📄 ইলম তিন প্রকার
ইলম তিন প্রকার : এক. প্রকাশ্য ইলম (الْعِلْمُ الجَلِيُّ), দুই. গোপন ইলম (الْعِلْمُ الخَفِيُّ) এবং তিন. আধ্যাত্মিক ইলম (الْعِلْمُ اللَّدُنِّيُّ)
এক. প্রকাশ্য ইলম : এমন সুস্পষ্ট ইলম, যাতে কোনো প্রকারের অস্পষ্টতা থাকে না। এটি আবার তিন প্রকার:
১. যে ইলম সরাসরি প্রত্যক্ষ করে অর্জন করা হয়। এটি চোখের মাধ্যমে অর্জিত ইলম।
২. যে ইলম শ্রবণের দ্বারা অর্জন করা হয়। এটিকে ইলমুল ইসতিফাযা বলা হয়।
৩. যে ইলম বুদ্ধি বা আকলের সাহায্যে অর্জন করা হয়। এটিকে ইলমুত তাজরিবা বা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান বলা হয়।
কান, চোখ ও বুদ্ধি-এই তিনটি হলো ইলম অর্জনের প্রশস্ত পথ ও দরজা। তবে তা এতেই সীমাবদ্ধ নয়। কেননা মানুষ পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সবগুলোর মাধ্যমেই ইলম হাসিল করতে পারে।
আবার মানুষ অভ্যন্তরীণভাবেও জ্ঞান অর্জন করে থাকে। যেমন: আনন্দ, খুশি, দুঃখ, বেদনা ইত্যাদি।
এমনিভাবে সত্য সংবাদদাতার দেওয়া খবরের মাধ্যমেও জ্ঞান হাসিল হয়। যদিও সংবাদ প্রদানকারী মাত্র একজন হোক না কেন?
এমনিভাবে অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও চিন্তাভাবনা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে জ্ঞান হাসিল করা যায়।
দুই. গোপন ইলম: সূফিয়ায়ে কেরামের নিকট এই প্রকারের ইলমকে মা'রিফাত বলা হয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য নেওয়া হয়- বান্দার মাঝে ও তার রবের মাঝে যে সমস্ত মাকাম ও অবস্থা সংরক্ষণ করা হয় ও লিখে রাখা হয় সেগুলো।
একজন সালাফ বলেছেন, 'অন্তর যখন গুনাহ পরিত্যাগ করতে সচেষ্ট হয়, তখন অন্তরে ঊর্ধ্বজগতের বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। অতঃপর তা ব্যক্তির মাঝে বিভিন্ন প্রকারের উপকার ও উপহার নিয়ে আসে।'
তিন. আধ্যাত্মিক ইলম: এটি হলো দাসত্ব ও আনুগত্যের ফল। আল্লাহর সাথে সত্যবাদিতা ও একনিষ্ঠতার পুরস্কার। কুরআন ও সুন্নাহর ইলম অর্জনে কঠোর পরিশ্রম করার প্রতিদান। আধ্যাত্মিক ইলম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন ও সুন্নাহর উপলব্ধিজ্ঞান; যা আল্লাহ তাআলা আমলকারী ব্যক্তিকে দান করে থাকেন। যেমন, 'সহীহ বুখারি'-তে এসেছে, একব্যক্তি আলি ইবনু আবী তালিব -কে জিজ্ঞাসা করেন, 'রাসূলুল্লাহ কি আপনাদের বিশেষ কিছু দান করেছেন, যা অন্য কাউকে দেননি?' উত্তরে আলি বলেন,
لَا وَالَّذِي فَلَقَ الْحَبَّةَ، وَبَرَأ النَّسَمَةَ، إِلَّا فَهَمَا يُؤْتِيْهِ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ رَجُلًا فِي كِتَابِهِ
'না, সেই সত্তার শপথ, যিনি শস্যদানা বিদীর্ণ করেছেন এবং প্রাণী সৃষ্টি করেছেন! কেবল সেই বোধশক্তি ও উপলব্ধিজ্ঞান, যা আল্লাহ তাআলা কাউকে তার কিতাব বোঝার জন্য দান করেন।[৬৮৭]
আসলে এটি হলো আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত আধ্যাত্মিক জ্ঞান।
আর যারা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, এ দুটির সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না, তাদের নিকটও ইলম আসে; তবে তা নিজের নফস ও বিতাড়িত শয়তানের পক্ষ থেকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া আধ্যাত্মিক ইলমের আলামত হলো : তা রাসূল -এর আনীত ইলমের সাথে একাত্মতা পোষণ করে। সুতরাং আধ্যাত্মিক ইলম দুই প্রকার: একটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে, আরেকটি শয়তানের পক্ষ থেকে। আর তা যাচাইয়ের মানদণ্ড হলো ওহি; কিন্তু আল্লাহর রাসূল -এর পরে ওহি আসার আর কোনো পথ নেই। (সুতরাং এখন কুরআন-সুন্নাহই হলো তা যাচাইয়ের একমাত্র মানদণ্ড।)
মূসা ও খাদির -এর ঘটনাকে দলীল বানিয়ে যারা বলে, আল্লাহ-প্রদত্ত আধ্যাত্মিক ইলম বা ইলমে লাদুন্নি দ্বারা ওহির ইলম থেকে অমুখাপেক্ষী থাকা বৈধ; তারা আসলে দ্বীনকে অস্বীকারকারী, আর এটি কুফর, যা তাদেরকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় এবং তাদের রক্ত হালাল সাব্যস্ত করে।
সুতরাং যে ব্যক্তি দাবি করে যে, তার অবস্থান মুহাম্মাদ -এর সাথে, যেরকম অবস্থান ছিল মূসা -এর সাথে খাদির -এর, অথবা সে কোনো ইমামের জন্য এই বিষয়টি সাব্যস্ত করে—তার জন্য জরুরি হলো: সে যেন ঈমান নবায়ন করে এবং পুনরায় সত্য কালিমার সাক্ষ্য দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করে। কারণ সে পুরোপুরিভাবে দ্বীন থেকে বাহির হয়ে গেছে; এই কারণে আল্লাহর আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া তো দূরের কথা; বরং সে অভিশপ্ত শয়তানের আউলিয়া ও প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছে।
এই বিষয়টিই নাস্তিক-মুরতাদ এবং পরিপূর্ণ ঈমানদারদের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
টিকাঃ
[৬৮৭] বুখারি, ৩০৪৭।