📄 মানযিল : বিনয় (اَلتَّوَاضُعُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-বিনয়ের মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا
"রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।”[৫৭৩]
অর্থাৎ স্থিরতা, গাম্ভীর্য ও বিনয়ের সাথে পথ চলে। দাম্ভিকতা, অহংকার ও গর্বের সাথে নয়। হাসান বাসরী বলছেন, 'তারা হলেন জ্ঞানী ও সহনশীল সম্প্রদায়।' মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা বলেছেন, 'গাম্ভীর্যপূর্ণ ও পবিত্র ব্যক্তিগণ, যারা মূর্খতাসুলভ আচরণ থেকে দূরে থাকেন। আর তাদের সাথে কোনো অশোভনীয় আচরণ করা হলে, তারা তা সহ্য করেন।'
'সহীহ মুসলিম'-এ এসেছে, ইয়ায ইবনু হিমার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَى أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ وَّلَا يَبْغِيَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ
"আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহি পাঠিয়েছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, কেউ যেন কারও ওপর গর্ব না করে এবং কেউ যেন কারও প্রতি অবিচার না করে।” [৫৭৪]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِّنْ كِبْرٍ
"যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।"[৫৭৫]
'সহীহাইন'-এর বর্ণনায় এসেছে, নবি বলেছেন,
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ كُلُّ عُتُلٍ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ
"আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামবাসীর পরিচয় জানাব না? তারা হবে প্রত্যেক নিষ্ঠুর, দাম্ভিক ও অহংকারী লোক।”[৫৭৬]
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ জান্নাত-জাহান্নামের তর্কবিতর্ক সম্পর্কে বলেছেন, "জাহান্নাম বলবে,
مَا لِي لَا يَدْخُلُنِي إِلَّا الْجَبَّارُوْنَ وَالْمُتَكَبِّرُونَ
'আমার কী হলো, আমার মধ্যে কেবল দাম্ভিক ও অহংকারীরাই প্রবেশ করছে!'
জান্নাত বলবে,
مَا لِي لَا يَدْخُلُنِي إِلَّا ضُعَفَاءُ النَّاسِ وَسَقَطُهُمْ
'আমার কী হলো, আমার মধ্যে কেবল দুর্বল ও অসহায় ব্যক্তিরাই প্রবেশ করছে!'[৫৭৭]
'সহীহ মুসলিম'-এর এক বর্ণনায় এসেছে, আবূ সাঈদ খুদরি ও আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
الْعِزُّ إِزَارُهُ، وَالْكِبْرِيَاءُ رِدَاؤُهُ، فَمَنْ يُنَازِعُنِي عَذَّبْتُهُ
"সম্মান হলো আল্লাহ তাআলার জামা আর অহংকার হলো তাঁর চাদর। (আল্লাহ বলেন) যে ব্যক্তি আমার সাথে তা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করবে, আমি অবশ্যই তাকে শাস্তি দেবো।”[৫ ৭৮]
নবি ছোটো ছোটো শিশুদের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদেরকে সালাম দিতেন।[৫৭৯]
দাসীও রাসূলুল্লাহ -এর হাত ধরে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেত। আর তিনিও তার সাথে তার ইচ্ছামতো চলে যেতেন।[৫৮০]
নবি যখন ঘরে থাকতেন, ঘরের লোকজনকে তাদের কাজে সাহায্য করতেন।[৫৮১]
আল্লাহর রাসূল নিজের জুতা নিজেই মেরামত করতেন, নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন, পরিবারের লোকজনদের জন্য বকরির দুধ দোহন করতেন, খাদিমের সঙ্গে বসে খাবার খেতেন, ইয়াতীম ও বিধবাদের প্রয়োজন পুরা করতেন, কারও সাথে দেখা হলে তিনিই আগে সালাম দিতেন আবার কেউ দাওয়াত করলে তা গ্রহণ করতেন, তা যত সামান্য বস্তুর জন্যই হোক না কেন।
নবি বলেছেন,
لَوْ دُعِيْتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لَأَجَبْتُ وَلَوْ أُهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعٌ لَقَبِلْتُ
"যদি আমাকে পশুর পায়া বা হাতা খেতে দাওয়াত করা হয়, তবুও আমি তা কবুল করব। আর যদি আমাকে পায়া বা হাতা হাদিয়া দেওয়া হয়, তা হলে অবশ্যই আমি তা গ্রহণ করব।”[৫৮২]
নবি অসুস্থ ব্যক্তিদের দেখতে যেতেন, জানাযায় উপস্থিত হতেন এবং গোলাম বা দাসের দাওয়াতও কবুল করতেন।
ফুযাইল ইবনু ইয়ায-কে একবার বিনয় ( تواضع ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। উত্তরে তিনি বললেন, 'বিনয় হলো-হক ও সত্যের প্রতি নত হওয়া, তা মেনে নেওয়া এবং তা যে-ই বলুক, তার থেকে তা গ্রহণ করা।'[৫৮৩]
কেউ কেউ বলেছেন, 'বিনয় হলো নিজেকে মূল্যহীন দেখা। যে নিজেকে মূল্যবান মনে করে, বিনয়ে তার কোনো অংশ নেই।' এটি ফুযাইল-সহ আরও কতিপয় আলিমের মত।[৫৮৪]
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, 'তাওয়াজু' হলো: ডানাকে নত করা এবং পার্শ্বকে নরম করা।'
আবূ ইয়াযীদ বুসতামি বলেছেন, 'নিজের কোনো মর্যাদা ও অবস্থান চোখে না পড়া এবং সৃষ্টির মধ্যে নিজের থেকে খারাপ আর কাউকে না দেখা।'[৫৮৫]
ইবনু আতা বলেছেন, 'বিনয় হলো সত্যকে গ্রহণ করা, তা যার কাছেই থাকুক। আর বিনয়ের মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত সম্মান। যে ব্যক্তি অহংকারের মধ্যে তা তালাশ করে, সে ওই ব্যক্তির মতো যে আগুনের মধ্যে পানি খোঁজে।'
উরওয়া ইবনুয যুবাইর বলেন, 'আমি উমর ইবনুল খাত্তাব-এর কাঁধে পানির মশক দেখে বললাম, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার জন্য এটা শোভা পায় না।' জবাবে তিনি বললেন, 'বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদল যখন নত হয়ে, আনুগত্য স্বীকার করে আমার কাছে আসে, তখন আমার অন্তরে কিছুটা অহমিকা চলে আসে, আমি পছন্দ করি যে, তা ভেঙে দিই।'[৫৮৬]
আবূ হুরায়রা একবার আমীর নিযুক্ত হলেন। তখন তিনি নিজের পিঠে করে কাঠের বোঝা বহন করতেন আর বলতেন, 'আমীরকে পথ করে দাও, আমীরকে পথ করে দাও!'[৫৮৭]
রজাহ ইবনু হাইওয়া বলেন, 'উমর ইবনু আবদিল আযীয যে পোশাক পরে খুতবা দিতেন, তার মূল্য ছিল মাত্র বারো দিরহাম। পোশাকের মধ্যে ছিল-একটি জুব্বা, একটি পাজামা, একটি পাগড়ি, দুটি মোজা আর একটি টুপি।'[৫৮৮]
মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি' তার এক ছেলেকে দেখলেন দাম্ভিকতার সাথে হাঁটছে। তখন তিনি তাকে বললেন, 'তুমি জানো, তোমার মাকে আমি কত দিরহাম দিয়ে কিনেছি? মাত্র তিনশ দিরহাম। আর তোমার বাবা? আমি! আল্লাহ যেন মুসলমানদের মধ্যে তার মতো অধিক (মানুষ) না বানান! আর তুমি এভাবে দাম্ভিকতার সাথে হাঁটছো!? [৫৮৯]
আল্লাহর সাথে সর্বপ্রথম যে গুনাহ করা হয়েছে তা হলো-অহংকার ও লোভ। অহংকার ছিল অভিশপ্ত ইবলীসের গুনাহ। আর এর পরিণতি যা হবার তা-ই হয়েছে। আর লোভ ও খাহেশ ছিল আদম-এর গুনাহ। যার পরিণতি হয়েছিল তাওবা ও হিদায়াত। ইবলীসের গুনাহ তাকে হঠকারিতা, বড়োত্ব আর মর্যাদা পাওয়ার জন্য তর্কবিতর্কের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অপরদিকে আদম-এর গুনাহ তাকে নিজেকে দোষী বলে স্বীকার করতে এবং ইস্তিগফার করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
সুতরাং অহংকারী, হঠকারী ও দাম্ভিক ব্যক্তিদের ঠিকানা হবে তাদের শাইখ ও নেতা ইবলীসের সাথে জাহান্নামে। অপরদিকে অপরাধে লিপ্ত ও লোভী ব্যক্তি, যারা ইস্তিগফার করে, তাওবা করে, নিজের দোষ স্বীকার করে এবং বড়োত্ব লাভের জন্য তর্কবিতর্ক করে না, তাদের ঠিকানা হবে তাদের পিতা আদম-এর সাথে জান্নাতে।
আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘অহংকার হলো শিরকের চেয়েও নিকৃষ্ট। কারণ অহংকারী ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের ক্ষেত্রেও অহংকার করে। আর মুশরিক আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করে, তবে তার সাথে অন্যান্য উপাস্যেরও ইবাদাত করে।’ আল্লাহর রাসূল বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِّنْ كِبْرٍ
"যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" ২৯০।
টিকাঃ
[৫৭৩] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩।
[৫৭৪] মুসলিম, ২৮৬৫।
[৫৭৫] মুসলিম, ৯১।
[৫৭৬] বুখারি, ৪৯১৮; মুসলিম, ২৮৫৩।
[৫৭৭] বুখারি, ৪৮৫০; মুসলিম, ২১৪৬।
[৫৭৮] মুসলিম, ২৬২০।
[৫৭৯] বুখারি, ৬২৪৭; মুসলিম, ২১৬৮।
[৫৮০] বুখারি, ৬০৭২।
[৫৮১] বুখারি, ৬৭৬।
[৫৮২] বুখারি, ২৫৬৮।
[৫৮৩] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশূক, ৪৮/৪১৯।
[৫৮৪] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশুক, ৪৮/৪১৯।
[৫৮৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৭৯।
[৫৮৬] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৭৯।
[৫৮৭] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক। ৬৭/৩৭৩।
[৫৮৮] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/৩২২।
[৫৮১] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক, ৩/৭২।
[৫৯০] মুসলিম, ৯১।
📄 মানযিল : মানবিকতা (اَلْمُرُوءَةُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-মানবিকতার মানযিল।
الْمُرُوْءَةُ হলো-আত্মাকে মানবিক গুণাবলিতে গুণান্বিত করা; যে গুণগুলোর মাধ্যমে প্রাণী ও অভিশপ্ত শয়তান থেকে মানুষ পৃথক হয়ে যায়।
ফকীহগণ এর সংজ্ঞায় বলেছেন, ' যা ব্যক্তিকে সুন্দর ও উত্তম গুণাবলিতে সুসজ্জিত করে, তা আঁকড়ে ধরা আর যা তাকে ত্রুটিযুক্ত ও মন্দ স্বভাবের বানায়, তা পরিত্যাগ করা।'
কেউ কেউ বলেছেন, 'সব ধরনের ভালো ও উত্তম আচরণ প্রয়োগ করা এবং সব ধরনের খারাপ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা।'
মুরূআত বা মানবিকতার মূল তাৎপর্য হলো-কথায়, কাজে এবং স্বভাব-চরিত্রে সমস্ত নীচতা ও হীনতা পরিহার করে চলা।
সুতরাং জিহ্বার মুরূআত : মিষ্টতা, পবিত্রতা ও কোমলতা এবং সহজ ও প্রাঞ্জলতার মাধ্যমে এর উপকারী ফল লাভ করা।
স্বভাব-চরিত্রের মুরূআত : প্রিয়জন ও দুশমন সবার প্রতিই অন্তর প্রশস্ত রাখা এবং হাসিখুশি ব্যবহার করা।
সম্পদের মুরূআত : যৌক্তিক, সামাজিক ও শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে কেবল প্রশংসনীয় খাতে তা ব্যয় করা।
ক্ষমতার মুরূআত : অভাবী ব্যক্তির প্রয়োজনে ক্ষমতাকে কাজে লাগানো।
দয়া-অনুগ্রহের মুরূআত: দ্রুততার সাথে বেশি বেশি দয়া ও অনুগ্রহ করতে থাকা। কারও প্রতি ইহসান করার সময় এর পরিমাণের দিকে না দেখা এবং ইহসান করার পর তা ভুলে যাওয়া।
এগুলো হলো সুন্দর ও উত্তম গুণাবলি দ্বারা নিজেকে সুসজ্জিত করার মানবিকতা।
আর মন্দ ও খারাপ গুণাবলি থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে মুরূআত হলো: ঝগড়া করা থেকে বিরত থাকা; এমনিভাবে নিন্দা করা, কারও নিকট হাতপাতা এবং তর্কবিতর্ক করা থেকে বিরত থাকা। এর তিনটি স্তর রয়েছে—
প্রথম স্তর: ব্যক্তির নিজের সাথে মানবিকতা (مُرُوْءَةُ الْمَرْءِ مَعَ نَفْسِهِ): এটি ব্যক্তিকে সমস্ত ভালো গুণাবলির দ্বারা সজ্জিত হওয়ার দিকে এবং খারাপ গুণাবলি ছেড়ে দেওয়ার দিকে মনোযোগী হতে বাধ্য করে।
দ্বিতীয় স্তর : অন্যান্য সবার সাথে মানবিকতা (الْمُرُوْءَةِ مَعَ الخُلْقِ): এটি হলো সবার সাথে শিষ্টাচার, ভদ্রতা, লজ্জাশীলতা এবং উত্তম আদব-আখলাকের সাথে মেলামেশা করা।
তৃতীয় স্তর : আল্লাহর সাথে মানবিকতা (الْمُرُوْءَةُ مَعَ الْحَقِّ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى): আল্লাহ তাআলা আপনাকে দেখছেন এবং তিনি আপনার প্রতিটি বিষয়ে খুঁটিনাটি সবকিছু অবগত আছেন—এই ভাবনায় আল্লাহকে লজ্জা পাওয়া। আর নিজের নফসের দোষত্রুটিগুলোকে সংশোধন করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করা।
উত্তম চরিত্র ও উদারতার মানযিলে যে আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে, সে আলোচনা এই মানযিলেও প্রযোজ্য।
📄 মানযিল : ইচ্ছা (اَلْإِرَادَةُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো—ইচ্ছা বা ইরাদার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ “আর তাদেরকে তাড়িয়ে দেবেন না, যারা সকাল-বিকাল তাদের রবের ইবাদাত করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের ইচ্ছা করে।” [৬০০]
সুফিয়ায়ে কেরামের নিকট ইচ্ছার মানযিলের মূলকথা হলো—ইচ্ছাশূন্য হওয়া।[৬০২]
এই বিষয়ে অনেকের অনেক বক্তব্য রয়েছে। অধিকাংশের অভিমত হলো—ইরাদা হচ্ছে: অভ্যাস পরিত্যাগ করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের কাজগুলো অভ্যাসের বশে অন্যমনস্কতার সাথে এবং প্রবৃত্তির আহ্বানে সাড়া দিতে গিয়ে সম্পন্ন হয়। কিন্তু আল্লাহর-পথের-পথিক বা মুরীদ এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তার থেকে (তার নিজস্ব) ইচ্ছাকে দূর করা হয়। আল্লাহর পথের পথিকের ব্যক্তিগত ইচ্ছা থেকে বের হয়ে যাওয়াটাই হচ্ছে, তার শুদ্ধ ইচ্ছার আলামত ও প্রমাণ।
কেউ কেউ বলেছেন, 'সত্যের সন্ধানে অন্তরকে জাগ্রত করা।'
দাক্কাক বলেছেন, 'ইরাদা হলো : অন্তরে জ্বলন, অস্থিরতা ও আসক্তি সৃষ্টি হওয়া এবং নিজের ভেতরে এমন তোলপাড় ও আগুন অনুভব করা, যা হৃদয়কে দগ্ধ করে দেয়।' [৬০২]
কেউ কেউ বলেছেন, 'মুরীদের অন্যতম গুণাবলি হলো—বেশি বেশি নফল আমলের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা, উম্মাতের কল্যাণকামিতায় একনিষ্ঠ হওয়া, একাকিত্ব ভালো লাগা, আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালনে কষ্ট সহ্য করা, সর্বাবস্থায় আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে প্রাধান্য দেওয়া, 'আল্লাহ দেখছেন' এই ভেবে লজ্জা অনুভব করা, তাঁর প্রিয় ক্ষেত্রগুলোতে সাধ্যমতো পরিশ্রম করা, যে সমস্ত মাধ্যম আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, তা আঁকড়ে ধরা, অল্পে পরিতুষ্ট হওয়া এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অন্তর স্থির না হওয়া।'
আবার কেউ কেউ বলেছেন, 'মুরীদ বা আল্লাহকে-চিনতে-ইচ্ছুক ব্যক্তির গুণাবলির মধ্যে অন্যতম হলো—সে কেবল তখনই ঘুমাবে, যখন চোখ খোলা রাখতে অপারগ হবে; সে কেবল তখনই আহার করবে, যখন প্রচণ্ড ক্ষুধা অনুভব করবে আর সে কেবল তখনই কথা বলবে, যখন তার কথা বলা জরুরি হবে।'
আবূ উসমান হারীরি বলেছেন, 'পথচলার শুরুতেই যার ইচ্ছা শুদ্ধ হবে না, তার পথচলা তাকে কেবল উলটো দিকেই নিয়ে যাবে।' [৬০৩]
তিনি আরও বলেছেন, 'মুরীদ যখন কোনো জ্ঞানের কথা শোনে আর সে অনুযায়ী আমল করে, তখন তা একটি হিকমত হিসেবে আজীবন তার অন্তরে থেকে যায়, যা তার উপকার করে এবং যখন কথা বলে, তখন শ্রোতারা এর মাধ্যমে উপকৃত হয়। অপরদিকে কেউ যখন কোনো জ্ঞানের কথা শোনে; কিন্তু সে অনুযায়ী আমল করে না, তখন তা একটি ঘটনা হিসেবে সে কয়েক দিন স্মরণ রাখতে পারে, অতঃপর ভুলে যায়।' [৬০৪]
ওয়াসিতি বলেছেন, 'মুরীদের সর্বপ্রথম স্তর হলো—আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার মাঝে নিজের ইচ্ছাকে বিলীন করে দেওয়া'।[৬০৫]
টিকাঃ
[৬০০] সূরা আনআম, ৬:৫২।
[৬০২] আবদুল কারীম কুশাইরি তার ‘আর-রিসালাহ (২/৩৫১)’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘ইচ্ছা বা ইরাদা হলো আল্লাহ-অভিমুখীদের পথের শুরু। এটি হলো এই পথের প্রথম মানযিল। একে ‘ইরাদা’ করে নামকরণের কারণ হলো: সবকিছুর শুরুতেই ইচ্ছা বা ইরাদা থাকে। কেউ যদি কোনোকিছুর ইচ্ছাই না করে, তা হলে তার আর সেই কাজ করা হয়ে ওঠে না। ইচ্ছা বা ইরাদা আল্লাহর-পথের-পথিকদের পথচলার শুরু হওয়ার কারণে বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের প্রথম মানযিলের নাম রাখা হয়েছে ইচ্ছা বা ইরাদার মানযিল। সুতরাং শব্দের দিকে লক্ষ করলে ‘মুরীদ’ তাকেই বলা হবে, যার ইরাদা রয়েছে; যেমন আলিম তাকেই বলা হয়, যার ইলম রয়েছে। কিন্তু সুফিয়ায়ে কেরামের পরিভাষায় ‘মুরীদ’ তাকেই বলা হয়, যার নিজস্ব কোনো ইচ্ছা বা ইরাদা থাকে না। সুতরাং তাদের পরিভাষায় যে ব্যক্তি ইচ্ছাশূন্য হতে পারে না, তাকে মুরীদ বলা হয় না; যেমন শব্দের দিকে লক্ষ করলে যার ইচ্ছা থাকবে না, তাকে মুরীদ বলা হবে না।’
[৬০২] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৩৫২।
[৬০৩] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৫৩।
[৬০৪] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৫৪।
[৬০৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৫৪।
📄 মানযিল : আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা (اَلْأُنْسُ بِاللَّهِ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতার মানযিল।
ঘনিষ্ঠতা হলো: আনুগত্য ও মহাব্বতের ফল। সুতরাং প্রত্যেক অনুগত বান্দাই আল্লাহর ঘনিষ্ঠ। আর প্রত্যেক অপরাধীই নিঃসঙ্গ। যেমন কবি বলেছেন:
فَإِنْ كُنْتَ قَدْ أَوْحَشَتْكَ الذُّنُوبُ فَدَعْهَا إِذَا شِئْتَ وَاسْتَأْنِسِ
'পাপাচার যদি তোমাকে ডুবিয়ে দেয় নিঃসঙ্গতায়; তা হলে যখন ইচ্ছা তুমি তা ছেড়ে দাও নির্দ্বিধায়, আর নিমগ্ন হও আপন প্রভুর নিবিড় ঘনিষ্ঠতায়।'
সালিক বা আখিরাতের পথের পথিক আল্লাহর যিক্সের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা অর্জন করে। আর কুরআন শ্রবণে তার অন্তর শক্তিশালী হয়, যেমন খাদ্য ও পানীয় দ্বারা শরীর শক্তিশালী হয়।
কেউ যদি সত্যিকারার্থেই আল্লাহকে ভালোবাসে, তাঁর সন্তুষ্টি তালাশ করে এবং সে অনুযায়ী আমল করে, তা হলে তার অন্তরের খাদ্য ও খোরাক হবে কুরআন শ্রবণ; যেমন এটি সেই সমস্ত ব্যক্তিদের আত্মিক খোরাক ছিল, যাঁরা ছিলেন এই উম্মাতের জ্ঞানীদের নেতা, যাঁদের অন্তর ছিল সবচেয়ে পবিত্র এবং যাঁদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে বিশুদ্ধ। তাঁরা হলেন সাহাবায়ে কেরাম।
আর কেউ যদি পথচ্যুত, ধোঁকাগ্রস্ত ও নিকৃষ্ট অবস্থার অধিকারী হয়, তা হলে তার অন্তরের খাবার হবে সংগীত; যেটা শয়তানের কুরআন। যাতে প্রবৃত্তির ও নফসের চাহিদা থাকে বেশ প্রাণবন্ত। আল্লাহ থেকে এদের অবস্থান হয় অনেক দূরে, আল্লাহর মাঝে ও তাদের মাঝে রয়েছে মোটা পর্দা; যদিও তারা নিজেকে আল্লাহওয়ালা বলে দাবি করে থাকে।
কুরআন শ্রবণ হলো আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ও সঠিক পথপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শ্রবণ। কুরআন শ্রবণের দ্বারা স্বচ্ছ মস্তিষ্কে অনেক ধরনের সূক্ষ্মজ্ঞান, ইঙ্গিত, মা'রিফাত ও তত্ত্বকথা হাসিল হয়, যা দ্বারা আল্লাহ তাআলার সাথে অন্তরের ঘনিষ্ঠতা শক্তিশালী ও মজবুত হয়। ফলে এর দ্বারা তারা আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করেন এবং তাদের অন্তরে আসে আনন্দ ও উৎফুল্লতা। যা মাঝে মাঝে শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। তখন তারা এতে এমন তৃপ্তি পায়, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সমস্ত তৃপ্তির চেয়ে আলাদা।
শ্রবণের মাধ্যমে আত্মা যে খোরাক পায়, তাতে অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। এর সূক্ষ্মতা ও রহস্যময়তার মধ্য থেকে কিছু উল্লেখ করছি :
জেনে রাখুন, আত্মার জন্য আল্লাহ তাআলা দুই ধরনের খাবার নির্ধারণ করেছেন:
এক ধরনের খাবার হলো বাহ্যিক খাদ্য ও পানীয়; যার মূল ও সারাংশ আত্মার জন্য আর অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য থাকে খাদ্য গ্রহণ করার সক্ষমতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশ।
আরেক ধরনের খাবার হলো আত্মিক খাবার, দৃশ্যমান বাহ্যিক খাবার-পানীয় থেকে আলাদা। যেমন: সুখ, শান্তি, আনন্দ, খুশি, স্বাদ, প্রফুল্লতা, জ্ঞান-বিদ্যা ইত্যাদি। এই খাবার হলো ঊর্ধ্বজগতের আসমানি খাবার।
এই দুই ধরনের খাবার দ্বারাই মানুষ নিজেকে টিকিয়ে রাখে। মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাথে এগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক-) এগুলোর মাধ্যমেই উভয় ধরনের খাবার মানুষের শরীরে পৌঁছে থাকে।
তবে চোখ ও কানের সাথে আত্মিক খোরাকের যে সম্পর্ক, তা অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের তুলনায় অনেক বেশি। খাবার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই দুটি মাধ্যম অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় অধিক কার্যকর ও শক্তিশালী। এ দুটির প্রভাবও সবচেয়ে বেশি। এ কারণেই আপনি দেখবেন, কুরআনের বহু জায়গায় চোখ ও কানকে এক সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةً لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
"আল্লাহ তোমাদের মায়ের পেট থেকে তোমাদেরকে এমন অবস্থায় বের করেছেন, যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কান দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন আর চিন্তাভাবনা করার মতো হৃদয় দিয়েছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।” [৬৪২]
কুরআনে এ রকম উপস্থাপনা অনেক এসেছে। এর একটি কারণ-ব্যক্তি যা দেখে এবং শোনে তা দ্বারা যতটুকু প্রভাবিত হয়; যা স্পর্শ করে, স্বাদ নেয় এবং যা শোঁকে তা দ্বারা ততটুকু প্রভাবিত হয় না। এর আরেকটি কারণ-আয়াতে যে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো ইলম অর্জনের পথ: চোখ, কান ও বুদ্ধি-বিবেচনা।
কানের সাথে অন্তরের সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততা, চোখের সাথে সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততার চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণেই মজাদার কিছু দেখার চেয়ে মজাদার কিছু শ্রবণের প্রভাব বেশি হয়। এমনিভাবে অপছন্দনীয় বস্তুর ক্ষেত্রেও দেখা ও শোনার মাঝে বেশ পার্থক্য রয়েছে।
যখন এই বিষয়টি জানা হয়ে গেল, তখন মনে রাখবেন-মানুষের এই পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের জন্য রয়েছে ভালো ও খারাপ গুণ। ভালো গুণগুলো হলো অন্তরের অংশ আর খারাপ গুণগুলো হলো নফসের অংশ।
কিছু কিছু মানুষ আছে, যাদের ইন্দ্রিয় থেকে অন্তর বা কল্বের কোনো অংশ নেই। আছে শুধু চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় অতি সামান্য একটু অংশ। কেবল মনুষ্যত্বের স্তরটি ছাড়া তাদের স্তর আর পশুর স্তর সমান। এই কারণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তুর সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন; বরং তাদেরকে পশুর চেয়েও পথভ্রষ্ট বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُوْنَ أَوْ يَعْقِلُوْنَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا )
“আপনি কি মনে করেন, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে? তারা তো চতুস্পদ জন্তুর মতো; বরং তারা আরও বেশি পথভ্রষ্ট।”[৬৪৩]
আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কাফিরদের কান, চোখ ও বোধ-বিবেচনা নেই বলে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ হলো, তারা এগুলো দ্বারা উপকৃত হয় না। ফলে তা যেন না থাকার মতোই।
সুতরাং প্রকৃত শ্রবণ অর্জিত হওয়ার মাধ্যমে যে পবিত্র জীবনের সূচনা হয়, সেই জীবনই এই পৃথিবীতে পূর্ণাঙ্গ জীবন। কারণ এর মাধ্যমেই অন্তর সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। যার ফলে শক্তি, উদ্যম, আনন্দ, খুশি, সজীবতা, প্রফুল্লতা ও উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। আর অন্তর যখন ভালো ও উপযুক্ত খাবার পায় না, তখন নষ্ট ও খারাপ খাবারের দ্বারাই শক্তিশালী হয়। খাবার যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন শক্তি-সামর্থ্য, আনন্দ, সজীবতা, প্রফুল্লতা সবই কমে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন খারাপ ও নষ্ট খাবার দ্বারা শরীর শক্তিহীন হয়ে পড়ে।
অন্তরের সাথে বাহ্যিক কানের সম্পর্ক খুব বেশি আর এ দুটির পরস্পরের দূরত্বও চোখ ও অন্তরের দূরত্বের চেয়ে কম। এই কারণে চোখের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলির তুলনায় কানের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলি অন্তরে দ্রুত প্রভাব ফেলে। যার ফলে মাঝে মাঝে মানুষ অতি আনন্দদায়ক, বা অতি কষ্টদায়ক বা পছন্দনীয় সুমিষ্ট কোনো সুর শোনার সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে যায়। অপরদিকে চিত্তাকর্ষক ও মনোরম কোনো দৃশ্য দেখে মানুষ জ্ঞান হারায় না।
কখনো কখনো অন্তরে এই ধরনের শ্রবণের মাধ্যমে প্রচণ্ড প্রভাব পড়ে; কিন্তু ব্যক্তি অন্যমনস্ক ও ব্যস্ত থাকার দরুন এবং সে সময় বাহ্যিক অবস্থার সাথে ভেতরগত অবস্থার মিল না থাকার কারণে তা টের পায় না। পরে যখন অবসর হয় এবং নিজেকে নিয়ে ভাবার সময় পায়, তখন ঠিকই সেই প্রভাবে সে আচ্ছন্ন হয়।
রূহ ও অন্তর যখনই ব্যস্ততা থেকে অবসর হয়, তখনই এই প্রকার শ্রবণ তাতে পরিপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
যা শ্রবণ করা হয়, তা যদি সুন্দর অর্থবিশিষ্ট হয় এবং সুমিষ্ট স্বরে শ্রবণ করা হয়, তা হলে অন্তরে সেই সুন্দর অর্থের একটা অংশ হাসিল হয় এবং অর্থ উপলব্ধি অনুসারে অন্তর এর মাধ্যমে পরিপূর্ণ আনন্দিত হয়। রূহের জন্যও একটা অংশ অর্জিত হয়; যেমন: সুরের মিষ্টতা, সৌন্দর্য ইত্যাদি। এর মাধ্যমে প্রাণশক্তি, উৎফুল্লতা, আনন্দ ও খুশি বেড়ে যায়। এমনকি মাঝে মাঝে এর প্রভাব শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে এবং আশপাশের সাথিসঙ্গীদের ওপরও পড়ে।
এটি পরিপূর্ণরূপে এই দুনিয়ায় অর্জন করা সম্ভব নয়। আর এটি কেবল আল্লাহ তাআলার পবিত্র কালাম আল-কুরআনুল কারীম শ্রবণের মাধ্যমেই সম্ভব। সুতরাং রূহ যখন ঝামেলা মুক্ত হয়, ওহির আলো ধারণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে, অর্থ হৃদয়ঙ্গম করার প্রতি আগ্রহী হয় এবং সমস্ত মনোযোগ শ্রুত বিষয়ের ওপর নিবদ্ধ রাখে; ফলে সে অন্তর উপস্থিত রেখে সতর্কতার সাথে কান পেতে রাখে, অতঃপর যখন সে তিলাওয়াতকারীর সুমধুর স্বর শ্রবণ করে, তখন তার অন্তর এই পৃথিবী ছেড়ে যাবার উপক্রম হয়, সে প্রবেশ করে ভিন্ন একজগতে, যেখানে সে এমন স্বাদ অনুভব করে সৃষ্টিজগতের কোনোকিছুর সাথেই তার কোনো তুলনা হয় না। সেটি জান্নাতে জান্নাতিদের অবস্থার চেয়েও অতি সূক্ষ্ম।
সুতরাং খাবার ও খোরাক হিসেবে এটা কতই-না উত্তম আর কতই-না উপকারী!
যে অন্তর শয়তানি (সংগীত) শ্রবণ দ্বারা পরিপুষ্ট, সেই অন্তরের জন্য এটা হারাম যে, সে কুরআন শ্রবণে এই স্বাদ পাবে; তবুও যদি সে এর কিছুটা স্বাদ অনুভব করে, তা হলে তা কেবল তিলাওয়াতকারীর সুমিষ্ট সুরের কারণে, এর গভীর অর্থ অনুধাবন করার কারণে নয়।
যখন অন্তর মনোযোগের সাথে কোনোকিছু শ্রবণ করে এবং এর বাহির ও ভেতরের মধ্যে বেশি তারতম্য না থাকে, তখন কান অন্তর পর্যন্ত সেই তথ্য পৌঁছিয়ে দেয়, যা অন্তরের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও (অন্তর এমন কিছু উপলব্ধি করে,) যা সেই শ্রবণকৃত বিষয় বোঝায় না এবং বক্তাও তা উদ্দেশ্য নেয় না। এটি শুধু অর্থবহ বাক্যের সাথেই বিশেষিত নয়; বরং অনেক সময় অর্থহীন কোনো শব্দ শ্রবণ করার মাধ্যমেও এ রকম উপলব্ধি হয়।
কুশাইরি বলেছেন, 'আমি আবূ আবদির রহমান সুলামি -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'আমি একবার আবূ উসমান মাগরিবির নিকট প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে একব্যক্তি চরকি দিয়ে পানি উত্তোলন করছিল। এটি দেখে তিনি বললেন, 'তুমি কি জানো, এই চরকিটি কী বলছে?' আমি বললাম, 'না।' তখন তিনি বললেন, 'সে বলছে, 'আল্লাহ, আল্লাহ। [৬৪৪]
সুতরাং ইশারা-ইঙ্গিতও দলীল ও আলামতের অন্তর্ভুক্ত। তবে এটি উপলব্ধি করার জন্য অন্তরে একাগ্রতা ও স্বচ্ছতা থাকা আবশ্যক। তীক্ষ্ণ অনুভূতির দ্বারা এমন ছোটো ছোটো বস্তুও উপলব্ধি করা যায়, যা অন্যরা বুঝতে পারে না এবং তাদের কল্পনাতেও আসে না।
আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে আল্লাহ তাআলার এই আয়াত সম্পর্কে বলতে শুনেছি-
لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ )
"যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না।” [৬৪৫]
এই সম্পর্কে তিনি বলেছেন, 'এই আয়াতটি ইঙ্গিত প্রদান করে যে, পবিত্র ব্যক্তি ব্যতীত কেউ কুরআন স্পর্শ করতে পারবে না। কারণ ঊর্ধ্বজগতের সেই সহীফা আল্লাহর নিকট অতি সম্মানিত হওয়ার কারণে যখন ফেরেশতারা পবিত্রতা অর্জন করা ব্যতীত তা স্পর্শ করতে পারে না, তখন এই সহীফার ক্ষেত্রেও পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করতে পারবে না-এটাই অধিক সংগত।'
আবার নবি বলেছেন,
لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيْهِ كَلْبٌ وَلَا صُورَةٌ
"যে বাড়িতে কুকুর থাকে এবং (কোনো প্রাণীর) ছবি থাকে, সেখানে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” [৬৪৬]
এই হাদীস সম্পর্কে আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, 'যখন কুকুর ও ছবি আল্লাহর- সৃষ্টি-করা-ফেরেশতাদেরকে বাড়িতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়, তখন কীভাবে আল্লাহ তাআলার মা'রিফাত, তাঁর মহাব্বত, তাঁর যিকরের স্বাদ এবং তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতা সেই অন্তরে প্রবেশ করবে, যে অন্তর বিভিন্ন ধরনের মন্দচাহিদা আর কুবাসনার কুকুর ও ছবি দ্বারা পরিপূর্ণ রয়েছে?!' এটি উপরিউক্ত হাদীসের শব্দ থেকেই সুস্পষ্টভাবে হৃদয়ঙ্গম হয়।'
এর আরেকটি উদাহরণ হলো: সালাত সহীহ হওয়া এবং সাওয়াব পাওয়ার জন্য শর্ত হলো কাপড় ও শরীর পবিত্র হওয়া। যদি এতে কোনো কমতি হয়, তা হলে সালাত নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং অন্তর যখন নাপাক হয় আর ব্যক্তি তা পবিত্র না করে, তা হলে তার সালাত কীভাবে বিশুদ্ধ হবে এবং এর দ্বারা সে কী সাওয়াব পাবে? যদিও এর দ্বারা তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। বাহ্যিক পবিত্রতার হুকুম দেওয়া হয়েছে তো কেবল অভ্যন্তরীণ পবিত্রতাকে পরিপূর্ণ করার জন্যই।
এর আরেকটি উদাহরণ হলো: সালাত সহীহ হওয়ার জন্য কিবলামুখী হওয়া একটি আবশ্যকীয় শর্ত। আর তা হলো আল্লাহ তাআলার ঘর। বান্দার শরীরকে সেদিকে ফেরানো জরুরি, তা না হলে সালাত নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং সেই ব্যক্তির সালাত কীভাবে বিশুদ্ধ হবে, যার অন্তর কিবলার অধিপতি ও শরীরের মালিক আল্লাহর অভিমুখী না হয়? বরং তার শরীর থাকে কিবলার দিকে ফেরানো, আর তার অন্তর থাকে আল্লাহ থেকে গাফিল?
এই রকম বিশুদ্ধ ইশারা-ইঙ্গিতের অনেক উদাহরণ রয়েছে; যেগুলো অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা, সঠিক অন্তর্দৃষ্টি এবং উত্তম চিন্তাভাবনা ছাড়া অর্জিত হয় না। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
শ্রবণের ক্ষেত্রে মানুষ তিন প্রকার:
প্রথম প্রকার: যে ব্যক্তি তার অন্তরকে কেবল নফসের বৈশিষ্ট্য দ্বারা পূর্ণ করে। ফলে তার অন্তর তার নফসে পরিণত হয়ে যায়। যার কারণে শাহওয়াত ও কুপ্রবৃত্তি তার ওপর প্রবল হয়। শ্রবণ থেকে এই ব্যক্তির অংশ জন্তু-জানোয়ারের অংশের মতো, যারা হাঁকডাক ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না।
দ্বিতীয় প্রকার: যে ব্যক্তি তার নফসকে তার অন্তরের গুণাবলি দ্বারা সুসজ্জিত করে তোলে। ফলে তার নফস তার অন্তরে রূপান্তরিত হয়। এ কারণে তার ওপর মা'রিফাত, মহাব্বত, আকল-বুদ্ধি ও পরিপূর্ণতার সব গুণসমূহ প্রবল হয়। এর ফলে তার নফস তার অন্তরের আলোয় উদ্ভাসিত হয়, আল্লাহর প্রতি নিশ্চিন্ত হয়, আল্লাহর দাসত্বে তার চক্ষু শীতল হয়, আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসায় সে প্রফুল্ল ও সতেজ হয়। শ্রবণ থেকে এই ব্যক্তির অংশ হলো ফেরেশতাদের অংশের সমান বা তার নিকটবর্তী। তার শ্রবণ করা হলো তার কল্ব ও রূহের খোরাক, দুনিয়াতে তার চোখের শীতলতা ও প্রশান্তি, একটি মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন বাগান, যেখানে সে স্বাধীনভাবে বিচরণ করে বেড়ায় এবং এতে তার জীবন হয় স্বাচ্ছন্দ্যময়।
কবিতা ও ছন্দমালা যারা শ্রবণ করে, তারা এ অর্থের প্রতিই ইঙ্গিত করে থাকে। কিন্তু তারা পথ ভুল করে ফেলেছে আর দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরছে।
তৃতীয় প্রকার: এর প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হলো সেই ব্যক্তি, যার মানযিল উপরিউক্ত দুই মানযিলের মাঝে অবস্থিত। তার অন্তর মূল ফিতরাত বা স্বভাবের ওপর অবশিষ্ট থাকে।
শ্রবণ থেকে এই ব্যক্তির অংশ হলো আগের দুই অংশের মাঝামাঝি অংশ। যদি সে তার কল্বের আহ্বানে সাড়া দেয়, তা হলে তার শ্রবণের অংশ হয় শক্তিশালী আর যদি সে তার নফস ও কুপ্রবৃত্তির ডাকে সাড়া দেয়, তা হলে তার শ্রবণের অংশ হয় দুর্বল।
আর আহ্বানে সাড়া দেওয়ার এই পার্থক্যের কারণেই আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে দ্বীনের বুঝশক্তি, উৎফুল্লতা এবং তাঁর কালাম শ্রবণে প্রশান্তি লাভ করার ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রকমের পার্থক্য হয়ে থাকে।
টিকাঃ
[৬৪২] সূরা নাহল, ১৬: ৭৮।
[৬৪৩] সূরা ফুরকান, ২৫: ৪৪।
[৬৪৪] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৫১৭।
[৬৪৫] সুরা ওয়াকিআ, ৫৬: ৭৯।
[৬৪৬] বুখারি, ৩২২৫; মুসলিম, ২১০৬।