📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 ইয়াকীন অর্জনযোগ্য নাকি আল্লাহ-প্রদত্ত?

📄 ইয়াকীন অর্জনযোগ্য নাকি আল্লাহ-প্রদত্ত?


এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে:
কেউ কেউ বলেছেন, 'এটি অন্তরে গচ্ছিত রাখা ইলম।' এর দ্বারা বুঝা যায় ইয়াকীন অর্জনের বিষয় নয়।
সাহল বলেছেন, 'ইয়াকীন হলো ঈমানের আধিক্য। আর ঈমান যে অর্জন করে নিতে হয় এতে কোনো সন্দেহ নেই।'
সঠিক অভিমত হলো: মাধ্যম ও কারণ বিবেচনায় ইয়াকীন অর্জনযোগ্য। আর মৌলিক দিক বিবেচনায় তা আল্লাহ্‌-প্রদত্ত।
সাহল বলেছেন, 'ইয়াকীনের শুরু হলো অন্তর্গত বিশ্বাস। এরপর সরাসরি ও চোখে দেখে বিশ্বাস।'
ইবনু খাফীফ বলেছেন, 'ইয়াকীন হলো অদৃশ্য বিষয়াবলির হুকুম-আহকামের তাৎপর্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।' [৬৩৬]
আবূ বকর ইবনু তাহির বলেছেন, 'ইলমের ক্ষেত্রে সংশয় আসতে পারে। কিন্তু ইয়াকীনের ক্ষেত্রে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।'[৬৩৭]
কেউ কেউ বলেছেন, 'যে অন্তরে আল্লাহ ব্যতীত অন্য বিষয়ের প্রতি নিশ্চিন্ততা রয়েছে, সে অন্তরে ইয়াকীন অবস্থান করে না।'
যুন-নূন মিসরি বলেছেন, 'ইয়াকীন আশাকে ছোটো রাখতে আহ্বান করে। ছোটো আশা দুনিয়াবিমুখতাকে আহ্বান করে। দুনিয়াবিমুখতা হিকমত সৃষ্টি করে। আর হিকমত পরিণামের দিকে দৃষ্টি দিতে উদ্বুদ্ধ করে।'[৬৩৮]
তিনি আরও বলেছেন, 'তিনটি বিষয় ইয়াকীন বা দৃঢ় বিশ্বাসের আলামত—
১. মানুষের সাথে মেলেমেশা কম করা,
২. দান করলে অতিরিক্ত প্রশংসা না করা এবং
৩. দান না করলে নিন্দা করা থেকে বেঁচে থাকা।
ইয়াকীনের আলামত হিসেবে আরও তিনটি বিষয় রয়েছে—
১. প্রতিটি বিষয়েই আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া,
২. প্রতিটি বিষয়েই আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং
৩. প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা।[৬৩৯]
জুনাইদ বাগদাদি বলেন, ‘দৃঢ় বিশ্বাস হলো এমন স্থির ইলম, যা এদিক- সেদিক নড়াচড়া করে না, বদলেও যায় না এবং অন্তরে কোনো পরিবর্তনও আনে না।[৬৪০]
ইবনু আতা বলেন, ‘মানুষ তাকওয়ার কতটা নিকটবর্তী, সে হিসেবে ইয়াকীন অর্জন করে থাকে।’
কেউ কেউ বলেছেন, ‘ইয়াকীন হলো মুকাশাফা বা উদ্ভাসিত হওয়া। এটি তিন প্রকার-
১. (আল্লাহর দেওয়া) খবরসমূহ উদ্ভাসিত হওয়া, ২. আল্লাহর পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও শক্তি উদ্ভাসিত হওয়া এবং ৩. অন্তরে ঈমানের হাকীকত উদ্ভাসিত হওয়া।
‘মুকাশাফা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: চোখে দেখার মতো কোনো বস্তু অন্তরে প্রকাশিত বা উদ্ভাসিত হওয়া। যার মধ্যে কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয় বাকি থাকে না। এটি হলো ঈমানের সর্বশেষ স্তর; ইহসানের স্তর।
কখনো কখনো মুকাশাফা দ্বারা তারা অন্য আরেকটি বিষয় বুঝিয়ে থাকেন। তা হলো, যা কেউ ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থার মাঝে শরীর থেকে রূহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার শুরুর দিকে দেখে থাকে।
আর যারা এই দুই ব্যাখ্যা ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে, তারা আসলে ভুলের মধ্যে রয়েছে। তারা সঠিক বিষয় উপলব্ধি করতে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে।
আবূ বকর ওয়ারাক বলেন, ‘ইয়াকীনের তিনটি স্তর রয়েছে-
১. খবর শুনে দৃঢ় বিশ্বাস করা (يَقِينُ خَبَرٍ), ২. দলীল-প্রমাণাদির মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস করা (يَقِينُ دَلَالَةٍ) এবং ৩. স্বচক্ষে দেখে বিশ্বাস করা (يَقِينُ مُشَاهَدَةٍ)।[৬৪১]
তিনি 'খবর শুনে দৃঢ় বিশ্বাস করা' দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়েছেন: খবরদাতার (রাসূলের) খবরের প্রতি অন্তরের স্থিরতা এবং তাতে নিশ্চিন্ত আস্থা রাখা। আর 'দলীল-প্রমাণাদির মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস করা' হলো আগের চেয়ে উঁচু স্তরের। এটি হলো দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে সাথে যে খবর প্রদান করেছে, দলীলের সাহায্যে তা প্রমাণ করা।
আর এটি হলো ঈমান, তাওহীদ ও কুরআনের অন্যান্য সাধারণ খবরের মতো। কেননা আল্লাহ তাআলা সমস্ত সত্যবাদীর চেয়ে বেশি সত্যবাদী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর খবরের সত্যতা সাব্যস্ত করার জন্য তিনি বান্দাদের জন্য দলীল, প্রমাণ ও উপমা পেশ করেছেন। ফলে তাদের জন্য দুই দিক থেকে ইয়াকীন হাসিল হয়: খবরের দিক দিয়ে এবং দলীল-প্রমাণের দিক দিয়ে।
আর এর মাধ্যমে বান্দা তৃতীয় স্তরে উন্নীত হয়। আর তা হলো স্বচক্ষে দেখে বিশ্বাস। এই স্তরে এসে বান্দার অন্তরে সেই খবরগুলো সম্পর্কে চোখে-দেখা-বস্তুর মতো আস্থা জন্মে। তখন অদৃশ্য বিষয়াবলির প্রতি বিশ্বাস, নিজ চোখে দেখা বস্তুর প্রতি বিশ্বাসের মতো হয়ে যায়; যেখানে কোনো দ্বিধা কিংবা সংশয় থাকে না। এটি হলো সর্বোচ্চ স্তরের মুকাশাফা (উদ্ভাসিত হওয়া)। এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন আমির ইবনু আবদি কাইস। তিনি বলেছিলেন, لَوْ كُشِفَ الْغِطَاءُ مَا ازْدَدْتُ يَقِينًا 'যদি পর্দা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, আমার ইয়াকীন একটুও বাড়বে না।' এটি আল্লাহর রাসূল -এর হাদীস নয় এবং এটি আলি ইবনু আবী তালিব -এর কথাও নয়। যেমনটি ধারণা করে থাকে হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞ কতিপয় ব্যক্তিবর্গ।
জ্ঞানীদের কেউ কেউ বলেছেন, 'আমি বাস্তবেই জান্নাত-জাহান্নাম দেখেছি।' তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'কীভাবে?' তিনি জবাব দেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ -এর দুচোখ দিয়ে তা দেখেছি। আর তাঁর চোখ দিয়ে দেখা, আমার নিকট আমার চোখ দিয়ে দেখার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। কারণ আমার চোখ মাঝে মাঝে ভুল দেখে এবং সঠিকতা নির্ণয় করতে বিচ্যুত হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ -এর চোখ তার সম্পূর্ণ বিপরীত। (তাঁর চোখ সবসময় সঠিক দেখে, কখনো বিচ্যুত হয় না।)'

টিকাঃ
[৬৩৫] সূরা বাকারা, ২: ৪-৫।
[৬৩৬] আবূ আবদির রহমান সুলামি, তবাকাতুস সূফিয়্যা, ৩৪৮।
[৬৩৭] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/৩১৮।
[৬৩৮] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়‍্যা, ১/৩১৮।
[৬৩৯] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৯/৩৬১।
[৬৪০] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/৩১১।
[৬৪১] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়‍্যা, ১/৩২১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00