📄 সত্যবাদিতার আলামত
সত্যবাদিতার আলামত হলো: অন্তরে নিশ্চিন্ততা ও স্বস্তি আসে। আর মিথ্যাচারের আলামত হলো : অন্তর দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যেমন 'সুনানুত তিরমিযি'তে এসেছে, হাসান ইবনু আলি ইবনি আবী তালিব থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
إِنَّ الصِّدْقَ طُمَأْنِيْنَةٌ وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيبَةً “সত্য হলো নিশ্চিন্ততা আর মিথ্যা হলো দ্বিধাগ্রস্ততা।”[৫৩৫]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ؛ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِى إِلَى البِرّ، وَإِنَّ البِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ صِدِّيقًا، وَإِيَّاكُمْ وَالكَذِبَ؛ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُوْرِ، وَالْفُجُورُ يَهْدِى إِلَى النَّارِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ كَذَّابًا "তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধরো। কেননা নিশ্চয়ই সত্য পুণ্যের পথ দেখায় আর পুণ্য জান্নাতের পথ দেখায়। কোনো ব্যক্তি সত্য বলতে থাকলে অবশেষে তাকে আল্লাহ তাআলার নিকট সিদ্দীক বা সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর তোমরা মিথ্যা থেকে কঠোরভাবে বেঁচে থাকো। কেননা মিথ্যা নিশ্চিতরূপে পাপাচারের পথ দেখায় আর পাপাচার জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়। কোনো ব্যক্তি মিথ্যা বলতে থাকলে অবশেষে তাকে আল্লাহ তাআলার নিকট কায্যাব বা মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়।”[৫৩৬]
রাসূলুল্লাহ সত্যবাদিতাকে সিদ্দীকের মর্যাদা লাভের চাবি ও সূচনা বানিয়েছেন। আর সিদ্দীকের মর্যাদা লাভ করাই হলো সত্যবাদিতার চূড়ান্ত ধাপ। সুতরাং কথায়, কাজে বা আচার-আচরণে মিথ্যাবাদী কোনো ব্যক্তি কখনো এই মর্যাদা অর্জন করতে পারবে না। বিশেষভাবে যারা আল্লাহ তাআলার গুণাবলি ও নামসমূহের ক্ষেত্রে মিথ্যা আরোপ করে এবং আল্লাহ যা নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন আর যা সাব্যস্ত করেননি, সেসব ক্ষেত্রেও আল্লাহ তাআলার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, তারা কোনোকালেও সিদ্দীকের মর্যাদা লাভ করতে পারবে না।
এমনিভাবে দ্বীন ও শারীআতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা; যেমন: আল্লাহ তাআলা যা হারাম করেছেন, তা হালাল করা; যা হালাল করেছেন, তা হারাম করা; যা আবশ্যক করেছেন, তা পরিত্যাগ করা; যা আবশ্যক করেননি, তা অবধারিত করে নেওয়া; আর আল্লাহ তাআলা যা পছন্দ করেছেন, তা অপছন্দ করা কিংবা তিনি যা অপছন্দ করেছেন, তা পছন্দ করা ইত্যাদি এ সবগুলোই সিদ্দীক হওয়ার পরিপন্থি ও সাংঘর্ষিক।
এমনিভাবে বাহ্যিক আমলে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া; যেমন: কেউ সত্যবাদী, মুখলিস, দুনিয়াবিরাগী ও আল্লাহর ওপর ভরসাকারীদের মতো বেশভূষা গ্রহণ করে; অথচ বাস্তবে সে তাদের দলভুক্ত নয়। (সেও সিদ্দীক হতে পারবে না।)
এ জন্যই সত্যবাদিতা হলো—গোপনে ও প্রকাশ্যে পরিপূর্ণ ইখলাসের সাথে আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধের পূর্ণ আনুগত্য করা এবং তা মনে-প্রাণে মেনে নেওয়া।
টিকাঃ
[৫৩৫] তিরমিযি, ২৫১৮।
[৫৩৬] বুখারি, ৬০৯৪; মুসলিম, ২৬০৬।
📄 সত্যবাদিতা সম্পর্কে সালাফদের কতিপয় উক্তি
আবদুল ওয়াহিদ ইবনু যাইদ বলেছেন, 'সত্যবাদিতা হলো: আল্লাহর সাথে যে চুক্তি (করা হয়েছে) আমলের মাধ্যমে তা পূর্ণ করা।'[৫৩৭]
কেউ বলেছেন, 'সত্যবাদিতা হলো অন্তরে লুকায়িত কথার সাথে মুখে-বলা-কথার মিল থাকা।'[৫৩৮]
কেউ বলেছেন, 'বাহ্যিক অবস্থা ও গোপন অবস্থা এক হওয়া। অর্থাৎ মিথ্যাবাদীর বাহ্যিক অবস্থা তার গোপন অবস্থার চেয়ে ভালো হয়; মুনাফিকের মতো; যার ভেতরের চেয়ে বাইরের অবস্থা ভালো থাকে।'
কেউ বলেছেন, 'সত্যবাদিতা হলো—মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলেও ন্যায় ও হক কথা বলা।'
কেউ বলেছেন, 'যার নিকট তুমি আশাও করো, আবার ভয়ও পাও; তার সামনে ন্যায্য কথা বলা।'
ইবরাহীম খাওয়াস বলেছেন, 'আপনি সত্যবাদীকে দেখবেন, হয়তো সে কোনো ফরজ দায়িত্ব পালন করছে, অথবা উত্তম কোনো কাজে লিপ্ত রয়েছে। [৫৩৯]
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, 'সত্যবাদিতার প্রকৃত মর্ম হলো— যেখানে মিথ্যা বলা ছাড়া রেহাই পাবে না, সেখানেও তুমি সত্য কথা বলবে। [৫৪০]
কেউ কেউ বলেছেন, 'সত্যবাদী ব্যক্তিকে তিনটি বিষয় সত্য বলা থেকে বিরত রাখতে পারে না—
১. মিষ্টান্ন (অর্থাৎ উপহার), ২. ভয়ভীতি ও ৩. চাটুকারিতা। [৫৪১]
হাদীসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, مَنْ صَدَقَنِي فِي سَرِيرَتِهِ صَدَقْتُهُ فِي عَلَانِيَتِهِ عِنْدَ خَلْقِي
“যে ব্যক্তি তার গোপন অবস্থাতেও আমার প্রতি সত্যবাদী থাকে, আমি আমার সৃষ্টিকুলের মাঝে তাকে তার বাহ্যিক অবস্থাতেও সত্যবাদী হিসেবে রাখব।"[৫৪২]
টিকাঃ
[৫৩৭] সাহল ইবনু আবদিল্লাহ তুসতারি, তাফসীর, ১২৬।
[৫৩৮] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৬৪।
[৫৩৯] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৬৫।
[৫৪০] আবদুল কাদীর জীলানি, আল-গুনইয়া, ২/৩৩৫।
[৫৪১] আবদুল কাদীর জীলানি, আল-গুনইয়া, ২/৩৩৫।
[৫৪২] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৬৫।