📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 দানশীলতার স্তর

📄 দানশীলতার স্তর


দানশীলতার দশটি স্তর রয়েছে:
১. নিজেকেই বিলিয়ে দেওয়া )اَلجُودُ بِالنَّفْسِ( : এটি সর্বোচ্চ স্তরের দানশীলতা। কবি (কোনো একজনের প্রশংসায়) বলেন,
يَجُودُ بِالنَّفْسِ إِذْ ضَنَّ الجَوَادُ بِهَا وَالجُودُ بِالنَّفْسِ أَقْصَى غَايَةِ الجُوْدِ
সে নিজের জীবন দিয়ে দেখায় উদারতা, যখন দানবীর ব্যক্তিগণও করে কৃপণতা। এ পথে আসলে তারাই অগ্রগামী মহান, যারা নিজের নফস্কেই করে দেয় কুরবান।
২. ক্ষমতার মাধ্যমে দানশীলতা )اَلْجُوْدُ بِالرِّيَاسَةِ( : এটি দানশীলতার দ্বিতীয় স্তর। ক্ষমতা পেয়েও নমনীয় আচরণ করা এবং উদারতা দেখানো বড়ো কঠিন। এ ক্ষেত্রেও ব্যক্তি নিজের ওপর অপরকে প্রাধান্য দেয়।
৩. আরাম-আয়েশ পরিত্যাগের মাধ্যমে দানশীলতা )اَلْجُوْدُ بِالرَّاحَةِ وَالرَّفَاهِيَّةِ( : এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি অপরের উপকারার্থে নিজের আরাম-আয়েশ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আহার- নিদ্রা ইত্যাদি পরিত্যাগ করে। যেমন বলা হয়েছে-
مُتَيَّمَ بِالنَّدَى، لَوْ قَالَ سَابِلُهُ : هَبْ لِي جَمِيعَ كَرَى عَيْنَيْكَ، لَمْ يَنَمِ
'প্রকৃত দানবীরকে যদি কোনো প্রার্থনাকারী বলে, 'তোমার দুচোখের সবটুকু নিদ্রা আমাকে দিয়ে দাও', তা হলে সে একটুও ঘুমুবে না।'
৪. ইলম শিক্ষা দেওয়া মাধ্যমে দানশীলতা )اَلْجُوْدُ بِالْعِلْمِ وَبَذْلِهِ( : এটি দানশীলতার সর্বোচ্চ মর্যদাপূর্ণ স্তর। ধনসম্পদ দান করার চেয়ে ইলম শিক্ষা দেওয়া অধিক উত্তম। কারণ সম্পদের চেয়ে ইলম বা জ্ঞান বেশি মূল্যবান।
ইলম শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন শ্রেণির হয়ে থাকে। তবে আল্লাহ তাআলার হিকমত ও তাকদীরি ফায়সালার দাবি হলো, ইলমের দ্বারা আল্লাহ তাআলা কোনো কৃপণ ব্যক্তিকে কখনো উপকার পৌঁছান না।
ইলম শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে দানশীলতার অন্যতম একটি দিক হলো: কেউ কোনো বিষয়ে জানতে না চাইলেও সুন্দর উপস্থাপনায় তাকে তা বুঝিয়ে দেওয়া।
৫. পদবি ও প্রভাবের দ্বারা উপকার করার মাধ্যমে দানশীলতা )الجُودُ بِالنَّفْعِ بِالجَاءِ( : যেমন: কারও ব্যাপারে সুপারিশ করা, কোনো ব্যক্তির জটিলতা নিরসনে ক্ষমতাবান কারও কাছে যাওয়া ইত্যাদি। এটি পদবি ও প্রভাবের যাকাতের ন্যায়। যেমন ইলমের যাকাত হলো, মানুষের মাঝে তা বিতরণ করা এবং তাদেরকে তা শেখানো।
৬. নিজের শরীরের উপকার করার মাধ্যমে দানশীলতা )الجُوْدُ بِنَفْعِ الْبَدَنِ( : যেমন রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
كُلُّ سُلَامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيْهِ الشَّمْسُ يَعْدِلُ بَيْنَ الاثْنَيْنِ صَدَقَةً وَيُعِينُ الرَّجُلَ عَلَى دَابَّتِهِ فَيَحْمِلُ عَلَيْهَا أَوْ يَرْفَعُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةً وَكُلُّ خُطْوَةٍ يَخْطُوهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةً وَيُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
“সূর্যোদয়ের প্রতিটি দিনে মানুষের প্রত্যেক জোড়া গ্রন্থির ওপর সদাকা নির্ধারিত রয়েছে, দুজন মানুষের মধ্যে সুবিচার করাও সদাকা, কাউকে সাহায্য করে তাকে তার সওয়ারিতে আরোহণ করিয়ে দেওয়া বা সওয়ারির ওপরে তার মালপত্র তুলে দেওয়াও সদাকা, ভালো কথা বলাও সদাকা, সালাত আদায়ের উদ্দেশে চলা প্রতিটি কদমও সদাকা এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও সদাকা।”[৫৪৯]
৭. সম্মান বিসর্জন দিয়ে দানশীলতা )اَلْجُوْدُ بِالْعِرْضِ( : যেমন সাহাবি আবূ দমদম -এর দানশীলতা। প্রতিদিন সকালে তিনি বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমার তেমন কোনো সম্পদ নেই যে, আমি মানুষের ওপর দান-সদাকা করব। তবে আমি তাদের প্রতি আমার সম্মান দিয়ে সদাকা করে থাকি, কেউ যদি আমাকে গালি দেয় বা অপবাদ দেয়, আমি তা ক্ষমা করে দিই।' নবি বলেন, "তোমাদের কে আছে, যে আবূ দমদমের ন্যায় করতে পারে?"[৫৫০]
এই প্রকার দানশীলতার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ হৃদয়, প্রশান্ত ও প্রশস্ত মন এবং মানুষের প্রতি শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত অন্তর।
৮. ধৈর্য ধারণ করা ও ক্ষমা করার মাধ্যমে দানশীলতা (الجُوْدُ بِالصَّبْرِ وَالْإِحْتِمَالِ وَالْإِغْضَاءِ): এটি হলো অন্যান্য স্তরগুলোর চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ স্তর। বান্দার জন্য অর্থ-সম্পদ দান করার চেয়ে এটি বেশি উপকারী, অধিক মর্যাদাসম্পন্ন এবং নিজের নফসকে দমিয়ে রাখতে বেশ কার্যকরী। সবার পক্ষে ধৈর্য ধারণ করা এবং ক্ষমা করে দেওয়ার এই নীতি অবলম্বন করা সম্ভব নয়। এটি কেবল মহৎ হৃদয়ের ব্যক্তিদের পক্ষেই সম্ভব।
সুতরাং যে ব্যক্তির পক্ষে টাকা-পয়সা দান করা কষ্টকর, তার উচিত এই পন্থাকে আঁকড়ে ধরা। কেননা এটি আখিরাতের পূর্বে দুনিয়াতেই সুন্দর পরিণতি নিয়ে আসে। এটি হলো প্রকৃত উদারতার নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَالجُرُوحَ قِصَاصٌ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ
“এবং জখমের বদলা অনুরূপ জখম। তবে যে তা ক্ষমা করে দেবে (অর্থাৎ কিসাস নেবে না) তার জন্য তা কাফফারা (পাপমোচনকারী) হবে।”[৫৫১]
৯. উত্তম চরিত্র ও হাসিখুশির মাধ্যমে দানশীলতা (الجُوْدُ بِالخُلُقِ وَالْبِشْرِ وَالْبَسْطَةِ): এটি ধৈর্য ধারণ করা, অপরের দেওয়া কষ্ট সহ্য করা এবং ক্ষমা করার চেয়েও ওপরের স্তরের দানশীলতা। এর মাধ্যমে ব্যক্তি লাগাতার সাওম পালনকারী ও রাতে সালাত আদায়কারীর মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অন্যান্য আমলের চেয়ে আমলনামায় এটি সবচেয়ে বেশি ভারী হবে। আবূ যার গিফারি থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন, لا تَحْقِرَنَّ مِنَ المَعْرُوفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
“কোনো নেককাজকে ছোটো করে দেখো না। এমনকি তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিখুশি চেহারায় সাক্ষাৎ করা হলেও।”[৫৫২]
(আবুদ দারদা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَا مِنْ شَيْءٍ أَثْقَلُ فِي الْمِيزَانِ مِنْ حُسْنِ الخُلْقِ
"মীযান বা দাঁড়িপাল্লায় উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী কোনো আমলই নেই।") [৫৫৩]
এই প্রকারের দানশীলতায় অনেক উপকারিতা ও কল্যাণ রয়েছে। কোনো ব্যক্তি সমস্ত মানুষকে ধনসম্পদ দিয়ে খুশি করতে পারবে না। কিন্তু উত্তম চরিত্র, ভালো আচরণ আর হাশিখুশি ব্যবহার দিয়ে সবাইকেই সন্তুষ্ট করতে পারে।
১০. মানুষের ধনসম্পদ উপেক্ষা করার মাধ্যমে দানশীলতা (الْجُوْدُ بِتَرْكِهِ مَا فِي أَيْدِي النَّاسِ عَلَيْهِمْ) : মানুষের নিকট যা রয়েছে তা পরিত্যাগ করা, সে দিকে ভ্রূক্ষেপই না করা, অন্তরে তা পাওয়ার আশাও না রাখা এবং ভাবভঙ্গি কিংবা কথাবার্তার মাধ্যমেও সেগুলোর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ না করা। এ সম্পর্কেই আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেছেন, 'অপরের সম্পদে লোভ করা থেকে বিরত থাকা, ধনসম্পদ দান করার চেয়েও উত্তম।'[৫৫৪]
এই ধরনের ব্যক্তি মানুষকে দান করার মতো হয়তো কোনো সম্পদ পায় না; কিন্তু সে মানুষের অর্থকড়ি থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করে, ফলে তারা দানশীলদের চেয়ে বেশি মর্যাদা লাভ করে এবং আত্মিক প্রশান্তি পায়।
দানশীলতার প্রতিটি স্তরেই ব্যক্তির জন্য সে যা দান করে তার চেয়ে অতিরিক্ত প্রাপ্তি রয়েছে। (দান করার কারণে ধনসম্পদ কখনো কমে না।) ব্যক্তির অন্তরে ও অবস্থায় এর একটি বিশেষ প্রভাব রয়েছে। আল্লাহ তাআলা দানশীল ব্যক্তিকে তার দানের চেয়ে বেশি দিয়ে থাকেন। অপরদিকে তিনি সম্পদ সঞ্চয়কারীর অর্থকড়ি ধ্বংস করে দেন। আল্লাহ তাআলাই প্রকৃত সাহায্যকারী।

টিকাঃ
[৫৪৯] বুখারি, ২৯৮৯; মুসলিম, ১০০৯।
[৫৫০] এর অনুরূপ হাদীস দেখুন-আবূ দাউদ, ৪৮৮৭; আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ৭০২৬।
[৫৫১] সূরা মায়িদা, ৫:৪৫।
[৫৫২] মুসলিম, ২৬২৬; আবূ দাউদ, ৪০৮৪।
[৫৫৩] আবূ দাউদ, ৪৭৯৯; তিরমিযি, ২০০২।
[৫৫৪] ইবনু মানযূর, মুখতাসারু তারীখি দিমাশূক, ১৪/২৭।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সবকিছুর চেয়ে প্রাধান্য দেওয়া

📄 আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সবকিছুর চেয়ে প্রাধান্য দেওয়া


অন্যের সন্তুষ্টির ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া, যে কাজে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে, তা সম্পন্ন করা, যদিও মানুষজন তাতে অসন্তুষ্ট হয়।
এটি হলো আম্বিয়ায়ে কেরাম-এর স্তর। এর চেয়েও উঁচু স্তর হলো রাসূলগণের স্তর। তার চেয়েও উচ্চ স্তর হলো রাসূলদের মধ্যে যারা أُولُو الْعَزمِ (দৃঢ় মনোবলের অধিকারী) ছিলেন তাদের স্তর। আর সর্বোচ্চ স্তর হলো আমাদের নবি মুহাম্মাদ -এর স্তর। কেননা তিনি (তাওহীদের বাণী নিয়ে) সমগ্র পৃথিবীবাসীর বিপরীতে একা দাঁড়িয়েছেন, একাই আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিয়েছেন, আল্লাহর জন্য কাছের-দূরের সব রকমের শত্রুতা সহ্য করেছেন, সবকিছুর সন্তুষ্টির আগে পুরাপুরিভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কার তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং নবি -এর সমস্ত চেষ্টা-প্রচেষ্টা, ইচ্ছা-উদ্যম ও তৎপরতা ছিল একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে রাজি-খুশি করা, তাঁর দেওয়া বিধিবিধান মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে দেওয়া, তাঁর কালিমাকে বিজয়ী করা এবং তাঁর শত্রুদের সাথে জিহাদ করার উদ্দেশ্যে; যতক্ষণ-না আল্লাহর দ্বীন সমস্ত দ্বীনের ওপর বিজয়ী হয়, আল্লাহর বিধান সমগ্র পৃথিবীবাসীর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুমিনদের ওপর তাঁর নিয়ামাত পূর্ণতা পায়। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায়) আল্লাহর বিধান (রিসালাত) সবার নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, তাঁর ওপর অর্পিত আমানত যথাযথভাবে আদায় করেছেন, উম্মাতের কল্যাণকামিতায় তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ মনোযোগী, আল্লাহর জন্য সর্বশক্তি দিয়ে জিহাদ করেছেন এবং একনিষ্ঠতার সাথে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আপন রবের ইবাদাত করে গিয়েছেন। সুতরাং মুহাম্মাদ ছাড়া প্রাধান্যদানের এই স্তর আর কেউ পেতে পারে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00