📄 সন্তুষ্টি অভিভাবক বানালো
আল্লাহকে রব হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার অর্থ: আল্লাহ তাআলাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে রব না বানানো; যার কাছে বান্দা নিজের কাজকর্ম ও প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রার্থনা করবে এবং যার কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ
"বলুন, আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো রবের সন্ধান করব, অথচ তিনিই সবকিছুর রব?” [৪৭০]
ইবনু আব্বাস ﷴ বলেছেন, 'ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য ও অভিভাবক হিসেবে আমি অন্য কাউকে সন্ধান করব?' অর্থাৎ আমি কীভাবে তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যকে রব হিসাবে খুঁজব, অথচ তিনিই সবকিছুর রব?!
এই সূরারই শুরুর দিকে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَتَّخِذُ وَلِيًّا فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
"বলুন, আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নিজের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করব, (সেই আল্লাহকে বাদ দিয়ে,) যিনি মহাকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা?”[৪৭১]
অর্থাৎ ইবাদাত লাভের সত্তা, বন্ধু, সাহায্যকারী ও আশ্রয়দাতা হিসাবে (আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে গ্রহণ করব?)। ওপরের আয়াতে উল্লেখিত শব্দটি এসেছে الْوَلَاءُ (বন্ধুত্ব করা)-থেকে; যা মহাব্বত ও আনুগত্যকে অন্তর্ভুক্ত করে।
ওই সূরার মাঝামাঝিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا وَهُوَ الَّذِي أَنْزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلًا
“আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো মীমাংসাকারীর সন্ধান করব, অথচ তিনি তোমাদের প্রতি বিস্তারিত বিবরণসহ কিতাব নাযিল করেছেন?"[৪৭২]
অর্থাৎ আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে সন্ধান করব, যিনি আমার মাঝে ও তোমাদের মাঝে মীমাংসা করে দেবে? ফলে আমরা যে বিষয়ে বিরোধ করছি, সে বিষয়ে অন্য কাউকে মীমাংসাকারী বানাব? অথচ আল্লাহর এই কিতাব সমস্ত মীমাংসাকারীদের সর্দার! সুতরাং কীভাবে আমরা তাঁর কিতাব ব্যতীত বিচার-মীমাংসার জন্য অন্য কারও দ্বারস্থ হব, অথচ তিনি বিস্তারিত, সুস্পষ্ট, পূর্ণাঙ্গ ও উপযোগী করে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন?
আপনি যদি উপরিউক্ত তিনটি আয়াত নিয়ে যথাযথভাবে চিন্তাভাবনা করেন, তা হলে দেখতে পাবেন যে, এই আয়াতগুলো সরাসরি আল্লাহকে রব হিসাবে, মুহাম্মাদ -কে রাসূল হিসাবে আর ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়া (র বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।) আর সেই হাদীসটিকে পাবেন এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যাকারী হিসেবে এবং এটা উপলব্ধি করবেন যে, সেই হাদীসটির উৎস হলো এই আয়াতগুলোই।
অনেক মানুষ এমন আছে যারা আল্লাহকে রব হিসাবে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট, তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো রবের সন্ধানও করে না; কিন্তু তাঁকে এককভাবে অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসাবে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে না; বরং তাঁকে ছাড়াও আরও অনেক নেককার ব্যক্তিদেরকে অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করে থাকে, এই ভেবে যে, তারা তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী বানিয়ে দেবে, আল্লাহর প্রিয় পাত্র বানাবে। তাদেরকে অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসাবে গ্রহণ করার বিষয়টি হলো রাজা-বাদশাহদের কাছের ও বিশেষ ব্যক্তিদেরকে অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করার ন্যায়। আসলে এটিই হলো শির্ক।
এ ক্ষেত্রে তাওহীদ হলো: আল্লাহকে ছেড়ে আর কাউকে অভিভাবক ও সাহায্যকারী না বানানো। কুরআনে অনেকবার মুশরিকদের এই স্বভাব ও চরিত্রের বর্ণনা এসেছে যে, তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আরও অনেককে অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসাবে গ্রহণ করে।
মুশরিকদের অভিভাবকগ্রহণ আর নবি-রাসূল ও মুমিন বান্দাদের পরস্পরের বন্ধুত্ব ও অভিভাবকগ্রহণ করা এক নয়। কারণ এটি হলো ঈমানের ও আল্লাহর সাথে বন্ধুত্বের পরিপূরক। আসলে আল্লাহর ওলিদের বন্ধুত্বের মাঝে রয়েছে একটি রং আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে রয়েছে ভিন্ন আরেকটি রং। যারা এ দুটি রঙের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না, তারা যেন তাদের তাওহীদের মূল অনুসন্ধান করে। কারণ এই মাসআলাটি হলো তাওহীদের মূল ভিত্তি ও বুনিয়াদ।
আবার অনেক মানুষ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহকে ছাড়া বিচারক-মীমাংসাকারী হিসাবে অন্যকে খোঁজে, তার কাছেই মীমাংসা চায়, বিচার-ফায়সালার জন্য তার কাছেই যায় এবং তার বিচারেই সন্তুষ্ট থাকে। এই তিনটি মাকামই হলো তাওহীদের রোকন বা ভিত্তি; অর্থাৎ: ১. আল্লাহকে ব্যতীত কাউকে রব হিসাবে গ্রহণ না করা, ২. আল্লাহকে ব্যতীত কাউকে ইলাহ্ হিসাবে গ্রহণ না করা ও ৩. আল্লাহকে ব্যতীত কাউকে মীমাংসাকারী হিসাবে গ্রহণ না করা।
আল্লাহকে রব হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার ব্যাখ্যা হলো: আল্লাহকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করতে সে অসন্তুষ্ট হবে। আর এটি হলো আল্লাহকে ইলাহ হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়া। আবার এটি (অর্থাৎ আল্লাহকে ইলাহ্ হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়া) আল্লাহকে রব হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়াকে পূর্ণতা দান করে। সুতরাং যে ব্যক্তি যথাযথভাবে আল্লাহকে রব হিসাবে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট হবে, অবশ্যই সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করতে অসন্তোষ প্রকাশ করবে। কারণ রব হিসাবে যে একজনকে মানবে, ইলাহ্ হিসাবেও সে কেবল একজনকে মানতে বাধ্য; যেমন যে ব্যক্তি জানে তার রব একজন, সে আবশ্যকীয়ভাবে এটাও জানবে যে, তার ইলাহ্ও একজন।
টিকাঃ
[৪৭০] সূরা আনআম, ৬: ১৬৪।
[৪৭১] সূরা আনআম, ৬: ১৪।
[৪৭২] সূরা আনআম, ৬ : ১১৪।
📄 সন্তুষ্টির গুণ অর্জনযোগ্য নাকি আল্লাহ-প্রদত্ত?
কুশাইরি [৪৭০] বলেছেন, 'এ দুটির মাঝে সমন্বয় করা সম্ভব। তা এভাবে যে, সন্তুষ্টির সূচনা হলো বান্দার উপার্জিত। এটি হলো সমস্ত মাকামের মতোই একটি মাকাম। আর এর শেষ হলো 'হাল' বা বিশেষ অবস্থার অন্তর্ভুক্ত; যা বান্দার জন্য অর্জনযোগ্য নয়। সুতরাং সন্তুষ্টির সূচনা হলো মাকাম আর এর শেষ হলো হাল।'
তবে সঠিক অভিমত হলো: রিযা বা সন্তুষ্টি কারণ-উপকরণের দিক বিবেচনায় অর্জনযোগ্য। আর প্রকৃত অবস্থা বিবেচনায় তা আল্লাহ-প্রদত্ত। সুতরাং বান্দা যদি সঠিক উপকরণ অবলম্বন করে এবং এর গাছ রোপণ করে, তা হলে সে এর থেকে সন্তুষ্টির ফল লাভ করবে। কারণ তাওয়াক্কুলের শেষ ধাপই হলো রিযা বা সন্তুষ্টি।
সুতরাং যে ব্যক্তির পা তাওয়াক্কুল, তাসলীম ও তাফবীযের মানযিলে স্থির হবে, নিশ্চিতভাবেই তার সন্তুষ্টির মাকাম হাসিল হবে।
কিন্তু এর অর্জন অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমসাধ্য হওয়ার কারণে, অধিকাংশ মানুষের এতে সাড়া দেওয়ার প্রবণতা না থাকার কারণে এবং তাদের জন্য এটি অনেক কঠিন হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর তা ওয়াজিব করে দেননি; বান্দার প্রতি তাঁর অসীম দয়ার কারণে এবং তাদের ওপর সহজ করার জন্য। তবে এটিকে তিনি তাদের জন্য পছন্দনীয় আমল হিসাবে সাব্যস্ত করেছেন এবং যারা এর গুণে গুণান্বিত হয় তাদের প্রশংসা করেছেন। এই সংবাদও দিয়েছেন যে, বান্দার ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টি জান্নাত ও জান্নাতের মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তার চেয়েও অনেক বড়ো, মর্যাদাপূর্ণ ও উত্তম।
যে ব্যক্তি তার রবের ওপর সন্তুষ্ট হয়, আল্লাহও তার ওপর সন্তুষ্ট হন। বরং বলা যায় আল্লাহর প্রতি বান্দার সন্তুষ্টি, বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টিরই ফল। আসলে বান্দার সন্তুষ্টি আল্লাহর দুটি সন্তুষ্টি দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে: একটি সন্তুষ্টি এর পূর্বে; যা বান্দাকে তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হতে উদ্বুদ্ধ করে, আরেকটি সন্তুষ্টি এর পরে; আর তা হলো বান্দার প্রতি তাঁর সন্তুষ্টির ফল। এ কারণেই সন্তুষ্টি হলো আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে প্রশস্ত দরজা, দুনিয়ার জান্নাত, আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তৃপ্তির স্থান, মহাব্বতকারীদের জীবন, ইবাদাতকারীদের প্রফুল্লতা আর আল্লাহর প্রতি আগ্রহীদের চোখের শীতলতা।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে বড়ো একটি উপকরণ হলো: আল্লাহ তাআলা যে কাজগুলোর মধ্যে তাঁর সন্তুষ্টি নিহিত রেখেছেন, তা আঁকড়ে ধরা। কারণ নিশ্চিতভাবে এটি তাকে সন্তুষ্টির মানযিলে পৌঁছিয়ে দেবে।
ইয়াহইয়া ইবনু মুআয-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, বান্দা কখন সন্তুষ্টির মাকামে পৌঁছতে পারে? এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'বান্দা যখন তার রবের ব্যাপারে নিজেকে চারটি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখবে। (আর তা হলো,) সে বলবে,
১. 'আপনি যদি আমাকে দান করেন, আমি গ্রহণ করব;
২. যদি আমাকে দান করা থেকে বিরত থাকেন, আমি সন্তুষ্ট থাকব;
৩. যদি আমাকে পরিত্যাগ করেন, তবুও আমি আপনার ইবাদাত করতে থাকব; আর
৪. যদি আমাকে ডাকেন, তা হলে আমি সাড়া দেবো। [৪৭৪]
টিকাঃ
[৪৭৩] 'আর-রিসালাহ' গ্রন্থের লেখক। যা আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা নামে প্রসিদ্ধ।
[৪৭৪] দেখুন-আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১০/৬৬।
📄 অন্তরে ব্যথা-বেদনা অনুভব করা সন্তুষ্টির পরিপন্থি নয়
সন্তুষ্টির জন্য এটা শর্ত নয় যে, অন্তরে ব্যথা-বেদনা, কষ্ট ও দুঃখও অনুভব করবে না। বরং এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো: আল্লাহর কোনো বিধানে আপত্তি না করা এবং ক্রোধান্বিত না হওয়া। এই বিষয়টি না বোঝার কারণে কিছু কিছু মানুষ প্রশ্ন করে যে, কষ্টকর ও অপছন্দনীয় বিষয়ে সন্তুষ্টি কীভাবে আসে? তারা এ বিষয়টিকে মানতে নারাজ। তারা বলে, এ ক্ষেত্রে সন্তুষ্টি প্রকৃতি ও স্বভাববিরুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলো সবর বা ধৈর্যধারণ করা। আর কীভাবেই-বা সন্তুষ্টি ও অপছন্দ একত্রিত হবে, যখন এ দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী বিষয়!?
সঠিক অভিমত হলো: এ দুটির মাঝে কোনো বৈপরিত্য ও বিরোধ নেই। ব্যথা-বেদনা অনুভব করা আর নফস কোনো বিষয়কে অপছন্দ করা সন্তুষ্টির বিপরীত নয়। যেমন অসুস্থ ব্যক্তি তিক্ত ও অপছন্দনীয় ওষুধ সেবনে সন্তুষ্ট থাকে, সাওম পালনকারী ব্যক্তি কষ্টকর ও কঠিন গরম দিনেও ক্ষুধা-তৃষ্ণায় সন্তুষ্ট থাকে, এমনিভাবে আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ আঘাত ও যন্ত্রণা সহ্য করেও সন্তুষ্ট থাকে। এ রকম আরও উদাহরণ রয়েছে। (সুতরাং বোঝা গেল, কষ্টকর ও অপছন্দনীয় বিষয়েও সন্তুষ্ট হওয়া যায়।)
সন্তুষ্টির পথ সংক্ষিপ্ত পথ, বেশ নিকটবর্তী; যা একটি মহান গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেয়। তবে এ পথে বেশ কষ্ট ও পরিশ্রম রয়েছে। এ সত্ত্বেও এর কষ্ট, মুজাহাদা বা চেষ্টা-সাধনা করার কষ্টের চেয়ে কম এবং মুজাহাদার পথের মতো এখানে বেশি ঘাঁটি ও তেমন জটিলতা নেই। সন্তুষ্টির ঘাঁটির জন্য প্রয়োজন কেবল সুউচ্চ মনোবল, দৃঢ় সংকল্প, নফসের পবিত্রতা আর আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সমস্ত আদেশ-নিষেধ আরোপিত হয়, তাতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া।
বান্দার জন্য এটি অর্জন করা সহজ করে দেয় যে বিষয়টি তা হলো: বান্দার নিজের দোষত্রুটি এবং আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও বান্দার প্রতি তাঁর দয়া-অনুগ্রহ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা। যখন কেউ এই উভয় দিক প্রত্যক্ষ করেও আল্লাহর সামনে নিজেকে অর্পণ করে না, তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয় না এবং তাঁর প্রতি মহাব্বতের টান অনুভব করে না; তখন তার জেনে রাখা উচিত, তার নফস হলো আল্লাহর কাছ থেকে বিতাড়িত নফস, তার অবস্থান আল্লাহ থেকে অনেক দূরে, সে আল্লাহর বন্ধুত্ব ও নৈকট্যলাভের যোগ্য নয়; অথবা বিভিন্ন বিপদাপদ ও বালা-মুসিবত দিয়ে আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করছেন।
সন্তুষ্টি ও মহাব্বতের পথ বান্দাকে ভ্রমণ করাতে থাকে, যদিও সে তার বিছানায় শুয়ে থাকে, ফলে সে আল্লাহর পথের অন্যান্য অভিযাত্রীদের চেয়ে সামনে এগিয়ে যায় এবং তাদেরকে ছাড়িয়ে যায়।
📄 রিয়া বা সন্তুষ্টির ফল
তাকদীরের সব বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকা অন্তরে আনন্দ ও প্রশান্তি সৃষ্টি করে। সন্তুষ্টি দুনিয়াবি প্রতিটি পরিস্থিতি ও বিপদাপদে অন্তরে স্থিরতা ও নিশ্চিন্ততা নিয়ে আসে। এমনিভাবে সন্তুষ্টির ফল হলো-অল্পেতুষ্টি, আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার পাওয়ার জন্য বান্দার আগ্রহী থাকা, আল্লাহ কর্তৃক তার কাজকর্ম আঞ্জাম দেওয়ার ব্যাপারে খুশি থাকা, প্রতিটি বিষয়ে মাওলার প্রতি সমর্পিত থাকা, বান্দার ওপর আল্লাহ যে হুকুম জারি করেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকা এবং তা নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়া, আল্লাহর প্রতিটি কার্যপরিচালনাতেই বান্দার জন্য কল্যাণ ও হিকমত রয়েছে; এই বিশ্বাস করা, আল্লাহর ফায়সালা সম্পর্কে তাঁর বিরুদ্ধে কারও কাছে কোনো অভিযোগ না করা ইত্যাদি।
এ কারণেই আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ সন্তুষ্টির নামকরণ করেছেন 'আল্লাহর সাথে উত্তম আচরণ' বলে। কারণ সন্তুষ্টি বান্দাকে আল্লাহর মালিকানাধীন যেকোনো বিষয়ে আপত্তি না করাকে আবশ্যক করে। এমনিভাবে এমন কথাবার্তা বলা থেকেও তাকে বিরত রাখে, যা আল্লাহর সাথে উত্তম আচরণের পরিপন্থি। ফলে সে এ কথা বলবে না যে, 'মানুষের কত-না বৃষ্টির প্রয়োজন!' এ কথাও বলবে না যে, 'আজকে প্রচণ্ড গরম' বা 'আজকে তীব্র ঠান্ডা'। এ কথাও বলবে না যে, 'দরিদ্রতা হলো বিপদ আর পরিবার-পরিজন হলো চিন্তা ও পেরেশানির কারণ'। আল্লাহ তাআলা যা কিছু ফায়সালা করেন, সেগুলোকে মন্দ নাম দেওয়া থেকেও বিরত থাকবে। কারণ উপরিউক্ত সবগুলোই হলো সন্তুষ্টির বিপরীত ও পরিপন্থি বিষয়।
উমর ইবনু আবদিল আযীয বলেছেন, 'তাকদীরি বিষয়েই কেবল আমার আনন্দ ও খুশি উপলব্ধি হয়।' [৪৭৫]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ বলেছেন, 'দরিদ্রতা ও প্রাচুর্যতা দুইটি বাহন। আমি কোনটাতে আরোহণ করছি তার কোনো পরোয়া করি না। যদি দরিদ্রতা হয়, তা হলে তাতে রয়েছে সবর। আর যদি প্রাচুর্যতা হয়, তা হলে তাতে রয়েছে খরচ করা।'[৪৭৬]
ইবনু আবিল হাওয়ারি বলেছেন, 'অমুক ব্যক্তি বলে, 'আমি পছন্দ করি যে, রাত যদি আরও দীর্ঘ হতো'। তিনি বলেন, 'এটি এক দিক দিয়ে ভালো, আরেক দিক বিবেচনায় মন্দ। ভালো দিকটি হলো: সে এটি কামনা করছে বেশি ইবাদাত ও মুনাজাত করার জন্য। আর মন্দ দিকটি হলো: আল্লাহ যা ইচ্ছা করেননি, সে তা কামনা করছে এবং আল্লাহ যা পছন্দ করেননি, সে তা পছন্দ করছে।' [৪৭৭]
উমর ইবনুল খাত্তাব বলেছেন, 'আমি কোনো পরোয়া করি না যে, আমার সকাল-সন্ধ্যা দরিদ্রতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে নাকি সচ্ছলতার ভেতর দিয়ে। [৪৭৮]
একদিন রাগান্বিত হয়ে উমর তার স্ত্রী আতিকা-কে বলেন, যিনি সাঈদ ইবনু যাইদ-এর বোন, 'আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দেবো।'
জবাবে তার স্ত্রী বলেন, 'আপনি কি আমাকে ইসলাম থেকে সরিয়ে দিতে পারবেন, আল্লাহ আমাকে হিদায়াত দান করার পর?' উমর বলেন, 'না।' তখন তার স্ত্রী বলেন, 'তা হলে আর কীসের মাধ্যমে আমাকে কষ্ট দেবেন?! [৪৭৯]
এর দ্বারা আতিকা বুঝিয়েছিলেন যে, তিনি তাকদীরের সব বিষয়ে সন্তুষ্ট। কোনোকিছুই তাকে তেমন কষ্ট দিতে পারে না। কেবল তার ইসলাম থেকে সরিয়ে দেওয়াতেই তিনি কষ্ট পাবেন আর এর তো কোনো পথ নেই। (কারণ তা আল্লাহর হাতে, কোনো মানুষের আয়ত্তে তা নেই।)
একদিন সুফইয়ান সাওরি রাবিয়া বাস্সি-এর নিকট অবস্থান করার সময় এই দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, আমাদের ওপর আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যান।' তখন রাবিয়া বাসি বললেন, 'আপনার কি লজ্জা হয় না, আপনি আল্লাহর কাছে আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার প্রার্থনা করছেন; অথচ আপনি তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট?!' তখন সাওরি বললেন, 'আস্তাগফিরুল্লাহ, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।' এরপর রাবিয়া বাসির কাছে জা'ফর ইবনু সুলাইমান প্রশ্ন করলেন, 'কখন বান্দা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট বলে বিবেচিত হয়?' তিনি উত্তর দিলেন, 'বান্দা যখন বিপদ-মুসীবতে আক্রান্ত হয়, তখন সেরকমই আনন্দিত হওয়া; যেরকম আনন্দিত হয় কোনো নিয়ামাত ও অনুগ্রহ লাভ করলে।' [৪৮০]
তাকদীরের ওপর ঈমান আনা এবং এতে সন্তুষ্ট হওয়া বান্দার সমস্ত পেরেশানি, দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা দূর করে দেয়।
টিকাঃ
[৪৭৫] ইবনু রজব হাম্বালি, ফাতহুল বারি, ১/৫৩।
[৪৭৬] আবূ তালিব মাক্কি, কূতুল কুলুব, ২/৬৬।
[৪৭৭] আবূ তালিব মাক্কি, কুতুল কুলুব, ২/৬৬।
[৪৭৮] আবূ তালিব মাক্কি, কুতুল কুলুব, ২/৬৬।
[৪৭৯] আবূ তালিব মাক্কি, কূতুল কুলুব, ২/৬৬।
[৪৮০] আবূ তালিব মাক্কি, কূতুল কুলুব, ২/৬৬।