📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 শোকরের প্রকৃত মর্ম

📄 শোকরের প্রকৃত মর্ম


ইবাদাতের ক্ষেত্রে শোকরের প্রকৃত মর্ম হলো-আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও নিয়ামাতের প্রভাব বান্দার জবানে প্রশংসা ও স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া, অন্তরে সাক্ষ্য ও মহাব্বতের মাধ্যমে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সমর্পণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া।
শোকর পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত- ১. শোকরগুজার বান্দা আল্লাহ তাআলার প্রতি বিনম্র হবে, ২. তাঁকে ভালোবাসবে, ৩. তাঁর দেওয়া অনুগ্রহ ও নিয়ামাত স্বীকার করবে, ৪. নিয়ামাত প্রদানের কারণে তাঁর প্রশংসা করবে এবং ৫. নিয়ামাতসমূহকে তাঁর অপছন্দনীয় খাতে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবে।
এই পাঁচটি ভিত্তির ওপরই শোকর প্রতিষ্ঠিত। ফলে যখন এগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি অনুপস্থিত থাকবে, তখন শোকরের ভিত্তিসমূহ থেকে একটি ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যে কেউ শোকর ও শোকরের সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করে, তার আলোচনা এই পাঁচটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।
যেমন: কেউ বলেছেন, 'শোকরের সংজ্ঞা হলো: বিনয় ও নম্রতার সাথে অনুগ্রহদাতার অনুগ্রহকে স্বীকার করা।'
আবার কেউ বলেছেন, 'অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে তার প্রশংসা করা।'
কেউ বলেছেন, 'শোকর হলো: অন্তর অনুগ্রহকারীর ভালোবাসায় সিক্ত হওয়া, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার আনুগত্যে বিনম্র হওয়া এবং জবানে তার আলোচনা ও প্রশংসা চলমান থাকা।'
শিবলি বলেছেন, 'শোকর হচ্ছে: অনুগ্রহদাতার প্রতি দৃষ্টিপাত করা; অনুগ্রহের প্রতি নয়।'[৪৯৭]
আমি বলি, তাঁর কথাটি দুটি বিষয়ের সম্ভাবনা রাখে-
১. অনুগ্রহদাতার প্রতি দৃষ্টিপাত করার কারণে তার দেওয়া অনুগ্রহের প্রতি দৃষ্টিপাত করার ফুরসতই সে পাবে না, (সে তাঁর প্রতিই মগ্ন থাকবে।)
২. আল্লাহর দেওয়া নিয়ামাতের প্রতি দৃষ্টিপাত, আল্লাহর প্রতি দৃষ্টিপাত করার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। এই ব্যাখ্যাটি পরিপূর্ণ। তবে তাদের নিকট প্রথমটিই বেশি শক্তিশালী।
কিন্তু সবদিক বিবেচনায় ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান হলো-নিয়মাত ও নিয়ামাতদাতা উভয়ের প্রতিই দৃষ্টিপাত করা। কারণ নিয়ামাতদাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়, তাঁর থেকে প্রাপ্ত-নিয়মাত অনুসারে। সুতরাং নিয়ামাত যখন পরিপূর্ণ হবে, কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া আদায়ও পরিপূর্ণ হবে। আর আল্লাহ তাআলা এটা পছন্দ করেন যে, তাঁর বান্দারা তাঁর দেওয়া নিয়ামাত প্রত্যক্ষ করুক, তাঁর প্রতি এর স্বীকৃতি জানাক, নিয়ামাত দেওয়ার কারণে তাঁর প্রশংসা করুক এবং তাঁকে ভালোবাসুক। তিনি এটা পছন্দ করেন না যে, বান্দারা তাঁর দেওয়া নিয়ামাত থেকে চোখ ফিরিয়ে নিক, তার আলোচনা বন্ধ করে দিক এবং তা প্রত্যক্ষ করা থেকে বিরত থাকুক।
শোকর আদায় করলে সবসময় অধিক নিয়ামাত পাওয়া যায়। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "যদি তোমরা আমার শোকর আদায় করো, তা হলে আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেবো।”[৪৯৮] সুতরাং যখন দেখবেন আপনার অবস্থা সংকটময়, তখন শোকর আদায়ের প্রতি মনোযোগী হোন।

টিকাঃ
[৪৯৭] মুনাবি, ফাইযুল কাদীর, ২/১৪০।
[৪৯৮] সূরা ইবরাহীম, ১৪: ৭।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 অনুগ্রহের প্রশংসা করাও শোকর

📄 অনুগ্রহের প্রশংসা করাও শোকর


অনুগ্রহদাতার প্রশংসা করার বিষয়টি তার দেওয়া অনুগ্রহের সাথে দুইভাবে সম্পৃক্ত:
১. ব্যাপক (اَلْعَامُ) এবং ২. বিশেষ (الخاص)।
১. ব্যাপক প্রশংসা : অনুগ্রহদাতার দয়া ও উদারতার কথা, করুণা ও মহানুভবতার কথা, তার ব্যাপক দান করার কথাসহ এ রকম আরও গুণাবলির কথা প্রকাশ করা।
২. বিশেষ প্রশংসা: প্রাপ্ত-নিয়ামাত সম্পর্কে আলোচনা করা, নিয়ামাত দানকারীর পক্ষ থেকে তার নিকট নিয়ামাত পৌঁছার কথা জানিয়ে দেওয়া। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ
"এবং আপনার রবের নিয়ামাতের কথা প্রকাশ করুন।” [৪৯৯]
এখানে 'নিয়ামাতের কথা প্রকাশ করা'র যে আদেশ, তার দুটি ব্যাখ্যা হতে পারে-
প্রথম ব্যাখ্যা: প্রাপ্ত-নিয়ামাতের আলোচনা করা এবং এ সম্পর্কে মানুষকে জানিয়ে দেওয়া। যেমন: 'আল্লাহ তাআলা আমাকে এই এই নিয়ামাত দান করেছেন' ইত্যাদি বলা। মুকাতিল বলেন, 'অর্থাৎ, এই সূরাতে বর্ণিত যে নিয়ামাতগুলো আপনাকে দেওয়া হয়েছে- যেমন: ইয়াতীম অবস্থায় আশ্রয় দেওয়া, পথ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকাবস্থায় পথ দেখানো এবং নিঃস্ব অবস্থায় ধনী বানিয়ে দেওয়া-সেগুলোর শুকরিয়া আদায় করুন।'[৫০০]
আনাস থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন, التَّحَدُّثُ بِنِعْمَةِ اللَّهِ شُكْرٌ وَتَرْكُهَا كُفْرٌ، وَمَنْ لَا يَشْكُرُ الْقَلِيْلَ لَا يَشْكُرُ الْكَثِيرَ، وَمَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسَ لَا يَشْكُرُ اللَّهَ، وَالْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ، وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ "আল্লাহ তাআলার নিয়ামাতের আলোচনা করা শোকর আর তা পরিত্যাগ করা অকৃতজ্ঞতা। যে ব্যক্তি অল্প
জিনিসেরও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না। আর যে ব্যক্তি মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না, সে আল্লাহরও শুকরিয়া আদায় করে না। আল্লাহ তাআলার নিয়ামাতের আলোচনা করা হলো: শোকর আর তা পরিত্যাগ করা হলো: অকৃতজ্ঞতা এবং একতাবদ্ধ হয়ে থাকা হলো: রহমত আর বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা হলো: আযাব।” [৫০২]
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: উপরিউক্ত আয়াতে 'নিয়ামাতের কথা প্রকাশ করা'র যে আদেশ নবি -কে করা হয়েছে, তার অর্থ হলো—আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, আল্লাহর পয়গাম (রিসালাত) পৌঁছিয়ে দেওয়া এবং উম্মাহকে শিক্ষাদান করা। মুজাহিদ বলেছেন, 'সে (নিয়ামাতটি) হলো নুবুওয়াত।' যাজ্জাজ বলেছেন, 'অর্থাৎ, আপনাকে যা দিয়ে পাঠানো হয়েছে, তা পৌঁছিয়ে দিন এবং আল্লাহ তাআলা যে নুবুওয়াত আপনাকে দান করেছেন, সে সম্পর্কে আলোচনা করুন।' কালবি বলেছেন, 'তা হলো কুরআন; আল্লাহ তাআলা নবিজিকে তা পাঠ করে শুনানোর আদেশ দিয়েছেন। [৫০৩]
সঠিক অভিমত হলো—এটি দুটি ব্যাখ্যাকেই অন্তর্ভুক্ত করে। কারণ দুটির প্রত্যেকটিই নিয়ামাত, যার ব্যাপারে শুকরিয়া আদায় করার এবং আলোচনা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর তা প্রকাশ করা তো শোকরেরই অন্তর্ভুক্ত।

টিকাঃ
[৪৯৯] সূরা দোহা, ৯৩: ১১।
[৫০০] এখানে কোনো ফুটনোট ছিল না, কিন্তু মূল ডকুমেন্টের টেক্সট ব্লকে একটি খালি রেফারেন্স হিসেবে [৫০১] উল্লেখ করা হয়েছে।
[৫০২] আহমাদ, ৪/৩৭৫।
[৫০৩] বাগাবি, তাফসীর, ৮/৪৫৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00