📄 উত্তম চরিত্রের পরিচয়
দ্বীনের পুরোটাই উত্তম চরিত্র নির্ভর। সুতরাং মনে রাখবেন, যিনি স্বভাব-চরিত্রে আপনার চেয়ে এগিয়ে, তিনি দ্বীন পালনেও আপনার চেয়ে এগিয়ে।
কেউ কেউ বলেছেন, 'উত্তম চরিত্র হলো: সাধ্যমতো খরচ করা, কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বেঁচে থাকা এবং অপরের দেওয়া কষ্ট সহ্য করা।'
কেউ বলেছেন, 'উত্তম চরিত্র হলো: সুন্দর আচরণ করা এবং খারাপ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা।'
আবার কেউ বলেছেন, 'খারাপ বৈশিষ্ট্যসমূহ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা এবং ভালো গুণাবলি দ্বারা নিজেকে সাজিয়ে তোলা।'
উত্তম চরিত্র চারটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত; যা ব্যতীত তা কল্পনাও করা যায় না- ১. ধৈর্য ধারণ করা (الصَّبْرُ) ২. পবিত্র থাকা (الْعِفَّةُ) ৩. সাহসিকতা (الشَّجَاعَةُ) এবং ৪. ইনসাফ বা সুবিচার করা (الْعَدْل)
১. ধৈর্য ধারণ করা: ধৈর্য বা সবর মানুষকে কষ্ট সহ্য করতে, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করে। আবার সহনশীলতা, স্থিরতা, নম্রতা, মনোযোগিতা ও তাড়াহুড়ো না করে চিন্তাভাবনার সাথে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
২. পবিত্র থাকা : পবিত্র থাকার প্রেরণা মানুষকে কথা ও কাজে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও নোংরামি থেকে দূরে রাখে, লাজুকতা অবলম্বন করতে শেখায়; যা সমস্ত কল্যাণের মূল। আর ফাহশা বা অশ্লীলতা, কৃপণতা, মিথ্যা, গীবত ও চোগলখুরি করা থেকে বাধা দান করে।
৩. সাহসিকতা: আত্মসম্মানবোধ বজায় রাখতে, অন্যকে নিজের ওপর প্রাধান্য দিতে এবং ধনসম্পদ খরচ করতে উদ্বুদ্ধ করে। মানসিক শক্তি ও সাহসের কারণে মানুষ তার প্রিয় বস্তুকেও পরিত্যাগ করতে পারে। রাগ নিয়ন্ত্রণ করে সহনশীল হতে পারে, নিজের নফসকে আয়ত্তে আনতে পারে। যেমন আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ "প্রকৃত বীর সে নয়, যে কুস্তিতে কাউকে হারিয়ে দেয়; বরং সেই ব্যক্তিই হলো আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”[৫৬৪]
এটিই হলো সাহসিকতার মূল তাৎপর্য। এটি এমন একটি গুণ, যার মাধ্যমে ব্যক্তি তার প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হওয়া থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
৪. ইনসাফ বা সুবিচার করা: এই গুণটি মানুষকে তার স্বভাব-চরিত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি থেকে বেঁচে থেকে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে সাহায্য করে। সুতরাং ইনসাফ মানুষকে কৃপণতা ও অপচয় এ দুয়ের মাঝামাঝি পর্যায়ের দানশীলতায় অভ্যস্ত করে তোলে। এমনিভাবে তা ব্যক্তির মাঝে সৃষ্টি করে-লজ্জাশীলতা; যা অধিক নীচতা ও নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নেওয়ার মধ্যবর্তী গুণ। সাহসিকতা; যা কাপুরুষতা ও দুঃসাহসিকতার মধ্যবর্তী গুণ। সহনশীলতা; যা অতি রাগ ও নিজেকে চূড়ান্ত অপদস্থ করার মধ্যবর্তী গুণ।
উপরিউক্ত চারটি গুণই হলো সমস্ত উত্তম চারিত্রিক গুণাবলির উৎস ও ভিত্তি।
অপরদিকে নীচ স্বভাব ও চরিত্রের ভিত্তিও হলো চারটি— ১. অজ্ঞতা (الجهل) ২. জুলুম ( الظُّلْمُ) ৩. কুপ্রবৃত্তি ( اَلشَّهْوَةُ ) এবং ৪. রাগ ( الغَضَبُ)।
১. অজ্ঞতা: অজ্ঞতার কারণে মানুষ ভালোকে মন্দ, মন্দকে ভালো, দোষত্রুটিকে পূর্ণতা আর পূর্ণতাকে দোষত্রুটি বলে মনে করে। (ফলে অজ্ঞ ব্যক্তি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।)
২. জুলুম : জুলুমের দরুন মানুষ যার যা প্রাপ্য, তা তাকে দেয় না। (এতে অন্যের হক নষ্ট হয়।)
৩. কুপ্রবৃত্তি: কুপ্রবৃত্তির কামনা ব্যক্তিকে লোভ-লালসা, কৃপণতা, অসততা এবং সব ধরনের অশ্লীলতা ও নীচতায় নামিয়ে দেয়।
৪. রাগ : রাগ মানুষকে অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা ও নির্বুদ্ধিতায় নিক্ষেপ করে।
ওপরে বর্ণিত এই অসৎগুণাবলি দ্বারা ব্যক্তির মাঝে নিন্দনীয় ও মন্দ স্বভাবের সৃষ্টি হয়। আর একটি মন্দ স্বভাব আরেকটি মন্দ স্বভাবের জন্ম দেয়। যেমন একটি উত্তম স্বভাব আরেকটি উত্তম স্বভাবের জন্ম দেয়।
প্রতিটি উত্তম স্বভাব দুইটি মন্দ স্বভাব দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। উত্তম স্বভাবটি মন্দ দুই স্বভাবের মাঝে অবস্থান করে। যেমন: দানশীলতা; যার দুই প্রান্তে রয়েছে দুটি মন্দ স্বভাব—কৃপণতা ও অপচয়। এমনিভাবে বিনয়, যা দুটি মন্দ স্বভাব অহংকার ও হীনতা দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে।
অন্তর যখন মধ্যমপন্থা থেকে বিচ্যুত হয়, তখন নিশ্চিতভাবেই তা দুই মন্দ স্বভাবের কোনো একদিকে ধাবিত হয়। সুতরাং অন্তর যদি বিনয়ের গুণ থেকে বিচ্যুত হয়, তা হলে হয়তো অহংকার ও দম্ভে লিপ্ত হয়ে পড়বে; নয়তো হীনতা ও অপদস্থতায় জড়াবে।
টিকাঃ
[৫৬৩] বুখারি, ৬০৩৫; মুসলিম, ২৩২১।
[৫৬৪] বুখারি, ৬১১৪; মুসলিম, ২৬০৯।
📄 অন্তর পরিশুদ্ধ করার পদ্ধতি
মানুষের আচার-আচরণে শেকড়-গেড়ে-বসা কোনো স্বভাব পরিবর্তন করা খুব কঠিন। যারা মন্দ স্বভাব বদলাতে কঠোর সাধনা ও মুজাহাদায় আত্মনিয়োগ করে, তাদের মধ্যে অধিকাংশই তা পরিবর্তন করতে পারে না এবং তাতে সফল হয় না।
স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে এটি হলো একটি চূড়ান্ত সত্য কথা, যা সাথে করেই পথিককে পথ চলতে হয়; এর চিকিৎসা করা কিংবা তা সমূলে দূর করতে সচেষ্ট হওয়া অনুচিত। যে এভাবে পথ চলে, তার পথচলা হয় সেই ব্যক্তির চেয়ে শক্তিশালী ও দ্রুত, যে তা দূর করতে ব্যস্ত থাকে।
এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার পূর্বে একটি উদাহরণ পেশ করছি, যাতে যা বোঝাতে চাচ্ছি তা পরিষ্কার হয়ে যায়। ধরুন, একটি নদী ঢালু ও নিম্নাঞ্চলের দিকে প্রবল বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। বাড়িঘর, ফল-ফসলাদি, মাল-সামানা সব ডুবিয়ে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। লোকজন নিশ্চিতভাবেই জানতে পেরেছে যে, এই প্লাবন তাদের ঘরবাড়ি, জমির ফসল ও ধনসম্পদ বরবাদ করে দেবে। ফলে এই পরিস্থিতি প্রতিরোধ করতে তারা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে যায়-
প্রথম দল: তারা নিজেদের সবটুকু শক্তি-সামর্থ্য এই প্রবাহ দমিয়ে রাখতে ও বন্ধ করতে ব্যয় করে। কিন্তু এতে তারা তেমন ফলপ্রসূ ও কার্যকরী কিছু করতে সক্ষম হয় না। কারণ তারা একদিকে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করলে অন্যদিক ধ্বসে যায়। যার ফলে তাদের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হয়।
দ্বিতীয় দল : এই দলটি তাদের পূর্ববর্তী দলের অবস্থা লক্ষ করে, ফলে তারা বুঝতে পারে যে, কোনোভাবেই এটা বাধা দিয়ে আটকানো যাবে না। তারা ভেবেচিন্তে এর ক্ষতি থেকে বাঁচার একটি উপায় বের করে। আর তা হলো এর মূল ঝরনাধারাই কেটে দেওয়া। যেখানে এই প্রবাহের উৎস, সেখান থেকেই তা বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু বিষয়টি তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কোনোভাবেই তারা এর প্রবাহমানতাকে আয়ত্তে আনতে পারে না। যত চেষ্টাই করে সব নস্যাৎ হয়ে যায়। তারা এতে ব্যস্ত থাকার দরুন এই পানির দ্বারা চাষাবাদ করা, ফল-ফসল উৎপন্ন করা, গাছ লাগানো ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত থাকে, এর দ্বারা উপকার অর্জনের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তাদের হয় না।
তৃতীয় দল: এই দলটি আগের দুই দলের বিপরীতে অবস্থান নেয়। এরা উপলব্ধি করেছে যে, আগের দল দুটি যে পন্থা অবলম্বন করেছে, তাতে তাদের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়েছে। ফলে এরা এদের সমস্ত শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করে নদীর প্রবাহমানতাকে তার স্বাভাবিক গন্তব্য থেকে তাদের অনাবাদি শুষ্ক জমির দিকে ঘুরিয়ে দেয়। এমন জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করে, যেখানে এর পানি পৌঁছার দরুন তারা উপকার লাভ করতে পারে। আবার এতে তাদের ক্ষতিরও কোনো আশঙ্কা থাকে না। ফলস্বরূপ, তারা এর দ্বারা বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফলমূল ও গাছ-গাছালি-ঘাস উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়। এতে করে নদীর ক্ষয়ক্ষতি থেকেও বাঁচতে পারে এবং নিজেরাও পর্যাপ্ত লাভবান হয়।
এই পরিস্থিতিতে এই দলটিই ছিল সঠিক পথ অবলম্বনকারী। আর বাকি দুই দলের সিদ্ধান্ত ও কর্মপদ্ধতি ছিল ভুল।
যখন উদাহরণটি স্পষ্ট হলো তখন জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলার মহান হিকমতের দাবি হলো, তিনি মানুষসহ সব প্রাণীর স্বভাবেই দুটি শক্তি প্রোথিত রেখেছেন— ক্রোধ শক্তি এবং কামনা বা ইচ্ছা শক্তি।
এই দুটি শক্তিই বিভিন্ন স্বভাব-চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ধারণে সাহায্য করে। প্রত্যেক প্রাণীর স্বভাবেই এই দুটি শক্তি দেওয়া হয়েছে। ফলে সে কামনা বা ইচ্ছা শক্তির মাধ্যমে উপকারী স্বভাব টেনে নেয় আর ক্রোধ শক্তির মাধ্যমে সে ক্ষতিকর ও অনিষ্টকর সবকিছু থেকে নিজেকে বাঁচায়।
যখন এই বিষয়টি সুস্পষ্ট হলো তখন জেনে রাখুন, এই দুই শক্তি হলো সেই নদীটির মতো, যা অন্তরের দিকে প্রবাহমান। আর তা নিশ্চিতভাবেই অন্তরের আবাদিকে বরবাদ করে দেবে।
অত্যাচারী অজ্ঞ অন্তর এ থেকে গাফেল থাকে, তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেয় এবং কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। ফলে তা ঈমানের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেয় এবং এর প্রভাব ও আবাদিকে নষ্ট করে ফেলে। এরাই কিয়ামাতের দিন জাহান্নামি হবে।
আর পবিত্র সচেতন অন্তর ওপরের উদাহরণের মতো তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে যায়-
১. একটি দল রয়েছে, যারা তাদের মন্দ স্বভাবগুলো দমিয়ে রাখার জন্য প্রচুর রিয়াযত, মুজাহাদা ও চেষ্টা করে থাকে; কিন্তু তারা এতে সফল হয় না। ক্লান্ত হওয়া ছাড়া তারা আর কিছুই পায় না।
২. আরেকটি দল রয়েছে, যারা তাদের মন্দস্বভাবগুলো সমূলে উৎপাটন করার জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার প্রজ্ঞা ও হিকমত তা অস্বীকার করে। কারণ মানুষের তবিয়ত বা সহজাত প্রকৃতিকে এভাবে সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে তাদের লড়াই তুমুল আকার ধারণ করে। কিন্তু তাতে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি হয়।
৩. আরেকটি দল রয়েছে, যারা এসব বিষয় এড়িয়ে যান, নিজেদেরকে সবসময় আমলে মগ্ন রাখেন। তারা মন্দ স্বভাবের আহ্বানে সাড়া দেন না। তারা সেগুলোকে আপন গতিতে ছেড়ে দেন, তবে গতিপথটা পালটে দেন। ফলে সেগুলো তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা নিজেদের ভিত্তি মজবুত করতে তৎপর থাকেন। তারা জানেন, সেই নদীর প্রবাহ তাদের নিকট অবশ্যই আসবে; কিন্তু দৃঢ় দেওয়াল ও মজবুত ভিত্তি যদি থাকে, তা হলে তা ভাঙতে পারবে না। বরং ডানে-বামে ঘুরতে থাকবে। এ কারণেই তারা তাদের শক্তি-সামর্থ্য, চিন্তা-চেতনা এবং ইচ্ছাশক্তি নিজেদের ভিত্তি ও আমল সুন্দর ও মজবুত করার কাজে ব্যয় করে থাকে। [৫৬৫]
তৃতীয় এই দলটি ভাবে—এই সমস্ত গুণাবলি এমনি এমনি ও অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি, এগুলো পানির মতো; যার দ্বারা ফুল, ফল, কাঁটা, ডালপালা সবই পুষ্টিপ্রাপ্ত হয়; এ পথে যেগুলোকে ভয় করা হয়, আসলে হুবহু সেগুলোই হলো সফল ও কামিয়াব হওয়ার মাধ্যম। তারা উপলব্ধি করে, বড়োত্ব (اَلْكِبْز) হলো একটি নদী। এখান থেকে অহংকার, ঔদ্ধত্য, আত্মগর্ব, জুলুম ও সীমালঙ্ঘন-প্রবণতা যেমন শক্তিপ্রাপ্ত হয়, তেমনি সুউচ্চ মনোবল, আত্মমর্যাদাবোধ ও আল্লাহর শত্রুদের থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছাশক্তিও শক্তিপ্রাপ্ত হয়। ফলে এই শ্রেণির ব্যক্তিরা এই মন্দ স্বভাবটির (বড়োত্বের) প্রবাহমানতাকে এই সমস্ত উত্তম গুণাবলির দিকে ফিরিয়ে দেয় এবং এটিকে তাদের অন্তরে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেয়, একেবারে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করে না। বরং এই বড়োত্বকে এমন সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করে, যা তাদের জন্য অধিক উপকারী। বদর যুদ্ধে নবি আবূ দুজানা-কে দুই সারির মধ্যে ঔদ্ধত্য ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখে বলেছিলেন,
إِنَّهَا مِشْيَةٌ تُبْغِضُهَا اللَّهُ إِلَّا فِي هَذَا الْمَوْضِعِ
"এটি এমন এক ভঙ্গির হাঁটা, যা আল্লাহ অপছন্দ করেন; কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তিনি তা পছন্দ করেন।” [৫৬৬]
দেখুন, মন্দ একটি গুণ কীভাবে প্রশংসনীয় হয়ে গেল! শুধু ক্ষেত্র পরিবর্তন করার কারণে। আরেকটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ مِنَ الخُيَلَاءِ مَا يُبْغِضُ اللهُ، وَمِنْهَا مَا يُحِبُّ اللَّهُ، فَأَمَّا الخُيَلَاءُ الَّتِي يُحِبُّ اللَّهُ فَاخْتِيَالُ الرَّجُلِ نَفْسَهُ عِنْدَ الْقِتَالِ، وَاخْتِيَالُهُ عِنْدَ الصَّدَقَةِ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা এক প্রকার অহংকারকে পছন্দ করেন, আর এক প্রকার অহংকারকে অপছন্দ করেন। আল্লাহ যে অহংকার পছন্দ করেন তা হলো—যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলায় অহংকার প্রদর্শন করা (যেন দুশমন ভয় পায়) এবং দান-সদাকা করার সময় ঔদ্ধত্য দেখানো (যাতে বেশি বেশি সদাকা করতে পারে)।”[৫৬৭]
গভীরভাবে ভাবুন, কীভাবে একটি মন্দ স্বভাব ইবাদাতে পরিণত হলো এবং আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্নকারী একটি গুণ কীভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে রূপান্তরিত হলো!
সুতরাং যারা এই মন্দ স্বভাবগুলো মূল থেকে সম্পূর্ণরূপে দূর করতে পরিশ্রমে লিপ্ত, তারা আসলে এই বড়োত্ব ও অহংকারকে একেবারে মিটিয়ে দিতে প্রয়াসী। অথচ এই গুণগুলো দ্বারাই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা যায়, যদি তা সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
এমনিভাবে হিংসার স্বভাবটিও যদি সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়, তা হলে তা ইবাদাতে পরিণত হয়। যেমন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি বলেছেন,
لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ الْقُرْآنَ فَهُوَ يَقُوْمُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَهُوَ يُنْفِقُهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ
"দুই ব্যক্তি ছাড়া আর কারও প্রতি হিংসা (ঈর্ষা) পোষণ করা বৈধ নয়। একজন হলো-এমন ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা কুরআন (-এর জ্ঞান) দান করেছেন। ফলে সে তা অনুযায়ী রাত-দিন আমল করে। দ্বিতীয়জন হলো-সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা অর্থসম্পদ দান করেছেন। আর সে দিন-রাত তা (আল্লাহর পথে) খরচ করে।"[৫৬৮]
সুতরাং হিংসা মানুষকে সৎকাজে প্রতিযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করে, যা আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন এবং তিনি এই প্রতিযোগিতার আদেশও দিয়েছেন- وَفِي ذلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُوْنَ "এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত।”[৫৬৯]
তাই অন্তর থেকে এই মন্দ স্বভাবটিকে একেবারে দূর করার চেষ্টা না করে, বরং একে প্রশংসিত হিংসায় রূপান্তরিত করুন এবং উচ্চ মর্যাদা লাভের জন্য প্রতিযোগিতা করুন।
মূলকথা হলো-পরীক্ষার এই দুনিয়ায় মানুষের ফিতরাত ও তবিয়তকে মূল থেকে দূর করা সম্ভব নয়। তাই সূক্ষ্মদর্শী ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণ এগুলোকে এমন সব উপকারী ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন, যা হারাম কিংবা অবৈধ নয়, যা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টিতে কোনো বিঘ্নতা সৃষ্টি করে না এবং তাঁর দৃষ্টি থেকে ফেলেও দেয় না।
যারা নিজের অন্তর পরিশুদ্ধ করতে চায় এবং অন্তরের রোগ দূর করতে চায়, তাদের জন্য এটি এই বইয়ের সবচেয়ে উপকারী একটি অনুচ্ছেদ। ইসলামে কিছু ভুল ধারণা অনুপ্রবেশ করার কারণে অনেকেই মনে করেন যে, সহজ পরিশ্রমে ও সাধারণ মুজাহাদায় নফস বা অন্তর পরিশুদ্ধ করা এবং উত্তম চরিত্রাবলিতে গুণান্বিত হওয়া অসম্ভব! আসলে তাদের এই ভাবনা তাদেরকে আরও জটিল জটিল রোগব্যাধি, পথভ্রষ্টতা ও গোমরাহিতে নিক্ষেপ করে।
অন্তর পরিশুদ্ধ করার বিষয়টি মূলত রাসূলগণের ওপর অর্পিত। আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে এই দায়িত্ব দিয়েই প্রেরণ করেছেন, তাঁদের হাতেই এর সংশোধন প্রক্রিয়া রেখেছেন। তাঁরা মানুষজনকে দাওয়াত দিয়ে, শিক্ষা দিয়ে, সঠিক দিকনির্দেশনা দান করে তাদের অন্তর পরিশুদ্ধ করবেন। ইলহাম বা অন্য কিছু দিয়ে নয়। রাসূলগণ উম্মাতের অন্তরের চিকিৎসা করার জন্যই প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ )
"তিনিই নিরক্ষরদের মাঝে তাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতঃপূর্বে তারা ছিল সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।”[৫৭০]
শরীরের চিকিৎসা করার চেয়ে অন্তর পরিশুদ্ধ করা অনেক বেশি কঠিন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাহ বহির্ভূত পন্থায় যে ব্যক্তি রিয়াযত, মুজাহাদা, সাধনা ও নির্জনতা অবলম্বন করে নিজের নফসকে সংশোধনের চেষ্টে করে, সে ওই রোগীর মতো; যে অভিজ্ঞ চিকিৎসককে বাদ দিয়ে নিজে নিজেই আপন খেয়াল ও সিদ্ধান্ত অনুসারে রোগের চিকিৎসা করা শুরু করে! আসলে আল্লাহর রাসূলগণ হলেন অন্তরের চিকিৎসক। তাই অন্তরের সংশোধন ও পরিশোধনের জন্য তাঁদের দেখানো পথ গ্রহণ করা, তাঁদের নিকট নিজেকে সমর্পণ করা এবং তাঁদের একান্ত অনুগত হওয়া ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই।
টিকাঃ
[৫৬৫] ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, 'আমি একদিন এই বিষয়টি সম্পর্কে এবং অন্তরের রোগসমূহ একেবারে নিশ্চিহ্ন করা এবং তার পথ পরিষ্কার করা সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে জিজ্ঞাসা করলাম। জবাবে তিনি বললেন, 'আত্মা হলো ময়লা-আবর্জনার কূপের মতো। যত খুঁড়বে, ততই সেখান থেকে নোংরা আবর্জনা বেরুবে। তবে তোমার পক্ষে যদি এর ওপরে ঢাকনা দিয়ে তা অতিক্রম করা সম্ভব হয়, তা হলে তা-ই কোরো। এটা খুঁড়তে ব্যস্ত হোয়ো না। কারণ তুমি কখনো এর গভীরতায় পৌঁছুতে পারবে না; বরং যখনই খুঁড়তে যাবে অন্য আরেকটি বেরিয়ে আসবে।' তখন আমি বললাম, 'এ সম্পর্কে আমি আরেকজন শাইখকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, 'আত্মার মন্দ স্বভাবগুলো হলো মুসাফিরের পথে পাওয়া সাপ, বিচ্ছুর মতো। যদি সে এগুলোর পেছনে পড়ে এবং তা মেরে ফেলতে উদ্যত হয়, তা হলে সে পথচ্যুত হয়ে যাবে। তার পক্ষে আর পথচলা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না। ফলে গন্তব্যে পৌঁছা কঠিন হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে তোমার উচিত হবে সামনে অগ্রসর হওয়া এবং এগুলোর প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ না করা। হ্যাঁ, যদি তোমার পথ রোধ করে সামনে কিছু এসে পড়ে, তা হলে তা মেরে ফেলো। অতঃপর সামনে এগিয়ে যাও।' ইবনু তাইমিয়্যা এই কথাগুলো খুবই পছন্দ করেন এবং এর বেশ প্রশংসা করেন।
[৫৬৬] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৬/১১২।
[৫৬৭] আবূ দাউদ, ২৬৫৯।
[৫৬৮] মুসলিম, ৮১৫; বুখারি, ৭৩।
[৫৬৯] সূরা মুতাফফিফীন, ৮৩: ২৬।
[৫৭০] সূরা জুমুআ, ৬২ : ২।
📄 উত্তম চরিত্র অর্জনযোগ্য নাকি আল্লাহ-প্রদত্ত?
যদি প্রশ্ন করেন: 'পরিশ্রম করে কি উত্তম চরিত্র অর্জন করা সম্ভব, নাকি এটি আয়ত্তে আনা অসম্ভব?'
উত্তরে আমি বলব 'এটি কষ্ট ও পরিশ্রম করে অর্জন করা সম্ভব। চেষ্টা সাধনা করতে করতে একপর্যায়ে তা ব্যক্তির স্বভাবে ও যোগ্যতায় পরিণত হয়। একবার নবি আব্দুল কাইস গোত্রের আশাজ্জ -কে বললেন,
إِنَّ فِيْكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ : الْحِلْمُ وَالْأَنَاةُ
"তোমার মধ্যে দুইটি গুণ রয়েছে, আল্লাহ তাআলা যা ভালোবাসেন- সহনশীলতা ও স্থিরতা।”
আশাজ্জ বললেন, 'আমি কি এই দুটি গুণ অর্জন করেছি নাকি এর ওপরই আল্লাহ তাআলা আমাকে সৃষ্টি করেছেন?'
নবি উত্তরে বললেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাকে এর ওপরই সৃষ্টি করেছেন।”
তিনি বললেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাকে এমন দুটি গুণের ওপর সৃষ্টি করেছেন; যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন।[৫৭১]
এই হাদীসটি ইঙ্গিত প্রদান করে যে, মানুষের স্বভাব-চরিত্রের মধ্যে কিছু রয়েছে সৃষ্টিগত আর কিছু রয়েছে অর্জিত, যা মানুষ পরিশ্রম করে অর্জন করতে পারে। যেমন: নবি সালাত শুরু করার পর যে দুআ করতেন, তাতে বলতেন,
اللَّهُمَّ اهْدِنِي لِأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِى لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ وَاصْرِفْ عَنِّي سَيِّئَهَا لَا يَصْرِفُ عَنِّي سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ
“হে আল্লাহ, আমাকে সর্বোত্তম চরিত্রের পথ দেখাও। তুমি ছাড়া আর কেউ এ পথ দেখাতে পারে না। আর স্বভাব-চরিত্রের মন্দ দিকগুলো আমার থেকে দূরে রাখো। তুমি ছাড়া আর কেউ মন্দগুলোকে আমার থেকে দূরে রাখতে সক্ষম নয়।”[৫৭২]
রাসূলুল্লাহ এখানে অর্জিত ও আল্লাহ-প্রদত্ত দু ধরনের স্বভাব-চরিত্রের কথাই উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
টিকাঃ
[৫৭১] মুসলিম, ১৭; আবূ দাউদ, ৫২২৫।
[৫৭২] মুসলিম, ৭৭২।