📄 আদব বা শিষ্টাচারের প্রকারভেদ
আদব বা শিষ্টাচার তিন প্রকার-
এক. আল্লাহর সাথে শিষ্টাচার ( الْأَدَبُ مَعَ اللهِ), দুই. রাসূলের সাথে শিষ্টাচার ( الْأَدَبُ مَعَ الرَّسُوْلِ) এবং তিন. সৃষ্টিকুলের সাথে শিষ্টাচার (الْأَدَبُ مَعَ الخُلْقِ)।
এক. আল্লাহর সাথে শিষ্টাচার: আল্লাহ তাআলার সাথে শিষ্টাচার আবার তিন ভাগে বিভক্ত:
১. কাজকর্মকে ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে বাঁচানো, ২. অন্তরকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও দিকে ধাবিত হওয়া থেকে বাঁচানো এবং ৩. নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টিজনক স্থানে প্রয়োগ করা থেকে বাঁচানো।
আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে নবি-রাসূলদের অবস্থা, তাঁদের সম্বোধন, প্রার্থনা ইত্যাদি লক্ষ করলে আপনি উপলব্ধি করবেন যে, তাঁদের প্রতিটি বিষয়ই ছিল শিষ্টাচার ও আদবের গুণে গুণান্বিত।
ঈসা বলেছেন,
إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ
“যদি আমি তা বলে থাকি, তা হলে আপনি অবশ্যই তা জানেন।” [৬১৬]
তিনি এটা বলেননি যে, 'আমি তা বলিনি।' এ দুটি জবাবের মাঝে রয়েছে আসলে শিষ্টাচারের পার্থক্য। এরপর তিনি তার প্রকাশ্য ও গোপন বিষয়কে আল্লাহ তাআলার জ্ঞানে সমর্পণ করেন। তিনি বলেন,
تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي "আপনি তো আমার মনের কথাও জানেন।”
এরপর তিনি আল্লাহ তাআলার গায়িবের জ্ঞান ও তাঁর সাথে বিশেষিত জ্ঞান সম্পর্কে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করে বলেন,
وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ "আর আমি আপনার মনে যা আছে তা জানি না।"
এরপর আল্লাহ তাআলা যে গায়িব বা অদৃশ্যের জ্ঞান পরিপূর্ণরূপে জানেন, সে বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি তাঁর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন,
إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ “নিশ্চয় অদৃশ্য বিষয়ে আপনিই পরিপূর্ণরূপে জ্ঞাত।” [৬১৭]
এরপর তিনি এ বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, তিনি তার উম্মাহকে রবের হুকুম ব্যতীত অন্য কোনো হুকুম দিয়েছেন; এটি খাঁটি তাওহীদের পরিচয়। তিনি বলেন,
مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ "আমি তো তাদেরকে কিছুই বলিনি, শুধু সে কথাই বলেছি যা বলতে আপনি আদেশ করেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো; যিনি আমার ও তোমাদের পালনকর্তা।”
এরপর তিনি জানান যে, তিনি তার উম্মাতের মাঝে যত দিন ছিলেন, তত দিন তাদের দেখাশুনা করেছেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তাদের ব্যাপারে তার কোনো অবগতি ছিল না। তখনকার ব্যাপারে কেবল আল্লাহ তাআলাই জানেন। তিনি বলেন,
وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَّا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ "আমি তাদের সম্পর্কে অবগত ছিলাম, যত দিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তখন আপনিই ছিলেন তাদের তত্ত্বাবধায়ক ও সংরক্ষক।”[৬১৮]
এরপর ঈসা বলেছেন,
إِنْ تُعَذِّبُهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ
"আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তো তারা আপনারই বান্দা।"
ঈসা-এর এই ভঙ্গিতে কথা বলা তার সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিষ্টাচারের বহিঃপ্রকাশ ছিল। মালিক তার নিজ গোলামের প্রতি দয়া, করুণা ও অনুগ্রহ করবে এটাই তো স্বাভাবিক। আর এরা তো আপনারই গোলাম, অন্য কারও নয়। সুতরাং তারা আপনার গোলাম হওয়া সত্ত্বেও আপনি তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন না। যদিও তারা আপনার অবাধ্য গোলাম, আপনার আদেশ-নিষেধ পরিপূর্ণভাবে মেনে চলেনি, পাপাচারে লিপ্ত ছিল। তবে তারা গোলাম হওয়ার দরুন মালিকের অনুগ্রহ লাভের অধিকার রাখে। সাধারণ একজন মালিকও তার দাসদের প্রতি অনুগ্রহ করে, সেখানে আপনি (সব মালিকের মালিক,) সব দয়াবানদের চেয়ে দয়ালু, সমস্ত দানশীলদের চেয়েও দানশীল; আপনি কীভাবে শাস্তি প্রদান করবেন? যদি তাদের অপরাধ ও সীমালঙ্ঘন মাত্রা অতিক্রম করে এবং তারা পরিপূর্ণ শাস্তির উপযুক্ত হয়, তা হলে ভিন্ন কথা।
এরপর তিনি বলেন,
وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"আর যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে আপনিই মহাপরাক্রমশালী, মহাবিজ্ঞ।”[৬১৯]
ঈসা এখানে বলেননি, الْغَفُورُ الرَّحِيمُ 'পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু'। এটি আল্লাহর সাথে তার চূড়ান্ত শিষ্টাচারের পরিচয়। কারণ তিনি এটি বলেছেন তখন, যখন আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর রাগান্বিত এবং তিনি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে নিয়ে যাবেন। এমতাবস্থায় الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ বলাই অধিক সমীচীন এবং শিষ্টাচারের পরিচয়।
এমনিভাবে আল্লাহ তাআলার খলীল ইবরাহীম -এর শিষ্টাচার লক্ষ করুন। তিনি বলেন,
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ
“আর আমি যখন রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।”[৬২০]
এখানে তিনি বলেননি যে, 'যখন তিনি আমাকে রোগাক্রান্ত করেন...'। আল্লাহ তাআলার প্রতি শিষ্টাচার রক্ষার্থেই তিনি এভাবে বলেছেন। এমনিভাবে খিজির-এর শিষ্টাচারও দেখুন। যখন তিনি ত্রুটিযুক্ত জাহাজ এবং তার থেকে উত্তম কোনো জাহাজ দ্বারা এর বিনিময় করা সম্পর্কে বলেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন—
فَأَرَدْتُ أَنْ أَعِيبَهَا
“আমি ইচ্ছা করলাম যে, এটিকে ত্রুটিযুক্ত করে দিই।”[৬২১]
অথচ দুই বালকের ব্যাপারে বলেছেন,
فَأَرَادَ رَبُّكَ أَنْ يَبْلُغَا أَشُدَّهُمَا وَيَسْتَخْرِجَا كَنْزَهُمَا رَحْمَةٌ مِّنْ رَّبِّكَ
"সুতরাং আপনার পালনকর্তা দয়াবশতঃ ইচ্ছা করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পণ করুক এবং নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক।" [৬২২]
এমনিভাবে জিনদের মধ্যে যারা ঈমান গ্রহণ করেছিল তাদের কথা,
وَأَنَّا لَا نَدْرِي أَشَرٌّ أُرِيدَ بِمَنْ فِي الْأَرْضِ
"আমরা জানি না যে, পৃথিবীবাসীদের সাথে কোনো খারাপ আচরণ করার সংকল্প করা হয়েছে..."
এখানে তারা বলেননি যে, 'পৃথিবীবাসীদের সাথে তাদের রব কোনো খারাপ আচরণ করার সংকল্প করেছেন।' এরপর তারা বলেন,
أَمْ أَرَادَ بِهِمْ رَبُّهُمْ رَشَدًا
“নাকি তাদের রব তাদেরকে সঠিক পথ দেখানোর ইচ্ছা করেছেন?” [৬২৩]
এগুলোর চেয়েও উত্তম শিষ্টাচারের কথা হলো মূসা যা বলেছিলেন,
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
“হে আমার প্রতিপালক, যে অনুগ্রহই তুমি আমার প্রতি নাযিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী।” [৬২৪]
এখানে তিনি বলেননি, 'তুমি আমার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে দাও...
এই প্রকারের শিষ্টাচারের অন্যতম নমুনা হলো: নবি -এর এই আদেশ যে, নিজের গোপনাঙ্গকে আবৃত করে রাখবে, যদিও এমন স্থানে থাকো যে, তোমাকে কেউ না দেখে; (অথচ আল্লাহ দেখছেন)।৬২৫। আল্লাহ তাআলার প্রতি চূড়ান্ত শিষ্টাচার থেকেই নবি এই হুকুম দিয়েছেন। কারণ তিনি ছিলেন আল্লাহর অধিক নৈকট্যশীল, আল্লাহর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি অধিক লাজুক।
শিষ্টাচার বা আদবই হলো পরিপূর্ণ দ্বীন। কেননা লজ্জাস্থান ঢেকে রাখা, ওজু করা, ফরজ গোসল করা, নাপাকি ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্রতা অর্জন করা এবং পরিশেষে পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো সবই শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই আলিমগণ এটা মুস্তাহাব বলেছেন যে, সালাতে বান্দা আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর পূর্বে নিজেকে সুসজ্জিত করে নেবে।
আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা সালাতে সতর ঢাকার চেয়েও অতিরিক্ত একটি হুকুম দিয়েছেন। তা হলো, সৌন্দর্য অবলম্বন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ “হে বনী আদম, তোমরা প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর সাজে সজ্জিত হও।” [৬২৬]
এখানে আল্লাহ তাআলা সুসজ্জিত হতে আদেশ করেছেন, সতর ঢাকতে নয়। আর এ জন্য বান্দার উচিত সালাতে সবচেয়ে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা।'
উত্তম শিষ্টাচারের একটি হলো—নবি সালাত আদায়কারীকে তার দৃষ্টি আসমানের দিকে উঠাতে নিষেধ করেছেন। [৬২৭]
আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে বলতে শুনেছি, 'এটি সালাতের পরিপূর্ণ শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত যে, বান্দা তার রবের সামনে অপরাধীর ন্যায় দাঁড়াবে, জমিনের দিকে দৃষ্টি অবনত রাখবে, ওপরের দিকে দৃষ্টি উঠাবে না।'
মূলকথা হলো: আল্লাহর সাথে শিষ্টাচার মানে তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণরূপে আঁকড়ে ধরা এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহর রঙে রঙিন হওয়া।
তিনটি বিষয় ব্যতীত কেউ আল্লাহ তাআলার সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণ করতে পারে না:
১. আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে জানা,
২. তাঁর দ্বীন, শারীআত, তিনি কী পছন্দ করেন, কী অপছন্দ করেন সে সম্পর্কে জানা এবং
৩. সত্য গ্রহণে উপযোগী ও কোমল আত্মার অধিকারী হওয়া, যা সব পরিস্থিতিতেই হক ও ন্যায় গ্রহণে প্রস্তুত থাকে। আল্লাহ তাআলাই একমাত্র সাহায্য-লাভের উৎস।
দুই. রাসূলের সাথে শিষ্টাচার: পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে অসংখ্য দিকনির্দেশনা এসেছে-
রাসূলুল্লাহ -এর সাথে শিষ্টাচারের মূল কথা হলো: সম্পূর্ণরূপে তাঁকে মেনে নেওয়া, তাঁর আনীত বিষয়াদির প্রতি আত্মসমর্পণ করা, তিনি যে খবর নিয়ে এসেছেন, তা পরিপূর্ণরূপে সত্যায়ন করা ও গ্রহণ করা; কোনো প্রকার যুক্তি, সংশয়, ব্যক্তিগত অভিমত ও গবেষণার প্রতি দৃষ্টি দেওয়া ছাড়াই। সুতরাং হুকুম দানের ক্ষেত্রে, আনুগত্য করার ক্ষেত্রে, আত্মসমর্পণ ও মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ -কে একক বলে ঘোষণা দিতে হবে এবং বাস্তবে সে অনুযায়ী আমল করতে হবে। যেমন আল্লাহ তাআলাকে ইবাদাত, একনিষ্ঠতা, নিজেকে তাঁর সামনে মিটিয়ে দেওয়া, তাঁর দিকে ধাবিত হওয়া এবং তাঁর ওপর ভরসা করার ক্ষেত্রে একক বলে বিশ্বাস করা ও মানা জরুরি।
এই দুই প্রকার তাওহীদ ব্যতীত আখিরাতে আল্লাহর শাস্তি থেকে বান্দার মুক্তি মিলবে না। আল্লাহ তাআলার তাওহীদ এবং রাসূল -এর আনুগত্যের ক্ষেত্রে তাওহীদ। সুতরাং নবিকে ছাড়া আর কাউকে বিচারক মানা যাবে না এবং তাঁর ফায়সালা ছাড়া অন্য কারও ফায়সালায় সন্তুষ্ট হওয়া যাবে না।
রাসূলের সাথে আরেকটি আদব হলো—কোনো আদেশ, নিষেধ, অনুমতি দেওয়া-নেওয়া বা অন্য কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে অগ্রগামী না হওয়া; যতক্ষণ- না তিনি এর আদেশ করেন, নিষেধ করেন কিংবা অনুমতি দেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُوْلِهِ
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে অগ্রগামী হয়ো না।”[৬২৮]
এই হুকুম কিয়ামাত পর্যন্ত কার্যকর থাকবে, এটি রহিত হয়নি। সুতরাং তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর সুন্নাতের চেয়ে অগ্রবর্তী হওয়া, তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সামনে অগ্রবর্তী হওয়ার মতোই (খারাপ)। সুস্থবোধসম্পন্ন ব্যক্তির নিকট এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
রাসূলের সাথে আরেকটি আদব হলো—তাঁর আওয়াজের চেয়ে আওয়াজ উঁচু না করা। কেননা এটি সমস্ত আমল বরবাদ হওয়ার কারণ। সুতরাং সিদ্ধান্ত ও চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাহ এবং তিনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তার ওপর অন্য কিছুকে প্রাধান্য দেওয়া হলে আপনার কী ধারণা? তা কী আমল কবুল হওয়ার কারণ হবে, যখন রাসূলের আওয়াজের চেয়ে আওয়াজ উঁচু করাই আমল বরবাদের কারণ?!
রাসূলের সাথে আরেকটি আদব হলো—সাহাবায়ে কেরাম যখন নবি -এর সাথে কোনো সম্মিলিত কাজে অংশগ্রহণ করতেন, যেমন: কোনো বক্তৃতা শোনা, জিহাদ করা বা পাহারা দেওয়া—তখন কেউ নিজ প্রয়োজনেও ততক্ষণ পর্যন্ত সেখান থেকে চলে যেতেন না, যতক্ষণ-না তাঁর অনুমতি গ্রহণ করতেন।
তিন. সৃষ্টিকুলের সাথে শিষ্টাচার: সমগ্র সৃষ্টির সাথে শিষ্টাচার বা আদব হলো—সবার মর্যাদা ও স্তরের প্রতি লক্ষ রেখে তাদের সাথে যথোপযুক্ত ব্যবহার করা। প্রতিটি স্তরের ক্ষেত্রে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আদব। আর কিছু কিছু স্তরের জন্য রয়েছে বিশেষ আদব।
সুতরাং মাতা-পিতার সাথে রয়েছে বিশেষ আদব। আবার শুধু পিতার জন্য রয়েছে বিশেষ আদব, যা কেবল তাঁর জন্যই প্রযোজ্য।
আলিমদের সাথে রয়েছে আলাদা আদব বা শিষ্টাচার। রাজা-বাদশাদের সাথে রয়েছে তাদের মর্যাদা অনুসারে আলাদা শিষ্টাচার। সমবয়সিদের সাথে তাদের স্তর অনুপাতে রয়েছে শিষ্টাচার। অপরিচিতের সাথে শিষ্টাচার আর পরিচিত ও ঘনিষ্ঠজনদের সাথে শিষ্টাচার এক নয়। এমনিভাবে মেহমানের সাথে ও পরিবারের লোকজনদের সাথেও রয়েছে আলাদা আলাদা শিষ্টাচার।
আবার প্রতিটি পরিবেশের জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন শিষ্টাচার। খাওয়ার জন্য এক ধরনের আদব, পান করার জন্য রয়েছে আরেক ধরনের আদব। আরোহণ করা, প্রবেশ করা, বের হওয়া, সফর করা, একজায়গায় অবস্থান করা, ঘুমানো, প্রশ্রাব করা, কথা বলা, চুপ থাকা, অপরের কথা শোনা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে রয়েছে আলাদা আলাদা আদব বা শিষ্টাচার।
উত্তম শিষ্টাচার হলো ব্যক্তির সফলতা ও সৌভাগ্যের শিরোনাম। আর মন্দ বা কম শিষ্টাচার হলো তার ব্যর্থতা ও দুর্ভাগ্যের শিরোনাম।
সুন্দর আদবের মাধ্যমে দুনিয়া-আখিরাতের অনেক কল্যাণ অর্জন করা যায়। আর মন্দ ও খারাপ আদবের কারণে জোটে বঞ্চনা আর লাঞ্ছনা।
সুতরাং মা-বাবার প্রতি শিষ্টাচারের ফল দেখুন, কীভাবে তাদের প্রতি শিষ্টাচারী ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা পাহাড়ের গুহা থেকে রক্ষা করেছিলেন, যখন পাথর এসে গুহার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল? [৬২৯]
আর মায়ের সাথে আদব রক্ষা না করায় আল্লাহর ইবাদাতগুজার বান্দা (জুরাইজকে) কী রকম পরীক্ষা দিতে হয়েছিল? তাকে অপকর্মের অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, তার ইবাদাতখানা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল এবং তাকে পতিতা নারীদের সামনে আনা হয়েছিল!! [৬৩০]
প্রত্যেক দুর্ভাগা, ব্যর্থ ও অসফল ব্যক্তি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করলে দেখবেন, তাদের দুর্ভাগ্য, ব্যর্থতা ও অসফলতার মূলে রয়েছে আদবের ঘাটতি, (অর্থাৎ খারাপ ব্যবহার ও মন্দ শিষ্টাচার।)
দেখুন, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ-এর সাথে মন্দ আচরণ করার কারণে আওফ ইবনু মালিক কীভাবে গনীমাতের মাল পেয়েও বঞ্চিত হয়েছেন?[১০১]
সালাতে সামনে যাওয়ার ক্ষেত্রে নবি -এর সাথে আবূ বকর সিদ্দীক-এর আদব লক্ষ করুন-আবূ বকর বলেছিলেন,
مَا كَانَ يَنْبَغِي لِابْنِ أَبِي قُحَافَةَ أَنْ تُصَلَّى بَيْنَ يَدَى رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
'আবু কুহাফার পুত্রের জন্য আল্লাহর রাসূল -এর সামনে দাঁড়িয়ে (ইমাম হিসেবে) সালাত আদায় করা শোভনীয় নয়।[৬৩২]
তিনি কীভাবে (আদবের মাধ্যমে) রাসূল -এর পর তাঁর মর্যাদা ও উম্মাতের ইমাম হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছেন?! সেদিন আবূ বকর-এর পেছনে সরে আসাই তাকে অনেক দূর সামনে এগিয়ে দিয়েছে। যদিও রাসূল তাকে আপন জায়গাতেই থাকতে বলেছিলেন।
টিকাঃ
[৬০৬] সূরা তাহরীম, ৬৬ : ৬।
[৬০৭] তাবারি, তাফসীর, ২৩/১০৩।
[৬০৮] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৪৪৫।
[৬০৯] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৪৪৬।
[৬১০] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৪৪৭।
[৬১১] আবূ বকর মালিকি, রিয়াদুন নুফুস, ১/২৩০।
[৬১২] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৪৪৭।
[৬১৩] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৪৪৭।
[৬১৪] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৪৪৮।
[৬১৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৪৪৮।
[৬১৬] সূরা মায়িদা, ৫: ১১৬।
[৬১৭] সুরা মায়িদা, ৫: ১১৬।
[৬১৮] সূরা মায়িদা, ৫: ১১৭।
[৬১৯] সূরা মায়িদা, ৫: ১১৮।
[৬২০] সূরা শুআরা, ২৬: ৮০।
[৬২১] সূরা কাহফ, ১৮: ৭৯।
[৬২২] সূরা কাহফ, ১৮: ৮২।
[৬২৩] সূরা জিন, ৭২: ১০।
[৬২৪] সূরা কাসাস, ২৮: ২৪।
[৬২৫] আবূ দাউদ, ৪০১৭।
[৬২৬] সূরা আ'রাফ, ৭:৩১।
[৬২৭] বুখারি, ৭৫০।
[৬২৮] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১।
[৬২৯] বিস্তারিত দেখুন-বুখারি, ২২১৫, ৫৯৭৪; মুসলিম, ২৭৪৩।
[৬৩০] বিস্তারিত দেখুন-বুখারি, ১২০৬; মুসলিম, ২৫৫০।
[৬৩১] আওফ ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'হিমইয়ার গোত্রের একব্যক্তি শত্রুদলের একব্যক্তিকে হত্যা করল, ফলে সে তার পরিত্যক্ত সম্পদগুলো নিতে চাইল। কিন্তু খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ তাকে নিষেধ করলেন। তিনি তখন তাদের সেনাপতি ছিলেন। কিন্তু আওফ ইবনু মালিক রাসূলুল্লাহ -এর নিকট আসলেন এবং ওই ঘটনা সম্পর্কে জানালেন। তখন রাসূলুল্লাহ খালিদ -কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ তাকে দিতে কীসে তোমাকে বাধা দিলো?' খালিদ বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি তার অনেক সম্পদ পেয়েছি।' তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তাকে তা দিয়ে দাও।' তারপর খালিদ আওফ ইবনু মালিক -এর কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি খালিদ -এর চাদর ধরে টান দিয়ে বললেন, 'আমি তো আগেই বলেছিলাম ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ -এর নিকট পৌঁছাবো, তাই হয়নি কি?' রাসূলুল্লাহ তা শুনতে পেলেন। এতে তিনি রাগান্বিত হলেন এবং বললেন, 'হে খালিদ, তুমি তাকে তা দেবে না। হে খালিদ, তুমি তাকে তা দেবে না। তোমরা কি আমার খাতিরে আমার সেনাপতিদের একটু ছাড়ও দেবে না? নিশ্চয় তোমাদের এবং তাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোনো ব্যক্তি উট কিংবা ছাগল চরাতে মনস্থ করল, অতঃপর মাঠে নিয়ে গিয়ে চরালো। তার পর পিপাসার সময় পানি পান করানোর জন্য জলাশয়ে নিয়ে গেল। ফলে পশুগুলো পরিষ্কার পানি পান করতে শুরু করল আর ঘোলাটে পানি পরিত্যাগ করল। সুতরাং (এখন কি তোমরা এটাই চাও যে,) পরিষ্কারটা তোমাদের জন্য হোক এবং অপরিষ্কারটা হোক তোমাদের নেতাদের জন্য?'-মুসলিম, ১৭৫৩।
[৬৩২] বুখারি, ১২১৮; মুসলিম, ৪২১।