📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 লজ্জাশীলতার প্রকারভেদ

📄 লজ্জাশীলতার প্রকারভেদ


লজ্জাকে ১০টি ভাগে ভাগ করা যায়—
১. অপরাধের কারণে সৃষ্ট লজ্জা (حَيَاءُ الجِنَايَةِ)
২. অপারগতার দরুন লজ্জা (حَيَاءُ التَّقْصِيرِ)
৩. শ্রদ্ধার কারণে লজ্জা (حَيَاءُ الْإِجْلَالِ)
৪. ভদ্রতাজনিত লজ্জা (حَيَاءُ الْكَرَمِ)
৫. শালীনতার লজ্জা (حَيَاءُ الْحَشَمَةِ)
৬. নফসকে ছোটো ও অপদস্থ মনে করার কারণে লজ্জা (حَيَاءُ اسْتِصْغَارِ لِلنَّفْسِ) (وَاحْتِقَارٍ لَّهَا)
৭. ভালোবাসার কারণে লজ্জা (حَيَاءُ الْمَحَبَّةِ)
৮. গোলামির কারণে লজ্জা (حَيَاءُ الْعُبُوْدِيَّةِ)
৯. সম্মান ও মর্যাদার কারণে লজ্জা (حَيَاءُ الشَّرَفِ وَالْعِزَّةِ) এবং
১০. নিজের প্রতি নিজের লজ্জা (حَيَاءُ الْمُسْتَحْيِي مِنْ نَّفْسِهِ)
১. অপরাধের কারণে সৃষ্ট লজ্জা : আদম -এর লজ্জা এর অন্তর্ভুক্ত। যখন জান্নাত থেকে তিনি পালিয়ে লুকানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা বলেছিলেন, ‘হে আদম, আমার থেকে পালানোর চেষ্টা করছো?’ তিনি জবাবে বলেছিলেন, ‘ইয়া রব, না; বরং আপনার প্রতি লজ্জার কারণে লুকানোর চেষ্টা করছি।’[৫১৮]
২. অপারগতার দরুন লজ্জা : যেমন, ফেরেশতাদের লজ্জা। যারা দিন-রাত আল্লাহ তাআলার তাস্বীহ-তাহলীলে মশগুল, সামান্য সময়ের জন্যও ক্লান্ত হয় না। কিয়ামতের দিন তারা বলতে থাকবে, سُبْحَانَكَ مَا عَبَدْنَاكَ حَقَّ عِبَادَتِك ‘আপনি দোষত্রুটি মুক্ত, আমরা আপনার যথোপযুক্ত ইবাদাত করতে পারিনি!’[৫১৯]
৩. শ্রদ্ধার কারণে লজ্জা : এটি হলো পরিচয়-প্রাপ্তির লজ্জা। বান্দা তার রবের পরিচয় অনুপাতে তাঁকে লজ্জা করে থাকে। (আল্লাহর পরিচয় যত বেশি পাবে, শ্রদ্ধা ও মহত্ত্বের কারণে তাঁর প্রতি লজ্জাও তত বাড়তে থাকবে।)
৪. ভদ্রতাজনিত লজ্জা : যেমন, নবি -এর লজ্জা। যখন যাইনাব -এর সাথে তাঁর বিয়ের ওলীমা খাওয়ার জন্য লোকজনদের দাওয়াত করেছিলেন আর তারা দীর্ঘসময় ধরে সেখানে বসে আলাপ করছিলেন। নবি -এর অনেক অসুবিধা হচ্ছিল, তবুও তিনি লজ্জার কারণে তাদেরকে বলতে পারেননি, 'তোমরা চলে যাও'।[৫২০]
৫. শালীনতার লজ্জা: যেমন, আলি ইবনু আবী তালিব-এর লজ্জা। তিনি আল্লাহর রাসূল -কে মযির মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করছিলেন। কারণ নবি -এর মেয়ে ফাতিমা তার স্ত্রী ছিলেন।
৬. নফসকে ছোটো ও অপদস্থ মনে করার কারণে লজ্জা: যেমন, বান্দা যখন তার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর কাছে চায়, তখন লজ্জা অনুভব করে; নিজেকে ছোটো ও ক্ষুদ্র মনে করার কারণে। ইসরাঈলি বর্ণনায় এসেছে, 'মুসা বলেন,
يَا رَبِّ إِنَّهُ لَتُعْرَضُ لِي الْحَاجَةُ مِنَ الدُّنْيَا. فَأَسْتَحْيِي أَنْ أَسْأَلَكَ هِيَ يَا رَبِّ
'রব আমার, অনেক সময় আমার দুনিয়াবি জিনিসপত্রের প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু তোমার কাছে তা চাইতে লজ্জা লাগে!'
জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেন,
سَلْنِي حَتَّى مِلْحَ عَجِيْنَتِكَ وَعَلَفَ شَاتِكَ
'তুমি আমার কাছে চাইবে, এমনকি তোমার খামিরার লবণ কিংবা বকরির জন্য ঘাস-পাতা হলেও।'[৫২১]
কখনো কখনো এই প্রকারের লজ্জার দুইটি কারণ থাকে-
১. প্রার্থনাকারী নিজেকে খুব ছোটো মনে করে আর তার অপরাধ ও গুনাহসমূহকে বড়ো করে দেখে, অথবা
২. যে জিনিসটি চাইছে, তা অনেক বড়ো মনে করে।
৭. ভালোবাসার কারণে লজ্জা: অনুরক্ত ব্যক্তি তার প্রিয় মানুষকে প্রচণ্ড ভালোবাসার কারণে লজ্জা পায়। এমনকি তার অনুপস্থিতিতেও যখন তার কথা অন্তরে আসে, হৃদয় ভরে লজ্জা অনুভূত হয় এবং সে তার চেহারাতেও তা টের পায়; কিন্তু জানে না, কী তার কারণ।
৮. গোলামির কারণে লজ্জা: এটি ভয় ও ভালোবাসা মিশ্রিত লজ্জা। আল্লাহ তাআলার গোলাম হওয়ার জন্য সে নিজেকে উপযুক্ত মনে করে না। কারণ তিনি হলেন সুউচ্চ ও সুমহান গুণাবলির অধিকারী। সুতরাং (অক্ষম, শক্তিহীন এক) বান্দার জন্য এমন রবের গোলাম হওয়ার কারণে তো লজ্জা অনুভূত হবেই; এতে কোনো সন্দেহ নেই।
৯. সম্মান ও মর্যাদার কারণে লজ্জা: সম্মানের অধিকারী বড়ো কোনো ব্যক্তির লজ্জা; যখন তার কাছ থেকে এমন কোনো কাজ, দান বা অনুগ্রহ প্রকাশ পায়, যা তার মর্যাদা ও পদবিমতো হয় না। তখন সেই ব্যক্তি তার সম্মান ও ইজ্জতের কারণে লজ্জিত হয়। এর দুটি কারণ-
এক. ওপরে যা বর্ণনা করা হলো। অর্থাৎ সম্মান ও মর্যাদার কারণে,
দুই. গ্রহণকারী বা প্রার্থনাকারীর প্রতি সে লজ্জাবোধ করে। যেন সে নিজেকেই প্রার্থনাকারী হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে অনেক সম্মানিত ব্যক্তি এমন রয়েছে, যারা দান করার পর দানগ্রহণকারীর সামনে আর কখনো যাননি; তার প্রতি লজ্জার কারণে। এই প্রকারের লজ্জা ভদ্রতাজনিত লজ্জারও অন্তর্ভুক্ত। কেননা সেও গ্রহণকারীর প্রতি আন্তরিকতার দরুন লজ্জা অনুভব করে।
১০. নিজের প্রতি নিজের লজ্জা: সম্ভ্রান্ত, অভিজাত ও উঁচু স্তরের ব্যক্তি নিজের জন্য ত্রুটিযুক্ত কিছুতে সন্তুষ্ট হওয়ার লজ্জা। সে নিজেই নিজেকে লজ্জা পায়। যেন তার মাঝে দুটি আত্মা। একটি অপরটির নিকট লজ্জিত হয়। এই প্রকারের লজ্জাশীলতা সবগুলোর চেয়ে পরিপূর্ণ ও উঁচু স্তরের। কারণ বান্দা যখন নিজেই নিজের কাছে লজ্জা পায়, তখন অপরের কাছে যে অধিক লজ্জা পাবে এটাই স্বাভাবিক।

টিকাঃ
[৫১৮] সুয়ূতি, জামিউল আহাদীস, ৫৯০২।
[৫১৯] সুয়ূতি, জামিউল আহাদীস, ৮০১২।
[৫২০] বুখারি, ৫১৬৮; মুসলিম, ১৪২৮।
[৫২১] ইবনু রজব হাম্বালি, জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ২/৬৬২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00