📄 ইলমের সম্পর্ক কুরআন ও সুন্নাহর সাথে
আল্লাহর-পথের-পথিক তার পথচলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যদি এই মানযিলের সাথে যুক্ত না থাকে, তা হলে নিশ্চিতভাবে তার পথচলা হবে ভ্রান্তপথে, সে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। সফলতা ও হিদায়াতের পথ সে হারিয়ে ফেলবে এবং এর সমস্ত দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। মাশায়েখগণ এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। আসলে আল্লাহর পথে ইলম অর্জন করা থেকে চোর-ডাকাত আর শয়তানের প্রতিনিধিরা ছাড়া আর কেউ বাধা দেয় না।
সূফিয়ায়ে কেরামের সর্দার ও শাইখ জুনাইদ ইবনু মুহাম্মাদ বাগদাদি বলেছেন, 'মানুষের জন্য সমস্ত পথ বন্ধ। কেবল রাসূলুল্লাহ -এর অনুসারীদের জন্য তা খোলা রয়েছে।' [৬৭৫]
তিনি আরও বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কুরআন মুখস্থ করেনি এবং হাদীস লিখে রাখেনি, সে অনুসরণযোগ্য নয়। কারণ আমাদের ইলম কেবল কুরআন ও সুন্নাহর সাথেই সম্পৃক্ত।'[৬৭৬]
তিনি আরও বলেছেন, 'আমাদের এই পথ কুরআন-সুন্নাহর উসূল বা বিধিবিধানের সাথে শর্তযুক্ত।'
আবূ হাফস্ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি সর্বদা নিজের কাজকর্ম ও অবস্থাকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যাচাই করে না এবং নিজের অন্তরকে পরীক্ষা করে না, তাকে সাধকদের কাতারে গণ্য করা যায় না।'[৬৭৭]
আবূ সুলাইমান দারানি বলেছেন, 'কখনো কখনো আমার অন্তরে অনেক ভালো ভালো কথার উদয় হয়, তবে আমি তা থেকে কেবল তখনই কোনোকিছু গ্রহণ করি, যখন সেই ব্যাপারে দুই ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করে—কুরআন ও সুন্নাহ। [৬৭৮]
আবূ ইয়াযীদ বলেছেন, 'আমি তিরিশ বছর সাধনা করেছি। কিন্তু ইলম ও ইলমসংক্রান্ত বিষয়াদির চেয়ে কঠিন কিছু পাইনি। যদি আলিমদের মতবিরোধ না থাকত, তা হলে আমি সেখানেই পড়ে থাকতাম। উলামায়ে কেরামের মতবিরোধ হলো রহমতস্বরূপ; তবে তাওহীদের ক্ষেত্র ব্যতীত।' [৬৭৯]
একদিন আবূ ইয়াযীদ একজন যাহিদ বা দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করতে বের হলেন। গিয়ে দেখলেন তিনি মাসজিদে প্রবেশ করার সময় কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করছেন। আবূ ইয়াযীদ তখন (তার সাথে সাক্ষাৎ না করে) তাকে সালাম না দিয়েই ফিরে আসেন এবং বলেন, 'এই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ -এর আদবসমূহের মধ্য থেকে একটি আদবের ব্যাপারেই বিশ্বস্ত নন; সুতরাং তিনি যে বিষয়ের দাবি করছেন, সে ক্ষেত্রে কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য হবেন? '৬৮০]
তিনি আরও বলেছেন, 'একবার আমি ইচ্ছা করলাম আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করব যে, তিনি যেন আমাকে নারীর আকর্ষণ থেকে মুক্ত রাখেন। তারপর ভাবলাম, কীভাবে এমন প্রার্থনা করা আমার জন্য বৈধ হবে, আল্লাহর রাসূল যার প্রার্থনা কখনো করেননি? এরপর আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে আমাকে নারীর আকর্ষণ থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন। এমনকি এখন আমি কোনো পরোয়াই করি না যে, কোনো নারী আমাকে অভ্যর্থনা জানাল নাকি কোনো দেওয়াল!'[৬৮১]
তিনি আরও বলেছেন, 'যদি তোমরা দেখো কোনো ব্যক্তিকে এমন কারামাত (অলৌকিক বিষয়) দান করা হয়েছে যে, তিনি শূন্যে উড়ছেন; তবুও তোমরা তার ধোঁকায় পড়ো না। যতক্ষণ-না তোমরা তার দ্বীনদারি, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও শারীআত পালনে তার অবস্থান যাচাই করে নাও। '৬৮২]
আবূ হামযা বাগদাদি ছিলেন অনেক বড়ো শাইখ। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল মাসআলা জিজ্ঞেস করার সময় তাঁকে (সম্বোধন করে) বলতেন, 'ইয়া সৃফি!' আবূ হামযা বলেছেন, 'যে ব্যক্তি সত্য পথ সম্পর্কে অবগত হয়, তার জন্য পথচলা সহজ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলার নিকট এ পথের কেবল একটিই নিদর্শন—প্রতিটি কথা, কাজ ও পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ -এর অনুসরণ করা।[৬৮৩]
কেউ কেউ বিভ্রান্তিকর এমন কিছু কথা বলেছেন, যা ইলম অর্জন করা থেকে বিরত থাকতে এবং ইলমকে উপেক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন: কেউ বলেছেন, 'আমরা ইলম অর্জন করি, এমন চিরঞ্জীব সত্তা থেকে যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না। আর তোমরা এমন ব্যক্তিদের থেকে ইলম অর্জন করে থাকো, যারা মরণশীল।'
তাদের কাউকে প্রশ্ন করা হলো, 'আপনি আবদুর রাযযাক ৬৮৪] থেকে হাদীস শোনার জন্য সফর করেন না কেন?' তিনি জবাব দেন, 'সেই ব্যক্তি আবদুর রাযযাক থেকে হাদীস শুনে কী করবে, যে সরাসরি সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে তা শুনে থাকে?!' (এগুলো হলো চরম মূর্খতাসুলভ কথাবার্তা।)
আরেকজন (ভণ্ড সূফি) বলেছেন, 'জ্ঞান )اَلْعِلْمُ( হলো অন্তর এবং আল্লাহর মাঝে একটি পর্দা।'
আরেকজন বলেছেন, 'তুমি যখন কোনো সৃফিকে حَدَّثَنَا ও أَخبرنا নিয়ে ব্যস্ত দেখবে, তখন তার থেকে হাত ধুয়ে নেবে।'
আরেকজন (ভণ্ড) সূফি বলেছেন, 'আমাদের রয়েছে অক্ষরের জ্ঞান আর তোমাদের রয়েছে কাগজের জ্ঞান।'
এগুলো হলো বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা। যারা এগুলো বলেছেন, তাদের মধ্যে যার অবস্থা সবচেয়ে ভালো, সে-ই হলো মূর্খ; অথবা সে অগভীর চিন্তার অধিকারী। অন্যথায় আবদুর রাযযাক ও তার মতো অন্যান্য হাদীস বিশারদগণ এবং ‘আখবারানা’ ও ‘হাদ্দাসানা [৬৮৬] অর্থাৎ হাদীস বর্ণনার ধারা যদি চলমান না থাকত, তা হলে তাদের পর্যন্ত এবং পরবর্তীদের নিকট পর্যন্ত ইসলামের কিছুই পৌঁছুত না!
যে ব্যক্তি আপনাকে ‘আখবারানা’ ও ‘হাদ্দাসানা’ অর্থাৎ হাদীস থেকে ফিরিয়ে দেয়, মনে রাখবেন সে হয়তো আপনাকে ভ্রান্ত-সূফিবাদের দিকে অথবা দার্শনিক যুক্তির দিকে কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক মতের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ কুরআন-সুন্নাহর ছাড়া তাদের কাছে রয়েছে শুধু ধর্ম-গবেষকদের সন্দেহ-সংশয়, বিভ্রান্তদের মতামত, বেশধারী সূফিদের কল্পনা-জল্পনা আর দার্শনিকদের খোঁড়া যুক্তি-বিবেচনা।
যে ব্যক্তি দলীল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, সে সঠিক পথ থেকে বিপথে যায়। আল্লাহর নিকট পৌঁছার এবং জান্নাতে যাওয়ার জন্য কুরআন-সুন্নাহ ব্যতীত আর কোনো দলীল নেই। যে সমস্ত পথ কুরআন-সুন্নাহর বহির্ভূত, সেগুলো হলো জাহান্নাম ও অভিশপ্ত শয়তানের পথ।
জ্ঞান বা ইলম হলো যার ব্যাপারে দলীল-প্রমাণ রয়েছে। জ্ঞানের মধ্যে সবচেয়ে উপকারী জ্ঞান হলো—রাসূলুল্লাহ যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা। ইলম হচ্ছে হাল বা বিশেষ অবস্থা থেকেও উত্তম। ইলম হুকুম দানকারী আর হাল হুকুম গ্রহণকারী। ইলম পথপ্রদর্শক আর হাল অনুসারী। ইলম আদেশকারী ও নিষেধকারী আর হাল আদেশ-নিষেধ বাস্তবায়নকারী। হালের সাথে ইলম যুক্ত না থাকলে, তা খেলোয়াড়ের হাতে কোষমুক্ত তরবারিতে পরিণত হয়।
হালের উপকার তার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অতিক্রম করে না। আর ইলমের উপকারিতা হলো বৃষ্টির মতো; পাহাড়ে, মরুভূমিতে, টিলা উপত্যকায় এবং গাছগাছালি উৎপন্ন হওয়ার স্থানসহ সব জায়গায় পৌঁছে যায়।
ইলমের পরিধি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগৎকেই বেষ্টন করে নেয়। অপরদিকে হাল বা বিশেষ অবস্থার পরিধি কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেই বেষ্টন করে রাখে। আর কখনো কখনো সে ক্ষেত্রেও সংকীর্ণ হয়ে যায়।
ইলম হলো পথপ্রদর্শক আর বিশুদ্ধ হাল হলো ইলমের মাধ্যমে পথপ্রাপ্ত। ইলম হলো আম্বিয়ায়ে কেরাম-এর উত্তরাধিকার, তাঁদের রেখে যাওয়া সম্পদ। ইলমের মাধ্যমেই আল্লাহকে চেনা যায়, আল্লাহর ইবাদাত করা যায়, তাঁর যিক্র করা যায়, তাঁকে এক বলে স্বীকৃতি দেওয়া যায় এবং তাঁর প্রশংসা-স্তুতি করা যায়, ইলমের মাধ্যমেই ব্যক্তি আল্লাহর পথ প্রাপ্ত হয়, যারা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছেছে, তারা ইলমের পথ ধরেই পৌঁছেছে আর যারা আল্লাহর নিকট প্রবেশ করেছে, তারা ইলমের দরজা দিয়েই প্রবেশ করেছে।
ইলমের দ্বারাই শারীআত ও আল্লাহর হুকুম-আহকামের পরিচয় জানা যায়, হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য করা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা যায় এবং আল্লাহ তাআলার পছন্দ-অপছন্দ জানা যায়; ফলে তাঁর নৈকট্য অর্জন করা সহজ হয়।
ইলম হলো ইমাম আর আমল তার মুক্তাদি। ইলম হলো নেতা আর আমল তার অনুসারী। ইলম নিঃসঙ্গতায় সঙ্গ দেয়, একাকিত্বের সময় আলাপ করে আর বিষণ্ণতার সময় বন্ধু হয়। ইলম সমস্ত দ্বিধা ও সংশয় দূর করে দেয়। যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করে, সে এমন ধনাঢ্যতার অধিকারী হয়, যেখানে থাকে না কোনো দরিদ্রতার ভয়। ইলম এমন এক আশ্রয়স্থল, যেখানে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তি থাকে নিরাপদ ও ভয়হীন।
ইলম নিয়ে আলোচনা করা তাসবীহ, গবেষণা করা জিহাদ, ইলম অন্বেষণ করা নৈকট্যলাভ, ইলম খরচ করা সদাকা আর ইলমের দারস দেওয়া সালাত আদায় করা এবং সিয়াম পালন করার ন্যায় মর্যাদা রাখে। ইলমের প্রয়োজনীয়তা খাবার- পানীয়ের প্রয়োজনীয়তার চেয়েও অনেক বেশি।
টিকাঃ
[৬৭৫] খতীব বাগদাদি, আল-ফাকীহ ওয়াল মুতাফাকিহ, ১/৩৮৯।
[৬৭৬] শাতিবি, আল-ই'তিসাম, ১/১৬৪।
[৬৭৭] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১০/২৩০।
[৬৭৮] ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/১৪৫।
[৬৭৯] ইবনু তাইমিয়্যা, আল-ইসতিকামাহ, ১/৯৫।
[৬৮০] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/৯৫।
[৬৮১] শাতিবি, আল-ই'তিসাম, ১/১৬০।
[৬৮২] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১০/৯০।
[৬৮৩] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক, ৫১/২৫৫।
[৬৮৪] আবদুর রাযযাক সে সময় হাদীসের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন। তার জীবনকাল ছিল: ১২৬-২১১ হিজরি পর্যন্ত। তিনি ইয়ামেনের সানআ নামক স্থানের অধিবাসী ছিলেন। তার সংকলিত হাদীসগ্রন্থ 'মুসান্নাফু আবদির রাযযাক' সবারই পরিচিত।
[৬৮৫] অর্থাৎ হাদীস বর্ণনা করতে ব্যস্ত দেখি।
[৬৮৬] أَخبرنا অর্থ: তিনি আমাদের খবর দিয়েছেন। আর حدثنا অর্থ: তিনি আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন।
📄 ইলম তিন প্রকার
ইলম তিন প্রকার : এক. প্রকাশ্য ইলম (الْعِلْمُ الجَلِيُّ), দুই. গোপন ইলম (الْعِلْمُ الخَفِيُّ) এবং তিন. আধ্যাত্মিক ইলম (الْعِلْمُ اللَّدُنِّيُّ)
এক. প্রকাশ্য ইলম : এমন সুস্পষ্ট ইলম, যাতে কোনো প্রকারের অস্পষ্টতা থাকে না। এটি আবার তিন প্রকার:
১. যে ইলম সরাসরি প্রত্যক্ষ করে অর্জন করা হয়। এটি চোখের মাধ্যমে অর্জিত ইলম।
২. যে ইলম শ্রবণের দ্বারা অর্জন করা হয়। এটিকে ইলমুল ইসতিফাযা বলা হয়।
৩. যে ইলম বুদ্ধি বা আকলের সাহায্যে অর্জন করা হয়। এটিকে ইলমুত তাজরিবা বা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান বলা হয়।
কান, চোখ ও বুদ্ধি-এই তিনটি হলো ইলম অর্জনের প্রশস্ত পথ ও দরজা। তবে তা এতেই সীমাবদ্ধ নয়। কেননা মানুষ পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সবগুলোর মাধ্যমেই ইলম হাসিল করতে পারে।
আবার মানুষ অভ্যন্তরীণভাবেও জ্ঞান অর্জন করে থাকে। যেমন: আনন্দ, খুশি, দুঃখ, বেদনা ইত্যাদি।
এমনিভাবে সত্য সংবাদদাতার দেওয়া খবরের মাধ্যমেও জ্ঞান হাসিল হয়। যদিও সংবাদ প্রদানকারী মাত্র একজন হোক না কেন?
এমনিভাবে অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও চিন্তাভাবনা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে জ্ঞান হাসিল করা যায়।
দুই. গোপন ইলম: সূফিয়ায়ে কেরামের নিকট এই প্রকারের ইলমকে মা'রিফাত বলা হয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য নেওয়া হয়- বান্দার মাঝে ও তার রবের মাঝে যে সমস্ত মাকাম ও অবস্থা সংরক্ষণ করা হয় ও লিখে রাখা হয় সেগুলো।
একজন সালাফ বলেছেন, 'অন্তর যখন গুনাহ পরিত্যাগ করতে সচেষ্ট হয়, তখন অন্তরে ঊর্ধ্বজগতের বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। অতঃপর তা ব্যক্তির মাঝে বিভিন্ন প্রকারের উপকার ও উপহার নিয়ে আসে।'
তিন. আধ্যাত্মিক ইলম: এটি হলো দাসত্ব ও আনুগত্যের ফল। আল্লাহর সাথে সত্যবাদিতা ও একনিষ্ঠতার পুরস্কার। কুরআন ও সুন্নাহর ইলম অর্জনে কঠোর পরিশ্রম করার প্রতিদান। আধ্যাত্মিক ইলম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন ও সুন্নাহর উপলব্ধিজ্ঞান; যা আল্লাহ তাআলা আমলকারী ব্যক্তিকে দান করে থাকেন। যেমন, 'সহীহ বুখারি'-তে এসেছে, একব্যক্তি আলি ইবনু আবী তালিব -কে জিজ্ঞাসা করেন, 'রাসূলুল্লাহ কি আপনাদের বিশেষ কিছু দান করেছেন, যা অন্য কাউকে দেননি?' উত্তরে আলি বলেন,
لَا وَالَّذِي فَلَقَ الْحَبَّةَ، وَبَرَأ النَّسَمَةَ، إِلَّا فَهَمَا يُؤْتِيْهِ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ رَجُلًا فِي كِتَابِهِ
'না, সেই সত্তার শপথ, যিনি শস্যদানা বিদীর্ণ করেছেন এবং প্রাণী সৃষ্টি করেছেন! কেবল সেই বোধশক্তি ও উপলব্ধিজ্ঞান, যা আল্লাহ তাআলা কাউকে তার কিতাব বোঝার জন্য দান করেন।[৬৮৭]
আসলে এটি হলো আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত আধ্যাত্মিক জ্ঞান।
আর যারা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, এ দুটির সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না, তাদের নিকটও ইলম আসে; তবে তা নিজের নফস ও বিতাড়িত শয়তানের পক্ষ থেকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া আধ্যাত্মিক ইলমের আলামত হলো : তা রাসূল -এর আনীত ইলমের সাথে একাত্মতা পোষণ করে। সুতরাং আধ্যাত্মিক ইলম দুই প্রকার: একটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে, আরেকটি শয়তানের পক্ষ থেকে। আর তা যাচাইয়ের মানদণ্ড হলো ওহি; কিন্তু আল্লাহর রাসূল -এর পরে ওহি আসার আর কোনো পথ নেই। (সুতরাং এখন কুরআন-সুন্নাহই হলো তা যাচাইয়ের একমাত্র মানদণ্ড।)
মূসা ও খাদির -এর ঘটনাকে দলীল বানিয়ে যারা বলে, আল্লাহ-প্রদত্ত আধ্যাত্মিক ইলম বা ইলমে লাদুন্নি দ্বারা ওহির ইলম থেকে অমুখাপেক্ষী থাকা বৈধ; তারা আসলে দ্বীনকে অস্বীকারকারী, আর এটি কুফর, যা তাদেরকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় এবং তাদের রক্ত হালাল সাব্যস্ত করে।
সুতরাং যে ব্যক্তি দাবি করে যে, তার অবস্থান মুহাম্মাদ -এর সাথে, যেরকম অবস্থান ছিল মূসা -এর সাথে খাদির -এর, অথবা সে কোনো ইমামের জন্য এই বিষয়টি সাব্যস্ত করে—তার জন্য জরুরি হলো: সে যেন ঈমান নবায়ন করে এবং পুনরায় সত্য কালিমার সাক্ষ্য দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করে। কারণ সে পুরোপুরিভাবে দ্বীন থেকে বাহির হয়ে গেছে; এই কারণে আল্লাহর আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া তো দূরের কথা; বরং সে অভিশপ্ত শয়তানের আউলিয়া ও প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছে।
এই বিষয়টিই নাস্তিক-মুরতাদ এবং পরিপূর্ণ ঈমানদারদের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
টিকাঃ
[৬৮৭] বুখারি, ৩০৪৭।