর হয়ে যায়।
ওপরে বর্ণিত আয়াতে (ذکر الله )আল্লাহর যিক্স)-এর দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে:
১. এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বান্দা তার রবকে স্মরণ করবে। কারণ আল্লাহর যিকরের মাধ্যমে অন্তর নিশ্চিন্ত হয় এবং শান্তি পায়। সুতরাং অন্তর যখন অস্থির ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে, তখন সে আল্লাহর যিক্ ছাড়া আর কোথাও শান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পাবে না।
২. এখানে 'আল্লাহর যিক্র' দ্বারা 'কুরআন' কে বুঝানো হয়েছে। এটি হলো আল্লাহর যিক্র, যা তিনি তাঁর রাসূলের ওপর অবতীর্ণ করেছেন। কুরআনের মাধ্যমে মুমিনের অন্তর নিশ্চিন্ততা লাভ করে। কেননা অন্তর কেবল ঈমান ও ইয়াকীনের দ্বারাই নিশ্চিন্ত হয়; আর কুরআন ছাড়া ঈমান ও ইয়াকীন অর্জনের আর কোনো পথ নেই। সুতরাং অন্তরের সুকূন ও নিশ্চিন্ততা আসে এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থেকে আর অন্তরের অস্থিরতা ও উদ্বেগ আসে এর প্রতি দ্বিধা ও সংশয় থেকে। কুরআন দৃঢ়তা অর্জনের স্থান, দ্বিধা ও সন্দেহ থেকে বান্দাকে রক্ষা করে। সুতরাং মুমিনের অন্তর কেবল কুরআনের মাধ্যমেই নিশ্চিন্ততা ও প্রশান্তি লাভ করে।
এই ব্যাখ্যাটিই হলো অধিক পছন্দনীয়।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের হৃদয়ে নিশ্চিন্ততা ও প্রশান্তি নিহিত রেখেছেন আর নিশ্চিন্ত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ ও খোশখবর দিয়েছেন। সুতরাং তাদের জন্য সুখবর ও সর্বোত্তম ঠিকানা!
يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ
“হে নিশ্চিন্ত আত্মা, তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও।”[৭০৬]
আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে প্রমাণ রয়েছে যে, আত্মাসমূহ তাঁর নিকট কেবল নিশ্চিন্ত হয়েই ফিরে যাবে। প্রশান্ত আত্মার অধিকারী ব্যক্তিরা তাঁর নৈকট্যশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। সালাফদের দুআর মধ্যে এটিও ছিল যে,
اللَّهُمَّ هَبْ لِي نَفْسًا مُطْمَئِنَّةً إِلَيْكَ 'হে আল্লাহ, আমাকে আপনার প্রতি প্রশান্ত ও নিশ্চিন্ত আত্মা দান করুন।'
আমার মনে হয় الشكية আর الظُّمَأْنِينَهُ এর মধ্যে দুটি পার্থক্য রয়েছে:
১ নং পার্থক্য: সাকীনা বা প্রশান্তি হলো সেই ব্যক্তির ন্যায়, যে শক্তিশালী কোনো শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে, যে তাকে ধ্বংস করে দিতে চায়। এমন অবস্থায় সে তার শত্রু থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, ফলে তার অন্তর শান্তি ও স্বস্তি লাভ করে। আর তুমা'নীনা বা নিশ্চিন্ততা হলো একটি দুর্গের ন্যায়, যা সে উন্মুক্ত অবস্থায় পায়, ফলে তাতে প্রবেশ করে এবং নিরাপদ হয়ে যায়। অতঃপর সেখানে সে তার সাথিসঙ্গী ও আসবাবপত্রের সমাবেশে শক্তিশালী হয়। সুতরাং অন্তরের তিনটি অবস্থা :
১. নিজের সাথে সংঘটিত কোনো ঘটনায় ভয় পাওয়া, অস্থির হওয়া ও পেরেশান হওয়া,
২. সেই ঘটনা দূর হয়ে যাওয়া এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু না ঘটা আর
৩. সংঘটিত ঘটনাটি যে কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল, সেই কাজে সফল হওয়া।
আসলে সাকীনা ও তুমা'নীনা একটি অপরটিকে আবশ্যক করে এবং পরস্পরকে যুক্ত রাখে। নিশ্চিন্ততা প্রশান্তিকে আবশ্যক করে, কখনো বিচ্ছিন্ন হতে দেয় না। এমনিভাবে প্রশান্তিও নিশ্চিন্ততাকে আবশ্যক করে, কখনো পৃথক হতে দেয় না। তবে নিশ্চিন্ততার কারণে প্রশান্তি পাওয়া শক্তিশালী হয়।
২ নং পার্থক্য: নিশ্চিন্ততা বা তুমা'নীনা হলো ব্যাপক। এটি ইলম ও ইয়াকীনের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে। এ কারণেই অন্তরসমূহ কুরআনের মাধ্যমে নিশ্চিন্ত হয়। কেননা কুরআনের মাধ্যমে ঈমান, ইয়াকীন, মা'রিফাত এবং বিভিন্ন পথের সঠিক দিকনির্দেশনা অর্জন করা যায়। কুরআনের মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান হয় এবং এর মাধ্যমেই সব সংশয়, সন্দেহ ও দ্বিধা দূর হয়ে যায়।
আর প্রশান্তি বা সাকীনা হলো ভয়ের সময় অন্তর স্থির থাকা এবং উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা দূর হওয়া। যেমন যুদ্ধের ময়দানে কাফিরদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সৈনিক মুজাহিদগণ তা লাভ করে থাকেন। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।

টিকাঃ
[৭০৩] সূরা রা'দ, ১৩: ২৮।
[৭০৪] তিরমিযি, ২৫১৮; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৭২৩।
[৭০৫] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৮০০১।
[৭০৬] সূরা ফাজর, ২৭-২৮।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : আত্মসমালোচনা (اَلْغَيْرَةُ)

📄 মানযিল : আত্মসমালোচনা (اَلْغَيْرَةُ)


আল্লাহ তাআলা বলেন, قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
“আপনি বলে দিন, আল্লাহ যেসব জিনিস হারাম করেছেন, তা হচ্ছে: প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা...”[৭২৮]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল বলেছেন,
لَا أَحَدَ أَغْيَرُ مِنَ اللَّهِ وَلِذَلِكَ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْمَدْحُ مِنَ اللَّهِ وَلِذَلِكَ مَدَحَ نَفْسَهُ وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعُذْرُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ أَنْزَلَ الْكِتَابَ، وَأَرْسَلَ الرُّسُلَ
* আল্লাহর চেয়ে অধিক আত্মমর্যাদার অধিকারী আর কেউ নেই; এ জন্য তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করেছেন。
* আল্লাহর চেয়ে প্রশংসাপ্রিয় আর কেউ নেই; এ কারণে তিনি নিজেই নিজের প্রশংসা করেছেন。
* আল্লাহর চেয়ে ওজর কবুলকারী আর কেউ নেই; যার ফলে তিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং রাসূল প্রেরণ করেছেন।”[৭২৯]
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَغَارُ وَإِنَّ الْمُؤْمِنَ يَغَارُ وَغَيْرَةُ اللَّهِ أَنْ يَأْتِيَ الْمُؤْمِنُ مَا حَرَّمَ عَلَيْهِ
"আল্লাহ তাআলা আত্মমর্যাদা উপলব্ধি করেন এবং মুমিনরাও আত্মমর্যাদা উপলব্ধি করেন। বান্দার ওপর আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন, বান্দা যখন তাতে লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত আসে।"[৭৩০]
'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এ আরও এসেছে, নবি বলেছেন,
أَتَعْجَبُوْنَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنَي
"তোমরা কি সা'দ (ইবনু উবাদা)-এর আত্মমর্যাদাবোধ দেখে আশ্চর্য হচ্ছো? আমি ওর থেকেও অধিক আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। আর আল্লাহ তাআলা আমার থেকেও অধিক আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী!”[৭৩১]
নিম্নের আয়াতটি আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে:
وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مَّسْتُوْرًا
"আর যখন আপনি কুরআন পাঠ করেন, তখন আপনার মাঝে ও যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মাঝে আমি একটি অদৃশ্য পর্দা স্থাপন করি।"[৭৩২]
সারি সাকাতি তার সাথিদের বলেছেন, 'তোমরা কি জানো সেই অদৃশ্য পর্দাটি কী? আত্মসম্মানবোধের পর্দা। আল্লাহর চেয়ে অধিক আত্মসম্মানবোধের অধিকারী আর কেউ নেই। আল্লাহ তাঁর কালাম বোঝার যোগ্যতা, তাঁর পরিচয়, তাওহীদ ও তাঁকে ভালোবাসার উপযুক্ততা কাফিরদের দান করেননি। ফলে তাদের মাঝে ও তাঁর রাসূল, কালাম ও তাওহীদের মাঝে একটি অদৃশ্য পর্দা স্থাপন করে দিয়েছেন।
আসলে অযোগ্যরা তা পেয়ে যাবে, এই বিষয়টি তাঁর আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে। ১৭০০। আত্মসম্মানবোধের মানযিল হলো অনেক সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ একটি মানযিল। কিন্তু পরবর্তী যুগের কিছু নামধারী সূফি এর বিষয়বস্তুকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে। তারা নিজেরা নতুন একটি বাতিল মাযহাব তৈরি করে নিয়েছে। তারাও এর নাম দিয়েছে 'আত্মসম্মানবোধ' (الْغَيْرَةُ)। অতঃপর অপাত্রে ও ভিন্ন স্থানে তা প্রয়োগ করেছে। তারা বিষয়টি বুঝতে না পেরে বিরাট তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। শীঘ্রই আপনি তা দেখতে পাবেন।
আত্মসম্মানবোধ বা গাইরত দুই ধরনের:
১. কোনো বস্তুর কারণে আত্মসম্মানবোধ (الْغَيْرَةُ مِنَ الشَّيْءِ) এবং
২. কোনো বস্তুর ওপর আত্মসম্মানবোধ (الْغَيْرَةُ عَلَى الشَّيْءِ)।
১. কোনো বস্তুর কারণে আত্মসম্মানবোধ: এটি হলো আপনার ভালোবাসার বস্তুতে অন্যের শরীকানা ও ভিড়কে অপছন্দ করা।
২. কোনো বস্তুর ওপর আত্মসম্মানবোধ: ভালোবাসার বস্তুকে একাই পেতে চাওয়ার প্রচণ্ড লোভ। অন্য কেউ যাতে তাতে অংশীদার না হয় এবং ভাগ না বসায়, তা কামনা করা।
গাইরাতের আরও একটি প্রকার রয়েছে: বান্দার নিজের নফস থেকে নফসের ওপর গাইরাত বা আত্মসম্মানবোধ; যেমন: তার নফস থেকে তার কল্বের ওপর গাইরাত, তার বিচ্ছিন্নতা থেকে তার স্থির থাকার ওপর গাইরাত, তার উপেক্ষা করা থেকে তার উদ্যমী হওয়ার ওপর গাইরাত, তার মন্দ স্বভাব থেকে তার প্রশংসনীয় স্বভাবের ওপর গাইরাত। (অর্থাৎ উত্তম বিষয়গুলো অর্জন করার জন্য আত্মসম্মানবোধ বা গাইরাত থাকা।) এই প্রকার আত্মসম্মানবোধ হলো সম্মানিত ও পবিত্র নফসের বৈশিষ্ট্য। নীচু ও নিম্ন স্বভাবের নফসের জন্য এতে কোনো অংশ নেই। নফসের পবিত্রতা ও সুউচ্চ হিম্মতের পরিমাণ অনুসারে এই আত্মসম্মানবোধ অর্জিত হয়।
আত্মসম্মানবোধের আরও দুটি প্রকার রয়েছে:
১. বান্দার ওপর আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ এবং
২. আল্লাহর জন্য বান্দার আত্মসম্মানবোধ, আল্লাহর ওপরে আত্মসম্মানবোধ নয়।
১. বান্দার ওপর আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ: এটি হলো আল্লাহ তাআলা তাকে অন্য কোনো সৃষ্টির গোলাম বানাবেন না; বরং তাকে কেবল নিজের জন্যই গোলাম হিসেবে গ্রহণ করবেন। এতে কাউকে অংশীদার করবেন না। তাকে শুধু নিজের জন্যই বেছে নেবেন। এটি এই দুই প্রকারের মধ্যে উঁচু স্তরের আত্মসম্মানবোধ।
২. আল্লাহর জন্য বান্দার আত্মসম্মানবোধ: এটি আবার দুই প্রকার: নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ এবং অপরের সাথে আত্মসম্মানবোধ।
বান্দার নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ হলো: বান্দা তার কাজকর্ম, কথাবার্তা, অবস্থা, সময়, শ্বাসপ্রশ্বাস মোটকথা তার ছোটোবড়ো সবকিছু একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই নিবেদন করবে। আল্লাহ ব্যতীত আর কারও জন্য নয়।
আর অপরের সাথে আত্মসম্মানবোধ হলো: কেউ যখন তাকে অন্যায়-অপকর্ম ও হারামে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করবে, তার হকসমূহের ব্যাপারে অবহেলা করবে এবং তা নষ্ট করবে, তখন এ বিষয়গুলো তাকে রাগান্বিত করে তুলবে এবং তার ক্রোধ বাড়িয়ে দেবে।
অপরদিকে আল্লাহ তাআলার ওপর আত্মসম্মানবোধ দেখানো হলো সবচেয়ে বড়ো মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতা। যারা এ আচরণ করে, তারা সবচেয়ে বড়ো মূর্খ এবং চরম বিভ্রান্ত। কখনো কখনো এটি ব্যক্তিকে আল্লাহর সাথে শত্রুতার দিকে ঠেলে দেয়; অথচ সে তা টেরই পায় না। কখনো কখনো মূল দ্বীন ও ইসলাম থেকেই বের করে দেয়। এরা আল্লাহর-পথের-পথিকদের পথচলায় বিঘ্নতা সৃষ্টি করে। এ পথের চোর-ডাকাতের চেয়ে এরা ক্ষতিকর হয়। এরাই প্রকৃত পথরোধকারী। আল্লাহর জন্য যারা আত্মসম্মানবোধ করেন, তাদের সাথে এদের কত পার্থক্য! তারা আল্লাহর জন্য নিজের কাজকর্ম, কথাবার্তা, আচার-আচরণ সবকিছু উৎসর্গ করে দেয়। জ্ঞানীরা আল্লাহর জন্য আত্মসম্মানবোধ করে আর মূর্খরা আল্লাহর ওপর আত্মসম্মানবোধ করে। সুতরাং এটা বলা যাবে না যে, أَنَا أَغَارُ عَلَى اللهِ 'আমি আল্লাহর ওপর আত্মসম্মানবোধ করি।' বরং বলতে হবে أَنَا أَغَارُ لِلهِ 'আমি আল্লাহর জন্য আত্মসম্মানবোধ করি।'
বান্দার নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ অপরের সাথে আত্মসম্মানবোধের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনি যখন আপনার নিজের সাথে আত্মসম্মানবোধ উপলব্ধি করবেন, তখন অপরের সাথে আল্লাহর জন্য আপনার আত্মসম্মানবোধও সঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি যখন নিজেকে বাদ দিয়ে অপরের সাথে আত্মসম্মানী হয়ে উঠবেন, তখন নিশ্চিতভাবেই আপনার আত্মসম্মানবোধ অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত হবে। সুতরাং এটা নিয়ে ভাবুন এবং এর প্রতি সূক্ষ্মদৃষ্টি নিবদ্ধ রাখুন।
এই স্তরের এই কথাগুলো নিয়ে বুদ্ধিমান পথিকদের চিন্তাভাবনা করা উচিত। কারণ এখানে এসে অধিকাংশ পথিকেরই পা পিছলে যায়। আল্লাহ তাআলাই সঠিক পথ দেখান, পথ চলার তাওফীক দেন আর তিনিই তাতে সুদৃঢ় রাখেন।
যেমন (তথাকথিত) এক প্রসিদ্ধ সুফি বলেছেন, 'আমি ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পাই না; যতক্ষণ-না আল্লাহর যিক্র করছে এমন কাউকে দেখি।' এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হলো সে ব্যতীত অন্যান্য গাফিলদের মধ্যে কাউকে যিক্র করতে দেখা। এর চেয়েও আশ্চর্যের হলো এটাকে তার বুজুর্গি ও শ্রেষ্ঠত্ব বলে গণ্য করা হয়!
আরেকজন বলেছেন, 'আমি আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করতে এবং তাঁকে দেখতে পছন্দ করি না।' তাকে বলা হলো, 'কেন?' তিনি জবাব দেন, 'আল্লাহর ওপর আত্মসম্মানবোধের কারণে; আমার মতো ব্যক্তি তাঁকে দেখবে?!'
এটি হলো মন্দ ও নিকৃষ্ট পর্যায়ের আত্মসম্মানবোধ। যা ব্যক্তির মূর্খতার প্রতিই ইঙ্গিত করে। যদিও সে নিজেকে ছোটো মনে করা, বিনয়, নম্রতা, অক্ষমতা ও অপদস্থতার গুণে গুণান্বিত থাকে।

টিকাঃ
[৭২৮] সূরা আ'রাফ, ৭: ৩৩।
[৭২৯] বুখারি, ৪৬৩৪; মুসলিম, ২৭৬০।
[৭৩০] বুখারি, ৫২২৩; মুসলিম, ২৭৬১।
[৭৩১] বুখারি, ৬৮৪৬; মুসলিম, ১৪৯৯।
[৭৩২] সূরা ইসরা, ১৭:৪৫।
[৭৩৩] ইবনু তাইমিয়্যা, আল-ইসতিকামাহ, ২/৪৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00